#শোধ_প্রতিশোধ
#নুরুন্নাহার_তিথী
২
রাফার চিৎকারে সবাই রাশেদের ঘরে গিয়ে দেখে মনি বেগম নিস্তেজ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। রাশেদের মা শাহিনা খাতুন আহাজারি করে উঠলেন। রাফা দ্রুত মনি বেগমের চোখে-মুখে পানির ছিঁটা দেয়। কিন্তু তাতেও জ্ঞান না ফিরলে সবাই ভয় পেয়ে যায়। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রাশেদ অনবরত ঘামছে। নামাজে যাওয়ার আগে যা হয়েছে তাতেই কি এসব হলো? চিন্তিত ও ভীত সে।
শাহিনা খাতুন রাশেদকে ডাকলেন।
"রাশেদ, কী রে তুই? তোর বউয়ের জ্ঞান ফিরতেছে না, আর তুই দরজার কাছে মূর্তির মতো দাঁড়ায় আছোস! হাসপাতালে নিতে হইবে তো বউরে। ধর ওরে।"
রাশেদ এগিয়ে আসে। বিছানা থেকে তুলতে যায় মনি বেগমকে। মনি বেগমের উপর থেকে কাঁথা সরাতেই চাদরে র-ক্ত দেখে চমকে যায় সবাই। চিৎকার করে উঠেন শাহিনা খাতুন।
"হায় হায়! র-ক্ত কেন? বউর কি গর্ভপা-ত হইলনি? রাশেদরে, জলদি বউরে নিয়া হাসপাতালে চল। ইয়া খোদা, কী দেখাইতাছো এই বয়সে! নাতিনাতকুর আসব বইলা কতো স্বপ্ন। এমনে ভাইঙ্গা দিও না।"
শেষের কথাগুলো তিনি উপরের দিকে চেয়েই বললেন। রাশেদ দ্রুত মনি বেগমকে কোলে নিয়ে বের হন।
হাসপাতালে নিলে ডাক্তার জানায়, শারীরিক আঘাত বা মানসিক আঘাতের কারণে ব্লি*ডিং হয়েছে। পরবর্তীতে যেন খেয়াল রাখেন।
ডাক্তারের কথায় সবার মনে স্বস্তি এলো। কিন্তু রাশেদ চিন্তিত। মনি বেগম যে তার ব্যাপারে জেনে গিয়েই এই অবস্থায় তা তো শুধু সেই জানে। বাড়ি ফিরে মনি বেগমকে বুঝাবেন বলে মনস্থির করলেন।
বাড়ি ফেরার পর মনি বেগম একদম নিরব হয়ে গেলেন। কারও সাথে কথা বলেন না। রাশেদও তাই কিছু বলার সাহস পেলেন না। এভাবে আরও দিন পেরোলো। রাশেদ এখন বারান্দায় গিয়ে রাত জেগে কথা বলে না। কিন্তু বাড়ি ফিরে রাত সাড়ে দশটার পর। আগে নয়টার আগে বাড়ি ফিরতো, এখন আরও দেরি করে ফিরে। মনি বেগম বুঝেও চুপ করে থাকেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে মানসিক চাপে পি-ষ্ট সে। শারীরিক অবস্থারও অনেক অবনতি হয়েছে তার। কিছু খাওয়ার রুচি হয় না। প্রায় ছয় মাসের গর্ভবতী সে এখন। গর্ভাবস্থায় রুচিহীনতা স্বাভাবিক ধরে নিয়ে শাহিনা খাতুন মনি বেগমকে তার বাবা বাড়ি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। বাবা বাড়িতে গেলে তো মা যত্ন করে খাওয়াবে। এখানে তিনি ঠিক মতো খেয়াল রাখতে পারেন না।
এদিকে রাশেদও মনে মনে খুশি। মনির জন্য শান্তিতে আসমার সাথে কথা বলতে পারেন না। কয়েকদিন আগেই আসমার সাথে হোটেলে সময় কাটিয়ে আসার পর আসমার প্রতি টান তার আরও বেড়েছে। তাই মায়ের সিদ্ধান্তে হ্যাঁ মিলায় রাশেদ। নিজেই গিয়ে মনি বেগমকে বাবার বাড়ি দিয়ে আসে। শ্বশুরবাড়ির লোকজন রাতে থাকতে বললেও বাহানা দিয়ে রাতের বাসে ফিরে আসেন।
মনি বেগম সবটাই নিরবে মেনে নেন। কাউকেই স্বামীর পরকিয়ার কথা বলতে পারেন না। যদি পাছে তাকে তালাক দেয়, এই ভয়ে। নারীর জীবন তো স্বামীর মুখের ওই তিন শব্দেই আটকে যায়।
এভাবে মাস খানেক পেরোয়৷ মনি বেগম এখন প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু দেখে তা মনে হয় না। মানসিক চাপ, ভয় সব মিলিয়ে শরীরের অবনতি হয়েছে আরও।
শীতের সকাল। উত্তরাঞ্চলের দিকে জানুয়ারিতে কুয়াশার আস্তর বেশ ভারী হয়। শীতও পড়ে বেশ। মনি বেগমের বাবার বাড়ি শহর থেকে গ্রামের দিকে হওয়ায় বাথরুম বাহিরে। বাড়ির ভেতরে পাকা বাথরুম বানানোর কাজ শুরু করেছেন কিছু দিন সবে হলো। এখনও কাজ শেষ হয়নি। মনি বেগম ফজর ওয়াক্ত উঠে অজু করতে কলপাড়ে যাওয়ার সময় ইটের টুকরোর সাথে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। যত্রই পেটে আঘা-ত লাগায় ব্যাথায় চিৎকার করে উঠেন তিনি। মনি বেগমের মা জোবেদা খাতুন তখন সবে ঘুম থেকে উঠে নিজেও অজু করতে আসছিলেন। মেয়ের চিৎকারে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মেয়েকে মাটিতে পড়ে কাতরাতে দেখে ভয় পেয়ে যান। দ্রুত মেয়েকে ধরেন তিনি। উনার চিৎকারে মনি বেগমের ছোটো ভাইও ঘুম থেকে উঠে আসে। সে এসে বোনের এই অবস্থা দেখে মায়ের নির্দেশে মসজিদের দিকে ছুট লাগায় তার বাবাকে খবর দিতে।
মনি বেগম কাঁপা কাঁপা স্বরে তার মাকে বলেন,
"আম্মা, আমার বাচ্চাটা বাঁচবো তো?"
"তুই চিন্তা করিস না, মা। কিচ্ছু হইব না। সজিব গেছে তোর আব্বারে কইতে। তোর আব্বায় ভ্যান নিয়া আইব। তোরে এখুনি হাসপাতালে নিমু। দাই আম্মাও তো বাড়িতে নাই। সে দুই দিন পর মাইয়ার বাড়ি থেকে আইব। এই সকাল সকাল ডাক্তারও পামু নাকি আল্লাহ ভালো জানেন।"
জোবেদা খাতুন মেয়ের চিন্তায় দোয়া-দুরুদ পড়ছেন। মনি বেগমের বাবা ভ্যান গাড়ি ঠিক করে নিয়ে এলেন মিনিট পনেরো পর। এরপর মনি বেগমকে নিয়ে হাসপাতালে যান। হাসপাতালে নিতে নিতে মনি বেগমের জ্ঞান নেই। সেই জ্ঞান ফেরে বেলা এগারোটার দিকে। পাশেই জোবেদা খাতুন বসে বসে গুনগুন করে কাঁদছেন। হাতে স্যালাইন চলছে মনি বেগমের। তিনি নিজের পেটে কাঁপা হাত রেখে নিচু দেখে আঁতকে উঠেন।
"আম্মা, আমার বাচ্চা?"
জোবেদা খাতুন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। মেয়েকে গর্ভপা-তের সেই বেদনাতুর সংবাদটা জানালেন। মনি বেগমও চাপা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তখন নার্স এলোন। রোগীর জ্ঞান ফিরেছে তাই ডাক্তার ডেকে আনেন। ডাক্তার এসে জানান,
"আপনি কি মানসিক চাপে ভুগছিলেন? সাত মাসের প্রেগন্যান্সির কাউকে এত করুণ স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো লক্ষণ না। গর্ভপাতের কারণে আপনার জরায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জরায়ুর টিস্যুতে এফেক্টেড হয়েছে।"
জোবেদা খাতুন চমকে উঠেন।
"কী বলেন, ডাক্তার ম্যাডাম? জরায়ুর ক্ষতি হইব কেন? আমার মাইয়ার পরে সন্তান হইব তো?"
"দেখুন, সন্তান হওয়া না হওয়া আল্লাহর হাতে। কতো মানুষ বহু বছর পরেও গর্ভবতী হয়। আমি পরামর্শ দিব, এখনি বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা না করতে।"
ডাক্তার কিছু ঔষধ লিখে চলে যান। মনি বেগম মাথার উপর ছাদের দিকে নিথর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। মাথায় তার হাজারও দুঃশ্চিন্তা।
এদিকে রাশেদদের বাড়িতেও এই খবর পৌঁছে গেছে। উনারা সকাল নয়টার দিকেই সবাই মিলে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। দুই ঘণ্টা লাগে এখানো আসতে। এসেই নার্সকে মনি বেগম কোন ওয়াডে আছে তা জানতে চান। নার্স দেখিয়ে দেন। শাহিনা বেগম, রাফা ও রাশেদের বাবা সবাই মনি বেগমের কাছে যান। রাশেদ যায় না। সে নার্সকে জিজ্ঞেসা করে,
"আমার স্ত্রীর গর্ভপা-তের কারণ কী? কী অবস্থা এখন?"
নার্স সরল মনে বলেন,
"আপনার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা অনেক খারাপ ছিল। আপনার শাশুড়ি জানিয়েছেন, পড়ে গিয়ে গর্ভপা-ত হয়েছে, কিন্তু উনার শারীরিক অবস্থা দেখে আমাদের মানসিক চাপ, দুঃশ্চিন্তাও এর কারণ মনে হয়েছে। তাছাড়া উনার জরায়ুর টিস্যু এতে ক্ষতি হয়েছে। আপনারা চেষ্টা করবেন উনাকে হাসিখুশি ও চিন্তা মুক্ত রাখার। আর পরপর বাচ্চা নিবেন না। আপনি তো স্বামী, তাই আপনাকে জানালাম। এমন হয় যে গর্ভপা-ত হওয়ার পরপর এক মাসের মধ্যে আবার বাচ্চা নিয়ে ফেলে। এতে ঝুঁকি থাকে। আপনার স্ত্রীকে সুস্থ হওয়ার সময় দিবেন।"
এসব বলে নার্স চলে যান। রাশেদ মনে মনে ভাবতে থাকে.....
চলবে,
এটা অনুগল্প। সর্বোচ্চ ৩-৪ পর্ব হতে পারে। আবার পরের পর্বেও শেষ হতে পারে। রেসপন্স করবেন প্লিজ। ভুল, ত্রুটি শালীন ভাষায় জানাবেন।
ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন।
