#মহুয়ার_রাতদিন.
পাশ থেকে আরেকজন পুরুষ জ্ঞানগর্ভ সুরে বললো,
"ওদের এখন শত্রু আছে। এক তার ফুফুরা। আরেক তার জামাইরা। হয়তো এর বাইরে আরো কেউ আছে।"
এমন একাধিক প্রশ্নবাণে জর্জরিত তারা নিজেরাই। কয়েকজন মহুয়াদের ঘর ভিটায় টর্চের ও মোবাইলের আলো ফেলে ফেলে দেখলো। এলমুনিয়াম ও টিনের কিছু হাঁড়িপাতিল,প্লেট,বাটি,জগ ছাড়া অবশিষ্ট কিছুই নেই। ওভাবেই সব পড়ে রইলো। গভীর আফসোস করতে করতে বাড়ির লোকজন যার যার ঘরে চলে গেলো।
হাসপাতালের ওয়ার্ডের দুটো টুলে বসে মহুয়া ও তার মা কান্নারত কণ্ঠে দোয়াদরুদ পড়ছে। মায়ের অনুমতি নিয়ে মহুয়া তার খালাকে ফোন দিয়ে জানালো। ফোন তার বালিশের নিচে ছিলো বিধায় অক্ষত ছিলো। তার কাঁধের ব্যাগটাও নাগালে ছিলো। যেহেতু সকাল হলেই আবার কর্মে যেতে হতো তার। রাতে বুলবুলিকে কোলে নিয়ে ঘর হতে বের হওয়ার সময় মহুয়া, তার ব্যাগ ও মোবাইলটাও হাতে নিয়ে বের হয়। তাই ব্যাগে থাকা টাকাগুলোও অক্ষত ছিলো।
তার খালা বাকি আত্মীয়ের জানালো। ভোর না হতেই তারা ছুটে এলো হাসপাতালে। মহুয়া ও তার মা একটু ভরসা পেলো নিকটজনদের দেখে।
মায়ের কাছে তাদেরকে রেখে মহুয়া বাড়িতে এলো। ঘর ভিটার কয়েকটি ছবি তুলে নিলো দুঃখের স্মৃতির এলবামে জমা করবে বলে।
সে শূন্য চোখে ঘর ভিটার দিকে ঠায় চেয়ে রইলো ধ্যানমগ্ন ঋষির ন্যায়। মহুয়াকে দেখে পাশের ঘরের দাদী,চাচী,ভাবিরা এগিয়ে এলো। তাদের দেখে মহুয়া ঝরঝর করে আবারো কেঁদে ফেললো।
এক দাদী তাকে প্রবোধ দিয়ে বললো,
"বইন কান্দিস না। যা আছে থালা,বাটি নিয়া ল। ধুইয়া আমগো ঘরে রাইখা দে। নয়তো টোকাই পোলাপান আইসা নিয়া যাইবো। আমগো ঘরে নাস্তা খাইস। চিতই পিঠা খোলায় দিতাছে।"
মহুয়া নাক চোখ ঢলে মুছে নেয় সুতী ওড়নাটার এককোণ দিয়ে। ঢুলির বেড়ার তৈরি অক্ষত ছোট্ট রসুই ঘরটায় গেলো সে। দরমার উপর থেকে ভাতের মাড় জমানো হাঁড়িটা নিয়ে নিলো। বস্তার ভিতর হতে কিছু কুঁড়ো নিয়ে মাড়ের সাথে গুলিয়ে নিলো। বাইরে গিয়ে খোয়াড় হতে হাঁস-মুরগিগুলো ছেড়ে দিলো। কুঁড়োর হাঁড়িটা তাদের সামনে রাখলো। অমনি রোজকার মতো সেগুলো হুড়মুড় করে খেয়ে নিলো তাদের খাবার। হাঁসগুলো টইটই করছে ভাতের জন্য।
মহুয়া ঘরের ভিতরে গেলো ছাঁই মাড়িয়ে। যা পেরেছে তুলে নিয়েছে খুঁজে খুঁজে। পুকুর ঘাটে নিয়ে সব ধুয়ে নিলো। নিজেও হাতমুখ ধুয়ে নিলো। ভাতের পাতিলের নিচের ভাতগুলো অতটা পুড়েনি। সেগুলো ধুয়ে হাঁসগুলোকে খেতে দিলো।
সেই চাচাদের উঠানে বাঁশের মাচায় নিয়ে শুকাতে দিলো হাঁড়িপাতিলগুলো।
মহুয়া তাদের রান্নাঘরের পিঁড়িতে বসে দুটো খোলাজা পিঠা খেলো নারকেল কুরানো দিয়ে। পানি খেয়ে উঠে দাঁড়ালো।
"বুলবুলি কী তোর মায়ের কাছে আছে?"
"হ্যাঁ চাচি। তাইতো রক্ষা। বুলবুলি আমার চেয়ে বেশি মায়ের কাছেই থাকে। নয়তো চাকরি করি কীভাবে আমি?"
"অ। তাও কতা।"
মহুয়া খোয়াড়ের চাবিটা তার হাতে দিয়ে নিরীহ গলায় বললো,
"দাদী,চাচী, আমি হাসপাতালে যাই। আমাদের এগুলো শুকালে একটা বস্তায় ভরে রাখবেন। এই নেন চাবি। হাসঁমুরগী সন্ধ্যায় খোয়াড়ে ঢুকে গেলে তালা দিয়ে দিবেন। সকালে আমি এসে তালা খুলে খাবার দিবো। মিরনের জন্য দোয়া করবেন।"
"আইচ্ছা যা। আল্লার হাওলা। দিমুনি তালা। খেয়াল রাখুম তোগো রসুই ঘর আর খোয়াড়ের দিগে। আর কী দেখুম। কিছুই তো নাই। তোরা মা,মাইয়া চিন্তায় মইরা যাইস না। একটা গতি খোদা কইরা দিবই।"
মহুয়া মাথায় ওড়না দিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় ছলছল চোখে। বাড়ির সীমানা পার হতেই দেখলো সাবের মহাজন ব্যস্ত পায়ে তাদের বাড়ির দিকেই আসছে। মহুয়া পায়ের গতি শ্লথ করলো তাকে দেখে। তিনিও থামলেন। তার চোখেমুখে উদ্বেগ। বিচলিত ভাব।
মহুয়া তাকে নিয়ে এসে খোলা ঘরের সামনে দাঁড়ালো। বিস্তারিত জানালো কাঁদোকাঁদো গলায়। তিনি কণ্ঠে সহানুভূতির ঝড় তুলে বললেন,
"আমি বাজারে মিলে আইসাই শুনলাম তোমাগো ঘরে রাইতে আগুন লাগছে। বেড়ার ঘরে আগুন লাগলে আর কিছু থাকে নাকি। চলো,তোমার লগে আমিও হাসপাতালে যামু তোমার ভাইরে দেখতে।"
"চাচা আমিতো যাবো অটোতে।"
"আমি ডাইরেক্ট রিকসা নিয়া যামু। তুমি চাইলে আমার লগে আসতে পারো। নয়তো ওয়ার্ড নাম্বার দাও।"
মহুয়া ওয়ার্ড নাম্বার বলে দিলো। দুজন আলাদাভাবে হাসপাতালে গেলো। সাবের যেতে যেতে কাশেমকে মহুয়াদের বিষয়টা জানালো। শুনে তিনি ছেলে আসিফকে জানালেন।
আসিফ অবাক হলো। মর্মাহত হলো বেশ। বললো,
"বিষয়টা খুবই দুঃখজনক। আমি মহুয়াকে ফোন দিচ্ছি বাবা।"
সাবের মহাজন হাসপাতালে গেলো। তার আগে মহুয়া পৌঁছে গেলো। তিনি বার্ণ ইউনিটে গিয়ে মিরনকে দেখলেন মহানুভবতার দৃষ্টিতে। মহুয়ার হাতে আসতে কিছু টাকা দিয়ে এলেন। সংকোচপূর্ণ চোখে হলেও টাকাগুলো নিতে হলো মহুয়ার। প্রয়োজনের কাছে লজ্জা,সংকোচ হার মানে।
টাকা বেঁচে থাকার অবলম্বন। টাকা পথ চলার শক্তি।
মহুয়াকে দেখেই তার শিশু কন্যা বুলবুলি আসার জন্য ছটপট করছে। মহুয়া মেয়েকে কোলে নিয়েই এদিক সেদিক যাচ্ছে। ওয়ার্ডের একটা শয্যায় মিরন অর্ধমৃত হয়ে পড়ে আছে। তার শরীরের পোড়াস্থানগুলো ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। স্যালাইন চলছে। তরল খাবার চলবে শুধু।
মহুয়া,তার মা,নিকটজনেরা ঘুরেফিরে মিরনকে দেখছে। মিরন স্পেশাল ছেলে হওয়ার সবার মনে আলাদা একটা সিমপ্যাথী আছে তারজন্য। তবে আশার কথা হলো কর্তব্যরত চিকিৎসক বলেছে ৪/৫ শতাংশ পুড়েছে মিরনের শরীর। তাই মিরন ঝুঁকিমুক্ত রয়েছে।
মহুয়া হাসপাতালের বাইরে গিয়ে খালা,মায়ের জন্য রুটি ও ডালভাজি নিয়ে এলো। হালিমার খেতে ইচ্ছে করছে না। থাকি থাকি তার কেবল বুক ভেঙ্গে কান্না আসছে। তার এতদিনের সংসারটা চোখের সামনে ছাঁই হয়ে গেলো। প্রতিটি জিনিসে তার কত স্মৃতি, কত আবেগ জড়ানো ছিলো। কত টুকরো গল্প মিশে আছে সংসারের কতকিছুতে।
মহুয়ার মোবাইল বেজে উঠলো উচ্চস্বরে। আসিফ। রিসিভ করেই আহত গলায় মহুয়া তাকে সালাম দিলো। আসিফ বললো,
"ওয়ার্ড নং বলো। আমি আসছি। তোমার ভাইকে দেখে তারপর দোকানে যাবো।"
মহুয়া ওয়ার্ড নং বললো। আসিফ মোবাইল রেখে দিলো। মা,খালাকে জানালো আসিফের কথা। তারা দু'বোন নিজেদের একটু গুছিয়ে নিলো পরিপাটি করে। বসে বসে তারা তসবিহ পাঠ করছে। মহুয়া সম্ভাব্য সবস্থানে তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া অপ্রত্যাশিত দূর্ঘটনার কথা সব জানালো।
আসিফ সরাসরি চলে এলো ওয়ার্ডে। দুইহাত ভরে ফলমূল নিয়ে এলো। মেয়ের দোকানের মালিক, সেই হিসেবে হালিমা ও তার বোন বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। এতে আসিফ বিব্রত হলো। সে নম্র ভঙ্গিতে সালাম দিলো মহুয়ার মা ও খালাকে। তাদেরকে বসতে অনুরোধ করে নিজেও বসলো একটি টুল টেনে। মিরনের মাথায় হাত রেখে তার শারীরিক অবস্থার কথা জানতে চাইলো। মহুয়া সব জানালো। তবুও আসিফ গিয়ে চিকিৎসকের সাথে দেখা করলো নিজের পরিচয় দিয়ে।
সব শুনে আসিফ ফিরে এসে বসলো। বললো,
"আলহামদুলিল্লাহ। চিন্তা করবেন না খালাম্মা। মিরন সুস্থ হয়ে যাবে।"
"বাবারে, আল্লায় যে কী মুসিবতে ফালাইলো আমাগোরে। মরার উপর খাড়ার ঘা। একদিকে আমার ছেলের এই অবস্থা,আরেকদিকে ঘরতো পুড়ে ছাঁই। আমাগো মাথা গোঁজারও নাই যে ঠাঁই।"
"আমি দেখি কী করা যায়। বাবা ও সাবের কাকার সাথে এ নিয়ে আলাপ করবো। কিন্তু আগুন কীভাবে লাগলো? একবারে পুরো ঘরটা পুড়ে গেলো?"
"কীভাবে লাগলো জানি না। তবে ঘরের কিছু হইতে যে লাগেনাই এইটা নিশ্চিত বাবা। ঘরে কোন কূপি,হারিকেন জ্বলেনাই। কয়েল জ্বলেনাই। সিগারেট খাওয়ারও লোক নাই ঘরে।"
নিদারুণ গলায় বলল হালিমা।
"জিনিস যায় তার,ঈমান যায় তার। বুবুরাতো ঘুমায়া ছিলো তখন। কারে সন্দেহ করবো।"
ব্যথিত স্বরে বললো মহুয়ার খালা।
মহুয়া তার মোবাইলে তোলা ছবিগুলো বের করে আসিফকে দেখালো। আসিফ ছবিগুলো জুম করে দেখলো। বুঝতে পারলো মহুয়াদের অর্থনৈতিক অবস্থা কতটা দুর্বল।
আসিফ বললো,
"তুমি কী বলো এই বিষয়ে?"
"আমাদের ঘরে আগুন লেগেছে বাইরে থেকে। কে বা কারা দিয়েছে জানি না। তবে যারাই দিয়েছে, হয় তারা আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে চেয়েছে। নয়তো আমাদের বাঁচিয়ে রেখে নিঃশ্ব করে দিতে চেয়েছে।"
বলিষ্ঠ আত্মবিশ্বাসী সুরে বললো মহুয়া।
"তুমি তাদের খুঁজে বের করতে চাও না?"
"চাই। কিন্ত আমার একার লড়াইটা কঠিন হবে।"
"তুমি একা নও। আমি পাশে আছি। তোমাকে হেল্প করবো। কারণ এসব অমানবিক, অ-মানুষদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব!"
আসিফের কথায় মহুয়াদের সবার মনোবল বেড়ে গেলো প্রচন্ডভাবে। আসিফের দিকে তারা প্রীত চোখে চাইলো। আসিফ তাদের বললো,
"আমি এখন আসি। দোকানে যাবো। টাইমলি মহুয়ার সাথে সব বিষয়ে আলাপ করবো।"
তারপর আসিফ দোকানে গিয়ে কিছুক্ষণ সময় দিলো। বাড়িতে গিয়ে তার বাবার সাথে মহুয়াদের পরিবার ও ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে একটু আলোচনা করলো। তখন তার বাবা তাকে বললো,
"সাবের ভাইয়ের মিলে মহুয়ার বাবা অনেক বছর শ্রম,ঘাম দিছে। তাই সাবের ভাইয়েরও হাত বাড়ানো উচিত। সবাই মিলে ওদের আগের ভিটার ঘর তুলে দিতে হবে।"
"এতো খুব মহৎ কাজ বাবা। সেটাই করতে হবে।এগিয়ে আসতে হবে সবার।"
খুশীমনে বলল আসিফ।
"শোন,আমি মহুয়া মেয়েটার জন্য একটা পাত্র ঠিক করছি। আগের জামাইরে সে তালাক দিয়ে দিবে। তারপর উপযুক্ত সময়ে বিয়ে হইবো। এতে তার মায়ের কাঁধ ভারমুক্ত হইবো।"
"বিয়ে? মহুয়ার? বুঝলাম না,কবে থেকে আপনি এত জনদরদী হয়ে উঠলেন? সেতো আমাদের কেউই না। অথচ তার একটা নিশ্চিত জীবন আপনি ঠিক করে ফেললেন?"
অদ্ভুত চোখে চেয়ে ভীষণ অবাক কন্ঠে বাবাকে জিজ্ঞেস করলো আসিফ।
#মহুয়ার_রাতদিন. ১০✍️ #রেহানা_পুতুল
অদ্ভুত চোখে চেয়ে ভীষণ অবাক কন্ঠে বাবাকে জিজ্ঞেস করলো আসিফ।
কাশেম হকচকিয়ে গেলো ছেলের অভিব্যক্তি খেয়াল করে। গলা ছেড়ে কেশে উঠলো। বললো,
"তোর হাবভাব দেখে মনে হইতাছে আমি কোন ভুল কাজ করার সিদ্বান্ত নিছি। একটা অসহায় মেয়ের সহায় হওয়া,তার জীবনের একটা গতি কইরা দেওয়া সওয়াবের কাজ। এই মেয়েটার বয়স কত হইবো? বড়জোর বিশ কি একুশ। আস্ত একটা জিন্দেগী তার সামনে পইড়া আছে। কোলের একটা শিশু বাচ্চা নিয়া এভাবে একলা জীবন ক্যামনে পার করবো? মা আইজ আছে কাইল নাই। ভাই তো না থাকার মতই। তখন মেয়েটা নানাভাবে লাঞ্চিত হইবো। নিরাপত্তা কই? সমাজটা বহুত নষ্ট। তোর মাও জানে বিষয়টা। মেয়েটার একটা আশ্রয় দরকার। একজোড়া ভরসার হাত দরকার।"
কথাগুলো বলে কাশেম আসিফকে মোটামুটি ভাঁজে আনতে সক্ষম হলো।
"বুঝলাম। বিয়ে হওয়া জরুরী মহুয়ার অবস্থান ভেদে। ভালো পরিবার হলে অবশ্যই ভালো। নয়তো ঝামেলা আরো বাড়বে বাবা।"
তখন আসিফের মা আফিফাও তাদের পাশে এসে বসলো। আসিফ মাকে জিজ্ঞেস করলো,
"আম্মা,বাবা নাকি মহুয়া মেয়েটার বিয়ে ঠিক করেছে?"
"তোর বাবা ঠিক করেনাই। একটু ভাব নিতে চাইলো আর কী দায়িত্ব নিয়া। ঠিক করছে মহুয়ার বাবার চাকরি করা মিলের মহাজন।"
"সাবের চাচা?"
"হ্যাঁ। উনিই তোর বাপের সাথে পরামর্শ করলো। তোর বাপ তোর সাথে পরামর্শ করতে বসলো। এই হইলো বিষয়।"
" পাত্র কে?"
"পাত্র উনি নিজেই!"
স্পষ্ট গলায় জানালো আফিফা।
"হোয়াট!" বলে আসিফ তেতে উঠলো। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ঝাঁঝালো স্বরে বললো,
"তোমাদের মাথা ঠিক আছে? না-কি ঘুষ খেয়েছো তার থেকে? এটা অসম্ভব! একটা তরুণী বয়সের মেয়ের বিয়ে কীভাবে এত এডাল্ট লোকের সাথে হয়? উনার চোখ এত খারাপ? মহুয়া না উনাকে চাচা বলে? ছিহ!"
কাশেম স্থির হয়ে বসে আছে চেয়ারে। ভাবখানা এমন যেন ভাজা মাছটিও উলটে খেতে জানে না। আসিফের মুখের কথা ঝামটি মেরে কেড়ে নেয় আফিফা। মেঘমুখে বললেন,
"বয় হারামজাদা। তুই এমন চ্যাতস ক্যান? মহুয়া তোর নিজের কেউ? না আমাদের কেউ? আরেক গ্রামের মাইয়া। চাচা কয় কী হইছে। তার আপন চাচা? সাবের ভাইর লগে মহুয়ার বিয়ে জায়েজ আছে। সাবের ভাইর লগে তোর বাপের সম্পর্ক দোস্তের মতোন। উনার বয়স কী এমন বেশী? পুরুষ মানুষের বয়স বেশী হইলেও কমবয়সী মেয়েরে ঘরে তুলতে পারে। এরমধ্যে বিপত্নীক উনি। দুই মেয়ে থাকে স্বামীর সাংসারে। কোন ছেলে নাই। মহুয়া গরীব। সমাজের নিচুতলার। কে তারে আবার বিয়ে করবো? ক? বাপের ভিটায় পঁইচা মরণের চাইতে অবস্থাসম্পন্ন,মান্যগণ্য একজন পুরুষের বউ হওয়া উত্তম। সাবের ভাই কইছে মহুয়ার নামে বিশ শতক জমি লেইখা দিবো। মহুয়ার মেয়ের সমস্ত খরচ নিজে বহন করবো। মহুয়াদের ঘরের বন্দোবস্ত করবো। মহুয়ার ঘরে যদি উনার কোন পুত্র সন্তান হয়,উনি মহুয়ার নামে একটা মার্কেট দিবো।"
আফিফা থামে। আসিফ এতক্ষণ বিষ্ফোরিত চোখে ও ব্যথাতুর হৃদয়ে মায়ের কথাগুলো হজম করে গেলো। তপ্ত স্বাস ফেলে আসিফ বাবা,মাকে জিজ্ঞেস করলো,
"বাহ! ভালই ত উনি তোমাদেরকে ম্যানেজ করে ফেললো। এই কাহিনী মহুয়ার পরিবার জানে?"
এবার যেন কিছু বলার সুযোগ পেলো কাশেম। বললো,
"নাহ। এজন্যই তো তোকে জানানো। সাবের ভাই কইলো মেয়েটা তোর দোকানে চাকরি করে। তুই ওকে ভালো করে বুঝিয়ে বললে ও রাজী হবে সবদিক বিবেচনা করে।"
আসিফের মাথায় হঠাৎ করে একটা দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেলো। সে বললো,
"আচ্ছা আমি ভেবে দেখি।"
আফিফা অনুনয় করে বললো,
"হ্যাঁ বাপ। মেয়েটার উপকার কর। সাবের ভাইয়ের মতো সামর্থবান,মানীলোক মেয়েটারে পছন্দ করছে,এটাই ত মেয়েটার সাত জনমের কপাল। নইলে অমন ঘরভাঙা, হতদরিদ্র, বাপ নাই,ভাই প্রতিবন্ধী, কোলে কন্যাশিশু, অমন পোড়ামুখী,জনমদুঃখী পথের মাইয়ারে কে বিয়া করতে চাইবো?
হয়তো অল্পবয়সের কোন তাগড়া ছেলে করবো। কিন্তু সে হয় সি.এন.জি চালক হইবো,নয়তো কোন কারখানার শ্রমিক হইবো। তিনবেলা ভাতের বদলে কিল-ঘুষি খাইবো। আর সাবের ভাইয়ের ঘরে না ভাতের অভাব হইবো। না পিন্দনের কাপড়ের অভাব হইবো। বাড়তি রাজত্ব তো পাইবোই। লগে ইজ্জতও। গুরুত্বও। তুই ওরে বুঝাইয়া ম্যানেজ কর। এই দায়িত্ব তোর। সাবের ভাই অনেক খুশি হইবো তোর উপরে। "
আসিফ ক্ষণসময় ব্যয় করলো ভাবনায়। দেখলো মহুয়ার জীবন নিয়ে তার মা,বাবার কথাগুলোয় যথেষ্ট যুক্তি আছে। সে বললো,
"আচ্ছা,কয়দিন যাক। তারপর বলবো সময় নিয়ে বুঝিয়ে। আগে তার ভাই সুস্থ হউক। ওদের মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হোক।"
"তাই ভালো।"
আসিফের কথায় ভরসা পেলো তার বাবা,মা। তারা ভিতরের রুমে চলে গেলো। আসিফও নিজের রুমে চলে গেলো। রাতে ঘুমানোর আগে সে মহুয়াকে ফোন দিলো। মিরনের খোঁজ খবর নিলো।
সেই রাতেই সাবেরকে ফোন দিলো কাশেম। বললো,
"ভাই কাজ হবে মনে হয়। আপনার মনের আশা পূরণ হইবো। আসিফ দায়িত্ব নিছে মেয়েটারে রাজী করানোর। কয়দিন পর বলবে বলছে।"
সাবের হিমালয় জয় করার মতো খুশী হয়।
পাঁচদিন পর মিরনের রিলিজ হলো। এই ভিতরে তিনদিন মহুয়া দোকান করেছে বুলবুলিকে তার মায়ের কাছে রেখে। তবে আগের চেয়ে কম সময় দিয়েছে দোকানে। বাড়িতেও গিয়েছে হাঁসমুরগিগুলো দেখাশোনার জন্য। পাশের বাড়ির ইরা ও মিরাকেও পড়া বন্ধ করে দিলো।
আসিফ উপস্থিত থেকে ডাক্তারদের সাথে কথা বলে মিরনের রিলিজ পর্ব সম্পন্ন করলো। মেডিসিনগুলো বুঝে নিলো মহুয়াকে পাশে রেখে। মহুয়া টাকা যেগুলো ম্যানেজ করলো। আসিফের হাতে দিতে চাইলো ডাক্তারকে দেওয়ার জন্য। আসিফ নিল না।
স্মিত হেসে বললো,
"এখন তোমার কাছে রাখো। আপাতত সব টাকা আমি দিয়ে দিচ্ছি। খুব বেশি নাতো সরকারি হাসপাতালের বিল।"
মহুয়া কাঁচুমাচু করতে করতে টাকাগুলো আবার তার ব্যাগে রাখলো। আসিফ লুকানো চোখে মহুয়ার আপাদমস্তক দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। এর আগে মহুয়াকে কখনো সে এভাবে দেখেনি। মহুয়ার প্রতি তার একটা মানবিক ও সহানুভূতির দৃষ্টি ছিলো তার দোকানের স্টাফ হিসেবে। কিন্তু সাবের কেন মহুয়াকে বিয়ে করতে চায়,এই প্রশ্ন থেকেই না চাইলেও আসিফের ভাবনায় ঠাঁই পেলো মহুয়া।
আসিফ মহুয়াকে জিজ্ঞেস করলো,
"মিরনকে নিয়ে তোমরা এখন কোথায় উঠবে। ওর সেবাযত্নের জন্য ভালো পরিবেশ দরকার।"
"আপাতত সেটার কোন সমস্যা নাই ভাইয়া। বাড়িতে এক চাচার ঘরে থাকবো। উনারা আমাদের জন্য একরুম ঠিক করে রেখেছে।
উনারা সচ্ছল এবং ভালো মানুষ। আব্বার আপন চাচাতো ভাই।"
বিনয়ী গলায় বলল মহুয়া।
"আচ্ছা থাকার আপাতত বন্দোবস্ত হলো। কিন্তু তোমাদের খাওয়া, দাওয়া?"
"দু চারদিন ত উনারাই খাওয়াবে বলছে। এরপর আমরা আলাদা রান্না করবো। আমাদের রান্নাঘর ঠিক আছে। আগুনতো দিলো আমাদের থাকার ঘরে।"
"বুঝলাম। তোমাদের ঘর তো তুলতে হবে। ভেবেছো কিছু?"
"মাথা গোঁজার ঠাঁই তো অবশ্যই করতে হবে। বাড়িতে যাই। আত্মীয়স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করবো সাহায্যের জন্য।"
"ঠিক আছে তোমরা চলে যাও। আমি দোকানে যাই। সব বিষয়ে যোগাযোগ রাখবো তোমার সাথে।"
গুরুগম্ভীর গলায় বলল আসিফ।
আসিফ মহুয়াদেরকে একটা গাড়ি ঠিক করে দিলো। আয়াদের সাহায্য নিয়ে মিরনকে ধরে গাড়িতে তুলে নিলো।
বাড়িতে গিয়ে চাচাদের ঘরে উঠলো তারা। আপাতত তারা নিজের বাড়িতেই থাকতে পারছে এটাই বড় শান্তি ও শান্তনা তাদের জন্য।
হালিমা মহুয়াকে বললো,
"আল্লার অশেষ দয়ায় আমার পোলা ভালোর দিকে যাইতাছে। ঘরে আগুন কে দিলো,এবার এইটা বাইর করার চেষ্টা করতে হইবো।"
মহুয়া বললো,
"মা,সেটাতো আছেই। আমাদের ঘরের ব্যবস্থা করতে হবে সহসাই। কাকাদের ঘরে কতদিন আর থাকবো।"
"তুই এক কাম কর মা,তোর মহাজন চাচার সাথে দেখা কর। উনি যদি কিছু টাকা পয়সার ব্যবস্থা করে দেয় আমাদের। বড় উপকার হয়। বেড়ার ঘর দেওন যাইবো না। আগুন আবার দিবো জালিমেরা। টিনের ঘর দিতে হইবো। ফুল টিনের ঘর।"
মায়ের কথায় মহুয়া সম্মতি জানায়।
পরেরদিন ভোরে বুলবুলি ঘুমে থাকতেই মহুয়া বেরিয়ে পড়লো বাড়ি থেকে। সাবের মহাজনের বাড়িতে গেলো। একই গ্রাম মহুয়া ও সাবেরের। মহুয়া তার দালানের ঘরে পা রাখতেই তিনি টের পেলেন। অসম্ভব খুশী হলেন মহুয়াকে দেখে। বুঝে উঠতে পারছেন না ঠিক। আসিফ কী তার হয়ে প্রস্তাবটা দিলো? মহুয়াকে কী তার মা জেনেশুনেই তার খালি পাঠালো কাজের ছুতোয়?
"চাচা আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন? "
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি হঠাৎ কইরা? বসো বসো।"
"চাচা আমি বেশী সময় নিব না। আমার তো ছোট বাচ্চা আছে জানেন।"
"হ জানি তো। তোমার বুকের দুধ পান করা শিশু, খাইতে না পারলে কাঁদবো।"
বলেই মহুয়ার বুকের উপরে চোরাচোখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সাবের। মহুয়ার নজরে পড়েনি সেটা। সে বললো,
"চাচা, আপনার মিল এখন বন্ধ। তাই বাড়িতে আসলাম সরাসরি। মা বললো, বাড়িতে আসতে। নিরিবিলি কথা বলা যাবে। মিলে ব্যস্ত থাকেন।"
"তোমার আম্মা একদম বুদ্ধিমানের কাজ করছে। তোমারে কী যে খাইতে দেই। আমার ত খালি ঘর। কাজ করার জন্য পাশের বাড়ির এক বেডি আসে আরো পরে।"
"চাচা,আমি কিছুই খাব না। আপনি বসেন।"
তবুও সাবের নিজেই মহুয়াকে চা,কলা,কেক এনে দিলো ট্রেতে করে। মহুয়া সংকোচপূর্ণ মুখে সামান্য খেলো ভদ্রতা দেখিয়ে।
তারপর মহুয়া তাদের ঘর নিয়ে সবিস্তারে বললো। শুনে মহাজন বললো,
"আমার কথাও টিনের ঘর হোক। নিরাপদে থাকতে পারবা তোমরা। তোমরা যা পারো কালেকশন করো। এরবাদে বাকি যা থাকে,সব ভর্তুকি দিয়ে আমি নতুন ঘর তুলে দিবো। যেহেতু তোমার বাপ নাই। তাই তোমাদের গার্ডিয়ান হিসেবে কাঠমিস্ত্রীর সাথে আমি আলাপ করবো খরচপাতি নিয়া।"
মহুয়া খুশী হয় সাবেরের মহানুভবতায়। বাড়িতে এসে মাকে ও মিরনকে জানায়। হালিমা সাবেরের উপর চিরকৃতার্থ হয়। মেয়ের সাথে একবেলা পার করে সাবেরের গল্প করে।
তারপর মহুয়া গোপনে অনেকভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলো তাদের ঘরে কে আগুন দিলো তা উদঘাটনের জন্য। এবং কিছুটা জেনেও গেলো। মহুয়া নির্বাক মনে বাড়ি ফিরে এলো। গায়ের বোরকাটা খুলতে খুলতে মাকে বললো,
"মা,আমরা যাদের ধারণা করেছি,ঘরে আগুন তারা দেয়নি। অন্যকেউ লাগিয়েছে লোক দিয়ে। তাদের উদ্দেশ্যেই ছিলো আমাদের চারজনকে পুড়িয়ে ছাঁই করে দেওয়া।"
"কী কস তুই? কারা এই পশু,এমন জানোয়ার?"
মেয়ের দিকে কাতর চাহনি নিক্ষেপ করে অসহায় কণ্ঠে জানতে চাইলো মহুয়ার মা।
#মহুয়ার_রাতদিন. ১১✍️ #রেহানা_পুতুল
"কী কস তুই? কারা এই পশু,এমন জানোয়ার?"
মেয়ের দিকে কাতর চাহনি নিক্ষেপ করে অসহায় কণ্ঠে জানতে চাইলো মহুয়ার মা।
"মা, আমি বুলবুলিদের বাড়ির এক ভাবিকে ফোন দিয়েছি। উনি বললো,আমান এখনো থানায়। তার মা অনেক চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারছে না তাকে। তার মায়ের মানসিক অবস্থা খুব খারাপ। শিউলি যে বিয়ের দিন চলে গিয়েছে আর আসেনাই। তবে আমান ছাড়া পেলেই শিউলিকে নিয়ে আসবে। তাদের বাসর হবে।"
"তারপর?"
"তারপর চুপিচুপি শিউলিদের বাড়িতে গেলাম। ফুফুর বাড়ি যেহেতু। সবই তো চেনা। ক্ষেতের আল ধরে শিউলির চাচাদের ঘরে ঢুকলাম। তারা বললো,শিউলির বিয়ের দিন আমানের মা তাদের বাড়ি গিয়েছে। সবার সামনেই তিনি ফুফুকে শান্তনা দিলো। এবং আমান আসার অপেক্ষায় থাকতে বললো। অনেকক্ষণ নাকি আমাকে গালমন্দ করেছে। তিনি চলে গেলে ফুফু মাঝ উঠানেই দাঁড়িয়ে বলছে, আপন ভাইয়ের মেয়ে আমার মেয়ের কপাল পোড়ার চেষ্টা করলো। জামাইকে পুলিশ দিয়ে ধরালো। আমি এর বদলা নিয়েই ছাড়বো। তো তাদের ধারণা আমাদের ঘরে আগুন ফুফুই লোক দিয়ে লাগিয়েছে। এটা তার বাপের বাড়ি। সব রুমই তার মুখস্থ। তাই আগুন কোন সাইড দিয়ে লাগালে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, সেতো তা জানেই। আমার বিশ্বাস হয়েছে এটা। আমানের মা যখন দেখলো আমি পুলিশ দিয়ে তার ছেলেকে থানায় নিয়েছি। সে কিছুটা হলেও ঘাবড়ে গিয়েছে। তাই সে আর বাড়তি কিছু করার চেষ্টা করবে না।"
হালিমা অবশ গলায় বললো,
"র*ক্তের মানুষ এত নিচু মনের হয়? আপন,ভাতিজি,ভাতিজারে সে মাইরা ফালাইতে চাইলো? আমি কী না করছি এই নন্দের লাইগা। যাক, শোকর মাওলার দরবারে। আমি অসহায় মানুষ। চাক্ষুষ প্রমাণ নাই। ক্যামনে ধরি তারে।"
বলে হালিমা দুঃখের গভীর স্বাস ছাড়লো।
"মাওলার দরবারে সব ছেড়ে দিলে হয় না মা। নিজেদের হাতেও কিছু বিচার রাখতে হয়।"
মেয়ের কথায় চ্যাত করে উঠলো হালিমা। দুঃখভরা মন নিয়ে কাঠ কাঠ গলায় বলল,
"কয় কেলাস পইড়া বেশী বাইড়া গ্যাছত তুই। তোর জিদ্দের লাইগাই আইজ আমাগো জীবনের এই বিতিকিচ্ছিরি। আমার বেমারে থাকা নাদান পোলাড়া কতই না কষ্ট পাইতাছে শরীরে। তুই যদি বুলবুলির বাপেরে পুলিশ দিয়া না ধরাইতি,তাইলে কী আমার ঘর পোড়ে? আমার এত বছরের সংসারের সব স্মৃতি শ্যাষ হইয়া গ্যালো। কতজনের হাতে পায়ে ধইরা টাকার বন্দোবস্ত করতে হইলো। তুই যেহেতু তার ঘরে যাইবি না আর, তাইলে চুলায় যাক তারা। দরকার কী আছিলো কাহিনী করবার। আমাগো সেই মুরোদ আছে তাগো লগে লড়বার? সব সময়ে,সবার লগে লড়তে নাই। চুপ মাইরা থাকতে হয়।"
মহুয়া নিরবে শুনে যায় মায়ের কথাগুলো। পুকুর ঘাটে গিয়ে মুখে বার কয়েক পানির ঝাপটা মারে। যেন চোখের জল ও পুকুরের জল মিশে একাকার হয়ে যায়।
শুক্রবারে সাবের মহাজন দু'জন কাঠমিস্ত্রী নিয়ে মহুয়াদের বাড়ি এলো। মিরনকে দেখল ঘরে গিয়ে। মিরনের পোড়া টান ধরেছে। সে এখন ভালোর দিকে যাচ্ছে।
এই কাঠমিস্ত্রীরা টিনের ঘরও তৈরি করে থাকে নকশাসহ। মহুয়া মাথায় ওড়না দিয়ে তাদের সামনে গেলো। মিস্ত্রিরা ঘরের পরিমাপ করলো। কতটুক কাঠ, টিন লাগবে। চেয়ারে বসে কাগজে কলমে সব হিসাব করে ফেললো।
মহুয়াকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
"তোমরা কত টাকা যোগাড় করতে পারবা আন্দাজমতে?"
"চাচা, বলতে পারছি না। চেষ্টা করছি আমরা। দুই তিনদিন পরেই জানাতে পারবো আপনাকে।"
"তাহলে ঘরের আয়োজন শুরু করুক তারা। টিনের দোকানদার আমার পরিচিত। বাকিতেও নেওয়া যাইবো।"
"ঠিক আছে চাচা। শুরু করুক উনারা।"
সাবেরের ধারণা ছিলো মহুয়া ও তার মা বিয়ের বিষয়টি জানে কিছুটা হলেও। সে মনে মনে বলল,
"চাচা না,আমি তোর স্বামী হমু কয়দিন পর।"
তারা চলে যায়। মহুয়া ও তার মা মিলে টাকার ব্যবস্থায় নেমে পড়লো। মহুয়ারা তাদের দুটো বড় গাছ বিক্রি করে ফেললো। আত্মীয়স্বজন থেকেও সাহায্য নিলো। আসিফের কাছে সাহায্য চাইলো না তারা। কেননা আসিফ মিরনের রিলিজ হওয়ার পুরো টাকা দিয়েছে। তারপর মহুয়া বড় বাজারে স্বর্ণের দোকানে যায়। তার গলার চেইন, ও এক জোড়া কানের দুল বিক্রি করে দিলো। এতে ভালো টাকা চলে এলো হাতে।
মহুয়া যখন গহনার দোকান হতে বেরিয়ে যায়,দূর হতে আসিফ তাকে দেখলো। বুঝলো কিছু। সে গহনার দোকানে এসে বললো,
"বোরকা পরা যেই মেয়েটি বেরিয়ে গেলো, সে কি বিক্রি করেছে দেখি?"
দোকানদার দেখালো।
"কত টাকা দিয়েছেন?"
দোকানদার টাকার অংক বলল।
আসিফ তার মানিব্যাগ হতে সম পরিমাণ টাকা দোকানদারের হাতে গুঁজে দিলো। বললো,
"আমি বসছি। ঘষে মেজে চকচকে করে দিন চেইন ও দুলজোড়া।"
দোকানদার তাই করলো। আসিফ মহুয়ার কানের দুলজোড়া ও গলার চেইনটা যত্ন করে তার কাছে রেখে দিলো।
তার পরেরদিন মহুয়া দোকানে গেলো। দেখলো ম্যানেজার ফাহিম নেই। ক্যাশে আসিফ বসে আছে। মহুয়া তাকে সালাম দিয়ে একপাশের টুলটাতে বসলো। নিত্যদিনের মতো বোরকা খুলে নিলো।
"ম্যানেজার কই ভাইয়া?"
"অসুস্থ। ফোন দিয়ে জানালো। সেজন্যই আমার আসতে হলো।"
আসিফ নিচু মাথায় ট্যালি খাতায় বিক্রির হিসাব দেখছে আর মহুয়ার কথার জবাব দিলো। সে ক্যালকুলেটরেও হিসাব মিলাচ্ছে। কিন্তু গরমিল হচ্ছে। মহুয়াকে ডাকলো । মহুয়া আসিফের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। খাতায় হিসাবটা বুঝিয়ে দিলো আসিফকে।
আসিফ মহুয়ার দিকে তাকালো। দেখলো মহুয়ার কান ও গলা খালি। জিজ্ঞেস করলো,
"তোমার চেইন ও দুল কোথায়?"
মহুয়া সত্যিটা বললো। আসিফ বললো,
" ঘরের জন্য?সেটার কী ব্যবস্থা হলো?"
মহুয়া সাবেরের কথা বলে সব বললো। আসিফ চিন্তা করে দেখলো আজ দোকান খালি। মহুয়াকে বিষয়টা এবার জানাই। হয়তো মহুয়া রাজী হতেও পারে সব বিবেচনা করে।
আসিফ গম্ভীর গলায় মহুয়াকে বললো,
"তোমাকে কিছু কথা বলার ছিলো। ক্লিয়ার আনসার দিবে।"
"অবশ্যই। বলেন?"
হকচকানো গলায় বলল মহুয়া।
"তুমি কী তোমার হাজব্যান্ডকে ডিভোর্স দিবে?"
"এখনো ভাবিনি মেয়ের কথা ভেবে।"
"তুমি তার কাছে যেহেতু যাবেই না,তাহলে ডিভোর্স না দিয়ে উপায় কী? তোমার অল্প বয়স। পুরো লাইফ সামনে। দ্বিতীয় বিয়ে করা জরুরী তোমার।"
মহুয়া বিস্মিত চোখে তাকায় আসিফের দিকে।
"আমি গরীবের মেয়ে। কে আমাকে বিয়ে করবে? আর এখন এসব আমার মাথায় নেই একদম। আমার মাথায় আছে, আমার পরিবার,আমার মেয়ে।"
"তোমার মেয়ের জন্যও দরকার একজন ভরসার মানুষ।"
মহুয়া মৌন থাকে। আসিফ সংকোচপূর্ণ কণ্ঠে খোলাখুলিভাবে মহুয়াকে সাবেরের প্রস্তাব শোনায়। নিমিষেই মহুয়ার সারামুখে অমাবস্যা ভর করলো। উজ্জ্বল মুখখানা অনুজ্জ্বলতায় ভরে গেলো। নিজেকে সংবরণ করতে পারলো না। কষ্টে, বিরক্তিতে তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। কেঁদেকেটে নাক মুখ ফুলিয়ে ফেলল। মহুয়ার নাজেহাল অবস্থা দেখে আসিফ বাবার উপর বিরক্ত হলো। ক্যাশের থেকে উঠে গেলো। মহুয়ার দিকে একটি টিস্যু বাড়িয়ে দিলো।
সহানুভূতির গলায় বললো,
"মুখ মুছে ফেলো। সরি তোমাকে কাঁদালাম বলে। ঠিক আছে বাবাকে বলে দিবো যেন উনাকে মানা করে দেয়।"
মহুয়া ফোঁফানো ধরা গলায় বললো,
"হ্যাঁ তাই করুন। উনাকে আমি চাচা বলি। আর উনি ছিহ! লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। আমি দরকার হলে মরে যাবো। বাকি জনম একলা থাকবো। তবুও এ অসম্ভব! আমাদের ঘর করে দেওয়া লাগবে না উনার। যা পারি আমরাই করবো। আমি গরিব বলে এতটা পঁচে যাইনি,যে চাচা সম্বোধন করে ডাকা পিতার বয়েসী কারো গলায় ঝুলে পড়বো। কিন্তু আমার ব্যক্তিত্ব আছে। আত্মমর্যাদাবোধ আছে।"
"মরে যাওয়া, একলা থাকা কোন সুস্থ সমাধান নয় মহুয়া। বেঁচে থাকতে হবে। বিয়ে করতে হবে। লড়াই করতে হবে জীবন নিয়ে।"
বিজ্ঞের সুরে বলল আসিফ।
দুপুরে আসিফ দোকান থেকে বের হয়ে গেলো। দু'জনের জন্য দুই প্যাকেট মুরগী পোলাও নিলো। দোকানে এসে মহুয়াকে বললো,
" আমার ক্ষুধা লেগেছে। তুমিও একটু লেট করে যেও আজ। যেহেতু ম্যানেজার নেই। বাইরে গিয়ে খেলে দোকান বন্ধ করে যেতে হবে দুজনের। তাই নিয়ে এলাম। ওই যে প্লেট, গ্লাস সবই আছে। বেড়ে নিজেও খাও। আমাকেও দাও।"
মহুয়া আসিফকে দিলো। নিজেও খেলো ইতস্ততবোধ করে হলেও। ক্ষুধায় তার পেটটাও চনমনিয়ে উঠেছে।
খাওয়া শেষে আসিফ বললো,
"ঘরে আগুন কে দিয়েছে জানতে পেরেছো?"
"নাহ। এখনো পারিনি।"
মহুয়া নিজের ফুফুর কথা গোপন করলো। নয়তো নিজেই ছোট হয়ে যাবে। মহুয়া বিকেলে বাড়িতে গিয়ে দেখে তাদের উঠান ভর্তি জিনিসপত্রে। ঘর তৈরির সরঞ্জামাদি চলে আসলো ভ্যানে করে। সবকিছুর তদারকি করছে সাবের মহাজন। তার উপরে হালিমার কৃতজ্ঞতা অসীম। মহুয়া ক্ষোভ নিয়ে মাকে সব জানালো। হালিমার মাথায় যেন বজ্রপাত পড়লো।
বললো,
" এই ছিলো বেটার মনে? তোরে আমি কই ভাই। আর তুই আমারে মাইয়ারে চাস বিয়া করতে? মন চায় কোপায়া ধড় আলগা কইরা ফালাই। চোখের শরম উইঠা গ্যাছে তার বউ মরার লগে লগে। নইলে তার তুলনায় ল্যাদা মাইয়ারে ক্যামনে বিয়া করতে চায়।"
আসিফ বাড়িতে গিয়ে তার বাবাকে মহুয়ার অমতের কথা জানালো। তিনি সাবেরকে জানিয়ে দিলেন। সাবের ক্রোধে ফুঁসে উঠলো। পরেরদিন সে লোক পাঠিয়ে মহুয়াদের উঠান থেকে ঘর তৈরির সবকিছু নিয়ে গেলো। লোক মারফতে ভয়ংকর হুমকি দিলো মহুয়াদের।
বিষয়টা আর গোপন রইলো না। জানাজানি হয়ে গেলো। তেলা মাথায় তেল সবাই ঢালে। তাই সবাই সাবেরের পক্ষ নিলো। মহুয়া ও তার মাকে বোঝাতে লাগলো যেন সাবেরকে বিয়ে করে মহুয়া। এতে তাদের উপকার ছাড়া ক্ষতি হবে না। কিন্তু মহুয়া ও তার মা কিছুতেই রাজী হলো না।
পরের পর্বগুলা এই ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে দেখেন?
