#বৃদ্ধাশ্রম____(পর্ব:২)


মায়ের সাথে কথা বলে ঘরে আসতেই দেখি , আমার স্ত্রী মাধবী বিছানায় গাল ফুলিয়ে বসে আছে । গায়ের শার্ট খুলে আলনায় রাখতে রাখতে বললাম , 


' কি হয়েছে ? '


মাধবী আমার কথার জবাব না দিয়ে আগের মতোই চুপ চাপ বসে রইলো। লামিয়াকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম , 


' আমি যাওয়ার পরে আবার ও তোর ভাবির সাথে মা ঝগড়াঝাটি করেছে ? '


লামিয়া বললো,


' আমি স্কুল থেকে ফিরেছিই বিকাল পাঁচটার পর । আমি বাসায় আসার আগে মনে হয় দুজনের লেগেছিলো। মাকে দেখলাম বিছানায় বসে আহাজারি করতে। এখনো করছে। আর এদিকে ভাবি নিজের রুমে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। রান্নাটাও করতে যায়নি কেউ।'


লামিয়াকে বললাম , 


' আচ্ছা , তুই যা । '


লামিয়া যেতেই মাধবীর পাশে গিয়ে বসলাম । ওর দিকে চেয়ে বললাম , 


' এভাবে মায়ের সাথে ঝ'গড়া করেছো কেনো? ওনার বয়স বেড়েছে , মাথা ঠিক নেই , আজ - কাল কখন কি বলে ফেলে নিজেও বুঝতে পারেনা। ওনার কথা ধরে তুমি অভিমান করে বসে রইবে !! '


মাধবী আমার কথা গুলো চুপচাপ শুনলো শুধু । বিপরীতে কিছুই বললোনা । আমি জানি মাধবী খুবই বুঝদার, লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে। মাধবী নরম মনের মেয়ে ওকে একটু বুঝিয়ে বললেই ও সব মানিয়ে নেবে । মাধবীকে আমার মা-ই প্রথম দেখায় পছন্দ করেছিলো বিয়ের সময়। মায়ের পছন্দের মেয়েকেই আমিও বিয়ে করে নিয়েছিলাম। অথচ বছর তিনেক যেতে না যেতেই বউ - শাশুড়ীর সম্পর্ক কেমন তিঁতকুটে হয়েগেছে । যেনো একজন আরেকজনকে সহ্য করতেই চায় না । মাধবী যদিও মায়ের সব কথা ধরে ধরে জবাব দেয় না তবুও মাঝে - মাঝেই জবাব দিয়ে ফেলে সহ্য করতে না পেরে। ওর তো খারাপ লাগে মাঝে , মাঝে। অথচ মাকেও কিছুই বলতে পারিনা কঠিন ভাবে। মায়ের যে বয়স হয়েছে দিন , দিন।কেমন বাচ্চাদের ন্যায় অল্পতেই রে'গে যান , অল্পতেই মেজাজ হারিয়ে ফেলেন , মাঝে মাঝে অবুঝের ন্যায় সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হবে এরকম কথা বেফাঁস বলে বসেন । 


' তোমার মা বলেছে , আমি নাকি বাচ্চা জন্ম দিতে অক্ষম মহিলা। তুমি ..... তুমি আমাকে বিয়ে করে সবচেয়ে বড় ভুল করেছো , আর তোমার মা নিজে সেই ভুলটা পছন্দ করে তোমার সাথে জুড়ে দিয়েছেন তাই উনি আমাকে এবার উপড়ে ফেলবে এ সংসার থেকে। তোমাকে বলে , বুঝিয়ে আমাকে ডিভোর্স করিয়ে দেবে আর তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করে আনবে আমার জায়গায় । '


বলতে , বলতেই মাধবী কেঁদে ফেললো হাউমাউ করে। আমি বিমুঢ় হয়ে চেয়ে রইলাম কেবল। মা এসব কি অবুঝের ন্যায় কথা বার্তা বলে । এসব কথার মানে হয়? আমাদের দুজনের মাঝে কারোরই বাচ্চা জন্ম দেয়া নিয়ে সমস্যা নেই। রিপোর্ট সব ঠিক এসেছে শুধু আল্লাহ চাইছেনা বলেই বাচ্চাটা এখন হচ্ছেনা । আল্লাহ তায়ালা যখন চাইবে তখন নিশ্চয়ই বাচ্চা হবে । এসব নিয়েও ছেলের বউয়ের সাথে তর্ক করতে হবে? 


'আহা , মাধবী মায়ের কথা ধরবেনা , বলেছিনা ! মা যা তা বলবে বলেই আমি সব শুনে নেব? পাগল তুমি? '


' নয়তো কি! তুমি তো মায়ের কথাতেই আমাকে বিয়ে করেছিলে তাহলে মায়ের কথায় ছাড়বে না এ বিশ্বাস করব কি ভাবে ? '


মাধবীর পাশে বসে ওর এক হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে ঠোঁটের স্পর্শ দিয়ে বললাম , 


' তোমাকে মায়ের পছন্দে বিয়ে করেছি কে বলেছে? বিয়ের আগে আমিও তো দেখতে গেছিলাম। আমার যদি পছন্দ না হতে তাহলে কি মায়ের দেখাতেই শুধু বিয়ে করে নিতাম ওমন মেয়ে তো উনি আর ও অনেক দেখেছিলেন আমার জন্য আমি কি সবাইকে বিয়ে করেছি? 

বিয়ের পর আমার মনে অজানা এক ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে মাধবী । আর সেই ভালোবাসা শুধু তোমাকেই পেতে চায় । আর কাউকে না। আমি তোমাকে খুব , খুব ভালোবাসি বউ। আর এসব নিয়ে মন খারাপ করবেনা । বাচ্চা আল্লাহ দিলে হবে না দিলে না হবে। আমরা নি:সন্তান দম্পতি হয়ে থাকব চিরকাল। আমার কোনো অভিযোগ থাকবেনা তোমাকে নিয়ে । তমার যদি থাকে তবে তুমি চাইলে আমাকে ছেড়ে যেতে পারো। আমি তোমাকে বাঁধা দেব না। '


মাধবী আর কিছু বললোনা। আমার কথা শুনে কিছু সময় বসে থাকার পর উঠে রান্নাঘরে চলে গেলো। 

লিমনের বউটা প্রেগন্যান্ট ছিলো তাই গত মাসে মায়ের বাসায় চলে গেছে । দুর্ভাগ্যবশত লিমনের সন্তানটা জন্মের সময়ই মা'রা যায়। এ নিয়ে ওর ছোটো বউটা খুবই ডিপ্রেশনে আছে। তাই লিমন ওকে শ্বশুর বাড়িতেই থাকার অনুমতি দিয়েছে কিছুদিন । ওখানে নিজের বাবা - মা , ভাই-ভাবিদের সাথে থেকে নিজ মনকে একটু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারবে দ্রুত। যা এখানে এলে হবেনা । তবে লিমনকে নাকি বলেছে তার আর বাবার বাড়িতে ভালো লাগছেনা সে দ্রুত এখানে আসতে চায়। মাধবীর সাথে আবার তার বোনের মতো সম্পর্ক কিনা ! মাধবীর ও নিজের বোন নেই আবার রিতারও নিজের বোন নেই যার ফলে দুইজা সব সময় বোনের মতো মিলেমিশে থাকে । 


রাতের খাবার মাধবী একা হাতেই রান্না করলো। লামিয়া যদিও সাহায্য করতে গিয়েছিলো তবে মাধবী ওকে বলেছে ও একাই সব সামলে নিতে পারবে । লামিয়া গিয়ে পড়তে বসুক । 


রান্না শেষ হলো রাত এগারোটার দিকে। লিমন আর লামিয়া আগে বসে খেয়ে উঠেছে। মাকে খেতে আসার জন্য লামিয়াকে দিয়ে দুবার ডাকতে পাঠিয়েছিলো মাধবী। তবে লামিয়ার কথায় সে মহিলা খেতে আসেনি। মাধবীও আর নিজে খেতে আসতে বলতে যায়নি। কেন যাবে সে? তাকে বিকেলে কত কথা বলেই না মনে আঘা'ত করেছে। সব কি এতো দ্রুত ভুলে যাওয়া যায়?  


আমি মাধবীকে খেতে বসতে বললাম। ও আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো। রাতের খাবারটা আমি আর মাধবী এক সাথে বসে খাওয়ার চেষ্টা করি। তবে কাজের চাপে মাঝে মাঝে আলাদা বসে খেতে হয়। মাধবী তবুও খেতে না বসে আমার আসার অপেক্ষা করে রইলো। আমি গিয়ে মাকে বলে -কয়ে খেতে আসার জন্য রাজি করালাম। মা আমাকে আর ফেরাতে পারলেন না। বড় ছেলে কি না ! তাই আমার সাথে এসে আমার পাশের চেয়ারে বসলো। মাধবী মাকে আমার পাশে আসতে দেখে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখালোনা। প্রতিদিনের ন্যায় স্বাভাবিক ভাবে মায়ের সামনে প্লেট, পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো। আমার প্লেটে খাবার তুলে দিয়ে মায়ের প্লেটেও খাবার তুলে দিতে চাইলো । চামচে ভাত উঠাতেই মা ওকে থামতে বললো। মাধবীর হাত থেকে ভাতের চামচ নিনের হাতে নিয়ে নিজের খাবার নিজেই নিজের প্লেটে তুলে নিয়ে চুপচাপ খেতে শুরু করলো। মাধবী আমার দিকে কেমন চোখে যেনো চাইলো হয়তো ওর মনের হতাশা বোঝাতে চাইলো। আমি বললাম , 

' খেয়ে নাও তুমি নিজের মতো । মা নিজের খাবার নিজেই নিয়ে খেয়ে নেবে । '


মাধবী চট করে বললো , 


' আমার হাতের বেড়ে দেওয়া খাবার খেতে আপত্তি অথচ রান্নাটা আমিই করেছি। '


মা ওই কথা শোনার সাথে সাথে রাগান্বিত দৃষ্টিতে মাধবীকে দেখে নিয়ে চুপচাপ থেকেই দ্রুত হাতে খাবার খেয়ে হাত ধুয়ে উঠে যেতে যেতে বললো,


' তুই পরের মেয়ে রেঁধেছিস তো কি হয়েছে? বাজার তো আমার ছেলেরাই করে । কাজের মেয়ে রেঁধে দেবে না তো কে দেবে ! '


উনি বলেই চলে গেলেন নিজের রুমে। মাধবী ছলছল নেত্রে আমার দিকে চেয়ে অভিযোগ করলো,


' শুনলে? শুনলে তোমার মা কি বললো আমাকে? 

আমি কাজের মেয়ে ? আমাকে তুমি কাজের মেয়ে করে নিয়ে এসেছো!এই সংসার তবে আমার নয়? আমি শ্রেফ এ সংসারের কাজের মেয়ে !!'


আমি ওকে থামাতে চেষ্টা করে বললাম,


' মায়ের মাথাটা ঠিক নেই মাধবী । উনি কিসব বলেন.....'


' তুমি চুপ করো, লিপন.... তুমি এখানেই বসে ছিলেনা? সব নিজের কানে শুনলেনা 

তোমার মা তো অসুস্থ নয় লিপন ..... উনি যথেষ্ট সুস্থ একজন মহিলা .... উনি জেনে , বুঝে আমাকে যা নয় তা বলে অপমান করছে ............... সব দেখে - শুনেও তুমি আমাকে চুপ থাকতে বলবে ? '


মাধবীর অভিযোগ শুনলাম বসে বসে। বুঝতে পারছিনা , কাকে কি বলবো এই পরিস্থিতিতে ? 


চলবে

#মিশকাতুল_জান্নাত


বাকি পর্ব গুলা এখানেই পাবেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url