গল্প : #ভুল
২য়+অন্তিম পর্ব
লেখিকা : #munmun_buri_মুনমুন_বুড়ি
প্রান্ত হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে আছে মাহিমা ও তার পাশে শুয়ে থাকা লোকটার দিকে। পুরো ঘর এর পরিবেশ একবার দেখে নিল প্রান্ত। মুহূর্তেই প্রান্তর মাথায় রক্ত উঠে গেল। সে তেড়ে গেল ওদের দিকে। মাহিমার কাছে গিয়ে ওর চুলের মুঠি ধরে টেনে শোয়া থেকে উঠায়। মহিমা চিৎকার করে ধরফড়িয়ে শোয়া থেকে উঠল। মাহিমার চিৎকারে পাশে থাকা রাসেল নামক লোকটার ঘুম ভেঙে যায়। সে প্রান্তকে দেখে দ্রুত নিজের শরীর চাদর দিয়ে ঢাকে। প্রান্ত ধাক্কা মেরে মাহিমাকে বিছানা থেকে মেঝেতে ফেলে দেয়। পাশে থাকা ফুলদানীটা নিয়ে মহিমার মাথায় বাড়ি মারে। রেগে চিৎকার করে বলে—
— তুই একটা বে*। তোর সাহস কী করে হলো তোর নাগর নিয়ে আমার ঘরে বে*গীরি করার। তোদের দুইটাকে আমি আজকে এইখানে পুতে ফেলব।
প্রান্তর এই রূপ দেখে রাসেল পাশ থেকে প্যান্টটা নিয়ে দ্রুত পালাতে চায়। প্রান্ত দ্রুত এসে রাসেলের পশ্চাৎদেশে এক লাথি মারে, ফলে রাসেলও মেঝেতে পড়ে যায়। প্রান্ত চারপাশে কিছু খুঁজতে লাগল। টি-টেবিলে ফল কাটার ছুরি দেখে সেটা নিয়ে তেড়ে গেল রাসেলের দিকে। রাসেল প্রান্তর পা জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
— আমাকে মাফ করে দিন স্যার, প্লিজ। আমি জানতাম না উনি বিবাহিত। উনি আমার সাথে সম্পর্ক রেখেছেন অনেকদিন ধরে। আর আগেও উনি আমাকে অনেক হোটেলে ডেকেছেন। কিন্তু আজকে এই বাড়িটা ডাকল। আমি সত্যিই জানতাম না। জানলে কোনোদিন আসতাম না। আমাকে মারবেন না, আমাকে মারবেন না।
প্রান্ত আজকে অবাকের পর অবাক হচ্ছে। কী শুনছে এগুলো! মহিমা আর আগেও! ছিঃ— আর ভাবতে পারল না প্রান্ত। প্রান্ত অগ্নিচক্ষু নিয়ে বলল—
— দুইটাই পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার ঘর থেকে বের হয়ে যাবি। যদি এক সেকেন্ডও বেশি তোদের আমি এই ঘরে দেখি, তাহলে লাশ পড়বে তোদের।
প্রান্ত কথাগুলো বলেই রুম থেকে বের হয়ে যায়। পাশের ঘরে এসে জিনিস ভাঙতে শুরু করে। কোনোভাবেই নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। কী দেখল এটা! ও আরেকটা মেয়ের জন্য প্রান্ত এতদিন তৃণা আর ওর বাচ্চাকে এত অবহেলা করে এসেছে! কী করেনি মেয়েটার সাথে! যতভাবে একটা মেয়েকে অত্যাচার করা যায় সব করেছে প্রান্ত। তৃণার কথা মাথায় আসতেই প্রান্ত কোনোদিকে না তাকিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
❇️
প্রান্ত হাসপাতালে এসেই আগের দিন যে ওয়ার্ডে তৃণাকে রেখেছিল সেখানে যায়, কিন্তু তৃণাকে পায় না। তাই রিসেপশনে গিয়ে বলে—
— কাল এখানে তৃণা রহমান নামে একজনকে অ্যাডমিট করা হয়েছিল। আমি ওর হাজব্যান্ড। একটু চেক করে বলুন তো।
রিসেপশনিস্ট প্রান্তর কথায় সায় জানিয়ে চেক করতে থাকে। প্রান্তর দিকে কয়েকবার আড়চোখে তাকিয়ে বলে—
— আপনি তৃণা রহমানের কী হন?
— হাজব্যান্ড।
— কাল কি আপনি ওনাকে অ্যাডমিট করেছিলেন?
— হ্যাঁ। কিন্তু এখানে তো লেখা আছে আপনি পেশেন্টের চাচাতো ভাই।
প্রান্ত রিসেপশনিস্টের কথায় কয়েকবার ঢোক গিলে, কিন্তু বলার মতো কোনো উত্তর পায় না। শেষে অনুরোধ করে বলে—
— আমাকে প্লিজ বলুন তৃণা রহমান এখন কোথায় আছেন?
রিসেপশনিস্ট একবার প্রান্তকে পর্যবেক্ষণ করে বললেন—
— উনি আজকে ভোর ছয়টা বাজে মারা গেছেন, এবং উনার গর্ভের সন্তানসহ।
— কীইইই
প্রান্ত হতভম্ব হয়ে চিৎকার করে ওঠে।
— আপনি কী বলছেন এইসব! মিথ্যা বলছেন আপনি। কোথায় আমার ওয়াইফ, বলুন কোথায়?
— আপনি শান্ত হন আর ঝামেলা করবেন না প্লিজ, এটা হাসপাতাল।
— আপনি আগে বলুন আমার ওয়াইফ কোথায়?
রিসেপশনিস্ট একজন ওয়ার্কারকে দেখে বলে প্রান্তকে তৃণার কাছে নিয়ে যেতে।
ওয়ার্কার প্রান্তকে নিয়ে মরচুয়ারি নিয়ে আসে। এরপর ফ্রিজ থেকে তৃণার লাশ, অন্য একটা ফ্রিজ থেকে একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে বের করে। প্রান্ত এই দৃশ্য দেখে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বুক কাঁপে। জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। প্রান্ত এক পা এক পা করে তৃণার দিকে এগিয়ে যায়। তৃণার হাতটা প্রান্তর হাতের মধ্যে নেয়। হাত অস্বাভাবিক ঠান্ডা। প্রান্ত কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে—
— তৃণা, এই তৃণা, তুমি ঘুমিয়ে আছো না? তোমার শরীর এত ঠান্ডা কেন?
বিপরীত পাশ থেকে কোনো শব্দ আসে না। যেভাবে আগে তৃণা প্রান্তকে কিছু বললে প্রান্ত উত্তর দিত না, সেভাবে আজ তৃণাও উত্তর দিল না। প্রান্ত পুনরায় বলল—
— কী হলো তৃণা, আমার সাথে কথা বলবা না? রাগ করেছো আমার ওপর? আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার রাগ আমি পরে ভাঙাব। আগে তুমি ঘুম থেকে ওঠো। দেখো, আমাদের কী সুন্দর একটা মেয়ে হয়েছে। তুমি সবসময় চাইতে না আমাদের একটা মেয়ে হোক। দেখো, আমাদের একটা মেয়ে হয়েছে, কিন্তু ও তো তোমারই মতো ঘুমিয়ে আছে। তোমরা মা-মেয়ে কি আমার ওপর খুব রাগ করেছো?
এবারও উত্তর করল না তৃণা। এবার প্রান্ত ছটফট করে ওঠে। আহত কণ্ঠে বলে—
— এই, এই তৃণা, কথা বলো, কথা বলো প্লিজ। দেখো আমি কান্না করছি, কষ্ট হচ্ছে আমার খুব। একটু কথা বলো না আমার সাথে প্লিজ। আমি আর কখনো তোমাকে কষ্ট দেব না, কিন্তু আমার সাথে কথা বলো এই তৃণা।
প্রান্ত তৃণার কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে এবার নিজের মেয়ের কাছে যায়। মেয়েটাকে দুই হাতে কোলে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে আর বলতে থাকে—
— আম্মা, আম্মা, তুমিও বাবার ওপর রাগ করেছো না। বাবা সরি। আর কখনো তোমাকে আর তোমার মাকে কষ্ট দেব না। তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসব। আমার সাথে একটু কথা বলো না মা, প্লিজ।
প্রান্ত মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করে কাঁদছে। প্রান্তর এই অবস্থা দেখে ওয়ার্কারদের চোখেও পানি চলে আসে। প্রান্ত একবার মেয়েটাকে জড়িয়ে কাঁদছে, অন্যবার তৃণাকে জড়িয়ে কাঁদছে। কিন্তু আফসোস, এখন কান্না করে কী লাভ! থাকতে মূল্য দিতে হয়।
❇️
দুইটা বছর কেটে গেছে। প্রান্ত তৃণা আর ওদের মেয়ের কবরের পাশে বসে আছে। আজ তৃণা আর ওদের মেয়ের মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতি বছর এই দিনে প্রান্ত সারা দিন তৃণা আর ওদের মেয়ের কবরের পাশে বসে কাটায়। প্রান্ত তৃণার কবরের দিকে তাকিয়ে বলে—
— তৃণা, তুমি শুনতে পাচ্ছো? আজ আমাদের মেয়েটার দুই বছর হলো। নিশ্চয়ই এতদিনে ও হাঁটতে শিখে গেছে। কিন্তু আমি তো দেখতে পাচ্ছি না। তুমি নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছো। আচ্ছা, ও তোমাকে মা ডাকে? ডাকে, হয়তো আমাকে তো বাবা ডাকে না এখনো। আমাকে ক্ষমা করতে পারো
পারেনি ও তাই না? আচ্ছা তৃণা, তুমিও কি এখনো আমার ওপর রাগে আছো? আমার ভুলের আর কি কোনো ক্ষমা নেই তৃণা?
কথাগুলো বলতে বলতেই প্রান্ত তৃণার কবরের ওপর মাথা রেখে কেঁদে ওঠে। সত্যি, হয়তো কিছু ভুলের ক্ষমা হয় না—যেমন প্রান্তর হয়নি।
⭕
সমাপ্ত
