তৃতীয়পক্ষ

পর্ব_০২

অনন্যা_অসমি


রোদ্দুর চলে যাওয়ার পর ঘরটা অদ্ভুত রকম নিরব হয়ে গেল। মাহা দরজাটা বন্ধ করল ঠিকই কিন্তু নিজের ভেতরে থাকা সন্দেহ এবং ভীতিকে তালা বন্ধ করতে পারল না।


খাওয়া শেষে বিছানায় এসে বসে ফোনটা হাতে নিল মাহা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত দশটার একটু বেশি বাজে। 


মাহা নিজেকে আটকাতে পারল না, রোদ্দুরকে ফোন করল। একবার দু’বার… তৃতীয়বার রিং হতে ফোনটা ধরল রোদ্দুর।


" বলো।" 


মাহা কান খাড়া করে অপর পাশ থেকে অন্য শব্দ শোনার চেষ্টা করল। 


" কথা বলছ না কেন?" 


" পৌঁছালে?”


" না, বাস ছাড়তে দেরি হচ্ছে। স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি।”


“ তোমার সাথে কে আছে?”


সাথে সাথে উওর দিল না সে। কিছুটা সময় নিয়ে জানাল,


" বললাম তো, জুনিয়র এসেছে সাথে। তুমি এতো চিন্তা করো না।" 


" আচ্ছা সাবধানে থেকো।”


" হুম। রাখছি।"


লাইন কেটে দিল রোদ্দুর। ফোন করার পর মাহার বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন আরো বেড়ে গেল। এতদিন রোদ্দুরের সাথে থেকে তার স্বভাব সে ভালোমতোই জানে। যখন সে বিরক্তবোধ করে তখন তার কথাবার্তা এরকমই শোনায়। আজও তার স্বরে যেন বিরক্তির রেশ ছিল। 


রাত বাড়ছে। মাহা বিছানায় শুয়ে পড়লেও ঘুম আসছে না তার। চোখ বন্ধ করলেই বাচ্চাদের জামাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, এছাড়াও নানা চিন্তা। 


মাহা জানে, সন্দেহ খুব ছোট্ট একটা শব্দ। কিন্তু এই ছোট্ট শব্দটাই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াতে পারে। সে নিজেকে বারবার বোঝাতে লাগল তার ভাবনা সঠিক নয়। রোদ্দুর এমন মানুষ না।

.

.


রোদ্দুর ফিরে এসেছিল মাঝরাতের দিকে। সকালে সে বের হতেই মাহা ব্যাগটার তল্লাশি করতে লাগল।


অফিসের পর ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো রোদ্দুর। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতেই তার নজরে এলো মাহার মুখশ্রী। 


" কি হয়েছে? এমন করে তাকিয়ে আছ কেন?”


মাহা সরাসরি তার চোখে চোখ রেখে বলল,


" একটা কথা জিজ্ঞেস করব। সত্যি সত্যি উওর দেবে?" 


রোদ্দুর ভ্রু কুঁচকে এলো।


" কি?”


" তোমার ব্যাগে বাচ্চাদের কাপড় ছিল সেটা কোথায়?”


মুহূর্তের জন্য ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল। রোদ্দুর যেন থতমত খেয়ে গেল। 


" কী বলছ এসব?”


" আমি পরিষ্কার করেই বলেছি। তোমার শেষ ট্যুর থেকে আসার পর ব্যাগে বাচ্চাদের একটা জামা ছিল। সেটা আমি আবারো রেখে দিয়েছিলাম।কিন্তু এখন সেটা আর নেয়। কোথায় গেল সেটা?" 


রোদ্দুর ঘুরে তাকাল। কর্কশ কন্ঠে বলল, 


" তুমি আমার ব্যাগে আমার অনুপস্থিতে হাত দিয়েছ কেন?" 


" রোদ্দুর! আমি তোমার স্ত্রী৷ তোমার যেকোন জিনিসের উপর আমার অধিকার আছে। স্বাভাবিক এই অদ্ভুত জিনিসে আমার অবাক হওয়া স্বাভাবিক।" 


" তুমি আমাকে সন্দেহ করছ?” খানিকটা উচুঁ স্বরেই বলল সে। 


" আমি তো তা বলিনি। আমি প্রশ্ন করছি, এতটুকু জিজ্ঞেস করার অধিকার নিশ্চয়ই আমার আছে?" কার বাচ্চার কাপড় ওটা?” শেষ কথাটা বলার সময় মাহার কণ্ঠ যেন কেঁপে উঠল। 


রোদ্দুর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বিরক্তির সঙ্গে বলল,


" আমরা যে বাসায় উঠেছিলাম হয়ত ওই বাসায় বাচ্চার। তাড়াহুড়োতে ব্যাগে ঢুকে গেছে।”


" হয়ত?" 


" মাহা, তুমি কেন এমন করছ? তোমাকে তো বলেছে কারণ?" 


" তোমার বলা কারণ আমি বিশ্বাস করতে চাইলেও কিন্তু মন মানছে না।”


রোদ্দুর রাগে টেবিলে হাত চাপড় মারল, বিকট একটা শব্দ শোনা গেল।


" এই হচ্ছে তোমার সমস্যা! তোমার মনটাকে সবসময় উজুহাত হিসেবে নিয়ে আসো। তোমার বাচ্চা নেই বলে কি আর কারো থাকবে না? তুমি সবসময় নিজের দুর্বলতা দিয়ে সবকিছু বিচার করো।" 


মাহা যেন একমুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।


" দুর্বলতা?" 


" হ্যাঁ, দুর্বলতা। তোমার বাচ্চা নেই বলে যে দুনিয়াতে কারো বাচ্চা থাকবে না এমন তো কোন কথা নেই।" 


" রোদ্দুর! তুমি এভাবে বলতে পারলে?"


" কি বললাম? তুমিই বেশি বাড়াবাড়ি করছ।" 


" বাড়াবাড়ি? আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম। যেটা আমার অধিকার। আর আমার কোন সমস্যা নেই, আমি শারীরিকভাবে বাচ্চা নেওয়ার জন্য একদম সুস্থ। তুমিই বাচ্চা নিতে আগ্রহী না। তুমিই ভিন্নভাবে সবসময় কথাটা এড়িয়ে যাও।"


রোদ্দুর চুপ হয়ে গেল তবে মূহুর্তেই গমগম স্বরে প্রশ্ন করল,


" তাহলে কী চাও তুমি? বলো! আমি কি প্রতিটা জিনিসের হিসেব তোমাকে দেব?”


" আমি শুধু সত্যটা জানতে চাই।”


" এইটাই সত্য।”


" কিন্তু আমার মন কেন বলছে এটা তোমার বানানো মিথ্যা আমাকে অন্ধকারে রাখার জন্য।" 


রোদ্দুরের চোখে৷ রাগের আভাস দেখা গেল। 


" মাহা তুমি এবার সীমা ছাড়াচ্ছ।”


" আর তুমি যে মিথ্যা বলছ।" 


দু’জনের মাঝখানে যেন অদৃশ্য স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। রোদ্দুরকে অন্য রুমের দিকে যেতে দেখে মাহা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, 


" পালাচ্ছ?”


" তোমার আজগুবি সন্দেহ নিয়েই থাকো তুমি। কথায় আছে না চোরের মন পুলিশ পুলিশ। তোমার হাবভাবও সেইরকমই।"


দরজা ধপ করে বন্ধ করে দিল সে। মাহা সোফায় বসে পড়ল। বুকের ভেতর থাকা কষ্ট যেন আরো ভারী হয়ে এলো। অবিশ্বাস, সন্দেহ আর পুরোনো ক্ষত সব মিলিয়ে মাহার মাঝে এক যুদ্ধ চলছে।


দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দটা আজ অস্বাভাবিক রকম জোরে কানে লাগছিল। সেই রাতটা মাহার কেটে গেল নির্ঘুমে। 


পরের ক’দিন তাদের সম্পর্কের ভেতরে একটা শীতলতা নেমে এল। প্রয়োজনের কথাটাও যেন এখন হয় না। 


রোদ্দুর ইদানিং রাতে দেরি করে ফেরে। আগের মতোন মাহা আর অপেক্ষা করে না। তাদের একসাথে খাওয়া হয় না। একসাথে বসে গল্প করাও যেন এখন শুধুই স্মৃতি। রোদ্দুর এখন আলাদা রুমে রাতে থাকে। 


বাইরে মাহা শক্ত থাকলেও একা একা তারাও দম বন্ধ হয়ে আসে। সে যেন রোদ্দুর থেকে নয় সত্যি থেকে পালানোর চেষ্টা করছে প্রতিনিয়ত। মাহা মাঝে মাঝে ভাবে সে কি সত্যিই বাড়াবাড়ি করছে?

নাকি এই অস্বস্তিটাই তার মনের দেওয়া সতর্ক সংকেত?


মাঝে এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল। এবার রোদ্দুর কোথাও যায়নি। নতুন সপ্তাহের বৃহস্পতিবার আজ। 


সকাল থেকে রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল। পেছনে কারো অস্তিত্ব বুঝতে পেরে ঘুরে তাকাল। রোদ্দুরকে দেখে চমকে উঠল সে। নিজেকে স্বাভাবিক করে জানতে চাইল,


" তুমি এখনো যাওনি?”


" আজ বিকালে তাড়াতাড়ি আসব৷ তৈরি হয়ে থেকো।" 


" কেন?" 


" বাইরে যাওয়ার জন্য কারণ লাগে নাকি? সুন্দর করে সেজে তৈরি হয়ে থেকো।" 


" আমার ভালো লাগছেনা। তুমি যাও।"


রোদ্দুর নিজে থেকেই এগিয়ে এলো। বলল,


' আমার কথায় সেদিন তুমি কষ্ট পেয়েছিলে।

খা"রাপ কথা বলেছি। সরি মাহা।" 


মাহা তাকাল। এই প্রথম কয়েকদিন পর সরাসরি চোখে চোখ রাখল সে। একটু থেমে আবারো বলল, 


" আমি রেগে গিয়েছিলাম। রাগের বশে আমার এমন কথা উচিত হয়নি।" 


মাহা চুপ করে রইল। কথা যেন বের হতে চাইছে না। 


" রোদ্দুর, সরি বললেই কী সব সমাধান হয়ে যায়?" 


" আমি জানি তা হয় না। ভুলটা আমারো সেটা আমি স্বীকার করছি৷ আমি উচিত হয়নি ওভাবে বলা। এতোদিন আমি নিজের করা কাজের জন্য লজ্জিত ছিলাম বলেই তোমার সামনে আসতে পারিনি৷ আজ আমি তোমার সাথে সময় কাটাবো। আমাদের সম্পর্কে মাঝে যে দেয়াল তৈরি হয়েছে সেটা আর বাড়তে দেব না আমি।" 


 

মাহা অবাক হল সাথে যেন খুশীও। মনে মাঝে তার আনন্দের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। 


সেদিন সত্যিই রোদ্দুর তাকে সময় দিয়েছিল। তার মাঝে যেন সত্যি কারের খুশী, অনুশোচনা দেখতে পেয়েছিল মাহা। সেই মূহুর্তে মাহার নিজের ভাবনার উপরেই সন্দেহ হতে লাগল!

.

.


রোদ্দুরে অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে আছে মাহা। তার হাতে একটা ব্যাগও দেখা যাচ্ছে। চারিপাশে ভালো মতো একবার চোখ বুলিয়ে নিল। সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্থ। রোদ্দুরকে না বলেই এসেছে সে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফোন করল না। রিসিপশনে এসে দাঁড়াল মাহা। রিসেপশনিস্ট মেয়ে তাকে দেখে এগিয়ে এলো। 


" আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি ম্যাম?" 


" আমার কিছু জানার ছিল।" 


" বলুন কী জানতে চান?" 


" আচ্ছা আপনাদের অফিস থেকে প্রতি সপ্তাহে কোথাও যেতে হয়? মানে কোন মিটিং বা জিনিস পত্রের হিসাবের জন্য?" 


রিসেপশনিস্ট মেয়ে কি রকম দৃষ্টিতে তাকাল সে। পরক্ষণেই চোখমুখ স্বাভাবিক করে জানাল, 


" সরি ম্যাম, অফিসের ভেতরে তথ্য আমরা বাইরের কাউকে জানাতে পারি না। আর এসব তথ্য আমাদের সেভাবে জানা নেই। এগুলো ডিপার্টমেন্ট অনুযায়ী উপর থেকে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়।" 


" আচ্ছা, ধন্যবাদ।" হতাশা হলো মাহা। যে কাজের জন্য এসেছিল তার কিছুই হলো না।


ভারাক্রান্ত মনে রোদ্দুরকে ফোন করে নিচে আসার কথা বলল। 


কয়েক মিনিট পরেই রোদ্দুর এলো, হাঁপাচ্ছে সে। মাহার হাত টেনে তাকে এক পাশে নিয়ে এলো৷ খানিকটা রাগী স্বরেই বলল, 


" তুমি এখানে কেন এসেছ? তোমাকে না বলেছি বাসা খালি রেখে বের হবে না?" 


" তোমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছিলাম। আজ তো তাড়াহুড়ো করে খাবার না নিয়েই চলে এলে।" 


রোদ্দুর যেন বিরক্ত হলো। 


" খাবারের কি অভাব আছে এখানে? আমাকে না জিজ্ঞেস করে কেন এসেছ?" 


" আমি....." 


" এদিকে দাও।" মাহার হাত থেকে খাবারের ব্যাগটা নিল রোদ্দুর। 


" এবার যাও। আমাকে না বলে আর আসবে না। চলো তোমাকে রিকশা ঠিক করে দিচ্ছি।" 


মাহার হাত টেনে নিয়ে এলো রোদ্দুর। তাকে রিকশা ঠিক করে ভাড়া মিটিয়ে দিল। কি মনে করে তার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল, 


" নেমে কিছু খেতে ইচ্ছে হলো খেও। বাসা থেকে আর বের হবে না। মামা রিকশা টানেন।" 


আপন গতিতে রিকশা এগিয়ে যেতে লাগল। মাহা নিজের ভাবনায় বিলিন হয়ে গেল। মনে মনে যে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিল৷ 


চলবে..........




( দুঃখিত এতোটা দেরি করে দেওয়ার জন্য। আজও ব্যস্ততার মাঝে শেষ করেছি। পরবর্তী পর্ব থেকে নিয়মিত দেওয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।)

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url