#লাল_শাড়ী (৩)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
রবি সারাদিন বেশ মজা নিয়ে কাজ করে। শিউলি বেশ কিছুক্ষণ পরপর তার কাছে এসে আবার চলে যায়। সে যে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে সেটা রবি বুঝতে পারছে। তাছাড়া শিউলি তাকে কি বলার চেষ্টা করছে তাও জানে। শিউলির ভয়টা বেশ মজা নিয়ে উপভোগ করছে। অতঃপর শিউলি কিছুটা সময় নিচতলায় থেকে আবার দোতলায় আসে। রবি এবার আড়চোখে তাকে দেখে বলে,“এই নিয়ে পনেরোবার।”
“হ্যাঁ?”
শিউলি বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে। রবি মুচকি হাসি দিয়ে বলে,“আপনি এই নিয়ে পনেরোবার দোতলা নিচতলা করলেন। আপনাকে দেখে তো এত মোটা মনে হয় না, তাহলে অকারণে এত হাটাহাটি করছেন কেন? পেটের মধ্যে কিরমি নাচানাচি করছে নাকি? এটা নাহলে তো এত উপর নিচ করার কথা নয়।”
“আপনি আমার সঙ্গে মজা করছেন?”
শিউলি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করে। রবি তার কাজে মনোযোগী হয়। শিউলির কথা শুনছে না এমন একটা ভাব ধরে কাজ করছে। শিউলি বেশ বিরক্ত হয়। পরক্ষণে নিজেকে সামলে শিউলি বলে,“একটা কথা বলবো?”
“আমাকে বলছেন?”
রবি কিছুটা ভাব নিয়ে। শিউলি এবার কিছুটা রেগেই বলে,“এখানে যেহেতু আপনি আছেন সেহেতু আমি আপনাকেই বলছি।”
“আচ্ছা বলেন? তবে হ্যাঁ একটা কথার বেশি বলা যাবে না।”
রবি শিউলির সঙ্গে মজা নিচ্ছে। বোকা শিউলি বুঝতে পারে না। তাই বলে,“একটা কথা বলার কথা বলেছি বলে একটাই বলবো? আর বলা যাবে না, এটা কেমন কথা?”
রবি জবাব দেয় না। সে চিন্তিত শিউলিকে আড়চোখে দেখে। এই জবাব না দেওয়াটাও এক প্রকার মজা তার জন্য। সে কাজটি করে বেশ ভালো বোধ করছে। রবির জবাব না পেয়ে শিউলি হতাশ হয়। হতাশ গলায় বলে,“আপনি সত্যি ভাইয়ার কাছে বিচার দিবেন?”
“হ্যাঁ। আপনি আমাদের সঙ্গে বেয়াদবি করেছেন। তাই বিচার তো দিতেই হবে।”
রবি কাজের ফাঁকে কথাটা বলে আবার কাজে মন দেয়। শিউলি ভীষণ ভয় পায়। তার নামে বিচার গেলে বিষয়টা ভালো দেখাবে না। তাই কিছুটা নরম গলায় বলে,“ক্ষ*মা করা যায় না?”
“না। আজ ক্ষমা করলে পেয়ে বসবেন। কাল আবার একই ঘটনা ঘটাবেন। সেজন্য মাফ করা যাবে না।”
কথাটি বলে রবি এক পলক সরাসরি শিউলির দিকে তাকায়। পরক্ষণে চোখ সরিয়ে বলে,“কাজের মাঝে বিরক্ত করা পছন্দ নয়৷ তাই কেউ বিরক্ত না করলে খুশি হবো।”
এটা বলে রবি আবার মন দিয়ে কাজ করছে। শিউলি আরও কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। অনেক সাহস করে আস্তে করে বলে,“এবার মাফ করে দেন। ভাইয়া জানতে পারলে সমস্যা হয়ে যাবে।”
রবি কথাটা না শোনার ভান ধরে কাজ করে। সে কাজের ফাঁকে গলা ছেড়ে গান ধরে,“ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে…।
ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে…।
ফান্দ বসাইছে ফান্দি রে ভাই
পুঁটি মাছো দিয়া
ওরে মাছের লোভে বোকা বগা
পড়ে উড়াল দিয়া রে….
ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে….।”
গানটি যে শিউলিকে উদ্দেশ্য করে গাওয়া হচ্ছে সেটা বুঝতে বাকি নেই শিউলির। সেজন্য কিছুটা রাগ নিয়েই চলে যায়। রবি তার যাবার পানে তাকিয়ে কিছুটা উচ্চশব্দে বলে,“ফা*ন্দে পড়িয়া বোকা বগা কান্দে রে….।”
_____
রবিদের কাজ শেষ হবার আগে ইমাদরা চলে আসে। রবি বাড়ি যাবার আগে ইমাদের সঙ্গে কাজ বিষয়ে কিছু কথা বলে। শিউলি ঘরের দরজায় কান পেতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার মনে হচ্ছে রবি তার ব্যাপারে বিচার দিচ্ছে। রবি কথা বলার ফাঁকে দরজার বাহিরে শিউলিকে দেখতে পায়। অতঃপর দু'জনার চোখাচোখি হয়। রবি শিউলিকে দেখে মুচকি হাসি দিয়ে বলে,“ভাইয়া আজ সকালের মতো ঘটনা না ঘটলে খুশি হবো।”
“মানে? সকালে কি ঘটেছে?”
ইমাদ বুঝতে না পেরে জানতে চায়।শিউলির আত্মা শুকিয়ে যাচ্ছে। রবি এখন তার কথা বলতে যাচ্ছে বুঝতে পেরে সে কান ধরে ইশারায় বলে,“না।একটু দয়া করুন।”
রবি শিউলির কান্ড দেখে মনেমনে বেশ মজা পাচ্ছে। এদিকে ইমাদ রবির জবাবের আসায় বসে রয়েছে। রবি প্রসঙ্গ বদলাতে শিউলিকে বলে,“আপনি কিছু বলবেন?”
রবির কথা শুনে ইমাদ দরজার দিকে তাকায়। শিউলি হকচকিয়ে যায়। দ্রুত কান থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ইমাদ শিউলিকে দেখে অবাক হয়। বিষ্ময় নিয়ে জানতে চায়,“তুই দরজার কাছে কি করছিস শিউলি?”
“না মানে ভাইয়া। আমি আসলে….।”
শিউলির আমতা আমতা করা দেখে ইমাদ কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে,“কি?”
“আপনি তো এই সময়ে চা খান। তো চা বানিয়ে নিয়ে আসবো, সেটা জানার জন্য এসেছি।”
“আচ্ছা। হ্যাঁ নিয়ে আয়।”
ইমাদ স্বাভাবিকভাবে কথাটি বলে। শিউলি চলে যায়। যদিও সে যেতে চায়নি। তাকে না চাইতেও চলে যেতে হয়। শিউলি রান্নাঘরে এসে মনেমনে রবিকে বকছিলো। সে মনেমনে বলে,“লোকটার একটু বেশিই ভাব। এই সামান্য বিষয়ে বিচার দেওয়া লাগে। এত করে বললাম তাও শুনলো। যা হওয়ার হোক, আর ঐ লোকটাকে কিছু বলবো না। ভাইয়া জানতে চাইলে অপরাধ স্বীকার করে মাফ চেয়ে নিবো। ঐ লোককে এত তেল দেওয়ার দরকার নাই। একটু ভয় পেয়েছি বলে, শালায় ভাব ধরলো। তোর ভাব নিয়া তুই থাক। তুই বিচার দিলে আমার কচু হবে।”
এভাবে একা একা কথা বলে যাচ্ছিলো। সেই সময়ে মহুয়া রান্নাঘরে আসে। শিউলির হাতে লবনের বৈয়ম দেখে কিছুটা অবাক হয়ে বলে,“কি করছো মহুয়া?”
“এই তো চা বানাচ্ছি।”
মহুয়ার কথায় ভাবনা থেকে বের হয়ে শিউলি জবাব দেয়। মহুয়া অবাক গলায় বলে,“লবন দিয়ে?”
“হ্যাঁ?”
শিউলি মূহুর্তে হকচকিয়ে যায়। তার হাতে লবনের বৈয়ম দেখে সেটা দ্রুত হাত থেকে সরাতে গিয়ে ফেলেই দেয়। মহুয়া এসব দেখে বলে,“কোন সমস্যা? শরীর খারাপ?”
শিউলি কোনভাবে বিষয়টি সামলে নেয়। মহুয়া কিছুটা বিরক্ত হয়েই চলে যায়। শিউলি দ্রুত নিজেকে সামলে চা বানিয়ে ফেলে।
শিউলি ইমাদের জন্য চা নিয়ে আসে। ইতিমধ্যে রবিরা চলে গিয়েছে। শিউলি চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে মাফ চাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু তার প্রয়োজন পড়ে না। ইমাদ চায়ে চুমুক দিয়ে বলে,“ভালো হয়েছে।”
ইমাদ বেশ স্বাভাবিক। অন্য দিনের মতোই কথা বলছে। যার মাধ্যমে শিউলি বুঝতে পারে রবি কিছু বলেনি। অথচ এতক্ষণ অবধি শিউলি এটা নিয়ে কতই না ভয়ে ছিলো? লোকটা তার ভয় নিয়ে মজা নিলো? এমনটাই তো মনে হয়। শিউলির এবার রবির উপর মারাত্নক রাগ হয়। পরক্ষণে রাগটা পড়ে যায়। সে তার নামে বিচার দেয়নি, এটা তো ভালো। শিউলির জন্য ভালো হলো, খুব ভালো। তাই রাগটা ঝেরে ফেলে শিউলি। শিউলিকে ভাবনায় মগ্ন দেখে ইমাদ বলে,“কি ভাবছিস?”
“কিছু না।”
শিউলি ভাবনা থেকে বের হয়ে ম্লান হেসে জবাব দেয়। ইমাদ কিছু মনে না নিয়ে বলে,“আমাদের বাড়িতে তোর কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো শিউলি?”
“না তো। হঠাৎ এই প্রশ্ন?”
শিউলির কথা জবাবে ইমাদ বেশ স্বাভাবিক গলায় বলে,“বাবা জানতে চায়। বাবা তোর দায়িত্ব নিয়েছে, এখন তোর ভালো থাকাটা দেখা তার দায়িত্ব। সেজন্য তোর কথা জানতে চায়। তোর সুবিধা অসুবিধা দেখতে বলে।”
“আচ্ছা।”
শিউলি ম্লান হেসে জবাব দেয়। এতটা সত্যি তাকে নিয়ে ভাবা হয়। জানা নেই শিউলির। ইমাদ চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বলে,“তোর কোন অসুবিধা হলে জানাইস। আর কোনকিছুর প্রয়োজন হলে মহুয়াকে বলিস।”
শিউলি মাথা নাড়িয়ে চায়ের কাপ নিয়ে চলে যায়। ইমাদ তার যাবার পানে কয়েক পলক তাকিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। বসার ঘর থেকে উঠে এবার শোবার ঘরে যায়। মহুয়া ঘরের মধ্যেই ছিলো। বিছানায় বসে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলছে। ইমাদ এসে তার পাশে বসে তাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। মহুয়া মুচকি হাসি দেয়। ইমাদ তার কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে করে বলে,“দ্রুত কথা শেষ করো?”
“কেন?”
মহুয়া ফোনটা দূরে সরিয়ে জানতে চায়। ইমাদ খুব ঘোর লাগা কন্ঠে বলে,“খুব প্রেম পাচ্ছে।”
“বিয়ের তিন বছরেও এত প্রেম?”
মহুয়া মজা করে বলে। ইমাদ জবাবে হাসি দিয়ে বলে,“তুমি পুরোটাই একটা প্রেম। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও, এই প্রেম শেষ হবার নয়।”
“তাই?”
মহুয়া ফোনটা কেটে দেয়। সে ইমাদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,“তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো ইমাদ?”
“তুমি যতটা বাসো।”
ইমাদ খুশিমনে জবাব দেয়। মহুয়া কপট রাগ দেখিয়ে বলে,“এটা ঠিক নয়। সবসময় তুমি এমন কথা বলো। মুখে ভালোবাসি বলতে তোমার বড্ড কৃপণতা। এটা কমাও। নয়তো কোন একদিন এটাই তোমায় বিপদে ফেলে দিবে।”
“তাই?”
ইমাদ হাসি হাসি মুখে বলে। মহুয়া মাথা নাড়ায়। ইমাদ তৎক্ষনাৎ মহুয়ার কপালে চুমু দেয়। অতঃপর বলে,“চলো কৃপণতা কমাই।”
এটা বলে ইমাদ ধীরে মহুয়ার খুব কাছে চলে যায়। দুজনে দুজনার গভীরতায় হারিয়ে যায়। ইমাদ তার এই স্পর্শ, এই অনুভূতি দিয়ে তার কৃপণতা দূর করছে।
’
’
চলবে,
(লেখা কেমন হচ্ছে? জানাবেন প্লিজ) পরের পর্ব মিছ না করতে চাইলে ফলো করে রাখুন ধন্যবাদ।
