#মহুয়ার_রাতদিন

. ৩+৪+৫ পর্ব

✍️ #রেহানা_পুতুল 

এদিকে ভয়ে মহুয়ার হৃৎপিণ্ডটা ছলকে ছলকে উঠছে। কোন অশুভ শক্তি যেন তার কলজেটা খাবলে খাবলে খাচ্ছে।

তারপর এক রাতে মহুয়া, তার বড় জা,ও শাশুড়ীর সাথে ভাত খেতে বসলো অন্যসব রাতের মতোই। রাহিমার ছয় বছরের ছেলে রাব্বিও বসেছে। সে বেশী ছোট চাচী মহুয়ার কাছেই থাকে। মহুয়াকে রাব্বি ছোটাম্মু বলেই ডাকে। মহুয়া রাব্বিকে প্রাণাধিক ভালোবাসে। ছোট্ট শিশুরা ফুলের মতো। নিষ্পাপ! নিখুঁত! তাদের কে না ভালোবেসে থাকা যায় না। মহুয়া রাব্বিকে খাইয়ে দিলো আগে। 


এই সময়ে রাহিমা ও তফুরার খাওয়া শেষ হয়ে গেলো। তারা উঠে গেলো। রাব্বি মহুয়াকে তাড়া দিয়ে বলল,


"তুমি খাইবা না ছোটাম্মু?"


"খাবো বাবা। তোমার খাওয়া শেষ হলেই।"


রাব্বির খাওয়া শেষ। সে উঠে চলে গেলো ঘুমানোর জন্য। মহুয়া দেখলো পানির জগ প্রায় খালি। পানি নেই। সে জগ নিয়ে উঠানে গেলো। নলকূপ চেপে জগ ভরে নিলো। ঘরে এসেই দেখে একটি বিড়াল তার ভাতের প্লেটে মুখ দিয়েছে। সে ভাতের প্লেটখানা ঘরের বাইরে নিয়ে একপাশে ঢেলে দিলো। মনে মনে বলল,


"হায়রে বিলাই,অভাগীর রিজিকে তুইও ভাগ বসালি। তুই খা আজ আমার ভাত।"


এই বলে বেজার মুখে মহুয়া ঘরে চলে এলো। টিনের বড় কৌটাটা নামিয়ে নিলো। ঘরে ভাজা কিছু শুকনো মুড়ি লবন পানিতে ভিজিয়ে খেয়ে নিলো। শুয়ে গেলো তার রুমে গিয়ে। 

কিছুক্ষন পর রাহিমার গলার শব্দে মহুয়া উঠে গেলো। 


"কী হয়েছে ভাবি?"


"আরেহ আমাগো ঘরের দুয়ারের সামনে উঠানে বিলাই একটা মইরা পইড়া আছে।"


তফুরাও উঠে এলো। দেখলো। বলল,


"কথা না বাড়ায়া অন্যদিকে নিয়া ফালায়া দাও। কোনদিক থেইকা কী খাইয়া আইছে, কে জানে।"


মহুয়ার সারামুখ ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করলো। ঠোঁট শুকিয়ে এলো। ভীরু ও উৎকন্ঠাজনিত গলায় বললো, 


"ভাবি,ওরে ত আমার প্লেটের ভাত দিছি খেতে। আমি জগ ভরতে গেলাম বাইরে। তখন বিলাইটা আমার ভাতে মুখ দিছিলো।"


"কস কী? তোর ভাতের থালায় কী এমন আছিলো যে খাইয়াই বিলাইটা মইরা গ্যালো?"


তফুরা ঝাঁঝিয়ে উঠলো মাথা দুলিয়ে। মহুয়ার মুখপানে দৃষ্টি তাক করলো।


 বললো,

"তুমি সত্যই ভাত খাওনাই? বিলাইরে দিলা?"


মহুয়া শ্লেষের হাসি দিলো ঠোঁট বাঁকিয়ে। কণ্ঠে উষ্মা ঢেলে বলল,


"নাহ। আমি খেলেতো এখন আমি মরতাম এবং আমার পেটের সন্তানও। আপনি বিষ দিয়েছেন আমার ভাতে?"


তফুরা পারেতো নিজের মাথা নিজেই ফাটিয়ে ফেলে। বিষিয়ে আসা কণ্ঠে বললো,


"তুমি কী আমাগো মা পোলারে আলাদা করতে চাও? এই ধান্দা তোমার দিলে? আমার ত মনে হয় তুমিই নিজেই ভাতে কিছু মিলাইছো,আমারে দোষী সাব্যস্ত করনের লাইগা।"


"আপনি জানেন এবারও আমার মেয়ে সন্তান জন্ম নিবে। তাই আপনি এটা করতে পারেন।"


শীতল গলায় বলল মহুয়া।


তারপর অনেকক্ষণ পালটা তর্ক,উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হলো তফুরা ও মহুয়ার মাঝে। তফুরা উত্তেজিত হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে মহুয়ার গালে সপাটে চড় বসিয়ে দেয় ফকিরনির মাইয়া বলে।

রাহিমা চুপ করে আছে নিরব দর্শকের মতো। মাঝেমধ্যে হুঁ হাঁ করছে জা ও শাশুড়ীর পক্ষ নিয়ে। তফুরা বড় বউকে অধিক স্নেহ করে। কারণ সে প্রথম সন্তান পুত্র জন্ম দিয়েছে। তফুরা রাগান্বিত মনে নিজের রুমে চলে গেলো। এক খিলি পান বানিয়ে মুখে পুরে দিলো।


 রাহিমা তার রুমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, 

"আম্মা,আপনে ত মহুয়ারে আসলেই অত দেখতে পারেন না মাইয়া জন্ম দিলো বইলা। আবার এইবারও মাইয়া জন্ম দিবো সে। আপনেই মনে হয় তার ভাতের থালায় কিছু মিশাইছেন।"


তফুরা মরিচ চোখে চাইলো রাহিমার দিকে। গজগজ সুরে বললো,


"আমি এত খারাপ মানুষ? বিলাই অন্যদিক থেইকা কিছু খাইয়া আইছে। চইলা যাও আমার সামনে থেইকা।"


রাহিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের রুমে চলে যায়। ঘুমন্ত ছেলেকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে যায়। মহুয়ার আঁখিজোড়া টলমল। নিস্তেজ হয়ে আসছে তার সমস্ত অনুভূতি। আধো ঘুমে আধো জাগরণে বাকি রাত পার করে। ভোরে আজান হলে বিছানা ছাড়ে। অজু করে এসে নামাজ পড়ে। কোরান তেলওয়াত করে। উঠে গিয়ে তার সমস্তকিছু গুছিয়ে একটি বড় সাইডব্যাগে ভরে নেয়। বোরকা পরে নেয়। ভাতিজা রাব্বির কাছে যায়। কপালে, গালে মায়ের মতো আদর করে। দু-চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝরছে তার। কারো উপস্থিতি টের পেয়ে রাহিমা চোখ মেলে। পিটপিট চোখে তাকায়।


 মহুয়াকে দেখেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো সে।

"কিরে কই যাস?"


"ভাবি কোন ভুলত্রুটি হলে মাফ করে দিবেন। রাব্বিকে মারবেন না জ্বালালে। একজন মায়ের কাছে পৃথিবী একদিকে বাকিসব একদিকে। আমার গর্ভের মেয়েকে বাঁচানো আমার ফরজ দায়িত্ব। এখানে থাকলে আমাদের মা,মেয়ের দু'জনেরই প্রাণ সংশয়। আপনার দেবর ফোন দিলে বুঝিয়ে বলবেন। আমাদের বাড়ি চলে যাচ্ছি আমি। আমার ভাতে উনিই বিষ মিশিয়েছে। এজন্যই সীমাকে দিয়ে চেকাপ করিয়ে আনলো আমাকে। অথচ তার আগে উনি ভালই চলছিল। উনার পরিবর্তিত নিষ্ঠুর আচরণ ও কর্ম আমাকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করেছে।"


রাহিমা স্তব্ধ চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো, 

"কবে আইবি আবার?"


"জানিনা। আমার রিজিকে যদি এই ঘরের ভাত থাকে তাহলে অবশ্যই আসা হবে। নয়তো আর আসা হবে না।"


ছলছল কণ্ঠে বলল মহুয়া।


ভোরের নির্মল হাওয়া,ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির বিন্দু,বাড়ি,ঘর,ফসলি জমি সব পিছনে ফেলে মহুয়া উঠে গেলো বড় রাস্তায়। একটা রিকশা নিয়ে চলে গেলো বাবার বাড়ি। তাকে দেখে এক পাহাড় বিস্ময় নিয়ে তাকালো তার মা। সে মা,বাবাকে সবিস্তারে সব জানালো। তাদের মাথায় হাত। নিজেরাই খেতে পায় না ঠিকমতে তিনবেলা। মেয়েকে কীভাবে খাওয়াবে। বাচ্চা প্রসবের সময় ও পরের খরব কীভাবে বহন করবে। মহুয়া তাদের আস্বস্ত করে বলল,


"তোমারা চিন্তা করো না। টিউশনি করবো। নয়তো কিছু একটা করবোই।"


"ক্যামনে করবি? পারবি? আইচ্ছা যাক,খোদায় এক ব্যবস্থা করবই।"


তার বাবা ক্ষোভের সাথে বললো,


"এই বেডিরে ত শাস্তি দেওন দরকার। তুই কস বুলবুলিরেও সেই পুকুরে ফালাইদিছে।"


"বাবা,আমি বেঁচে থাকলে সাজা উনি পাবেই। অন্যায়কারীকে আল্লাহ তার প্রাপ্য সাজা দিবেই। হয় আগে নয় পরে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।"


মহুয়া নিজের রুমে চলে যায়। কাপড়চোপড়গুলো ব্যাগ হতে বের করে নেই। গুছিয়ে রাখে পুরোনো কাঠের আলনাটিতে। হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় নির্জন বাগানের ধারে। একটি প্রকাণ্ড আম গাছের গুড়ির উপর বসে পড়ে দুই হাঁটু ভেঙ্গে। স্বামীর বাড়ির সব স্মৃতি মনে পড়তেই ঢুকরে কেঁদে উঠে মহুয়া। নীড় হারা ডাহুকীর ন্যায় কাটিয়ে দেয় একবেলা।


ছোট ভাই মিরন সামনে এসে মহুয়াকে তার ভাষায় বলে,

"বুবু,মা খাইতে ডাকে।"


মহুয়া উঠে যায় ঘরে। ভাত খেয়ে নেয়। তার মা বুঝতে পারে মহুয়া বেশ কেঁদেছে। কিন্তু কিছুই বলল না। নিত্য অভাব যেখানে লেগেই আছে,সেখানে মেয়েকে প্রবোধ দিবেই বা কী বলে। কারণ আশু পরিস্থিতিতে সে নিজেও বিরক্ত। 


সেদিন বিকেলেই মহুয়া তার এক চাচীর ঘরে যায়। সেই চাচীকে প্রসঙ্গত বলে,


"চাচী আমার সবই ত শুনলেন,পারলে আমাকে দুজন স্টুডেন্ট যোগাড় করে দিবেন। ফাইভ,সিক্স,সেভেনের হলেই হবে। এইটের হলেও পারবো। আপনাকে বলার কারণ হলো ঝুমার সাথে এ বাড়ির ও বাড়ির ছেলেমেয়ে পড়ে। তাই আপনি বা ঝুমা খোঁজ করলেই আশাকরি পেয়ে যাবেন।"


শুনে সেই চাচী খেদ ঝেড়ে বললেন, 


"আইচ্ছা দেখি কী করণ যায়। একটা জালিম হড়ি তোর কপালে জুটলো। আরে বুড়ি, মাইয়া হইবো তো কী হইছে? মাইয়া হলো ঘরের লক্ষী,প্রাণ! আমরাতো সাত বইন আমার বাপের ঘরে। কই আমার দাদিতো আমারে মাইয়া নিয়া খোঁচা দেয়নাই আমার মায়েরে।

তোর মা,বাপও,এক্কেবারে বিদেশি পোলা পাই বিয়া দিয়া দিলো অল্পবয়সেই। অভাব কইরাও যদি পড়তে পারতি,তাইলে ভালো ঘরে বিয়া হইতো। বড় একখান চাকরিও পাইতি। ঘরের অভাবও দূর হইতো। নিজের জীবনও গড়ায়া লওন যাইতো।"


"থাক চাচী, মা বাপকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সব আমার নিয়তি। যাই চাচী।"


"হ যা। সাবধানে যাইস।"


সেই সন্ধ্যায় তফুরা, মহুয়ার বাবাকে ফোন দিয়ে বললো,


"কথা মন দিয়া হুনেন,আপনার মাইয়া কার অনুমতি নিয়া ঘর থেইকা বাইর হইলো? তার এত বড় হিম্মত! তার প্যাটের মাইয়া নিয়া সে থাউক বাপের বাড়ি। আমার ঘরে তার আর জায়গা নাই। আমি আমার বিদেশী পোলারে আবার বিয়া করামু। সেই ঘরে পোলায় পোলা জন্ম দিবো।

মুরুক্ষু মাইয়া বিয়া করামু। তবুও বড় ঘরে করামু। আপনার মতন নুন আনতে পান্তা ফুরায়,এমন ঘরের মাইয়া আনুম না। রূপ দিয়া,বিদ্যা দিয়া কী পানি খামু আমরা।"


কথাগুলো বলেই চট করে মোবাইল রেখে দিলো তফুরা।


মহুয়ার বাবা বিষাদগ্রস্ত মুখে স্ত্রীকে ডাকলেন। মেয়েকে ডাকলেন। তফুরার বলা কথাগুলো শুনালেন। মহুয়া থম মেরে আছে বাজ পড়া পাখির ন্যায়। মুখ দিয়ে কোন শব্দই উৎসারিত হচ্ছে না তার। তার মা চোখের পানি ছেড়ে দিলো ঝরঝর করে। 


তখন মাকে সে শান্তনা দিয়ে বললো,

"আরেহ মা কান্দো কেন? আমানতো আমাকে অনেক ভালোবাসে। তার মা বললেই হলো নাকি? একটা সম্পর্ক কী এতই সস্তা, বললো আর শেষ হয়ে গেলো। আমি আমানকে সব বুঝিয়ে বলবো। আশাকরি সে বুঝবে।"


মা,বাবার সামনে থেকে মহুয়া উঠে যায়। নিজের রুমে গেলো। আমানকে ভিডিও ফোন দিলো। আমান রিসিভ না করে কেটে দিলো। মহুয়া অডিও কল দিলো। বাট নো রিসিভ। রাতে মহুয়া খেয়ে শুয়ে পড়লো। মোবাইলে টুং করে আওয়াজ হলো। আমানের পাঁচ মিনিটের ভয়েজ নোট এলো হোয়াটসঅ্যাপে। মহুয়ার হৃদয় নেচে উঠলো ময়ুরের পেখমের মতো।


দোচালা বেড়ার ঘর তাদের। রাতের নির্জনতায় কথা পাশের রুম হতে শোনা যাবে। তাই মহুয়া কানে হেডসেট লাগিয়ে নিলো। মন দিয়ে নিবিড়ভাবে আমানের কথাগুলো শুনলো। একবার নয়। বারবার শুনলো। বুঝতে কী তার অসুবিধা হচ্ছে নাকি? শেষমেষ আমানও? কোথায় যাবে এবার সে? তার রাত-দিন বুঝি এবাবেই কাটবে তিমির আঁধারের ন্যায়। নাকি অন্যরকম কিছু ঘটবে তার জীবনে? 


ভাবতেই মহুয়ার সমস্ত শরীর মন অসাড় হয়ে আসে। সে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে অশীতিপর বৃদ্ধা#মহুয়ার_রাতদিন. ৪ ✍️ #রেহানা_পুতুল 

 ভাবতেই মহুয়ার সমস্ত শরীর মন অসাড় হয়ে আসে। সে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে অশীতিপর বৃদ্ধার ন্যায়। চুরমার হয়ে যাওয়া মনকে প্রবোধ দিতে পারে না। শেষবারের মতো আবারো শুনলো আমানের কথাগুলো।


"মায়ের থেকে, ভাবির থেকে সব শুনেছি। বাইরে আরামে থাকি না। কষ্টে থাকি। খাটি। রোজগার করি। সেই টাকা বাড়িতে পাঠাই। কেন? পরিবারের সবাই যেন শান্তিতে থাকে। সেজন্য। কিন্তু শান্তি নাই। আমাদের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে তোমরা দুর্বল। তাই মা তোমাকে মাঝেমধ্যে এটা ওটা নিয়ে কটাক্ষ করে। অবজ্ঞা করে কথা বলে। এসব আমি মানছি। কিন্তু এর প্রতিশোধ হিসেবে ত তুমি আমার মায়ের নামে এত বড় অপবাদ দিতে পার না। গ্রামে পুকুরে পড়ে গিয়ে,আগুনে পড়ে গিয়ে প্রায়ই বাচ্চা মারা যায়। এটা সবাই জানে। এটা সত্য। কিন্তু তুমি বললা মা বুলবুলিকে ফেলে দিয়েছে পুকুরে। আবার গতরাতে বিড়াল মারা গেলো। এখন কাকতালীয়ভাবে তোমার ভাত এবং বিড়ালের মৃত্যু একই সময়ে হয়েছে বলে তুমি মাকে বিষ দিয়েছে বললা। তুমি চলে আসছো ভালো করেছে। আপাতত আর যাওয়ার চিন্তা ভাবনা করার দরকার নেই। বাচ্চা হলে তার খরচ আমি দিবো। তোমার চোখে আমার মা সবসময়ের জন্যই এখন খারাপ। আবার মার চোখেও তুমি খারাপ। দুই খারাপ এক ঘরে বাস করা সম্ভব নয়। কী করবো বলো, মাকেতো লাইফ থেকে বাদ দিতে পারব না। নিজের খেয়াল রেখো।"


মহুয়া বালিশে মাথা হেলিয়ে শুয়ে আছে। কান থেকে হেডসেট আলগা করে নিলো। নিরবে অশ্রু ঝরতে লাগলো আঁখিজোড়ার কোণ বেয়ে। ক্লান্ত পথিকের ন্যায় মহুয়া তন্দ্রাঘোরে ডুবে গেলো। সকালে উঠে বিষয়টা জানালো না সে পরিবারকে। তারাও বুঝতে পারল না। মহুয়ার মেঘমুখ দেখে তারা ধরে নিলো বিদ্যমান পরিস্থিতির জন্যই এমন মুখ গোমড়া হয়ে আছে মেয়ে। থাকাটাই স্বাভাবিক। 


দুপুরে মহুয়াকে ডেকে পাঠালো সেই চাচী। মহুয়া গেলে তিনি জানালেন, 


"শোন সকালে হাঁটতে হাঁটতে উত্তর বাড়িতে গেলাম। দুইজন ছাত্রী ঠিক কইরা আইলাম তোর লাইগা। মিজানের ভাতিজি। নিজামের জমজ মাইয়া দুইটা আছে না,ইরা ও মিরা নাম। ফাইভে পড়ে এবার। তারা পড়বে তোর কাছে।"


" মিজান ভাইয়ের ভাতিজিরা এতবড় হয়ে গেলো? মাশাল্লাহ!" 


"আরে তার বড় ভাই নিজাইমনা প্রেম কইরা অল্পবয়সে বিয়া করল না? এরবাদেই ত জমজ দুইটা মাইয়া হইলো। মিজানের মা ভাবি, নাতনিগোরে ছেলে মাষ্টারের কাছে পড়াইব না। মাইয়া টিচার খুঁজতাছে। বাও মতন পাইতাছে না।"


"মিজান ভাই কোথায় এখন? কী করে? নিজাম ভাই?"


"দুই ভাই চাটগাঁইয়াতে ব্যবসা করে। ফলের আড়ত নাকি। ভাবি কইলো। হুন,ভাবি কইলো তোরে হেগো বাড়ি গিয়া বিকালে পড়াইতে। আমি তোর সমস্যা খুইলা কইলাম। পরে রাজী হইলো তোগো ঘরে আইসা পড়তে। ইরা, মিরা আইজ থেইকাই পড়তে আইবো তোর কাছে। বেতন নিয়া সমস্যা হইবো না। "


"আলহামদুলিল্লাহ চাচী। আপনি আমার সাত জনমের উপকার করলেন।"


মহুয়া ঘরে এসে বিষয়টা জানালো। তার মা,বাবা স্রস্টার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। ইরা,ও মিরা বিকেলে এসে মহুয়ার কাছে পড়ে চলে গেলো। তারা দুই বোন টিচার হিসেবে মহুয়াকে বেশ পছন্দ করলো। মহুয়ার মা তাদেরকে গাছের পেয়ারা পেড়ে দিলো খেতে। 


আমান মহুয়ার সাথে নিজ থেকে সেভাবে যোগাযোগ করে না। যতটুকু করে দায়সারাভাবে। কিন্তু মহুয়া দমে নেই। সে রাতদিন আমানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। সে আমানকে হারাতে চায় না। সে চায় আমান তাকে বিশ্বাস করুক। তাকেই নিয়েই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বেঁচে থাকুক। কিন্তু আমান সেভাবে যোগাযোগ করে না মহুয়ার সাথে। আমানের নিরবতায়,দুরত্বে, মহুয়ার অন্তর ফেটে চৌচির হয়ে যায় চৈত্রের মাঠের ন্যায়।


এভাবে কেটে যাচ্ছে মহুয়ার রাত-দিন। নয়মাস পূর্ণ হলে মহুয়ার কোল জুড়ে আসে ফুটফুটে একটি কন্যাসন্তান। মহুয়ার খুশির অন্ত নেই। সাতদিন পরে সে মেয়ের নাম রাখে বুলবুলি। আমানদের বাড়িতে সে খবর দেয়নি। দেওয়ার মতো পথ আমানের মা রাখেনি। বরং বন্ধুর করে রেখে পুরো পথ। মহুয়া আমানকে ভয়েজ নোট দিয়ে বুলবুলির কথা জানিয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে ছবি দিয়েছে। মেয়ে হয়েছে শুনে আমানের মাঝে কোন বাড়িতি উচ্ছ্বাস দেখা গেল না। তবে কিছু টাকা পাঠালো নামমাত্র। এতে মা,মেয়ের একজনেরও প্রয়োজন মিটানো গেল না।


মহুয়া বুঝতে পারলো,তফুরা বিভিন্ন যুক্তি খণ্ডন করে করে ছেলের কান ভারি করে তুলেছে মেয়ে সন্তানের বিপরীতে। আর আমানও মায়ের কথাকে প্রাধান্য দিলো। 

মহুয়া বেদনার স্বাস ছাড়ে। মাথা উঁচিয়ে আকাশপানে চায়। মহুয়ার মেয়ের যখন বয়স পাঁচ মাস। তখন তার বাবা ডায়রিয়া হয়ে মারা যায়। মহুয়া ও তার মায়ের মাথায় যেন হঠাৎ বজ্রপাত হলো। এতদিন তার বাবা মিলে গিয়ে কম বেশি কাজ করেছে। মাসে একটা আয়ের পথ ছিলো। এখন তাও বন্ধ হয়ে গেলো।  


তার পরেরদিন ভোরে মহুয়ার বিধবার মা তাকে বললো, 


"মারে শোন,তিনদিন বা পাঁচদিনের দিন তোর বাপের নামে একটু মিলাদ দিমু। কোরান খতম হইবো। সারাজীবন আমগোর লাইগা খাইটা গেলো হে,আর এখন আমরা তার লাইগা দুই চারজন মিসকিন যদি আল্লারওয়াস্তে না খাওইয়াতে পারি,আল্লাহ বেজার হই যাইবো। আমি মাটির ব্যাংকটা ভাইঙ্গা পালামু।"


মহুয়া মরা বিকেলের মত অবসন্ন গলায় মাকে বলে,


"ঠিক বলছ মা। আমার কাছেও টিউশনির কিছু টাকা আছে। আমরা মা,মেয়ে মিলে আব্বার জন্য খাওয়াবো।"


"মিরনরে পাঠিয়ে তার মহাজন চাচাকেও দাওয়াত করতে হবে মা।"


"তাতো অবশ্যই। ধর,মিরন এখনো তার মিলে আছে। তোর বাপে অনেকবছর তার মিলে শ্রম দিছে। তার টাকায় আমাগো প্যাটে দানা পানি পড়ছে।"


"তাইলে আমি গিয়ে বলল উনাকে।"


"হ মা, তুই অহনই বোরকা পিন্দা যা। উনি এখন মিলে আছে। দাওয়াত দিয়া আয়।"


ঠিক তখনই উঠান হতে মা,মেয়ের কানে রাশভারী পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো। মিলের মহাজন সাবের উদ্দিন। 


"কইরে মিরন,আছত ঘরে?"


মহুয়ার মা সাদা কাপড়ের আঁচলখানা দিয়ে মাথা ঢেকে নেয়। দরজার আড়ালে গিয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। মহুয়া মাথায় ওড়না দিয়ে সামনের রুমে যায়। চেয়ার দেখিয়ে বিনীত গলায় অনুরোধ করে বলে,


"চাচা আসসালামু আলাইকুম। বসেন। মিরন বাইরে বসে আছে। আব্বার জন্য শুধু কান্না করে।"


"ওয়ালাইকুম আসসালাম। তুমি মিরনের বড় বইন না?"


"জ্বী চাচা।"


"মাশাল্লাহ। সেই কবে তোমারে দেখছি। তোমার আব্বার লগে আমার মিলে গিয়া বইসা থাকতা। তখনো অনেক সুন্দর ছিলা তুমি। এহনো কম না। যাইহোক, তোমাগো খোঁজখবর নিতে আইলাম। নয়তো অন্যায় হইয়া যায়।"


" মা এতক্ষণ আপনার কথাই বলছিলো। আমি যেতাম এখন আপনার কাছে। দাওয়াত দেওয়ার জন্য। আব্বার জন্য ক'জন মিসকিন খাওয়াবো আমাদের সামর্থনুযায়ী। যদিও আমরা নিজেরাই মিস্কিন।"


সাবের ভদ্রতাসুলভ হাসি ছড়িয়ে দেয়। বলে,

"ওহ! আইচ্ছা। শুইনা ভালো লাগলো। এই নাও কিছু টেকা পয়সা রাখো। তুমি বাপের বড় সন্তান। তোমার ভাই না থাকার মতই। এখন তোমার,মা,ভাইর দায়িত্ব তোমার কাঁধে কিন্তু। এইটা রাত-দিন মগজে রাইখতে হইবো।"


মহুয়া সাবেরের করুণা নিতে অপারগতা প্রকাশ করছে। সাবের বুঝতে পারলো। কৌশলে বলল,


"আরেহ মেয়ে এভাবে ভাবো ক্যান? যাও পরে পোষাইয়া দিও মিরনরে দিয়া মিলের মইধ্যে। মিলাদ পাঁচদিনের দিন পড়াইয়ো। তাইলে আমি আসতে পারুম।"


সাবের এক খিলি পান মুখে পুরে চলে যায় হক মাওলা বলে। মহুয়া ও তার মা সাবেরের দানের উপর খুশী হয়। 

তারপর পাঁচদিনের দিন মিলাদের অনুষ্ঠান হয়। বিকেলে সবাই চলে যায়।


 সাবের মহুয়াকে ডেকে বললো,

"আলহামদুলিল্লাহ। পাক ভালো হইছে। আমি রাইতে মিল বন্ধ কইরা যাওনের সময় আবার আসুম। দরকার আছে। তোমাগে কামেই আইতে হইবো আমার।"


"জ্বি। অবশ্যই আসবেন চাচা।"


 সেদিনই মহুয়া লোক মারফতে চুপিচুপি খবর পাঠালো বড় জায়ের কাছে। মিলাদে তিনি আসতে না পারলেও যেন রাব্বিকে অন্তত পাঠিয়ে দেয়। রাব্বির জন্য রাত-দিন তার মন পোড়ে। কিন্তু রাব্বির আসা হয় না। যার মাধ্যমে রাব্বির আসার কথা ছিলো, সএ মহুয়াকে বলল,


"শোন, তোর জামাই সামনের মাসে আইবো শুনলাম। 

তোর খুশী হওনের কাম নাই। তারে তার মা আনাইতাছে। বিয়া করাইবো। পোলায় পোলা পয়দা করবো নাকি। পাত্রী ঠিক হইছে। হুনছি তোরেও ছাড়বো না। দেখলি শখ কত,গাছেরটাও খাইবো। তলারটাও খাইবো। "


মহুয়া দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। তার সমস্ত পৃথিবী এক লহমায় দুলে উঠলো ভূমিকম্পের ন্যায়। পাশে থাকা বরই গাছের ডাল হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। বুকের পাঁজরগুলো যেন আমান নিজহাতে হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিচ্ছে। 


চলবে...৪

#সামাজিক #sadst#মহুয়ার_রাতদিন.৫ ✍️ #রেহানা_পুতুল 

মহুয়া দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। তার সমস্ত পৃথিবী এক লহমায় দুলে উঠলো ভূমিকম্পের ন্যায়। পাশে থাকা বরই গাছের ডাল শক্ত করে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। বুকের পাঁজরগুলো যেন আমান নিজহাতে হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিচ্ছে। 


মাগরিবের আযান শুরু হলো। আকাশের সমস্ত লালিমা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে মেঘের আড়ালে। পাখিরা ডানা মেলে উড়ে গেলো আপন নীড়ে। মহুয়া অচল পায়ে হেঁটে গিয়ে কলপাড়ে বসলো। পুকুর ঘাটে যাওয়ার মতো জোর তার দুই পায়ে নেই। সে নলকূপ চেপে একটু পানি খেয়ে নিলো হাতের তালুয় করে। অযু করে নিলো নামাজ পড়ার জন্য। ঘরে গিয়ে নামাজ পড়ে নিলো। বুলবুলি ক্ষুধায় কান্না জুড়ে দিলো। মহুয়া নামাজের পাটিতে বসেই বুলবুলিকে স্তন পান করালো। 


বাবার মৃত্যু উপলক্ষ্যে মিরন ছুটিতে আছে। মিলে যায় না। মহাজন তাকে ছুটি দিয়েছে। মৃতের ঘর। শোকের পরিবেশ। ঘরে কম বেশী লোক সমাগম রয়েছে। তবে এরা সবাই মহুয়ার নিকটজন। নানী,খালা,মামা,মামী,ফুফু এমন। মহুয়া সবাইকে আমান সম্পর্কে যা জানলো সবটুকুই বললো। 


মহুয়ার মা নিরীহ গলায় বললেন,


"বিপদ আইতে লাগলে সবদিক দিয়াই আসে। দুনিয়ায় সবকিছু জোর কইরা করন যায়। কিন্তু মন জোর কইরা পাওন যায় না। আল্লার কাছে বিচার দিয়া আমি সবর রইলাম। মাওলা উত্তম ফয়সালাকারী।"


রাত নয়টার দিকে গলা খাঁকারি দিয়ে সাবের মহাজন এলো। 

"কইগো করিমের বেটি, আছো নি?"


মহুয়ার মা সদ্য বিধবা নারী। চারমাস দশদিন ইদ্দত পালন করতে হবে। পর পুরুষের সামনে যাওয়া নিষিদ্ধ তার জন্য। তাই মহুয়াকেই সব সামলাতে হবে। এমন মানসিকতা মহুয়া ইতঃপূর্বেই নিয়ে রেখেছে।

মহয়া বুলবুলিকে মিরনের কোলে দিলো। তার মা পরিবারের সাথে স্বামীর শোক পালনে মশগুল। মহুয়া ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে নিলো। 


"চাচা আসসালামু আলাইকুম।"


"ওয়ালাইকুম আসসালাম। তোমার আম্মা ভালো আছে নি?"


লম্বা করে সালামের জবাব দিয়ে বললো সাবের মহাজন।


"জ্বি চাচা। ভালো আছে।"


মহুয়া পান বানিয়ে দিলো মহাজনকে। তিনি গালভর্তি পান মুখে নিয়ে বললেন,


"রাত হইয়া যাইতাছে। বাড়ি যাইতে হইবো আমার। কামের কথায় আসি।"

"জ্বি চাচা বলেন।"


সাবের মহাজন কাঠের চেয়ারটাতে পায়ের উপর পা তুলে বসলো আরামদায়কভাবে। ঝুলে থাকা নতুন সাদা লুঙিটাকে আঁটসাঁট করে নিলেন দুই পায়ের ভাঁজের মধ্যে।

মিরনও একপাশে বসলো একটি টুলের উপরে। দরজার আড়ালে মহুয়ার নানী ও খালা দাঁড়িয়ে আছে উৎসুক চোখে। মহাজন কী বলে তা শোনার জন্য।


"শোন, তোমার আব্বা এখন জীবিত নাই। তোমার আম্মা বিধবা। তোমার ছোট ভাই হইলো গিয়া শারিরীক প্রতিবন্ধী। সে চাইলেও অন্য সব জোয়ান ছেলের মতো খাটতে পারব না। তোমার বিষয়েও সব অবগত আছি আমি। জীবন ত আর থাইমা থাকতে পারে না। তারে চালায়া নিতে হইবো। তোমরা তিনজন মানুষের প্যাট ত বন্ধ হইব না। আবার তোমার আছে মাছুম একটা শিশু। তারও ত খরচ পাতি আছে কিছু। তাই বলি তুমি একটা কাজে নাইমা পড়ো।"


"কোথায় পাবো কাজ চাচা? কে দিবে আমাকে চাকরি?"


"পাবা, পাবা।সব রকমের যোগ্যতার চাকরি আছে দুনিয়ায়। একটু খুঁইজা নিতে হয়। আমি তোমার বাপের কাছে ঋণী। করিম কম খাটেনাই আমার ধান,চাইলের আড়তের লাইগা। আমার পরিচিত একজনের ফ্যাক্টরি আছে বড় মার্কেটে। সের সাথে আমার ভালোই খাতির। আমি তারে কইছি তোমাগো কথা। সে রাজী হইছে। সেখানে তোমার মতো আরো কর্মজীবী মেয়েরা আছে। তুমি দু চারদিন বাদে আমার লগে চইলো। নিজেই সব বুইঝা নিতে পারবা।"


" চাচা,আমার ত কোলের শিশু আছে। সম্ভব না।"


"এই দুনিয়ায় সবই সম্ভব বেটি। আগে ফাইনাল কইরা আসো।"


"আচ্ছা চাচা, আমি মায়ের সাথে আলাপ করে আপনাকে জানাবো।"


"হ,জানাইয়ো।"


সাবের মহাজন চলে যায় করিমের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে।


মহুয়া, পিছনের রুমে এসে বিষয়টা সবাইকে অবগত করে। মহুয়ার মা বুঝতেছে না কী বলবে। তার নানী বললো,


"আগে ওই ব্যাডার লগে গিয়া বাও বুইঝা আয়। ব্যাডাতো তোগো ভালার লাইগাই কইছে। নইলে কে কার খবর লয় আইজকাইল? পোলাপান দুইটা পড়ানোর টেকা দিয়া কী তোগো চাইরজন মাইনষের চইলবো।"


মহুয়া নিরুত্তর রয়। বুলবুলিকে কোলে তুলে বুকের মাঝে মিশিয়ে নেয়। দুগাল ভরে মায়ের মমতা বুলিয়ে দেয়। রাতে মহুয়া খালি বিছানায় ছটপট করে। একদিকে পরিবারের হাল ধরা,অপরদিকে নিজের ব্যক্তিগত সুখ বির্সজন হয়ে যাচ্ছে,আমান কী সত্যিই দ্বিতীয় বিয়ে করবে? এটা কোনো মানুষের কথা হলো? ছেলে সন্তান না হলে আরেকটা বিয়ে করবে সে? কী হারামি মা ও ছেলে। কিন্তু আমান ত এত খারাপ ছিল না।

 মা,তার মন ঘুরিয়ে দিয়েছে। হায়রে নারী! কীভাবে পারিস নিজে একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর জীবনটা তছনছ করে দিতে। এমন বিক্ষিপ্ত ভাবনায় কেটে যায় রাত্রির প্রথম ভাগ।


 বাবার মিলাদকে কেন্দ্র করে সারাদিন বহু ধকল গিয়েছে মহুয়ার উপরে। ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত শরীরে রাজ্যের অবসাদ নেমে আসে। বুঁজে আসে মহুয়ার অশ্রুসিক্ত আঁখিজোড়া।


তারপর মহুয়া সাবের মহাজনের সাথে বড় বাজারে যায়। একটা ফ্যাক্টরির মধ্যে প্রবেশ করে। চেয়ারে বসা একজন বয়স্ক লোক। সাবের মহুয়াকে নিয়ে তার সামনে যায়। হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে বলবলে, 


"কাশেম ভাই,ওর কথাই বলছি আমি আপনারে। আমার মিলের ম্যানেজার করিমের মেয়ে।"


মহুয়া সালাম দিলো কাশেমকে। তিনি সালাম নিলেন। মহুয়ার সাথে কথা বললেন। মহুয়া সব জানালো। শুনে তিনি আশাহত গলায় বললেন, 


"ফ্যাক্টরির হিসাব কিতাব বুইঝা নেওয়ার জন্য তুমি যথেষ্ট। সুন্দর কইরা কথা বলতে পারো। বিদ্যাবুদ্ধিও আছে তোমার। দেখতেও চালু আছো। তারপরেও আপাতত তোমাকে রাখা যাইবো না। কারণ তোমার বাচ্চা ছোট। স্তন পান করে। তুমি রোজ তাকে রাইখা আসতে পারবা না। "


সাবের অনুরোধের সুরে বললো,


"অল্প টাইমের লাইগা মাইয়াটারে কোন কাম দেওন যায় না ভাই? যেহেতু ছোট বাচ্চা আছে,তাইলে কয়েক ঘন্টার জন্য আসবো।"


"বুঝছি আপনি পার্ট টাইম চাকরির কথা কইতাছেন।"


"হ,হ। তাই কইতাছি ভাই। নয়তো ওর মায়ের কাছে আমি বেইজ্জতি হইয়া যামু।"


কাশেম একটুক্ষন ভেবে নিয়ে মহুয়াকে বললো,

"তুমি রোজ ৪/৫ ঘন্টা টাইম দিতে পারবা? আমাদের কসমেটিকস দোকানে?"


"পারবো। এটা কোথায় চাচা?"


"বজরা মার্কেটের দোতলায়। তোমার বাড়ি থেকে সেটা কাছে। অটো বা লেগুনায় কইরা আসা যাওয়া করতে পারবা। রোজ সকালে দশটা থেকে তিনটা পর্যন্ত।"


"জ্বী চাচা, পারবো।"


সাতপাঁচ না ভেবে খুশী খুশী মুখে জানিয়ে দেয় মহুয়া। তাদের জীবনের এই চরম দুর্দিনে এই বা কম কিসের। সে কৃতজ্ঞতার চোখে সাবের মহাজনের দিকে তাকায়। সাবের মহুয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় গুরুজনের মতন।

মহুয়া বাড়িতে গিয়ে নতুন চাকরির আদ্যোপান্ত মা ও ভাইকে জানায়। মিরন উৎফুল্ল হয় এই ভেবে, বেলায় বেলায় আর শাকপাতা খেতে হবে না তার। মহুয়ার মা খুশী হয় এই ভেবে,ছেলেমেয়েকে নিয়ে তিন বেলা পেট ভরে খেতে পারবে এবার। উপোস থাকতে হবে না আর। 


মহুয়া তার মাকে বলে,

"মা,তাহলে সামনের সপ্তাহ থেকে যাওয়া শুরু করি? ইরা ও মিরার পড়ার কোন বিঘ্ন ঘটবে না। ওরা ত আসে বিকেল পাঁচটার পরে।"


"হ মা,তাই করতে হইবো একটু ভালোভাবে বাঁচতে হইলে। তুই বুলবুলিরে দুধ খাওয়াইয়া যাইবি। এরপর মাঝখানে তারে আমি ফিডারে কইরা পানি,দুধ খাওইয়াতে পারুম। আশাকরি সমস্যা হইবো না। অমন দুই চারটা বাচ্চা আমি নিজেই পালতে পারি। আর আমার নানুভাইরে পারুম না? তুই প্রস্তুতি নে।"


তারপর নিদিষ্ট দিনে মহুয়া তার চাকরির দোকানে যায়। প্রথম দিন বলে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায় সাবের মহাজন। অবশ্য তার আগে মহুয়া উনাকে অনুরোধ করেছে সাথে যাওয়ার জন্য। মহুয়ার বেশ পছন্দ হলো দোকান। কাঁচের আয়নার ভিতরে প্রতিটি সেলফে হরেকরকম কসমেটিকস দিয়ে সাজানো। ক্যাশে বসা ছিলো দোকানের ম্যানেজার।


 সাবের তাকে বললো,

"ওর নাম মহুয়া। সম্পর্কে আমার ভাতিজি হয়। তোমাদের মালিক তারে চাকরি দিছে এই দোকানে। দোকান কী তুমি একলাই চালাও?"


"নাহ। স্টাফ আরেকজন আছে। এখন ত আবার এই আপা আসলো। এই দোকানে তিনজনেই যথেষ্ট। মাঝে মাঝে আসিফ ভাইও আসে।"


"আসিফ কে?"


"কাসেম কাকার মেজো ছেলে। এটাতো আসিফ ভাইয়ের দোকান।"


"ওহ আইচ্ছা। বুঝলাম।"


তিনি চলে গেলেন দোকান হতে বেরিয়ে। মহুয়া নিজ থেকেই টুকটাক কথা বলছে ক্যাশ ম্যানেজারের সাথে। নতুন চাকরি,নতুন আরেকটি অধ্যায় যুক্ত হলো জীবনে। তবুও বিষাদের গাঢ় আস্তরণে ঢেকে আছে মহুয়ায় হৃদয়ের এপাশ ওপাশ। থাকি থাকি কেবল তার আমানের কথা মনে পড়ছে। অভিমান করে আমানের সাথে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দিয়েছে। আমানও কোন যোগাযোগ করে না মহুয়ার সাথে। রোজ নিয়ম করে মহুয়া দোকানে যাচ্ছে,আসছে। কোন ঝামেলা সৃষ্টি হচ্ছে না। বা মেয়ে বলে বাইরে কোন বিড়ম্বনার স্বীকারও হতে হয়নি তাকে। 


তারপর এক মধ্যদুপুরে মহুয়া দোকানে কাজ করছে বিপরীতমুখী হয়ে। হঠাৎ সে শুনতে পেলো তার একান্ত প্রিয়জনের কণ্ঠস্বর!


"মেকাপবক্স দেখান। আর এই লিস্টের আইটেমগুলো হবে আপনাদের কাছে?"


"থাকব না ক্যান? সবই আছে। বিয়ের সাজানি লিস্ট মনে হয়?"


"হ্যাঁ। ঠিক ধরেছো।"


"কার বিয়ে ভাইজান? আপনার?"


"হ্যাঁ আমার।"


মহুয়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আমান মহুয়াকে দেখেই ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।

"মহুয়া! তু..তুমি এখানে কী করছো? কেন এলে?"


চলবে...৫


বাকি পর্ব গুলা এই ওয়েবসাইটেই দেওয়া হয়েছে দেখেন?

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url