আঁধারি_অমানিশা
পর্ব ২+৩+৪+৫
নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
গায়ে হলুদের পর্ব মিটে গেলো। যে যার মতো ঘুমাতে চলে গেলো।
*
সকাল থেকে বাড়িতে হুলুস্থুল বেধে গেছে। বিয়ে তোড়জোড় চলছে বেশ। সবাই টুকটাক কাজ করছে।
মুনতাহা মায়ের পাশে বসে হাতে হাতে টুকটাক কাজ করে দিচ্ছিলো।
কিছুটা দূরে দুই প্রতিবেশি বলাবলি করছিলো,“বড় মেয়েটার লজ্জাবোধও নেই। নিজের আগে ছোটটার বিয়ে হচ্ছে তাও দেখো কেমন মুখ দেখিয়ে চলছে।”
“লজ্জা থাকলে কি এত বছর পার করতে পারতো? তাহলে তো সেই রাতেই মৃত্যুকে বরণ করে নিতো। এসব মেয়েদের লজ্জা থাকে না।”
“মেয়েটার কপাল খারাপ। নয়তো কি সুন্দর মেয়েটা শেষে কিনা কলঙ্কিত হতে হলো।”
“বাবা মায়েরও আক্কেল নেই, মেয়েটাকে বিয়েতে রাখার কি প্রয়োজন ছিলো? ছেলের বাড়ির লোকজন যদি জানে,বড় বোন অবিবাহিত তার উপর বিয়ে না হওয়ার কারণ জানলে তো শেষ। ছেলে পক্ষ মেঝ মেয়েকে গ্রহণ করে কিনা দেখো।”
“আমিও এই বিষয়টা নিয়ে ভেবেছি। তাদের উচিত ছিলো বড় মেয়েকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়ার।”
দু’জন কুটকাচালি করছিলো। পাশ থেকে মেঘরাজের কানে কিছু কথা গেলো।
মেঘরাজ নীলাশাকে এদিকটায় আসতে দেখে ডাক দিলো।
“নীলাশা শোন?”
“হ্যাঁ ভাইয়া বলেন।”
“আমার সাথে একটু ওদিকটায় চলো, কিছু জরুরি কথা আছে।”
“আচ্ছা চলুন।”
নীলাশা মেঘের সাথে ওদিকটায় গেলো।
“হ্যাঁ ভাইয়া বলুন, কিসের জন্য ডাকলেন?”
“আমাকে একটা প্রশ্নের জবাব দাও তো, তোমার বড় আপার বিয়ে হয়নি?”
নীলাশা কিছুটা চমকালো। নিজেকে সামলে বললো,“কেন আপনি জানেন না ভাইয়া?”
“না। আমি তো ভেবেছি মুনতাহার বিয়ে অনেক বছর আগেই হয়ে গেছে। কিন্তু ওখানে শুনলাম....।”
নীলাশা মেঘরাজকে থামিয়ে দেয়। বুঝতে পারলো হয়তো কারো পরনিন্দা পরচর্চা মেঘের কানে গিয়েছে।
“না ভাইয়া। বড় আপার বিয়ে হয়নি। বড় আপা একটা অফিসে চাকরি করে।”
“তুমি কিছু মনে না করলে আমি আরো একটা প্রশ্ন করবো?”
“হ্যাঁ ভাইয়া। বলুন?”
“আমি তো জানতাম এদিকে সবাই বড়দের বিয়ে না দিয়ে ছোটদের কথা ভাবে না। মানে লোকজন নানা ধরনের কথা বলে। তাই ভেবেছি মুনতাহার বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু ফুপি ওর বিয়ে না দিয়ে নীলিমার বিয়ে কেন দিচ্ছে?”
“আসলে ভাইয়া আমি এই ব্যপারে তেমন কিছু জানি না।"
নীলাশা এড়িয়ে গেলো। খুব শান্ত গলায় বললো,“আমি আসি ভাইয়া।”
নীলাশা মেঘের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। চলে গেলো। মেঘ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো।
তার কানে শুধু বাজছে,“আমি আপনাকে ভালোবাসি না। আমি অন্যকাউকে ভালোবাসি, দয়া করে আমাদের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবেন না। প্লীজ।”
★
নীলিমাকে কনে সাঁজানো হলো। যথা সময়ে বরযাত্রীও চলে এলো।
সবকিছু খুব ভালোভাবে মিটে গেলো। নীলিমার বিয়েটা হয়ে গেলো।
প্রতিবেশি কয়েকজনের মুখ দেখে মনে হলো, তারা আশা করছিলেন এখানে ঝামেলা হবে। কেউ হয়তো ঝামেলা চাইছিলেন বিধায় ছেলের বাবাকে মুনতাহার ঘটনা বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিশেষ লাভ হলো না। কারণ ছেলেপক্ষকে সবকিছু আগেই জানানো হয়েছে।
মূলত মুনতাহারের বাবা চায়নি বিয়ের দিন কোন সমস্যা হোক, যা ঘটে তা রটতে সময় নেয় না এটা তার ধারনা। সেই ধারনা থেকেই নিজ থেকে সব বলা।
*
কনে বিদায়ের সময় নীলিমা খুব কান্না করছিলো।আশেপাশে সবাই ছিলো, শুধু ছিলো না মুনতাহা। নীলিমার চোখ হয়তো কয়েকবার তাকে খুঁজছিলো। বেশ কয়েকবার চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিয়েছিলো।
*
মুনতাহা ছাদের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে।
“নীলিমাকে বিদায় দিতে যাবে না?”
মুনতাহা শব্দে পেয়ে ঘুরে তাকালো। সামনে মেঘরাজ দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুনতাহা স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,“এত লোকজনের মধ্যে ভালো লাগছে না।”
“ওহ। ভালো আছো মুনতাহা?”
“হঠাৎ এ কথা কেন? ভালো না থাকার তো কোন কারণ নেই।”
“আমি তো ভালো না থাকার বেশ কিছু কারণ দেখছি।”
“ভাইয়া এসব কথা বাদ দিন।”
“আচ্ছা দিলাম। তা তোমার প্রেমিক তোমায় ছেড়ে দিয়েছিলো কেন?”
মুনতাহা চুপ করে রইলো। এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।
“কি হলো বললে না তো?”
“সম্পর্কে আপনি আমার মামাতো ভাই, আশা করবো এমন কোন প্রশ্ন করবেন না যাতে নিজের সীমা লঙ্ঘন হয়।”
মুনতাহা চলে যাচ্ছিলো। পিছন থেকে মেঘরাজ তার হাত ধরে নিলো।
“আমি আমার সীমা খুব ভালোভাবে জানি তা তোমার শেখানোর প্রয়োজন নেই। এতটুকু বলো শুধু কি হয়েছিলো তোমার সাথে যার জন্য তোমার প্রেমিক ছেড়ে দিলো/ ফুপি তোমার আগে নীলিমার বিয়ে দিলো। কি হয়েছিলো? এবং কবে?”
“এসব বলতে আমি আগ্রহী নই।”
“কিন্তু আমি শুনতে আগ্রহী।”
“ভাইয়া দেখুন বাড়িতে অনেক লোকজন তারা আমাদের একসাথে দেখলে খারাপ ভাববে।”
“তো? তোমাকে ভালো ভাবে এরকম কাউকে তো আমি বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত দেখলাম না।”
“আপনি ঠিক বলেছেন আমাকে এখানে কেউ ভালো ভাবে না। তবে আপনাকে তো ভাবে, শুধু শুধু নিজেকে খারাপ ভাবাবেন কেন?”
“আমি বুঝলাম না খারাপ ভাববে কেন? আমরা না ভাই-বোন?”
“আপন তো না। কাজিন। আর কাজিনদের নিয়ে সবকিছু ভাবা যায়। লোকজন খারাপ ভাববে।”
“কাজিনদের মধ্যে সবকিছু হয়? প্রেম, বিয়ে সব?”
“মানে?”
“মানে আবার কি? তুমি যা বললে তাই বললাম। তবে এত বছর পর তোমার উন্নতি হয়েছে দেখে ভালোই লাগলো।”
মুনতাহা না বুঝে তাকিয়ে রইলো। মেঘ বললো,“আগে তো ভাই-বোন ভাবতে। মানে আপন। কাজিন আর আপন মায়ের ভাই-বোন একই ছিলো। তবে এখন ভাবনায় পরিবর্তন হয়েছে দেখে ভালো লাগলো।”
মুনতাহা চমকালো। হঠাৎ মনে পড়লো একদিন মেঘরাজ বলেছিলো,“কাজিনদের মধ্যে সব হয়। কাজিনদের নিয়ে সব ভাবা যায়। একদিন দেখবে তুমি এটা বলবে।”
“কি হলো কি ভাবছো? আমার কথা মিলে গেছে সেটা ভাবছো?”
মেঘরাজের কথায় ভাবনা থেকে বের হয়ে এলো। মুনতাহা বললো,“আপনি আমাদের বাড়ির আত্মীয়, আত্মীয়র মতোই ব্যবহার করুন। হাত ছাড়ুন। এটা বিদেশ নয় যে যখন খুশি চাইলে যে কারো হাত ধরা যায়।”
মেঘরাজ হাসলো। মুনতাহা মেঘরাজের হাসি দেখে ঘাবড়ালো। মেঘরাজ বললো,“তোর কি ধারণা আমি পুরনো কথা মনে রেখেছি? বিদেশ থেকে এসে তোকে অবিবাহিত দেখে পুরনো প্রেম জেগে উঠেছে? তাহলে তুই ভুল ভাবছিস, আমি সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস জীবনে গ্রহণ করি না। তুই তো প্রেমিকের ধোঁকা খেয়ে শেষ হওয়া প্রেমিকা। যার জীবনে আগেই কেউ ছিলো।
আর শোন, আমি তোকে কাজিন ছাড়া কিছু ভাবি না। আমি না থাকাকালীন একটা ঘটনা ঘটে গেছে, জানি না বলে জিজ্ঞেস করেছি। এতটুকুই।”
মেঘরাজ চলে গেলো। পিছন ফিরে আর একবারও দেখলো না।
মুনতাহা ছাঁদে বসে পড়লো। মুনতাহা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,“সেকেন্ড হ্যান্ড?”
মুনতাহা কান্না করে দিলো। বিয়ে বাড়ির ব্যস্ত পরিবেশে তার কান্না কারো চোখে পড়লো না।
★
মুনতাহার বাবা মেয়েকে বিদায় দিয়ে সেই যে ঘরে এসে বসেছেন আর বের হননি। মুনতাহার মা ঘরে এসে তাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,“তুমি কিছু নিয়ে চিন্তিত? নীলিমার চলে যাওয়ায় কষ্ট হচ্ছে?”
বাবা বললেন,“তা একটু হচ্ছে। তবে বেশি কষ্ট হচ্ছে মুনের জন্য।”
“মুনের জন্য কষ্ট হচ্ছে?”
“হ্যাঁ। মেয়েটার সাথে বড় অবিচার হয়ে গেলো। কারণে অকারণে আমিও তাকে কম কথা শোনায়নি, কি করবো বলো? পরিস্থিতি এমন হয়ে গেছে যে আমি আর নিজের মাথা ঠিক রাখতে পারি না। আমি খুব খারাপ বাবা তাই না? নিজের বড় মেয়ের কথা না ভেবে মেঝ মেয়ের কথা ভাবলাম, হয়তো পরে ছোট মেয়ের কথাও ভাববো।”
“না তুমি খারাপ বাবা নও। আমি জানি তুমি কেন মুনকে এভাবে কথা শোনাও। মুনও বোঝে।
না বুঝলে হয়তো আমি তোমাকে খারাপ বাবা বলতাম। কিন্তু বলা হবে না। কারণ তোমাকে যখনি খারাপ ভাবতে যাবো ঠিক তখনি আমার মনে পড়ে যায় সেদিনের সেই ঘটনা, মা হয়ে আমি যতটা না মেয়ের পাশে ছিলাম, তারচেয়ে বেশি তুমি ছিলে। তাই তোমাকে বাবা হিসাবে খারাপ বলাটা সাজে না।”
“তোমার মতো মুনও কি বোঝে? নাকি আমার বিরক্তি, রাগের মাথায় বলা কথাগুলোই শুধু শুনে?”
“মুন আমাদের বিচক্ষণ মেয়ে, তাই তুমি ভেবো না। ও ঠিকই তোমার পরিস্থিতি বোঝে।”
“বুঝলে ভালো। নয়তো সারাজীবন আমি তার চোখে খারাপ বাবা হয়েই থাকবো।”
“এসব কথা বাদ দাও না।”
“বাদ দিলেই কি সব কথা বাদ দেওয়া যায়?”
বাবা চোখের কোণে আসা জলটা মুছে নিলেন। মা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ালো।
_______
শিরিন বেগম বসার ঘরে ছিলেন৷ কলিংবেলের শব্দ পেয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। সামনে তার মেয়ে রুমঝুম দাঁড়ানো। শিরিন বেগম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন রাত এগারোটা বাজে। তিনি বেশ শান্ত গলায় বললেন,“এতরাত অব্দি কোথায় ছিলে?”
রুমঝুম বললো,“বন্ধুর বাড়ি ছিলাম।”
“বন্ধুর বাড়ি থেকে কেউ এত রাতে বাসায় আসে? সময় সম্পর্কে জ্ঞান নেই তোমার, কতটা সময় বাহিরে থাকা উচিত, কতটা সময় নয় সেটা জানো না তুমি?”
“সবে তো রাত ১১ টা বাজে তাতে সমস্যা কি?”
“সমস্যা কি মানে তুমি এতরাত অব্দি বাহিরে থাকবে? রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি ভালো না, যদি তোমার সাথে কিছু হয়ে যায়। তোমার জন্য আমরা আমাদের মান-সম্মান নষ্ট করতে পারবো না।”
“আসল কথা বলো, আসল সমস্যা মান-সম্মান। আমার বিপদ হওয়াটা তোমাদের আসল সমস্যা নয়। তাই না?”
“সে তুমি যাই মনে করো। আমার বাড়িতে থাকতে হলে তোমাকে অবশ্যই সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে হবে।”
“তা হঠাৎ এত সচেতন হলে কিসের জন্য? কই আগে তো কখনো সচেতনতা চোখে পড়েনি, আজ হঠাৎ মেয়েকে নিয়ে এত ভয়?”
“তুই তো জানিস না, নিচতলায় যারা থাকে মানে ঐ মুনতাহারা। আজ মুনতাহার মেঝ বোনের বিয়ে ছিলো।”
“তো?”
“জানিস মুনতাহা বড় হওয়া সত্ত্বেও ওর বিয়ে কেন দেয়নি? আগে ছোট মেয়ের বিয়ে কেন দিলো?”
“জানি।”
“তুই জানিস কিভাবে? আমি তো আজ জানলাম।”
“যেভাবে তুমি জানো। তোমাকে এক কাকী মা বললো, তুমি আবার আর একজনকে বললে, এভাবে পুরো বিল্ডিং এমনি ছড়িয়ে গেছে।
তো ভয় পাচ্ছো আমার সাথে এমন না হয়?”
“হ্যাঁ। তুমি বড় হয়েছো, তাই এখন থেকে তোমাকে সেভাবে চলাফেরা করতে হবে।”
“যার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে, তাকে নিয়ে মিছেই ভয় পাচ্ছো তুমি।”
“মানে? তুই কি বলতে চাইছিস?”
“কিছু না। তোমার সাথে ফালতু কথা বলার সময় আমার নেই। গেলাম আমি।”
রুমঝুম তার মাকে এড়িয়ে চলে গেলো।
'
'#আঁধারি_অমানিশা
#পর্ব ৩
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
মুনের আজ অফিস থেকে বের হতে বেশ রাত হয়ে গেলো। কাজের চাপ ছিলো বেশ। বোনের বিয়ে উপলক্ষে বন্ধ নিতে গিয়ে বেশ কাজ জমে গেছে। সব কাজ শেষ করে বের হতে গিয়ে রাত ১০টা প্রায়।
অর্ধেক পথ গাড়িতে(টেক্সি) আসার পর হঠাৎ গাড়িটা থেমে গেলো।
মুন বললো,“কি হলো মামা গাড়ি থামালেন কেন?”
চালক বললেন,“জানি না মা। চলতে পথে হঠাৎ থেমে গেলো। এখন স্টার্টও নিচ্ছে না। মনে হয় নষ্ট হয়েছে। আমি দুঃখিত, তুমি প্লীজ অন্যকোন গাড়ি দেখো।”
“এখন এই গলির মাথায় গাড়ি কোথায় পাবো?”
“আমিও বা কি করবো?”
“আচ্ছা সমস্যা নাই। দেখছি আমি।”
মুন নেমে যায়। গলি থেকে হাঁটা শুরু করে। কিছুটা সামনে দুটো ছেলেকে বসে সিগারেট খেতে দেখলো। ছেলে দুটোকে দেখে কিছুটা ঘাবড়ালো মুন। তবে থেমে থাকলো না, সে তার মতো হেঁটে চলেছে।
ছেলে দুটো একবার তার দিকে তাকালো। পরক্ষনে চোখ ফিরিয়ে নিলো।
যতই হোক একা একটা মেয়ে, মুন কিছুটা ভয় পেয়েছে। তবুও হেঁটে যাচ্ছে। তবে ছেলেগুলো কোনরকম খারাপ কিছু করেনি। মুন সেটা তাদের ছাড়িয়ে কিছুটা সামনে যাওয়ার পর উপলব্ধি করলো। তবুও তার মনে ভয় বাসা বেঁধেছে। হয়তো মেয়ে বলে জন্ম নিয়েছে বলেই এই ভয়। নারী হৃদয় যেমন নরম তেমনই ভিতু, কথায় বলে। তাই মুন তার ভয়টাকে স্বাভাবিকভাবে নিয়ে গন্তব্যে এগিয়ে যাচ্ছে।
আশেপাশে তাকিয়ে একবার দেখে নিলো, কোথাও কোন গাড়ির দেখা মেলে কিনা। কিন্তু না মিললো না।
কিছুটা সময় পর, মুনের সামনে একটা বাইট এসে থামলো। হুট করে বাইক সামনে আসায় চমকে উঠলো মুন। পরক্ষণে বাইক চালককে দেখে স্বাভাবিক হলো।
মেঘরাজ বাইকে বসে থাকা অবস্থায় বললো,“উঠে আসো।”
“ভাইয়া আপনি এখানে? কি করছিলেন?”
“তোমাদের বাড়ি যাচ্ছি। তুমি যাবে? যেতে চাইলে আসো?”
মুন কিছু একটা ভেবে বললো,“না। আমি হেঁটে যেতে পারবো।”
“বাহ পায়ে জোর আছে বলতে হবে। আধা কিলোর মতো পথ হেঁটে যাবে। বেশ উন্নতি হয়েছে বলতে হয়।”
“হ্যাঁ। আপনি যান।”
“নাটক বাদ দাও। এখানে তোমার প্রেমিক আসেনি, ভাই এসেছে। ভাইয়ের বাইকে ওঠাই যায়।”
মুন তাও দাঁড়িয়ে রয়েছে। মেঘরাজ বললো,“তোমার কি মনে হয় আমি সব ভুলে গিয়ে তোমার সাথে আবার রংঢং করবো? একদমি না। এসব ভুল ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসো। এখন আমি শুধু তোমার ভাই। বুঝলে, এই কথাটা মাথায় রাখো।”
“আমি কখন বললাম আপনি আমার ভাই না। এত বেশি বুঝেন কেন?”
“আমি না বেশি তুমি বুঝো। তুমিই তো ভাবছো, আমার বাইকে গেলে তোমার হাতের ছোঁয়া আমার গায়ে লাগবে, আমি অন্যকিছু ভাবতে পারি। এসবের জন্যই তো উঠছো না।”
মুন চমকালো। মনের কথা বুঝলো কিভাবে? এ কি মন পড়তে জানে নাকি?
“না। আমি মন বিশেষজ্ঞ নই। তবে কথা বলে, যার দৌঁড় যতটা। তাই বুঝে নিয়েছি, তোমার ভাবনার দৌঁড় কোথায় গিয়ে থেমেছে।”
“মোটেই না। আপনি ভুল ভাবছেন।”
“ভুল আমি কখনোই ভাবি না। তবে একবার অজান্তে ভুল হয়ে গেছে। আমি আশা রাখছি আর কখনো হবে না।”
মুন অবাক হয়ে মেঘরাজের দিকে তাকালো। মেঘরাজ মুচকি হাসলো।
মুন আস্তে করে উঠে মেঘরাজের বাইকে বসলো। মেঘরাজ বাইক চালানো শুরু করলো।
“ভালোভাবে ধরে বসো। পড়ে গিয়ে কোমর গেলে শেষে আমারই দোষ হবে।”
মুন কিছু বললো না। মুন ধীরে ধীরে মেঘরাজের কাঁধে হাত রাখলো। মেঘরাজ আপনমনে বাইক চালাচ্ছে। মুন পিছনে বসে চোখ বন্ধ করে নিলো।
অতীত,
গভীর রাত। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। মুনও ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন হন্তদন্ত হয়ে মেঘরাজ মুনের ঘরে ঢুকলো।
মুন বললো,“একি ভাইয়া তুমি ঘুমাওনি?”
“না। চল আমার সাথে।”
“মানে? কোথায়?”
“ফুচকা খেতে।”
“কি? এতরাতে? তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”
“একদমি না।”
“আরে বাসার সবাই জানতে পারলে কি বলবে? তারা কিছুতেই রাজি হবে না এখন বাইরে যেতে দিতে।”
“আরে তাদের জানাবো কেন? আমরা তো লুকিয়ে বের হবো।”
“কি?”
“হ্যাঁ। চল।”
“না আমি যাবো না। আমার ভয় করছে।”
“তুই সেই ভীতুই রয়ে গেলি। ক্লাস নাইনের বুড়ি ভাব দেখো ক্লাস ওয়ানের বাচ্চা জেনো।”
“কি? আমি বুড়ি?”
“তো কি বাচ্চা?”
“আমি তোমার সাথে যাবো না। তুমি আমাকে বুড়ি বলে অপমান করেছো, আমি কিছুতেই তোমার সাথে যাবো না।”
“আরে একটু তো বুড়িই বলেছি তাতে কি হয়েছে? আচ্ছা স্যরি। আর বলবো না। এবার চল।”
“আচ্ছা মাফ করলাম। তাও আমার বাহিরে যেতে ভয় করছে। এভাবে লুকিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে?”
“ধুর বোকা। লুকিয়ে যাওয়াটাই তো মজার। চল আজ আমার সাথে, দেখবি লুকিয়ে লুকিয়ে যেতে কত মজা।
মনে হালক ভয় থাকবে এই ধরা পড়ে না যাই। আর বুকে অধম্য ইচ্ছা, যে বাহিরে যেতে হবে আমাকে। দেখবি সেই এক অনুভূতি৷ চল।”
মুন বাঁধা দিতে চাইলেও মেঘ শুনলো না। মুনকে নিয়ে লুকিয়ে বাহিরে চলে গেলো।
মুন মেঘের সাথে পাশাপাশি হাঁটছিলো। মুন বললো,“আমরা কি শুধু হাঁটবো?”
“না। তোকে শুধু হাঁটতে কে বলেছে, আকাশের দিকে তাকা।”
“কেন?”
“তাকা না।”
মুন তাকালো।
“কি দেখছিস?”
“আকাশ তার মাঝে ঝলমল করছে কতগুলো তারা। সুন্দর দৃশ্য।”
“উঁহু। তারচেয়ে সুন্দর দৃশ্য আছে আকাশে। ভালোভাবে দেখ।”
“আর কি?”
“হাজার তারা মাঝে এক চাঁদ। যার নিজস্ব কোন আলো নেই তবুও দেখ তারাগুলোর পাশে কত সুন্দর করে জেগে আছে। মনে হচ্ছে চাঁদের আলোয় পুরো আকাশ আলোকিত হয়েছে।”
“এইমাত্র না বললে চাঁদের কোন নিজস্ব আলো নেই তবে তার আলোতে আকাশ কিভাবে ঝলমল করে?”
“ঐ যে উজ্জ্বল তারা। তারা বোধহয় চাঁদকে আলো দিয়ে আলোকিত করছে। চাঁদটাকে দেখতে সুন্দর লাগছে না?”
“হ্যাঁ খুব সুন্দর।”
“ঠিক যেমন তুই।”
মুন বিষ্ময় নিয়ে মেঘরাজের দিকে তাকালো।
“মানে?”
“এই নিরিবিলি রাতের চাঁদ। আমার চন্দ্র।”
মুন মুচকি হেসে মেঘরাজের দিক তাকালো। মেঘরাজ বললো,“এখন কেমন লাগছে?”
“খুব ভালো। আচ্ছা ঐ চাঁদের তো আলো নেই, তাহলে কি আমারো নেই?”
“তা জানি না। তবে ঐ তারাগুলোর মতো তোকেও আলো দিয়ে একজন জাগিয়ে রাখছে।”
“কে? তুমি?”
“অবশ্যই আমি।”
মুন কিছু বললো না। সদ্য কিশোরীতে রুপান্তিত হওয়া নারী হিসাবে মুনের হৃদয়ে ভালোবাসা নামক শব্দটা বেশ গোছালো। সে জানে ভালোবাসার মানে, তার অনুভূতি সম্পর্কে। আর এটা বোঝেও মেঘরাজ তার প্রতি দূর্বল। একটু না অনেকটা।সেই ছোট থেকেই, তাই তো নিজ বাড়ি ছেড়ে বেশিরভাগ সময় ফুপুর বাড়িতে কাটায় মেঘরাজ। মুন যে দূর্বল নয় তা নয়। তবে মুনের বারবার মনে হয়,“ এটা কি ঠিক। তারা তো সম্পর্কে ভাই-বোন। সমাজের চোখে তাদের কৈশোরের এই অনুভূতি কেমন নাম পাবে?”
*
তারপর মেঘরাজ মুনকে ফুঁচকা খাওয়ালো।
তারপর কত রাত এভাবে লুকিয়ে রাত্রীবিলাস করো কাটলো তাদের, এটা একমাত্র তারাই জানে। কত রাতের আকাশ সাক্ষী তাদের অনুভূতির। তবে অনুভূতি প্রকাশ করা আর হলো না।
বর্তমান,
“ঐ কোথায় হারিয়েছো?”
মেঘের কথায় হুঁশ ফিরলো মুনের। মুন বললো,“হ্যাঁ।”
“বাসায় এসে গেছি। যাও ভিতরে।”
“তুমি যাবে না?”
“না ইচ্ছে করছে না। বাসায় যাবো।”
“কিছুক্ষন আগে না বললে আমাদের বাসায় থাকবে?”
“একটু আগে যে মায়ের সাথে কথা বললাম তখন কোথায় ছিলে? কি এত ভাবছিলে?”
“না মানে কিছু না।”
“বুঝেছি। নিশ্চয় বেঈমানটার কথা ভাবছিলি।”
মুন বিরক্ত হলো। কিন্তু তা প্রকাশ করলো না।
মেঘরাজ বললো,“আমাকে ভালোবাসলি না কেন মুন? আমাকে ভালোবাসলে কি ক্ষতি হতো? সেই তো যাকে ভালোবাসলি সে তোকে ধোঁকা দিয়ে গেলো। আমি অন্তত ধোঁকা দিতাম না।”
মেঘ মুনের উত্তরের অপেক্ষায় তার দিকে চেয়ে রইলো। কিন্তু মুন সে তো নিরোত্তর। চুপ করে রইলো। মেঘ বিরক্ত হয়ে চলে গেলো। মুন বাসার ভিতরে ঢুকলো।
*
'#আঁধারি_অমানিশা
#পর্ব ৪+৫
#নুসরাত জাহান মিষ্টি
রুমঝুম বাসার দিকে ফিরছিলো পথে নীলাশার সাথে দেখা হয়ে গেলো। রুমঝুম নীলাশাকে দেখতে পেয়ে বললো,“এই পিচ্চি, এদিকে আয়।”
নীলাশা বললো,“রুমঝুম আপু তোমাকে না বলেছি আমাকে পিচ্চি ডাকবে না।”
“তোকেও না বলেছি, আমি এটা বলেই ডাকবো।”
“তোমাকে নিয়ে আর পারি না।”
“যাই হোক বাসায় ফিরছিস?”
“হ্যাঁ।”
“এত তাড়াতাড়ি? সবে তো দুপুর বারোটা বাজে এত তাড়াতাড়ি স্কুল ছুটি হয়ে গেলো?”
“না।”
“স্কুল ফাঁকি দিয়ে এসেছিস?”
“না।”
নীলাশার না শুনে রুমঝুম খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকালো।
নীলাশা কিছু একটা ভাবলো তারপর বললো,“আচ্ছা আপু তোমাকে একটা সত্যি বলবো?”
“হ্যাঁ বল।”
“আমি না স্কুল পালিয়ে আসছি। এখন বাসায় গেলে মা খুব বকবো তাই বলছিলাম....।”
রুমঝুম নীলাশাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,“আমার বাসায় গিয়ে কাটাতে চাস তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
“এভাবে রোজ স্কুল ফাঁকি দিস কেন?”
“রোজ কই। মাঝেসাজে দেই।”
“মাঝে মাঝে বা ফাঁকি কেন দেই?”
“আরো একটা সত্যি বলবো?”
“কি? স্কুল ভালো লাগে না। তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
“এই কথাটা তুমি আগে আরো অনেকবার বলেছো।”
“তোমার মনে আছে তবে?”
“হ্যাঁ মনে আছে।”
“তাহলে সবসময় জিজ্ঞেস কেন করো ফাঁকি দেই কেন?”
“কারণ পড়ালেখা কারোরি ভালো লাগে না। তবুও সবাইকে করতে হয়। পড়ালেখা না করলে উপরে কিভাবে উঠবি? নাকি পড়ালেখা বাদ দিয়ে বিয়ে করার ইচ্ছে?”
“আমি একটা বাচ্চা মেয়ে, তুমি আমাকে এসব কি বলছো?”
“বাচ্চা হয়ে আমার মতো বড় মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব গড়লি কেন?”
“সে তো তোমায় ভালো লেগে গেছিলো তাই।”
“তাই?”
“হ্যাঁ।”
“আচ্ছা তোর আমাকে এত ভালো লাগলো কেন? আমি সবসময় চুপচাপ, একা একা থাকি বলে কেউ আমাকে পছন্দ করে না। তা তুই করলি কেন?”
“তুমি চুপচাপ কই থাকো? আমি তো দেখি তুমি খুব বকবক করো।”
“সে তো তোর সাথে, তুই আমার সাথে সেরকম সম্পর্ক তৈরি করে নিয়েছিস তাই।”
“এটাই কারণ। অন্যরা তোমার সাথে কখনো আগ বাড়িয়ে কথা বলেনি, তাই তুমিও বলোনি। নয়তো তুমি চুপচাপ থাকার মেয়ে নও।”
“না রে তেমন নয়। আসলে আমিও একসময় সবার সাথে কথা বলতে চাইতাম। ছোটবেলা থেকে বাবা-মা কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকায় আমাকে ঘরবন্দী করে রেখে যেতো, তাই আশেপাশে ঘরে গিয়ে সবার সাথে কথা বলা হয়নি। তারপর যখন বাবা-মা বন্দী করে রাখতো না তখন আর যাওয়ার ইচ্ছে হয়নি। কারণ অভ্যাস হয়ে গেছিলো।”
“হুম। তুমি খুব কষ্টে বড় হয়েছো ছোটবেলা থেকে তাই না?”
“ না তো। তোর এমন মনে হলো কেন?”
“তুমি মিথ্যা বলছো। আমার বন্ধু পিংকি আছে না, ওর বাবা-মাও কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাই ওর সবসময় মন খারাপ থাকে।ওর খুব কষ্ট হয় । তাই আমি বুঝি তুমিও খুব কষ্টে ছিলে।”
“তুই তো ভালোই বড় হয়েছিস।”
“তুমি আমাকে যতটা বাচ্চা মনে করো আমি ততটাও নই।”
“কথা বলতে বলতে বাসার সামনে এসে গেছি, তোর বাবা মা দেখার আগে আমাদের ফ্লোরে চল।”
“হ্যাঁ।”
নীলাশার সাথে রুমঝুমের বেশ আগে থেকে আলাপ। নীলাশা আগ বাড়িয়ে রুমঝুমের সাথে গল্প করা শুরু করেছিলো, এক পর্যায়ে রুমঝুমের গল্প করার সাথী হয়ে ওঠে নীলাশা। নীলাশা মাঝে মাঝে স্কুল পালিয়ে রুমঝুমদের বাসায় এসে কাটিয়ে যেতো। রুমঝুম তাতে বাঁধা দিতো না। কারণ তার বেশ ভালো লাগতো। নীলাশার সাথে গল্প করে তার দিনটা বেশ ভালোই যেতো।
*
নীলাশাকে নিয়ে রুমঝুমে ঘরে প্রবেশ করতে তার মা বললো,“তুই এই বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে এসেছিস কেন? তুই তো কারো সাথে তেমন মেলামেশা করিস না, কেউ তোর সাথে থাকুক তা পছন্দ করিস না তবে এঁকে নিয়ে আসলি কেন?”
“আমার সব পছন্দ অপছন্দ তুমি বুঝি জানো? বাসায় তো রইলে সবে কয়েকদিন, এরমাঝে সব জেনে বসে আছো?”
রুমঝুম নীলাশাকে বললো,“আমার ঘরে আয় পিচ্চি।”
নীলাশা রুমঝুমের সাথে তার ঘরে গেলো। রুমঝুমের মা শিরিন বেগম হতভম্ব হয়ে গেলো। মেয়ে তাকে কোন বিষয়ে পাত্তাই দেয় না, ব্যপারটা তাকে বেশ পোড়ায়। এর কারণও সে জানে। তার চাকরি। চাকরি এবং সন্তান দুটো মধ্যে সমতা মেনটেন করতে পারিনি সে। বলা চলে কখনো চায়নি। তার কাছে তখন বাচ্চা অতিরিক্ত ঝামেলা মনে হতো।
অতীত,
শিরিন বেগম কর্মস্থলে কাজ করছিলেন। তখন তার এক কলিগ মেয়েকে খাওয়াচ্ছিলেন।
“বাবু আর একটু আছে খাও। এভাবে না খেয়ে থাকলে হয়।”
শিরিন বেগম বললেন,“অফিস টাইমে বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছেন? এজন্যই আপনার কাজ শেষ হয় না, রোজ ওকে নিয়ে আসার কি প্রয়োজন?”
“দেখুন আমি ওকে পারমিশন নিয়েই নিয়ে আসি। তাছাড়া আমার কাজ অফিস টাইমের মধ্যে শেষ না হলে আমি ওভার টাইম করি। কাজ শেষ করে তবেই বাড়ি যাই। তাই আমি কোনসময় আমার বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছি, সেটা দেখার বিষয় নয়।”
“আমি ওভাবে বলতে চাইনি। রোজ রোজ ওকে নিয়ে আসেন, আপনার কাজের সময়ও দেখি বিরক্ত করে, কখনো কখনো কাজগুলো নষ্ট করে। আপনাকে বসে বসে পুনরায় করতে হয়। তাই বলছিলাম আমি, রোজ রোজ ওকে নিয়ে আসার কি প্রয়োজন?”
“প্রয়োজন আছে। কয়েকদিন পর ওকে স্কুলে ভর্তি করাবো, তখন ও আসবে না। তাই এখন সাথে করে নিয়ে আসি। এই ক’টা দিন ওকে একা রেখে আমি চাই না ওর মনের উপর কোন প্রভাব পড়ুক। কিংবা ওর মনে হোক ওর মা কাজ করতে গিয়ে ওকে প্রায়োরিটি দিচ্ছে না।”
“স্কুলে ভর্তি করালে যে এমনটা মনে হবে না সেটা তো নয়? কারণ সেসময় তো ও আপনার সাথে থাকবে না।”
“তখন আমি ওভার টাইম করবো আপনি কি সেটা ভাবছেন? একদমি না। তখন আমি পাঁচটার মধ্যে কাজ শেষ করে চলে যাবো। স্কুল ছুটির পর কয়েক ঘন্টা তো সেটা ম্যানেজ করা যাবে। আর বাসায় গিয়ে যতটা টাইম আমি অফিসে বেশি সময় দিতাম ততটা সময় আমি ওকে দিবো। তারপর বাকি কাজ, যেটা এখন করি।”
“আপনার এই বিষয়টা আমার পছন্দ না। যাই হোক আমি বলার কে?”
“সময় হলে আপনি বুঝবেন, আমার এই কাজটা কত গুরুত্বপূর্ণ।”
বর্তমান,
শিরিন বেগম এখন বুঝেন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তার মেয়ে তার থেকে কতটা দূরে চলে গেছে।
----
মুন কাজ শেষে বাসায় এসে দেখলো বাহির থেকে তালা মারা। মুনের কাছে চাবি থাকায় সেটা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো। মুন তার মাকে ফোন দেওয়ার কথা ভাবলো, এর মাঝে তার মা ফোন দিলো।
“হ্যাঁ মা। কোথায় তোমরা?”
মুনের মা বললেন,“তোর মামা বাসায়। আমরা রাতের মধ্যে ফিরে আসবো, চিন্তা করিস না।”
নীলাশা মায়ের থেকে ফোনটা নিয়ে নিলো।
“হ্যাঁ আপু?”
“হ্যাঁ। বল বনু।”
“জানো আপু আমরা আজ মামার বাড়ি কেন এসেছি?”
“কেন?”
“মেঘ ভাইয়ার হবু বউকে দেখতে। আজ আমরা সবাই দেখতে গিয়েছিলাম। জানো আপু খুব সুন্দর দেখতে মেয়েটা, বাসায় গিয়েই তোমাকে খবরটা দিতাম। মা ফোন করায় এখনই দিয়ে দিলাম।”
মুনের মা নীলাশার থেকে ফোনটা এক প্রকার কেড়ে নিয়ে কেটে দিলো।
“তোকে বেশি বুঝতে বলেছে কেউ? তোকে মুনকে জানাতে বলছি আমি? তুই ফোন কেড়ে নিয়ে জানালি কেন? এত অগ্রিম ওস্তাদি কেন তোর?”
মাকে এভাবে রেগে যেতে দেখে বেশ ঘাবড়ালো নীলাশা। ভয়ে ভয়ে বললো,“তুমি হঠাৎ এভাবে রেগে গেলে কেন মা?”
মুনের মা নিজেকে স্বাভাবিক করে শান্ত গলায় বললেন,“বাসায় গিয়ে আপুকে মেঘরাজের বউ কিংবা ওর বিয়ে নিয়ে কিছু বলবে না। আমার কথাটা মাথায় রেখো।”
“আপুকে বললে কি হবে?”
“আপু কষ্ট পাক এটা চাও না তো? তাহলে শুনে রাখো তুমি এসব বললে তোমার আপু খুব কষ্ট পাবে, তাই তুমি তাকে এসব নিয়ে কিছু বলবে না। মনে থাকবে?”
নীলাশা কিছু বুঝলো না। তবে মা যখন বলেছে আপু কষ্ট পাবে তখন পাবে। তাই নীলাশা মাথা নেড়ে বুঝালো সে বুঝতে পেরেছে।
*
মুন বিছানায় শুয়ে আছে। সে ঠিকই শুনেছে মেঘরাজের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়েছে তারা।
মুনের ভিতরে কেমন অনুভূতি হচ্ছে তা সে বুঝতে পারছে না। তার হঠাৎ করে এত কষ্ট হচ্ছে কেন? এটা তো হওয়ার ছিলো। এখানে তার কষ্ট পাওয়ার তো কোন কারণ নেই।
মুনের মন হঠাৎ বলে উঠলো,“তবে কি কিশোরী বয়সের আবেগকে ভুলতে পারেনি সে। সে সেই আবেগে আজও পড়ে আছে।”
পরক্ষণেই বলেই উঠলো,“না এটা ঠিক নয়। সেসময়ে যেটা সম্ভব ছিলো না, সেটা এখন তো কোনমতে সম্ভব নয়।”
---
নীলাশারা বাসায় চলে গেলো। মেঘ বাসায় এসে তাদের পেলো না। মেঘ বাসায় আসতে তার মা বললো,“মেঘ তোর সাথে আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
“হ্যাঁ মা বলো?”
“এই ছবিটা দেখ।”
মেঘের মা ফোন থেকে ছবি বের করে দিলো। মেঘ সেটা দেখলো।
“এই মেয়ের ছবি দেখে আমি কি করবো?”
“কি করবি মানে? এই মেয়েটাকে আজ আমরা দেখে এসেছি।”
“তোমরা দেখে এসেছো তো কি হয়েছে?”
“আরে তুই আসল ব্যপারটা বুঝতে পারছিস না। আমি এই মেয়েটাকে তোর জন্য তোকে এসেছি।”
মেঘ চমকালো। কোনমতে নিজেকে সামলে বললো,“আমাকে না জিজ্ঞেস করে তোমরা এতদূর এগিয়ে গেছো?”
“কেন? তোর মেয়েটাকে ভালো লাগেনি?”
“এখানে ভালো লাগা, না লাগার কথা নয় মা। আমি এই মূহুর্তে বিয়ে করবো না।”
“মানে বিয়ে করবি না মানেটা কি? বয়স কত হয়েছে দেখেছিস? এখনো বিয়ে না করলে কবে করবি?”
“জানি না। তবে আমি এখন বিয়ে করবো না।”
“কেন? কি সমস্যা তোর?”
“সমস্যা একটাই, কিশোর বয়সের আবেগ থেকে বের হতে পারিনি।”
মেঘরাজ নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। মেঘের মা সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। তিনি বুঝতে পারলেন না, মেঘ এইমাত্র কি বলে গেলো।
*
মেঘ ঘরের মধ্যে গিয়ে বিছানায় বসে পড়লো। নিজের চোখ বন্ধ করে নিলো। সেখানে মুনকে নিয়ে রাতের শহর ঘুরে বেড়ানোর সুন্দর দৃশ্যগুলো ভেসে উঠেছে। পরক্ষণেই মনে হলো মেঘের গালে স’জোরে কেউ থাপ্পড় মারলো। মেঘ চোখ খুলে ফেললো।
মেঘ বলে উঠলো,“ভালোবাসা এত পোড়ায় কেন?”
'
'
চলবে,
(ভুলক্রটি ক্ষমা করবেন।)
#আঁধারি_অমানিশা
#পর্ব ৫
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
মুনের মা কয়েকবার মুনের করে কড়া নাড়লো, মুন দরজা খোলেনি। মুন ঘুমিয়েছে ভেবে তিনি চলে গেলেন।
মুন বিছানায় শুয়ে ছিলো। শব্দ করার মতো জোর মুখে নেই। তাই মায়ের ডাকে জবাব দিলো না।
তার ভিতরে কি হচ্ছে একমাত্র সেই জানে। বয়সের দিক দিয়ে পরিপক্বতা পেয়েছে মুন, কিন্তু তাও আজ কেন জানি না বেশ আবেগি হয়ে উঠেছে।
কিছু সময় মনে হয় ভুল করছে, এই বয়সে এসে আবেগে কাঁন্না করাটা বড্ড বেমানান লাগে। পরক্ষণে মন বলছে, “আবেগের কি কোন বয়স হয়?”
(বিঃদ্রঃ এর উত্তরটা আমিও চাই, পাঠকরা দিয়ে দিয়েন)
মুনে স্মৃতির পাতায় ডুব দিলো।
অতীত,
মেঘরাজের সাথে মেলামেশাটা বেশি হয়ে যাচ্ছে। মনে মনে মন দেওয়া নেওয়া হয়ে গেছে। শুধু দু’জনের মুখে প্রকাশ করা বাকি ছিলো।
মেঘরাজ মনের কথা জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।
*
মেঘের জীবনে তার অনাকাঙ্খিত কথাটি প্রকাশ করার সময় আসার পূর্বে একদিন মেঘের মা মুনের মাকে ফোন দিলো।
মুনের মা বললো,“হ্যাঁ ভাবী বলো?”
“আমি আজ তোমার সাথে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলতে চাই।”
“হ্যাঁ বলো।”
“তুমি আমার একমাত্র ননদ হওয়ায়, তোমার সাথে আমার সম্পর্কটা বেশ ভালোই। আমার স্বামী কথা নাহয় বাদ দিলাম। তার কাছে তুমি তার পৃথিবীর মতো, দেখো আমি সরাসরি বলছি, আমি চাই না আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হোক।”
“মানে? কেন এমন কথা বলছো ভাবী?”
“সরাসরি বলছি,এই বয়সটা আবেগের। মানে মেঘ এবং মুনের বয়সের কথা বলছি। এই বয়সে ওদের এত মেলামেশা আমার চোখে ভালো ঠেকছে না। তাছাড়া মেঘের রোজ রোজ তোমাদের বাসায় থাকাও আমার কাছে গড়মিল লাগছে।
দেখো এখন ওরা অনেক ছোট, ওরা বুঝছে না তবে আমরা বুঝছি। ওদের এখন পড়ালেখার বয়স, তাছাড়া আমার কাছে ভাই-বোন সম্পর্কের মাঝে অন্য সম্পর্কে বেশ খারাপ লাগে। আমার কাছে ভাই মানে তো ভাই, সে মামাতো হোক কিংবা নিজের। একই কথা। এই সম্পর্ক অন্যদিকে মোড় নিক তা আমার পছন্দ না।
তোমাকে আর খোলাসা করে বলতে হবে না নিশ্চয়। ওরা যে একে-অপরের ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যে নেই তা কিন্তু আমি বেশ টের পাচ্ছি।
আজ আমি পাচ্ছি, কাল প্রতিবেশি পাবে। তারপর সবাই কথা শোনাবে। আমি এসব নিতে পারবো না।
সবচেয়ে বড় কথা মেঘরাজ আমার একমাত্র সন্তান, তাকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন, আশা আছে।”
“এখন আমাকে কি করতে বলছো ভাবী?”
“মুনকে বোঝাও, মেঘের সাথে নির্দিষ্ট একটা গন্ডির মধ্যে থাকতে।”
“আচ্ছা ভাবী আমি বুঝতে পেরেছি। আমি মুনকে বোঝাবো।”
“আমি আশা রাখি তুমি পারবে। তোমাকে বললে সমাধান পাবো তাই কিন্তু তোমাকে বলা।”
“বুঝেছি ভাবী।”
*
মুনের মা মুনকে আলাদা করে ডাকে। মুন বললো,“মা ডাকছিলে কেন?”
“মেঘ তোর কি হয়?”
“মানে এটা কেমন প্রশ্ন মা?”
“আমি যা জিজ্ঞেস করেছি সেটা বল।”
“মামার ছেলে। অর্থাৎ মামাতো ভাই।”
“হ্যাঁ ভাই। সম্পর্কটা তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয় কি?”
“মানে?”
“দেখ কাজিনদের এত মেলামেশা পাড়া-প্রতিবেশী ভালো চোখে দেখে না।
তোর আর মেঘের বিষয় নিয়ে কথা হোক তা আমি চাই না।”
“মা তুমি এভাবে কেন বলছো? আমরা তো ছোট থেকেই এভাবে বড় হয়েছি।”
“ছোট থেকে বড় হয়েছিস। কিন্তু এখন তুই ছোট নেই। আর মেয়েদের ছোটবেলা আর বড়বেলা এক নয়।”
“আচ্ছা মা তুমি কি বলতে চাইছো বলো তো?”
“এটাই তুই মেঘের সাথে মেলামেশা করা বন্ধ করে দে।”
“এটা সম্ভব নয় মা।”
“কেন সম্ভব নয়? সমস্যা কোথায়?”
“তোমার থেকে কখনো কিছু লুকাইনি তাই আজ সত্যিটা বলছি। আমার মেঘ ভাইয়াকে অনেক ভালো লাগে। আমি তাকে পছন্দ করি।”
মুনের মা কিছু সময় চুপ রইলেন। তারপর বললেন,“মেঘের মা তোকে কোনদিন মেঘের পাশে মেনে নিবে না। কারণ ভাবীর কাছে ভাই-বোন মানে ভাই-বোন, এখানে কোন বৈষম্য নেই। আমি তোকে এতটুকুই বলবো, বাকিটা তোর সিদ্ধান্ত।”
মুন হতভম্ব হয়ে গেলো। তারপর বললো,“কাজিনদের মধ্যে তো হয় সম্পর্ক?”
“হুম। এটা অবৈধ নয় তবে অনেকে এসব মানে না৷ এই বয়সে এইরকম হতে পারে। তাই আমি তোকে দোষ দিবো না। তবে তুই নিশ্চয় আমার এবং ভাবীর সম্পর্ক নষ্ট হোক এটা চাবি না। সেই সাথে মেঘের সাথে তার পরিবারে কোন সমস্যা হোক। এসন না চাইলে বলবো সময় থাকতে মনকে বোঝা। এখনো সময় আছে।”
“মামী কোনভাবেই মানবে না?”
“সে আমাকে পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে।”
মুন কিছু বললো না। চুপ করে রইলো। মুনের মা তাকে জড়িয়ে ধরলো। তিনি বললেন,“আমার এই মূহুর্তে তোকে কি বলা উচিত আমি সত্যি জানি না। শুধু বলবো, আবেগের বয়সে ভুল করে ফেলেছিস, এটা ভেবে এখনই নিজেকে ওসব মোহ থেকে বের করে আন।”
মুন তখনো কিছু বললো না।
--
সেদিন রাতেও মেঘরাজ আসলো মুনকে রাতের আকাশ দেখাতে নিয়ে যেতে। তবে মুন গেলো না।
“কি হলো আজ যাবি না কেন চন্দ্র?”
“এসব ঠিক নয়। এতরাতে একজন ছেলের সাথে আমার যাওয়া ঠিক নয়।”
“মানে? এসব তুই কি বলছিস?”
“আমি একজন মেয়ে ভাইয়া। তাই আমার জন্য এটা ক্ষতিকর।”
“মানে? আমি তোর জন্য ক্ষতিকর এটাই বলতে চাইছিস তুই?”
“না। তবে কেউ দেখে নিলে আমাকে খারাপ ভাববে। তুমি তো ছেলে, তোমাকে কিছু বলবে না কিন্তু আমাকে বলবে।”
“এসব ফালতু কথা আজ তোকে কে বলেছে?”
“দেখো আমি কোন ফালতু কথা বলছি না। যা বলছি সত্যি বলছি।
দেখো সম্পর্কে আমরা ভাই-বোন ঠিক আছে। ভাই-বোন একসাথে যেতেই পারে। তবে রাতের বেলা এভাবে যাওয়াট ঠিক নয়। যতই ভাই-বোন হোক।”
“বারবার ভাই-বোন ভাই-বোন বলছিস কেন? আমরা কাজিন, একেবারে তোর মায়ের পেটের ভাই না, যে বারবার ভাই-বোন করছিস। আর ফালতু বকবক না করে চল।”
“আমি যাবো না। তুমি আমার সাথে এত মেলামেশা করবে না। এসব ঠিক নয়।”
“কি তখন থেকে এসব ঠিক না এসব ঠিক না বলে যাচ্ছিস? ঠিক নয় কেন? আমরা ছোট থেকে এভাবে বড় হয়েছি তাহলে এখন ঠিক নয় কেন?”
“তুমি বুঝবে না। কারণ তুমি মেয়ে নও। সমাজ আমাকে ভালো চোখে দেখবে না। কারণ একটা মেয়ের একটা ছেলের সাথে এভাবে মেলামেশা শোভা পায় না।”
“শোভা পায় কি পায় না সেটা তোর সমাজ ঠিক করবে? যেখানে আমাদের কোন সমস্যা নেই।”
“আমাদের নয়, বলো তোমার সমস্যা নাই। তবে আমার সমস্যা আছে।”
“কি সমস্যা? সমস্যা থাকবে কেন তোর?তুই মেয়ে আমি ছেলে বলে?
আমরা ছেলে, মেয়ে বলেই তো আমাদের মধ্যে ঐ সম্পর্কে গড়ে উঠেছে নয়তো কি উঠতো?”
“ঐ সম্পর্ক মানে?”
“মানে আর কি ভালোবাসা।”
“কি?”
“হ্যাঁ আমি তোকে ভালোবাসি, তুই আমাকে ভালোবাসিস।”
“মানে আমি তোমাকে ভালোবাসি এটা তোমাকে কে বলেছে?”
“সব যদি বলেই দিতে হয় তবে চোখ আছে কেন? চোখ আছেই তো দেখার জন্য, আর মস্তিষ্ক বোঝার জন্য।”
“এসব কি আজগুবি কথা বলছো তুমি? আমরা ভাই-বোন সেখানে তুমি কিসব উল্টাপাল্টা কথা ভাবছো? ভাই-বোন হিসাবে ভালোবাসা যায়, তবে তুমি যেভাবে বললে তাতে মনে হলো প্রেমিক হিসাবে তোমাকে ভালোবাসি।”
মেঘ চমকালো।
“মানে? তুই প্রেমিক হিসাবে আমাকে ভালোবাসিস না? ভুল কথা আমি না, তুই বলছিস। দেখ অনুভূতি সবসময় মুখে বলতে হয় না, বুঝে নেওয়া যায়। তোর আমার প্রতি অনুভূতি আছে,এটা আমি বুঝতে পারি। আর আমারও আছে। এটা তুইও বুঝতে পারিস। আর বুঝতে না পারলে জেনে নে, আমি তোকে ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি। আমার তোর প্রতি অনেক গভীর অনুভূতি আছে।”
“ঠিক এই কারণেই আমি যেতে চাইছি না। তুমি ভাই-বোনের সম্পর্কটাকে নষ্ট করতে চাইছো। অন্যভাবে কল্পনা করে তুমি আমাদের কাজিন সম্পর্কের অপমান করছো।”
“এই চন্দ্র পাগলের মতো কি বলছিস? আমি তোকে ভালোবাসি, এটা আমাদের কাজিন সম্পর্কের অপমান? কিভাবে বলতে পারলি তুই, তুই কখনো শুনিস নি কাজিনদের বিয়ে হয়।”
মেঘ মুনকে জড়িয়ে ধরে।
“পাগলের মতো কি সব বলছিস? আমাদের মধ্যে কোন খারাপ সম্পর্ক নেই, যে অপমান বা অসম্মান হবে সম্পর্কের। ভালোবাসা খারাপ নয়, খুব সুন্দর।”
মুন মেঘকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে ছাড়ায়, তারপর স’জোরে একটা থাপ্পড় মারে।
“তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরার সাহস কোথায় পাও? এই মাঝরাতে আমার ঘরে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমাকে কলঙ্কিত করতে চাও? আমার প্রেমিকের কাছে আমাকে ছোট করতে চাও?”
মেঘের মাথা ঘুরতে শুরু করে। মেঘ আমতা আমতা করে বলে,“প্রেমিক? তোর প্রেমিক?”
“হ্যাঁ আমি একজনকে ভালোবাসি। সেই আমাকে তোমার সাথে মেলামেশা করতে বারণ করেছে। আমাদের মেলামেশা তার পছন্দ না।সে যদি জানে, আমি তোমার সাথে রাতে ঘুরতে বের হই তাহলে তো সে আমাকে ছেড়ে দিবে।”
মেঘ হতভম্ব হয়ে গেলো। তার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হয় না। তাও বললো,“কোথায় তোকে তো কখনো কোন ছেলের সাথে মেলামেশা করতে দেখিনি তবে তোর প্রেমিক আসলো কোথা থেকে?”
“এখন এসবের কৈফিয়ত দিতে হবে তোমাকে? দেখো আমি তোমাকে আমার ভাই ছাড়া কিছুই মনে করিনি। আর করবোও না। দেখো তুমি দয়া করে আমাকে আর বিরক্ত করো না। তোমার জন্য আমি ওর সাথে আমার সম্পর্ক নষ্ট করতে পারবো না।”
মেঘ চলে যাওয়ার জন্য পিছু ঘুরে। দরজার কাছে গিয়ে মুনের দিকে পুনরায় ফিরে। তারপর বলে,“ভালো থাকিস তোর ভালোবাসার সাথে, হয়তো তার প্রতি তোর প্রেমকে আমি আমার জন্য ভেবেছিলাম। তার কথা মনে করে, তোর মুখশ্রী জুড়ে ফুঁটে ওঠা লজ্জাকে আমি আমার জন্য ভেবেছিলাম। আপনমনে তার কথা ভেবে হেসে ওঠাকে আমি আমার জন্য ভেবেছিলাম। আমি ভুল করেছিলাম,তার মাসূল আমিই দিবো।”
মেঘ চলে যাওয়ার পূর্বে বলে যায়,“তোর এই থা/প্প/ড়ের কথা আমার সবসময় মনে থাকবে।”
মেঘ চলে যায়। মুন সেখানেই বসে পড়ে।
আবেগকে জাগিয়ে দেওয়া মানুষটার আবেগকে কষ্ট দিয়েছে আজ সে। তারও যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তার তো করার কিছু নেই।
মুন কেঁদে দেয়।
সেই যাওয়ার পর মেঘ বেশ কিছুদিন মুনদের বাসায় আসেনি। পরে একদিন খবর পায়, মেঘ বিদেশ চলে যাচ্ছে। যাওয়ার আগের দিন ফুপুর সাথে দেখা করতে আসে। সেদিন মুন দরজার আড়ালে লুকিয়ে ছিলো। তবে মেঘ একবারের জন্যও ঘরের ভিতরে তাকায়নি।
বর্তমান,
মুন পুরনো কথা ভেবে কান্না করে দিলো।
অন্যদিকে মেঘও পুরনো কথা ভাবছিলো।
মুনের সাথে স্কুলের মাঠে আড্ডা দেওয়া, মেলায় ঘুরতে যাওয়া সবকিছু খুব মিস করে সে।
*
মুন বিছানা থেকে উঠে বসলো। আলমারি থেকে এক মুঠ চুরি বের করে দেখতে লাগলো। সবুজ রেশম চুরি। মেঘের দেওয়া।
অতীত,
মেঘ এবং মুন মেলা গেলো। বাসায় না জানিয়ে, স্কুল ফাঁকি দিয়ে।
মুনের অবশ্য ভয় করছিলো। তবে মেঘ থাকায় সে ভয়কে পাত্তা দিলো না। মেলায় দু’জন ঘুরছিলো।
হঠাৎ চুরির দোকান দেখে মেঘ দাঁড়িয়ে গেলো।
এক মুঠ সবুজ রেশম চুরি হাতে তুলে নিলো। তারপর মুনের বাম হাতটা ধরলো। নিজ হাতে পড়িয়ে দিলো। আপনমনে বললো,“বাহ বেশ লাগছে তো?”
মুন নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বললো,“হ্যাঁ সুন্দর।”
“নিয়ে নে। এটা মেলায় তোকে দেওয়া আমার প্রথম উপহার হিসাবে সবসময় যত্ন করে রেখে দিস চন্দ্র।”
মুন মুচকি হাসলো। মেঘ বেশ খুঁটিয়ে মুনের হাতে চুরিগুলো লক্ষ্য করছিলো।
বর্তমান,
মুন চুরিগুলোর দিকে তাকিয়ে বললো,“চুরিগুলো বেশ যত্নেই আছে।”
'
'
চলবে,
(ভালো হইছে মনুরা? কমেন্ট না কইরা যাইয়ো না।)
