গল্প: অতীত। 

দ্বিতীয় পর্ব 


যেখানে অতীত কথা বলতে শেখে, কিন্তু মুখ খুলে না

মিতু ঠিক জানে না, সে কতক্ষণ মেঝেতে বসে ছিল।


সময় থেমে গিয়েছিল।ঘড়ির কাঁটা চলছিল, কিন্তু তার ভেতরে কিছু একটা হঠাৎ থেমে গেছে।


হাজী আবদুল করিম এখনো তার হাত ধরে আছেন।


চাপটা খুব শক্ত না।কিন্তু অদ্ভুতভাবে দৃঢ়।

যেন কেউ অনেক বছর ধরে একটা কথা চেপে ধরে রেখেছে—এখন হঠাৎ সেটা হাত দিয়ে বলে দিচ্ছে।


মিতু ধীরে মাথা তোলে।হাজী সাহেবের চোখ দুটো লাল। ভেজা। কিন্তু অদ্ভুত শান্ত।এই চোখ সে আগে দেখেনি।


এই চোখে ভয় নেই। লজ্জাও নেই।এই চোখে আছে… স্বীকৃতি।


মিতুর গলা শুকিয়ে আসে।


— আ… আপনি…?কথাটা শেষ করতে পারে না সে।

হাজী সাহেব কথা বলতে পারেন না।কিন্তু তিনি চোখ বন্ধ করেন।আবার খোলেন।


একবার।তারপর ধীরে ধীরে।

এই ভঙ্গিটা মিতু চেনে।


এই ভঙ্গিটা সে জীবনে একবারই দেখেছে।

সেই রাতে।

পনেরো বছর আগেতখন মিতুর বয়স দশ।


ময়মনসিংহের একটা আধা-পাকা বাড়ি।

বিদ্যুৎ ছিল না সেদিন।হারিকেন জ্বলছিল।

মা রান্নাঘরে।বাবা উঠানে।

হঠাৎ গন্ধটা আসে।ধোঁয়ার গন্ধ।

আ*গুনের শব্দ প্রথমে কেউ বোঝে না।আ*গুন শব্দ করে না।আগুন আসে নিঃশব্দে।

তারপর চিৎকার।মা’ র চিৎকার।বাবার গলা।

ছাদে আ*গুন ধরে গেছে।মিতু তখন দৌড়াচ্ছে।

কিন্তু কোথায় যাবে, জানে না।

ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে যাচ্ছে।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

ঠিক তখনই কেউ তাকে তুলে নেয়।একজন লোক।

মুখ দেখা যায় না।শুধু গলার স্বর—

— চোখ বন্ধ কর মা… চোখ বন্ধ কর।

লোকটার শরীর গরম।ভীষণ গরম।

মিতু অনুভব করে—লোকটার বুকের পাশে একটা শক্ত দাগ।পো*ড়া দাগ।তারপর আর কিছু মনে নেই।


হাসপাতালে জ্ঞান ফেরে।

মা নেই।বাবা নেই।

শুধু এক নার্স বলেছিল—

— কেউ একজন আ*গুনের ভেতর ঢুকে তোমাকে বের করেছে। নিজে পু*ড়ে গেছে। তারপর চলে গেছে।

লোকটার নাম কেউ জানে না।

মিতু শুধু জানে—

তার শরীরের এই দাগটা সেই রাতের।

আর এখন…একই দাগ,হুবহু একই!


হাজী আবদুল করিমের শরীরে।মিতু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।ঘরটা হঠাৎ খুব ছোট মনে হচ্ছে।


— আপনি… আপনি কেন…?

কথা আসে না।

হাজী সাহেব তাকিয়ে থাকেন।তারপর চোখ নামিয়ে নেন।

লজ্জা?না।এই চোখে লজ্জা নেই।

এই চোখে আছে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি।

মিতু হঠাৎ বুঝতে পারে—

এই মানুষটা কথা বলতে না পারলেও,

তার ভেতরে জমে আছে পুরো একটা ইতিহাস।


আর সেই ইতিহাসে সে নিজেই জড়িয়ে আছে।

বাইরে হঠাৎ গাড়ির শব্দ।

মিতুর বুক ধক করে ওঠে।

রাহিব!

এত তাড়াতাড়ি?

সে তো বলেছিল কাল রাতে ফিরবে!

মিতু জানে—এই মুহূর্তে যদি রাহিব ঘরে ঢোকে,

এই দৃশ্য দেখলে…সবকিছু ভেঙে পড়বে।


সে তাড়াতাড়ি হাজী সাহেবের গায়ে চাদর টেনে দেয়।

হাত ছাড়াতে গিয়ে দেখে—

হাজী সাহেব তার হাত ছাড়ছেন না।

মিতু নিচু গলায় বলে—

— আব্বা… ছাড়ুন… ও চলে এসেছে…

হাজী সাহেব ধীরে চোখ বন্ধ করেন।

তারপর খুব কষ্টে, প্রায় অদৃশ্য ভঙ্গিতে মাথা নাড়ান।

না!

মানে—

“এখন না।”

মিতুর মাথা ঘুরে যায়।

— এখন না মানে কী?

দরজায় পায়ের শব্দ।

রাহিবের গলা—


— মিতু? তুমি কোথায়?


মিতু তাড়াতাড়ি দরজার দিকে যায়।


— আমি… আমি রান্নাঘরে ছিলাম।গলা কাঁপছে।

রাহিব ঘরে ঢোকে।চোখ বুলিয়ে নেয় চারপাশ।

পরিষ্কার বিছানা,পরিচ্ছন্ন ঘর।

এক মুহূর্ত থামে।

— আজ শফিক আসেনি, তাই না?

মিতু মাথা নাড়ে।

— আমি পাশের লোকটাকে ডেকেছিলাম।

রাহিব তাকিয়ে থাকে।খুব গভীরভাবে।

এই তাকানোটা মিতু চেনে।

এই তাকানো মানে—

রাহিব বুঝে ফেলেছে, কিছু একটা হয়েছে।

— তুমি কি… আব্বার ঘরে ঢুকেছিলে?

মিতু চুপ।

চুপ থাকাই এখন সবচেয়ে বড় স্বীকারোক্তি।

রাহিবের মুখ শক্ত হয়ে যায়।

— মিতু, আমি একটা কথা বলেছিলাম।

— জানি।

— তাহলে?

মিতু চোখ তোলে,সরাসরি তাকায়।

— যদি আমি না ঢুকতাম… উনি আজ সারাদিন নোংরা অবস্থায় থাকতেন।

রাহিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।

তারপর ধীরে বলে—

— তুমি জানো না, তুমি কী খুলে ফেলেছ।

এই কথাটার ভেতরে হুমকি নেই।ভয় আছে।


মিতুর গলা শুকিয়ে আসে।

— আমি দাগ দেখেছি।

এক সেকেন্ড,দুই সেকেন্ড নিরাবতা

রাহিবের চোখ বড় হয়ে যায়।

— কোন দাগ?

-বাবার শরীরে আ*গুনের পো*ড়া দাগ। 

রাহিব চেয়ারে বসে পড়ে।হাত দিয়ে মুখ ঢাকে।

অনেকক্ষণ কিছু বলে না।

তারপর খুব আস্তে বলে—

— বাবা বলেছিল… এই দিনটা আসবে।

মিতু অবাক।

— মানে?

রাহিব উঠে দাঁড়ায়। অস্থিরতায় কিছুক্ষন হাঁটে।

জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।

— তুমি জানো না মিতু… আব্বা কী ছিলেন।

মিতু কিছু বলে না।

— উনি শুধু আমার বাবা না।

এক সময় উনি ছিলেন… অন্য মানুষ।

রাহিব ঘুরে তাকায়।

— তুমি যে আ*গুনের রাতটার কথা বলছ…

সেই রাতে বাবা পুলিশে আ*ত্মসমর্পণ করেছিলেন।

মিতুর শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।

— কী?

— ওই আ*গুনটা দুর্ঘটনা ছিল না।

মিতুর মাথার ভেতর যেনো সব কিছু শূন্য হয়ে গেছে। 

— তাহলে?

রাহিব চোখ নামিয়ে বলে—

— ওই বাড়িতে… লুকিয়ে রাখা ছিল কিছু মানুষ,কিছু নাম,কিছু টাকা।

— কী টাকা,কিসের টাকা?

— কালো টাকা।

মিতু বসে পড়ে, যেনো রহস্যময় কোন সিনেমার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে! 

— আ*গুনটা লাগানো হয়েছিল প্রমাণ নষ্ট করার জন্য।

মিতুর মাথা ঝিমঝিম করে।

— তাহলে আমি…?

রাহিব খুব ধীরে বলে—

— তুমি ভুল জায়গায় ছিলে, ভুল সময়ে।

নীরবতা।

ভয়ানক নীরবতা।

— বাবা ঢুকেছিল শুধু তোমার জন্য না।

— তাহলে?

— উনি ঢুকেছিল… নিজের পাপের মধ্যে থেকে একজনকে অন্তত বাঁচাতে।

মিতুর চোখে জল আসে।

— উনি আমাকে বাঁচিয়েছেন… আর আমার পরিবার?

রাহিব কিছু বলে না।

এই না বলাটাই সবচেয়ে ভ*য়ংকর।

ঠিক তখনই—

হাজী আবদুল করিমের ঘর থেকে একটা শব্দ আসে।

একটা খুব ছোট শব্দ,কিন্তু পরিষ্কার।

একটা অক্ষর।

ভাঙা-ভাঙা... 

কষ্টে বের হওয়া।

— মি…তু…

রাহিব আর মিতু দুজনেই জমে যায়।

কারণ—পাঁচ বছরে এই প্রথম,

হাজী আবদুল করিম, কথা বললেন।

আর দরজার ওপাশে,কারা যেন ফিসফিস করে উঠল—

কারণ ওই বাড়িতে,এই মুহূর্তে

শুধু তারা তিনজন ই ছিলো তাহলে কাদের কথার ফিসফিস শব্দ শোনা যাচ্ছে.....! 🥺


⏭️চলবে..........

লেখা: 1 Minute With Mitu  


গল্পটা কেমন লাগছে আপনার কাছে অবশ্যই কমেন্ট এ আপনার মূল্যবান মতামত জানাবেন ❤️


৩য় পর্বের লিংক এই ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url