#ফেলে_আসা_দিন_
#পর্ব_২
#লেখিকা_Sathi
__আবির, তোমার আসল মাকে তুমি জানো?
" আবির মাত্র ভাত মুখে তুলছিল। হঠাৎ এমন প্রশ্নে ভাত ফেলেই অবাক চোখে আমার দিকে তাকায়। চোখে মুখে অস্বস্তি নিয়ে বলে উঠে।
__তুমি কী বলছো? মাথা ঠিক আছে তোমার?
" কথাটা প্রায় ধমকের সুরে বলে আবার ভাত খেতে নিতেই আমি গলা শক্ত করে বলি।
__প্লিজ, আবির, মিথ্যে বলবে না। আমি জানি তুমি আমার বর্তমান শাশুড়ির ছেলে নও। তুমি সত্যিই জানো, তোমার মা অন্য কেউ।
" আমার কথা শেষ হতেই বিকট শব্দ হয়। প্লেট থেকে ভাত-মাংস ফ্লোরে গড়িয়ে পড়ে। আমি কিছু বোঝার আগেই আবির উঠে এসে আমার মুখ চেপে ধরে। চোখ দুটো আ*গুনের মতো জ্ব*লছে।
__আর কোনোদিন আমাকে এই প্রশ্ন করবে না। ওই মহিলাকে নিয়ে কিছু বলবে না।
" কথাটা ছুঁ*ড়ে দিয়ে আবির গটগট পায়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আমি পিছন থেকে তাকিয়ে রইলাম টলমল চোখে। বিয়ের পর আজ প্রথম ও আমার গা*য়ে হা*ত তুলল। ওর কথায় স্পষ্ট, ও সব জানে।তাহলে আমাকে কেন বিয়ে করল?আমাদের সম্পর্কটা কী?স্টে*প সিস্টার…?
"এই প্রশ্নটা মাথায় আসতেই গা গোলাতে থাকে।
আর কেন আবির তার মাকে এতটা ঘৃ*ণা করে?
সে কি জানে, আমার মা-ই তার মা?প্রশ্ন অনেক, উত্তর নেই।
" টেনশনে মাথাটা ভার হয়ে আসে। ধীরে ধীরে বসে ফ্লোর থেকে সব পরিষ্কার করি। হাত কাঁপছে, বুকের ভেতর অজানা ভয়। কিচেনে যেতেই চোখ পড়ে আবির ওর মায়ের রুমে যাচ্ছে। আমি আর কিছু না ভেবে সব রেখে নিজের রুমে এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
" বেশ অনেকক্ষণ হয়ে গেল, ও আসছে না। ডাকতে যাবো ভাবতেই দেখি, আবির আসছে। চোখে-মুখে অনুতাপ, হাঁটার ভঙ্গিতেই বোঝা যায় রাগটা আর নেই।
__মেহের, সরি।
__কিসের জন্য?
" আবির আর আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে হাত ধরে রুমে নিয়ে আসে। ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে আমার পাশে বসে। গলার স্বরটা নরম করে বলে।
__আমি সত্যিই সরি। কী করবো বলো,যাকে আমি জীবনে সব থেকে বেশি ঘৃ*ণা করি, তুমি তাকে নিয়েই আমাকে প্রশ্ন করেছো। নিজেকে ক*ন্ট্রোল করতে পারিনি। তাই এমন করে ফেলেছি। ক্ষমা করো।
" বলেই আবির আমার হাত দুটো শক্ত করে ধরে।
আমি বুঝতে পারছি না ও কেন মাকে এতটা ঘৃ*ণা করে। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু ভয় লাগছে। তবুও ভয়ে ভয়ে বললাম।
__ঠিক আছে, ক্ষমা করলাম। কিন্তু আমার কি জানার অধিকার নেই তোমার অতীত সম্পর্কে?
" প্রশ্নটা করেই শঙ্কিত চোখে তাকালাম। আবির ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হাত ধরে আমাকে উঠিয়ে বারান্দায় নিয়ে যায়। বারান্দায় ছোট একটা দোলনা। নিঃশব্দ পরিবেশ, রাতের হালকা বাতাস। আবির চুপচাপ আমাকে দোলনায় বসায়। নিজেও পাশে এসে বসে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিজ থেকেই বলে...
__জানতে চাও আমি কেন তাকে এতো ঘৃণা করি?
__হুম… প্লিজ বলো না।
" আবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করে নিজের ভালো খারাপ অতীত।
__আমার বাবা আর মায়ের খুব সুন্দর একটা সংসার ছিল, যা তিনি নিজে শেষ করে দেন। এখন যিনি আছেন, তিনি আমার সৎ মা। কিন্তু আমার নিজের মা আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল অনেক বছর আগে। তখন আমার বয়স মাত্র চার বছর। কিছুটা মনে আছে, কিছুটা নেই। তার মুখটাও প্রায় ভুলে গেছি। আমার মায়ের ভীষণ লোভ ছিল, টাকার লোভ। তার কাছে সংসার মানে ছিল বস্তায় বস্তায় টাকা আর পার্টি। বড়লোকের ছেলে মেয়েদের সাথে মিশতে মিশতে সে আব্বুকে ভুলে গিয়েছিল। ভুলে গিয়েছিল, তার একটা সংসার আছে, একটা ছেলে আছে। এক সময় খুব বড়লোক একজনের সাথে। প*রকী*য়ায় জড়িয়ে পড়ে। আমাকে আর আব্বুকে ফেলে সে চলে যায়। একবারও ভাবেনি, তাকে ছাড়া আমরা কীভাবে বাঁচবো।আব্বু ভীষণ ভালোবাসত তাকে। পাঁচ বছরের সংসার ভেঙে যখন সে চলে গেল, আব্বু পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। কিন্তু আমার কথা ভেবে আবার নতুন করে শুরু করে। আমাকে মানুষ করতে আবার বিয়ে করে। তুমি বলে এমন স্বা*র্থপর লো*ভী মহিলাকে কে ঘৃ*ণা করবেনা। আমার শৈশব ন*ষ্ট করে দিছে। বাহিরে বের হলে নানা লোকের নানা কথা। ভীষণ রকম ঘৃ*ণা করি এই মহিলাকে আমি।
" এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলে থামে আবির। শেষ কথাগুলো জড়িয়ে জড়িয়ে আসছিল। বোঝা যায়,আবির কাঁদছে।আমি হাত বাড়াতে চাই, কিন্তু ও নিজেই নিজেকে সামলে নেয়। ও বোধয় দুর্বলতা দেখাতে চায় না। আমি আর জোর করি না। বরং বুকের ভেতরে থাকা প্রশ্নটা বেরিয়ে আসে, যা নিজে অনেক ভয়ে আছি।
__তুমি কি এখন উনাকে দেখলে চিনতে পারবে?
__মুখটা ভুলে গেছি। স্পষ্ট মনে নেই। ছোট ছিলাম তো। তবে আব্বু দেখলে অবশ্যই চিনবে। কিন্তু তুমি হঠাৎ এসব জিজ্ঞেস করছো কেন? প্লিজ, এই মহিলার ব্যাপারে আর কখনো কিছু জিজ্ঞেস করো না। ঘৃ*ণা হয় আমার।
" আবিরের এতো ঘৃ*ণা দেখে ভয় হয়। সাথে আবিরের কথায় স্পষ্ট বুঝলাম, ও মাকে দেখলে চিনতে পারবে না। কিন্তু ঘৃণাটা অসীম। আমার ভেতরে ঢুকে পড়ে সম্পর্ক ভাঙনের ভয়। মায়ের সত্যিটা বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। কীভাবে বলবো? ও এতটা ঘৃ*ণা করে,সত্যিটা জানলে আমাকেও ঘৃ*ণা করবে। হয়তো কোনোদিন আমার মুখই দেখবে না।ভাবতেই শ*রীর শি*উরে ওঠে।ওকে ছাড়া আমি থাকবো কীভাবে?
"মনে মনে ঠিক করলাম, কখনো সত্যিটা বলবো না।
এতক্ষণে যেহেতু শ্বশুরমশাই কিছু বলেননি, বুঝলাম উনিও চুপ থাকবেন। এমনিতেই আবিরের সাথে এখন উনার সম্পর্ক ভালো নয়। সৎ মা, বাবা ছেলের সম্পর্ক দূরে ঠেলে দিয়েছে। মাকেও আস্তে করে নিষেধ করবো। যদি কোনোদিন চিনে ফেলে, এই ভাবনাতেই বুক কেঁপে ওঠে। মা এমন কেন করলো?
মা তো এমন ছিল না…
__কি হলো? কোথায় হারিয়ে গেলে?
" আবিরের কোথায় ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসি। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বললাম।
__কোথাও না। বাদ দাও এসব। যা হয়েছে, সব ভুলে যাও।
" আমার কথায় আবিরও সায় দেয়। আমি একটু স্বস্তির নিশ্বাস নিতেই, শুনতে পেলাম শ্বশুর বাবা ডাকছে। মনের অজান্তেই ভ*য় ঢুকে গেল।
তবে কি উনি সব বলার জন্য ডাকছে…?
চলবে...
পরবর্তী পর্ব খুব শীঘ্রই পাবেন (লেখিকার লেখা শেষ হলেই) এই ওয়েবসাইটেই পাবেন।
