#মহুয়ার_রাতদিন.
৬ +৭+৮ পর্ব
✍️ #রেহানা_পুতুল
"কার বিয়ে ভাইজান? আপনার?"
"হ্যাঁ আমার।"
মহুয়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আমান মহুয়াকে দেখেই ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।
"মহুয়া! তু..তুমি এখানে কী করছো? কেন এলে?"
"কেন এই দোকানে আপনি ছাড়া আর কেউ আসা নিষেধ না-কি? আপনার দরকার হতে পারে,আর কারো দরকার হতে পারে না?"
ঘৃণামিশ্রিত কণ্ঠে দৃষ্টি তাক করে বলল মহুয়া।
আমান কেনাকাটা বাদ দিয়ে মহুয়ার দিকে মনোনিবেশ করলো। অপরাধী গলায় অনুরোধ করে বললো,
"তুমি একটু বাইরে আসবে?"
মহুয়া অবিচল। দৃঢ় কণ্ঠে বললো,
"প্রয়োজন মনে করি না।"
দোকানের ম্যানেজার ছেলেটা সন্দেহাতীত চোখে দু'জনকে দেখতে লাগলো। আমান বুঝতে পারলো মহুয়া এক পাও নড়বে না দোকান হতে। তাই সে মহুয়াকে আর বিশেষ ঘাঁটালো না। কেনাকাটা না করেই দোকান হতে সে চঞ্চল পায়ে বেরিয়ে গেলো।
মহুয়া টুলের উপর বসে পড়লো। খেই হারিয়ে ফেলল নিজের উপর। মাথাটা টনটন করছে। মনে হচ্ছে মগজগুলো ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে কিছু বিষাক্ত পোকার দল। হায় মালিক! হায় কপাল! এমন দিন দেখার আগে তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেলো না কেন? সে কপাল ঠেকিয়ে ধরলো ওয়ালের মাঝে। নিজের দূর্ভাগ্যকে অভিসম্পাত দিতে লাগলো মনে মনে। তার ভিতরটা যেন কলাপাতার মতন ফরফর করে চিরে ফেলছে আমান নিজ হাতে। দানবীয় যন্ত্রণায় মহুয়ার মুখ দিয়ে অস্ফুট আওয়াজ বের হলো।
ম্যানেজার ফাহিম মহুয়াকে সহানুভূতি দেখালো না। উলটো খিটখিটে মেজাজে বললো,
"দিলেন ত ব্যবসার বারোটা বাজিয়ে। বিয়ের কাস্টমার রোজ রোজ পাই? সারাদিনে যা বেচাবিক্রি হইতো, তার দিগুণ হয় এমন বিয়ার কাস্টমার হইলে। কাশেম চাচাতো বুঝেনাই। দিলদরদী মানুষ। চোখের পানি ফেলে মন গলায়া ফেলছেন। আর চাকরি হইয়া গ্যালো আপনার। আসিফ ভাই থাকলে এক্ষুনি আপনার সাধের চাকরি নট হইয়া যাইতো।"
মহুয়া চুপ রইলো। ফাহিমের কথাগুলোর কাউন্টার দিল না। ফাহিম আবার জিজ্ঞেস করলো,
"কে উনি? আপনার প্রতারক প্রেমিক না-কি?"
মহুয়া নিঃশ্চুপ! নিশ্চল! তার ভাষারা নির্বাক! কষ্টগুলো দলা পাকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে পুরো হৃৎপিণ্ডজুড়ে। বিনা অপরাধে অযৌক্তিক বিষয়কে ইস্যু করে তাকে এই নরক যন্ত্রণা কেন দিলো আমান ও তার মা? পুত্র সন্তান হয় নি বলে আমান সত্যিই দ্বিতীয় বিয়ে করতে যাচ্ছে? নাহ। অপরাধী তারা। সাজা তাদের প্রাপ্য! তাদেরকে সাজা দিতে হবে। চোখের জল মুছে ফেলতে হবে। ঘুনে ধরা বাঁশের মতো মচকে গেলে চলবে না। তাকে সেগুন কিংবা মেহগনি গাছের মতো টেকসই ও মজবুত হতে হবে। না ভাঙ্গবে। না মচকাবে। শত ঝড় বৃষ্টিতেও টিকে থাকবে তার নিজস্ব শক্তি নিয়ে।
দোকান থেকে বেরিয়ে মহুয়া বাড়িতে চলে গেলো। বোরকা খুলেই হাত মুখ ধুয়ে নিলো। মায়ের আদেশে আগুনে হাত ছেঁকে নিলো রোজকার মতো। আগুনের সংস্পর্শ পেলেই না কি জ্বীন ভূতের প্রভাব থাকলে তা দূর হয়ে যায়। মেয়ে বুলবুলিকে কোলে তুলে নিলো। আদর করলো প্রাণভরে।
ভাত খেয়ে নিলো। ভ্যানিটি ব্যাগ হতে মোবাইলটা বের করলো। দেখলো আমানের ভয়েজ মেসেজ। বিষিয়ে আসা মন নিয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও শুনলো।
"মহুয়া দয়া করে ভুল বুঝ না। আমি বিয়ে করতে একদমই চাই নি। এবং এখনো চাই না। মা বিয়ে ঠিক করেছে। এবং নিজেই বলছে যেনো তোমাকে না ছাড়ি। উনি ছেলে নাতির মুখ দেখতে চায়। তুমিতো জানই আমাদের পরিবারে ছেলে নেই রাব্বি ছাড়া। আমার জীবন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে মায়ের নানারকম যুক্তির কাছে হেরে যাচ্ছি। আমিতো তোমারই আছি। কোনদিন তোমাকে ছেড়ে যাবো না। তোমাদের বাড়ি আসবো আমার মেয়েকে দেখতে।"
ক্ষোভে,ঘৃণায় মহুয়া মুখ বিকৃত করে ফেললো। মাকেও শোনালো আমানের কথাগুলো। দোকানে আমানের সাথে দেখা হওয়ার বিষয়টাও মায়ের সাথে শেয়ার করলো। শুনে তার মা হালিমা মরিচ কণ্ঠে বললো,
"মা যেমন এক হারামির হারামি। পোলাও হইছে আরেক হারামী। দুই হারামি মিলা যা ইচ্ছা করুক। খেতা পোড় হেগো। যেমনে আল্লায় দিন নিতাছে আমাগো। হাজার শোকর তার দরবারে। টিউশনি করস। চাকরি করস। নিজের মেয়ে নিজে পালতাছোস। তাইলে ওই চামারগোরে দিয়া আর কী কাম তোর জিন্দেগীতে? ভুইলা যা। ধইরা নে স্বামী মইরা গ্যাছে তোর। অহন মাইয়া নিয়া তোর একলাই বাঁচতে হইবো।"
"মা,তাদের একটা টাইট দিতে চাই। আমি একজন উকিল ও একজন বড় মাওলানার সাথে আলাপ করবো বিষয়টা নিয়ে। তারপর থানায় মামলা করবো। আগে বিয়ে কবে সেই খবর নিতে হবে।"
শুনে হালিমা ঘাবড়ে উঠে।
"কী কস? পারবি? ক্যামনে কী করবি?"
"মা,আল্লাহ ভরসা। তুমি দোয়া করো আমার জন্য। আমিতো একদম পড়াশোনা না জানা মেয়ে ন। এসএসসি পাশ। এখনো সময় সুযোগ মিললে কলেজে ভর্তি হওয়া যায়।"
হালিমা একটু ভরসা পেলো মেয়ের মুখে আত্মবিশ্বাসী কথা শুনে।
পরেরদিন সকালে মহুয়া দোকানে গেলো। বোরকা খুলে নিলো। চাইলেও সে বোরকা পরে থাকতে পারে না। এই বোরকাটা মোটা কাপড়ের। অল্পদামের। অস্বস্তি লাগে লম্বাসময় ধরে পরে থাকতে। দোকানে তার দায়িত্ব সামলাচ্ছে সে। কাস্টমারদের সাথে কথা বলছে। কসমেটিকস পণ্য দেখাচ্ছে। বিক্রি করছে। বিদায় দিচ্ছে। ফাহিম ক্যাশে বসে টাকা নিচ্ছে।
ভর দুপুরের দিকে দোকান ফাঁকা হলো। কেউ নেই। ফাহিমের জিহবা চুলকাচ্ছে মহুয়াকে কিছু বলার জন্য। তার কামুক চাহনি লাটিমের মতো বৃত্তাকারে ঘুরছে মহুয়ার বক্ষ যুগলের উপরে। সে বলে ফেললো,
"বুঝলাম না,আপনার জামার বুকের অংশ রোজই ভিজতে দেখি। কারণ কী?"
মহুয়া ফাহিমের কথাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলো। সরল গলায় বললো,
"আমার কোলের শিশু আছে ফাহিম ভাই।ব্রেস্ট ফিডিং করাই। অনেক সময় হয়ে গেলে এমন হয়।"
"ওহ!" বলে ফাহিম খুব আপত্তিকর দুটো বাক্য বলে ফেললো মহুয়াকে। মহুয়ার দু'কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো উত্তপ্ত সীসার ন্যায়। তাতানো মেজাজে এগিয়ে এসে ফাহিমের গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দিলো। ফাহিম মহুয়ার হাত ধরে ফেললো যেনো দ্বিতীয় চড় না দিতে পারে মহুয়া। মহুয়া হাত মোচড়ামুচড়ি করছে ছাড়ানোর জন্য। পারছে না।
ঠিক তখনই দোকানের মালিক আসিফ চলে এলো। ফাহিম চট করেই মহুয়ার হাত ছেড়ে দিলো। মহুয়া রা*গে,লজ্জায় কুঁকড়ে গেলো,অচেনা,অদেখা, আসিফকে দেখে। আসিফও এর আগে মহুয়াকে দেখেনি। তার বাবার কাছে শুনেছে মহুয়ার কথা। উপস্থিত অপ্রীতিকর পরিস্থিতি দেখে সে নিজেই ইতস্ততবোধ করলো।
কর্কশ স্বরে ধমকে উঠে ফাহিমকে জিজ্ঞেস করলো,
" কী হচ্ছে এসব?"
ফাহিম গাঁইগুঁই শুরু করলো। নমনীয় স্বরে বললো,"কিছু না ভাই।"
"কিছু না মানে? আমি দেখলাম তুই ওর হাত ধরা?"
ফাহিম নিশ্চুপ।
আসিফ গলার ঝাঁঝকে হালকা করে নিয়ে মহুয়াকে বললো,
"দোকানে নস্টামি করতে আসো? নাহ?"
মহুয়ার মন চাচ্ছে মাটির নিচে পুঁতে যেতে। এতবড় অপবাদ নেয়া দুঃসাধ্য তার পক্ষে। মহুয়া তৎক্ষনাৎ চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলো।
আসিফ ভরাট কণ্ঠে বলে উঠলো,
"এই মেয়ে বসো বলছি চুপচাপ। কোথায় যাওয়া হচ্ছে?"
"আমি চাকরি ছেড়ে দিলাম আপনার দোকানে। মাফ করবেন।"
মহুয়ার কথার দৃঢ়তায়, ব্যাক্তিত্বে,আত্মমর্যাদায়, আসিফ আশ্চর্য হলো। সে বুঝতে পারলো মহুয়া মেয়েটা নির্দোষ। সে শাসনের সুরে বললো,
"আমার দোকানে তোমার চাকরি হয়েছে আমার বাবার ইচ্ছায়। কিন্তু চাকরি যাবে বা তুমি ছাড়বে সেটা আমার ইচ্ছায়। বসো। স্থির হও। আমি দেখছি।"
মহুয়া বসলো। আসিফ বিষয়টা খোলাখুলিভাবে জানতে চাইলো।
মহুয়া বললো,
"সেটা মুখে বলা সম্ভব নয় ভাইয়া। উনি খুব আপত্তিকর কথা বলেছে আমাকে। আমি উনাকে চড় মেরেছি। তখন উত্তেজিত হয়ে উনি আমার হাত ধরেছে।"
আসিফ উঠে এসে ফাহিমের পিঠে,গালে আঘাত করলো হাত দিয়ে। বললো,
"মাফ চা বলছি মহুয়ার কাছে। "
উপয়ান্তর না পেয়ে ফাহিম মুখে মাফ চাইলো মহুয়ার কাছে। আগে চাকরি বাঁচাতে হবে। পরের খেলা পরে হবে। শা*লী, বলে গোপনে আরো বিশ্রী দুটো বাক্য বললো ফাহিম।
মহুয়া তার দায়িত্ব শেষে চলে গেলো। সঙ্গী করে সঙ্গে নিলো এক তিক্তকর,বিদঘুটে অভিজ্ঞতার ঝাঁপি। তার আগে আসিফ তার মোবাইল নাম্বার চেয়ে নিলো।
মহুয়া বাড়িতে গিয়ে মা হালিমাকে জানালো না দোকানের কাহিনীটা। অকারণে বিধবা শোকাহত মাকে অতিরিক্ত চিন্তায় ফেলে দেওয়া ঠিক হবে না। রাতে ভাত খেয়ে নিয়ে মহুয়া তার রুমে শুয়ে পড়লো। শিশু বুলবুলি মায়ের স্তন পান করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লো।
মুঠোফোন বেজে উঠলো। রিসিভ করে মহুয়া সালাম দিলো। ওপাশ হতে ভেসে এলো গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠ।
"ওয়ালাইকুম সালাম। কেমন আছো মহুয়া?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?"
"ভালো আছি। তোমার সাথে আজ দেখা হলো বাজে একটা অবস্থায়। যাইহোক, তুমি মনে কিছু রেখো না।"
"ভাইয়া, আমি আর আগ্রহ পাচ্ছি না আপনার দোকানে যেতে। অন্তত ওই পিশাচটা থাকাবস্থায়।"
আসিফ অনুধাবন করতে পারলো,মহুয়া তার সিদ্ধান্তে অনড়! সে মহুয়াকে শান্তনা দিলো তার সামর্থনুযায়ী। তার বাবার কাছে মহুয়ার প্রশংসা শুনেছে। এবং শুনেছে মহুয়ার নিষ্পেষিত জীবনের গল্প। মহুয়াকে দেখেও আসিফের পছন্দ হয়েছে। প্রমিত ভাষায় মহুয়ার মার্ধূযময় চমৎকার বাচনভঙ্গিতে দোকানে কাস্টমার এখন তেমন ফেরত যায় না। আনুপাতিক হারে বিক্রি বেড়েছে।
সে আরো বললো,
"তুমি কাল ও পরশু তোমার মেয়েকে সময় দাও। দোকানে আসতে হবে না। স্বাভাবিক হও। তারপর এসো। ফাহিমকে বাদ দিয়ে দিবো কিছুদিন পর। সে বহুদিনের পুরোনো বিশ্বস্ত ম্যানেজার। হুট করে বাদ দিলে তারও ক্ষতি। আমারও ক্ষতি। বুঝতে পেরেছো।"
আসিফকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে মহুয়া ক্ষীণকায় স্বরে হুঁ বললো।
আসিফ মোবাইল ফোন রেখে স্বস্তির দম ছাড়লো।
তার একদিন পরেই কাশেম ছেলের রুমে গেলো। আসিফ অন্যদিকে ব্যস্ত। কাশেম নিজের আধপাকা দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
"তোর লগে একটা বিষয় আলাপ করা দরকার।"
"কী বাবা? কোন বিষয়ে? বলেন শুনি?"
"মহুয়া মেয়েটার বিষয়ে। তবে এখন না। ঠান্ডা মাথায় বোঝাপড়ার বিষয় এইটা।"
"সমস্যা নেই। বলবেন।"
অন্যমনস্ক হয়ে বলল আসিফ।
এদিকে আমান মহুয়াদের বাড়ি আসার আগেই মহুয়া জেনে গেলো আমান কোন মেয়েকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। শুনে মহুয়া বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো। মায়ের কাছে ছুটে গেলো।
স্তম্ভিত গলায় মাকে বললো,
"মা জানো,আমান কাকে বিয়ে করবে?"
"কারে?"
আমরা যে সবসময় বলি আমাদের শিউলি। আমাদের শিউলি ফুল। আমাদের সেই শিউলি হতে যাচ্ছে আমানের দ্বিতীয় স্ত্রী।
হালিমা দপ করে মাটিতে বসে পড়লো। হই হই করে উঠলো না। কেবল হায় হায় করে করুণ গলায় বললো,
"কোঁচার ছুরি দিয়ে এইভাবেই প্যাট কাটা যায়। বুঝলি মা।"
"নাহ মা। বুঝতে চাই না। বোঝার কথাও না।"
চোয়াল শক্ত করে বজ্রকণ্ঠে বলে উঠলো মহুয়া।
#মহুয়ার_রাতদিন.৭ ✍️ #রেহানা_পুতুল
"কোঁচার ছুরি দিয়ে এইভাবেই প্যাট কাটা যায়। বুঝলি মা।"
"নাহ মা। বুঝতে চাই না। বোঝার কথাও না।"
চোয়াল শক্ত করে বজ্রকণ্ঠে বলে উঠলো মহুয়া।
হালিমা উঠে গিয়ে নিজের অতি সস্তা বাটন সেটটি হাতে নিলো। ক্ষোভে বেলুনের মতো ফুলেফেঁপে উঠছে। ফোন দিলো তার আপন ননদকে। তার ননদ মোবাইল রিসিভ করে বড় ভাবিকে সালাম দিলো।
হালিমা সালাম নিয়েই উত্তেজনায় গজগজ করে বললো,
"তুই এইটা কী কইরলি? শিউলির বিয়া আমার মাইয়ার জামাইর লগেই তোর দিতে হইবো? তোর ভাইয়ের লগে সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা নিয়া তোর মনোমালিন্য ছিলো। কিন্তু আমাদের সাথে তো কিছু ছিল না তোগো। আর শিউলি কী হারামি মাইয়া,মহুয়ার লগে তার কত খাতির ছিলো। আমরা সবাই কত কইতাম মহুয়া ফুল আর শিউলি ফুল হইলো দুই সই। তুই এই বিয়া ভাঙানি দে কইলাম। বিদেশি পোলা পাই তোর লোভ হইলো?"
"ভাবি থামো। অনেক কইছো। মহুয়ার হড়ি শিউলিরে ম্যালা পছন্দ করলো। কইলো মহুয়াও থাকবো আমানের পহেলা স্ত্রী হিসাবে। আমরা তো আরো মনে করলাম,তোমরা অতটা মনে কষ্ট পাইবা না। দুই মামাতো ফুফাতো বইন একলগে মিলামিশ্যা থাকবো। সমস্যা ত দেখি না। শিউলি না হইলেও হেরা অন্য মাইয়ারে বিয়া করাইতো। তহন বেশী ভালা লাগতো মহুয়ার? মন মেজাজ ঠান্ডা করো ভাবি। মাইনা নেও। ভালো হবো কইলাম।"
হালিমা আর কিছু বলে না। কান থেকে মোবাইলটা আলগা করে নেয়। মেয়ের দিকে ব্যথিত মুখে চায়। মহুয়া অভিমানী গলায় বলে,
"তুমি ফোন কেন দিলে মা? দরকার নেইতো। বিয়ে ফাইনাল। এখন ভাঙ্গবে?"
"তাইলে কী করবি? সতীনের ঘর করবি?"
"অসম্ভব! একলার জীবন অনেক ভালো। হাত আছে,পা আছে,মাথায় মগজ আছে। এই যথেষ্ট আমার, পেট চালানোর জন্য।"
তার দুদিন বাদে আমান মহুয়াদের বাড়ি যায়। এটা সেটা নিয়ে যায় যেতে। হালিমাকে সালাম দিলো সে। মহুয়া নিজের মেয়েকে কোলে নিয়ে বাইরে বাঁশঝাড়ের দিকে চলে গেলো। আমান হালিমাকে সব বুঝিয়ে জোর অনুরোধ করলো মহুয়াকে যেন ডেকে আনে তার সামনে।
"আমি ডাইকা আনতাছি মহুয়ারে। তবে তোমার লগে যাওয়া,তোমার ঘর করা এইটা সম্পূর্ণ তার মর্জি। আমার কিছুই না।"
হালিমা গিয়ে মেয়েকে বললো,
"দুপুর হই যাইতাছে। পরে দুপুরের ভাত খাওয়ানো লাগবো হ্যারে। বুলবুলিরে না দেখলে যাইবো না কইলো। গিয়া কথা বইলা বিদায় কর মা। যতসব আপদ! মরা!"
অসহনীয় গলায় বলল হালিমা।
মহুয়া নিরুপায় হয়ে মায়ের কথায় ঘরের ভিতরে এলো। নয়তো তার ইচ্ছে ছিলো দেখা দিবে না। তার মেয়েকেও ছুঁতে দিবে না আমান নামের অ-মানুষটাকে।
"কেমন আছো মহুয়া?"
মহুয়াকে দেখেই নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো আমান। বুলবুলিকে জোর করে মহুয়ার কোল হতে নিজের কোলে নিয়ে নিলো। অচেনা মানুষের স্পর্শ পেয়ে বুলবুলি কেঁদে উঠলো। মহুয়া ফের বুলবুলিকে নিজের কোলে নিয়ে নিলো। বুলবুলির কান্না বন্ধ হয়ে গেলো। মায়ের গলা পেঁচিয়ে চুপটি করে রইলো পরম নির্ভরতায়।
মহুয়ার কণ্ঠ চড়ায় গেল না। শান্ত গলায় বললো,
"আমি কেমন আছি তা জেনে আপনার কাজ নেই। আপনার মুখে মহুয়া নাম শুনতে বাজে লাগছে। কেন এসেছেন বলে বিদায় হউন।"
মহুয়ার পরিবর্তিত নির্দয় আচরণে আমান হতাশ হলো। সে নরম গলায় অপরাধীর মতো করে বললো,
"আমি, তুমি থেকে আপনি হয়ে গেলাম?"
"আমি দূরের মানুষদের সবসময় আপনি বলি।"
দৃষ্টি মাটিতে রেখে বললো মহুয়া।
আমি তোমাকে ও বুলবুলিকে নিতে এসেছি। মা বললো নিয়ে যেতে।"
"আমি যাব না। আপনি আসতে পারেন।"
"রা গ করো না বলছি। বাবার সংসারে আস্তাকুঁড়ের মতো পড়ে থাকার চেয়ে স্বামীর ঘরে সম্মানের সাথে থাকা ভালো নয়?"
"সতীন নিয়ে ঘর করার মতো সম্মান আমি চাই না। আমি আমার ঠিকানায় ভালো আছি।"
"তুমি কী আর কোনদিন আমাদের বাড়ি যাবে না।"
"ধরে নিতে পারেন,নাহ।"
"এটাই তোমার ফাইনাল কথা?"
"হ্যাঁ।"
"ভুল করছো কিন্তু মহুয়া। বিরাট ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছো। তোমার, বুলবুলির সব কিছুই তো ঠিক থাকবে। সমস্যা কোথায়? আমিতো মায়ের মন রাখার জন্য রাজী হয়েছি। মন থেকে না।"
"যদি তাই হয়,তাহলে আমার চোখে আপনি একজন মেরুদণ্ডহীন পুরুষ। যে কি-না নিজের লাইফের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে না। নিজের স্ত্রীর অধিকার ঠিক রাখতে পারে না। সুতরাং আপনার মতো মেরুদণ্ডহীন মানুষের লাইফে আমি থাকতে রাজী নই। কারণ আমার মেরুদণ্ড আছে।"
এভাবে ঘন্টাব্যাপী পালটা যুক্তিতর্ক চললো আমান ও মহুয়ার মাঝে। আমান পরাজিত সৈনিকের মতো ক্ষিপ্ত মেজাজে মহুয়াদের ঘর ও বাড়ির প্রাঙ্গন ত্যাগ করলো।
মহুয়া ফোঁস করে তপ্ত স্বাস ছাড়লো। মায়ের কাছে গেলো বুলবুলিকে কোলে নিয়ে। বললো,
"আরেহ মা, সে আমাকে যতটুকু মায়া দেখিয়ে নিতে চাইলো,তার চেয়ে বেশী হলো অন্য কারণ। ভাবছে বুঝতে পারবো না তার মায়ের চালাকি। তার মা আমাকে নিয়ে যেতে বলছে,এটা সত্যি। আমাকে কখনো ছাড়বে না সে, তা মায়ের কথায় হোক বা তারও মায়া থেকে হোক,এটাও সত্যি।
আমি যদি বিয়েতে উপস্থিত থাকি, তখন সবাই ধরে নিবে আমার ইচ্ছেতেই পুত্র সন্তানের জন্য সে দ্বিতীয় বিয়ে করতে যাচ্ছে। এবং তারাও সেটাই সবার কাছে প্রকাশ করবে আমার অগোচরে। কিন্তু আমি তা কিছুতেই হতে দিব না। খেলা দেখাবো এদের। এই রকম খাটাইশ,অবিবেচক,পাষাণ মানুষদের কঠিন সাজা দিতে হয়।"
হালিমা আক্ষেপের সুরে বললো,
"হাঁচাই কইছত মা। এইটাই আসল কাহিনী। বিয়ার দিন তুই হেগো ঘরে থাকলে সবকিছু সহজ হইয়া যাইবো হ্যাগো লাইগা। কারো প্রশ্নের মুখে পড়বো না। এখন ত খাইবো মাইনকার চিপা।"
মহুয়া বাঁকা হাসলো আমানকে নিয়ে।বললো,
"তবে আর বলি কী মা, বিয়ের বিষয় না হলে সে এখন আসতোই না আমাদের বাড়ি। আমিও মাঠে নেমে পড়লাম।"
পরেরদিন মহুয়া দোকানে যায়। ম্যানেজার ফাহিম তার সাথে কোনো কথা বলছে না। মহুয়া বলল কথা। একই স্থানে কাজ করতে গেলে সহপাঠির সাথে কথা না বলে কাজ করা যায় না। কিছুক্ষণ পর দোকানে আসিফ চলে এলো। মহুয়ার ডিউটি শেষ হওয়া অবধিই সে থাকবে। যেন ফাহিমের সাথে মহুয়ার আর কোন আপত্তিকর ঝামেলা না হয়। তাই। মহুয়া চলে গেলো ডিউটি শেষে। আসিফও তখন বেরিয়ে গেলো।
মহুয়াকে ফোন দিলো। জিজ্ঞেস করলো,
"সারাক্ষণ তোমাকে বিমর্ষ লেগেছে। কোন কথাও বলনি। তুমি কী চাকরি ছেড়ে দিতে চাচ্ছো?"
মহুয়া নমনীয় গলায় বললো,
"এমন কিছুই না ভাইয়া। ভিন্ন বিষয়।"
"কী বলো। আমি তোমার এক ধরনের অভিভাবক। বলো?"
আসিফের জোরাজোরিতে মহুয়া বললো,
"প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা কতটা যৌক্তিক? এটা জানা খুব দরকার আমার।"
"ওকেহ। আমার পরিচিত ল.ইয়ার আছে। জেনেই জানাচ্ছি তোমাকে।"
রাতে আসিফ ফোন দিলো মহুয়াকে। বললো,
"খবর নিয়েছি। প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা আইনত অবৈধ এবং ফৌজদারি অপরাধ। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এর ৬ ধারা অনুযায়ী এই রুলস।
প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা এবং তার ভরণপোষণ না দেওয়া একটি ফৌজদারি অপরাধ। এবং ইসলামিক আইন অনুযায়ী, একজন পুরুষ চারটি বিয়ে করতে পারে। তবে শর্ত হলো তাকে সকল স্ত্রীর প্রতি সমানভাবে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যদি কোনো পুরুষ এই সমতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে দ্বিতীয় বিয়ে করা তার জন্য জায়েজ নয়।"
মহুয়া আসিফকে কৃতজ্ঞতার সাথে অশেষ ধন্যবাদ জানালো। আসিফ মোবাইল রেখে দিলো। অতিরিক্ত কোন কথা বলল না মহুয়ার সাথে। সে আগেই বুঝতে পেরেছে, বিষয়টা মহুয়ার। অন্য কারো হলে সে ব্যস্ততার মাঝে ফোন করে করে এত তথ্য রেডি করতো না।
তারপরের দিন মহুয়া আমানদের নিকটবর্তী থানায় চলে গেলো দোকানে যাওয়ার আগে। সবকিছু জানালো। এবং বললো পরে আসবে মামলা করতে।
হেমন্তের এক মধ্য দুপুর। আমানদের সারা উঠানজুড়ে ছড়িয়ে আছে মিঠে রোদ্দুরের কোমলতা। আমান মাত্রই বউ নিয়ে বাড়িতে এসেছে। ঘরোয়া আয়োজনে সম্পন্ন হলো তার দ্বিতীয় বিয়ে। বরবেশে সে খোশ মেজাজে আছে। নতুন ফুল। নতুন সুবাস। আহা! মধু! মধু!
এমন সময় দু'জন পুলিশ আমানদের ঘরের উঠানে হাজির হলো। উপস্থিত সবাই ভড়কে গেলো। আমান পালিয়ে যেতে চাইলো। পারলো না। তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিলো একজন পুলিশ।
আমান অদ্ভুত চোখে পুলিশকে জিজ্ঞেস করলো,
"কী ব্যাপার? কোন অপরাধে আমাকে এরেস্ট করলেন?"
#মহুয়ার_রাতদিন.৮ ✍️ #রেহানা_পুতুল
আমান অদ্ভুত চোখে পুলিশকে জিজ্ঞেস করলো,
"কী ব্যাপার? কোন অপরাধে আমাকে এরেস্ট করলেন?"
"প্রথম স্ত্রী জীবিত। কিন্তু তার অনুমতি না নিয়ে কোন কারণ ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এটা ফৌজদারি অপরাধ। তাই থানায় আপনার নামে মামলা হয়েছে। চলুন।"
"কে দিলো আমার নামে মামলা?"
বিচলিত কণ্ঠে জানতে চাইলো আমান।
"যে দেওয়ার সেই দিয়েছে। চলুন।"
আমান বিষিয়ে আসা কণ্ঠে মহুয়ার উদ্দেশ্যে গোপনে বললো,
" ছাড়া পাই আগে। পরে তোর বিষ বাইর করবো।"
আমানের মা তফুরা কান্না জুড়ে দিলো।
পুলিশকে কাকুতি মিনতি করে বললো,
"আপনাগো আল্লার দোহাই লাগে,আমার পোলারে ছাইড়া দ্যান। ওর দোষ নাই। আমিই ওরে ইন্ধন দিছি আবার বিয়া করনের লাইগা। যেহেতু পহেলা ঘরে শুধু মাইয়াই হইতাছে।"
"আপনি মুরুব্বি বলে আপাতত বেঁচে গেলেন। নয়তো ছেলের সাথে আপনার হাতেও হাতকড়া পরাতাম। ঘর সামলান। আপনার ছেলে বছর খানেক ঘুরে আসুক। ধরে নিবেন এতোদিনের মতো এখনো সে দেশের বাইরে আছে।"
আমান বরের বেশ চেঞ্জ করার অনুমতি চাইলো। পুলিশ দিল না। অন্যদের বললো,
"উনার কাপড় চোপড় নিয়ে কেউ থানায় আসুন। সেখানে চেঞ্জ করার অনেক জায়গা আছে।"
তফুরা উঠানের মাটিতে বসে আছাড়িপিছাড়ি করে কাঁদতে লাগলো।অন্যরা হায় হুতাশ শুরু করলো তাকে শান্তনা দিতে দিতে। কেউ কেউ মহুয়ার পক্ষ নিয়ে মনে মনে বললো,
"বেশ হইছে। মা,ছেলের শিক্ষা হওনের দরকার আছিলো। কত ভালো ছিলো আমানের বউ। নাহ, এর নাতি চাই নাতি। এতে বউর কী দোষরে মুরুক্ষ বেটি? তোর ছেলে তার প্যাটে যেইটা দিবো সেইটাই ত বাইর হইবো। কিন্তু আমানের বউর এত বড় দুঃসাহস ক্যামনে হইলো?"
সময়, পরিবেশ,পরিস্থিতি মানুষকে বদলে দেয়। সাহসী করে তোলে। একা বাঁচতে শেখায়। আত্মবিশ্বাসী ও পরিশ্রমী করে তোলে। যেমনটি হয়েছে মহুয়ার ক্ষেত্রে।
মহুয়ার আপন ফুফাতো বোন নববধূ শিউলির বিয়ের আনন্দ ধূলায় মিশে গেলো নিমিষেই। ঘোমটা পরিহিত অবস্থায় সে বিষন্নমনে বসে আছে। তার সাথে আসা চাচাতো ভাই বোনেরা চলে গেলো বাড়িতে। শিউলির বাবা মাকে বিষয়টা জানালো। শুনে আমানের পরিবারের মতো তারাও বিক্ষুব্ধ হলো মহুয়ার উপরে। পারেতো গেঁড়ে ফেলে মহুয়াকে।
শুক্রবার বলে মহুয়া বাড়িতেই ছিলো। ছোট ভাই মিরনও ছিলো বাড়িতে। মহুয়া মা ও ভাইয়ের পাশে গিয়ে বসলো। মিরন তার অস্পষ্ট ভাষায় বোনকে বললো,
"বেশ হইছে ধইরা নিছে। আমি সামনে পাইলে তারে কিল-ঘুষি মারতাম।"
হালিমা ভীরু কণ্ঠে মেয়েকে বললো,
"এবার কী হয় আল্লায় জানে। আমরা ওদের চাইতে নিরীহ মানুষ। তোর বাপ থাকলেও এক কথা আছিলো। আমার মনে কেমন জানি কু ডাকতাছে। তোর যেই জল্লাদ হড়ি। পানিতে ফালাতা বোবা মাছুম নাতনিরে যে মাইরা ফালাইতে পারে,তার পক্ষে সবই সম্ভব। আল্লাহ গো রহম করো। দয়া করো।"
"দূর মা। অযথা টেনশন করো না। কী করবো সে বা তারা আরেক গ্রামে থেকে? এক বাড়িতে বাস হলে তাও কথা ছিলো। আরো নিরীহ কেউ হলেও মামলা করার রাইটস আছে তার। আমি থানায় গিয়ে সব পুলিশদের বলেছি। তারা আমাকে আস্বস্ত করেছে। মিরন ত সবই শুনছে। নারে ভাই?"
মিরন মাথা ঝাঁকিয়ে বোনের কথার সম্মতি জানায়।
শনিবারে মহুয়া দোকানে যায়। আসিফ আসে তার পরে। দোকানে কর্তব্যরত থাকা অবস্থায় মহুয়া, মালিক আসিফ,ম্যানেজার ফাহিম কেউই কারো সাথে অহেতুক কথা বলে না। সবাই প্রফেশনালিজম বজায় রাখে। তার বাইরেও তারা কেউ কারো সাথে যোগাযোগ করে না। মহুয়াকে দুইদিন মোবাইলে আসিফ কল দিয়েছে। তাও প্রয়োজনেই। আসিফের নজর এড়ালো না মহুয়ার মলিন মুখের অভিব্যক্তি। মহুয়া দুপুর শেষে মহুয়া চলে যায় বাড়িতে। আসিফ একবার ভাবলো ফোন দিবে মহুয়াকে। পরে আর দিল না। দেওয়া ঠিক হবে না এই ভেবে।
বিকেলে মহুয়া মেয়েকে কোলে নিয়ে পাশের বাড়িতে গেলো। সেই ভাবি থেকে আমানদের ঘরের খবর নিলো। সেই ভাবি তাকে জানালো,
"আমাইন্না থানায় পইড়া আছে। মধুর বাসর, গাঙে ভাইসা গ্যাছে। হের মা জামিনের জন্য ছুটাছুটি করতাছে। বড় উকিল ধরছে। উকিলরে ঘুষ দেওনের লাইগা গয়না বন্ধক দিছে। তোর ফুফাতো বইন শিউলিমালারে নিয়া গ্যাছে তার চাচাতো ভাই আইসা। আর আসেনাই বেচারি।"
তারপর মহুয়া কিছুক্ষন গল্প করলো সেই ভাবির সাথে। ঘরের পিছনের সরু আড়া অতিক্রম করে চলে এলো নিজেদের বাড়ি। বাড়িতে এসে মা,ভাইকে জানালো সব। তারা শান্তি পেলো শুনে। হালিমা বললো,
"হ পোলায় জেলে থাউক। মা পোলারে ছুটানোর জন্য নাকানিচুবানি খাউক একবার।"
মিরন মিলে যায়। কাজ করে। মাস শেষে নামমাত্র হলেও মাইনে পায়। মহুয়ার চাকরিটাও মন্দ নয়। মাস শেষে নিয়মমাফিক বেতন পায়। ব্যস্ততায়,বেদনায় মোটামুটি ভালই দিন যাচ্ছে তাদের।
#গল্প দ্রুত পেতে #রেহানা_পুতুল পেইজে 👉follow ও like দিয়ে রাখবেন। পেইজ গ্রো না দেখলে হাত চলে না।🙋♀️✍️
তার সাতদিন পরের ঘটনা। হেমন্তের রাত্রির শেষভাগ। প্রকৃতি নিরব, নিস্তব্ধ! হালকা ঠান্ডার আমেজে সেও এলিয়ে পড়েছে রাত্রির গায়ে। ঝিঁঝি পোকার দল ডাকছে না। জোনাকিরা জ্বলছে না। বাতাস বইছে না। সারা আকাশে ছড়িয়ে আছে কালো মেঘের চাদর। নেই তারাদের আনাগোনা। ঘরের কোণের কুনো ব্যাঙটাও আজ ডাকছে না। শোনা যাচ্ছে না কুকুরের ডাক। কিংবা বিড়ালের মিহিস্বরে কান্না।
মহুয়াদের ঘরে সবাই গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। সবার গায়ে পাতলা কাঁথা জড়ানো। হঠাৎ বুলবুলি নড়ে উঠলো কান্না করে। মেয়ের জন্য উপর দিয়ে ঘুম হলেও ভিতরটা সারাক্ষনই সজাগ থাকে মহুয়ার। সে চোখ মেললো। বুলবুলির দিকে তাকাতেই নিজের গায়ে উষ্ণতা অনুভব করলো। মুহূর্তেই দেখলো আগুন জ্বলছে তার রুমের চারপাশের বেড়ার মধ্যে। মহুয়া আর্তচিৎকার দিয়ে উঠলো,
"মা...আগুন। আমার রুমে আগুন।"
হালিমার ঘুম ছুটে গেলো। চোখ মেলতেই দেখলো সারাঘরেই আগুন জ্বলছে। অসহায়ের মতো পাগল পাগল কণ্ঠে সে চিৎকার করে বললো,
"বাইর হইয়া যা মা,মাইয়া। হারাঘরেই আগুন।"
মিরন কাঁথামুড়ি দিয়ে আছে বিধায় টের পেল না আগুনের তাপ। মহুয়ার কোলে বুলবুলি,তাই সে চাইলেও ভয়ে মিরনের কাছে যেতে পারল না। উচ্চস্বরে ভাইকে ডাকলো,
"মিরনরে..। মিরন..।ভাই উঠানে আয়। আগুন ঘরে।"
মিরনের গায়ে খুব গরম লাগছে। সে ধড়মড়িয়ে উঠে গেলো। তার গায়ে আগুন জ্বলছে। ঘটনার আকস্মিকতায় মিরন হতভম্ব! নির্বাক! কোনদিকে যাবে তাও বুঝে উঠছে না। হালিমা ছুটে গেলো মিরনের চৌকির কাছে। ততক্ষনে হালিমার পরনের শাড়িতে আগুন ধরে গিয়েছে। সে শাড়ি খুলে ফেলে দিলো। মিরনকে ঝাপটে ধরে টেনে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন তিনি।
মহুয়া বাড়ির অন্যদের ডাকলো ভয়ার্ত চোখে কম্পিত গলায়। তারা এসে ঘরে আগুন নেভাতে পারলো না চেষ্টা করেও। তার পূর্বেই ঘর পূড়ে ছাঁই। দুই কামরার ছোট্ট দোচালা বেড়ার ঘরটি কয়েক মিনিটেই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলো।
হালিমাকে একটা কাপড় এনে এলো এক জা। মহুয়ার কোল থেকে বুলবুলিকে কোলে নিয়ে নিলো তার এক চাচাতো ভাই। মিরনের অবস্থা শোচনীয়। তাকে বাড়ির লোকজন মিলে ধরাধরি করে নিয়ে গেলো হাসপাতালের দিকে।
হালিমা ও মহুয়া বুক ফাটিয়ে আকূল স্বরে কান্না করছে। মিরনকে নিয়ে যাওয়া লোকদের পিছন পিছন গেলো মা,মেয়ে। নিশুতি রাতের আঁধার ঠেলে বিক্ষিপ্ত পায়ে প্রায় দৌডাচ্ছে তারা। আগুন কিভাবে লাগলো তা নিয়ে আপাতত তাদের ভাবান্তর নেই। মিরনকে বাঁচানোই মূল আরাধ্য। সহজ,সরল মিরন মায়ের প্রাণের ধন। বোনের পরান। মিরনকে হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করা হলো বাড়ির মানুষের সহযোগিতায়।
মহুয়াদের বাড়ির রাত্রির নিস্তব্ধ শেষ প্রহর মুখরিত হলো বহু মানুষের গুঞ্জনে। সবাই জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ ধারণা করলো ঘরের ভিতর মশার কয়েল,বা অন্যকিছু থেকে আগুন লেগেছে।
বিচক্ষণ দুই একজন বললো,
" মহুয়াদের সবাইকে মেরে ফেলার জন্যই সারা ঘরে কেউ আগুন জ্বালিয়ে দিলো নাতো? কিন্তু কে বা কারা করতে পারে এমন নৃশংস কর্মকাণ্ড!"
পাশ থেকে আরেকজন পুরুষ জ্ঞানগর্ভ সুরে বললো,
"ওদের এখন শত্রু আছে। এক তার ফুফুরা। আরেক তার জামাইরা। হয়তো এর বাইরে আরো কেউ আছে।"
চলবে...৮
বাকি পর্ব গুলা এই ওয়েবসাইটেই দেওয়া হয়েছে দেখেন?
