গল্প :- #এক_মুঠো_রোদ (
১১)-১২-১৩ শেষ পর্ব
লেখক :- #A_Al_Mamun
.
--চাঁদ দুইটা কই পেলেন?
--একটা ওই যে ওপরে।
--আরেকটা কই গেলো?
--যায়নি তো, আমি তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছি।
--ইসসসসসস.
--ইসসস কি? আমি কি মিথ্যা বলছি?
--তো?
--ওই আকাশের চাঁদটাকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করছে। ওখানে কি করো, নিচে এসে দেখো আমার চাঁদটা কত সুন্দর।
--আমায় এত লজ্জা কেনো দিচ্ছেন?
--লজ্জা দিচ্ছি কই?
--আমার যে লজ্জা লাগছে।
--পাগলি একটা..। আচ্ছা বিয়ের পর রোজ এভাবে ছাদে এসে তোমার কোলে মাথা রেখে চাঁদ দেখার সুযোগ দিবে?
--আমি কি মানা করছি? আমারও খুব সখ আপনার সাথে এভাবে সময় কাটানোর।
--আচ্ছা তোমার আর কি কি সখ বা ইচ্ছা আছে?
--তা তো জানি না। তবে একটা ইচ্ছা আছে।
--শুনি তো।
--আপনার ওপর অধিকার খাটাতে দিবেন?
--ওমা, এটা বলার কি আছে।
--আমি কিন্তু খুব ভালোবাসবো।
--সেটাই তো চাই।
--আমায় বাসবেন না?
--আমি তো তোমায় এমনিতেই খুব ভালোবাসি।
--তাই বুঝি?
--হুম
--ভাবিইইই,,,,, ও ভাবি। কই তুমি?
পেছন থেকে রিয়ার আওয়াজ শুনে মামুন লাফ দিয়ে মিষ্টির কোল থেকে মাথা তুলে নেয়।
--এখানে কি করছো এত রাতে?(রিয়া)
--হাতের কাছে একটা ঝাড়ু থাকলে নিয়ে আয়।(মামুন)
--কেনো?
--তোকে কিছুক্ষণ পিটাইতাম।
--কেনো?
--দেখতেছিস ভাই আর ভাবি এখানে বসে আছে। কেনো এলি?
--আমি এক্ষুণি আম্মুকে ডাকতে গেলাম।
--এই না না, বনু আমার। আমিতো মজা করছিলাম।
--মিষ্টি চলো তো, অনেক রাত হয়েছে।
--তুই যা না। একটু পরই সে আসবে।
--চুপ থাক, বিয়ের আগেই এই অবস্থা। বিয়ের পরতো মনে হয় আমাদেরই ভুলে যাবি।
--কি বলে মেয়েটা। ভুলবো কেনো?
--আচ্ছা বাদ দিন না, আসলেই অনেক রাত হয়েছে। আমি যাই, সকালে তো তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।(মিষ্টি)
--চলে যাবে?
--হুম।
--আচ্ছা যাও।
--বাবারে... তোদের ঢং দেখে বাঁচি না। চলো তো ভাবি.....।
রিয়া মিষ্টির হাত ধরে টেনে রুমে নিয়ে যায়।
রাতের প্রায় অর্ধেকটা সময় পার হয়ে গেছে।
মিষ্টি বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে থাকে, আজ তার কিছুতেই ঘুম আসছে না।
প্রায় মাঝরাতে বিছানা ছেড়ে মিষ্টি বারান্দায় এসে দাড়ায়।
গত ৬ মাস ধরে তার সাথে কত কিছু ঘটে গেলো। কত কিছু হারিয়েছে, নতুন করে পেয়েছে। জীবনের এপারওপার পুরো বদলে গেছে।
একটা সময় এই বাড়ির আশ্রিতা হয়ে ছিলো সে, কিন্তু কালই সেই নাম পরিবর্তন হয়ে এইবাড়ি বউ হবে মিষ্টি। নিজের একটা ঘর হবে, নিজের একটা মানুষ হবে।
পেছন থেকে রিয়া এসে মিষ্টির কাঁধে হাত রেখে বলে ওঠে।
--কিগো ভাবি, আজ বুঝি ঘুম আসছে না?
--তুমি উঠে গেলে যে?
--আমারো ঘুম আসছিলো না। তাই তোমার কাছে এলাম। তুমি এখানে কি করছো?
--এমনিই চাঁদটা দেখতে এলাম।
--ওও, কাল থেকে তো চাঁদ দেখার জন্য তোমার পাশে আরেকজন থাকবে, তখন মন ভরে দেখিও। এখন চলো, অনেক রাত হয়েছে।
--আচ্ছা চলো।
.
বিয়ের আর মাত্র একদিন বাকি। বাড়িতে বড় ধরনের কোনো অনুষ্ঠানও হচ্ছে না। শুধু কিছু পরিচিত মুখ আর বিয়ে পড়ানোর জন্য কাজি সাহেবকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।
বাড়ি ভর্তি অনেক কাজ। রিয়া মায়ের সাথে বিয়ের যাবতীয় কাজগুলো সামলাচ্ছে।
মামুন মিষ্টির কাছে এসে দেখে মিষ্টি হাত দুটো সামনের দিকে বাড়িয়ে বিছানায় বসে আছে।
বিষয়টা ভালো করে বুঝার জন্য মামুন মিষ্টির সামনে এসে দাড়ায়।
ফর্সা হাতদুটোতে কত সুন্দর করে মেহেদী লাগানো আছে। সাথে হাতের তালুর মাঝখানে (M+M) লিখা।
--ওয়াও, কে লাগিয়ে দিলো?
--রিয়া।
--রিয়া পারে?
--হুম
--আমাকে তো লাগিয়ে দিলো না।
--আমি দিবো তো।
--তুমিও পারো?
--একটু একটু।
--M+M তে কি হয়?
--মিষ্টি + মামুন হয়।
--আচ্ছা, আমিতো ভাবলাম এটাও হয়তো ডিজাইন।
--মিথ্যা কেনো বলেন? আপনি কি এতোই বোকা?
--আমি কি চালাক?
--হুম।
--আচ্ছা? জানতাম নাতো।
--একটু সাহায্য করুন না।
--কি?
--নাকের মধ্যে বিড়বিড় করতেছে। একটু চুলকিয়ে দিন না।
--শুধু নাক?
--হুম।
--দিলাম.... আর কোথাও চুলকায় না?
--আপাতত না।
মুখের সামনে উড়ে আসা চুলগুলো ধীরে হাতে কানের পাশে গুজে দিয়ে মিষ্টির দুবাহু ধরে এক ঝাটকায় কাছে নিয়ে আসে।
দুহাতে মেহেদী লাগানো থাকায় হাত দিয়ে কিছুতে সাপোর্ট দিতে না পারায় সোজা মামুনের বুকে গিয়ে পড়ে।
মামুনও দুহাতে জড়িয়ে নেয় মিষ্টিকে।
--কি করছেন? মা এসে পড়বে।
--আসবে না, মা ব্যস্ত।
--আমি কিন্তু জামায় মেহেদী লাগিয়ে দিবো, ছাড়ুন।
--লাগাও, তোমাকেই ধুতে হবে।
--সুযোগ নিচ্ছেন?
--হুম।
--গালে লাগিয়ে দিবো।
--লাগাও, ভয় পাই নাকি?
--এত ভালোবাসা উতলে পড়ছে কেনো? দেখবো বিয়ের পর এই ভালোবাসা কই যায়।
--তখনতো ভালোবাসা আরো বাড়বে। সহ্যই করতে পারবে না।
--বাব্বাহ, এতো ভালোবাসবেন?
--হুম।
--সত্যি?
--মিথ্যে মনে হয়?
--নাতো, আমি কি তা বলছি?
--তোমাকে দেখলেই শুধু আদর করতে ইচ্ছে। এত্ত মিষ্টি কেনো তুমি?
--যাহ, ছাড়ুন।
--একটু আদর করি না!
--ইসসসসস, ছাড়ুন বলছি।
--তোমার নামটা যে রেখেছে, তাকে সামনে পেলে একটা ধন্যবাদ দিতাম।
--আমার বাবা রেখেছিলো।
--শশুড় মশাই, আপনাকে ধন্যবাদ।(চিৎকার করে)
--এই পাগল হলেন নাকি? মা শুনলে কি বলবে?
--মা জানে তার ছেলে একটু পাগল টাইপের। তুমিও জেনে নাও।
--আসলেই পাগল।
--হুম, এবার আরো পাগল হয়ে যাবে।
--আর পাগল হওয়া লাগবে না। এমনিতেই যতটুকু পাগল আছেন ততটুকু সামলাতে পারছি না।
--চেষ্টা করো। পারবে....
--সেটাই তো করতেছি।
--তোমার মেহেদী তো শুকিয়ে গেলো, এবার আমায় লাগিয়ে দাও না।
--আচ্ছা, ছাড়ুন। আপনি বসুন আমি হাত ধুয়ে আসি।
--আচ্ছা যাও।
--
--কি হলো যাও।
--আপনার হাত কোথায়?
--ওহ সরি সরি।
--শয়তান একটা।
.
আজ মিষ্টির বিয়ে। মামুনের স্ত্রী হয়ে রুমে বিছানার এক কোনায় লম্বা একটা ঘোমটা দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে সে। আনমনেই ভাবতে শুরু করে।
জীবনে অপূর্ন স্বপ্ন হিসেবে যা ভেবেছিলাম, তা আর পূর্ন হতে চলেছে। সত্যিই আমি #এক_মুঠো_রোদ এর দেখা পেয়েছি। কখনো ভাবিনি আমার বিয়ে হবে, একটা সংসার হবে, একটা পরিবার হবে। সে আমায় এতটা ভালোবাসে যে মাঝেমাঝে কান্না চলে আসে। সত্যিই কি আমি এই ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য?
ছোটবেলায় বাবা বলতো, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।
সত্যিই আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।
কোথায় যেতাম আমি, কোথায় আশ্রয় হতো আমার, কি খেতাম আমি? কিন্তু আল্লাহ আমায় এমন মানুষের কাছে পাঠিয়েছে যেখানে থেকে আমার নতুন করে কিছু চাওয়ার নেই। সবই পেয়ে গেছি আমি। এখন শুধু ভয় আছে, হারানোর। কিন্তু আমি কিছুই আর হারাতে দিবো না। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমার স্বামী, সংসার, পরিবার আগলে রাখবো। সত্যিই আজ নিজের প্রতি নিজের হিংসে হচ্ছে। না চাইতেও কত কিছু পেয়ে গেছি। আর অনেকে চেয়েও পায় না।
মিষ্টির কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মামুন রুমে প্রবেশ করে। সাথে সানু বেগম আর রিয়াও আছে।
মিষ্টি বিছানা থেকে নেমে এসে প্রথমে সানু বেগম এবং পরে মামুনকে সালাম করে।
মিষ্টির হাত ধরে টেনে নিয়ে মিষ্টিকে বিছানায় বসায় সানু বেগম।
--সব শাশুড়ির মতো আজ আমার নতুন করে কিছুই বলার নেই। এমনিতেই পুরো সংসারটা তোমার হাতে। তবে হ্যা, নতুন করে কিছু দিতে এসেছি। এই নাও।
--এটা কি মা?
--আমার বিয়ের গহনা। তোমার শশুড় এগুলো আমাকে বিয়ের পরে গিফট করেছিলো। আমার গহনা পড়ার সখ নেই। তাই ভবিষ্যৎতের জন্য তুলে রেখেছিলাম। আমার পক্ষ থেকে এগুলো তোমার উপহার।
--কিভাবে পড়বো? আমিতো কখনো পড়িনি।
--পাগলি মেয়ে, আমি পড়িয়ে দিচ্ছি।
.
সানু বেগম অতি যত্ন করে মিষ্টিকে গয়না পড়িয়ে দিচ্ছে। মিষ্টিও মায়াভরা চোখে শাশুড়ির দিকে চেয়ে আছে।
--মা, শুধু মিষ্টির জন্য? আমার জন্য কিছু নেই?
--গয়না পড়বি?
--ধুর, বাবার কিছু নেই আমার জন্য?
--একটা লুঙ্গী আছে।
--আর কিছু নেই?
--সেন্ডেল আছে একজোড়া।
--মিষ্টির বেলায় গহনা, আর আমার বেলায় সেন্ডেল?
--তোকে যা দিলাম তা কি কম দামি?
--কি দিয়েছো?
--মিষ্টিকে।
--এটা ঠিক বলেছো মা। খুব দামি জিনিস পেয়েছি আমি।
--হুম...। তো তোরা থাক, আমি গেলাম।
--আচ্ছা।
মিষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সানু বেগম বেরিয়ে পড়ে। রিয়া এসে মিষ্টির পাশে বসে।
--কিরে? তোকে বের হওয়ার জন্য কি এপ্লিকেশন পাঠাতে হবে? সব জায়গায় কাবাবের হাড্ডির মতো ডিস্টার্ব করিস কেনো?
--চুপ করতো। তোর জন্য আমি একা হয়ে গেলাম। মিষ্টি আর আমার সাথে ঘুমাবে না। কত কষ্ট হবে আমার।
--বাবারে, এতো ইমোশনাল হইয়েন না আপু, আপনাকেও খুব তাড়াতাড়ি বিদায় করা হবে এই বাড়ি থেকে। তখন আর একা ঘুমানো লাগবে না। আপাতত এখন আমাদের ডিস্টার্ব করিয়েন না, রুমে চলে যান।
--ভাবি, আমার একটা কথা রাখবে?
--কি?
--এই শয়তানটাকে সারাক্ষণ মাইরের ওপর রাখতে পারবে?
--সে কি তোর মতো? আমার তো আফসোস হয় তার জন্য, যে তোর জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করবে। আমার কপাল ভালো আমি মিষ্টি পেয়েছি।
--তোর সাথে আমি আর কথা ই বলবো না। গেলাম আমি।
--যা যা।
--All The Best ভাবি। শুভ রাত্রি।
.
রিয়া রুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই মামুন দরজা লাগিয়ে দেয়।
মিষ্টির পাশে এসে বসতেই মিষ্টি বলে ওঠে।
--আপনি সবসময় রিয়ার সাথে এমন ঝগড়া করেন কেনো?
--ঝগড়া করি কই? রিয়া আমার কলিজা। আর আমিও রিয়ার কলিজা। শুধু বলে প্রকাশ করাই ভালোবাসা না। তোমার জন্য কি করতে পারবো তা আমি জানি না, কিন্তু আমার বোনের জন্য আমি জীবনটাও দিয়ে দিতে পারি। সেই ছোটবেলা থেকে ওকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। ওর একমাত্র খেলার সাথি আমি, বন্ধু আমি, শত্রু আমি, সবই আমি।
--তাহলে ওকে এতো বকা দেন কেনো?
--কই বকি? আমাদের কথাই এমন।
--বাবাহ, বুঝি না।
--ওতো বুঝতেও হবে না।
--আপনি তো এখনো আমার ঘোমটাই তুললেন না।
--ঘোমটা কই?
--দিচ্ছি, আপনি আবার বাহিরে যান। আবার আসেন।
--কেনো?
--যান না। আমি ঘোমটা দিয়ে বসতেছি।
--আচ্ছা।
মিষ্টি আবার নতুন করে ঘোমটা দিয়ে বিছানার মাঝখানটায় বসে। চারদিকটা ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করছে। পুরো রুমটা কত সুন্দর করে সাজানো। মিষ্টি নিজের হাতেই নিজের বাসর ঘর সাজিয়েছে, সুন্দর না হয়ে উপায় আছে?
মামুনের দরজা আটকানোর শব্দে মিষ্টি ধীরেধীরে বিছানা থেকে নেমে দাড়ায়।
মামুন বিছানার সামনে এসে দাড়ালে মিষ্টি এগিয়ে গিয়ে মামুনকে সালাম করে।
মিষ্টির দুবাহু ধরে বিছানায় বসানো হয়।
--আমার ঘোমটা তুলবেন না?
--না তুললে হয় না?
--আমাকে দেখবেন না?
--দেখতেই হবে?
--আপনার জন্য কত সুন্দর করে সেজেছি।
--আমার জন্য?
--তো কার জন্য সাজবো?
--দেখে নিজেকে সামলাতে পারবো তো?
--আমি কি করে বলবো?
--যদি না পারি?
--সমস্যা নেই, আজ বাঁধা দেওয়ার মতো কোনো যুক্তি আমার কাছে নেই। আমি যে পুরোপুরি ভাবে আপনার হয়ে গেছি। আর আপনি আমার।
--তাই? তুলবো?
--হুম।
মামুন ধীরেধীরে মিষ্টির ঘোমটার দিকে হাত বাড়াতে থাকে।
--১ মিনিট.
--কি হলো?
--আমার খুব লজ্জা লাগছে।
--বলেছিলাম না একদিন তোমার লজ্জা ভাঙাবো! আজ সেই দিন চলে এসেছে।
--কিসের দিন?
--আজ তোমার লজ্জা ভাঙাবো।
--কিভাবে?
--দেখবে?
--হুম।
.
.গল্প :- #এক_মুঠো_রোদ (১২)
লেখক :- #A_Al_Mamun
.
বলেছিলাম না একদিন তোমার লজ্জা ভাঙাবো! আজ সেই দিন চলে এসেছে।
--কিসের দিন?
--আজ তোমার লজ্জা ভাঙাবো।
--কিভাবে?
--দেখবে?
--হুম।
মামুন ধীরেধীরে মিষ্টির ঘোমটা সরিয়ে মুখটা উপরে তোলে।
সাধারণত মিষ্টি একটুও সাজগোছ করে না। তাতেই মিষ্টিকে অপ্সরীর মতো লাগে।
কিন্তু আজ মিষ্টি সেজেছে, একটা লাল বেনারসি, সাথে হালকা মেকাপ আর লাল লিপস্টিক। এতেই মামুনের নাজেহাল অবস্থা। যেনো সর্গের কোনো পরী এসেছে মামুনকে জ্বালাতে।
চোখ দুটো বন্ধ করে মিষ্টি চুপ করে বসে আছে। আর মামুন এক নজরে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে।
--চোখ বন্ধ করে আছো যে?
--খুব লজ্জা করছে।
--একটু তাকাও।
ধীরেধীরে চোখ খুলে মামুনের দিকে তাকায় মিষ্টি। দুজন দুজনকে এমনভাবে দেখছে, যেনো কখনো এই দেখার শেষ হবে না। দুজন অনেকটা কাছাকাছি এসে বসে।
--মাকে একবার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিলো দোয়াটার ব্যাপারে।
--কিসের দোয়া?
--কারো নজর যেনো না লাগে সেই দোয়া।
--কেমন লাগছে আমায়?
--এতটা মিষ্টি লাগছে যে ইচ্ছে করছে খেয়ে ফেলতে।
--যাহ, মুখে কিছু আটকায় না বুঝি?
--চেষ্টা তো করছি, কিন্তু আটকিয়ে রাখতে পারছি না।
--পারবেন।
--সত্যিই ইচ্ছে করছে।
--কি?
--মিষ্টি টেস্ট করতে।
--ইসসসসসস।
--ভাবছি আমার ডায়াবেটিস না হয়ে যায়।
--কেনো হবে?
--বেশি মিষ্টি খাওয়া তো ভালো না। ডায়াবেটিস হয়ে যাবে।
--তো কম খাবেন।
--এমন মিষ্টি কি কম খাওয়া যায়?
--আজ রাতটা নিয়ে আপনার কোনো প্ল্যান নাই?
--ছিলো অনেক, সব ভুলে গেছি। তোমার আছে?
--হুম।
--শুনি তো।
--ছাদে যাবেন?
--এত রাতে?
--চাঁদ দেখতে ইচ্ছে করছে।
--কালই তো দেখলে।
--চলুন না, আজও দেখবো। আপনি আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকবেন। আর আমি আপনার চুলে বিনি কেটে দিবো। চাঁদ দেখবো আর গল্প করবো।
--আচ্ছা চলো।
.
মিষ্টিকে কোলে নিয়ে মামুন ছাদে এসে এক কোণায় বসে।
মামুন আজও মিষ্টির কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে।
--দেখুন, চাঁদটা কত সুন্দর।
--হুম, খুব সুন্দর।
--উপরে দেখুন না।
--হুম।
--গাঁধা আমাকে না, আকাশে।
--আমার চাঁদতো তুমিই। আমি শুধু তোমাকেই দেখবো।
--এত দেখার কি আছে?
--মন ভরে না যে, শুধু দেখতেই ইচ্ছে করে।
--আচ্ছা দেখুন।
--চলো না।
--কোথায়?
--রুমে।
--মাত্রই তো আসলাম।
--চাঁদ তো দেখা হয়ে গেছে।
--চলে যাবেন?
--হুম।
--আচ্ছা চলুন।
মিষ্টিকে কোলে করে আবার রুমে আনা হয়।।
--আপনি না বললেন আমার লজ্জা ভাঙাবেন?
--হুম।
--কই?
--আচ্ছা,,,,! আমার বউ তাহলে প্রস্তুত?
--সেই কবে থেকে। আপনি ভালোবেসে কাছে টেনে নিবেন, এই আসায় কতরাত ঘুমাতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই আপনাকে দেখতাম। আর আজ আপনি আমার এতটা কাছে। আপনাকে বোজাতে পারবো না এমন সময় একটা মেয়ের অনুভূতি কেমন থাকে।
--কেমন থাকে?
--লজ্জা সরমের মাথা খেয়ে এত কিছু বলেছি, আর পারবো না।
মিষ্টির দিক থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে মামুন মিষ্টির দিকে এগিয়ে যায়।
(এইবার কি হয় সেটা আর না বলি)
.
সকালে মুখে পানি ছিটায় ঘুম ভাঙে মামুনের। জানালা দিয়ে একটা নতুন সকাল উকি দিচ্ছে। বাহিরে এখনো আলো ফুটে নি।
বিছানার পাশেই মিষ্টি বসে চুলের পানি মুছতেছে।
মামুনের আর বুঝতে বাকি রইলো না এটা কিসের পানি।
সামনের ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আয়নায় নিজের দেখছে মিষ্টি। পেছন থেকে আয়নায় মিষ্টিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মামুনকে জেগে উঠতে দেখে মিষ্টি মামুনের পাশে এসে বসে।
--উঠে গেছেন?
--তোমার চুলের পানি কি আর ঘুমাতে দিলো?
--পানি পড়েছে বুঝি?
--হুম।
--সরি সরি।
--হবে না।
--তাহলে?
মামুন ওমনি মিষ্টিকে ঝাপটে ধরে বিছানা ফেলে দেয়। ভেজা চুলগুলোতে একটা পাতলা তোয়ালে পেচানো।
চেষ্টা করেও মামুনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারছে না সে।
--ছাড়ুন, মাত্র গোসল করেছি, আর পারবো না।
--তাহলে এমন ভেজা চুল নিয়ে আমার সামনে কেনো এসেছো?
--আমার ইচ্ছা।
--এখন আমারও ইচ্ছা।
--যাহ, ছাড়ুন।
--তোমার মধ্যে একটা মিষ্টি ঘ্রাণ আছে। যা আমার পাগল করে দেয়।
--কেমন ঘ্রাণ?
--এটা এমন একটা ঘ্রাণ যা শুধু আমিই পাই।
--আচ্ছা!
--বলেছিলে সকালে জড়িয়ে ধরে আমার ঘুম ভাঙাবে।
--আপনি ঘুমাচ্ছিলেন, তাই ভাবলাম না জাগাই।
--এখন তো এর মূল্য দিতে হবে।
--কি মূল্য?
--মিষ্টি দাও।
--যাহ, সকাল সকাল কি শুরু করলেন। ছাড়ুন, মা উঠে যাবে। নামাজ পড়ে রান্না ঘরে যেতে হবে।
--একটা দাও না, আর কিছু লাগবে না।
--দিবো, তাহলে উঠুন। গোসল করে নামাজটা পড়ে নিন।
--আগে দাও, এরপর উঠবো।
--আপনি যেই শয়তান, এমনিতেই নামাজ পড়েন না। এখনতো আপনার ওপর আমার পুরো অধিকার আছে। উঠে নামাজ পড়বেন। এরপর যা চাইবেন তাই দিবো।
--বাবারে।
--উঠেন, আজ থেকে আর নামাজ বাদ দেওয়া যাবে না।
--উঠছি তো।
--না, এক্ষুণি উঠুন। আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি, একসাথে নামাজ পড়বো।
মামুনকে একপ্রকার জোর করেই বিছানা থেকে তুলে গোসল করতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
.
সানু বেগম নামাজ শেষ করে রান্না ঘরে এসে দেখে মামুন রুটি বানাচ্ছে। আর মিষ্টি মামুনকে সাহায্য করতেছে।
নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে দুইবার নিজেকে নিজে চিমটি কাটে।
--কে রে এটা?(সানু বেগম)
মাকে এভাবে সামনে দেখে মামুন লজ্জা পেয়ে রুটি বানানো ছেড়ে একটু দুরে গিয়ে দাড়ায়।
--আব্বা, আজ এত সকাল সকাল কিভাবে?
--এমনিই ঘুম ভেঙে গেলো। তাই ভাবলাম মিষ্টিকে একটু সাহায্য করি।
--২৮ বছর ধরে আপনার মা একা একা রুটি বানিয়েছে, কখনো তো আপনার ঘুম ভাঙেনি।
--ধুর,আমি গেলাম।
বলেই মামুন মাকে পাশ কাটিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে যায়।
--মিষ্টি, আজ তোমার আসার প্রয়োজন ছিলো না। আমি পারতাম।
--কেনো মা? আমি কি নতুন? আমি সেই মিষ্টি, নতুন কেউ না তো।
--ধুর পাগলি, আমি কি সেটা বলছি? অন্তত আজ তো বিশ্রাম করতে পারতে।
--সমস্যা নেই মা। আপনি গিয়ে বিশ্রাম করুন।
--আমি রুটি বানাই দাও। পাগলটা আজ এত তাড়াতাড়ি উঠে গেলো কিভাবে? আবার এসে রুটিও বানাচ্ছে।
--তুলে নিয়ে আসলাম। নামাজ পড়ালাম, এরপর রান্না ঘরে নিয়ে আসলাম।
--মাশা-আল্লাহ, প্রতিদিন এভাবে তুলে নামাজ পড়াইবা।
--দোয়া করবেন মা।
.
নাস্তা শেষে রিয়া মিষ্টিকে নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়।
--কি খবর ভাবি?
--হুম ভালো(মুচকি হেসে)
--এক রাতেই আমায় ভুলে গেলা?
--ওমা, ভুললাম কই?
--আমায় ডাকতেও আসলে না আজ।
--তুমি তো ঘুমাচ্ছিলে, তাই ভাবলাম বিরক্ত না করি।
--আচ্ছা বাদ দাও, কেমন কাটলো কাল রাত?
--সবার যেমন কাটে।
--বাব্বাহ, সবার কেমন কাটে সেটা তুমি কিভাবে জানো?
--বললাম আরকি, ভালোই কেটেছে।
--আমাদের সবারই মনের আসা পূরণ হলো। তুমি চেয়েছিলে পরিবার, আর আমরা তোমায়।
--হুম, আজ আমি খুব খুশি। আল্লাহর কাছে এই দুনিয়ায় আমার আর কিছুই চাওয়ার নাই। না চাইতেও আমি সব পেয়ে গেছি।
--ওমা, চাওয়ার নেই মানে? আমাদের একটা বাবু লাগবে না?
--আল্লাহ চাইলে আমাদের বাবুও হবে। চিন্তা করো না।
--খুব তাড়াতাড়ি চাই কিন্তু। এরা আমায় বাড়ি থেকে তাড়ানোর প্ল্যান করছে। যাওয়ার আগে যেনো বাবুর সাথে খেলাধুলা যেতে পারি।
--তাই বুঝি?
--হুম। গিয়েই ভাইয়াকে বলবে আমাদের সবার একটা বাবু লাগবে, তাড়াতাড়ি।
--আচ্ছা বলবো।
.
মিষ্টির খুশিতে পুরো বাড়ি যেনো খিলখিল করছে। সানু বেগম তো সোজাসুজি বলে দিয়েছেন। "এবার আমি শুধু বিশ্রাম নিবো। তোমার সংসার তুমি সামলাও" মিষ্টিও মুচকি হেসে শাশুড়ির কথায় শায় দেয়।
স্বামী সংসার নিয়ে মিষ্টির এখন অনেক চিন্তা।
একটা সময় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হতো মিষ্টিকে, কিন্তু এখন এই সংসারের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাকে ভাবতে হয়।
ধীরেধীরে দিনগুলো পার হতে থাকে। এমনি একদিন অফিস শেষে মামুন বাসায় ফিরে দেখে পুরো ঘর নিস্তব্ধ, রিয়া নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, মা নিজের রুমেই বসে আছে। আর মিষ্টি বিছানার এক কোনায় জড়ো হয়ে বসে আছে।
মামুন কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে আজ ঘরের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। যার জন্য সবাই চুপ করে আছে।
--কিগো? আজ দরজা খুলতেও আসলে না। দরজা দেখি আগে থেকেই খোলা।
--আমিই খুলে এসেছিলাম।
--কিছু হয়েছে?
--হুম।
--কি?
--আমি বলতে পারবো না। মাকে জিজ্ঞেস করুন।
--মা বকেছে?
--না।
--মুখ দেখেতো মনে হচ্ছে কেঁদেছিলে।
--একটু।
--ঝগড়া হয়েছে?
মিষ্টি মামুনের দিকে মুখ তুলে তাকায়...
--কি বলছেন এসব?
--তাহলে এভাবে চুপ করে আছো কেনো?
--আমি বলতে পারবো না। মাকে জিজ্ঞেস করুন।
--মাত্রই অফিস থেকে আসলাম। এসেই এটা নিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করা যায়?
--ফ্রেস হয়ে নিন, খাবার খান, এরপর যান।
--কি হয়েছে সেটা তো বলবে।
--মা বলবে।
--তুমি বললে সমস্যা?
--আমি বলতে পারবো না।
--ধুর....।
মামুন কিছুটা রাগ মাথায় নিয়ে মায়ের রুমে এসে দাড়ায়, সানু বেগম তখনো নামাজের পাটিতে বসে তাজবিহ পড়ছেন।
মামুনকে নিজের রুমে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করেন,
--কিরে বাবা, চলে এলি?
--হুম।
--আয় বস।
--বসবো না, খুদা লেগেছে।
--আচ্ছা খেয়ে আয়।
--মিষ্টি বললো তুমি নাকি আমাকে কিছু বলবে।
--সে বলেনি?
--না।
--আচ্ছা বস এখানে। আমিই বলছি।
--মিষ্টি কি ঝগড়া করেছে?
--ধুর গাধা, তোর কি মনে হয় সে ঝগড়া করতে পারে?
--তাহলে?
--দুপুরে রান্নার সময় হঠ্যাৎই মিষ্টি মাথা চক্কর দিয়ে পড়ে যায়। কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম কি হতে চলেছে। তবুও শিওর হওয়ার জন্য ডাক্তারকে খবর দেই। ডাক্তারও সেটাই বললো যেটা আমি ভেবেছিলাম।
--কি হয়েছে মা?
--আমাদের ঘরে নতুন মেহমান আসবে।
--কে?
--বলদ, তুই বাবা হতে চলেছিস?
--অ্যাহ! সত্যি?
--হুম
--তাহলে মিষ্টি বললো না কেনো?
--মেয়েটা সারাদিন কেঁদেছে।
--কেনো?
--ওকে গিয়েই জিজ্ঞেস কর।
--তা তো করবোই। তোমার ঘরের চেরাগ আসতেছে। আগে জানালে আসার সময় তো মিষ্টি নিয়ে আসতাম।জানালে না কেনো?
--কাল আনিস। এখন মিষ্টির কাছে যা।
--আচ্ছা।
.
.গল্প :- #এক_মুঠো_রোদ (১৩) শেষ পর্ব
লেখক :- #A_Al_Mamun
.
তোমার ঘরের চেরাগ আসতেছে। আগে জানালে আসার সময় তো মিষ্টি নিয়ে আসতাম।
--কাল আনিস। এখন মিষ্টির কাছে যা।
--আচ্ছা।
এক প্রকার দৌড়েই মায়ের রুম থেকে বেরিয়ে আসে মামুন।
নিজের রুমের সামনে এসে উকি দিয়ে দেখে মিষ্টি এখনো বিছানার এক কোনায় বসে আছে।
নিজের চেহারায় একটু রাগি ভাব নিয়ে মামুন আবার রুমে প্রবেশ করে।
মামুনকে ভেতরে আসতে দেখে মিষ্টি উঠে দাড়ায়।
--তোমরা বউ শাশুড়ি মিলে কি আমায় পাগল বানিয়ে ছাড়বা?
--কেনো?
--তুমি বলছো মা বলবে, আর মা বলছে তুমি বলবে। কাহিনী কি?
--সত্যিই কি মা কিছু বলেনি?
--না।
--আমাকেই বলতে হবে?
--থাক, কারো কিছু বলা লাগবে না। শুনবো না আমি।
--এত রাগ করেন কেনো?
--তো কিছু বলছো না কেনো?
--বলবো তো।
--বলো।
--আজ একটু শরীর খারাপ থাকায় মা ডাক্তার ডেকেছিলো। জানেন ডাক্তার এসে কি বলেছে?
--কি?
--বুঝে নিন না।
--বুঝতে পারবো না, তুমি বলো।
--এমন করেন কেনো?
--বলবে? নাকি চলে যাবো?
--বলছিতো। ডাক্তার বললো.....
--কি?
--আমার খুব লজ্জা লাগছে।
--তবুও বলো।
--আমি মা হবো।
মামুন মিষ্টিকে বুকে টেনে নিয়ে কপালে আলতো করে একটা চুমু একে দেয়।
--মা আমায় আগেই বলে দিয়েছে। এই পাগলি, তোমার চোখে পানি কেনো?
--মা খুব খুশি হয়েছে।
--তো তুমি কেনো কেঁদেছো?
--এতটা খুশি কখনো লাগেনি। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না, তাই কেঁদেছি।
--তুমি আসলেই একটা পাগলি।
--আপনি খুশি হন নি?
--খুব।
--খুব লজ্জা লাগছে আমার। সারাদিন রুম থেকেই বের হইনি।
--কেন?
--কি ভাববে ওরা? ৩ মাসেই মা হতে চলেছি।
--এতে ভাবা ভাবির কিছু নেই। ৩ বছর লাগাবো নাকি?
--তা নয়, তবুও কেমন না?
--ধুর, পাগলী মেয়ে। আমার অফিসের এক কলিগ তো বিয়ের আগেই সুখবর পেয়ে গিয়েছিলো। এরপর বিয়ে করেছে। সেক্ষেত্রে আমাদের কি ওতো তাড়াতাড়ি হয়েছে নাকি? ঠিক সময়েই হয়েছে।
--আচ্ছা বাদ দিন, ফ্রেস হয়ে আসুন। আমি খাবার দিচ্ছি।
--আচ্ছা।
এতদিন যাবত মিষ্টি সংসারটাকে একা হাতেই সামলাতো। কিন্তু এখন থেকে সাথে আরো ৩জোড়া হাত যোগ হয়েছে।
মিষ্টিকে তেমন কোনো কাজই করতে দেওয়া হয় না। রান্নাবান্না সব সানু বেগম রিয়াকে সাথে নিয়েই সেরে ফেলেন। আর মামুন অফিস থেকে ফিরে এসে মিষ্টিকে টুকিটাকি কাজে সাহায্য করে।
দিন শেষে ভালোবাসার মানুষটা যখন বুকে জড়িয়ে নেয়, তখন নিজের আবেগগুলো কান্না হয়েই বেরিয়ে আসে। যাকে সুখে রাখার জন্য দিন রাত এক করে দেওয়া হয়, সেই যখন দিন শেষে কান্নায় ভেঙে পড়ে, তখন কারই বা ভালো লাগে? মামুন যখন কান্নার কারনটা জানতে চায়, তখন উত্তর আসে এত সুখ নাকি তার সহ্য হচ্ছে না।
মিষ্টি গর্ভবতী থাকা কালিন পুরো পরিবার এতটাই যত্ন করেছে যে খুশির সময়ও মিষ্টি কান্না করে দিতো। বড্ড আনন্দে মিষ্টির দিনগুলো পার হতে থাকে।
ধীরেধীরে ডেলিভারি সময় এগিয়ে আসে।
১ মাসের জন্য ছুটি নিয়ে মামুন সারাক্ষণ মিষ্টির পাশেই সময় কাটায়।
--আর কত দিন লাগবে পাপা ডাক শুনতে?
--পাপা ডাক শুনার এত শখ?
--ওমা, কার শখ নাই?
--বুঝলাম, একটু তো অপেক্ষা করাই লাগবে।
--একটু জিজ্ঞেস করে দেখবো?
--কাকে?
--আমার বাবুটাকে।
--কিভাবে?
--এই দেখো।
মিষ্টির পেটের ওপর কান লাগিয়ে মামুন কথা বলা শুরু করে।
ওদিকে মিষ্টি মামুনের কান্ড দেখে খিলখিল করে হাসতে থাকে।
--কি বলেছে জানো?
--কি?
--বললো আর বেশিদিন অপেক্ষা করা লাগবে না। উনি খুব তাড়াতাড়ি আসতেছে।
--আপনাকে বলেছে?
--হুম।
--তাহলে আর অধৈর্য হইয়েন না। একটু অপেক্ষা করুন।
--এছাড়া তো আর কোনো উপায়ও নাই।
--খালি খালি চিন্তা করেন। শুয়ে পড়েন, অনেক রাত হয়েছে।
--আচ্ছা তুমিও শুয়ে পড়ো।
--হুম
.
মামুন মিষ্টির মাথা হাত বুলিয়ে দিতে দিতে দুজনই একসাথে ঘুমিয়ে পড়ে।
মাঝরাতে মিষ্টির বোবা আর্তনাদে মামুনের ঘুম ভেঙে যায়, দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে লাইট জ্বালিয়ে দেখে মিষ্টি মুখে আচল গুজে দিয়ে কাঁদছে। যার জন্য কোনো শব্দ হচ্ছে না।
মুখ থেকে আচল সরিয়ে মামুন জিজ্ঞেস করে।।
--কি হয়েছে তোমার?
--খুব ব্যথ্যা করছে, আর পারছি না।
--আমায় জাগালে না কেনো? দাড়াও মাকে ডেকে আনছি।
একটু পর সানু বেগম মামুনের সাথে দৌড়ে রুমে প্রবেশ করে। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় দ্রুত এম্বুলেন্সে খবর দেওয়া হয়।
মাঝরাতেই মিষ্টিকে সাথে নিয়ে সবাই হাসপাতালে রওয়ানা দেয়।
সানু বেগম রিয়াকে সাথে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারের বাহিরের চেয়ারে বসে আছে। আর মামুন দরজার এদিক ওদিক পায়চারী করছে।
--মামুন, এখানে এসে বস।
--না মা, আমি ঠিক আছি।
--একটু তো সময় লাগবেই, কতক্ষণ এভাবে হাটবি? এদিকে আয়।
মায়ের ডাকে মামুন এসে চেয়ারে বসে।
--মা, ভয়ের কোনো কারন নেইতো?
--কিসের ভয়? আল্লাহকে ডাক। দেখবি সব ভালোয় ভালোয় শেষ হবে।
--তুমিও করো।
--আমি করতেছি।
--ভাই, ওতো চিন্তা করিস না। ভাবির কিচ্ছু হবে না।(রিয়া)
--তাই যেনো হয়।
দীর্ঘ ৩ ঘন্টা পর অপারেশন থিয়েটারের বাহিরে লাল বাতি বন্ধ হয়ে যায়।
মামুন দৌড়ে দরজার সামনে এসে দাড়ায়।
একটু পর ভেতর থেকে একজন মহিলা ডাক্তার বের হয়।
--ম্যাডাম, আমার স্ত্রী কেমন আছে?
--আলহামদুলিল্লাহ উনি ভালো আছেন।
--আমার বাবু হয়েছে?
--হ্যা ভাই, আপনার মেয়ে হয়েছে। তবে সবচেয়ে খুশির বিষয় হলো আপনার জমজ মেয়ে হয়েছে।
ডাক্তারের কথায় মামুন ওখানেই হেঁসে দেয়।
সানু্ বেগম আর রিয়াও ডাক্তারের কথায় খুব খুশি।
--আমরা ভেতরে যেতে পারবো?
--না ভাই, একটু পর ওনাকে কেবিনে দেওয়া হবে। তখন দেখিয়েন।
--ম্যাডাম তাড়াতাড়ি, আর তর সইছে না।
--চুপ কর পাগল, এত লাফাচ্ছিস কেনো?(রিয়া)
--শুনেছিস? তোর জমজ ভাইঝি হয়েছে। খুশি না হয়ে উপায় আছে? মা শুনেছো?
--শুনেছি শুনেছি, একটু চুপ কর। ওরা দেখলে কি ভাববে?
--যা ভাবার ভাবুক। আমার কি?
.
একটু পর মিষ্টিকে কেবিনে দেওয়া হয়। সবাই একসাথে মিষ্টির সামনে এসে দাড়ায়।
সানু বেগম আর রিয়া দুজন দুই বাচ্চাকে কোলে নিয়ে নেয়। আর মামুন রিয়ার পাশে এসে বসে।
--আমাদের মেয়ে দেখেছেন? জমজ।
--মেয়ে পরে, তুমি কেমন আছো?
--আপনাদের দোয়ায় খুব ভালো।
--মেয়েদের দেখেছো?
--হুম। আপনি দেখেছেন?
--না।
--দেখুন না।
মামুন উঠে মায়ের সামনে এসে দাড়ায়, মায়ের কোলে একটা মেয়ে, আর রিয়ার কোলে একটা মেয়ে। মামুন দুই মেয়েকে একসাথে নিজের কোলে নিয়ে নেয়। নিজের অজানতেই চোখ দিয়ে পানি পড়ছে মামুনের। রিয়া, মা আর মিষ্টি মামুনের দিকে এক নজরে তাকিয়ে আছে। বাবা হওয়ার অনুভূতিটা বুঝি কাউকে প্রকাশ করা যায় না? কেনো এতটা খুশি লাগে? পাথরে গড়া হৃদয়ের ছেলেটাও কেনো খুশিতে চোখের পানি ফেলে?
রাতে রাতেই মিষ্টিকে বাড়ি নিয়ে আসা হয়। মিষ্টি বিছানায় শুয়ে আছে, আর পাশেই শুয়ে আছে দুটো ছোট্ট পরি। মামুন মেয়েদের মাথার পাশে বসে বাচ্চা বাচ্চা কথা বলছে। আর মিষ্টি মামুনের কান্ড দেখে হেসেই যাচ্ছে।
--আপনিতো মেয়ে চেয়েছিলেন। আপনার মনের আসাই পূরণ হলো। খুশি হয়েছেন?
--খুব। এখন পর্যন্ত তোমার কাছে যা চেয়েছি, একটু বেশিই পেয়েছি। মেয়েও।
--আপনি যা চেয়েছেন তা পেয়েছেন। এখন যেনো আমার ভালোবাসায় কোনো কমতি না থাকে।
--কমতি থাকবে কেনো?
--এই যে দুইজন নতুন মানুষ এলো, এরাই তো আমার ভালোবাসায় ভাগ বসাবে। আমি ভালো করেই জানি।
--আরে নাহ।
--কচু না, মা ও তো এখন এদের নিয়ে থাকবে। কেউ আর আমায় ভালোবাসবে না।
--কে বললো?
--আমি জানি।
--কারো ভালোবাসায় কেউ ভাগ বসাতে পারে না।
--পারে, এখনো একবারও আপনি আমায় বুকে জড়িয়ে নেন নি। অথচ মেয়েদের কতবার নিয়েছেন তার হিসেব নেই।
--হায় খোদা, কি হিংসেরে বাবা।
--উমম
মামুন এগিয়ে গিয়ে মিষ্টিকে বুকে জড়িয়ে নেয়।
--থাক, এখন এতো ভালোবাসা দেখানো লাগবে না, নিজে থেকে তো নেন নি।
--আমার ভুল হয়ে গেছে, ক্ষমা করে দেন।
--আদর করছেন একবারও? আর ওদের কতবার করছেন?
--হায়, কই যামু আমি? এ দেখি মহা হিংসা। নিজের মেয়েদের প্রতিও হিংসা।
--আমার ভালোবাসায় কেনো ভাগ বসাবে হ্যা? ওদের যত আদর করবেন, তার চেয়ে আমায় বেশি আদর করবেন। মনে থাকে যেনো।
--ঠিক আছে ম্যাডাম।
--জানেন, খুব কষ্ট হচ্ছিলো। আপনাকে কতবার ডেকে দিতে বলেছি। কিন্তু ওরা আপনাকে ডাকে নি।
--খুব মিস করছিলে বুঝি?
--হুম, আপনি আমার পাশে থাকলে হয়তো আমার এত কষ্ট হতো না।
--তোমায় আর কখনো কষ্ট পেতে দিবো না। সারাজীবন তোমায় এই বুকের মধ্যে আগলে রাখবো।
--মনে থাকে যেনো।
--থাকবে।
.
--ভাবছি দুটো মেয়েকে একসাথে কি করে সামলাবো?
--পুরো একটা পরিবার এক হাতে সামলে নিয়েছো, আর নিজের মেয়েদের পারবে না?
--হুম পারবো তো। কখনো ভেবেছেন আমাদের টুইন হবে?
--ভাবি নি, তবে সখ ছিলো। যদি আমারও টুইন হতো। আজ আমার সখও পূরণ হলো।
--আমায় বেশি বেশি ভালোবাসলে এমন আরো সখ পূরন হবে।
--আচ্ছা? টিম হবে?
--কিসের টিম?
--একটা ফুটবল টিম।
--যাহ শয়তান।
মিষ্টিকে এক টানে বুকে নিয়ে এসে
--বলো, কতটা ভালোবাসতে হবে তোমায়?
--যতটা ভালোবাসলে আপনি সারাক্ষণ আমাকে নিয়ে ভাববেন ততটা।
--এতটা?
--হুম। ৭ মাস যাবত আপনাকে ওতটা কাছে পাইনি। অনেক মিস করছি আপনার ছোয়া। সব উসুল করে নিবো।
--কি মেয়েরে বাবা।
--খুব ভালোবাসি আপনাকে।
--এই পাগলি, কাঁদছো কেনো? আজতো আমাদের খুশির দিন।
--এই বাড়িতে আসার পর আমি কখনো কষ্টে কাঁদিনি, কাঁদতে হয়নি। এতটা সুখ আমার ভাগ্যে ছিলো যে কষ্টের চেয়ে সুখের পরিমানটাই বেড়ে গেছে। কান্নাটা তো আমার অভ্যাস ছিলো, শুধু কান্নার কারনটা বদলেছি। এখন আর কষ্ট পেলে কাঁদি না, খুশিতে কাঁদি। আমি সত্যিই খুব খুশি, একটা মা পেয়েছি, ননদ নামের একটা বোন পেয়েছি। সারাজীবন পাশের থাকার জন্য আপনাকে পেয়েছি। আর কি চাই বলুন তো। আল্লাহর রহমতে আমাদের কোল আলোকিত করে দুটো মেয়ে এলো। বাকি জীবনটা হাসিখুশি কাটানোর কারনটাও পেয়ে গেছি। এবার আপনিই বলুন, কেনো কাঁদবো না?
মিষ্টিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নেন মামুন।
সত্যিই তো, ভালোবাসার মানুষটাকে সারাজীবন পাশে পেলে আর কি লাগে? ভালো থাকার জন্য কি এটা যথেষ্ট কারন নয়?
যে মানুষটার কল্পনায় আপনি ছাড়া দ্বিতীয় কারও অস্তিত্ব নেই,
যে মানুষটা হাজারটা বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে আপনাকে জয় করেছে,
তার চোখে আপনাকে পাওয়ার আনন্দের অশ্রু থাকবেই।
আপনি সারাজীবন তাকেই মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসুন,
যে তার ভালোবাসার শক্তি দিয়ে আপনাকে জয় করেছে।
"বেচে থাকুক ভালোবাসা"
.
.
........সমাপ্ত.........
