#মহুয়ার_রাতদিন.

 ১২+১৩+১৪ পর্ব

 ✍️ #রেহানা_পুতুল

মহুয়া ও তার মাকে বোঝাতে লাগলো যেন সাবেরকে বিয়ে করে মহুয়া। এতে তাদের উপকার ছাড়া ক্ষতি হবে না। কিন্তু মহুয়া ও তার মা কিছুতেই রাজী হলো না। সাবের লোক মারফতে ভয়ংকর হুমকি দিলো মহুয়াদের।


হালিমা আবারো মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লো। পরেরদিন মহুয়া বাড়ি থেকে বের হয়ে আসিফকে ফোন দিলো। পথের একপাশে দাঁড়িয়ে সাবেরের কাণ্ডকীর্তি বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। মহুয়ার আকুল কান্না আসিফের হৃদয়কে তোলপাড় করে দিলো। 


সে মহুয়াকে আন্তরিক গলায় বললো,


"উনাকে প্রতিহত করার এবং তোমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আজ থেকে আমার। তুমি নিশ্চিন্তে মনে থাকো। আর ঘর যেভাবে হওয়ার প্ল্যান হয়েছে সেভাবেই হবে। সাবেরের পরিবর্তে বাকি হেল্প আমি করবো। আমি আজ তোমার সাথে তোমাদের বাড়ি যাবো। এমনিতেই তোমার ছোট ভাই মিরনকে দেখতে আসতাম।"


" আজ নয়। ভয় লাগে ভাইয়া। সাবের কাকা শুনলে আবার যদি কোন বদনাম রটায়?" 


"ওকেহ, আমি তোমার সাথে যাবো না। শুক্রবার বিকেলে আসবো। ঠিক আছে মহুয়া।"


"হ্যাঁ ঠিক আছে। ধন্যবাদ আমার কথাকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য।"


স্মিত হেসে বলল মহুয়া।


"পথ চলায় কে কখন কীভাবে কার কাছে গুরুত্ব পাবে তা আগে থেকে কেউই জানে না। যাইহোক, এত ভারাক্রান্ত হয়ে থাকলে মানায় না। দোকানে যাও। আমি আসতেছি।"


মহুয়া কান হতে মুঠোফোনটাকে আলগা করে নেয়। দোকানে চলে যায়। ম্যানেজার ফাহিম ক্যাশে বসে আছে। সেদিনের পর হতে সে মহুয়ার সাথে অতিরিক্ত একটি কথাও বলে না। আসিফ বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে মহুয়াকে নিয়ে। কিন্তু ভাবনার কোন থই খুঁজে পেল না সে। তাই ভাবনার ইতি ঘটিয়ে দিলো আপাতত। উঠে ফ্রেস হয়ে দোকানে চলে গেলো। দোকানে মহুয়ার সাথে সেও প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না। পেশাদারীত্বভাব বজায় রেখে চলে।


শুক্রবারে আসিফ মহুয়াদের বাড়িতে গেলো। মহুয়ার চাচাদের ঘরে গিয়ে বসলো। সামান্য নাস্তা করলো। মিরনকে দেখলো। হালিমার মন খারাপ দেখে আসিফ জিজ্ঞেস করলো, 


"কোন সমস্যা,খালাম্মা?"


"বিপদ যহন আসে তহন চারদিক হইতেই আসে বাবা। মিরনরে আর মিলে কামে রাখব না সাবের ভাই। মিরন গতকাইল গেলো আর খেদায়া দিলো সে। মুখের ভাষাও কর্দয করছে সেই।"


"কী বলল?"


জবাব দিলো মহুয়া। বলল,

"আমার মিলে তুই আর আসবি না। তোদের মতো ছোটলোকদের উপকার করতে নেই। তোরা প্রতিদান দিতে জানিস না। কেবল নিতে জানিস।"


আসিফ স্থির রইলো। পরমুহূর্তেই বললো,

"ভালো হয়েছে এক হিসেবে। মিরন স্পেশাল চাইল্ড! ওর কোন কাজ না করাই ভালো। তুমি যেহেতু চাকরি করছো, তাহলে ও বাড়িতে থেকে তোমার মেয়েকে ও সবকিছু দেখাশুনা করতে পারবে খালাম্মার সাথে থেকে। মিল থেকে ও কিই বা আর এমন বেতন পেতো?"


"তাও কথা।"


আক্ষেপের স্বাস ছেড়ে বলল মহুয়া।


আসিফ বেরিয়ে গেলো উঠানে। মহুয়াদের খালি ঘর ভিটা দেখলো ভালো করে। মহুয়ার মা আসিফকে তাদের ঘর,রান্নাঘর,বাগান দেখিয়ে সংসার জীবনের কিছু স্মৃতিচারণ করলো। সাথে মহুয়া ও মিরনও আসছে। আসিফ বললো,


"আমি কাল ঘর করার মিস্ত্রি পাঠিয়ে দিবো। তারা দেখে হিসেব দিবে আমাকে। আপনারা মা,মেয়ে ঘর করা নিয়ে কোন চিন্তা করবেন না।"


"যেহেতু দায়িত্ব নিয়েছেন, তাহলে আগের হিসেবে ঘর হলে আমরা যেই টাকাগুলো সাবের কাকাকে দিতাম, সেটা আপনি নেন।"


নমনীয় চোখে বলল মহুয়া।


"পরে দিলেও হবে। এখন দিতে চাইলেও দিতে পারো।"


মহুয়া ব্যস্ত পায়ে তার চাচাদের ঘরে গেলো। চাচীর স্টিলের আলমারিতে গচ্ছিত রাখা টাকাগুলো নিলো। পা ঘুরিয়ে উঠানে আসিফের নিকট এলো। টাকাগুলো আসিফের হাতে দিয়ে বললো,


"এই নিন ভাইয়া। গুনে নিন।"


আসিফ টাকাগুলো গুনে বললো,

"এত টাকা কীভাবে ম্যানেজ করতে পারলে?"


"আমার নানার বাড়ির আত্মীয়দের কিছু হেল্প আছে। আম্মা বড় দুটো আমগাছ বিক্রি করেছে। আমার কানের এক জোড়া দুল ও গলার একটা সোনার চেইন বিক্রি করে দিয়েছি। বেশী টাকা তো এখান থেকেই এলো।"


"তাই বলো। ঠিক আছে। আমি এখন আসি। কাল মিস্ত্রি পাঠিয়ে দিবো।"


আসিফ টাকাগুলো নিয়ে চলে গেলো।

পরেরদিন মিস্ত্রি দুজন এলো। মাফজোক করে দিলো ঘরের। আস্তে আস্তে ঘরের উঠানে স্তুপ হতে লাগলো ঘর তৈরির সরঞ্জামাদি। দশদিনের মধ্যে মহুয়াদের তিন কামরার ফুলটিনের ঘর তৈরি হয়ে গেলো। হালিমা মসজিদের হুজুর ডেকে ঘর বন্ধক করালো। সার্মথ্যের ভিতরে মিলাদ পড়িয়ে কয়জন মিসকিন খাইয়ে দিলো। আসিফকেও বিশেষভাবে দাওয়াত করেছে হালিমা। আসিফ অপারগ প্রকাশ করেছে আসবে না বলে।


এক নিরিবিলি ভোরে তফুরা মহুয়াদের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হলো। মহুয়া ও তার মা চমকালো। থমকালো না। বরং এইদিনের অপেক্ষায় মা,মেয়ে প্রমোদ গুনেছিলো। যেহেতু তফুরার আপাদমস্তক বোরকা ও নেকাব দিয়ে আবৃত। তাই মহুয়া চিনেও না চেনার ভান করলো। তারা মা,মেয়ে চুপ করে রইলো। তফুরা বুলবুলিকে নিজের কোলে নিয়ে নিলো। বিনয়াবনত হয়ে সংকোচপূর্ণ গলায় মহুয়ার দিকে চেয়ে বললো,


"আমি ওর দাদী। তোমার কাছে আইছি মামলাটা তুইলা নেওনের জন্য। আমার পোলায় তো তোমারে ছাইড়া দেয়নাই। অস্বীকার করেনাই। তুমি হুদা হুদাই ঝামেলা পাকাইছো। এই নাদান মাইয়াটারে বাপের মহব্বত থেইকা সরাইয়া রাখছো। তুমি চইলা আসো বাড়িতে।"


"আপনি চলে যান। মামলা তুলব না। আইনমতে তার প্রাপ্য সাজা পেয়ে গেলে এমনিতেই জামিন হয়ে যাবে।"


টনটনে সুরে প্রতিউত্তরে বলল মহুয়া।


"কিন্তুক বিপদ তো আরেকখানে। আমান তিন মাসের ছুটিতে আসছে। বিদেশের কোম্পানিরে লোক দিয়া বলাইছি,আমান হাসপাতালে। অনেক অসুখ। এক মাস ছুটি দিছে। নইলে আরো একমাস বাড়ান যাইবো। এর বেশী হইলে তার চাকরি থাকব না।"


মুখের নেকাব সরিয়ে নিরীহ স্বরে কথাগুলো বলেই মরা কান্না জুড়ে দিলো তফুরা। 


"যার কর্ম যেমন তার ফলও তেমন। তার চাকরি বাঁচানোর দায়িত্ব আমার নয়। আপনি আসতে পারেন। ডিভোর্স লেটার চলে যাবে আপনাদের বাড়ি।"


তফুরা হতাশ হলো। বিদীর্ণ মুখে উঠে চলে গেলো নিজের গন্তব্যের দিকে। জেলখানায় গিয়ে ছেলেকে জানালো বিষয়টা। আমার মুখকে বিকৃত করে ফেলে। তার ঘনিষ্ঠ একটি ছেলের নাম বলে মাকে। এবং বলল, সেই ছেলে যেন তার সাথে দেখা করে শীঘ্রই। 


মহুয়াদের ঘর আসিফ দায়িত্ব নিয়ে খরচ দিয়ে তুলে দিয়েছে। এ খবর চাউর হয়ে গেলো আড়ালে আবডালে। সাবের বিষ্ফোরক হয়ে উঠলো। আসিফের বাবাকে নরম গলায় জানালো বিষয়টা। শুনে কাশেম উত্তেজিত হলো। তিনি রাতে আসিফকে জিজ্ঞেস করলেন সত্যতা যাচাইয়ের জন্য। 

"কিরে তুই নাকি মহুয়াদের ঘর তুলে দিলি?"


আসিফ বিনাবাক্যে স্বীকার করে নিলো। 

"বাবা ঘর মিস্ত্রিরা তুলেছে। আমি নই।"


"বের্ত্তুমিজ পোলা! বাপের ভুল ধরিস? কিছুদিন আগে আমারে প্রশ্ন করলি আমি কবে থেইকা এতো দানশীল হইলাম। একই প্রশ্ন আমিও তোরে করতাছি। উত্তর দে।"


"ঘরের অর্ধেক টাকা তারা দিয়েছে। বাকি অর্ধেক আমি দিয়েছি বাকিতে। কারণ মহুয়া আমার দোকানে চাকরি করে। তার বেতন থেকে কেটে নিবো। এবং ঋণের দায়ে সে চাকরি ছাড়ার নাম নিবে না মুখে। তাকে দিয়ে দোকানে ভালো প্রফিট হয়।"


"নাকি অন্যকিছু?"


"যা ভাবেন আপনারা।"


আসিফের মা আফিফা চনচন করে উঠলো।

"জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পাইছে তোর? কই আগরতলা কই উগিরতলা? সাবের ভাই শুনলেও বা কী কইবো?"


কাশেম শাসনের সুরে ধমকে উঠে বললো,

"যদি এমন কিছু ঘটে। তাইলে আমার ঘরের দুয়ার তোর লাইগা বন্ধ। মান ইজ্জত বলে কিছু থাকবো সমাজে?"


"যেটা আমার মাথায় নেই সেটাই আপনারা ভেবে বসে আছেন। এই মেয়ের সাথে আমার ভালো করে আলাপই হয় না। আবার প্রেম,বিয়ে? সে আমার দোকানের একজন বিশ্বস্ত ভালো কর্মী। এর বাইরে আর কিছুই না। ওরা নিঃশ্ব! অসহায়! তাই ওদের পাশে দাঁড়িয়েছি,সহমর্মিতা দেখিয়েছি মানবিকবোধের জায়গা থেকে। ব্যাস!"


ক্ষ্যাপানো স্বরে কথাগুলো বলেই বের হয়ে যায় আসিফ। 


এদিকে তোড়জোড় করে শিউলিকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দিলো তার পরিবার। কেননা তারা জানতে পারলো, মহুয়া মামলা তুলে নিবে না। আমানকে পুরো দুই বছর সাজা ভোগ করতে হবে। তার বিদেশ যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেলো। তার স্থানে মালিক নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। সুতরাং তার আশায় মেয়েকে ধরে রাখা বোকামি। এই খবর আমান জেনে গেলো। 

মহুয়ার উপর আমান, তফুরা,শিউলি, তার মা,বাবা, মহাজন সাবের,কাশেম,ম্যানেজার ফাহিম সবাই ক্রোধান্বিত! সবার আক্রোশ! সবার দিগুন বিরুক্তি!


তারপর এক ঊষালগ্নে মহুয়া আটকা পড়লো সাবেরের ঘরে। সাবের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলো। মহুয়াকে টেনে নিজের বিছানার উপরে নিয়ে ফেললো। হিংস্র শার্দূলের মতো আগ্রাসী থাবায় মহুয়ার গায়ের সমস্ত পোশাক খুলে নিলো। পাঞ্জাবী খুলতে খুলতে বিশ্রী গালি দিয়ে বললো,


"মাইয়া তোরে এখন রক্ষা করার কেউই নাই। তোর নাগর আসিফ তার গ্রামে নাক ডাইকা ঘুমাইতাছে।"


মহুয়া খাঁচায় বন্দী পাখির ন্যায় ছটপটাতে লাগলো শত মিনতি করে। লাভ হলো না। সাবের তার কাজ শুরু করে দিচ্ছিলো,ঠিক তক্ষুনি তার দরজায় করাঘাত হলো বিকট শব্দে। সাবের ক্ষেপে গিয়ে দরজা খুললো। নয়তো বাড়ির অন্য ঘরের লোকজন এসে যাবে। মহুয়া কাঁপতে কাঁপতে সেলোয়ার জামা পরে নিলো।


আগুন্তক ঘরের ভিতরে প্রবেশ করল। সাবেরের গলা টিপে ধরে জিজ্ঞেস করলো,

"মিরনকে কোথায় গুম করছিস লুইচ্চা?"


 পুরুষালী গলা শুনে মহুয়া রুমের আড়াল হতে উঁকি মারলো। দেখলো তার সেই পুরোনো প্রিয়মুখটি। বিস্ময়ে! লজ্জায়!সংকোচে মহুয়ার মরে যাওয়ার উপক্রম!

#মহুয়ার_রাতদিন. ১৩ ✍️ #রেহানা_পুতুল

পুরুষালী গলা শুনে মহুয়া রুমের আড়াল হতে উঁকি মারলো। দেখলো তার সেই পুরোনো প্রিয়মুখটি। বিস্ময়ে! লজ্জায়!সংকোচে মহুয়ার মরে যাওয়ার উপক্রম!


আগেরদিন বিকালে মিরন প্রতিদিনের মতো বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। পাশের ধান ক্ষেতের খালি জমিতে কয়েকবাড়ির ছেলেরা মিলে বল খেলে। সবার সাথে জমির পাড়ে বসে খেলা উপভোগ করে মিরন। তারপর বাজারে গিয়ে এক কাপ চা ও এক পিস কেক খেয়ে মিরন বাড়িতে ফিরে আসে। মিরন যেহেতু অসুস্থ, তাই তার চলাফেরার দৈনন্দিন রুটিন মা,বোনের মুখস্থ।


 খেলা শেষ হলো। বিকেল ফুরিয়ে গেলো। সাঁজের আগমন ঘটলো। কিন্তু মিরন এলো না। হালিমা ও মহুয়া উদ্বিগ্ন হলো। বোরকা পরে মা,মেয়ে ভিন্ন ভিন্ন দিকে মিরনকে খুঁজতে বের হলো। কোথাও মিরনের চিহ্নটুকু নেই। এভাবে বাড়ির ও আশপাশের বাড়ির মানুষজন জেনে গেলো। সবাই হায়-হুতাশ শুরু করলো। চারপাশ ঘনিয়ে আঁধার নেমে এলো। হালিমা ঘরে ফিরে এলো। নাতনি বুলবুলিকে পাশে বসিয়ে কান্না জুড়ে দিলো। মহুয়া বাজারে চলে গেলো। গ্রামের পরিচিত যে ছেলের দোকানে মিরন চা খায় রোজ।


তাকে ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করলো,

"আলফু ভাই, মিরন চা খেতে আসছিলো বিকেলের শেষের দিকে? তাকে খুঁজে পাচ্ছি না।"


"হ। আইছিলো তো। এক কাপ মালাই চা আর একটা 'ক্রিম বন' খাইলো। এরপর দেখলাম সাবের মিয়ার মিলের ভিতরে গেলো। তারপর তো আর জানি না বইন।"


বিচলিত স্বরে জানালো আলফু।


পা চালিয়ে মহুয়া মিলে গেলো। মিরনকে দেখতে পেল না। উপস্থিত অন্যদের কাছে মহুয়া জানতে চাইলো,


"আমার ভাই মিরন মিল থেকে বের হয়ে কোনদিকে গেলো,আপনারা দেখেছেন?"


"কই মিলে তো তোমার ভাইরে দেখিনাই। অবশ্য আমি আইলাম বেশীক্ষণ হয়নাই।"


জানালো লোকটি।


অন্যরা বললো,

"আমরাও দেখিনাই। তাই কইতে পারি না।"


"সাবের চাচা বিকালে মিলে আসছে?"


"হ আইছিলো। আবার চইলা গ্যাছে।"


মহুয়া বিমর্ষ নয়নে সম্ভাব্য সব স্থানে মিরনকে খুঁজলো। ফলাফল শূন্য। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে গেলো মহুয়া। আশাহত গলায় মাকে সব জানিয়ে বললো,


"আম্মা,কী করবো এখন? কোথায় খুঁজবো আর?"


"তোর নানাগো বাড়ি,খালাগো বাড়ি মোবাইল কর।"

বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো হালিমা।


"মিরন এই জনমেও একা একা কোন আত্মীয়ের বাড়ি যায় নি আম্মা। আজ হঠাৎ কেন যাবে? তবুও ফোন দেই।"


বলে মহুয়া সব আত্মীয়ের বাড়ি ফোন দিয়ে খোঁজ নিলো। সবার এক কথা। মিরন যায় নি। বাড়ির মানুষজন মহুয়াদের ঘরে জড়ো হলো। কারো কারো কথামতে বাড়ির আশেপাশের ডোবা,খালেও মিরনের সন্ধান করলো। লাভ হলো না। মহুয়া কান্নাজড়িত সুরে আসিফকে মিরনের বিষয় জানালো। আসিফ চিন্তিত হলো। 


বললো,

"সকাল হোক। দেখো মিরন ফিরে আসে কি-না। নইলে থানায় যেতে হবে।"


পল্লীগ্রাম। রাত হতেই নির্জনতা ভর করলো পরিবেশজুড়ে। সবাই যার‍ যার ঘরে চলে গেলো। 


মহুয়া চট করে মাকে বললো,

"মা,আলফু বললো মিরনকে মিলে ঢুকতে দেখেছে। আবার মিলে যারা ছিলো তারা বলল সাবের বিকেলে মিলে গিয়েছে। যদিও তারা মিরনকে দেখেনি মিলে। তাহলে সাবের মহাজনের বাড়িতে একবার যাওয়া জরুরী নয়?"


"হ, তাই তো। ভালো কথা মনে করছত।আলফু ছেলেটা আন্দাজে মিছা কতা কওনের পোলা না। এখন রাইত হইয়া গ্যালো। অমাবইস্যার আন্ধার মাড়ায়া ক্যামনে যাইবি? ভোরে যাইস। বুলবুলি তখন ঘুমায়া থাকবো। হের বাদে থানায় গিয়া পুলিশরে জানাইতে হইবো। বইসা থাকনের টাইম নাই। আইচ্ছা সাবের কিছু করেনাই তো মিরন রে? সেইতো তোর, আমার উপরে বহুত ক্ষ্যাপা!"


তসবী হাতে দোয়া দরূদ পড়তে পড়তে আল্লাহর নাম জপতে জপতে বললো হালিমা।


"এটা আমারও একটু একটু মনে হচ্ছে। দেখি আগে তার বাড়ি যাই। একা যাওয়া ঠিক হবে মা?"


"এখন হইলে সমস্যা আছিলো। ভোরে এই ঘর ওই ঘরের মুরুব্বিরা নামাজ পড়তে উইঠা যায়। সমস্যা নাই। তুই ঘরে যাইস না। দুয়ারের বাইরে খাড়ায়া জিগাবি আর চইলা আসবি।"


 "হ্যাঁ। সেটাই। ঘরে যাওয়ার কাজ নেই আমার।"


সারারাত নির্ঘুম কাটে মহুয়া ও হালিমার। অপেক্ষা প্রভাতকালের। ভোরের আলো না ফুটতেই মহুয়া বোরকা পরে বেরিয়ে যায় সাবেরের বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাবের তার ঘরে নামাজ পড়ে উঠলো মাত্র। তখন ঘরের দরজায় বাইরে হতে আস্তে করে টোকা পড়লো। সে আধপাকা দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে চাপানো দরজার দুই কপাট মেলে ধরলো। মহুয়া তাকে সালাম দিয়ে ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলো। 


সাবেক অবাক চোখে দুঃখিত গলায় বললো,

"হায় খোদা! কি কও? ভিতরে আসো। ভালো কইরা শুনি।" 


মহুয়া এক পা অতিক্রম করে ঘরের ভিতরে গেলো। এবং সামিনে দাঁড়িয়ে থেকেই বললো, 

"চাচা, আলফু বললো তার দোকান হতে চা খেয়ে মিরন আপনার মিলে গেলো। এবং আপনার মিলের লোকজন বলল আপনি বিকেলে মিলে ছিলেন।"


"আলফু কইছে? একদম মিছা কথা। তোমার ভাই মিরন সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আমি বিকালবেলায় মিলে ছিলাম তা সত্য। কিন্তু আমি থাকা অবস্থায় তোমার ভাইরে দেখিনাই। তার আগে পরে গেছে কি-না সেইটাতো আমি জানি না।"


মহুয়া হতাশ হয়। তার ধারণা ছিলো সাবের থেকে হয়তো কোন ক্লু পাবে মিরনের। সে বিদীর্ণ স্বরে বললো, 


"আচ্ছা চাচা। আসি তাহলে।"


মহুয়া পা বাড়াতেই তার হাত ধরে ফেললো সাবের। ভিতর হতে দরজা বন্ধ করে দিলো। মহুয়ার মুখ চেপে ধরলো যেন চিৎকার দিতে না পারে। তার অল্পক্ষণ পরেই মিজান গিয়ে হাজির হলো সাবেরের ঘরে।


মিজান ভাই! তিনি না চট্রগ্রামে থাকেন? বাড়িতে কখন এলো আর এতো ভোরে এখানেই বা কেন? মহুয়া আর কিছু ভাবতে পারে না। সম্বিৎ ফিরে পায় মিজানের হেঁড়ে গলায় আওয়াজে।


"এই মহুয়া এদিকে আয়।"


মহুয়া পা টিপে টিপে যায় মিজানের সামনে। আড়ষ্ট হতে ঘরের দেয়াল চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। মিজান ভিতর হতে দরজা বন্ধ করে দিলো। সাবেরের গলা টিপে বললো,


"মিরন কোথায় বল? নইলে তুই এখন গুম হয়ে যাবি কসম। মহুয়ার বাপে সারাজীবন তোরে ভাই বলছে। কিন্তু নিজের লোলুপতার জন্য ভাতিজিসম মহুয়াকে বিয়ে করতে চাইলি। সে রাজী না হওয়াতে তার আলাভোলা সহজ সরল ভাইটাকে গুম করলি। যেন মিরনকে খুঁজতে মহুয়া তোর কাছে আসে, আর তুই নোংরামিতে মেতে উঠবি। বল মিরন কই?"


সাবের গর্জন করে উঠলো। 


"এই শুয়োরের বাচ্চা। মিরনরে আমি গুম করছি প্রমাণ কী?"


"প্রমাণ আলফু।"


বলে মিজান সাবেরের বিশেষ স্থানে জোরে লাথি মারলো। বয়স্ক সাবের নিতে পারল না। ওমাগো! বলে ভয়ানক যন্ত্রণায় হাত চেপে ধরে বসে পড়লো। বুঝলো তার আর রক্ষা নেই। কারণ সে এবং গ্রামের সবাই জানে মিজান খুবই বদরাগী ছেলে। একবার মারপিট করে আপন চাচাতো ভাইকে ছুরিকাঘাত করে র ক্তা ক্ত করেছিলো মিজান।


 মহুয়ার মুখে কোন রা নেই। পূর্বের স্থানে কুঁজোর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। 


সাবের কোঁকানো স্বরে বললো,

"ধানের গোলার ভিতরে আছে।"


মহুয়া দিশেহারা হয়ে ছুটে গেলো বিশাল ধানের গোলার দিকে। যেই চৌকির উপরে গোলাটা অবস্থিত, মহুয়া সেই চৌকিতে পা দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। দেখলো তাই ভাই মিরন। আধশোয়া হয়ে ঘুমিয়ে আছে। 


"ভাই,মিরন। এই মিরন উঠে আয়।"


বোনের আদরমাখা কণ্ঠ শুনে মিরন জেগে উঠে। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। মিজান এগিয়ে গেলো। মিরনকে ধরে গোলার ভিতর হতে বের করে আনলো। মিরনকে সাবেরের সামনে এনে বললো,


"এত কাহিনী করার টাইম নাই। আমি যেটা ধারণা করছি সেটা সত্যি কিনা বল? তুই মহুয়ার সাথে অশ্লীল কাজ করার জন্য এই নাটক করছিস। ঠিক?"


সাবের মাথা ঝাঁকিয়ে বলে ঠিক। 


মহুয়া নির্বাক হয়ে যায়। মিজান বলে,


"এখন কী সাজা দিবো সাবের মহাজনরে? নাকি থানাপুলিশ করবো? বাড়ির সবাইকে ডেকে আনবো?"


সাবের হাতজোড় করে মাফ চাইলো মিজানের কাছে। মিজান বললো,


"আজকের পর হতে মহুয়াদের পরিবারের কারো কোন রকম ক্ষতি হলে তার দায়ভার তোর নিতে হবে। রাজী?"


সাবের সম্মতি জানায়।


" মহুয়ার পা ধরে বল,আম্মা আমার ভুল হইছে মাফ কইরা দাও।"


সাবের মনে মনে ফুঁসে উঠছে। যেন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ। কেউ দেখে যাবে। এদের বিদায় করা জরুরী। তাই উপায়হীন হয়ে সাবের মহুয়ার পা ধরে মিজানের শিখিয়ে দেওয়া কথা বলল।


মিজান ও মহুয়া মিরনকে নিয়ে চলে যায়।

"মিজান ভাই হঠাৎ করে এই বাড়িতে এলেন কেন?"

লজ্জা ও ইতস্তত কণ্ঠে জানতে চাইলো মহুয়া।


"যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর। এত সাহস দেখিয়ে একা যাওয়া উচিত হয় নি তোর।"


"বুঝলাম। মিরনকে না পেয়ে পাগলের মতো হয়ে ছিলাম। অতটা ভাবতে পারিনি। বুঝে উঠতে পারিনি।

আপনার বিষয়টা বুঝলাম না মিজান ভাই?"


"সেটা বাড়িতে গিয়ে চাচীর থেকে জেনে নিস।"


"আচ্ছা।"


পুরোপথ কেউ আর কোন কথা বলে না। মিজান তাদের বাড়ির পথে পা রাখে। মহুয়া মিরনের গলা পেঁচিয়ে ধরে নিজেদের বাড়ি চলে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় মহুয়া বাকরুদ্ধ! মিরনকে দেখে হালিমা বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে। মহুয়া বড় বড় স্বাস ফেলতে থাকে। ঘটনার সারাংশ মাকে বললো।


শুনে হালিমা ভীতসন্ত্রস্ত! সে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো, 

"তুই ক্যামনে সাবেরের বাড়ি গেলি বাপ? ক্যামনে? কও তো মায়েরে?"


মিরন বললো,

বিকালে সাবের তাকে চিপস কিনে দেয়। মিল থেকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। দূর আছে সেই জায়গা। পথের উপর একটু সময় দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবে। তারপর আবার তাকে নিয়ে তার বাড়িতে চলে যায়। সময় সন্ধ্যার পর। রাতে ভাত খাইয়ে দিয়ে গোলার ভিতরে তাকে লুকিয়ে থাকতে বলে। সে রাজী না হলে রাকে ভয় দেখায়। মিরন ভয়ে রাজী হয়। 


হালিমা বললো,

"নিজের মনের সামান্য খায়েস মেটানোর লাইগা মানুষ এতবড় হারামিপানা করে। মন চায় কুচি কুচি কইরা ফালাই এই বেটারে।"


বুলবুলি জেগে যায়। কান্না করে। তাই মহুয়া মিজানের বিষয় জানতে পারেনি তৎক্ষনাৎ!


সকালে ঘুম ভাঙ্গার পরেই আসিফের মনে হলো মহুয়ার কথা। মিরনের কথা। তার ভাবনায় ঠাঁই হলো এই মহুয়ারা বড় একা। ঘুরেফিরে তাদের জীবনে বিপদ লেগেই আছে। মহুয়াদের রাত-দিন এভাবে যেতে পারে না। আসিফ ফ্রেস হয়ে নাস্তা করে নিলো। 

 

বাবা মাকে বললো, 


"ভাবছি মহুয়াকে বিয়ে করবো। ওরা অসহায়! যতটুকু ওকে দেখেছি ভালই মনে হলো।"


"মনে হওয়া আর বাস্তবতা এক? তুই না সেদিন কইলি এই মেয়ের সাথে তোর কথাই হয় না? আর এখন কী কস তুই? তাইলে ত আমাদের আন্দাজটাই ঠিক হইলো। কই গ্যালো তোর লম্বা কথা? আমাদের উপযুক্ত তোর দোকানের বেতনভুক্ত সামাইন্য একটা কর্মচারী মেয়ে?"


রোষপূর্ণ গলায় জিজ্ঞেস করলেন আসিফের পিতা কাশেম।

 

#মহুয়ার_রাতদিন. ১৪ ✍️ #রেহানা_পুতুল

 "কই গ্যালো তোর লম্বা কথা? আমাদের উপযুক্ত তোর দোকানের বেতনভুক্ত সামাইন্য একটা কর্মচারী মেয়ে?"


রোষপূর্ণ গলায় জিজ্ঞেস করলেন আসিফের পিতা কাশেম।


"বাবা, কে কার উপযুক্ত এটার মানদণ্ড কী অর্থ দিয়ে বিচার হয়?"


" তো কী দিয়া হইবো? সমাজ এমনিই। যেই কথা ঠোঁটে নিছত, সেইটা ঠোঁটের বাইর করবি না কইলাম। গিলা ফালা।"


পাশ থেকে আসিফের মা আফিফা বললো,

"আমরা চান্দের দ্যাশে বাস করি না। এই সমাজের কথা আত্মীয়স্বজনের কথাও মাথায় রাখতে হইবো। হেরা গরিব! অসহায়! তার লাইগা পাশে দাঁড়াইছস,উপকার করছোস,যেহেতু হেগো কেউ নাই,এই পর্যন্ত সবই ঠিক আছে। কিন্তু মাঝখান দিয়া ভূতে ধরার মতন কী ভুলভাল কথা কইলি।"


আসিফ উঠে যায়। তার ধারণা ছিলো অন্তত তার মা তাকে সাপোর্ট করবে। কিন্তু না,তার মাও বেঁকে বসলো। স্বামীর সুরে কথা বলল।


বুলবুলিকে স্তন পান করিয়ে ফের ঘুম পাড়িয়ে দেয় মহুয়া। তার রাতে ঘুম হয়নি, ভোরেও উঠে যেতে হয়েছে। নিজের উপরে গেলো ঝড়। সবমিলিয়ে ট্রমাটাইজড মহুয়া। একই অবস্থা মিরনেরও। থেমে থেমে কেঁপে উঠে মিরন প্রবল বৃষ্টিতে ভেজা পাখির ছানার মতো।


মহুয়ার চোখ জড়িয়ে আসে। ঘুমে ঢলে পড়ে। ঘন্টাখানেক পর ঘুম থেকে উঠে যায়। দোকান আছে বলে। সে মাকে জিজ্ঞেস করলো,


"মা,মিজান ভাই কীভাবে জানলো? আমাদের তো উদ্বার উনিই করলো। বাপরে! বীরের মতো গিয়ে হাজির হলো ঢাল তলোয়ার ছাড়া।"


"এই পোলার হাত পা দুই জোড়াই চারখান ঢাল তলোয়ার। আর কিছু লাগে? মিজানের অতীত মনে কইরা দেখ।"


"ঠিক বলছ মা। তুমি গেলে তাদের বাড়ি? না মিজান ভাই আসলো?"


"মিজানই আসলো। এসে কইলো,চাচী আমি পরশু বাড়ি আসছি। কাল বাড়িতে ছিলাম না। নানাদের বাড়িতে গেছিলাম। আইসা শুনলাম মিরন নাকি নিখোঁজ । আমি আজ সকালেই চিটাগাং চইলা যাইতাছি। তাই যাওয়ার আগে আপনারে দেখতে আইছি। মিরনের খোঁজ পাইছেন চাচী? 

পরে আমি কানতে কানতে কইলাম, বাবা হ হাঁচাই শুনছ। আলফু নাকি দেখছে মিরনরে মিলে ঢুকতে। তাই মহুয়া সাবেরের বাড়িতে গেছে। সাবের আবার মহুয়ারে বিয়া করতে চাইছে। মানা করনে ক্ষেইপা আছে আমাগো উপরে। তার দেওয়া ঘরের সব কাঠকুঠ নিয়া গেছে লোক দিয়া। 

এসব শুইনাই মিজান লম্বা লম্বা পা ফালায়া চইলা গ্যালো। আমারে কিছু কয়নাই। যদিও আমি বুঝতে পারছি মিজান সাবেরের বাড়িতেই যাইতাছে।"


"ওহ! এবার বুঝলাম কাহিনী। মিজান ভাই যাই করুক না কেন আমাদের পরিবারের সাথে আগে থেকেই ভালো চলে। বিপদে আপদে এগিয়ে আসে। সাবের বেটারে যেই উষ্ঠা লাথি আর শাসানি দিয়েছে মা, জনমের জন্য সোজা হয়ে যাবে আশাকরি। নইলে তো মিজান ভাই আছেই।"


"হ, এইটা আল্লাহর রহমত ছাড়া আর কিচ্ছু না। মিজানরে ফেরেশতার মতন সেখানে পাঠাইয়া দিলো তোগো দুই ভাইবোনরে রক্ষা করনের লাইগা। আবার বাড়ি আইলে একবেলা দাওয়াত দিয়া খাওয়ামু তারে। ঘরের পালা মুরগী জবা দিমু।"


"দিতে পারবা। সমস্যা নেই।"


বলেই মহুয়া কৃতজ্ঞতার সাথে মিজানকে স্মরণ করে। আস্তে ধীরে তৈরি হয়ে নেয় দোকানে যাওয়ার জন্য। মিরনের কথা আসিফকেও মোবাইলে জানিয়ে দিলো মহুয়া।


মহুয়া দোকানে যাওয়ার আগে ভাইকে ভালো করে শাসিয়ে দেয় মায়া মায়া কণ্ঠে। 

"ভাই আর কোনদিন ওই কুত্তার মিলে যাইবি না। কেউ তোর পকেটে টাকা ভরে দিলেও তার কথামতে কোথাও যাবি না। ক্ষেতে গিয়ে একটু খেলা দেখবি। আলফুর দোকানে গিয়ে চা খাবি। তারপর বাড়িতে চলে আসবি। মা আছে,তোর ভাগনি আছে। সময় কেটে যাবে এমনিই। বুঝলি ভাই।"


মিরন অনুগত হয়ে ঘাড় হেলিয়ে বোনের কথায় সম্মতি প্রকাশ করে।


মিজান বাসে যেতে যেতে ভাবতে থাকে মহুয়ার কথা। মহুয়া তার পাশের বাড়ির মেয়ে। সম্পর্কে চাচাতো বোন হয়। দেখতে আগের মতই লাস্যময়ী আছে। মেয়ে হওয়াতে বাহ্যিক সৌন্দর্যে এতটুকু ভাটা পড়েনি। মহুয়াকে বিয়ে করতে চাইলে কী তার পরিবার আপত্তি তুলবে? ভুল হয়ে গিয়েছে, মহুয়ার মোবাইল নাম্বারটা নেওয়া উচিত ছিলো। তাহলে তাদের পরিবারের খোঁজ খবর নেওয়ার বাহানায় টুকটাক কথা হতো মহুয়ার সাথে। এতে ভাব জমানো যেতো। মহুয়ার মনকেও বোঝা যেতো। 


মহুয়া দোকানে চলে যায়। আসিফও আসে দুপুরের দিকে। আসিফ সুযোগ খুঁজছে মহুয়াকে কিছু বলার জন্য। কিন্তু সুযোগ মিলছে না। সে চেয়েছে কথাগুলো মোবাইলে না বলে সরাসরি বলবে মহুয়াকে। কিছু বিষয় কিছু মানুষের মুখোমুখি হয়ে বললে বিপরীত মানুষটার দিক হতে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। দোকান শেষে মহুয়া বাড়ি চলে যায়। গিয়েই তার মায়ের কাছে শুনলো বুলবুলির দাদী সাপের কামড়ে মারা গিয়েছে।


 মহুয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাকে বললো,


"কে বলছে তোমাকে? পাশের বাড়ির ওই ভাবিটা?"


"হ। আহারে তকদির। তার ছোট পোলা জেলখানায়। মারে দেখতে আসতে পারবো নাকি,কি জানি। থানার নিয়ম ত কইতে পারি না। বেটি নাকি বাগিচার ভিতরে পাকা সুপারি পাড়তে গেছিলো। পানক সাপ কুণ্ডলী পাকাইয়া বইসা ছিলো। সে মাথা তুইলা সুপারি চাইতে চাইতে আগাইতাছিলো গাছের গোড়ার দিকে। অমনি সাপের গায়ে পাড়া পড়ছে। আর সাপে করছে দংশন। হাসপাতালেও নাকি নিছিলো। আহ জিন্দেগী! আহ মরণ! আল্লায় আমার মরণ ক্যামনে রাখছে কে জানে।"


মহুয়ার একটু খারাপ লাগলো তফুরার জন্য। পরক্ষণে আবার বিষিয়ে উঠলো মন। তফুরা তার সাথে শাশুড়ী হিসেবে যতটুকু ভালো চলেছে, তার চেয়ে বেশী নিষ্ঠুরতা করেছে। তার মেয়েকে মেরে ফেলেছে। তার বর্তমান মেয়েকেও মেরে ফেলার জন্য তার ভাতে বিষ মিশিয়েছে। খেতে দেয়নি ঠিকভাবে।


হালিমা বললো,

"তুই যাইবি নাকি? তোগো ত এহনও ছাড়াছাড়ি হইনাই।"


"আমি গেলে নানান কথা উঠবে মা। ঝামেলা পাকিয়ে যাবে। যেহেতু আমি তাকে ছেড়ে দিবো। আর গিয়ে কাজ নেই। একটার পর একটা বিপদ লেগেই আছে আমাদের। তাই সেদিকে সময় দিতে পারছি না। রাতে আসিফ ভাইকে ফোন দিবো। উনার তো পরিচিত ল.ইয়ার আছে। এর আগেও উনি আমাকে সঠিক তথ্য নিয়ে দিয়েছে।"


সন্ধ্যার পর মহুয়ার বড় জা তাকে ফোন দিলো। মহুয়াকে অনুরোধ করে বললো,


"তোর কাঁটা দূর হইছে। চইলা আয় মাইয়া নিয়া।"


"ভাবি সবকিছু মিলিয়ে জল যে পরিমাণ ঘোলা হয়েছে এবং যে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছে, আমার ফিরে যাবার অবকাশ নেই। মাফ করবেন আমাকে। একা আছি। ভালো আছি। বেঁচে আছি।"


জায়ের কথা শুনে মহুয়ার মনে হলো এখন আমানদের বাড়ির অন্যরাও তাকে ফুসলাতে থাকবে চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কারো কথায় পটে যাওয়া যাবে না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে হবে। যেই কথা সেই কাজ। 


সে রাতে মহুয়া নিজেই আসিফকে ফোন করলো। আসিফ অবাক হলো না। কারণ মহুয়া তাকে প্রয়োজনে মাঝে মাঝে ফোন করে। যদিও এর বাইরে কখনো ভুল করে মহুয়া তাকে ফোন দেয়নি। এমন কি সেও না। তবে মহুয়ার আজকের ফোন পেয়ে আসিফ অন্যদিনের চেয়ে খুশী হলো। সে নিজেই ভাবছে মহুয়াকে ফোন দিবে। কিন্তু মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো মহুয়ার অপ্রত্যাশিত ফোনকল তার হৃদয়ে সুখের ফল্গুধারা বইয়ে দিলো। যদিও আসিফ সেটা গোপন করলো মহুয়ার কাছে। মহুয়া সালাম দিলো। আসিফ সালামের জবাব দিয়ে ঠান্ডা গলায় জানতে চাইলো, 


"মহুয়া কেমন আছো? দোকানে সেই পরিবেশ ছিল না বলে জিজ্ঞেস করতে পারিনি কিছু। মিরন কেমন আছে?"


"আলহামদুলিল্লাহ মোটামুটি আছে মিরন। আমরাও আছি ঠিক যেমন থাকার কথা।"


মহুয়ার কণ্ঠ নিষ্প্রভ! ধীর! ক্লান্ত!


"তো বলো কী সমস্যা এখন?"


"ভাইয়া,আমি বুলবুলির আব্বুকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো। কীভাবে কী করতে হবে আমি তো জানি না। আপনি তো আগেও এমন বিষয়ে আমাকে হেল্প করেছেন, তাই আপনার শরনাপন্ন হলাম।"


"ঠিক আছে আমি খোঁজ খবর নিয়ে সব ওকে করছি। ফাইনাল করেই তোমাকে জানাবো।"


তার পরের সপ্তাহে মহুয়া আসিফের সাহায্য নিয়ে আমানকে তালাক দিয়ে দিলো। রুলস মেনে প্রথমে লিখিত নোটিশ পাঠালো আমানের কাছে তাদের বাড়ির ঠিকানায়। তারপর কাজির কাছে ও আমানদের গ্রামের চেয়ারম্যানের কাছে। এখন মাত্র কার্যকর হওয়ার অপেক্ষা। মহুয়া প্রলম্বিত স্বাস ছাড়লো। যেন তার বুকের উপর হতে বিশাল পাথর সরে গেলো।


তার দু'চারদিন পর এক রাতে আসিফ নিজেই ফোন দিলো মহুয়াকে। কারণ এখন মহুয়াকে যে কেউ বিয়ে করার প্রস্তাব দিতে পারে। দেরী করলে নিজেই ফেঁসে যাবে পরে। মহুয়া রিসিভ করলো। আসিফ একথা ওকথা বলল কিছুক্ষণ। তারপর বললো,


"মহুয়া,মানুষ হিসেবে আমাকে তোমার কেমন লাগে?"


"খুব ভালো লাগে আসিফ ভাই। অন্যের বিপদে যে মানুষটা নিঃস্বার্থভাবে মহানুভবতার হাত বাড়িয়ে দেয়,সে নিঃসন্দেহে একজন ভালো মনের অধিকারী। তাকে পায়ে ঠেলার বা ইগনোর করার কোন সুযোগ নেই।"


মহুয়ার অকপট স্বীকারোক্তি।


মহুয়ার কথা শুনে আসিফের নিজের উপর আত্মবিশ্বাস দিগুণ হয়ে গেলো। তার অন্তরটা নেচে উঠলো। সে নড়েচড়ে বসলো বুক টানটান করে। কণ্ঠে রসসুধা ঢেলে বললো,


"আমি তোমার ও বুলবুলির এক আকাশ নির্ভরতা হতে চাই। চিরদিনের জন্য। নির্ভর করা যায় আমাকে?"


মহুয়া বিদুৎ শকের মতো কেঁপে উঠলো। হাত থেকে মুঠোফোনটা পড়ে গেলো বিছানার উপরে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে। এ কী শুনলো সে? সত্যি না-কি বিভ্রান্তি!


"হ্যালো...হ্যালো...মহুয়া এনি প্রবলেম? আমাকে শুনতে পাচ্ছো?"


মহুয়া অবিশ্বাস্য চোখে মোবাইলের স্ক্রিনের উপরে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। ওপ্রান্ত হতে ভেসে আসছে আসিফের ভরাট অথচ নরম কণ্ঠস্বর। 

 

পরের পর্ব গুলা এই ওয়েবসাইটেই দেওয়া হয়েছে দেখেন? 

চলবে...১৪

চলবে...১৩

চলবে...১২

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url