দ্বিতীয় পর্ব

গল্প: সিদ্ধান্ত 

মিতুর বাসায় ঢুকে দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমার পা আর শরীরের কথা শুনল না। মেঝেতে বসে পড়লাম। মনে হচ্ছিল, আমি কোনো সিনেমা থেকে বেরিয়ে এসেছি—কিন্তু সিনেমা বন্ধ হয়নি।

মিতু আমার সামনে এক গ্লাস পানি ধরিয়ে দিল। আমি ধরলাম না।

“তুই ঠিক করেছিস,” সে ধীরে বলল। “ভুল হলেও… এই ভুলটা করলে বাঁচবি।”

আমি হাসতে চেয়েছিলাম। পারিনি। বাঁচব—এই শব্দটা তখন আমার কাছে অদ্ভুত লাগছিল।

সেই রাতেই ঘুমাতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই শ্বশুরের মুখটা ভেসে উঠছিল। কথাগুলো নয়—ওনার চোখ। একজন মানুষ যখন জানে সময় শেষ, ঠিক তখন যেমন চোখ হয়—আমি সেরকম চোখই দেখেছিলাম।

পরের তিন দিন আমি যেন লুকিয়ে থাকা এক মানুষ। ফোন বন্ধ। পর্দা টানা। খাবার গলায় নামত না। মা–বাবার কথা মনে হলে বুকটা হু হু করে উঠত। কিন্তু আমি জানতাম—এখন ফোন ধরলে আমি আর কখনো বেরোতে পারব না।

চতুর্থ দিনে ফোন অন করলাম।

স্ক্রিন ভরে গেল। দুই শতাধিক মিসড কল। মায়ের ভয়েস মেসেজ—কাঁপা গলা। বাবার ছোট ছোট টেক্সট— “মা, কোথায়?” “একবার কথা বল।” “আমরা ভয় পাচ্ছি।”

রাশেদের মেসেজগুলো আলাদা ছিল। প্রথমে রাগ। “এটা কী নাটক?” “তুমি আমার সম্মান নষ্ট করেছ।” তারপর সুর বদলাল। “তুমি ঠিক আছ তো?” “আমি চিন্তায় আছি।” শেষের দিকেরগুলো প্রায় ভাঙা— “একবার কথা বলো।” “যদি কিছু হয়ে থাকে, আমি ঠিক করে দেব।”

ঠিক তখনই একটা মেসেজ এল—অচেনা নম্বর থেকে।

“তুমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছ। ফিরে এসো না। যা-ই ঘটুক।”

কোনো নাম ছিল না। কিন্তু আমার বুক ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি জানতাম, এটা কে পাঠিয়েছে।

সেদিন সন্ধ্যায় নিউজ ব্রেক করল।

রাশেদের পরিবারের প্রধান কোম্পানি—তদন্তের আওতায়। মানি লন্ডারিং। ভুয়া কনস্ট্রাকশন রিপোর্ট। নিরাপত্তাহীন ভবনে চাপা দেওয়া দু**র্ঘটনা। নামগুলো একে একে ভেসে উঠছিল স্ক্রিনে—যেগুলো আমি হিসাবের খাতায় দেখেছি, কিন্তু প্রশ্ন করিনি।

রাত আটটার দিকে আরেকটা খবর এলো।

“প্রাক্তন চেয়ারম্যান মাহমুদ সাহেব হৃদরোগে আ**ক্রান্ত হয়ে মা**রা গেছেন।”

আমি মেঝেতে বসে পড়লাম। হাত থেকে ফোন পড়ে গেল।

কেউ জানে না— মা**রা যাওয়ার আগে, তিনি একজন মানুষকে অন্তত বাঁচাতে চেয়েছিলেন।


তিন সপ্তাহ পর, 

একটি সাদা খাম এলো মিতুর ঠিকানায়। কোনো প্রেরকের নাম নেই। ভেতরে একটি ইউএসবি আর হাতে লেখা চিঠি।

লেখা কাঁপা। কিন্তু সিদ্ধান্ত স্পষ্ট।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“আমি ভালো মানুষ ছিলাম না। আমি জানতাম কী করছি। আর আমি জানতাম—আমার ছেলে কী করছে।

তোমার বিয়েটা ছিল শেষ চাল। তুমি যদি থেকে যেতে, তোমার নাম ব্যবহার করে সব বৈধ করা হতো। তারপর তুমি আর কখনো বেরোতে পারতে না।

আমি নিজের সন্তানকে থামাতে পারিনি। কিন্তু একজন নির্দোষ মানুষকে আটকে যেতে দিতে পারিনি।

বাঁচো। যারা পারে না, তাদের জন্য বাঁচো।”

ইউএসবিতে সব ছিল। ভুয়া চুক্তি। মিথ্যা অডিট। ফোর্জড সই। রাশেদের সই।

তখনই আমি বুঝলাম— আমাকে ভালোবাসার জন্য বিয়ে করা হয়নি । আমি ব্যবহার হওয়ার জন্য হাতিয়ার ছিলাম

সেদিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম— আমি আর পালাব না।

আমি সামনে যাব। আমি সত্য বলব।

কারণ কিছু মানুষ শেষ মুহূর্তে ঠিক কাজটা করে যায়। আর  কেউ— সেই সুযোগটা নষ্ট করার অধিকার রাখে না। আমাকে পারতেই হবে.....।


চলবে.....


লেখা: 1 Minute  With Mitu  


Inspired from English story

এই ওয়েবসাইটে ৩য় পর্ব দেওয়া হয়েছে দেখেন। 


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url