গল্প :- #এক_মুঠো_রোদ (

০৮)-৯-১০

লেখক :- #A_Al_Mamun

.

--অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়?

--হ্যা, কাল দুপুরে বারান্দায় বসে ছিলাম। লোকটাকে দেখলাম বাসার আশেপাশে পায়চারী করতেছে। কিন্তু যখন মিষ্টি বারান্দায় এলো, লোকটা মিষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিলো। এমন মনে হলো যেনো লোকটা মিষ্টিকে চেনে।

--তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে না? কেনো এভাবে তাকিয়ে থাকে? কিরকম দেখতে লোকটা? 

--তোর বয়সি...

--আচ্ছা আমি দেখতেছি বিষয়টা। তুমি মিষ্টিকে কিছু বলিও না।

--ঠিক আছে।

মামুন অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। বাহিরে বের হয়ে দেখে একটা লোক সামনের বাসার গেইটের সামনের সিড়িতে বসে বারান্দার দিকে তাকিয়ে আছে।

মামুন সন্দের চোখে লোকটার দিকে তাকায়। মামুনকে সামনে দেখে লোকটা হাতে বাদাম নিয়ে চিবুতে চিবুতে এদিক ওদিক তাকিয়ে উঠে রাস্তা ধরে হাটা দেয়।

অফিসের তাড়া থাকায় লোকটার পেছনে সময় নষ্ট না করে অফিসের দিকেই রওয়ানা দেয় মামুন।

অফিস শেষে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার সময় মামুন খেয়াল করে সেই লোকটা মামুনকে দেখে সোজা অন্যদিকে হাটা দেয়। সন্দেহটা যেনো আরো ঘাড়ো হতে থাকে।

কলিংবেল দেওয়ার পর মিষ্টি এসে দরজা খুলে হাসিমুখে মামুনের সামনে দাড়ায়।

মিষ্টির হাসিমুখটাও যেনো আজ মামুনকে খুশি করতে পারছে না। মনের মধ্যে কত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

কে এই লোক? কার জন্য এখানে এসে দাড়ায়? মিষ্টির পরিচিত কেউ নয়তো? কেনো ক্ষতি করে ফেলবে নাতো?

--এই, কি ভাবছেন এতো? ভিতরেতো আসুন।

--হুম।

--ব্যাগটা দিন। এতো উদাস লাগছে কেনো আপনাকে? 

--ক্লান্ত লাগছে। একটু পানি দিবে?

--আপনি রুমে যান, আমি নিয়ে আসছি।

--আচ্ছা।

.

মামুন রুমে এসে ভাবতে থাকে...

মিষ্টিকে কি একবার জিজ্ঞেস করে দেখবো সে এই ব্যাপারে কিছু জানে কিনা?

না থাক, পুরোনো কথা মনে করিয়ে দিলে হয়তো কষ্ট পাবে। আমি নিজেই দেখবো কে এই লোক।

--নিন লেবুর শরবতটা খেয়ে নিন।

--কষ্ট করে আবার এটা বানাতে গেলে কেনো?

--আপনাকে কেমন যেনো লাগছে। কিছু হয়েছে?

--না না, কি হবে? কাজের চাপে একটু ক্লান্ত লাগছে।

--ওও আচ্ছা, তাহলে খেয়ে এসে শুইয়ে পড়ুন।

--খাবারটা একটু এনে দিবে?

--আচ্ছা, আপনি হাত মুখ ধুয়ে নিন। আমি এনে দিচ্ছি।

--ঠিক আছে।

মামুন ঠিক করে নেয় কাল যে করেই হোক লোকটার পরিচয় জেনে নিবে। 

কে সে? কেনই বা এই বাসার সামনে এসে ঘুরঘুর করে।

অফিস থেকে ১০ দিনের ছুটি নিয়ে আসে মামুন। একটাই প্ল্যান, সারাক্ষণ মিষ্টির সাথেই সময় কাটাবে সে। কিন্তু একটা চিন্তা কিছুতেই সেই কাজটা করতে দিচ্ছে না।

কোনো রকমে রাতটা পার করে পরদিন সকাল থেকে মামুন মায়ের বারান্দায় এসে বসে থাকে। মোটামুটি পুরোদিনই মামুন বারান্দায় এবং বাসার সামনের রাস্তার সময় কাটায়। কিন্তু লোকটাকে আর খুজে পাওয়া যায় নি।

.

--তোমায় কিছু কথা বলার ছিলো।

--জ্বি বলুন না।

--কাল তো শুক্রবার। কেনাকাটা করতে হবে না?

--যেমনটা আপনি ভালো বুঝেন।

--মাকে বলেছি, কাল আমরা শপিংয়ে যাবো।

--আমিতো এসব বুঝি না। রিয়াকে নিয়ে গিয়ে আপনি কিনে নিন।

--পাগলি, তোমার পছন্দের জিনিস তুমি কিনবে। রিয়া কি করে জানবে তোমার পছন্দ কি।

--আপনি নাহয় পছন্দ করে নিবেন।

--আমি মাকে বলে দিয়েছি, কাল সকালে তৈরী থেকো।

--আমার কেমন যেনো লাগে শপিংয়ে যেতে। সবার মাঝে নিজেকে কেনো যেনো তুচ্ছ মনে হয়। বাবাগো, ১ম যখন গিয়েছিলাম, এত বড় বিল্ডিং দেখে মনে হচ্ছিলো এই বুঝি মাথায় এসে পড়বে।

--কেনো এমন লাগে?

--প্রথমবার গিয়েছিলাম তো তাই হয়তো এমন লেগেছে।

--আর লাগবে না, সকালে রিয়াকে নিয়ে তৈরী থাকবে।

--আচ্ছা।

.

আজও প্রতিদিনের মত মিষ্টি নাস্তা বানানো শেষ করে মামুনকে ডাকতে আসে।

--শুনছেন? অনেক বেলা হলো তো, উঠুন।

--

--এই যে মিঃ(হালকা ধাক্কা দিয়ে)

--হুম।

--উঠবেন না?

--আজ অফিস নেই, আর একটু ঘুমাই।

--নাস্তা ঠান্ডা হয়ে গেলো।

--আর একটু পর উঠি।

--আমি এক্ষুণি মাকে ডাকতে গেলাম।

বলেই মিষ্টি পেছন ফিরে হাটা দিবে, এমন সময় মিষ্টির হাত ধরে নিজের দিকে একটা হেচকা টান দেয় মামুন।

নিজেকে সামলাতে না পেরে মিষ্টি গিয়ে মামুনের ওপর পড়ে।

দুহাত দিয়ে মিষ্টিকে নিজের বুকের ওপর শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে যায় মামুন। 

মামুন ওপরে আর মিষ্টি নিচে।

চোখ দুটো বন্ধ করে চুপ করে শুয়ে আছে মিষ্টি।

--কই যাচ্ছিলে? বিচার দিতে? 

--

--চোখ খোলো।

--পারবো না।

--কেনো?

--ছাড়ুন প্লিজ।

--ছাড়ার জন্য কি ধরেছি? চোখ খোলো।

--না না... প্লিজ ছেড়ে দিন। দরজা খোলা, মা এসে পড়বে।

--আসবে না। 

--তবুও, আমাদের এখনো বিয়ে হয়নি। কেনো এভাবে জড়িয়ে নিয়েছেন আমায়? আমার কেমন যেনো লাগছে। প্লিজ ছেড়ে দিন।

--কেমন লাগছে?

--শরীর কাঁপতেছে। 

--একটা পাপ্পি দেই?

--একদম না। 

--জোর করবো?

--পারলে করেন।

--না পারার তো কোনো কারন নেই। কিন্তু দিবো না।

--তাহলে ছাড়ুন।

--ছাড়বো, তবে একটা শর্ত আছে। 

--কি?

--বিয়ের পর প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জাগাতে আসলে আমার জড়িয়ে ধরে একটা পাপ্পি দিতে হবে। 

--পারবো না। 

--কেনো?

--আমার লজ্জা করে।

--বিয়ের পরও?

--হুম।

মিষ্টিকে ছেড়ে দিয়ে মামুন অন্য পাশে সরে যায়।

--ঠিক আছে যাও, লাগবে না।

--রাগ করেছেন?

--না।

--আচ্ছা করবো, আপনি যেভাবে চান।

--লাগবে না।

ওমনি মামুনকে জড়িয়ে ধরে একটা পাপ্পি দিয়ে বসে। 

--প্লিজ আর রাগ করে থাকবেন না। আপনি যদি রাগ করেন তাহলে আমি কোথায় যাবো?

--এই পাগলি, আমিতো মজা করছিলাম। তোমার ওপর কি রাগ করা যায়? 

--আপনি যা বলবেন আমি সব শুনবো, সব করবো। তবুও রাগ করে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করবেন না। প্লিজ....

--ধুর, আমি কি এমনটা করতে পারি?

--কথা দিন, আমার সাথে কখনো কথা বলা বন্ধ করবেন না। 

--কথা দিলাম। যত যাই হয়ে যাক, তোমার সাথে কথা বলা বন্ধ করবো না।

--মনে থাকে যেনো।

--জ্বি থাকবে।

--উঠুন, কত কষ্ট করে নাস্তা বানিয়েছি। সব ঠান্ডা হয়ে গেলো।

--৫ মিনিট, আমি আসতেছি।

--জলদি....।

--আচ্ছা।

.

নাস্তা শেষে বারান্দায় বসে মামুন পত্রিকা পড়ছিলো। এমন সময় খেয়াল করে সেই লোকটা আজও গেইটের সামনে পায়চারি করতেছে। 

দ্রুত নিচে নেমে মামুন লোকটার সামনে এসে দাড়ায়।

--এই যে ভাই, কে আপনি? এখানে কি করছেন?

--কই? কিছু না। 

--প্রতিদিন এই বাড়ির সামনে কেনো ঘুরঘুর করেন? কি চান?

--না ভাই, কিছু না। আমি আসি....।

বলেই লোকটা সামনের দিকে হাটা দেয়। মামুন দৌড়ে গিয়ে লোকটার সামনে দাড়ায়।

--এমনি এমনি ৪-৫ দিন ধরে কারো বাড়ির সামনে কেউ ঘুরঘুর করে না। কোনো কারন তো আছেই। কেনো ঘুরঘুর করছিলেন?

--এমনি সময় কাটাচ্ছিলাম। কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আসিনি ভাই, সত্যি বলছি।

--আপনাকে দেখতে তো কোনো ভালো ফ্যামিলির ছেলে বলেই মনে হয়। কিন্তু যেই কাজ করতেছেন, এসে না জিজ্ঞেস করে যদি সোজা মারা শুরু করতাম, কিছু করতে পারতেন?

--ভাই, কি যে বলেন। কেনো এমন করবেন? আমি কি কারো ক্ষতি করেছি?

--ক্ষতি করেননি, কিন্তু করবেন না যে তার কি গ্যারান্টি আছে? ৪-৫ দিন যাবত সকাল-সন্ধ্যা একই বাসার সামনে ঘুরঘুর করতেছেন। এই বাড়ির কাউকে চেনেন? পুলিশে কমপ্লেইন দিবো?

--না না ভাই, আমি আর আসবো না।

--কেনো এখানে আসতেন?

--ওই বারান্দায় একটা মেয়েকে দেখেছিলাম। ওই মেয়েটাকে ভালো লাগে, তাই তাকে দেখতে আসি।

--মেয়ে? কোন মেয়ে?

--একটু আগেও এসেছিলো। এখন চলে গেছে।

--হালার ঘরে হালা ওইটা আমার বউ। থাপ্পড় চিনস? কানের নিচে এমন একটা দিমু আজীবন মনে রাখবি। 

--সরি ভাই। আর আসবো না।

--যা ভাগ এখান থেকে।

-- এক্ষুণি চলে যাচ্ছি।

--আর যেনো এই বাসার সামনে না দেখি।

--ঠিক আছে।

.

মামুনের ধমক খেয়ে লোকটা একটু তাড়াহুড়া করেই পালায়। 

--কে ছিলো লোকটা?(সানু বেগম)

--তুমি দেখেছো?

--হুম, বারান্দা থেকে দেখলাম তার সাথে কথা বলছিলি। কে সে?

--আর বলো না, মিষ্টিকে মনে হয় এই বারান্দায় দেখেছে। তাই প্রতিদিন চলে আসে... তবে কথাবার্তা শুনে মনে হলো ভয় পাওয়ার মতো কোনো কারন নেই। 

--এসব ছেলেদের কি কোনো কাজ নেই? 

--বাদ দাও। এমন ধমক দিছি, আর আসবে না।

--না আসলেই ভালো।

--মিষ্টিকে একটু বলো না এক কাপ চা দিতে।

--পাঠাচ্ছি ওকে।

একটু পর হাতে চা নিয়ে মিষ্টি বারান্দায় আসে।

--চা চেয়েছিলেন?

--হুম, থ্যাংকস।

--আমাকেই ডাকতে পারতেন। মাকে কেনো অর্ডার দিলেন?

--অর্ডার দিলাম কই? তোমাকে বলতে বললাম।

--এরপর থেকে আমাকে সরাসরি ডাক দিবেন।

--আচ্ছা বাবা, সরি। বসো এখানে, তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা ছিলো।

--কি কথা?

--তোমার বাড়ির ঠিকানা মনে আছে?

--কেনো?

--একবার গিয়ে দেখে আসতাম।

--কেনো?

--কেনো কি? তোমার বিয়ে, ওনাদের জানালে ভালো হতো না?

--ওরা আমার কেউ না। কেনো ওদের জানাবেন?

--শত হলেও তো তোমার মা। ছোট থেকে তোমায় মানুষ করেছে। অন্তত ওনারা জানুক যে তাদের মেয়ে স্বামীর বাড়িতে আছে।

--দেখুন, ওনাদের জানালেও কোনো লাভ নেই। আপনি ওসব ভুলে যান। এই পৃথিবীতে আমার আপনজন বলতে শুধু আপনারাই আছেন। আর কাউকে আমি চিনি না।

--আচ্ছা আমায় ঠিকানাটা তো দিতে পারো। ওনারা তো আর আমায় চেনে না। দুর থেকে দেখে আসবো ওনারা কেমন আছেন, কিভাবে আছেন।

--হঠ্যাৎ ওনাদের কথা মনে পড়লো কেনো?

--ওনারা ছোট থেকে তোমায় মানুষ না করলে আজ কি আমি তোমাকে পেতাম? তাই মন থেকে ওনাদের একটা ধন্যবাদ দিতে মন চাচ্ছে।

--লাগবে না।

--দাও না। 

--ওনারা কখনোই আমার মঙ্গল চান নি। আর আমার শত বাবা অনেক খারাপ মানুষ। বিপদ বাড়ানোর দরকার নাই।

--আচ্ছা আমি তাদের সাথে কথা বলবো না। শুধু ঠিকানাটা দাও। দেখেই চলে আসবো।

--কথা বলবেন নাতো?

--না।

--ঠিক আছে। ঠিকানা "------------"


সন্ধ্যায় মিষ্টি আর রিয়াকে সাথে নিয়ে মামুন শপিংয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।

বিয়ের বাকি আর ৭ দিন। মোটামুটি কিছু প্রতিবেশী আর মামুনের কিছু কাছের সহকর্মীকে দাওয়াত দেওয়া হয়ে গেছে।

এখন শপিং করা হয়ে গেলে প্রায় ৫০% কাজ এগিয়ে যাবে।

শপিং মলে পোছানোর ১০ মিনিটের মাথায় বাড়ি থেকে সানু বেগমের ফোন আসে।

--হ্যা মা বলো।

--কোথায় তুই?

--এইতো দোকানে, রিয়া আর মিষ্টি কাপড় দেখতেছে।

--বাড়িতে পুলিশ এসেছে।

--কিহ? কেনো?

--জানি না। ওরা আমার সামনেই বসে আছে, মিষ্টিকে খুজতেছে। 

.

.গল্প :- #এক_মুঠো_রোদ (০৯)

লেখক :- #A_Al_Mamun

.


--বাড়িতে পুলিশ এসেছে।

--কিহ? কেনো?

--জানি না। ওরা আমার সামনেই বসে আছে, মিষ্টিকে খুজতেছে। 

--মিষ্টিকে খুজতেছে? কি করেছে মিষ্টি?

--ওর নামে নাকি থানায় মামলা আছে।

--মামলা? কিসের মামলা?

--জানি না। ওরা মিষ্টিকে চাচ্ছে। তুই তাড়াতাড়ি বাসায় এসে ওদের সাথে কথা বল।

--আমি এক্ষুণি আসছি।

--তাড়াতাড়ি আয় বাবা।

মিষ্টি আর রিয়াকে সাথে নিয়ে মামুন দ্রুত বাসায় ফেরে।

ড্রয়িংরুমে তখনো ২ জন পুরুষ আর একজন মহিলা পুলিশ বসে আছে।

মামুনকে রুমে প্রবেশ করতে দেখে একজন পুলিশ সামনে এগিয়ে আসে।

--এনাদের মধ্যে মিষ্টি কে?

--কি হয়েছে স্যার? মিষ্টি কি করেছে?

--ওনার নামে মার্ডার কেইস আছে।

--কিহ? মার্ডার? কি বলছেন এসব? 

--আমি ঠিকই বলছি। 

--কবে করেছে খুন?

--৬ মাস আগে, এরপর থেকেই উনি পলাতক। আজ গোপন সুত্রের ভিত্তিতে ওনার খবর পেয়েছি আমরা। ভালোয় ভালোয় ওনাকে আমাদের হাতে তুলে দিন। নাহলে আপনাকেও বিপদে পড়তে হবে।

--আপনি কি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন?

--মনে করেন হুমকি...। আপনি খুনের আসামিকে সাহায্য করছেন। 

--কি প্রমান আছে যে মিষ্টি খুনি। যদি আপনি প্রমান দিতে পারেন, তাহলে আমি নিজেই মিষ্টিকে আপনার হাতে তুলে দিবো।

--প্রমান আদালত করবে, আমাদের কাজ আমাদের করতে দিন।

--অন্তত এটা তো বলতে পারেন যে কাকে খুন করেছে বা কোথায় খুন করেছে।

মিষ্টি আর রিয়া দুজন পুলিশের ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে একটু দুরে দাড়িয়ে আছে।

--৬ মাস আগে উনি ওনার বিয়ের রাতে তার স্বামীর বাড়ির এক লোককে ছুরি দিয়ে আঘাত করে বিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। ঠিক তার পরদিন রাতে সেই লোকটাকে তার স্বামী ঢাকা নিয়ে যাচ্ছিলো চিকিৎসার জন্য। মিষ্টি সেখানে এসে ওনার স্বামীকে গাড়ির সামনে ধাক্কা দিয়ে খুন করে। মিষ্টি যাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে সেই লোকটাই এর সাক্ষী এবং তিনিই মামলা করেন। মিষ্টির পরিবারকে সবসময় পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে রাখা হতো। আজ তারাই আমাদের মিষ্টির ঠিকানা দিয়েছেন।

--স্যার, আপনি যা বলছেন সবই আমি বুঝেছি, এখানে সম্পূর্ণ কাহিনীটা ভুল ভাবে আপনাদের উপস্থাপন করা হয়েছে। আমি আপনাদের সবটা খুলে বলছি।

--দেখুন ভাই, কাহিনী শুনা আমাদের কাজ না, আপনাদের যা বলার কোর্টে এসে বলবেন বা প্রমান করবেন। আমরা তদন্ত করে দুটো ঘটনার সাথেই মিষ্টির সম্পৃক্তা পেয়েছি।

--স্যার, কি বলছেন এসব? আগামী সপ্তাহে আমাদের বিয়ে, এখন যদি ওকে আপনারা নিয়ে যান, তাহলে একটা সুন্দর জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন।

--আগামী সপ্তাহে আমরা ওনাকে কোর্টে চালান দিবো, এর আগে যদি কিছু করতে পারেন তাহলে তো ভালোই, নাহলে ঝামেলা অনেক বাড়বে। 

.

আর কোনো কথা না শুনে মিষ্টিকে চিহ্নিত করে পুলিশ সাথে করে নিয়ে হাটা দেয়।

মিষ্টি দুচোখের পানি ফেলতে ফেলতে পেছন ফিরে তাকায়... মামুন দৌড়ে মিষ্টি কাছে আসে।

--একদম চিন্তা করবে না। তোমার কিচ্ছু হবে না। আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনবোই... এখনো এক সপ্তাহ সময় আছে। এর আগেই আমি তোমায় নিয়ে আসবো...

মিষ্টির সাথে কথা বলতে বলতে মামুন রাস্তায় চলে আসে। ততক্ষণে মিষ্টিকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়।

যাওয়ার আগ পর্যন্ত মিষ্টি আর কোনো কথা বলেনি।

ঘরে এসে ঠাস করে সোফায় এসে বসে মামুন।

মা আর রিয়াও পাশে বসে আছে।

--সব আমার দোষ, আমার জন্যই মিষ্টিকে আজ জেলে যেতে হলো। 

--কি করেছিস তুই?

--বিকেলে মিষ্টির বাবা মায়ের কাছে গিয়েছিলাম। মিষ্টি আমায় বার বার নিষেধ করেছিলো যে ওরা মানুষ ভালো না, তবুও চলে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম মানুষতো পরিবর্তন হয়, হয়তো তারাও হয়েছে। ওরা আমায় কেঁদে কেঁদে বলেছিলো যেনো ঠিকানাটা দেই, বিয়ের দিন লুকিয়ে লুকিয়ে এসে একবার মিষ্টিকে দেখে যাবে। বিশ্বাস করে ঠিকানাটা দিয়েছিলাম। 

--যারা মেয়েটার জীবনটা নরক বানিয়ে দিয়েছিলো, তুই তাদের কাছে কোন ভরসায় গিয়েছিলি? এতটা বোকা কি করে হলি তুই? 

--বুঝতে পারিনি মা, অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি আমি। 

--যেভাবেই হোক ওকে বের করে নিয়ে আয়। 

--হুম, ওকে আমি নিয়ে আসবো। সব প্রমান আমি জোগাড় করবো।

বলেই মামুন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।

.

সোজায় থানায় এসে মিষ্টির মুখোমুখি দাড়ায় মামুন। 

--আমায় ক্ষমা করে দিও, তোমার কথা না শুনে তোমায় বিপদে ফেলে দিলাম।

--কি করেছেন আপনি?

--তোমার মায়ের কাছে গিয়েছিলাম। পুলিশ ওখান থেকেই ঠিকানাটা পেয়েছে।

মুচকি হেসে মিষ্টি জবাব দেয়।

--আপনি একটা পাগল, কথা বলবেন না বলে ঠিকানাটা নিয়েছিলেন। যাই হোক, আল্লাহ ভাগ্যে যা রেখেছেন তাই হবে।

--কিচ্ছু হবে না, আমি আছি কি করতে? একদম চিন্তা করবে না।

--আপনাদের খুব মনে পড়বে। রিয়া তো আমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারে না। ওকে বলবেন কয়েকদিন কষ্ট হবে, পরে ঠিক হয়ে যাবে। 

--তোমার মৃত স্বামীর ঠিকানাটা দিবে?

--আমিতো ভিতরে, এবার কি নিজের বিপদ বাড়ানোর চিন্তা করছেন? বাসায় যান।

--ঠিকানাটা দাও।

--কি করবেন ঠিকানা দিয়ে?

--যে তোমার নামে এই মিথ্যে মামলা করেছে তাকে খুজে বের করে মামলা তুলে নিতে বলবো।

--দিবো না।

--দিতে বলেছি।

--না। আপনি চলে যান।

--না দিলে আমি আর বাসায় ফিরবো না।

--কেনো এমন করছেন? ওর ভালো মানুষ না, আপনার ক্ষতি করে ফেলবে।

--যদি তুমি না দাও তাহলে কি আমি ওকে খুজে বের করতে পারবো না?

--প্লিজ এমন করবেন না, বাসায় ফিরে যান। 

--চিন্তা করো না, তোমাকে নিয়েই আমি বাসায় ফিরবো। এর আগে না।

.

মিষ্টিকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মামুন বেরিয়ে পড়ে। জোরে জোরে চিৎকার করে মিষ্টি মামুনকে ডাকছে, কিন্তু সেই আওয়াজ আর মামুনের কান পর্যন্ত পোঁছাচ্ছে না।

--আম্মু... রাতের প্রায় ৩ টা। ভাইয়া এখনো ফিরলো না। 

--হ্যা রে মা, অনেক্ষন যাবত ওকে ফোন দিচ্ছি। ফোনটাও বন্ধ বলছে। আমারতো খুব চিন্তা হচ্ছে।

--ভাইয়া কি মিষ্টির জন্য থানায় বসে আছে। চলো আমরা গিয়ে দেখি।

--এত রাতে বাহিরে বের হওয়া ঠিক হবে না। সকাল পর্যন্ত দেখি, এরপর যাবো।

পরদিন সকাল সকাল সানু বেগম রিয়াকে সাথে নিয়ে থানায় যায়।

--আমার (---------) মেয়ের সাথে দেখা করতে এসেছি।

--ওনারতো জামিন হয়ে গেছে।

--জামিন হয়ে গেছে? কখন?

--কাল রাতেই ওনার স্বামী এসে ওনাকে নিয়ে গেছে।

--স্বামী? 

--জ্বি...

পুলিশের কথার আগা মাথা কিছু বুঝতে না পেরে থানার বাহিরে এসে বসে সানু বেগম।

--আম্মু, মিষ্টির স্বামী কে? (রিয়া)

--জানি না রে মা, আমিও তো প্রথম শুনলাম। তোর ভাইও তো ফোন ধরতেছে না। কি যে করি আমি? আমার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে।

--চলো বাসায় চলো। 

--বাসায় গিয়ে কি করবো? মিষ্টি কোথায় চলে গেলো? তোর ভাইয়েরও কোনো খবর নেই।

একটু পর মামুনের ফোন থেকে সানু বেগমের কাছে কল আসে।

--মা, কই তোমরা?

--তুই কই বাবা? তোকে কত খুজতেছি।

--আমি তো বাসায় আসলাম। তোমরা কই গেছো?

--আমরা থানায়।

--থানায় কেনো? জলদি বাসায় এসো।

--আচ্ছা আসতেছি।।

.

--কে আম্মু? ভাইয়া কল দিছে?

--হ্যা।

--কই সে?

--বাসায় বললো। চল...

--হ্যা চলো।

রিয়া আর সানু বেগম বাসায় এসে দেখে মামুন ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখতেছে।

--কই ছিলি তুই সারা রাত?

--কোথাও যাইনি তো।

--তাহলে বাসায় কেনো আসলি না?

--একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে গিয়েছিলাম। তোমরা থানায় কেনো গেলে?

--তুই ফিরে আসছিলি না। তাই ভাবলাম মিষ্টির জন্য হয়তো থানায় বসে আছি। কিন্তু গিয়ে দেখি মিষ্টিও থানায় নেই। ওর স্বামী নাকি ওকে জামিন করিয়ে নিয়ে গেছে। আর তুই এখন রুমে এসে টিভি দেখছিস। কোথায় থেকে এলো মিষ্টির স্বামী?

--শুনবে?

--কি শুনবো?

--কাল রাতে কি হয়েছে শুনবে?

--কি?

--বসো এখানে।

--হুম।

--মিষ্টিকে বাঁচানোর কোনো উপায় না পেয়ে পুরো পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আমার প্রয়োজন ছিলো সেই লোকটাকে যে মিষ্টির নামে মামলা করেছিলো। কিন্তু তার ঠিকানা আমি জানতাম না। তাই রাতেই মিষ্টির মায়ের কাছে গিয়েছিলাম। ওরা আমার দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলো। হতাস হয়ে ওদের বাড়ি থেকে ফিরে আসছিলাম। সামনেই একটা লোকের সাথে ধাক্কা লাগলো। আমার সাথে ধাক্কা লেগেই লোকটা পড়ে যায়। ওই লোকটাকে দেখে বেশ অবাক হলাম। এত রাতেও লোকটা সানগ্লাস পড়ে ছিলো। আমার সাথে ধাক্কা খাওয়ায় তার সানগ্লাসটা পড়ে যায়, খেয়াল করে দেখলাম তার এক চোখ নষ্ট। তড়িঘড়ি করে লোকটা সানগ্লাস পড়ে সামনের দিকে হাটা দেয়। পেছন ফিরে দেখি সে মিষ্টির মায়ের ঘরের দিকেই যাচ্ছে। তখনই মিষ্টির কথা মনে পড়ে গেলো। যেই লোকটা মামলা করেছিলো তার তো এক চোখ নষ্ট ছিলো। যা মিষ্টিই নষ্ট করেছিলো।

লোকটার পিছু নিয়ে দেখি সে মিষ্টির মায়ের ঘরেই প্রবেশ করে।

মিষ্টির মায়ের ঘরটা বেড়ার ঘর হওয়ায় আমার জন্য বেশ সুবিধা হয়।

তাদের ঘরের পেছনে গিয়ে বেড়ার ফাঁকে উকি দিয়ে কিছু কথা শুনলাম।

--এই নিন ৫০ হাজার, বাকি ৫০ ওকে আমার হাতে তুলে দিলেই পেয়ে যাবেন।

লোকটার দেওয়া টাকাটা হাতে নিয়েই মিষ্টির মা খুশিতে গজগজ করতে থাকে।

বেশ অবাক হলাম ওদের কর্মকান্ডে। তাই ফোনটা বের করে বেড়ার ফাঁকে দিয়ে ভিডিও শুরু করি।

--মিষ্টিকে আজই তুমি পেয়ে যাবে। শুনেছি পুলিশ ওকে থানায় নিয়ে গেছে। এখনই ওকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসবো। তুমি টাকাটা রেডি রাখো।

--টাকা রেডি আছে। ওকে শুধু আমার কাছে এনে দাও। 

--একটু আগে মিষ্টিকে যেই লোকটা আশ্রয় দিয়েছিলো সেই লোকটা এসেছে। তোমার ঠিকানা চেয়েছে। তাকে আমি তাড়িয়ে দিয়েছি।

--ভালো করেছো। কাউকে আমার ঠিকানা দিবে না। জলদি তোমার মেয়েকে আমায় এনে দাও। ও আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। আমার চোখ নষ্ট করেছে। ছুরির আঘাতে আমার চেহারাটা কুৎসিত বানিয়ে ফেলেছে। এর প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। ওকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেললেও আমার গায়ের জ্বালা মিটবে না। ওর জন্য আমি সমাজে মুখ দেখাতে পারি না। ওর মতো কত মেয়েকে রেপ করে বুক ফুলিয়ে রাস্তা দিয়ে হাটতাম। কিন্তু ওই মেয়ের জন্য এখন আমায় মাথা নিচু করে হাটতে হয়। আমার এই কুৎসিত চেহারার জন্য আমার দিকে কেউ তাকায়ও না। সেদিন ওকে রেপ করতে পারি নি, আমায় ছুরি মেরে পালিয়েছিলো। আর দেরি নয়। জলদি ওকে এনে দাও।

--চিন্তা করো না। তোমার করা মিথ্যে মামলায় সে ফেঁসে গেছে। তার পালানোর কোনো রাস্তা নেই। আমিই ওকে বের করে নিয়ে আসবো থানা থেকে। চলো আমার সাথে।

তারা তাদের কথা শেষ করেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।

মিষ্টির মায়ের এমন মানসিকতা দেখে অবাক হওয়া ছাড়া আর কেনো উপায় নেই। নিজের মেয়ে না হলেও, ছোট থেকে তো নিজের মেয়ের মতো করেই মানুষ করেছিলো। তার মনে কি একটুও মায়া জন্মায়নি? কিভাবে সে টাকার জন্য মেয়েকে শেষ করে দিতে পারে? 

মিষ্টির মতো আমার মনেও তার মায়ের জন্য প্রচন্ড ঘৃণা জন্মায়।

.

তাদের আগেই থানায় এসে পৌছাই, এবং ভিডিওটা পুলিশের হাতে তুলে দেই।

এর প্রায় ১ ঘন্টা পর মিষ্টির মা বাবা আর ওই লোকটা থানায় এসে পৌছায়।

আমি পেছনেই বসে ছিলাম।

মিষ্টির মা এসে পুলিশের কাছে বলে যে তারা যেই মেয়েকে গ্রেপ্তার করেছে সেটা আসল অপরাধী নয়, ঠিকানা সম্ভাবত ভুল ছিলো। তাই ওই মেয়েটাকে যেনো তারা ছেড়ে দেয়। মেয়েটা সম্পূর্ণ নিরপরাধ।

পুরো অফিস চারদিক থেকে পুলিশ ঘিরে ফেলে।

তাদের অবাক করে দিয়ে সবাইকে গ্রেপ্তার করে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি ওখানেই বসে ছিলাম।

ঘন্টা দুয়েক পর সেই পুলিশটা আমার সামনে আসে যে বাসা থেকে মিষ্টিকে নিয়ে এসেছিলো।

--আপনার দেওয়া ভিডিও দেখে ওদের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সবাই নিজেদের দোষ শিকার করেছে। তাই সবাইকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

--স্যার মিষ্টি?

--একটু অপেক্ষা করুন। কিছু কাগজপত্রের কাজ আছে। শেষ হলেই ওনাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

--স্যার বাঁচালেন। সামনের সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে। বুঝতেই পারছেন কি হতো।

--সরি ভাই, এটা আমাদের ডিউটি। নিজের মন মতো কিছু করার সুযোগ নেই।

--আমাদের বিয়েতে আপনার দাওয়াত রইলো। আসবেন কিন্তু।

--সময় নাইরে ভাই। এমন চাকরি করি যে ২ মাস হলো নিজের বউটারেই চোখে দেখি না। সামনের মাসে বাড়ি যামু। বউটা প্রতিদিন ফোন দিয়া আসতে বলে।

--তোর ফাও পেচ্যাল বন্ধ করে কাজের কথায় আয়। এরপর কি হলো?(রিয়া)

--এরপর আরকি, পুরো পুলিশ স্টেশনকে বিয়ের দাওয়াত দিলাম।

--রাখ তোর দাওয়াত? সারারাত কই ছিলি? মিষ্টি কোথায়?

.

.গল্প :- #এক_মুঠো_রোদ (১০)

লেখক :- #A_Al_Mamun

.

এরপর কি হলো?

--এরপর আরকি, পুরো পুলিশ স্টেশনকে বিয়ের দাওয়াত দিলাম।

--রাখ তোর দাওয়াত? সারারাত কই ছিলি? মিষ্টি কোথায়?

--মাঝরাত হয়ে যাওয়ায় আর বাসায় আসিনি। সামনে যেই পার্কটা আছে, ওখানেই বসে ছিলাম। 

--এখন মিষ্টি কই?

--সবগুলো পাতিল খালি। ক্ষুধায় জান যায় যায় অবস্থা। তাই মিষ্টি নাস্তা বানাচ্ছে। রান্নাঘরে আছে গিয়ে দেখ।

--মেয়েটা ওপর দিয়ে এতটা ধকল গেলো। আর তুই ওকে রান্নাঘরে পাঠিয়ে এখানে পায়ের ওপর পা তুলে টিভি দেখছিস?(সানু বেগম)

--আমার কি দোষ? সে তো আমার সাথে কথাই বলছে না।

--কেনো?

--রেগে আছে বোধয়। সেই রাত থেকে একটা কথাও বলেনি।

--রাগার দরকারও আছে, থাক তুই এখানে।

মামুনকে ড্রয়িংরুমে রেখে রিয়া আর সানু বেগম রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়।

--মিষ্টি....

--আরে মা, কোথায় ছিলেন আপনারা?

--থানায় গিয়েছিলাম। 

--ওও, আমি তো চলে এসেছি।

--হ্যা মামুন সব বলেছে। বুকের ওপর থেকে পাথর নেমে গেছে মনে হচ্ছে। তুমি রুমে যাও, আমি নাস্তা বানাচ্ছি।

--না না মা, আমি পারবো। 

--পারলেও এখন করা লাগবে না। রুমে গিয়ে একটু বিশ্রাম নাও। 

--বিশ্রাম তো পরেও নিতে পারবো।

--যেতে বললাম না! যাও।

--আচ্ছা।

রিয়া মিষ্টিকে সাথে করে নিয়ে রুমে এসে বসে। মিষ্টিকে রুমে যেতে দেখে মামুনও পেছন পেছন রিয়ার রুমে এসে মিষ্টির সামনে দাড়ায়।

--তোর এখানে কি?(রিয়া)

--তোর ভাবির সাথে একটু কথা বলতাম।

--সে বলবে না। 

--একটু রান্না ঘরে গিয়ে মাকে সাহায্য কর। আমি ওর সাথে একটু কথা বলি।

--রিয়া তুমি যাবে না। এখানেই বসে থাকো।(মিষ্টি)

--আমার অপরাধটা কি সেটা তো বলো। কেনো আমার সাথে কথা বলছো না?

--

--এটার ও জবাব দেবে না?

--রিয়া, ওনাকে বলো আমি ওনার সাথে কথা বলবো না।

--কিন্তু কেনো?

--যে আমার কথা শোনে না, কেনো তার সাথে কথা বলবো?

--বাবারে..... একটা ভুল নাহয় করে ফেলেছি। তাই বলে কথা বলবে না?

--না।

--ঠিক আছে, আমার সাথে কথা না বললে আমি খাবো না।

--রিয়া, ওনাকে ঢং করতে মানা করো। 

--আমি ঢং করতেছি? ঠিক আছে, কাল দুপুরের পর থেকে আমি এখনো কিছু খাইনি, একটু পর জ্ঞান হারাবো, তখন যেনো আমার কাছে না আসে।

--ভাই, এবার কিন্তু ওভার এক্টিং করছিস, যা নিজের রুমে যা।(রিয়া)

--থাক তোরা, আমিও আর কারো সাথে কথা বলবো না।

.

মিষ্টির সাথে রাগ দেখিয়ে মামুন সোজা নিজের রুমে চলে আসে।

--আচ্ছা, ভাইয়ার সাথে কথা বলছো না কেনো?

--সে আমার কোনো কথাই শুনে না।

--কি এমন কথা? শুনি তো।

--জানো কাল রাতে কি করেছে?

--কি?

--আমি তাকে কতবার বারন করলাম আমার শতমায়ের বাড়িতে না যেতে। কিন্তু সে আমার কথা না শুনেই ওদের বাড়িতে চলে যায়। কত বড় বিপদ হয়েছে জানো তুমি?

--বিপদ? কি বিপদ?

--কাল রাতে সে থানা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আমি বুঝতে পারছিলাম সে আবার আমার শত মায়ের বাড়িতেই যাবে। কারন যে মামলা করেছে আমি তার ঠিকানা দেই নি। তাই ঠিকানা নেওয়ার জন্য সে ওই বাড়িতেই যাবে। আমি অনেক চিৎকার চেঁচামেচি করে পুলিশকে বলছিলাম যেনো কেউ গিয়ে ওনাকে নিয়ে আসে। ওরা মানুষ ভালো না, ওনার ক্ষতি করে ফেলবে। কেউ আমার কথা শুনছিলো না। এভাবে ২ ঘন্টা চলার পর অতিষ্ঠ হয়ে এক পুলিশ আমার শতমায়ের বাড়িতে যেতে রাজি হয়। এর প্রায় ১ ঘন্টা পর তোমার ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে আসে। জানো কি হয়েছিলো?

--কি?

--তোমার ভাইকে ওরা ওই বাড়িতে বেঁধে রেখেছিলো। যদি ওরা ওনার কোনো ক্ষতি করে ফেলতো? ভাগ্য ভালো পুলিশ গিয়ে ওনাকে ছাড়িয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে। এর কিছুক্ষণ পরই পুলিশ আমাকে ছেড়ে দেয়।

--আচ্ছা... তাহলে এই ব্যাপার?

--কোন ব্যাপার?

--কি চাপাবাজিটাই না করলো। দেখাচ্ছি মজা। তুমি বসো আমি আসতেছি।

--কই যাও।

--বসো তো। আমি আসতেছি।

রিয়া দৌড়ে এসে মামুনের রুমে প্রবেশ করে। 

--আমার রুমে কি? তোর রুমে আমি গেছি?

--যাবিও না আর।

--তো তুইও বের হ আমার রুম থেকে।

--তুই কিভাবে এত চাপাবাজি করলি আমার আর আম্মুর সাথে?

--কিসের চাপাবাজি?

--আমাদের বললি কিভাবে হিরোর মতো গিয়ে মিষ্টিকে ছাড়িয়ে নিয়ে এলি। এখন কাহিনী তো দেখি পুরোই উল্টা।

--উল্টা? মিষ্টি কিছু বলছে?

--সব বলে দিছে।

--ধ্যাত.... মেয়েটার পেট পাতলা। কথা রাখতে জানে না।

--মিথ্যুক কোথাকার।

--বনু, আম্মুকে বলিস না প্লিজ।

--মিথ্যা কেনো বললি?

--অল্প একটু মিথ্যা বলছি শুধু। ভিডিও করার সময় বেড়াতে হেলান দিয়ে ভিডিও করছিলাম। বেড়া এতটাই পাতলা ছিলো যে ভেঙে ভেতরে পড়ে যাই। পরে ওরা আমায় ধরে বেঁধে ফেলে। তবে হ্যা, আমায় মারতে পারে নি। এর আগেই কি করে যেনো পুলিশ এসে পড়ে। পরে আমাদের সবাইকে থানায় নিয়ে আসা হয়। ভিডিওটা পুলিশকে দেখালে আমাকে আর মিষ্টিকে ছেড়ে দিয়ে পুলিশ ওদের গ্রেপ্তার করে। শুধু এতটুকুই মিথ্যা বলছি।

--কেনো মিথ্যা বললি?

--আমার একটা মানইজ্জত আছে না! আমাকে বেঁধে ফেলেছে এটা কিভাবে বলি। 

--ছাগল কোথাকার, যা ভাগ।

রিয়ার ধমক খেয়ে মামুন চুপ করে বসে আছে। একটু পর রিয়া হাতে নাস্তার প্লেট নিয়ে আবার মামুনের কাছে ফিরে আসে।

--এই নে, নাস্তা খা।

--খাবো না আমি, নিয়ে যা।

--কেনো?

--ইচ্ছা নাই।

--না খেলে তোর ১২টা বাজাবো আমি।

--কি করবি?

--আম্মুকে সব বলে দিবো।

--কি বলবি?

--তুই হিরো না, জিরো। উল্টা আরো কতকিছু বানিয়ে বানিয়ে বলবো।

--তুই আমার বোন নাকি শত্রু?

--খা বলছি।

--মিষ্টি এলো না কথা বলতে।

--দরজার বাহিরেই দাড়িয়ে আছে সে। তুই খেয়ে নে। খাওয়া শেষ হলেই সে আসবে।

--ওকে একটু ভেতরে পাঠা। কথা আছে তার সাথে।

--পাঠাচ্ছি, খাওয়া শুরু কর।

--হুম।

.

রিয়া বাহিরে এসে মিষ্টিকে ভেতরে পাঠায়। হাতে প্লেট নিয়ে মামুন বিছানায় বসে আছে। আর মিষ্টি এসে ধীরেধীরে মামুনের পাশে বসে।

--কথা বলবে না আমার সাথে? এতটা রাগ আমার ওপর?

--আপনি কেনো আমার কথা শুনেন না?

--এখন থেকে সব শুনবো। 

--যদি ওরা আপনার কোনো ক্ষতি করে ফেলতো? তখন কি হতো?

--আমি না গেলে তোমায় ছাড়াতাম কি করে? 

--তাই বলে বিপদে পড়তে হবে আপনাকে?

--আচ্ছা বাবা যা হওয়ার হয়ে গেছে। আর করবো না এমন। তুমি যা বলবে তাই শুনবো।

--সত্যিতো?

--৩ সত্যি। 

--আপনি আমায় খুব ভালোবাসেন তাইনা?

--ওমা, তুমি কিভাবে জানো এটা?

--ধুর, বলুন না।

--হুম বাসি, খুব।

--আমার যদি কিছু হয়ে যেতো, আপনি কষ্ট পেতেন?

--মরেই যেতাম।

--এত ভালোবাসেন?

--হুম।

--আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরি?

--বাবারে, আজ নিজে থেকেই?

মামুনকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মিষ্টি নিজে থেকেই মামুনকে জড়িয়ে ধরে।

এই প্রথম মিষ্টি জড়িয়ে ধরায় মামুন লজ্জা পাচ্ছে।

মামুনকে জড়িয়ে ধরেই মিষ্টি কান্না করা শুরু করে।

মিষ্টির মুখটা উপরের দিকে তুলে আলতো করে চোখের পানি মুছে দেয় মামুন।

--এই পাগলি, কাঁদছো কেনো?

--আমি খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। ভেবেছিলাম আমি বুঝি আর কখনো আপনাদের কাছে ফিরে আসতে পারবো না। 

--এমনটা কি হতে পারে? তুমি না ফিরলে আমরা কি করে থাকতাম হ্যা? তুমি তো এখন এই পরিবারের একটা বড় অংশ। না চাইলেও তোমায় ফিরতে হতো, শুধু আমাদের জন্য।

--সত্যিই কি আমার ভাগ্যে এত ভালোবাসা ছিলো? 

--তোমায় তো কেউ এমনি এমনি ভালোবাসেনি। এই ভালোবাসা তুমি জয় করে নিয়েছো। 

--একটা কথা বলি?

--হ্যা বলো না।

--ভালোবাসি।

--শুনি নি।

--ভালোবাসি।

--শুনতে পারছি না, আরো জোরে বলো।

-যাহ, বলবো না আর।

--আর একবার বলো প্লিজ।

--আপনাকে আমি খুব খুব ভালোবাসি।

--আমিও।

--বিয়েটা কেনো পেছালেন? আমার আর দেরি সহ্য হচ্ছে না।

--ওমা, এত তাড়া?

--হুম।

--বিয়ের শপিংই তো করা হলো না, কাল আবার যাবে?

--শপিংয়ে?

--হুম।

--আচ্ছা।

.

ভালোয় ভালোয় পুরো দিন কেটে যায়। পরদিন সকালে মামুন আর মিষ্টি আবার বিয়ের শপিংয়ের জন্য বের হয়।

রিয়ার স্কুল থাকায় মামুন আর মিষ্টিকে একাই বের হতে হয়।

বাসার বাহিরে বের হয়ে দেখে সেই লোকটা আজ আবার বাসার সামনে দাড়িয়ে আছে। যে প্রতিদিন এখানে দাড়িয়ে বারান্দার দিকে তাকিয়ে থাকতো।

মামুন আর মিষ্টিকে গেইট দিয়ে বের হতে দেখে লোকটা তাদের দিকে এগিয়ে আসে।

--কেমন আছেন ভাই?

--তুমি আজও এসেছো? কি চাই?

--না ভাই, আজ জ্বালাতে আসি নি। একটা কথা জিজ্ঞেস করতে আসলাম।

--কি কথা?

--ভাবিকে জিজ্ঞেস করতাম।

মিষ্টি লোকটাকে এই প্রথম দেখলো। 

মামুনকে উদ্দেশ্য করে মিষ্টি বলে ওঠে।

--কে উনি?

--জানি না। শুনো কি বলে।

--হ্যা বলুন কি বলবেন।

মিষ্টির অনুমতি পেয়ে লোকটা মিষ্টির সামনে এসে দাড়ায়।

--আপনি আমাকে কখনো দেখেন নি?(লোকটা)

--নাতো।

--আমি প্রতিদিন এখান থেকে আপনাকে দেখতাম।

--ওই মিয়া, কি বলতে আসছো সেটা বলো।(মামুন)

--আচ্ছা উনি কি আপনার স্বামী?

লোকটার এমন প্রশ্নে মিষ্টি একটু অবাকই হয়। কে এই লোক, হঠ্যাৎ কেনই বা এমন প্রশ্ন করছে।

মামুন মিষ্টির উত্তরটা শোনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। মিষ্টিও ঘুরে মামুনের দিকে তাকায়। একটুখানি ভেবে লোকটাকে জবাব দেয়।

--জ্বি, উনি আমার স্বামী। কেনো?

--উনি বলেছিলেন তখন আমার বিশ্বাস হয়নি। তাই আবার এলাম জিজ্ঞেস করতে।

--এই যে ভাই, এবার তো বিশ্বাস হয়েছে? এবার যান।(মামুন)

লোকটা আর কোনো কথা না বলে উল্টোদিক ঘুরে সোজা হাটা দেয়।

--কে এই লোকটা?

--কি জানি, তোমাকে পছন্দ করে।

--আমাকে? কিভাবে? আমি তো চিনিই না।

--যখন বারান্দায় আসতে, সে এখান থেকে উকি দিতো।

--ধুর, চলুন তো। 

--চলো।

.

শপিংমলে প্রবেশ করে মিষ্টি নিজে পছন্দ করে করে কাপড় দেখছে। পুরো দিন শেষ করে মামুনের জন্য, নিজের জন্য, মায়ের জন্য, রিয়ার জন্য, সবার জন্যই মিষ্টি পছন্দ করে কাপড় নেয়।

বাসায় ফিরে সানু বেগমের সামনে সব কাপড় রেখে দেয় মিষ্টি। সানু বেগম আর রিয়া মিষ্টির পছন্দ দেখে খুব খুশি হয়।

ধীরেধীরে বিয়ের দিনক্ষণ এগিয়ে আসে।

বিয়ের আগে থেকেই মিষ্টি পুরো সংসারের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। শুধু মামুনের সাথে একরুমে থাকা হয় না।

তখন রাতের প্রায় ১১টা.. মিষ্টি ছাদে গিয়ে বসে আছে। সারা বাড়ি খুজে মিষ্টিকে না পেয়ে মামুনও ছাদে চলে আসে।

--তুমি এখানে, আর আমি তোমাকে পুরো বাড়ি খুজতে খুজতে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।

--ওমা, কেনো? 

--ভাবলাম বিয়ের আগে বুঝি পালিয়ে গেলে।

--ধুর, কি বলেন এসব। এদিকে আসুন।

মামুন এগিয়ে গিয়ে মিষ্টির পাশে বসে। সুযোগ বুজেই মিষ্টির কোলে মাথা রেখে শুইয়েও পড়ে।

--কি করছেন? মা এসে পড়লে?

--মা ঘুমিয়ে গেছে।

--রিয়া এসে পড়বে।

--আসবে না।

--তবুও

--এত ভয় পাও কেনো হ্যা? আজতো এভাবে এখানেই ঘুমিয়ে যাবো।

--তো আমাকে এভাবে বসে থাকতে হবে?

--হুম।

--ইসসসস, শখ কত।

--পারবে না বুঝি?

--পারবো। আচ্ছা একটা কথা বলি?

--বলো।

--বিয়ের পর আমরা এভাবে ছাদে এসে গল্প করতে পারবো?

--ভালো লাগে বুঝি?

--খুব, দেখুন না চাঁদের আলোয় চারদিকটা কত সুন্দর লাগছে।

--লাগবেই তো। চাঁদ যে আজ দুইটা উঠছে।

--দুইটা কই পেলেন?

--একটা ওই যে ওপরে।

--আরেকটা কই গেলো?

--যায়নি তো, আমি তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছি।

--ইসসসসসস.

.

.

চলবে.......

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url