সত্যে ঘটনা (তৃতীয় পর্ব)
একদিন জসিমের মা সত্যি সত্যি অ"*ন্ধ হয়ে গেল। কম বয়সে অ'ন্ধ হওয়ার কারণ একটাই। জসিমের মায়ের তখন বয়স ৪৫ বছর। ছেলে জসিমের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এবং প্রতি রাতে এশার নামাজ পড়ে জসিমের কথা মনে পড়ে খালি কাদতো এই জন্য জসিমের মায়ের চোখে সমস্যা হয়ে গেছে তাই জসিমের মায়ের জরুরি চোখের চিকিৎসা করাতে হবে।
জসিমের জন্য অপেক্ষা করতে করতে আরো ৩ বছর পেরিয়ে গেলে। জসিম আর যোগাযোগ করেনি এর ভিতরে। সালটা ২০১০ সাল।
জসিমের মায়ের চোখের সমস্যার জন্য চিকিৎসা করা লাগবে। গ্ৰামের ডাক্তার বলেছে তাকে শহরে নিয়ে যেতে। তাই জসিমের বাবা জসিমের মাকে ওই এলাকার শহরের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে চোখ পরীক্ষা করে তারা বলছে তাকে ঢাকা বড় কোন হসপিটালে নিতে হবে তার চোখে অনেক বড় সমস্যা হয়েছে । যদি ভালো চিকিৎসা হয় উনি আবার দেখতে পাবে এমনটা আশ্বাস দিয়েছে কিন্তু অনেক টাকা-পয়সার ব্যাপার।
কত টাকা লাগবে এটা জানা যায়নি কেননা ঢাকা শহরে হাসপাতালে গেলে পরে জানা যাবে। মা ছেলের জন্য অন্ধ হয়ে আছে। ছেলেকে এক নজর দেখবে বলে মা পাগল হয়ে যাচ্ছে। এই যে ২০০৩ সাল এখন ২০১০ সাল প্রায় সাতটা বছর পেরিয়ে গেছে ছেলের সাথে মায়ের দেখা নেই। দশ মাস দশ দিন মা পেটে ধরেছে। এজন্য মায়ের কষ্ট বেশিই থাকে।
জসিমের মা আজ বড্ড অসহায় করেছে চোখে দেখতে পায় না। তবুও তার ছেলের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে। মাঝে মাঝে প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে আমি অন্ধ হলে কি হবো আমার ছেলেটা একদিন আসবে সেদিন আমি মনের চোখ দিয়ে দেখতে পাবো। আহ মা,,,,,
প্রতিবেশী মহিলা জসিমের মায়ের কথা শুনে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে আর বলে ছেলেটি যদি জানতো তার মা তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে, তার জন্য দোয়া করতে করতে, তার জন্য চোখের পানি ঝরতে ঝরতে ,আজ অন্ধ হয়ে গেছে আমার মনে হয় কোন ছেলে আর দূরে থাকতে পারতো না ।প্রতিবেশী মহিলা এগুলা বলছে আর বড় করে নিঃশ্বাস ছড়াচ্ছে।
যাই হোক বাড়ির কিছু জমি বিক্রি করে অন্ধ স্ত্রীর জন্য টাকা জমিয়েছেন জসিমের বাবা। তাকে ঢাকা বড় হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাবে। তখন সালটা ২০১০ সালের মাঝামাঝি। জুলাই মাস চলতাছে। হবিগঞ্জ থেকে একবারে বাস ধরে ঢাকার উদ্দেশ্যে স্ত্রীকে নিয়ে। জসিমের ছোট ভাই আয়নকে বাড়িতে রেখে আসছে বাড়ি দেখাশোনার জন্য। জসিমের বাবার বাজারে একটা ছোট মুদির দোকান আছে ওইটা দিয়েই বর্তমানে তাদের সংসার চলত। ওই দোকান দেখাশোনা করার জন্য বাড়িতে অয়নকে রেখে আসছে।
তখন ছোট বাটন ফোনের যুগ ছিল আস্তে আস্তে চিঠির যুগ চলে গেল। চিঠির প্রতি মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেললো। সরকারি কোন দপ্তরের কাজে চিঠি আদান-প্রদান হতো কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের আদান প্রদানের জন্য চিঠি লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়।
তখনকার সময় অয়নের কাছে একটা বাটন ফোন থাকে এবং জসিমের বাবার কাছে একটা বাটন ফোন থাকে। তখনকার সময়ে এই বাটন ফোন সবার কাছে থাকতো না যারা একটু বুঝে তাদের কাছেই থাকতো। আর যারা একটু বেশি বুঝে তাদের কাছে এর চেয়ে বেশি দামি ফোন থাকতো।
তখনকার মানুষ নতুন ফোন আসছে কিভাবে ব্যবহার করা অনেকে জানতো না সবাই জানতো না। ইয়ং ছেলেগুলো জানতো। তখন নতুন ফে"সবুক আবিষ্কার হয়েছে কিন্তু সবার কাছে পৌঁছায়নি ফে'সবুক কি। তখন youtube আবিষ্কার হয়নি।
তখন মানুষ মেমোরির মাধ্যমে কম্পিউটার থেকে গান ডাউনলোড করে অথবা ওয়াজ ডাউনলোড করে শুনতো। মুভি+ নাটক ডাউনলোড করে
দেখতো। ইত্যাদি ইত্যাদি।
যাইহোক জসিমের বাবা জসিমের মাকে ঢাকা নিয়ে আসছে ভালো একটি চক্ষু হাসপাতালে চক্ষু ডাক্তার দেখানোর জন্য। গ্ৰামের ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছিল ওই হাসপাতালে যান । আর সেই হাসপাতালে ঠিকানা অনুযায়ী তারা এই প্রথম ঢাকা শহরে আসছে।
তখন শেখ হা"সিনার সরকারের আমলের বছর ২ শেষ হয়েছে।
শহরে অনেক ভিড়। মানুষের গমাগম। তারা হবিগঞ্জ থেকে রাতে রওনা দিয়েছিল খুব সকালে এসে ঢাকায় পৌঁছালো। মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা করতে করতে অ'ন্ধ স্ত্রীকে নিয়ে একটা সময় ওই হাসপাতালে পৌঁছালো ঢাকা লায়ন হাসপাতাল।
সেখানে সিরিয়াল মোতাবেক লাইন ধরে ডাক্তার দেখাতে হয়। জসিমের বাবা একটা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে রইল আর অন্যদিকে জসিমের মাকে এক জায়গায় বসাইয়া রাখছে।
একটা সময় চক্ষু ডাক্তারের কাছে গিয়ে চোখ দেখাচ্ছিল পরে কি কি করতে হবে সেগুলো লিখে দিছে। কিছু কিছু পরীক্ষা দিয়েছে। সেই পরীক্ষা করার জন্য যখন জসিমের মাকে জসিমের বাবা বলছিল চলো তোমার চোখ পরীক্ষা করে দেখবে। জসিমের মা বলছিল আমি কি আর ভালো হবো আমি কি আমার জসিমেরে দেখতে পাবো।
এই কথা শুনে জসিমের বাবা বলল তুমি এই ছেলের জন্য চোখ ন/ষ্ট করে ফেলেছ আর কত তুমি এরকম করবে ঠিক একদিন তোমার ছেলে ফিরে আসবে আমি বললাম।
তুমি এত চিন্তা করে না। ডাক্তার তোমাকে পরীক্ষা দিয়েছে চলো আগে পরীক্ষার রুমে যাই। সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর ডাক্তার বলল এই চো/খ আর ভালো হবে না। তার দুই চো/খ ড্যা/মেজ হয়ে গেছে।
ডাক্তারের এমন কথা শুনে সাথে সাথে জসিমার মা একটা চিৎ/কার দিয়ে উঠলো কি বলেন ডাক্তার সাহেব তাহলে আমি আমার ছেলেকে কিভাবে দেখব??? আমার জসিমরে ফিরে আসবে যদি জসিম ফিরে আসে আমি জসিমকে কিভাবে দেখব?? গিয়ে ডাক্তার সাহেব আমার চোখ ভালো করে দেন আমি যেন আমার জসিমকে একবারের জন্য দেখতে পাই???
তখন জসিমের বাবা কে ডাক্তার জিজ্ঞাসা করে জসিম আপনাদের ছেলে কিন্তু কি হয়েছে??
তখন জসিমের বাবা ডাক্তারকে সংক্ষেপে বলে দেয় যে এমন এমন বহু বছর আগে রাগ করে বাড়ি ছেড়েছে কিন্তু এখন পর্যন্ত বাড়ি ফিরে নাই।
তখন থেকে জসিমের জন্য প্রতিদিন কান্দে । কাঁদতে কাঁদতে আজকে চোখের অবস্থা এরকম করে ফেলেছে। তা ডাক্তার সাহেব কোন সিস্টেম নাই আমার স্ত্রীকে ভালো করার জন্য। জসিমের বাবা কান্না জড়িত কন্ঠে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল এই কথা।
ডাক্তার জসিম এর বাবাকে বলল যদি ওনাকে কেউ চোখ দান করে বিশেষ অপা*রেশনের মাধ্যমে তাহলে উনি দেখতে হবে।
ডাক্তার আরো বললো,,, জসিম ছেলেটা যদি জানত তার মা তার জন্য কান্না করতে করতে আজকে চোখের এই অবস্থা করে ফেলেছে ছেলেটি পাগল হয়ে যেতো।
আশা করি আপনার ছেলে একদিন ফিরে আসবে তবে আমার খুব খারাপ লাগতে এই জন্য। মা বুঝি এমনই হয়। ডাক্তারের চোখে পানি টলমল করছে।
ডাক্তার শেষে বলল আপনারা আপাতত বাড়ি চলে যান।
জসিমের মাকে নিয়ে জসিমের বাবা বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। বাড়ি ফিরে সবাইকে হতাশ করেছে । পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই দেখতে এসেছে জসিমের মাকে ভালো হয়েছে কিনা কিন্তু জসিমের মা সুস্থ হয়নি এটা থেকে সবাই আফসোস করেছে।
দেখতে দেখতে ২০১০ সাল শেষের অবস্থায়। কিছুদিনের মধ্যে আবার চিঠি এলো। জসিম আবার চিঠি পাঠিয়েছে।,,,,,,
চলবে
লেখক মোঃ সোরমান হোসেন রবিন।
সত্য ঘটনা: অভিমান করে বাড়ি ছেড়েছি ২০০৩ সালে।
চ্যাপ্টার-৩ শেষ। খুব শীঘ্রই চ্যাপ্টার ৪ দেওয়া হবে।
সোরমান হোসেন রবিন ভাইয়ের আইডি থেকে লেখাটি সংগ্রহ করা।
#story #photooftheday #গল্প #photochallenge #winterfun
