#অন্ধ_বিশ্বাস
#writer_sumaiya_afrin_oishi
#পর্বঃ৬
পরন্ত বিকল.! মেয়ে পক্ষে'র বাড়ি'তে এসে গম্ভীর হয়ে বসে আছে আদিব। ভাগ্য আজ কোথায় এসে দাঁড় করিয়েছে তাকে? এমনও দিন আসবে আবারো তার জীবনে, কখনো ভাবনায় ছিলো না তার। মনে'র চিলেকোঠার ঘর'টা যে অন্য করো নামে পুরো'টা লিখে দিয়েছিলো সে। অথচ মানুষটা খুব যত্ন করে, তার সমস্ত বিশ্বাস, ভরসা, ভেঙে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলো কত সুন্দর করে। যার ফলে অন্য কোনো নারী'র সঙ্গ পেতে মন সায় দিচ্ছে না তার। তবুও মায়ে'র মন রক্ষার্থে পাশের গ্রাম মধুপুরে মেয়ে দেখতে আসছে আদিব। তাদের সামনে জড়সড় হয়ে বসে আছে এক মায়াবী কন্যা "ফারিহা" তার মনে ভয়, সংকোচ মিলে একাকার। এই বুঝি তাকে রিজেক্ট করে চলে যাবে ছেলে পক্ষের লোকজন।
মা ম'রা মেয়ে ফারিহা।ছোটবেলা থেকে সৎ মায়ে'র কাছে লা'ঠি-ঝাঁ'টা খেয়ে মানুষ হয়েছে। অনার্স শেষ হতে আর একবছর বাকী, অথচ বিয়ে হচ্ছে না কারণ মেয়ে'টার গায়ের রং কালো বলে। মানুক আর নাই মানুক, এই যুগে ৯৯% মানুষ সৌন্দর্যের পুঁজরী! সেখানে কালো মেয়েগুলো হয় নিছক হাসি'র পাএ। যা ফারিহা হারে হারে টের পাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
সৎ মা তো বু'ড়ি ছাড়া ডাকে না তাকে। সংসারের অপ্রয়োজনীয় জিনিস মনে করে পরিবার তাকে।পরিবারে'র অবহেলায় নিজে'কে নিত্যন্ত বোঝা মনে হচ্ছে। সে-ও মনে প্রাণে মুক্তি চায় এই জীবন থেকে। "কেউ একজন আসুক। তাকে এ জীবন থেকে মুক্তি করুক!" এই বলে সৃষ্টিকর্তা'র নিকট প্রার্থনা করছে বারংবার।
তবুও যে এ জীবন থেকে মুক্তি মিলছে'ই না তার। কতই না বয়স তার?অথচ বিয়ে হচ্ছে না এটা নিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীদের কানাঘুষা, হা-হুতাশের শেষ নেই। লজ্জায় ঘর থেকে বের হওয়াটা ও দুষ্কর হয়ে যাচ্ছে আজকাল। যার ফলে বাবা নামক মানুষ'টা প্রতিনিয়ত যেমন ইচ্ছে তেমন পাএ পক্ষে'র মুখোমুখি বসিয়ে দিচ্ছে তাকে। মাঝে মাঝে ফারিহা'র নিজেকে পশুপাখি মনে হচ্ছে। যার নিজের বলতে কোনো আত্মা-সম্মান কিংবা মতামতে'র গুরুত্ব নেই কারো কাছে। দায়িত্বে'র বেড়াজালে আঁটকে আছে বাবা!তাইতো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করতে পারেছে না শুধু।
নিজের কালো চামড়া নিয়ে সৃষ্টকর্তা নিকট অভিযোগে'র শেষ নেই ফারিহা'র।
সমাজের মানুষে'র নিকট সাদা চামড়া'র খুব দাম তাই না?
আজ যদি তার ও একটা সাদা চামড়া থাকতো এই সমাজ তাকে আলাদা ভাবে মূল্যয়ণ করতো। সমাজের মানুষে'র কাছে ক্ষণে ক্ষণে এত অপমান, অপদস্তও হতে হতো না।
"সবাই শুধু তার গায়ের রঙটাই দেখে। অথচ তার ভিতরে সুন্দর, স্বচ্ছ একটা হৃদয় আছে তা কেউ দেখলো না..!"
ভাবতেই চোখ দু'টোতে অশ্রু'তে ভরে টইটম্বুর। সবার অগোচরে হাতে'র উল্টো পিঠ দিয়ে দ্রুত মুছে ফেললো জলটুকু।
সবার চোখ ফাঁকি দিলেও ছোট্ট আদিবা'র চোখে ধরা পড়লো।
দাদির কোলে বসে এতক্ষণ ফারিহা'র দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি'তে তাকিয়ে ছিলো। ফারিহা'র চোখে পানি দেখে মৃদু চেঁচিয়ে আদিবা দাদির নিকট প্রশ্ন করলো,
"আপাই দেকো? দোকো? কত বলো(বড়) মেয়ে'টা বাচ্চাদে'র মতো কাঁদে!"
আদিবার এমন কথায় সবার দৃষ্টি ফারিহা'র দিকে। মুহূর্তেই বাবা তার দিকে ক্রোধিত চোখে তাকালো তা দৃষ্টি গোচরে'র আড়ালে পড়লো তার।
আদিবা"র কথায় ফারিহা বেশ লজ্জা পেলো। সবার মাঝে অস্বস্তি লাগছে তার। নিচু মাথাটা আরো নিচু করে নিলো। পরক্ষণে আদিবা দাদি'র কাছ থেকে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে ফারিহার কাছে আসলো। তার ভাস্যমতে তাদের মতো ছোট মানুষরা শুধু কাঁদে। সেখানে এতবড় মেয়ে কাঁদলো কেনো? এটা কি জানা’র বিষয় নয়? আদিবা ফারিহা'র একটা হাত ধরে ধা'ক্কা'তে ধা'ক্কা'তে কৌতূহল নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন জুড়ে দিলো,
"এই তুমি কাঁদলে কেনু? তুমি কি আমাল মতো ছো'তো মানুত..!"
ফারিহা কি জবাব দিবে এহেন কথায়..! ছোট্ট এইটুকু মেয়ে তাকে সবার মাঝে লজ্জায় ফেলে দিলো। আমতা আমতা করে বললো,
"আমার চোখে পোকা গিয়েছিলো আম্মু।"
আদিবা মুখ গোল করে বললো,
"ওহ আত্তা।"
ভাবখানা এমন যেন এমন উওর আদিবার পছন্দ হয়নি। সে বিজ্ঞদের মতো চেয়ে পুনরায় বললো,
"আততা তুমি এতবড় ঘোমতা দিতো কেনু? তুমি কি নতুন বউ!"
আদিবা'র এমন কথায় উপস্থিত সবাই হেসে দিলো এবার। তাদের হাসি দেখে আদিবাও খিলখিল করে হেসে দিলো। এদিকে ফারিহা লজ্জা'য় দ'ম আটকে আসার উপক্রম। সুমনা বেগম আদিবা'কে ডেকে নিলো নিজের কাছে। ফারিহা'র দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে মা?"
ফারিহা ভিত কণ্ঠে নিম্ন স্বরে বললো,
"আমি ঠিক আছি আন্টি।"
"আচ্ছা তুমি তাইলে এবার ভিতরে যাও মা।"
ফারিহা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। আস্তে ধিরে নিজের রুমে চলে গেলো। সুমনা বেগম হাসিমুখে সবার উদ্দেশ্য জানালো, মেয়ে তার পছন্দ হয়েছে। নিঃসন্দেহে ফারিহা একজন ভদ্র, শান্তশিষ্ট মেয়ে। যা এইটুকু সময় বুঝতে কোনো অসুবিধা হয়নি সুমনা বেগমে'র।
আদিব সবটা যেন এতক্ষণ নিরব দর্শক হয়ে দেখলো।ইতোমধ্যে বড়রা বিয়ে'র প্রসঙ্গে চলে গিয়েছে।
বিয়ের ডেট ফিক্স করা'র আগে আদিবের জীবন নিয়ে মেয়ের সাথে একান্ত কথা বলা খুবই জরুরি। যদিও মেয়ে পক্ষ এসব জানে আগে থেকেই। তবুও অবিবাহিত, তার উপরে শিক্ষিত একটা মেয়ে, তারতো একান্ত পছন্দ, অপছন্দে'র একটা ব্যপার আছে, তারও নিজেস্ব মতামত আছে। অথচ কেউ মেয়েটাকে একবার এসব জিজ্ঞেস অবধি করলো না।
এদের এমন আচরণে বিরক্ত হলো আদিব।এতো তাড়া কিসের সবার? তাইতো নিজেই লাজ-লজ্জা ভুলে হালকা কেশে সবার উদ্দেশ্য আদিব গমগমে কণ্ঠে বললো,
"যদি আপনারা অনুমতি দিতেন, তাহলে মেয়ের সাথে আমার পার্সনাল কিছু কথা বলার ছিলো।"
ফারিহা"র বাবা হেসে বললো,
"অবশ্যই বাবা কথা বলতে পারো তুমি।"
পরক্ষণে নিজের ছোট ছেলে'কে হাঁক ছেড়ে পুনরায় বললো,
"কই'রে শাওন....
বাবাজি'কে ফারিহার রুমটা দেখিয়ে দেয় তো।"
শাওন আদিব'কে নিয়ে ফারিহার রুমে গেলো। ফারিহা খাটে বসা ছিলো, তার কেমন জানি আনইজি লাগছে আদিবকে দেখে। নিজের পরা ওড়না'টার এক সাইড ধরে হাত কচলাচ্ছে।
দু'জন কে রেখে রুমের বাহিরে এসে দাঁড়ালো শাওন। আদিব কোনো বনিতা ছাড়া শক্তপোক্ত কণ্ঠে বললো,
"আমার আপনাকে কিছু বলার ছিলো ফারিহা।"
ফারিহা জড়ানো কণ্ঠে ক্ষীণ স্বরে বললো
"জ্বি বলুন।"
"আপনি কি জানেন?
আমার একটা মানুষ ছিলো। যাকে আমার কা'ফ'নে মু'ড়া'নো লা'শ ছাড়া দুনিয়ার সব কিছু উজাড় করে দিয়েছি। তারপর ও দীর্ঘ সময় তাকে ধরে রাখতে পারি নি....!"
"আমি আপনার অতীত সম্পর্কে অবগত। আন্টি আমাকে সবকিছু বলেছে।"
"আপনি কি এই বিয়ে'তে রাজি আছেন? না-কি পছন্দের কেউ আছে?"
"না না। কি বলেন এ-সব? আমাদের মতো কালো মেয়েদের আবার কে থাকবে...!বাবা যেটা চাচ্ছে তাই হবে। আমার কোনো আপওি নেই। আমি রাজি।"
"দেখুন বাবা-মায়ের কিংবা কারো চাপে পড়ে বিয়ে করতে হবে না আমাকে। আপনার মতামতকে প্রধান্য দিচ্ছি আমি। কারণ সংসার'টা আপনি করবেন। আমাকে আপনার পছন্দ হয়তো?
আপনি বিনা সংকোচে আপনার মতামত জানাতে পারেন। ভালো-মন্দ আমি নিজ দায়িত্বে সব কিছু সামলে নিবো।"
ফারিহা আবিরের কথায় মুগ্ধ হলো। এই প্রথম কেউ তার মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। নিঃসন্দেহে আদিব একজন সুদর্শন পুরুষ। যেকেউ তাকে পছন্দ করবে। ফারিহা মিনিট দু'য়েক সময় নিয়ে লাজুক হেসে হ্যাঁ-বোধক সম্মতি জানালো।
আদিব কিছু একটা ভাবছে। দু'জনার মধ্যে নিরবতা বিরাজমান। ফারিহা একটু সাহস করে ক্ষীণ কন্ঠে বললো,
"আপনার অতীত নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই।
তবে অতীত আঁকড়ে ধরে বর্তমানে যে থাকবে তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবেন না। আমি আপনার জীবনে জড়ালে শুধু আমাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে আপনাকে। আর একটা কথা, আমার গায়ের কালো রঙ নিয়ে আপনার কোনো অভিযোগ আছে না-কি?"
"দেখুন আপনার গাঙের রং কালো কিংবা সাদা এসব ব্যপার না। অবশ্যই আপনার মনটা সুন্দর হতে হবে। সত্যি কথা বলতে দ্বিতীয় বারের মতো কারো জীবনে জড়ানোর ইচ্ছা ছিলো না আমার। মায়ের জন্য, পরিস্থিতি'র জন্য বাধ্য হয়ে বলতে পারেন। তবে আপনাকে আপনার প্রাপ্য সম্মান, আপনার অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকবো। কথা দিচ্ছি!
আমি আপনাকে শুধু নিজের বউ করতে চাচ্ছি না মিস ফারিহা।
আমার মেয়ে'র জন্য একজন "মা" নিতে চাচ্ছি। আমার ছোট্ট মেয়েটা কে মানুষ করা'র দায়িত্ব দিতে চাচ্ছি আপনাকে।
আমার মায়ে'র জন্য একটা মেয়ে'র মতো বউ নিতে চাচ্ছি। এ-ই দুজনকে আপনাকেই দেখতে হবে। বলুন পারবেন তো এসব?"
"আমি আমার সাধ্য মতে চেষ্টা করবো। তাদের যত্নে'র কোনো ত্রুটি রাখবো না আমি। বিশ্বাস রাখতে পারেন।"
"হাহাহা বিশ্বাস...! বিশ্বাস শব্দ'টা কাঁচের টুকরো'র ন্যায় ভেঙে গিয়েছে, হারিয়ে গিয়েছি সেই কবে'ই আমার জীবন থেকে। মেনে নিলাম আপনার কথা। তবে বিশ্বাস করতে পারলাম না।
কেনো জানেন?"
ফারিহা আবিরের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চটজলদি বলে উঠলো, কেনো?
ফারিহার জানা’র কৌতূহল দেখে আদিব মৃদু হাসলো। অতঃপর ক্ষীণ কন্ঠে আক্ষেপ করে বললো,
"আমি মানুষকে বিশ্বাস করে দেখেছি বহুবার।
এক প্লেটে খাওয়া মানুষটাও খুব সুন্দর করে বি'শ্বা'স'ঘা'ত'ক'তা করেছে। এক বালিশে সোয়া মানুষটাও ভীষণ যত্ন করে মন ভেঙেছে..!
চোখে চোখ রেখে নিখুঁত ভাবে মিথ্যে বলেছে।
অতঃপর বিশ্বাস-ঘা'ত'ক'তা'রাই আমায় আপন-পর মানুষ চিনতে শিখিয়েছে।
সত্যি বলতে বিশ্বাস নামক শব্দ'টা আমার ডিকশনারি থেকে ডিলিট হয়ে গিয়েছে।"
আদিবের চোখ ছিলো তীব্র তাচ্ছিল্যতা। নিজেকে সামলে লম্বা শ্বাস ছাড়লো। একটু থেমে পুনরায় আবার বললো আদিব,
"যাকগে এসব ছাড়ুন। আমি আবারো বলছি, আপনি মন থেকে মেনে নিতে পেরেছেন তো সবকিছু? অভিযোগ নেই তো কোনো?"
"হ্যাঁ আমি মেনে নিয়েছি। আমার কোনো অভিযোগ নেই এই বিষয়ে।"
"ওকে ফাইন। আর কিছু জানার কিংবা বলার আছে আপনার?"
ফারিহা মাথা নেড়ে "না" জানালো। আদিব যাবার জন্য পা বাড়ালো, আবারো কিছু একটা ভেবে পিছনে ঘুরে বললো,
"আজ আসি আমি কেমন। ভালো থাকবেন আপনি..।
বলেই লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেলো। ফারিহা আবিরের যাওয়া দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে মনে মনে আওড়ালো,
"জানিনা পৃথিবীতে কতদিন বাঁচবো। তবে যতদিন বেঁচে থাকবো, বা বেঁচে থাকার সুযোগ পাবো,ততদিন আপনজনদের কাছে প্রিয় হয়ে, তাদের ভালবাসায় থেকে, তাদের ভালবেসে জীবন কাটাতে চাই। জানেন সবার একজন নিজস্ব মানুষ থাকা দরকার পরে জীবন সংসারে।
যে অন্ততঃ মন খারাপে মন ভালো করার দায়িত্ব নেবে । আমি না-হয় আপনার এই দায়িত্ব'টা নিলাম মিস্টার আদিব।"
.
দুই পরিবারের কারো কোনো আপওি নেই এই বিয়েতে। অবশেষে বিয়ের ডেট ফিক্স করলো বড়রা। মেয়ে পক্ষ থেকে কেনাকাটার জন্য দু'দিনের সময় নিলো সুমনা বেগম। আগামী শুক্রবার দিবাগত রাতে বিয়ে হবে জানিয়ে দিলো তিনি। তারপরে আরো কিছু কথাবার্তা বলে বিদায় নিয়ে, নিজেদের বাড়ি'র পথে রওয়ানা দিলো তারা।
.
.
ব্যস্ত ভাবে একটা দিন চলে গেলো। বিয়ে হবার আর একটা দিন বাকি আছে। এদিকে জসিমে'র মানসিক, শারী'রিক নি'র্যা'ত'ন, তার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে এক প্রকার পালিয়ে বাসা থেকে আজ নিজের গ্রামে এসেছে ঋতু। দুপুর হওয়ায় মানুষ জন কম রাস্তায় তাই কারো চোখে পড়েনি ঋতু'কে। দুয়েকজন দেখেছে তারা দেখেই নাক মুখ কুঁচকে ফেললো। সেদিকে পাওা না দিয়ে, ক্লান্ত শরীরে ভাইয়ের বাসায় এসে দরজায় কড়া নাড়ালো ঋতু।
দরজায় বারবার ধা'ক্কা'র শব্দ কানে আসতেই বিরক্তি নিয়ে দরজা খুললো ঋতু'র ভাবি "মৌমিতা"। দরজার ওপাশ ঋতু'কে দেখে ভুত দেখার মতো চমকে উঠলো মৌমিতা। পা-থেকে মাথা অবধি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলো সামনে থাকা জীর্ণ শীর্ণ মানবী'কে। এই ঋতু আর আগের ঋতু'র মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান।
ঋতু মৃদু হেসে বললো,
"কেমন আছো ভাবি?"
পরক্ষণে নাক-মুখ কুঁচকে ফেললো মৌমিতা। ঘৃণিত দৃষ্টিতে চেয়ে রুষ্ট হয়ে বললো,
"তুমি এখানে কেনো?"
ঋতু দরজার দিকে এগোতে এগোতে হাসিমুখে বললো,
"কেন আসতে পারিনা না-কি? দেখি সাইড দেও আমাকে ভিতরে ঢুকতে দেও ভাবি।"
মৌমিতা ঋতু'কে ঘাড় ধা'ক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে বললো,
"খবরদার আর এক-পাও এগোবে না। যেখান থেকে এসেছো সেখানে যাও। তোমার মতো মেয়ের কোনো জায়গা হবে না আমার ঘরে। কোন মুখ নিয়ে এসেছো লজ্জা করছে না? আর তোর আর লজ্জা..! জসিমে'র আদর ফুরিয়ে গিয়েছে নাকি মা..? না-কি তোর শরীরে'র চাহিদা মি'টে গেছে। আরো অক'থ্য ভাষায় গা'লা'গা'লি শুরু করে দিয়েছে মৌমিতা।
ঋতু ছলছল চোখে, করুণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ভাবি'র মুখের দিকে।
"কি হয়েছে মৌমিতা এমন চেঁচাচ্ছো কেনো তুমি?"
এদের কথা শুনে ঘর থেকে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে আসলো ঋতুর ভাই রিয়ান। বোনের চেহারা দেখে, মুহূর্তেই চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেলো তার। মুখ ঘুরিয়ে নিলো বোনের থেকে, এই মেয়ে তাদে'র মান-সম্মান নষ্ট করে সমাজের কাছে হাসির পাএ বানিয়ে দিয়েছে। তার মুখ ও দেখতে চায় না রিয়ান।
ঋতু ভাইকে দেখে ভরসা পেলো। আবেগ জড়ানো কণ্ঠে বললো,
"ভাইয়া...!"
রিয়ান রেগে গেলো। ক্রোধিত কণ্ঠে বললো,
"মৌমিতা এই মেয়ে'কে আমার চোখের সামনে দিয়ে যেতে বলো এক্ষুণি। আমার কোনো বোন নেই। ম'রে গেছে সেই আগের ঋতু।এই মেয়েকে আমি চিনি না। এর মুখো জানি কোনোদিন আমি না দেখি।"
বলেই ভিতরে চলে গেলো রিয়ান। মৌমিতা স্বামী'র এমন আচরণে বেশ খুশী হয়েছে। বিজয়ী একটা হাসি দিলো তিনি। ঋতু'কে ভেংচি কেটে মুখের উপরে দরজা লাগিয়ে দিলো। ঋতু'র চোখ দিয়ে বৃষ্টি'র ন্যায় অশ্রু কণা গুলো চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। আজ তার কান্না কারো চোখে পড়েনা। অথচ একটা সময় ঋতু ছিলো সবার আদরের।সেই মানুষ গুলোই তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। শুধু মানুষ না,ঋতু'র মনে হচ্ছে,
"গোটা পৃথিবী'টাই তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ভাই-ভাবীর অপমানে বিষন্ন মন নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো ঋতু। পথিমধ্যে শুনতে পেলো আদিবে'র জন্য মেয়ে ঠিক করেছে তার মা। এমন কথা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই হৃদয়'টা র'ক্তা'ক্ত হচ্ছে ঋতু'র।
না..! না..! আদিব অন্য কারো হতে পারে না। যেমন করেই হোক আদিব'র কাছে একটু আশ্রয় ভিক্ষা চাইবে সে। প্রয়োজনে হাত-পায়ে ধরে ভিক্ষা চাইবে..! শুধু একটু আদিবের প্রশান্ত বুকে মাথা রেখে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিবে।
#চলবে.......
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ! ]
আসসালামু আলাইকুম! প্রিয় পাঠক মহল নিশ্চয়ই সবাই রেগে আছেন আমার উপরে? কতদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে আপনাদের, রেগে যাবারই কথা। কি করবো বলুন? প্রচুর ডি'প্রে'শ'নে আছি। মা'নসি'ক, শা'রী'রি'ক ভাবে খুবই অসুস্থ। তারপর আপনাদের কথা চিন্তা করে এলোমেলো ভাবে লিখলাম আজ। ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিবেন! আমার জন্য মন থেকে একটু দোয়া করবেন প্লিজ! বলাতো যায় না কার দোয়া আল্লাহ কবুল করে।
সবাই ভালো থাকবেন। ভালোবাসা সবাইকে!#অন্ধ_বিশ্বাস
#writer_sumaiya_afrin_oishi
#পর্বঃ৭
দুপুরের খাবার খেয়ে আস্তে ধিরে হেঁটে হেঁটে নিজে'র দোকানের দিকে যাচ্ছিলো আদিব।পথিমধ্যে হুট করে কেউ এসে পিছন থেকে তার হাত ধরে ফেললো। আকস্মিক এমন ঘটনায় চমকে উঠলো আদিব। পরক্ষণে চিরচেনা সেই কণ্ঠে "আদিব" নামটি কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই হকচকিয়ে উঠলো সে, মুহূর্তেই পা জোড়া যেন বরফের মতো জমে গেলো তার। এটা কী তার শোনার ভুলো নাকি সত্যি? নিশ্চিত হতে, শব্দের উৎস খুঁজতে পিছনে ঘুরতেই চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেলো তার, দৃষ্টি'তে যেন ঘৃণা উপচে উপচে পড়ছে । এই মানুষটা'কে এখানে মোটেও আশা করেনি সে। মুহুর্তেই পুরনো ক্রো'ধ, ক্ষো'প,ঘৃ'ণা মিলেমিশে একাকার হয়ে, মাথা চাপা দিলো তার। নিজের হাতটা এক ধা'ক্কায় ছাড়িয়ে নিয়ে দু'কদম পিছিয়ে গেলো সে। ঋতু'র দিকে একটি বার তাকালো না অবধি , পরক্ষণেই উল্টো পথে হাঁটা দিলো সে। রাস্তা'র মধ্যে বসে সিনক্রিয়েট করতে চাচ্ছে না সে। তার থেকে ভালো এখান থেকে দ্রুত চলে যাওয়া। মন থেকে একবার মুছে গেলে তার ছায়া'টা সহ্য হয়না অপর মানুষটা'র। আবিদে'র ও এই মানুষটা'র সাথে কথা বলতেও ঘৃ'ণা হচ্ছে। তীব্র ঘৃণা হচ্ছে! এই নারী তার কেউ না! কেউ না! সে অন্য কারো অধিকার ।
আদিবে'র এমন আচরণে মন ক্ষু'ণ্ণ হলো ঋতু'র। অজানা এক অভিমান বাসা বাঁধলো হৃদয় গহীনে। তার আদিব এমন করে বদলে গেলো কি করে? চোখ দু'টো ছলছল করছে তার। পরক্ষণে নিজের করা অন্যয়ে'র জন্য অনুশোচনা'র অনলে দ'গ্ধ হচ্ছে ভিতরটা।এটাই তো তার প্রাপ্য। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো ঋতু।
ঋতু'র ভাবনার ভিতরে লম্বা লম্বা পা ফেলে অনেকটা পথ অতিক্রম করে ফেলছে আদিব। ঋতু এক প্রকার দৌড়ে গেলো আদিবে'র কাছে। মৃদু চেঁচিয়ে বললো,
"আদিব যেওনা আদিব..! আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যাও প্লিজ। আমাকে একটু শান্তি দিবে। এই মনটা যে বড্ড ক্লান্ত। আমার কর্মের ফল আর বহন করতে পারছি না আমি। আমাকে একটু এবার অন্ততো শান্তি দেও আবিদ..! আমি একটু শান্তি চাই!
ঋতু'র কণ্ঠে ছিলো নিদারুণ অসহায়ত্বতা। যা অপর পুরুষটি শুনেও শুনলো না। তার মনে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না। যত প্রিয় মানুষ হোকনা কেনো একবার মন থেকে উঠে গেলে দ্বিতীয়বারের মতো আর মনে বসানো যায় না। অবিশ্বাস একবার মনের দরজায় কড়া নাড়িয়ে হাতছানি দিলে, তার অসহায়ত্ব তখন নিছক ছ'ল'না মনে হয় অপর মানুষটির নিকট।
ঋতু পুনরায় আদিবে'র ডান হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।
ঋতু'র এমন আচরণে পুরনো ক্রো'ধ মাথায় ভয়ংকর ভাবে দা'উ'দা'উ করে জ্বলে উঠলো আদিবের। ঋতুর স্পর্শ যেন তার শরীর ঝাঁকিয়ে ঘিনঘিন করে উঠলো। নিজের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে আবিদ দাঁতে দাঁত চেপে ভয়ংকর ক্রোধিত কণ্ঠে বললো,
" খবরদার! খবরদার! পুনরায় আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করবেন না। তাহলে কিন্তু এর ফলাফল মোটেও ভালো হবে না আপনার জন্য।"
"আবিদ দয়া করে আমার কথাটা একবার শোনো। আমাকে আর একটি বার সুযোগ দেও প্লিজ! আমার মেয়ে'টার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে হলেও আর একটা সুযোগ দেও আবিদ। আমি তোমার পায়ে পড়ি!
ঋতু চোখের জল ফেলতে ফেলতে কথা গুলো বলেই সত্যিই আদিবের পা জড়িয়ে ধরলো।
"পা ছাড়ুন প্লিজ! আমি আপনার কথা মোটেও শুনতে যাচ্ছি না ঋতু। আপনি আগে আমার কাছের কেউ থাকলেও বর্তমান আপনি অন্য কারো স্ত্রী। অন্যের জিনিস হ'স্ত'ক্ষে'প করার স্বভাব আপনার থাকলে ও নিশ্চয়ই আমার নেই। কিছু ভুলের কখনো ক্ষমা করা যায় না..! আর রইলো আমার মেয়ের কথা? আমার মেয়ে মা-বাবা দু'জনই আমি। এতদিন যখন সামলাতে পেরেছি মেয়েকে,অবশ্য বাকি জীবনও পারবো। আমি বেঁচে থাকতে কখনো আমার মেয়ের মা'কে প্রয়োজন হবে না আশা রাখছি। আপনার এসব চিন্তা করতে হবে না খামোখা। যদি চিন্তাই হতো অন্তত এতকিছু করার আগে একবার হলেও ভাবতেন। এখন আর এসব ভেবে লাভ কি বলুন?
আপনি আপনার নতুন সংসার নিয়ে ভালো থাকুন। শুধু শুধু ঝামেলা না করে এখান থেকে চলে যান দয়া করে।"
" না! না! আমি যাবো না। আমি তোমাকে ভালোবাসি আবিদ! আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি আবিদ। আমি অন্য কাউকে চাই না। আমি তোমার কাছে থাকতে চাই। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে এবারের মতো ক্ষমা করো। আমি একটু শান্তি চাই! তোমার সাথে বাঁচতে চাই। তোমার কাছে একটু আশ্রয় চাই আবিদ। প্লিজ আমাকে ফিরিয়ে দিও না..!"
কি নিশ-পাপ ছিলো সেই চাওয়া। আহা..! এই চাওয়া মধ্যে ছিলোনা কোনো ছ'ল'না। কণ্ঠে ছিলো মানুষটিকে হারানোর অসহায়ত্ব, প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ভয়। সময়ে'র মূল্যয়ণ না করে অসময়ের চাওয়া আদৌও কি পূর্ণতা পায়? উঁহু পায় না। সঠিক সময়ে নিজের করা কর্মগুলোর দিকে লক্ষ রাখতে হয়, নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে বিবেকে সচল রাখতে হয় । তবেই জীবনে স্বার্থকতা মিলে। না হয় নিজের করা ঘৃ'ণিত কর্মের জন্য আজীবন মানুষের কাছে প্রতিনিয়ত হাসির পাএ হয়ে ম'রতে ম'রতে বাঁচতে হয়।
প্রিয় মানুষের প্রতি বিশ্বাসে একবার ভাঙন ধরে গেলে, তখন সে সত্য কথা বললেও সেখানে অবিশ্বাসের ছোঁয়া লেগে যায়। বিশ্বাস হলো মাটির পুতুলের মত, ভাঙার পরে সেটা জোড়া দিলেও ভাঙার দাগটা ঠিকই থেকে যায়।
তেমনি ঋতু'র আবেগি কথা শুনেও হৃদয় এতটুকু দয়া হলো না আবিদের। সে শব্দ করে হাসলো। পরক্ষণে কণ্ঠে তাচ্ছিল্যতার সুর টেনে বললো,
"ভালোবাসা.....! হাহা! তুমি বোধ জানো না আমি আর সেই আগে'র আবিদ নেই। বাস্তবতা আমাকে অনেক শিখিয়েছে, আমিও মানুষ চিনতে শিখেছি। আসলে দোষ টা তোমার ছিলো না। আমি ভুলেই গেছিলাম সবাই সবকিছুর যোগ্য নয়।
যতটুকু ভালোবাসার প্রয়োজন ছিলো, তার চেয়ে অধিক ভালোবেসেছি বলেই- হয়তো তুমি আমার ভালোবাসার মূল্য বুঝতে পারোনি!
আমি অনিয়মের নিয়ম ভে'ঙ্গে তোমাকে ভালোবেসেছি আর তুমি সেই ভালোবাসা কে নিয়ম করেই অবহেলা করেছো'!
আসলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পেয়ে গেলে আমরা কেউই সেটার মূল্যায়ন করি না'! তাই যতটুকু প্রয়োজন তারচেয়ে অধিক কোনো কিছুই করা উচিত না! সেটা ভালোবাস হোক বা কেয়ার, রেস্পেক্ট, ট্রাস্ট যাইহোক না কেনো'!
এখন আমিও আমার মতো করে ভালো থাকতে শিখে গিয়েছি। মেনে নিয়েছি কঠিন বাস্তবতা, মেনে নিয়েছি নি'য়'তি'কে।
আমার লাইফে বিশ্বা'স'ঘা'ত'কদের প্রবেশ করা নি'ষি'দ্ধ।"
ঋতু অবাক হয়ে শুনছিলো আবিদের কথা গুলো।আজ এই আদিবের মধ্যে কতটা পরিবর্তন। ঋতু মানতেই পারছে না যেন। হৃদয়ের আশার আলোটুকু ভেঙে চূ'র্ণ'বি'চূ'র্ণ হয়ে গেলো। স্তব্ধ হয়ে স্হী'র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সামনের মানুষটির দিকে।তার কান্না থেমে গেলো, আদিবের পা থেকে হাতে'র বাঁধনটা ছুটে গিয়েছে।
আদিব মূহুর্তেই অন্য দিকে মুখ রেখে সরে দাঁড়িয়ে পুনরায় আবার বললো,
"ভাগ্যক্রমে আমাদের আবার দেখা হলো, সৃষ্টিকর্তা নিকট প্রার্থনা এটাই যেন শেষ দেখা হয়..! তবে শেষ বারের জন্য তোমার কাছে একটাই অনুরোধ থাকবে'!
তা হলো মিথ্যে ত্যাগ করা'_
কারণ এই মিথ্যের কারণে তোমার আমার মাঝে এতটা দূরত্ব , এই মিথ্যের কারণে তোমার আমার পথ আলাদা, মিথ্যের কারণেই আমাদের বিচ্ছেদ হওয়া...
এই মিথ্যের কারণে শুধু আমাদের'ই নয়, হাজারোসম্পর্কের বিচ্ছেদ হয়'!
আর আমি চাই না এই মিথ্যের কারণে তোমার পরবর্তী সম্পর্কে বিচ্ছেদ নেমে আসুক! আমি চাই না অবিশ্বাসের আগুনে তোমাদের সম্পর্কটা পুড়ে ছাই হোক!
তুমি বলেছিলে ভালোবাসি, আমি বিশ্বাস করেছি _
তোমার নানান রকমের মিথ্যে জেনেও আমি সুযোগ দিয়েছি।
তবে সুযোগ একবার দেয়া টা ঠিক আছে, কিন্তু বার বার দেয়া বোকামি! আর ভুল তো মানুষ ই করবে! কিন্তু যে ভুল জেনেশুনে বার বার করা হয়, সেটাকে ভুল বললে নিঃসন্দেহে মূর্খতা করা হবে'!
তাই আমিও পারলাম না আরেকবার সেই ভুলকে প্রশ্রয় দিতে'! "
আবিদ আর এক মুহূর্ত ও দাঁড়ালো না। পা বাড়ালো নিজের গন্তব্য। ঋতু রাস্তার উপরে বসে আদিবের যাওয়ার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
এদের এতক্ষণের চিৎকার চেঁচামেচি, কান্না'র শব্দ শুনে গ্রামের কিছু মানুষ ঋতু'র নিকট এসে জড় হলো। আদিব ও ঋতুর পাশাপাশি গ্রাম হবার কারণে অনেকেই তাদের বিষয় অবগত। ঋতু'কে এখানে এই অবস্থা দেখে কারো মনে সামান্য দয়া হলো না। উল্টো সবাই ছিঁ! ছিঁ! করছে। যে যা পারছে মন্দ কথা শুনাতে ভুললো না। এক বয়স্ক মহিলা তো তাকে দেখে আঁচল দিয়ে নিজের মুখ ডেকে নিলো। যেন ঋতু'কে নিজের চেহারা দেখানোও ঢের অ'ম'ঙ্গ'ল। মানুষজনের কথা কানে আসতেই আবিদ পিছনে ফিরে তাকালো, ঋতু'কে কিছু মানুষ ঘিরে ধরেছে। সেদিকে পাওা দিলো না আবিদ। পরক্ষণেই কোথা থেকে যেন আবিদের এক দুঃসম্পর্কের চাচি এসে তাকে হাঁক ছেড়ে ডেকে জিজ্ঞেস করলো,
"আবিদ বাবাজি এই হানে কি হইছে? এই অপয়া মাইয়া এহানে আইলো কেমনে?"
"তেমন কিছু হয়নি চাচি। আমি দোকানে যাচ্ছি অনেক দেরি হয়ে চাচ্ছে আমার। আমি আসি এখন।"
ব্যস্ততা দেখিয়ে দ্রুত চলে গেলো আবিদ। এখানে এক মুহূর্তে সে থাকতে চায় না। তার যেন দ'ম আঁটকে যাচ্ছে। আজ আর দোকানে মন বসবে না তার। নিরিবিলি একটা জায়গায় একান্ত সময় কাটানোর জন্য নদী'র দিকে এলোমেলো পায়ে হাঁটছে। পুরো ক্ষ'ত গুলো জাগ্রত হচ্ছে বারংবার। শূন্য দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এলোমেলো ভাবে বললো,
"জীবনে বহু কিছু হারিয়েছি। কিছু ইচ্ছায় তো কখনো অনিচ্ছায়। আজ তোমায় হারানোটা ছিলো আমার ইচ্ছের’ই একটা অংশ। আমায় আগলে নিয়ে যত্নে ভাঙতে চাওয়া মানুষটা কে আমি আমার জীবন থেকে খারিজ করলাম।"
.
একবার ছেড়ে যাওয়া মানুষ গুলো আবারো ফিরতে চাইবে। আদৌও তাদের সাথে পুনরায় কি জীবন বাঁধা যায়? উওর'টা হবে -না। কিছু কিছু মানুষকে কখনোই দ্বিতীয় বার ক্ষমা করা যায় না! কক্ষণোই না....!
.
.
আবিদের চাচি বুঝলো আবিদ কিছু লুকাচ্ছে তার থেকে। মুহূর্তেই উনি ঋতু'কে ধা'ক্কা দিয়ে বললো,
"এই ক'ল'ঙ্কি'নী, ন'ষ্টি মা...! তুই কোন মুখ লইয়া এই গ্র্যামে আইছো। দুইডা সংসার তছনছ কইরাও তোর মনে শান্তি হয়নায়। সোনার টুকরা পো'লা'ডা রাইখা বুড়া এক ব্যাডার লগে ভাগছো। পোলাডারে তো একবার টাকা পয়সা সব নিয়া খা'ই'য়া দেছো। এহন আবার পোলাডায় যেই না একটু নিজের জীবন'ডা গুছাইয়া লইবো
অমনি এহানে হাজির হইছো।তোর নতুন ভা..., আদর সোহাগ কম পড়তে আছে নাহি। কম পড়লে পা'ড়া'য় যা। তোর জন্য ঐডাই ভালো। এক্ষণই এই গ্র্যাম দিয়ে দূর হবি শ'য়'তা'নে'র বা'চ্চা। আর যেন কোনো দিন তোর ছায়া এই গ্র্যামে না দেহি।"
বলেই আবারো ধা'ক্কা দিলো চাচি। সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উচ্ছাস নিয়ে যেন উপভোগ করছে বিষয়টি। ঋতু প্রত্যুওরে কাউকে কিছু বলতে পারলো না। কি বলবে সে? তার কর্ম ভালো হলে তো এসব আর শুনতে হতোনা। অনুতপ্তের আ'গু'নে হৃদয়টা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। অথচ কাউকে বুঝতে পারছে না।
লোকজনে'র এমন বাজে বি'শ্রী বি'শ্রী বাক্য আর সহ্য করতে পারলো ঋতু। ক্লান্ত শরীর, এক বুক অসহ্য য'ন্ত্রণা নিয়ে গ্রাম ছাড়লো ঋতু। আবার জসীমে'র নিকট যাবে বলে গাড়িতে বসলো। আজ তার আপন বলতে কেউ নেই। তার কষ্ট গুলো অনুভব কেউ করছে না। বিশাল এই পৃথিবীতে সে সম্পুর্ন একা। জসিমে'র ঐ খানেই তার শেষ ভরাসা। যত কষ্ট দিক একটা থাকার মতো আশ্রয়তো আছে।পরক্ষণে আবার মনে মনে ভয় ও হচ্ছে। ূযদি জসিম ও তাকে সবার মতো তাড়িয়ে দেয়.....।
.
.
প্রায় ঘন্টা খানিক হয়েছে নদীর পাড়ে ঘাসের উপরে সুয়ে, আকাশে দিকে তাকিয়ে নিকোটিনের ধোঁয়া উড়াচ্ছে আবিদ। নিজের কষ্টগুলো যেন নিকোটিনের ধোঁয়া'র সাথে উড়িয়ে দিচ্ছে ঐ দূর আকাশে। অতিরিক্ত সিগারেট খাবার ফলে মাথা টনটন করছে তার। হাতের সিগারেটায় দুই'টা টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে বারকয়েক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো আবিদ। অতঃপর মনে মনে আওড়ালো,
"আমি অ'ভিশাপ দিচ্ছিনা
তবে আমি খুব করে চাই আমার সাথে অ'ন্যায় করা মানুষদের আল্লাহ তায়ালা নিজে হাতে শা'স্তি দিক।
আজ না হোক আজ থেকে দশ বছর কিংবা দশ যুগ পরে হলেও তারা তাদের কর্মফল ভোগ করুক।
তারাও উপলব্ধি করুক আ'ল্লাহ ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না।তারা উপলব্ধি করুক অ'ন্যকে ঠ'কালে নিজেকেও ঠ'কতে হয়, অন্যকে ক'ষ্ট দিলে সেই ক'ষ্ট সু'দসহ নিজের কাছেও ফিরে আসে।"
মাথাটা ঘুরছে তার। উঠে গিয়ে নদীর পানি দিয়ে ভালোভাবে চোখে মুখে ছিঁটালো। পরক্ষণে সুমনা বেগম ফোন দিয়ে বাজারের কিছু লিস্ট দিলো। আজকের বিষয়টি এখনো তার অজানাই রয়ে গেলো। মায়ের ফোন পেয়ে নিজেকে সামলে নিলো আদিব। মধ্যবিও পুরুষ মানুষদে'র ভিতরে'র কষ্ট জাগ্রত করতে নেই! তাদের কষ্ট গুলো বুকের ভিতরে খুব গোপনে মাটি চাপা দিয়ে রাখতে হয়। কেননা তাদের যে অনেক দায়িত্ব জীবন সংসারে। নিজের কষ্টগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে হেলেদুলে নিজের বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলো আবিদ।
চলবে......
হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনে'র জন্য আমি এতো দিন অনেক অসুস্থ ছিলাম। আজ একটু মোটামুটি সুস্থ তাই আর দেরী করিনি লিখতে। কেউ রাগ করবেন না। আশা করি আমাচর সমস্যা বুঝবেন আপনারা। কেমন হয়েছে জানাবেন। ভুল ত্রুটি হলে ধরিয়ে দিবেন।
ধন্যবাদ!#অন্ধ_বিশ্বাস
#writer_sumaiya_afrin_oishi
#পর্বঃ৮
ঋতু'র ঢাকায় পৌঁছাতে রাত দশ'টা বেজে গিয়েছে। বাস থেকে নেমে ক্লান্ত দেহ, বিষন্ন মন'টা টে'নে'হিঁ'চ'ড়ে কোনো মতে জসিমে'র বাসার দিকে যাচ্ছে। এর পরে তার সাথে ঠিক কি হবে আদৌও জানা নেই তার। জসিমে'র ভয়ে বুকে ধুকপুকানি হচ্ছে,ঋতু অনুভব করছে সারা শরীর মৃদু কাঁপছে তার। তবুও একবুক সাহস নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া যে তার কোনো উপায় নেই হাতে। নিজ দোষে সৃষ্টিকর্তা যে তার সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
শরীর, চোখে, মুখে স্পষ্ট বিষন্নতার ছাপ, তার উপরে সারাটা দিন অনাহার করেছে মেয়েটা। হাঁটতে পারছে না ঠিকভাবে, দেহটা আর চলছেই না সামনে। নিজের কাছে টাকাও আছে খুব সীমিত। তবুও ক্ষুধার জন্য কিছু খেতেই হবে। হঠাৎ চোখে পড়লো একটা চায়ের দোকান। সেখান থেকে ১০ টাকা দিয়ে দু'টো পাউরুটি কিনে পানি দিয়ে ভিজিয়ে গ'প'গ'প করে খেয়ে নিলো। দোকানদার অবাক চোখে এক ক্ষুধার্ত মেয়ের খাওয়া দেখলো। পেটের ক্ষুধার জন্যই তো মানুষ কত কি করে..!
যে মেয়েটা এসব দেখলেও একটা সময় নাক ছিটকিয়েছে, আজ পেটের দা'য়ে অ'মৃ'ত ভেবে খাচ্ছে শুকনো পাউরুটি।
.
ঘন্টাখানিক হয়েছে জসিমে'র বাসার সামনে জুবুথুবু হয়ে বসে আছে ঋতু। বাসার দরজায় বড় একটি তালা ঝুলানো। চারপাশে শুনশান নীরবতা বিরাজমান। রাত তরতর করে বাড়ছে অথচ মানুষটার কোনো খবর নাই। ঋতি'র ফোনটা অবধি তুলছে না। মনটা কু গাইছে তার। তবে কি শীলা'র নিকট গিয়েছে জসীম। ঋতু ছিলো তার কয়েক দিনের মোহ,গুটি কয়েকদিনে'র প্রয়োজন মাএ। মোহ কেটে গিয়েছে এখন ঋতু'র দর্শন ও বিষাক্ত ঠেকাচ্ছে জসিমে'র কাছে।
সংসারের জন্য শীলা'কেই খুব দরকার তার। সেটা হারে হারে অনুভব করে জসিম। তাইতো শীলা'কে নিজের কাছে আনবার জন্য ম'রি'য়া হয়ে উঠেছে জসিম।
ঋতু কয়েকদিন আগে শুনেছিলো, যে ভাবেই হোক শীলা ও তা ছেলে-মেয়েদের ঢাকায় নিয়ে আসবে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে তুমুল ঝ'গ'ড়া ও হয়েছিলো। তাকে বারবার বাসা থেকে যাবার হুমকি দিয়েছিলো জসিম। সেখানে গতকাল সে নিজ ইচ্ছায় জসিম'কে কিছু না বলে বাসা থেকে চলে গিয়েছিলো। এমটা করা একদম ঠিক হয়নি তার।নিজের জায়গাটা নিজেই হাতছাড়া করলো সে। জসিমে'র মতো মানুষের দ্বারা সবই সম্ভব।
মাথা ভর্তি দুশ্চিন্তা, একাধিক প্রশ্ন কিলবিল কিলবিল করছে মস্তিষ্ক জুড়ে।
তবে কি জসিম শীলা'কে নিয়ে আসবে?
তাকে যদি বাসায় আর না তোলা হয়? একা এই শহরে কি করবে সে? কোথায় যাবে? না আর ভাবতে পারছে না ঋতু। তার মাথা'টা তীব্র যন্ত্রণা করছে।
আরো কিছু সময় অপেক্ষা করছে ঝতু কিন্তু আসছে না জসিম। ক্লান্ত শরীর নিয়ে সারারাত এখানে বসে থাকাও সম্ভব নয়। মিনিট দশেক দুরত্বে বান্ধবী রিয়া'র বাসা। একবার ভাবলো সেখানে যাবে। আবার ভাবলো,
এতো রাতে তাদের বিরক্ত করা কি ঠিক হবে? সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে ঋতু।
হুট করে সিদ্ধান্ত নিলো রিয়া'কে একবার কল করা যাক। যদি যেতে বলে তবে যাবে সে। কয়েকবার কল দিতেই রিসিভ করলো রিয়া। ঋতু আকুতি কণ্ঠে বললো,
"দোস্ত আমি আসবো তোদের বাসায়? বড় বিপদে পড়েছি..! একটা রাত জায়গা হবে তোদের বাসায়? প্লিজ একটা রাত শুধু! "
এতো রাতে ঝতু তার বাসায় আসবে শুনে কপালে ভাঁজ পড়লো অপর প্রান্তে'র মানুষটির। খানিক চিন্তিতো হয়ে প্রশ্ন করলো,
"এতো রাতে আমাদের বাসায় আসবি মানে? কোনো সমস্যা হয়েছে? না-কি তোর নতুন জামাই বাসা থেকে বেড় করে দিয়েছে"
শেষে'র কথাটা খোঁচা দিয়ে বললো রিয়া। যা ঋতু'র হৃদয়ে হাজারটা সুচের মতো বিঁধল। ঋতু আজকের ঘটনা আড়াল করলো। মুখে একটু হাসি টেনে বললো,
"কি যে বলিস তুই। আমি গ্রামে গিয়েছিলাম কয়েকদিন আগে। আজই একটু আগে ফিরলাম। আর উনি হঠাৎ ব্যাবসার কাজে ঢাকার বাহিরে গেছে। ফিরতে অনেক রাত হবে, বাসার চাবিটাও উনার কাছে। বাসার সামনে একা একা ভয় করছে আমার।"
রিয়া বিশ্বাস করলো কি-না বুঝা গেলো না। তবে সে অনুভব করছে, ঋতু একদমই ভালো নেই। ঋতু'র এমন একটা ঘৃ'ণি'ত কাজের জন্য তার উপরে ক্রো'ধি'ত রিয়া। একসময় দু'জন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। এখন দু'জনার মাঝে বড্ড দূরত্ব। আগে তার অনেক বিপদে বেশ সাহায্য করেছে ঋতু। এই মানুষটি বিপদে তাকে কি করে না করা যায়..?মানবতার খাতিরে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে আসতে অনুমতি দিলো রিয়া। অনুমতি পেয়ে আর এক সেকেন্ড ব্যয় করলো না ঋতু। দ্রুত পায়ে এগালো রিয়া'র বাসায়।
.
ঋতু'র জী'র্ণ-শী'র্ণ মুখশ্রী দেখে গোপনে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো রিয়া। রিয়া'র ও তার হাসবেন্ড সাজিদকে নিয়ে এক রুমে'র একটি বাসায় ছোট্ট সংসার তাদের। যার ফলে সবকিছু একরুমের মধ্যে। ঋতু ফ্রেশ হয়ে এসে খাটের কিনারায় বসলো। তার এক পাশে রিয়া ও সাজিদ বসা। কয়েকবার লক্ষ করছে ঋতু, সাজিদ তার শরীরের দিকে গভীর দৃ'ষ্টিতে তাকাচ্ছে। এই দৃষ্টি ভালো ঠেকছে না ঋতু'র কাছে। সে মাথা নত করে আছে।
রিয়া ঋতু'কে পর্যবেক্ষণ করলো কিছু সময়। মুখ দেখে মনে হচ্ছে সারাদিন কিছু খায়নি। তাই ঋতু'কে বসতে বলে ফ্রিজ থেকে খাবার নিয়ে গরম করতে গেলো রান্না ঘরে। এই সুযোগে সাজিদ এসে ঋতু'র পাশ ঘেঁষে বসলো। ঋতু লাফ দিয়ে উঠে মৃদু স্বরে বললো,
"কি করছেন কি ভাইয়া? দূরে গিয়ে বসুন।"
পরক্ষণেই ঋতু'র একটি হাত ছোঁ মে'রে ধরে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে দিয়ে সাজিদ ফিসফিস করে বললো,
"এতো দূর দূর করছো কেনো শা'লি'কা....! বুড়ো বয়সে'র ব্যাটা'রা তোমার কাছে চান্স পায়। আমি ইয়াং দুলাভাই হয়ে কি আমার সুন্দরী শা'লি'কে একটু আদর করতে পারি না। একটা রাত হবে কি? একবার আসো তোমার বুড়ো জামাইয়ে'র থেকে অনেক বেশি সুখ দিবো..!"
বলেই পৈ'চা'শী'ক ভাবে হাসলো সাজিদ। যা দেখে ঘৃণা, ক্রো'ধ মিলেমিশে একাকার ঋতু'র শরীর। শরীর ঘিনঘিন করছে। নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না ঋতু। এক ঝাঁ'ট'কা'য় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সাজিদের গালে এক থা'প্প'ড় মা'র'তে হাত এগোতেই হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো সাজিদ। মূহুর্তেই ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো ঋতু। সাজিদ হাত আরো একটু শক্ত করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে নিম্ন স্বরে কটমট করে বললো,
"ব্যা.. মা.. তোর এই অ'প'বি'ত্র শরীর নিয়ে এতো অ'হংকা'র। মনে হচ্ছে দুধের ধোয়া তুলসী পাতা তুই..! তোকে তো আমি দেখে নিবো মা... !"
এরি মধ্যে রিয়া'র পায়ের আওয়াজ শোনা গেলো। এই শব্দ কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ঋতু'র দিকে রক্তিম চোখে একবার তাকিয়ে হাত ছেড়ে দিয়ে রুম থেকে বাহিরে চলে গেলো সাজিদ।
লজ্জায় ঘৃণায় চোখ দু'টো ঝাপসা হয়ে গেলো ঋতু'র। আজ নিজের করা ভুলের জন্য প্রতি পদে পদে অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে তাকে। সবাই তাকে পেয়ে বসেছে যেন। একটা সময় সাজিদ তাকে কতটা সম্মান করতো, কত ভালো মানুষ মনে করতো তাকে। অথচ সেই মানুষটা আজ তাকে কুৎসিত প্রস্তাব দিচ্ছে। এই পুরুষ কি আদৌও ভালো মানুষ? না এরা হচ্ছে মুখোশধারী শ'য়'তা'ন। এই শহরের প্রতিটি অলিতে-গলিতে এমন হাজারো মুখোশধারী ভদ্রলোক রয়েছে।
এক শ'য়'তা'নের পাল্লায় পড়ে আজ জীবনে এতো দুঃখ দু'র্দ'শা। আজ আদিব তার কাছে থাকলে হয়তো দুঃখরা তাকে ছুঁতে পারতো না। আফসোস...! মানুষটাকে নিজেই ঠকিয়েছে সে, তার সমস্ত বিশ্বাস তাসেরঘরে'র মতো ভেঙে মিলিয়ে দিয়েছে হাওয়ায়, তার সরলতা নিয়ে খেলা করেছে প্রতিনিয়ত। এখন মানুষটা বুঝতে শিখেছে বিশ্বাস'ঘা'ত'ক'দে'র বারবার ক্ষমা করতে নেই...! তাইতো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ঋতু'র থেকে। ভাবতেই চোখের জমাট বাঁধা অশ্রু গুলো গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে।
এখানে এই বাসায় আর মন টিকছে না ঋতু'র। তার জন্য তার বান্ধবীর সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হোক তা একদমই চায় না সে। কিন্তু এতো রাতে কোথায় যাবে? তাই বাধ্য হয়ে এই রাতটা এখানেই কাটাতে হবে।
রিয়াকে খাবার নিয়ে রুমে আসতে দেখে দ্রুত চোখে'র জলটুকু মুছে ফেললো হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে। আজকের ঘটনা বলে দু'জনার মধ্যে অশান্তি বাড়াতে দিলো না ঋতু। তাই এসব বিষয় কিছু বললো না রিয়া'কে।
রিয়া খাবার বেড়ে দিয়ে ডাকলো ঋতু'কে। পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা থাকা সত্যেও গলা দিয়ে নামছে না খাবার। কয়েক লোকমা খেয়ে রেখে দিলো খাবার। যা দেখে মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হলো রিয়া।
.
রাতে খাটে ঋতু'কে ঘুমাতে দিয়ে, ফ্লোরে বিছনা করছে রিয়া। সে ও সাজিদ এখানে ঘুমাবে বলে। তা দেখে মনে মনে ঢোক গিললো ঋতু। সাজিদ'কে ভয় করছে ভীষণ! যদি আকস্মিক ঘুমের ঘোরে তার কাছে চলে এসে খারাপ কিছু করে বসে সাজিদ ? এসব লোকদে'র একদম বিশ্বাস নেই। রিস্ক নেওয়াটা একদম ঠিক হবে না। তাই ঋতু মিনমিন কণ্ঠে বললো,
"রিয়া তুই আমার পাশে ঘুমা। খাটে তো অনেক জায়গা আছে। ফ্লোর ঠান্ডা, তোর এমনিতেই ঠান্ডা সহ্য হয়না। তাছাড়া কতদিন পড়ে তোর সাথে দেখা হলো। আয় না আজ একসাথে ঘুমাই দু'বোন।"
রিয়া আর না করলো না। এমনিতেই ফ্লোরে ঘুমাতে অভস্ত্য না সে। তাই সজিদকে উদ্দেশ্য করে বললো,
"হ্যাঁ ঋতু ঠিক বলছে সাজিদ। তুমি একটু কষ্ট করে এখানে ঘুমাও প্লিজ। আমি ঋতু'র কাছেই ঘুমাই আজকে। বলতে বলতে রিয়া খাটে সুইলো।"
এদিকে সাজিদে'র মন ক্ষু'ন্ন হলো, রাগে ফুঁসছে সে ভিতরে ভিতরে। তার সমস্ত পরিকল্পনা জলে গেলো। মনে মনে ভাবছে রিয়া ঘুমোলে চুপিচুপি ঋতু'র কাছে যাবে সে। অথচ ঋতু তার সমস্ত পরিকল্পনা ভেঙে চূ'র্ণ'বি'চূ'র্ণ করে দিলো ঋতু। এখন নিজের বউ'টাকেও কাছে পেলো না।
মনে মনে বিশ্রী কয়েকটা গা'লি দিলো ঋতু'কে।
ঋতু রিয়া'কে ঝাঁপটে ধরে, সারারাত ভয়ে ভয়ে নির্ঘুম কাটিয়ে দিলো। অতঃপর খুব ভোরে উঠে জসিমে'র বাসার সামনে চলে গেলো। যদিও রিয়া নাস্তা খেয়ে যেতে বলেছিলো তাকে বারংবার। কিন্তু ঋতু শুনলো না। সে এমনিতেই যেখানে যায় সেখানেই অশান্তি শুরু হয়। না জানি আবার কোথায় কখন কোন ঝামেলা হয় এ নিয়ে আ'ত'ঙ্কি'ত ঋতু। কস্মিনকালেও চায় না সে, তার জন্য তার প্রিয় বান্ধুবী এতটুকু কষ্ট পাক। যেমন আছে সুখী থাকুক মেয়ে'টা। তাইতো সাজিদের মুখদর্শনে'র আগেই দ্রুত জায়গা ত্যাগ করলো ঋতু।
.
.
সকালে এসেও যখন বাসায় তালা ঝুলানো দেখলো, তখন ঋতু নিশ্চিত হলো জসিম রাতে বাসায় ছিলো না। তাহলে লোকটি গেলো কই? আনমনে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলো। মন যেন উত্তর দিয়ে দিলো,
"লোকটি শীলার কাছে গিয়েছে ঋতু। জসিমে'র নিকট তোর প্রয়োজন শেষ ঋতু..! এখন শুধু তোকে তার জীবন থেকে ঘাড় ধা'ক্কা দিয়ে বের করা বাকি।"
ভিতর থেকে কাল্পনিক উওর শুনে ঋতু'র বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। নিজের আজগুবি ভাবনা মনের ভিতর চাপা দিয়ে পাশের রুমের লোকদের জিজ্ঞেস করছিলো, তারাও কিছু জানে না জসিম কই গিয়েছে। আশাহত হয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে অপেক্ষা করছে বাসার ভিতরে যাবার জন্য।
অবশেষে প্রায় নয়টার দিকে দূর থেকে কাঙ্ক্ষিত পুরুষটি'র মুখটি দেখা আশার আলো দেখা গেলো মুখশ্রী জুড়ে। পরক্ষণে তার সাথে ঠিক কি হতে চলছে ভাবতেই আশার আলোটুকু নিবে গিয়ে চোখে মুখে ফুটে উঠেছে ভয়। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছে মেয়ে'টা।
অনেক সময় মনে'র ডাক ও সত্যি হয়। ঋতু'র মন ঠিক বলছে জসিম শীলার নিকটই গিয়েছিলো। শীলা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে এখন বাবা'র বাড়ি থাকে। দীর্ঘদিন পড়ে হঠাৎ জসিম'কে দেখে সবাই অবাক হয়েছিল। সেই সাথে বিভিন্ন ভাবে অপমানিত হতে হয়েছে তাকে। শীলা ও ছেলে-মেয়েদের নিতে আসছে শুনে ছেলেমেয়েরা আনন্দে আ'ত্ম'হা'রা। দীর্ঘদিন পড়ে বাবাকে দেখে ছেলে-মেয়ে দু'টো "আব্বু" "আব্বু" বলে পিছু ছাড়ছে না। কতদিন পড়ে সন্তানদের হাসিখুশি মুখটা দেখে সহজ, সরল মনের অধিকারী শীলা রাজি হয় সে যাবে জসীমে'র সাথে। ভাই- ভাইদের বউ আ'প'দ বিদায় করতে পারলেই বাঁচে। তারা ও শীলা'কে বিভিন্ন ভাবে বুঝাচ্ছে যাতে শীলা চলে যায়।বিনিময়ে বোঝা দূর হবে তাদের ঘাড় থেকে, তারা মুক্তি পাবে।
কিন্তু বেঁ'কে বসে শীলা'র "মা"। উনি কাঠকাঠ গলায় স্পষ্ট বলে দিয়েছে , তার মেয়েকে স'তী'নে'র সংসারে পাঠাবে না। ঋতু'কে ডিভোর্স দিলে তবেই শীলা যাবে। এর আগে যেন শীলা'র দ্বারে কাছের দ্বিতীয়বার না আসে জসিম। আরো বিভিন্ন ভাবে অপমান করেছে। যা খুব গায়ে লেগেছে জসিমে'র। তবুও সে মুখ বুঝে হজম করেছে সব।
শীলা ও মায়ের কথার কিংবা সিদ্ধান্তে'র উপরে কিছু বলতে পারেনি। এই মা'টার জন্যই তো টিকে আছে সে। মা না থাকলে বোধহয় এতোদিনে শীলার অস্তিত্বটুকু মুছে যেতে পৃথিবী থেকে।
জসিম তাদের কথা দিয়ে এসেছে ঋতু'কে ডিভোর্স দিবে। এমন কি ঋতু'র অগোচর ডিভোর্সে'র কাগজ রেডি করে রেখেছে সে। তবুও শক্তপোক্ত শ্বাশুড়ির মন বিন্দু মাএ মন গলেনি। যেটুকু সময় ছিলো ঋতু'র জন্য কথায় কথায় শুধু অপমানিত হতে হয়েছে। আর এসব সহ্য না করতে পেরে পুনরায় ঢাকা এসেছে জসিম।
বাসার সামনে আসতেই যখন ঋতু'কে চোখে পড়লো তখনই ভিতরে সমস্ত ক্রো'ধ মুহুর্তেই মাথা চাপা,দিলো। এই মেয়ে'র জন্যইতো গ্রামের মানুষ তাকে দেখে ছিঃ! ছিঃ! করে। জসিম তেড়ে এসে ঋতু'র গলা চেপে ধরে বিশ্রী বাক্যে গমগম কণ্ঠে বললো,
" ন'টি'র বা'চ্চা ন'টি তুই এখানে কেনো? তুই না চলে গেলি তোর ভা'তা'.. কাছে আবার আসছিস কেনো?
কার কাছে রা'ত কাটিয়ে এসেছিস এখানে। অপয়া ন'ষ্টি মা..। আমার চোখের সামনে থেকে যা এক্ষুনি।"
মুখের বাক্য শেষ করে ছুঁড়ে মারলো ঋতু'কে। শক্ত হাতের বাঁধন থেকে গলাটা ছাড়া পেয়ে জোরে জোরে হাঁপাতে লাগলো ঋতু। জসিম তালা খুলে ভিতরে যাবে অমনি ঋতু দৌঁড়ে এসে জসিমে'র একটা হাত ধরে আকুতি-মিনতি কণ্ঠে বললো,
"তুমি আমাকে ভুল বুঝো না জসিম। আমাকে তাড়িয়ে দিও না। দোহাই লাগে জসিম। আমি আর কখনো কোথাও যাবো না বাসা থেকে। শেষ বারের মতো ক্ষমা করে দেও।"
জসিম উচ্চ স্বরে বললো,
"মা..' হাত ছাড়। তোকে আর আমার ঘরে তুলবো না। তোর জন্য যত অশান্তি..! তুই চলে যা আমার চোখের সামনে থেকে।"
বলে এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো জসিম। আকস্মিক ধা'ক্কায় ঋতু টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে দেয়ালের সাথে পড়লো। মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো " ও মা গো...! এদের চিৎকার, গালমন্দ কথা শুনে পাশের বাসার কিছু লোক জড়ো হলো। ঋতু'কে একজন মহিলা তুলে বসালো। জসিম'কে হুমকি দিয়ে বললো,
"বাসায় এসে বউ'টাকে এভাবে মা'র'তে'ছে'ন কেনো? আপনি কি মানুষ..! এমন করলে আমরা কিন্তু পুলিশ ডাকতে বাধ্য হবো।"
জসিম বাজখাঁই গলায় বললো,
"এই খা'নি'ক আমার বউ না। আপনারা সাক্ষী আমি এই মুহূর্তে ওরে তালাক দিলাম।"
সাথে সাথে মুখে তিনবার তালাক উচ্চারণ করলো জসিম। ঋতু অবাক হয়ে দেখছে এই মানুষটাকে। কি করেনি এই মানুষটার জন সে। অথচ আজ তার জীবন থেকে মুক্ত করে দিবার আগে একটি বার ভাবলো না।
এমন ঘটনায় উপস্থিত সবাই হতবাক। জসিম দ্রুত ভিতরে প্রবেশ করে, ভিতর থেকে ডিভোর্স পেপার ও কাবিনের একলক্ষ টাকার একটি চেক ঋতু'র মুখের উপরে ছুঁড়ে মারলো। ঋতু কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজটা তুলে যখন দেখতে পারলো ডিভোর্স পেপার অমনি কলিজা'টা দুমড়ে মুচড়ে উঠলো তার। দিকবিদিক শূন্য হয়ে সবার সামনে জসিমে'র পা ঝাপটে ধরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
"আমার সাথে এতো বড় অন্যায় করো না জসিম। আল্লাহ ছাড়বে না তোমাকে। দয়াকরে আমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিও না। তোমার জন্য সব শেষ করেছি, সবাইকে ছেড়েছি।
তুমি তো জানো? তুমি ছাড়া আমার আর কোথাও যাবার জায়গা নেই। আমার আশ্রয়টুকু এভাবে কেড়ে নিয়ো না......!
মেয়েটির করুণ আর্তনাদ শুনে উপস্থিত মানুষ গুলোর চোখে জল টইটম্বুর। কিন্তু পাষাণ হৃদয়ে'র পুরুষটির এতটুকু মায়া হলো না। সে ধা'ক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো ঋতু'কে। এক মহিলা চোখের জল মুছতে মুছতে বললো,
" ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক তোমাদের তালাক হয়ে গেছে মা। কাঁদিস না আল্লাহ আছেন উপরে। এসব অমানুষকে মুক্ত করে দে। ডিভোর্স পেপার সাইন করে দে। তারপর এখান থেকে জীবনটা নিয়ে চলে যা মা। ভাগ্যে যা আছে তা হবেই।"
ঋতু চিৎকার দিয়ে বললো,
"আমার জীবনটা তুই নষ্ট করে দিলি জা'নো'য়া'রে'র বা'চ্চা। আমার সাথে করা অন্যায়ের জন্য তুই শাস্তি পাবি। তুই বাঁচবি না..! তোর আয়ু কমে গিয়েছে। জা"হে'ল তুই বে-বেশি দিন বাঁচবি না। তোর বিদায়ের পালা এবার। "
হঠাৎ চুপ হয়ে গেলো ঋতু। অবশেষে কাঁপা কাঁপা হাতে মুক্ত করে দিলো জসিম'কে। ব্যস্ত শহরে ব্যস্ত মানুষগুলো সবাই চলে গিয়েছে যার যার ঠিকানায়। শুধু রয়ে গেলো ঋতু। তাকে কেউ সঙ্গে নিলো না। সবকিছু হারিয়ে আজ সে নিঃস্ব। প্রাপ্তির খাতাটা একেবারে শূন্য। এতবড় পৃথিবীতে কেউ তার রইলো না। চারপাশে যেন শূন্যতা বিরাজমান, তার বুকটা হাহাকার করছে আজ সব হারিয়ে। তবে কি এটাই তার কর্মের ফল? না-কি আরো বাকি আছে...! ভাবলো না কিছু আর। সব কূল হারিয়ে অতি শোকে পাথর হয়ে গিয়েছে মেয়েটা। রাস্তার পাশ ধরে এলোমেলো পায়ে হাঁটছে অচেনা, অজানা ঠিকানায়।
.
.,
বাসরঘরে বসে আছে ফারিহা। তার কোলটা দখল করে আছে ছোট্ট আবিদা। ছোট্ট মেয়েটা চুপ করে গুটিশুটি মেরে ফারিহা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। মনে হচ্ছে বহুদিন পরে এক মায়ের উষ্ণতা অনুভব করছে সে। ফারিহাও মায়ের মতো মমতাময়ী হাতদিয়ে আষ্টে-পিষ্টে জড়িয়ে নিয়েছে মেয়েটাকে। মেয়ে'টার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ফারিহা। কতওো মায়া মেয়েটার মুখে।
অবশেষে আজ ঘরোয়া ভাবে তার বিয়ে হয়েছে আবিদে'র সাথে। সুমনা বেগম আজই নিয়ে এসেছে তাকে। এতক্ষণ নতুন বউ দেখার জন্য মানুষজন ছিলো। রাত বাড়ার সাথে সাথে চলে
গিয়েছে সবাই। তক্ষণই ফারিহাকে আবিদের রুমে নিয়ে এসেছে সুমনা বেগম। সাথে এসেছে আবিদা ও। সে ফারিহার পাশে পাশে ঘুরছে। ফারিহা তা দেখে আবিদাকে কোলে তুলে নিলো। সাথে সাথে একদম চুপ করে আছে আবিদা। সুমনা বেগম পাশে বসে ফারিহাকে মৃদু স্বরে ডাকল,
"ফারিহা মা..!"
"জ্বি আম্মা বলুন।"
"আদিবা ঘুমাচ্ছে? আমার কাছে দেও তোমার কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়ই।"
"না আম্মা কি যে বলেন কষ্ট হবে কেনো। ঘুমায়নি ও এখনো, থাকুক আমার কাছে।"
সুমনা বেগম হুট করে ফারিহার একটি হাত ধরে অনুরোধ করে, কান্নারত কণ্ঠে বললো,
"মা'রে আমার ছোট্ট নাতনী'টা'কে কখনো কষ্ট দিও না। আমার অবর্তমানে নিজের মেয়ের মতো দেখে রেখো ওকে। মা থেকেও মা নেই বাচ্চা মেয়েটা'র।
আজ থেকে আদিবা'কে তোমার হাতে তুলে দিলাম মা। কখনো বুঝতে দিও না তুমি সৎ মা। এটা আমার অনুরোধ মা..!"
সুমনা বেগমের চোখের পানি কয়েক ফোঁটা ফারিহার হাতে পড়তেই কেঁপে উঠলো সে। তড়িঘড়ি করে মৃদু কণ্ঠে বললো,
"একি আম্মা আপনি কাঁদছেন কেনো? দয়াকরে কাঁদবেন না।
আম্মা আমিও সৎ মায়ের হাতে মানুষ হয়েছি। মায়ের আদর কখনো পাইনি। বিয়ে হয়েছে, এখন থেকে আপনারাই আমার আপনজন।
আমি জানি সৎ মায়ের হাতে মানুষ হওয়া কতটা কষ্টে'র, যন্ত্রণাময়। যে কষ্ট আমি ভোগ করছি সেই কষ্টে'র একটা আঁচড় ও এই ছোট্ট আদিবার গায়ে লাগবে না। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি আম্মা।"
ফারিহার কথায় খুশী হলো সুমনা বেগম। উনি মৃদু হাসলো। ফারিহা মেয়ের মতো যত্ন করে হাত দিয়ে চোখে জলটুকু মুছে দিয়ে পুনরায় বললো,
"আর কাঁদবেন না আম্মা! এমনিতেই আপনি অসুস্থ।"
সুমনা বেগম ফারিহার কপালে চুমু দিয়ে বললো,
" না আর কাঁদবো না মা। আর শোন? তোর মা নেই এমন কথা আর কখনো বলবি না খবরদার! আজ থেকে তুই আমার মেয়ে। আমি তোর মা..!"
ফারিহা মৃদু হাসলো, সুমনা বেগমের স্পর্শে মায়ের ছোঁয়া অনুভব করছে সে । বহুবছর পরে কেউ তাকে মেয়ের মতো আদর করে, কাছে টেনে নিলো। ইশ মায়েদের ছোঁয়া এতো মনোমুগ্ধকর হয় বুঝি....! ফারিহার জানা ছিলো না। বসার ঘরে কারো কথার আওয়াজ শুনে সুমনা বেগম রুম থেকে চলে গেলো। ফারিহা এই সুযোগে আবিদার কপালে চুমু খেলো। তারপর নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বললো,
"আজ থেকে তুই আমার মেয়ে। আমি তোর মা। আমি থাকতে তোকে কখনো মায়ের কষ্ট অনুভব করতে দিবো না।"
আবিদা ড্যাবড্যাব করে তাকি রইলো, সে কি বুঝলে কে জানে। কিছুসময় পরে তার আদো আদো কণ্ঠে বললো,
"তুমি আমার আম্মু?"
"হ্যাঁ মা..। আমি তোমার আম্মু..!"
"আত্তা আমি তোমাকে একটু আম্মু বলে ডাকি?"
ইশ মা হারা এক অসহায়ত্ব মেয়ে'র কি নিষ্পাপ আবদার। ফারিহা চোখ দু'টো ছলছল করে উঠলো। সে-ও তো আবিদার মতো মা-হারা ছিলো। ফারিহার চোখে জল দেখে আবিদার ছোট মস্তিস্ক ব্যাথিতো হলো। সে করুণ কন্ঠে বললো,
"থাক আমি আম্মু ডাকবোনা তোমালে। তুমি কান্দুনা নতুন বউ।"
ফারিহা দ্রুত নিজের চোখের জলটুকু মুছে ফেললো। একটু হেসে বললো,
"আমি কাঁদছি না আম্মু। তুমি আম্মু বলে না ডাকলে অনেক কাঁদবো।"
আবিদা ঝড়ের বেগে কয়েকবার ডাকলো,
আম্মু..! আম্মু..! আম্মু..! আমাল আম্মু!
কতদিন পরে কাউকে আম্মু ডেকে ছোট বাচ্চাটা আনন্দিত। একটু পরপর ডাকছে "আম্মু" বলে। তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে মনে হচ্ছে একফালি স্বচ্ছ জল যা ছোট্ট আবিদাকে তৃপ্তি দিচ্ছে।
ফারিহা আবিদাকে যত দেখছে, যত কথা শুনছে তত মায়া হচ্ছে। কতটা আদুরে মায়াবী বাচ্চা মেয়েটা। মনচাচ্ছে সারাদিন আদর করতে।।
ইশ এতো সুন্দর বাচ্চা রেখে তার মা অন্য পুরুষের সাথে কি করে থাকে? মনেমনে ফারিহা ধি'ক্কা'র জানালো ঋতু'কে।
কিছুসময় আবিদা ঘুমিয়ে পড়লো। তার একটু পড়েই সুমনা বেগম নিজের কাছে নিয়ে গেলো আবিদা'কে। যদিও ফারিহা বলে ছিলো থাকুক তার কাছে। তবুও সুমনা বেগম জোড় করে নিয়ে গেলো। কেননা যতই আপন ভাবুক, মেয়েটা তো বিবাহিত জীবনে নতুন। তার ও স্বপ্ন আছে এ রাত নিয়ে।
রাত বারোটা এখন। ফুলসজ্জািত ঘরে আবিদের জন্য অপেক্ষা করছে ফারিহা। আসার পর থেকে লোকটাকে আর চোখে পড়েনি তার। নিরব রজনীতে না চাইতেও কতশত ভাবনা আবিদকে নিয়ে ভাবছে সে। অবশেষে তার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো আবিদ৷ আবিদের উপস্থিতি টের পেয়ে লজ্জায়, অজানা এক অনুভূতিতে মিইয়ে যাচ্ছে ফারিহা।
হয়তো এখান থেকেই শুরু হবে তাদের নতুন জীবনের সুচনা.....।
#চলবে....
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ! ]
আমাদের সমাজের কিছু পুরুষের চরিত্র তুলে ধরতে অনেক অসামাজিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আশা করি কেউ খারাপ ভাবে নিবেন না..!
রিচেক করিনি ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন।
