#লাল_শাড়ী (২)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
প্রায় সময় ইমাদের বন্ধুর পরিবাররা বাড়িতে আসতো। তাদের সবার সামনে মহুয়া সবসময় বলতো,“ও শিউলি। আমাদের বাড়ির কাজের মেয়ে।”
এই কথাটি শুনতে শিউলির ভালো লাগতো না। তার কিশোরী মন হৃদয় দিয়ে এই বাড়ির সদস্য হওয়ার জন্য লড়ে যাচ্ছে। মহুয়ার মন জয় করতে জান দিয়ে সব কাজ নিখুঁত করার চেষ্টা করছে। তার মায়ের সঙ্গে সব কাজই করতো শিউলি। তাই কাজে বেশ পারদর্শী। আরও পারদর্শী হওয়ার চেষ্টা করছে। শুধুমাত্র মহুয়ার মন জয় করতে। কিন্তু লাভ হচ্ছে না। মহুয়া তাকে বোন বা পরিবারের কোন সদস্য ভাবতে পারছে না। তার সঙ্গে বোনের মতো আচরণ করলেও তাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার সময় ‘কাজের মেয়ে’ বলে। এটা ভীষণ খারাপ লাগে শিউলির। কিন্তু অন্যের আশ্রয়ে থাকা মানুষের মন খারাপের মূল্য কি? এটা ভেবে শিউলি মন খারাপ নিমিষেই দূর করে ফেলে। তবুও হৃদয়ের কোনে কষ্টটা জমা হয়ে যায়।
আজ শুক্রবার। মহুয়া তৈরি হতে ব্যস্ত। আজ তার এবং ইমাদের এক বন্ধুর বাড়ি দাওয়াত। সেজন্য তৈরি হচ্ছে তারা। ইমাদ একটি শার্ট বের করে মহুয়াকে দেখিয়ে জানতে চায়,“এটা পড়বো?”
“পড়ো।”
মহুয়া খুশি মনে বলে। পরক্ষণে তার মুখটায় চিন্তার ভাজ পড়ে। এটা দেখে ইমাদ তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। নরম গলায় বলে,“তোমায় দেখে মনে হচ্ছে, দুনিয়ার সব চিন্তা তোমার মাথায় কেউ দিয়ে গেছে। ঘটনা কি?”
“আচ্ছা আমরা যে শিউলিকে ঘরে রেখে যাবো, ও আবার কিছু চু*রি করে পালিয়ে যায় যদি?”
মহুয়া ঘরের কর্তী। তাই তার এই চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। তার জন্য শিউলি তো শুধুমাত্র কাজের মেয়ে। তবে ইমাদ তো সত্যি জানে। শিউলির সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। তবে তার বাবা চায় না এটা লোকে জানুক। তাদের স্ট্যাটাসের সঙ্গে এমন আত্মীয় যায় না। মানবিকতা দেখিয়ে তার দায়িত্ব নিয়েছে এই ঢের। তবুও সত্যি তো এটাই শিউলি ইমাদের বোন। ইমাদ পুরোপুরি না চিনলেও শিউলি যথেষ্ট চিনে। তাই আশ্বাস দিয়ে বলে,“চিন্তা করো না। শিউলি ওমন মেয়ে নয়।”
“তবুও…।”
মহুয়া তাও চিন্তা করছে। এটা দেখে তাকে ঘুরিয়ে তার কপালে চুমু খেয়ে ইমাদ বলে,“দুনিয়ার সব সহজ। শুধু তোমায় একটু সহজ করে সবটা ভাবতে হবে। তবেই দেখবে সব সহজ এবং সুন্দর।”
একটু থেমে মজা করে বলে,“হয়েছে, ধার করে চিন্তা নিয়ে আসতে হবে না মাথায়। এত সহজ নয় আমার বাসা থেকে চু**রি করে পালানো। বুঝলে?”
শিউলি চা দিতে এসে দু’জনার কথা শুনতে পায়। সে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে যায়। তাই চা না দিয়ে চলে যায়। বাস্তবতা হিসাব করলে, মহুয়া ভুল নয়। কিন্তু শিউলি কষ্ট পায়। সে তো তাদের আপন ভাবে। এভাবে এই বাড়িতে মাস খানেক কাটিয়ে দেয় শিউলি। এই তো মন খারাপ, পরক্ষণে মনকে কিছু একটা বুঝ দিয়ে ভালো করে ফেলে। শিউলি নিজেই নিজেকে বোঝায়,“আমি তাদের স্থানে থাকলে হয়তো এই দয়াটুকু করতাম না। তারা তো বেশ করছে।”
আবার একটু থেমে বলে,“তাছাড়া আমিও তো তারা এত উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলেই আত্মীয় মানছি। তারা আমাদের মতো হলে হয়তো তাদের আপন হওয়ার সাধ জাগতো না।”
এভাবে নিজেই নিজেকে বোঝায় শিউলি। মাস ছয়ের মাঝে নিজেকে এই বাড়ির কাজের লোক হিসাবে মানিয়ে নেয়। এটাই তার পরিচয়। এই পরিচয়টা মেনে নেয় শিউলি। অবশ্য এতদিনে মহুয়া এবং ইমাদের সে বেশ বিশ্বস্ত হয়ে গিয়েছে। সেই সঙ্গে কিছুটা কাছের। হবে নাই না কেন? বিনা পয়সায় কাজের মেয়ে পেয়েছে যে। শুধু থাকা খাওয়ার বিনিময়ে ঘরের যাবতীয় কাজ করিয়ে নেওয়া চারটি খানি কথা নয়। এমন মানুষ পেয়ে কে না আপন বানাবে? শিউলিও সবটা মানিয়ে নেয়।
___
“এদিকটায় রং ভালো হয়নি। এটা আবার করতে হবে। ওখানটায় ঐ কালার নয় লাল কালার হবে।”
বাড়িতে রং করা হচ্ছে। শিউলি দাঁড়িয়ে থেকে সবটা নজরে রাখছে। ভুলক্রটি ধরিয়ে দিচ্ছে। এই গুরু দায়িত্ব পালণ করে নিজেকে একটু বাড়ির একজন লাগছে। মালকিন, মালকিন ভাব চলে এসেছে। এই তো আর এফ এলের চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে, একের পর এক হুকুম দিয়ে যাচ্ছে রং মিস্ত্রিদের। কর্তী লাগবে না কেন? তবে তার এই হুকুম বেশিক্ষণ চললো না। রং মিস্ত্রির কাজে তিনজন ছিলো। দুজন মধ্য বয়স্ক লোক, একজন যুবক লোক। সেই যুবকটি শিউলির আচরণে প্রচন্ড বিরক্ত হয়।তাই আর সহ্য করতে না পেরে বলে,“আপনি এত ভালো বুঝছেন তবে আপনিই কাজটা করেন, আমরা চললাম।”
“চললাম মানে? গুনে গুনে টাকা নিয়েছেন অগ্রিম, এখন কাজ ফেলে চললাম মানে? মগের মুল্লুক পেয়েছেন?”
শিউলি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কথাটা বলে। যুবক ছেলেটি অর্থাৎ রবি বিরক্তি নিয়ে বলে,“আমরা আমাদের কাজে এত খবরদারি করা পছন্দ করিনি। স্যরি এত ভুল ধরলে কাজ করা যাবে না। আমরা পারবো না।”
রবি কথাটি বলে বাকি দুজনকে বলে,“চাচা অগ্রিম টাকা ফেরত দিয়ে চলো।”
রবি প্রচন্ড রেগে গিয়েছে। সেই সঙ্গে শিউলি কিছুটা বাড়াবাড়ি করছে বুঝতে পেরে নিজেই নিজেকে বকে বলে,“মাথামোটা শিউলি, এটা কি করলি? এখন ভাইয়া ভাবী আসলে কি জবাব দিবি তুই গাধী?”
শিউলি কিছুটা হকচকিয়ে যায়। পরক্ষণে নিজেকে সামলে রবিকে বলে,“আচ্ছা আচ্ছা। আর বেশি কথা বলবো না। আপনারা কাজ করুন।”
“না। আমরা কাজ করবো না। কারণ আপনি আমাদের সঙ্গে খুবই দূর্ব্যবহার করেছেন।”
রবির কথা শুনে শিউলি চোখ বড় করে তাকায়। কিছুটা বিষ্ময় নিয়ে বলে,“এরমাঝে দূর্ব্যবহার কই পেলেন? একটু কাজ দেখবো না? একটু বেশিই ভাব নিচ্ছেন মনে হয় না?”
রবির সঙ্গে থাকা দুজন। অর্থাৎ তার চাচারা বলে,“এত ঝামেলা করার প্রয়োজন নেই। এবার আমরা কাজ করি। এরপর বেশি করলে নাহয় বাদ দিবো।”
রবি জবাব দেয় না। সে শিউলির দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শিউলি তার চাহনি দেখে কিছুটা ভয় পায়। দুষ্টু লোক ভেবে সন্দেহও করে। তখনই রবি তার আর একটু কাছে এসে আস্তে করে বলে,“কাজের মেয়ের মালকিনের মতো ভাব নিতে মন চাইলে, আমাদেরও ভাবটা বেশিই দেখাতে হয়।”
“মানে!”
শিউলি হতভম্ব হয়ে যায়। রবি মুচকি হাসি দিয়ে কাজে মন দেয়। আর কাজ করতে করতে বলে,“ইমাদ ভাইয়া আমার পরিচিত মানুষ। সেজন্য কাজটা ফেলে যাচ্ছি না। তবে অবশ্যই আমি তাকে নালিশ করবো, তার বাড়ির একজন এভাবে আমাদের….।”
শিউলি আর কিছু শুনতে পায় না। শোনার মতো অবস্থায় সে ছিলো না। ইমাদ রবির পরিচিত কথাটা দ্বারা সে যা বোঝার বুঝে গিয়েছে। ইমাদ এবং মহুয়া আজ বাড়ি নেই। সকালে যাবার সময় ইমাদ শিউলির হাতে টাকা দিয়ে বলে,“রং মিস্ত্রি আজকে থেকে কাজ শুরু করবে। যেহেতু আমরা থাকবো না তাই তুই অগ্রিম টাকাটা দিয়ে দিস। আর কাজটা বুঝিয়ে দিস। দোতলার কোন রুমে কোন রং করবো, তা তো জানিস। সবটা বুঝিয়ে বলিস।”
“আচ্ছা।”
শিউলি সম্মতি জানিয়ে টাকাটা নেয়। ইমাদ এবং মহুয়া চলে যায়। সকাল দশটার দিকে রবিরা আসে। রবির চাচা আগ বাড়িয়ে শিউলিকে ঘরের একজন ভেবে নেয়। শিউলি এটা দেখে একটু কর্তী হওয়ার মজা নিতে বড্ড বেশি ভাবের সঙ্গে কথা বলে। শুধু তাই নয়, ইচ্ছে করে তাদের ভুল ধরছিলো। এটা সে মজা করেই করছিলো। কিন্তু এখন রবি যদি ইমাদকে বিচার দিয়ে দেয়। আজ অবধি সেভাবে বকা খায়নি শিউলি। ইমাদ বা মহুয়া তাকে টুকটাক মাঝেসাজে ভুল ধরিয়ে দিলেও সেভাবে বকেনি। কারণ তার ভুলটা যে কম হয়। এখন এই ঘটনায় যদি রেগে যায় এবং খুব বকে। তাছাড়া তারা কি ভাববে? শিউলিকে লোভী ভাববে? সে এই বাড়ির মালকিন হওয়ার স্বপ্ন দেখে, এমনটা ভাবতে পারে। এমন হলে শিউলির জন্য বিষয়টা খুবই জঘন্য হবে। এজন্য শিউলি ভয় পেয়ে যায়। রবি শিউলির ভয়টা বুঝতে পারে। সে আড়চোখে শিউলিকে দেখছিলো। সে শিউলির ভয় দেখে মনেমনে বেশ মজাই নেয়। সকালে রবির ইমাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। ইমাদ তখনই জানিয়ে দিয়েছিলো,“আমরা বাড়ি থাকবো না। আমাদের বাড়ির কাজের মেয়েটি থাকবে, তার থেকে সব বুঝে নিও।”
’
’
চলবে,
(ভুলক্রুটি ক্ষমা করবেন। কেমন হয়েছে?)
কেমন লাগলো???৩য় পর্ব এই ওয়েবসাইটেই দেওয়া হয়েছে দেখেন।
