গল্প: #অতীত। শেষ পর্ব
বেসমেন্টের আলো জ্বলে ওঠার পর কয়েক সেকেন্ড কেউ নড়লো না,রাজ্যের নীরাবতা ভর করেছে...শুধু ভারী নি:শ্বাসের শব্ধ চারপাশে।
মিতুর মনে হয়—এই আলোটা যেন কাউকে বাঁচানোর জন্য না,সবকিছু ন-গ্ন করে দেওয়ার জন্য।
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মুখ এখন আর বদলাচ্ছে না।মুখটা স্থির হয়ে গেছে।
চেনা নয়।কিন্তু ভয়ানকভাবে আ*ত্মবিশ্বাসী।
মিতু খুব ধীরে প্রশ্ন করে—
— তাহলে… আপনি রাহিব নন?
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
— না— আমি কখনোই রাহিব ছিলাম না।
ঘরের এক কোণে, লোহার দরজার ভেতর থেকে আরেকটা কণ্ঠ—
— মিতু… আমি এখানে…
এই কণ্ঠে কোনো অভিনয় নেই।
এই কণ্ঠে আছে ভাঙা মানুষ।
মিতু চোখ বন্ধ করে।
দুইটা রাহিব—একজন সামনে, একজন দেয়ালের পেছনে।
তারমানে এতোদিন রাহিব নামের ছদ্মবেশীর সাথে সংসার করেছি....একজন পরিচয়হীন মানুষ!
ইকবাল সাহেব ফিসফিস করে বলে— সত্যিটা বলো এবার,
— আজ একবারেই শেষ করি।
— আমার নাম সফিকুল ইসলাম।
— সেই ১৫ বছর আগে আ-গুনের রাতে আমি ছিলাম হাজী সাহেবের “কাজের লোক”।
হাজী আবদুল করিম চোখ নামিয়ে নেন।
এই চোখ নামানো মানেই স্বীকার।
ইকবাল সাহেব বলেন—
— সফিকুল ছিল সেই মানুষ,
যে আ-গুন লাগানোর পর ঘর চেক করত—
কেউ বেঁ*চে আছে কিনা।
মিতুর বুকের ভেতর মোচড় দেয়।
— তাহলে…?
সফিকুল মাথা নাড়ে।
— হ্যাঁ।
— আমিই তোমাকে কোলে তুলে নিয়েছিলাম,হাজী সাহেবের আদেশে...পরে হসপিটাল।
সবাই চুপচাপ কেউ কথা বলছে না।
— আ-*গুনটা লাগানো হয়েছিল কালো টাকার নথি পোড়ানোর জন্য।
মূলত এখানে বাকি যারা উপস্থিত আছে সবাই দেশের মূল্যবান নথিপত্র বিক্রি, বিভিন্ন হে'র ফের করে অঢেল টাকা কামিয়েছেন, আর সকল খারাপ কাজের প্রমাণ ছিলো এই বাড়িতেই....।
কেউ যেনো কিছু বুঝতে না পারে সেজন্য তোমাদের ফ্যামিলিকে এই বাসা ভাড়া দেওয়া হয়েছিল।
— কিন্তু ভেতরে বাচ্চা আছে—এটা প্ল্যানে ছিল না।
মিতুর চোখ ভিজে ওঠে।
— তাহলে আপনি কেন…?
সফিকুল চুপ করে থাকে।
তারপর বলে— কারণ আমি তখনও পুরোপুরি খারাপ মানুষ হইনি।
ইকবাল সাহেব লোহার দরজার দিকে এগিয়ে যান।
— এখন ওকে দেখো।দরজা খোলা হয়।
ভেতরে বসে আছে একজন মানুষ—চেহারা ক্লান্ত,
চোখে অপরাধবোধ।
এই মানুষটা কথা বলার আগেই মিতু বুঝে যায়—
এই চোখ সে চেনে,ছোট বেলায় দেখেছে... যারা সাথে তার বিয়ের কথা শুরু থেকেই ছিলো...মিতু খেয়াল করলো রাহিবের ফেসের সাথে সফিকুলের চেহারার অদ্ভুত মিল আছে...একদম জমজ ভাইয়ের মতো!কেউ হঠাৎ দেখলে আলাদা করতে কষ্ট হবে.....।
— রাহিব…?
লোকটা মাথা নাড়ে।
— আমি ভেবেছিলাম,
ওরা কয়েক মাসের জন্য আমাকে লুকিয়ে রাখবে।
— তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে,কিন্তু সেই কয়েক মাস ১৫ বছরে গিয়ে থেমেছে....।
মিতু হাসে,খুব কষ্টেও যে মানুষ হাসতে পারে আজ বুঝলো সে....
— আর আমি?
— আমি সবার খেলার মোহড়া হ'য়ে গেছি....!
রাহিব কাঁদে— আমি দুর্বল ছিলাম।
এই একটা শব্দে মিতুর মনে হয়—সব ব্যাখ্যা শেষ,আর বাকি অর্থহীন কথা শোনার টাইম বা ইচ্ছে কোনটাই নেই।
হঠাৎ হাজী সাহেব গলা পরিষ্কার করেন,তিনি বলেন...
— আ-*গুনটা আমার সিদ্ধান্ত।
— আমি ভেবেছিলাম—সব পুড়লে, পাপও পুড়বে।
মিতু ধীরে তাকায়।
— কিন্তু আপনি জানতেন… আমিও ভেতরে আমার বাবা-মা'র সাথে।
হাজী সাহেব মাথা নাড়েন।
— হ্যাঁ, জানতাম।
এই “জানতাম” শব্দটা যেনো মৃ-*ত্যুর মতো ঠান্ডা।
— তাহলে আমাকে বাঁচালেন কেন?
এই প্রশ্নটার জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা।
হাজী সাহেব চোখ বন্ধ করেন।
— কারণ ওই মুহূর্তে
আমি প্রথমবার বুঝেছিলাম—পাপ ঢেকে রাখলেই কমে না।
— আর তুমি বেঁচে গেলে…
আমি প্রতিদিন ম**রতে শুরু করলাম।
-তারমানে আমাকে বাচিয়ে আপনি পস্তাচ্ছিলেন?
-নাহ!ধীরে ধীরে নিজের করা সকল পাপের বোঝার নিচে ডেবে যাচ্ছিলাম....আমার নি:শ্বাস চলছিলোই তোমার জন্য, তোমাকে সকল সত্য বলার জন্য.... একটু শান্তিতে ম**রার জন্য।
-আমার এই বাড়িতে বিয়ের কারণ কি?
-কারণ তুমি ছিলে আমাদের অ*পরাধের জীবন্ত প্রমাণ, তোমাকে অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়ার রিক্স আমরা নেইনি।
-বাহ, বেশ ভালো প্লান।
-আরএকটা জিনিস বুঝলাম না আপনি নিজের ছেলে কে ১৫ বছর বেজমেন্টে বন্ধি করে কেনো রেখেছিলেন?
-কে,রাহিব?
-হ্যা।
-রাহিব আমার ছেলে না.....।
-কিহ! তাহলে কে আপনার ছেলে....?
-কেউ না,আমি কখনো বিয়েই করিনি....।
-What The F.......🙄
-মিতু ধপাস করে নিচে বসে পড়লো,মনে হলো কেউ যেনো শক্ত লাঠি দিয়ে তার মাথায় সজোরে আঘাত করেছে, মাথাটা ঝিমঝিম করতে লাগলো.....
ইকবাল সাহেব কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিলো....
মিতু হাতের ইশারায় চুপ থাকতে বললো....২ মিনিট আমাকে থিতু হতে দিন.....উফ এখানে তুমি কে, আমি কে খেলা চলতেছে....।
বুঝতে পারছিনা আমার সাথে কি হচ্ছে...! আমি যাকে আমার স্বামী ভেবে এসেছি সে একজন ছদ্মবেশী,যাকে আমি শশুর ভেবে এতো সেবাযত্ন করলাম সে লোক নাকি জীবনে বিয়েই করেনি....!হা হা হা.... কি হচ্ছে এসব...
মিতু পাগলের মতো হাসতে থাকে.... সবাই হা করে তাকিয়ে আছে....মিতুর দিকে....।
একটু ভেবে মিতু চুপচাপ বেজমেন্টের সিড়ি বেয়ে উঠতে থাকে, শেষে গিয়ে একবার ফিরে তাকিয়ে বলে....তারমানে এখানকার কারো সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই,তবে আমি কেনো শান্তিতে বাচতে দিবো....! গত ১৫ টা বছর আমি যে ক্ষ*ত বয়ে বেড়িয়েছি সেই দায় কার! আমার মা-বাবার তো কোন অপরাধ ছিলো না তাহলে...তারা কিসের শাস্তি পেয়েছে?
আমি জানি চাইলে আমি সবাইকে পুলিশে দিতে পারি কিন্তু আবারও টাকা আর পাওয়ার ব্যবহার করে সবাই ফিরে আসবেন....এতে আমার শরীরের ক্ষ*ত টার সাথে মনের ক্ষত টাও রয়েই যাবে....
কিন্তু যদি আমার মা-বাবার মতো তোমাদের পরিনতি হয় তাহলে অন্তত মনের ক্ষত টা দূর হবে....
বাকিরা দৌড়ে আসার আগেই মিতু বেজমেন্টের দরজা বাহির থেকে লক করে দিলো... গ্যারেজ থেকে পেট্রোল এর ঢোপ টা এনে বেজমেন্টে দরজার নিচ দিয়ে ঢেলে দিতে লাগলো....
ওপাশ থেকে চিৎকার চেচামেচিতে একদম কর্ণপাত করলো না মিতু....রান্নাঘর থেকে দেশলাইয়ের বাক্স টা এনে ধরিয়ে দিলো....ওপাশের চিৎকার বাড়তে লাগলো....
মিতুর দু-চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো... মা-বাবার কথা ভেবে...সেদিন তার নিরাপরাধ মা-বাবা ঠিক এভাবেই চিৎকার করেছিলো....কেউ শোনেনি........
মিতু ফিসফিস করে বলে....মা-বাবা আজ আমি তোমাদের প্রতি--শোধ নিয়েছি... হয়তো অনেক কিছুই হারিয়েছি কিন্তু তোমাদের হারানোর মতো কষ্ট কোন কিছুতেই নেই.....।
মিতু বাসার দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়....চুপচাপ হাটতে থাকে সে জানে না এখন তার কি করা উচিৎ, কিন্তু অদ্ভুত রকম এক প্রশান্তি বিরাজ করে...তার মনে....।
মিতু ওর শরীরের পো**ড়া দাগে হাত রাখে,আর মনে মনে বলে আজ থেকে কোন অতীত আর তাকে তাড়া করবে না....আজ থেকে সে মক্ত।
-সমাপ্ত🥀
লেখনীতে: 1 Minute With Mitu
বি:দ্র: যারা গল্পটা পড়েছেন অবশ্যই কমেন্টে জানাবেন কেমন লেগেছে #অতীত গল্প। 😊 লেখায় ভুল ত্রুটি হতেই পারে, ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশাকরি।
#গল্প #ebook #golpo #post #পোস্ট #postoftheday #ভাইরাল #story #storytime #thriller #থ্রিলার
