প্রহসনের_অভিনয় 

পর্ব: ০২+৩+৪

আফরিন_সুলতানা_আজু 


সদর দরজার দিক থেকে ভেসে আসা পরিচিত কণ্ঠ কানে আসতেই জিভান হঠাৎ করে মাথা ঘুরিয়ে পেছন তাকাল।


— "ভাই..!"


দরজার সামনে দাঁড়ানো ছেলেটা জিভানকে দেখে একেবারে থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিস্ময়ে তার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল, যেন সে কোনো স্বপ্ন দেখছে। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল, তারপর হঠাৎ করে হাতে থাকা সব জিনিস মাটিতে ফেলে দিয়ে দৌড়ে চলে গেল জিভানের কাছে।


এক মুহূর্ত দেরি না করে জিভানের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে । বহু বছর পর এই আলিঙ্গনে জিভানের বুকের ভেতর কেমন হাহাকার জেগে উঠল।


জিভান কিছুক্ষণের জন্য একদম স্থির হয়ে গেল। এতদিন পর ছোট ভাইকে এভাবে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে তার নিজের হাত কাঁপছে । সে ধীরে ধীরে ভাইয়ের পিঠে হাত রাখল। গলা ভারী হয়ে এলো, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। অস্পষ্ট স্বরে ঠোঁট কাঁপিয়ে ছোট্ট করে বলল,


—' রিদান..!'


ছেলেটা খুশিতে কান্না করে দিলো,এই কন্ঠে নিজের নাম গত পাঁচ বছর ধরে শুনেনি সে । আরো চেপে ধরলো তার ভাইকে।

— 'আমি ভেবেছিলাম... তুমি আর ফিরবে না, ভাই। ডক্টররা বলেছিলো তুমি নাকি কোমা থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারবে না ...আমিতো তোমাকে ক্ষণিকের জন্য হারিয়েই ফেলেছিলাম ভাই ।


কথাগুলো শুনে জিভানের বুকটা হাহাকার করে উঠল। চোখের কোণ ভিজে উঠল অজান্তেই। কাঁপা কণ্ঠে জিভান বলল,

— 'এখন তো ফিরে এসেছি , আর হারাবি না আমায় কথা দিলাম ।


—'হারাতেও দেবো না .....


এ কথা বলে রিদান আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে, যেন পৃথিবীর সবকিছু হারিয়ে গেলেও ভাইটিকে হারাতে দেবে না।

চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল, সবাই মায়া ভরা দৃষ্টিতে দুই ভাইকে দেখছে । কতদিন পর এই দুই ভাইকে একসাথে দেখলো তারা, অজান্তেই সবার চোখে পানি চলে এলো । লিয়ানা মুচকি হেসে হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছলেন। পেছনের মেয়েটাও দুই ভাইকে দেখে মৃদু হাসে।


বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কাটার পর রিদান ধীরে ধীরে তার ভাইয়ের কোল থেকে নামল। চোখের পানি হাতের পিঠ দিয়ে মুছে নিয়ে জিভানের কাঁধে হাত রাখল সে। ঠোঁটে এক মৃদু হাসি ফুটিয়ে নরম স্বরে বলল,


—'আজ আমার ভীষণ খুশি লাগছে ভাই… তুমি ফিরে এসেছো! আমাদের পরিবারে যে শূন্যতা এতদিন ধরে ছিল, আজ মনে হচ্ছে সেই শূন্যতা অবশেষে পূরণ হলো।'


জিভান কিছু বলল না চুপচাপ তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। পাঁচ বছর পর তাকে দেখে জিভানের বুকটা হঠাৎ গর্বে ভরে উঠল। আগের চেয়ে অনেক পরিণত দেখাচ্ছে রিদানকে। বেশ লম্বা হয়েছে, শরীরটাও বেশ গড়নশীল হয়েছে। আর ঠোঁটের কোণে সেই মৃদু হাসিটা,,যা তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।


রিদান একটু মুচকি হেসে আবার বলল,

—'এই খুশির দিনে তোমাকে একটা দারুণ সুখবর দিতে চাই, ভাই।'


ভ্রু কুঁচকে জিভান প্রশ্ন করল,

—'কিসের সুখবর, রিদ?'


রিদান একবার জিভানের দিকে তাকিয়ে, তারপর তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে চোখ ঘুরিয়ে নরম করে হেসে উঠল। সেই হাসির মধ্যে এক ধরনের লজ্জা আর আনন্দ মিলেমিশে ছিল তার।


—'তুমি ঘরে ঢুকেই আসলে সেই খবরটা আগেই দেখে ফেলেছো ভাই ,' রিদান হালকা হাসি দিয়ে বলল। 'তবুও আমি চাই, একজন ছোট ভাই হিসেবে এই সুখবরটা তোমাকে আমার মুখে শুনতে দিই।'


রিদানের কথা শুনে জিভানের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কৌতূহল জমতে লাগল। সে আড়চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আবার রিদানের দিকে দৃষ্টি ফেরাল। মুখের অভিব্যক্তি কিছুটা কঠিন হয়ে উঠল তার।


—'কি বলতে চাইছিস…?' জিভান ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করল।


রিদান তার ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে হেসে উত্তর দিল,

—'তুমি চাচ্চু হতে চলেছো, ভাই।'


বেস এইটুকুই যথেষ্ট ছিল জিভান কে কিছুক্ষণ আগের সেই রাগে জিভানে পরিবর্তন করতে । জিভান এক ঝটকায় রিদানের কলার চেপে ধরলো । 


জিভানের কণ্ঠ হঠাৎ করেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল, চোখে রাগের আগুন। গলা কাঁপতে কাঁপতে সে ফুঁসে উঠল,


—'এর মানে… তুই ওকে বিয়ে করেছিস?'


রিদান হকচকিয়ে গেল। ভাইয়ের কথাটা যেন কানে ঢুকতেই চাইছে না। কেঁপে কেঁপে বলল,

—'হে ক…কেন ভাইয়া? 


 জিভান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে কলারের চাপ আরও শক্ত করে গর্জে উঠল,

—'তোর সাহস হলো কি করে আমার বউকে বিয়ে করার! কে তোকে অনুমতি দিয়েছিল? কোন অধিকার নিয়ে তুই এমন কাজ করলি?'


রিদান হতবাক। ভাই যে পুরোপুরি ভুল বুঝছে সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারল সে। বুকের ভেতর ভয় আর অসহায়তা একসাথে জমে উঠল। ছটফট করতে করতে কাঁপা গলায় সে অনুনয় করল,

—'ভাই, তুমি ভুল ভাবছো! তুমি যেটা ভাবছো সেটা মোটেও ওরকম কিছু না। আমাকে শোনো, প্লিজ… আমি আসল ব্যাপারটা বলছি!'


কিন্তু জিভান কোনো কথা শুনতে চাইল না। দাঁত চেপে, রাগে কণ্ঠ কাঁপিয়ে বলল,

—'কি সেটা না?! তুই আমার বউকে বিয়ে করেছিস আমার অনুমতি ছাড়া! আমি তো ওকে এখনো তালাক দিইনি, আর তুই… তুই ওকে বিয়ে করে নিলি ! তোর বাচ্চার মাও পর্যন্ত বানিয়ে ফেললি!'


রিদান কান্না জড়ানো কণ্ঠে না বোধক মাথা নাড়ল, মরিয়া হয়ে চিৎকার করে বলল,

—'ভাই, তুমি যা ভাবছো সেটা সত্যি না!'


  লিয়ানা আর এভিন এগিয়ে এলো, পাশাপাশি তিসান জিভানের চাচাও এগিয়ে আসলো । তারা দুই ভাইকে আলাদা করার চেষ্টা করতে লাগলেন।

লিয়ানা কেঁদে কেঁদে বললেন,

—'জিভান, ছেড়ে দে ওকে! রিদানের কষ্ট হচ্ছে। !'


এভিনও দ্রুত এগিয়ে এসে অনুনয় করলেন,

—'জিভান, ওকে ছাড়ো! আমি বলছি, ছাড়ো ওকে । আসল সত্যিটা অন্য কিছু!'


কিন্তু জিভান কোনো কিছুই শুনল না। তার হাতের চাপ তখনও শক্ত।


রিদান মরিয়া হয়ে ছটফট করতে করতে শেষ শক্তিটুকু দিয়ে এক প্রকার চিৎকার করে উঠল,

—'ও তোমার বউ হলেইতো … তো তালাক দেবে, ভাই!'


.রিদানের শেষ কথাটা ঘরের ভেতর বাজের মতো আছড়ে পড়ল। মুহূর্তেই চারপাশের সবকিছু থেমে গেল। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই।শুধু রিদানের হাঁপানোর শব্দ আর সবার ভারী শ্বাসের আওয়াজ কানে আসছে।


জিভানের হাত ধীরে ধীরে রিদানের কলার থেকে সরে গেল। তার চোখের রাগের আগুন নিভে গিয়ে সেখানে জমল এক অজানা শূন্যতা। ঠোঁট কাঁপছে, গলা শুকিয়ে গেছে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে অবশেষে সে ফিসফিস করে কৌতুহল নিয়ে বলল,

—'কি… কি বললি তুই?'


রিদান কষ্টে ভেজা কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলল,

—'ভাই, তুমি যা ভাবছো… আসলে ব্যাপারটা মোটেও সেটা নয়।'


জিভানের দৃষ্টি কঠিন হয়ে উঠল। শান্ত কণ্ঠে, কিন্তু ভেতরে আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলতে জ্বলতে সে বলল,

—'তাহলে সত্যিটা বল। সব পরিষ্কার করে বল।'


রিদান এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। বুকের ভেতরে জমে থাকা যন্ত্রণা আর কান্না তাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সে ধীরে ধীরে বলল,

—'যে মেয়েটাকে তুমি তোমার বউ ভাবছো… সে আসলে রোজা না, ভাই। সে হচ্ছে রোজার জমজ বোন, লারা।'


জিভান প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। তার চোখে একরাশ অবিশ্বাস ভেসে উঠল।

—'কিহহ ওর ..ওর জমজ বোন আছে ??

রিদানের চোখে পানি এসে গেল। কষ্টের গলায় সে বলতে লাগল,

—' হে ভাই সেটা তো তুমি জানতে না আর না জানতে চেয়েছিলে ...

"একটু থেমে ".........পাচঁ বছর আগে তোমার বিয়ের পর ঘটে যাওয়া সেই বিস্ফোরণের পরে… তুমি যখন কোমায় চলে গেলে, আমরা সবাই ভেবেছিলাম তোমাকে হয়তো আর কখনও ফিরে পাব না। তখন রোজা ভাবি একেবারে একা হয়ে পড়ে এই বাড়িতে আমাদের কারোর সাথে ভালো কথাও পর্যন্ত বলে নি সে "করণ ভাবি মনে করে তার জন্যই তোমার এই করুণ পরিণতি " সবসময় নিজেকে দোষারোপ করতো । আমরা বুঝাতাম কিন্তু ভাবি বুঝতেই চাই ছিলো না ,এরপর নিজের বাপের বাড়ি চলে যায় ।'


সে একবার কেঁপে ওঠা কণ্ঠে থামল, তারপর আবার বলল,

—'তারপর হঠাৎ এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় রোজা ভাবির মা-বাবাও মারা যায়। মুহূর্তেই রোজা ভাবি আর লারা দুজনে নিঃস্ব হয়ে যায়। পুরো পৃথিবীতে তারা কাউকে আর পাশে পায়নি।'


জিভানের বাবা-মা, লিয়ানা আর এভিন, তখন চোখের পানি মুছতে মুছতে এগিয়ে এলেন। লিয়ানা কাঁপা গলায় বললেন,

—'তখন আমরা রোজা আর লারাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসি। আমরা ভেবেছিলাম এভাবে অন্তত ওরা নিরাপদে থাকবে, আর পরিবারের অংশ হিসেবে বাঁচতে পারবে । আর রোজা মা তো এই পরিবারের এক অংশ হয়ে আছে ।'


এভিন ভাঙা কণ্ঠে যোগ করলেন,

—'কিন্তু গত কয়েকটা বছরেও রোজা মা আমাদের সাথে কোনো কিছু শেয়ার করতো না আমাদের সাথে কোনো কথাও বলতো না ,এই বাড়ির অংশ হয়েও সে যেন এই বাড়ির কেউ নয় এমন করতো । কিন্তু লারা...ও সবসময় আমাদের সাথে খুব মিশুক ছিলো ,কখনো আমরা তাকে পর মনে করি নি। এরি মাঝে রিদান লারা কে ভালোবাসে ফেলে । আমাদের ও এতে কোনো আপত্তি ছিল না,,পরে আমরা রিদানের সঙ্গে ওর বিয়ে দিই।'


জিভান হাঁ করে শুনছিল সবকিছু। তার চোখে অশ্রু জমে উঠেছে।


রিদান কেঁদে কেঁদে ভাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,

—'ভাই, আমি কখনোই তোমার জায়গা নিতে চাইনি। আর নিও নি । তোমার জায়গা তোমার বউ , সবকিছুই ঠিক আছে । 


জিভান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর এতক্ষণের জমে থাকা রাগ মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে তীব্র শূন্যতায় পরিণত হলো। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না।


সে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,

—'মানে… আমি যাকে এতক্ষন যাবৎ রোজা ভেবেছিলাম… সে আসলে লারা?'


লিয়ানা কেঁদে কেঁদে মাথা নাড়লেন,

—'হ্যাঁ জিভান… তুমি ভুল বুঝেছো। লারা তোমার বউ নয়।'


জিভানের পা কাঁপতে লাগল। সে এক কদম পিছিয়ে মাটিতে বসে পড়ল, মাথা দু’হাতে চেপে ধরে।


—'আমি… আমি আমার নিজের ভাইকে… এত বড় মিথ্যা অন্যায়ের জন্য দোষারোপ করলাম… অথচ আসল সত্যিটাও জানতাম না…'


রিদান কাঁদতে কাঁদতে ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল,

—'ভাই, তুমি কিছু ভুল করোনি। তুমি তো শুধু ভাবি কেই চেয়েছিলে ।আমরা সবাই একসাথে আছি ,, তোমার বউ তোমার কাছেই আছে এটাই সবচেয়ে বড় সত্যি।'


জিভান চুপচাপ তাকিয়ে রইলো ছোট ভাইয়ের দিকে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে মোচড় দিচ্ছে। নিজের উপরেই রাগে-ক্ষোভে জ্বলছে সে। এত্ত বড় ভুল কিভাবে হলো তার! মা-বাবার সামনে যা খুশি তাই বলে ফেলেছে… এমনকি নিজের ছোট ভাইকেও ছেড়ে দেয়নি। এখন এসব ভাবতেই বুকটা হুহু করে উঠছে।


মাথা নিচু করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল জিভান। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর হঠাৎ মাথা তুলে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,


— 'রোজা কোথায়, রিদ?'


রিদান চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুছে নিল। গলাটা কাঁপছিলো সামান্য।


— 'জানি না ভাই… হয়তো ভার্সিটিতে, নয়তো ..নয়তো অন্য কোথাও।


পাশ থেকে লিয়ানা ধীরে ধীরে বললেন,


— 'রোজা মা আমাদের কিছু বলে যায় না, কোথায় যায় বা কখন আসে,কেউই জানি না।'


জিভান আর স্থির থাকতে পারল না। তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল,


— 'আমি যাবো ওর কাছে…'


রিদান সঙ্গে সঙ্গে হাত ধরে থামিয়ে দিলো,


— 'না ভাইয়া! তুমি এই অবস্থায় কোথাও যাবে না। ভাবি এমনিতেই রাত আটটার পরে ফিরে আসে। এখন তো মাত্র সাতটা পনেরো বাজে। তুমি বরং একটু বিশ্রাম নাও।'


— 'কিন্তু আমি… আমি দেখা করতে চাই, রিদ।'জিভানের কণ্ঠে অসহায়তা স্পষ্ট।


রিদান নরম সুরে বলল,


— "রাতেই দেখা করতে পারবে। এখন আমার সাথে চলো। অবস্থা দেখেছো নিজের? আগে বিশ্রাম নাও।'


জিভান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।


— '… মম ভাইয়া আর আমার খাবার উপরে পাঠিয়ে দিও।'


— 'আচ্ছা, ,' লিয়ানা সায় দিয়ে উত্তর দিলো।


চলবে..


আজকে বড়সড় করে দিলাম ..😒🔪,,এখন কেউ ছোট বললে আর লিখবো না 

.প্রহসনের_অভিনয় ৩

আফরিন_সুলতানা_আজু 


নিউ ইয়র্ক সিটির রাত।


______ডিজিটাল ঘড়ির লাল আলো জ্বলজ্বল করছে—৯:০০।

আকাশে তারা দেখা যায় না, কেবল শহরের আলোকোজ্জ্বলতা চারপাশ ঢেকে রেখেছে। রাস্তার দুই পাশে আকাশছোঁয়া অট্টালিকাগুলো যেন নির্লজ্জভাবে মানুষের ব্যস্ততা দেখছে,আর তাদের জানালার আলো নিচের অন্ধকারে অদ্ভুত নীরব সঙ্গীত ছড়িয়ে দিচ্ছে।

রাস্তা জমে আছে ভয়ানক যানজটে।হাজারো গাড়ির লাল আর সাদা আলো একে অপরের সাথে মিশেরাস্তার মাঝে তৈরি করেছে অদ্ভুত এক রঙিন বিশৃঙ্খলা।হর্নের কর্কশ শব্দে কানে তালা লেগে যাওয়ার উপক্রম। কেউ বিরক্ত হয়ে গাড়ির জানালার বাইরে মাথা বের করে চিৎকার করছে,

কেউবা অস্থিরভাবে স্টিয়ারিং চেপে বসে আছে।


এই হুল্লোড়, এই কোলাহলের মাঝখান দিয়ে হাঁটছে রোজা। নিঃশব্দে,ধীর, ক্লান্ত পায়ে। যেন শহরের এই বিশৃঙ্খলার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

সে এখানে আছে,,কিন্তু তবুও নেই।


তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই,চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে শূন্য।চোখের কোণে অদৃশ্য অশ্রু জমে আছে,যা শহরের ঝলমলে আলোতেও ধরা পড়ে না।তার পা চলছে, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে সেটা সে নিজেও জানে না।

হয়তো গন্তব্যহীন এক যাত্রা…

হয়তো হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচার এক মরিয়া চেষ্টা।


হাজার মানুষের ভিড়ের মাঝেও সে অদ্ভুতভাবে একা।কেউ পাশ দিয়ে চলে যায়,কেউ হয়তো এক সেকেন্ডের জন্য তাকায়,কিন্তু কেউ থেমে দাঁড়ায় না।

কারো চোখে কৌতূহল নেই,কারো কণ্ঠে সান্ত্বনা নেই।এই ব্যস্ত শহরে দুঃখের কোনো মূল্য নেই,,।

এখানে কেবল সময়ের দৌড়,মানুষের স্বার্থ, আর অন্ধকার প্রতিযোগিতা।


এক মুহূর্তের জন্য রোজা থেমে দাঁড়ায়।লাল সিগন্যালের নিচে গাড়ির লাইন জমে আছে।বিলবোর্ডের রঙিন আলো তার মুখে পড়ছে,কিন্তু সে সেই আলোতে কোনো উষ্ণতা খুঁজে পায় না।শীতল বাতাসের মতো, তার বুকের ভেতরটাও ফাঁকা।যেন ভেতরে ভেতরে সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।


ঠিক তখনই,তার সামনে ভেসে ওঠে একটি মুখ জিভানের।

একটি হাসি...

একটি স্মৃতি…


যে হাসি এক মূহুর্তের জন্য তার পৃথিবী হয়েছিল।যে মানুষটা তার বুকে আশ্রয় ছিল কিছু সময়ের জন্য।সেই মানুষটিকে…এক নিমিষেই সে হারিয়েছে। অপ্রত্যাশিত, নির্মম এক বিস্ফোরণে।


রোজার নিঃশ্বাস আটকে আসে।তার হৃদপিণ্ড হঠাৎ করেই দ্রুত স্পন্দিত হয়।সেই মুখের স্মৃতিই যেন তাকে সামনে ঠেলে দেয়।তার পা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে শুরু করে,সে জানে না কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে।


কিন্তু তার মনের গভীরে কোথাও,অচেতনভাবে একটি গন্তব্য ঠিক হয়ে আছে।যেন কারও অদৃশ্য হাত তাকে পথ দেখাচ্ছে। সে হাঁটছে…রাস্তা পেরিয়ে, গলি পেরিয়ে,শহরের আলো পিছনে ফেলে।


আর শেষমেশ, বার্ন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়।


সেই বাড়ি… যেখান থেকে তার সব হারানোর শুরু।যে বাড়ির প্রতিটি দেয়াল জানে তার কান্নার শব্দ, তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ।


নিঃশব্দে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সেই বড় অট্টালিকা বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলো ।


লিয়ানা সবে টেবিল থেকে উঠে নিজের রুমে যাচ্ছিলেন হঠাৎ কারোর ধীর পায়ে হাঁটার শব্দ শুনে পিছনে তাকান । রোজা এসেছে , কিন্তু কেমন যেন খুব দূবল দেখাচ্ছে তাকে । লিয়ানা দেরি না করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন রোজার কাছে । 


রোজার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে অস্থির হয়ে বললেন,

—' রোজা মা তুমি কি ঠিক আছো এমন লাগছে কেন ?তোমার কি শরীর খারাপ মা?'


রোজা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না শান্ত ভঙ্গিতে জবাব দেয়,

—'জানি না ..

একটু থেমে ' মেইড কে দিয়ে খাবার পাঠিয়ে দিয়েন ...'


লিয়ানা কিছু বললেন না ।তিনি জানেন রোজা এমন কথায় বলবে । রোজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ । কেঁদেছে মেয়েটা। কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে তার ফর্সা মুখটা ,এর কারণ তার কাছে অজানা নয় । জিভানের জন্যই এই অবস্থা। তিনি মৃদু হেসে বলেন...' আচ্ছা ঠিক আছে তুমি গিয়ে ফ্রেশ হয় নাও । হয়তো এর পর তোমার এই মুখ খানা আর এমন থাকবে না 


লিয়ানার হঠাৎ এহেন কথায় অবাক হলো রোজা।তার কথার মর্ম বুঝে উঠতে পারলো না। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আগের নেয় নিজের কক্ষের দিকে পা বাড়ালো ।


পিছন থেকে লিয়ানা মৃদু হাসলেন এই ভেবে যে কাল সকালে রোজা আর আগের মতো থাকবে না।


রোজা রুমে ঢুকে একটি বারের জন্য ও বিশ্রাম নিলো না সোজা চলে গেল সাওয়ার নিতে । দরজাটাও লক করতে ভুলে গেছে সে ।


রোজা ওয়াশরুমে ঢুকতেই রুমে প্রবেশ করে জিভান । এতক্ষন যাবৎ রিদানের সাথে কথা বলছিলো ছাদে । একটু আগেও এসে দেখে গিয়েছিলো রোজা এসেছে কি না। এখন আবার আসলো । পুরো রুম পর্যবেক্ষণ করলো না রোজা তো আসেনি । এত দেরী করছে কেন সে ? কেন এত অপেক্ষা করাচ্ছে জিভানকে? কেন এই কয়েক মূহুর্তের কষ্ট দিচ্ছে তাকে ? 


জিভান দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে দেখতে লাগলো ।

 পরনে সাদা শার্ট আর কালো ট্রাউজার। চুলগুলো সামান্য এলোমেলো, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। নিজের প্রতিচ্ছবি দেখেই হালকা এক তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো জিভানের ঠোঁটে।


—'এ কেমন দেখাচ্ছি আমি?'

নিজের প্রতিচ্ছবিকে যেন প্রশ্ন করলো সে।


অপরিচিত, অথচ খুব পরিচিত লাগছে নিজেরই চোখের সেই অস্থির দৃষ্টি। 

রোজাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা… আর তাকে হারানোর ভয় দুটো মিলে তার ভেতরকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।


জিভান কিছুক্ষণ ড্রেসিং টেবিলের সামনে স্থির দাঁড়িয়ে রইল।

আয়নার কাছে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে আছে সে। হালকা ভেজা চুলগুলো কপালের সাথে লেগে আছে, । ধীরে ধীরে টেবিলের উপর থেকে একটি চিরুনি তুলে নিল। চুল আঁচড়ানোর চেষ্টা করতেই হাত হঠাৎ কেঁপে উঠল, আর সেই চিরুনিটা টং শব্দে মেঝেতে পড়ে গেল।


গভীর নিঃশ্বাস ফেলে হাঁটু গেড়ে সেটি তুলতে নিচু হলো জিভান।

তার মন তখনো উত্তেজনা আর কৌতূহলে ভরা, শরীর কাঁপছে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে।


এদিকে, ওয়াশরুমের দরজাটা খুলে বের হলো রোজা । তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুলগুলো মুছতে লাগলো গায়ে একটা সাদা তোয়ালে জড়ানো।

চুলের ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে তার কাঁধ ভিজে গেছে, আর তার ফর্সা গা বিন্দু বিন্দু পানিতে উজ্জ্বল করছে ।


হঠাৎ তার চোখ থেমে গেল আয়নার কাছে।সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে আছে এক অচেনা পুরুষ, মাথা নিচু করে কি যেন খুঁজছে।


রোজার নিঃশ্বাস মুহূর্তেই আটকে গেল।বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়তে লাগল অস্বাভাবিকভাবে।ভয় যেন তার সারা শরীরকে গ্রাস করে নিল।


ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে এক পা… দুই পা… সে এগিয়ে যেতে লাগল।

প্রতিটি পদক্ষেপে তার কাঁপা নিঃশ্বাস যেন গলা আটকে দিচ্ছে।


মনের ভেতর আতঙ্কের সাথে সাথে অস্থির কণ্ঠে প্রশ্ন জাগল,

—'কে এই লোক? আমার রুমে কি করছে?

কোনো শত্রু নাকি… কি খুঁজতে এসেছে?'


তার চোখ চারপাশে ছুটে বেড়ালো।তারপর দৃষ্টি থামল ড্রেসিং টেবিলের পাশের কাঠের কোট র‍্যাকে ।সেখান থেকে নিঃশব্দে বের করে আনল ছোট্ট একটি বন্দুক।


এটা সবসময় তার কাছে থাকে। কিন্তু কেন ,সেটা পড়ে জানা যাবে ।


এখন তার হাত শক্ত হয়ে বন্দুকের চারপাশে শক্ত করে ধরা।

চোখে ভয়ের সাথে মিশে আছে সতর্কতা। সে বন্দুকের মুখ সোজা তাক করল অচেনা পুরুষটির দিকে।


অন্যদিকে, জিভান মেঝে থেকে চিরুনিটা পেয়ে নিয়ে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে যাচ্ছিল।

হঠাৎ মাথা সামান্য ঘুরাতেই তার দৃষ্টি গেল আয়নার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোজার দিকে।


রোজা তখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মুখে ভয় আর বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট।

তার হাতে বন্দুকএটা জিভান খেয়ালই করল না।


তার চোখে কেবল রোজা।দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সামনে দাঁড়ানো সেই মানুষ,

যার জন্য সে প্রতিটি মুহূর্তে বেঁচে ছিল।


হঠাৎ বুকের ভেতর থমকে গেল জিভানের নিঃশ্বাস।তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক কোমল, গভীর হাসি ফুটে উঠল।


সে রোজার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল নিঃশব্দে,অজানা সেই মুহূর্তের সৌন্দর্যে হারিয়ে গিয়ে।


রোজা হঠাৎ তার মুখটা স্পষ্ট দেখল।মুহূর্তেই তার শরীর জমে গেল স্থবিরতার মধ্যে।তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। হাতের বন্দুক চট করে পিছনে লুকিয়ে ফেলল সে, যেন সেটা আদৌ ছিল না।


তার বুকের ভেতর কাঁপতে থাকা হৃদপিণ্ডের শব্দ পর্যন্ত যেন কানে শোনা যাচ্ছিল।


—'জি… জিভান!'

কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে উচ্চারণ করল সে।


সে একটুও খেয়াল করল না যে রোজার হাতে কিছু ছিল।

তার চোখে কেবল রোজা ।তার বহু প্রতীক্ষার স্বপ্ন, তার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা।


রোজা তখনো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,তার বুকের ভেতর ভয় আর অশ্রু মিশে অদ্ভুত এক অনুভূতি তৈরি করছে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না

যাকে সে হারিয়ে ফেলেছে ভেবে কেঁদে কেঁদে শেষ হয়ে গিয়েছিল,

সে-ই এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।


চলবে...প্রহসনের_অভিনয় 

পর্ব_৪

আফরিন_সুলতানা_আজু 


রোজার বুকের ভেতর তখন তীব্র ঝড় বইছে।তার চোখে পানি জমে আছে, কিন্তু সে কাঁদতে পারছে না। মুহূর্তটি এত অবাস্তব, এত অপ্রত্যাশিত যে তার নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে।


জিভান ধীরে ধীরে উঠে তার দিকে এগিয়ে এলো।

এক পা... দুই পা... যেন প্রতিটি পদক্ষেপে তার সমস্ত অনুভূতি কেঁপে উঠছে।


তার কণ্ঠে ভাঙা স্বর, তবু অদ্ভুত দৃঢ়তা,,

—'রোজা.....

একটি নাম।মাত্র একটি নাম উচ্চারণ করতেই যেন পুরো পৃথিবী কেঁপে উঠলো রোজার ভেতরে।


রোজা স্থির দাঁড়িয়ে আছে, তার হাত কাঁপছে।একদিকে বন্দুকের ভয়, অন্যদিকে অজানা বিস্ময়।সে চোখ নামাতে পারছে না জিভানের দিক থেকে।

তার ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে অবশেষে কিছু শব্দ বের হলো,

—'না... এটা সত্যি না... এটা নিশ্চিয় আমার হ্যালুসিনেশন হ্যাঁ এ..এটা সত্যি না...


জিভানের ঠোঁটে হালকা ব্যথার হাসি ফুটলো।

চোখ দুটো গভীর অন্ধকারে মোড়ানো, কিন্তু তার ভেতর এক অদ্ভুত উষ্ণতা লুকানো।

সে রোজার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,

—'এটা হ্যালুসিনেশন নয় রোজা ....এটা সত্যি..


রোজা হঠাৎ এক পা পিছিয়ে গেল।তার ঠোঁট কাঁপছে, বুক ধকধক করছে।

তার মাথার ভেতর অজস্র প্রশ্নের ঝড়,"সে তো একেবারেই কোমায় চলে গিয়েছিলো ,,কালকেই তো তাকে দেখে এসেছিল । কয় তখন তো একি অবস্থায় ছিল । হঠাৎ তার সামনে কিভাবে?


—'না! তুমি জিভান নও!

রোজার কণ্ঠ ফেটে গেল চিৎকারে।তার চোখ ভয়ে বড় হয়ে উঠলো।

—'তুমি... তুমি কে? আমাকে বলো! কে তুমি ?


জিভানের মুখে কষ্টের ছায়া ভেসে উঠলো।সে ধীরে ধীরে রোজার দিকে আরেক পা বাড়ালো।

—আমি-ই জিভান, রোজা। তোমার জিভান। তোমার তিন কবুল বলা হাসবেন্ড জিভান এ্যাশবার্ন।


রোজার বুকের ভেতর তখনো কাঁপছে ভয়, অস্থিরতা আর আনন্দের অদ্ভুত এক মিশ্রণ তৈরি হচ্ছে তার মাঝে।

রোজা খুশি হতে গিয়েও বারা বার থেমে যাচ্ছে। 

সে কাঁপা গলায় অস্পষ্ট স্বরে বলল,


—'কিভাবে ফিরে এলে তুমি ? আর কখনই বা আসলে কেউ আমায় বলে নি কেন ? আন্টি... আন্টি ও তো আমায় কিছু বলেনি ..


জিভানের ঠোঁটের কোণে হালকা একটুকরো হাসি খেলে গেল। রোজার কণ্ঠে কাঁপা উত্তেজনা, তার চোখের গভীরে জমে থাকা অশ্রুজল জিভানকে আরও নরম করে তুলল। সে ধীরে ধীরে আরেক পা সামনে এগিয়ে এলো।


— 'আমিই মানা করেছিলাম মমকে না বলতে… আর আমি তোমার আসার আগেই হসপিটাল থেকে ফিরে এসেছি,'

তার কণ্ঠে শান্ত ভরসা, যেন রোজার সমস্ত ভয়কে মুছে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাতে।


রোজার বুকটা হুহু করে উঠল। চোখের কোনা দিয়ে গড়িয়ে এলো উষ্ণ অশ্রু। কাঁপা কাঁপা হাতে পিছনে থাকা বন্দুকটা আলতো করে হাতে থাকা তোয়ালের ভাঁজে পেঁচিয়ে বেডের ওপরে রাখল। জিভান সেটা বুঝতে পারলো না ।তারপর ধীর পায়ে জিভানের দিকে এগিয়ে এলো।


তার কম্পিত হাত দুটো জিভানের মুখে রাখতেই জিভানের নিঃশ্বাস আটকে গেল। রোজা তার মুখের প্রতিটি রেখায় ভালোবাসা মেখে দিতে লাগল। মুহূর্তটাতে তার বুক ভরে উঠল এক অজানা তৃষ্ণায়, এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে। সে জিভানের মুখকে আগলে নিল, যেন তাকে আর কখনও হারাতে চায় না।


অত্যন্ত কষ্টে, কাঁপা কণ্ঠে সে বলল,

— 'তুমি… তুমি জানো না, জিভান… আমি কীভাবে বেঁচে ছিলাম তোমাকে ছাড়া। প্রতিটি রাত… প্রতিটি মুহূর্ত তোমার কথা ভেবে পুড়েছি আমি! ওই ব্লাস্টের পর ভেবেছিলাম তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি। ভেবেছিলাম… আমার সবকিছু শেষ।


তার গলায় শব্দ আটকে আসছে। কাঁদতে কাঁদতে সে জিভানের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।


— 'কিন্তু পরে যখন তোমার খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম, সবাই বলল তুমি কোমায় আছো। বিশ্বাস করো, জিভান, সেই মুহূর্তটা… সেই মুহূর্তটা আমার কাছে মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর ছিল।


জিভান গভীর শ্বাস নিল, তার বুকও ভারী হয়ে উঠছে রোজার কষ্টে। সে রোজার কাঁধ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট রোজার চুলের মধ্যে ডুবে গেল, গলার স্বর ভারী হয়ে এলো।


— 'আমি জানি, রোজা। আমি সব জানি। তোমার প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি কষ্ট… আমি অনুভব করেছি। তোমার কাছ থেকে দূরে থাকাটা আমার জন্যও ছিল সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার ।


জিভানের চোখ ভিজে উঠল।সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

 রোজাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।


রোজা প্রথমে অবাক হলো কিছুটা।তার বুকের ভেতর গুমোট এক শব্দে কেঁপে উঠল, তারপর সে জিভানের আলিঙ্গনে নিজেকে হারিয়ে ফেলল।তার হাত নিজের অজান্তেই জিভানের পিঠে জড়িয়ে ধরল।দুই ভাঙা আত্মা যেন আবার এক হয়ে গেল সেই মুহূর্তে।


রোজা কাঁদতে কাঁদতে বলল, 


—'আমি ভেবেছিলাম তোমাকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছি...!


জিভান তার কানে ফিসফিস করে বলল, —"না রোজা..এভাবে আর কেঁদো না..আমি প্রমিস করছি আর ছেড়ে যাবো না ।


—'তোমাই ছেড়ে যেতও দিবো না ...


বলে আরো শক্ত করে আকড়ে ধরলো জিভানকে।


রোজা জিভানের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। তার অশ্রু ভিজিয়ে দিচ্ছে জিভানের শার্ট। জিভান আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে নরম একটি চুমু খেল।


—'চুপ করো রোজা… আর কেঁদো না। আমি আছি তো তোমার সাথে। এখন আর কিছু আমাদের আলাদা করতে পারবে না।


রোজার বুক ধকধক করছে। কাঁপা হাতে সে জিভানের শার্টের কলার শক্ত করে ধরল, যেন তাকে ছেড়ে দিলে আবার হারিয়ে ফেলবে।


ধীরে ধীরে জিভান তার মুখ উপরে তুলল। চোখে চোখ রাখল রোজার।

দু’জনের নিঃশ্বাস মিশে গেল। চারপাশ যেন অদ্ভুত নীরবতায় ডুবে গেল।


রোজা কিছু বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু জিভান আঙুল দিয়ে তার ঠোঁটে আলতো চাপ দিল।

—'কিছু বলো না…....

সে ফিসফিস করে বলল।


তারপর জিভান ধীরে ধীরে রোজার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। মুহূর্তটি যেন স্থির হয়ে গেল সময়ের বুকে। রোজার চোখ বুজে এলো। সমস্ত ভয়, কষ্ট, শূন্যতা মিলিয়ে গেল সেই চুম্বনের গভীরতায়।


রোজা কাঁপতে কাঁপতে জিভানের ঘাড়ে হাত জড়িয়ে ধরল। জিভানও তাকে শক্ত করে নিজের বুকে টেনে নিলো। দু’জনের দেহের উষ্ণতা এক হয়ে গেল।


জিভান রোজাকে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে নিয়ে গেল। তার কণ্ঠে নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি,

—'আজ আর আমাদের মাঝে কোনো দূরত্ব থাকবে না রোজ… আজ আমি তোমাকে প্রমাণ করব … তুমি শুধু আমার।


রোজা কেবল জিভানের বুকে মুখ লুকিয়ে রইল।তার শরীর কাঁপছিলো, কিন্তু মনে হচ্ছিলো সে অবশেষে শান্তি ফিরে পেয়েছে তার ভালোবাসা কে ফিরে পেয়েছে।


ঘর ভরে গেল তাদের ভালোবাসার নিঃশ্বাসে, একে অপরের স্পর্শে এবং সেই গভীর মিলনে যেখানে দু’টি ভাঙা আত্মা আবার এক হয়ে গেলো। 


সকাল ৮:১৫ ...🎀


হালকা শীতল বাতাসে সাদা পাতলা পর্দাগুলো দুলছে।জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আসা সোনালি সূর্যের কোমল আলো ধীরে ধীরে ঘরটাকে ভরিয়ে তুলছে এক অদ্ভুত উষ্ণতা আর শান্তিতে।মৃদু হাওয়ায় পর্দার দোলন যেন এক প্রশান্ত সঙ্গীতের মতো বাজছে। রোজা ধীরে ধীরে চোখ মেলল।প্রথমে তার দৃষ্টি ঝাপসা ছিল, মাথাটাও কেমন জানি ভারী লাগছিল।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার দৃষ্টি পরিষ্কার হলো, এবং সে বুঝতে পারল আজকের সকালটা অন্যরকম।চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা, যেন পৃথিবীর কোলাহল তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। গত রাতের সমস্ত অস্থিরতা, ভয়, কষ্ট ,সব যেন এই উষ্ণ আলোর ভেতরে গলে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে।


এক মুহূর্তের জন্য রোজা বুঝতেই পারছিল না ....সে কি স্বপ্নে আছে, নাকি বাস্তবে?

তার বুকের ভেতর হঠাৎ কাঁপুনি উঠল।ধীরে ধীরে সে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল পাশে শোয়া মানুষটির দিকে।


তার দৃষ্টি পড়তেই নিঃশ্বাস আটকে এলো।

জিভান!


সে তার পাশেই শুয়ে আছে, এক হাত রোজার কোমর জড়িয়ে ধরে ।

তার মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি, যেন বছরের পর বছর পরে অবশেষে সে শান্তি খুঁজে পেয়েছে।

এলোমেলো কালো চুলের কিছু গোছা কপালের উপর এসে পড়েছে।

তার নিঃশ্বাস ধীর, গভীর ,,মনে হয় প্রতিটি নিঃশ্বাসে রোজার নামই উচ্চারিত হচ্ছে।

ঠোঁটের কোণে লেগে আছে হালকা, তৃপ্তির একটুকরো হাসি।


রোজার বুকটা হুহু করে উঠল।তার চোখে জল , কিন্তু সে হাসছে ।এমন এক হাসি যা শুধুই ভালোবাসার, যা শুধুই জিভানের জন্য।


সে কাঁপা কাঁপা হাতে আলতো করে জিভানের মুখের উপর থেকে এলোমেলো চুল সরিয়ে দিল। তার আঙুলের স্পর্শে জিভানের শরীর হালকা কেঁপে উঠে । কিন্তু সে চোখ মেলল না, যেন রোজার এই স্পর্শটুকু আরও কিছুক্ষণ উপভোগ করতে চায়।


রোজা তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ।তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল গত রাতের প্রতিটি মুহূর্ত। জিভানের উষ্ণ আলিঙ্গন…তার দৃঢ় বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা অজানা কষ্টগুলো…এবং সেই প্রতিশ্রুতির শব্দ, যা রোজাকে আবার বাঁচতে শিখিয়েছে।


জিভান আস্তে চোখ খুলল। তার গভীর, সমুদ্রের মতো দৃষ্টি রোজার চোখের সঙ্গে মিলিত হলো। 


সে আলতো করে রোজার গাল স্পর্শ করে, তার স্পর্শে রোজার শরীর কেঁপে উঠলো।


— 'তুমি ঘুমাওনি...


জিভান মৃদু হাসল, তার কণ্ঠে উষ্ণতা ভেসে উঠল,

— 'তোমার স্পর্শ অনুভব করছিলাম...


রোজা হালকা লাজুক হাসি হাসল। জিভান মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার প্রিয় রমণীর দিকে। কী সুন্দর তার সেই হাসিটা! গত পাঁচ বছর ধরে যা সে দেখতে পায়নি।


রোজা মিষ্টি হেসে বলল,

— 'যাও, ফ্রেশ হয়ে আসো। সবাই নিশ্চয়ই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।


জিভান দুষ্টু হেসে চোখ মারল,

— 'তুমিও এসো, একসাথে ফ্রেশ হয়ে আসি !


এ কথা শুনে রোজা বিরক্ত ভান করে বালিশ তুলে তাকে মারতে শুরু করল।

— 'যেতে বলেছি, যাও!


জিভান হালকা আঘাতে আউচ করে উঠল, কপট কষ্টের অভিনয় করে বলল,

— 'আহ্! যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি... এভাবে কেউ মারে নাকি? ব্যথা পেলাম তো!


রোজা চোখ রাঙিয়ে বলল,

— বেশ পেয়েছো! এবার যাবে তো না কি আরও মার খাবা?


জিভান বাধ্য ছেলের মতো মুখ বাঁকিয়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।


ওর চলে যেতেই রোজা দ্রুত বিছানার নিচে হাত বাড়িয়ে লুকানো বন্দুকটা বের করল। বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়ের গিঁটটা যেন একটু খুলে গেল। বন্দুকটা আবার নিজের জায়গায় রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে।


তার মনে একটাই আতঙ্ক ঘুরপাক খাচ্ছিল—

যদি জিভান বন্দুকটা দেখতো তো একের পর এক প্রশ্ন করতে শুরু করতো। আর এমন অস্থির সময়ে সঠিকভাবে কিছুই সে বুঝিয়ে বলতে পারত না তাকে।


_______________


রোজা জিভানকে নিয়ে ধীরে ধীরে সিরি বেয়ে নিচে নামচে। এতক্ষনে সবাই ডাইনিং টেবিলে বসে পড়েছে । মিস লিয়ানা টেবিলের উপর খাবারের প্লেট রাখতেই তার চোখ পড়লো রোজা আর জিভানের উপর । দুজনে একসাথে হাসি মুখে নিচে নামছে । 

এই দৃশ্য দেখে মিস লিয়ানার বুকটা কেঁপে উঠল। পাঁচ বছর পর রোজাকে এভাবে হাসতে দেখছেন তিনি। পাঁচ বছর পর নিজের ছেলেকে এভাবে নিশ্চিন্তে, সুস্থ মনে হাসতে দেখছেন তিনি। তার চোখ ভিজে এলো।


তার হৃদয় ভরে উঠলো এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। এক অজানা সুখের স্রোত বয়ে গেল তার ভেতর দিয়ে।

এভিন, তাসিন, জুহি, জিসা সবাই একসাথে তাকিয়ে আছে রোজা আর জিভানের দিকে। মুহূর্তটাকে যেন কেউ নীরবে বন্দী করে রাখতে চাচ্ছে।


রোজা আর জিভান টেবিলের কাছে এসে একসাথে বসল। রোজা ধীরে চোখ তুলে মিস লিয়ানার দিকে তাকালো। মিস লিয়ানা তার দিকেই তাকিয়ে আছেন, চোখে একরাশ স্নেহ আর ভালোবাসা। রোজা ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে তাকালেন তার দিকে। সেই হাসি যেন একটুকরো শান্তি ছড়িয়ে দিল টেবিলজুড়ে।


ঠিক সেই সময় হঠাৎ পেছন দিক থেকে রিদান দৌড়ে এসে ধপ করে জিভানের পাশে বসে পড়লো। তার পুরো শরীর ঘামে ভেজা, হাঁপাচ্ছে। জিভান তাকিয়েই বুঝতে পারলো ....নিশ্চয়ই এতক্ষণ মর্নিং ওয়াক করছিল সে।


রিদান একগাল হেসে উচ্ছ্বাসে বললো,

—'এত বছর পর আজ ভাইয়ের সাথে ব্রেকফাস্ট করবো... ইশ, কি মজা...!


তার কথা শুনে সবাই হেসে ফেললো।


লিয়ানা একটু ধমকের সুরে বললেন,

—'আগে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে যা!


রিদান মাথা নেড়ে দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে জবাব দিল,

—'আগে খেয়ে নিই, তারপর...


তার দুষ্টুমি ভরা জবাব শুনে টেবিলজুড়ে আবারও হাসির রোল উঠলো।

মুহূর্তটায় যেন পাঁচ বছরের সব অন্ধকার মিলিয়ে গিয়ে নতুন ভোরের আলো ফুটে উঠলো তাদের জীবনে। 


এভিন তখন কফিতে চুমুক দিয়ে লিয়ানা কে বললেন,

—'লারা কোথায় লিয়ানা?...


—'ওর শরীরটা বেশ খারাপ তাই আসেনি। আমি নাস্তা দিয়ে এসেছি ওর রুমে ।


এভিন মাথা নাড়ে ,

—'ভালো করেছো ....।


এরপর সবাই নাস্তা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।  


ব্রেকফাস্ট শেষে সবাই উঠে যায় । রোজা মিস লিয়ানা কে কাজে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলো । লিয়ানা বেশ অবাক হয়ে তার দিকে তাকায় । 

—' রোজা তোমাকে করতে হবে না ওরা আছে তো ...


—' তাতে কি হয়েছে ..? রোজা মৃদু হেসে উওর দিল।


লিয়ানা আর কিছু বলল না । তিনি তো এটাই চেয়েছিল যে রোজা আগের মতো হোক । সেই হাসি খুশি রোজা ..


অন্যদিকে.....এভিন,রিদান আর জিভান । তিন বাপ ছেলে সোফায় বসে । গল্প করতে শুরু করে । 


এভিন জিভানেন দিকে তাকিয়ে বলল,

—' তা জিভান এখন কি ভাবছো ..? আগের কাজে ফিরে যাবে নাকি পরিবারিক ব্যাবসা সামলাবে ..!


বাবার কথায় জিভান কোনো ভাবনা ছাড়াই উত্তর দিলো ।

—'আগেই যে কাজে ছিলাম সেই কাজেই ফিরে যাবো ,,রিদ তো এদিক টা সামলাচ্ছে ।


রিদান সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে জিভানের দিকে তাকাল। অবাক হয়ে হালকা চেঁচিয়ে বলল ।

— 'মানে তুমি আবার সেই ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টরের কাজে ফিরে যাবে? ভাইয়া, সেই কাজের কারণেই তো তোমার এত বড় ক্ষতি হয়েছিল। আমরা তো তোমাকে প্রায় হারিয়েই ফেলেছিলাম। তুমি কি সত্যিই আবার সেই জায়গায় ফিরতে চাও?


জিভান শান্তভাবে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে রিদানের দিকে তাকাল।

— রিদ, আমি জানি এটাতে ঝুঁকি আছে। কিন্তু এটাই আমার কাজ, আমার দায়িত্ব। আমি পালিয়ে থাকতে পারব না। চিন্তা কোরো না, আমি সাবধানে থাকব।"


রিদান মুখ নামিয়ে নিল, তার এতে কিছু বলার নেই । বললেও হয়তো কোনো কাজ হবে না । সে জানে তার ভাইকে । সে তার কাজে অটল।


পাশ থেকে রোজা সবটাই শুনছিলো । 


চলবে ...


পরের পর্বগুলা এই ওয়েবসাইটেই দেওয়া হয়েছে দেখেন,,,


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url