#অন্ধ_বিশ্বাস 


#writer_sumaiya_afrin_oishi 


#পর্বঃ২+৩+৪+৫


দু-দু'টো দিন গত হলো। আজ জসিম বাড়ি আসছে, সেই সাথে ঋতুর মনে চলছে তীব্র আ"ন্দ'লো'ন। তার হৃদয় জুড়ে আনন্দের শিহরণ বইছে বারংবার। রুমে বসে নিজেকে পরিপাটি করছে, বিভিন্ন সাজসজ্জায়, দামী শাড়ী-চুড়ি পড়ে রেডি হয়ে নিলো। রুম ডেটে যাচ্ছে সেখানে তো আর সাদামাটা ভাবে যাওয়া যায় না! তাই নিজেকে জড়িয়ে নিলো কৃত্রিম রুপে। বারংবার আয়নায় নিজেকে দেখছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। এরিমধ্যে ছোট্ট আদিবা ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে মা'কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আধো আধো কন্ঠে বললো,


"আম্মু তুমি তই দাত্তো(যাচ্ছ)? এতো ছাজুগুজু করতো কেনো? তোমালে মেলা থুন্দর লাগে! আমিও তোমাল থাতে দাবো।"


 বাচ্চা মেয়ে'টার কথায় মন গললো না পা'ষা'ণী' মায়ের ! সে-তো অন্য পুরুষে কঠিন ভাবে আসক্ত! সেখানে নিজের স্বামী সন্তান কি করে ভালো লাগবে? এর শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে থামবে নিজেও জানে না। হয়তো সেদিন নিজের করা পাপের জন্য জীবন বিনাশ ঘটবে,আর আফসোস করবে। কেননা সৃষ্টিকর্তা'র আদেশ অমান্য করলে শাস্তি অনিবার্য! হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য ছাড় দেন নিজেকে শুধরে নিবার জন্য, কিন্তু তিনি কাউকে ছেড়ে দেয় না। 


ঋতু মেয়ের আচরণে বিরক্তবোধ হলো। মেয়ে'কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে দিয়ে, ধমক দিয়ে বললো, 


"শ'য়'তা'নে'র বাচ্চা তোকে সব বলতে হবে। সবসময় এতো জ্বালা ভাল্লাগে না আমার। যা তোর দাদির কাছে যা।"


ছোট্ট মেয়েটা মায়ের ধমক খেয়ে কেঁদে দিলো। সুমনা বেগম আদিবা'র কান্না'র আওয়াজ শুনে নিজের কাছে ডেকে নিলো। দূর থেকে ঋতু'কে এই রুপে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো তিনি। সন্দিহান দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। আজ দু'দিন ধরে কেউ কারো সাথে কথা বলে না। এতে অবশ্য ঋতু'র কিছু যায় আসে না, আরো ভালো হয়েছে তার। 

.

সকাল দশ-টা ভেজে চলছে। ঋতু'কে এক্ষুনি বেড় হতে হবে। সুমনা বেগম নাতনী'কে নিয়ে নিজের রুমে সুয়ে আছে। ঋতু একটু উঁকি দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো, 


"এ্যাই শুনুন? আমি একটু ব্যাংকে যাচ্ছি। আর বাসায় তো বাজার শেষে'র দিকে। সবকিছু গুছিয়ে ফিরতে দেরি হবে। তাই আদিবা'কে সাথে নিচ্ছি না, ওর খেয়াল রাখিয়েন।"


সুমনা বেগমে'র সন্দেহ তীব্র হলো, নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে না পেরে তাচ্ছিল্য করে বললো,


"বাসায় বাজার যা আছে তাতে'তো আরো দশদিন চলে যাবে ভালোভাবে। ব্যাংকে কি এমন কাজ যে সারাদিন লাগবে? না-কি ব্যাংকে'র নাম করে নতুন না'গ'রে'র সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছো?"


"বাসায় বসে বসে সব হাতের কাছে পান'তো তাই টের পান না। সব ঝামেলা তো আমাকেই সহ্য করতে হয়। আপনার ছেলে তো আর এসে সব কাজ করে দিয়ে যায় না। আবার কথাও শুনান আমাকে। আজ'কে আদিব শুধু কল দিক, হয়তো বাসায় আপনি থাকবেন না হয় আমি। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো ঋতু।"


"সে আর নতুন কি? এগুলো তো তোমার পুরনো অভ্যাস। এইটা আর বাসা নেই নরকে পরিণত হয়েছে!এই নরক থেকে আমিও মুক্তি চাই।"


ঋতু শুনেও শুনলো না। এখন কথা বাড়ানো'র সময় নেই তার। দ্রুত চলে গেলো জসিমে'র দেওয়া ঠিকানায়। সুমনা বেগম ঋতু'র যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হতাশার শ্বাস ছাড়লো। সৃষ্টিকর্তা নিকট বারংবার নিজের মৃ'ত্যু কামনা করছে। এই নরকে এক সেকেন্ড ও থাকতে ইচ্ছে করছে না তার।

.

সারাটা দিন রঙ তামাশায় একান্ত সময় পাড় করলো ঋতু ও জসিম। বেলা গড়িয়ে গিয়ে সন্ধ্যার আভা ছড়িয়ে পড়ছে প্রকৃতি জুড়ে। দু'জন মিলে ফ্রেশ হয়ে লিপ কি'স করে বিদায় নিলো। 

.

আদিবা মায়ের জন্য কান্না করছে। মায়ের কাছে যাবে সে। সুমনা বেগম নানা ভাবে থামানোর চেষ্টা করছে। এরিমধ্যে কয়েকবার ঋতু'কে কল দিয়েছিলো কিন্তু রিসিভ হয়নি।এরিমধ্য সন্ধ্যার পরে খালি হাতে ফুরফুরে মেজাজে বাসায় আসলো ঋতু। ঋতু'কে দেখা মাএ'ই সুমনা বেগম নির্লজ্জে'র মতো আগবাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, 


"এতো দেরী হলো কেনো তোমার? তুমি না বাজার আনতে গেলে, তাও ফিরলে তো খালি হাতেই। কোনো সমস্যা হয়নি তো?"


"আর বইলেন না ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারিনি আজ। তারমধ্যে আবার বাড়ি থেকে ভাবি কল দিয়েছিলো ডাক্তার দেখানোর জন্য। তাই বাড়ি গিয়েছিলাম।"


"তোমার ভাবি বেশী অসুস্থ নাকি? এখন কেমন আছে?"


"ভালো আছে এখন।"


সুমনা বেগম আর কিছু বললো না। কেননা প্রায় সময়ই ঋতু'র ভাবি অসুস্থ থাকে। বাসায় আর কেউ নেই। ঋতুর বাবা-মা একজন ও বেঁচে নেই। একটা মাএ ভাই সে ও চাকরির জন্য ঢাকা থাকে। প্রায় সময়ই ভাবি'র কথা বলে এখানে-সেখানে যায় ঋতু। আদৌও কোথায় যায় তা আর কখনো জানা হলো না সুমনা বেগমে'র। উনি ঋতু'র কথাই বিশ্বাস করে নিলো।


পরক্ষণে আদিবা মা'কে দেখে জাপ্টে ধরলো মায়ে'র গলা।মেয়ের উপরে একরাশ বিরক্ত হলো, তবুও কোলে করে নিজের রুমে চলে গেলো। জসিমকে একটা টেক্সট করে জানিয়ে দিলো বাসায় পৌঁছেছে সে। কিছুসময় বিশ্রাম করে নিজেকে ঠিক করে নিলো। আদিবা এর মধ্যে ঘুমিয়ে গিয়েছে, নিজেও ডিনার করে নিলো। ডাটা অন করে আদিবে'র সাথে কিছুক্ষণ মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো ঋতু। আজও মায়ে'র নামে কটুকথা বানিয়ে বলতে ভুল হলো না তার।

.

.

এভাবে চলছে দিন, দিন গিয়ে মাসে পরিণত হয়েছে। একটা মাস গত হয়ে গেলো! এরমধ্যে আদিব একটি বার ও কল দিলো না মা'কে। সুমনা বেগম নানান টেনশনে অসুস্থ্য হয়ে গিয়েছে। সারাক্ষণ মনটা আকুপাকু করছে ছেলেটার সাথে একটু কথা বলার জন্য। রোজ অপেক্ষা করে ছেলের কল আসবে বলে, কিন্তু এই অপেক্ষার যে অবসান ঘটছেই না। সারাদিন মনটা উদাসীন ভাবে ছ'ট'ফ'ট করে ছেলেটার জন্য। ঠিকভাবে খাওয়া ধাওয়া অবধি করতেও পারছেনা ছেলের চিন্তায়। তবুও নামাজ পড়ে প্রতিনিয়ত ছেলে'র মঙ্গল কামনা করছে। হ্যাঁ এরাই হচ্ছে "মা"! 

.

মাঝরাতে আদিবা'র চিৎকার করা' কান্না'র আওয়াজ কর্ণকুহরে পৌঁছাতে'ই ঘুম ভেঙে গেলো সুমনা বেগমে'র। এমন কান্না কেনো করছে মেয়েটা? তড়িঘড়ি করে উঠে চিন্তিতো হয়ে ঋতু'র রুুমে'র কাছে গেলো। হাঁক ছেড়ে ডাকলো,


" বউমা আদিবা এমন করে কাঁদছে কেনো?"


কিন্তু ভিতর থেকে কোনো উওর আসলো না। দরজা খোলাই আছে, অন্ধকা'রে হাতড়িয়ে সুমনা বেগম রুমে প্রবেশ করলো। রুমের লাইট জ্বালাতেই আতঙ্কে উঠলেন তিনি। কারণ, ঋতু রুমে নেই। নেই! কোথাও নেই ঋতু! মুহূর্তেই মনটা কু’ডাক দিলো। আদিবাকে কোলে নিয়ে বাড়ির প্রত্যেক'টা রুম, ওয়াশরুম হন্যহয়ে খুঁজলো। কিন্তু ঋতু নেই। তবে কি কোথায় চলে গেলো না তো! ভাবতেই পারছে না সুমনা বেগম। নাতনী'র মুখের দিকে তাকিয়ে কলিজা মোচড় দিয়ে উঠলো তার। ইশশ এই বাচ্চা মেয়ে'টা 'মা' ছাড়া কি ভাবে থাকবে? এতরাতে কি করবে সে? আপাতত আদিবার কান্না থামাতে হবে। দ্রুত রান্না ঘরে গিয়ে দুধ গরম করে খাইয়ে দিলো। মেয়েটাকে বুকের সাথে চেপে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আর নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে সুমনা বেগম। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লো ছোট্ট আদিবা। সুমনা বেগম নাতনী'র মুখের দিকে তাকিয়ে ছ'ট'ফ'টি'য়ে কাটিয়ে দিচ্ছে বাকি রাতটুকু। তার চোখে আর ঘুম ধরা দিলো না। উদাসীন হয়ে সৃষ্টিকর্তা নিকট বারংবার প্রার্থনা করছে-" সকাল হতেই যেন ঋতু বাড়িতে আসে। কোথাও যেন না যায়।"

.

সকাল হতে না হতেই সারা পা'ড়া'য় রটে গেলো ঋতু ও জসিম পালাতে গিয়ে ধরা পড়ছে। জসিমে'র বউ রাতে টের পেয়ে লোক দিয়ে ধরিয়েছে। জসিম'কে আ'চ্ছা মতো মে'রে'ছে লোকজন। ঋতু মেয়ে বলে কেউ গায়ে হাত তুলেনি, তবে যাচ্ছে তাই বলে গালি দিচ্ছে আর ছিঁ!ছিঁ! করছে লোকজন। এলাকার চেয়ারম্যান বাড়িতে দু'জন কে আটকিয়ে রাখা হয়েছে শেষ রাতে। বেলা হলে এর বিচার করবে এলাকার চেয়ারম্যান সাহেব।

 সকাল সকাল এমন একটা খবর পেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলো সুমনা বেগম। মান-সম্মান আর থাকলো না তাদের। 

.

বেলা দশটা চেয়ারম্যান বাড়িতে অনেক লোকজন গিজগিজ করছে। ঋতু কান্না কাটি করে মাপ চাইছে সবার নিকট। জসিম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, আর জসিমে'র বউ, বাচ্চা ছেলে-মেয়ে দু'টো কাঁদছে। এখানে উপস্থিত রয়েছে সুমনা বেগম ও আদিবা। এত মানুষ'জন তার উপরে অনেকক্ষণ পরে মা'কে দেখে মায়ের কোলে যাবে বলে কাঁদছে আদিবা। 

সবার দৃষ্টি আদিবা'র দিকে স্হির। এইটুকু ছোট্ট একটা মেয়ে রেখে কি করে মানুষ এতবড় জ'ঘ'ন্য কাজ করে ভাবাচ্ছে সবাই'কে। পরক্ষণে চেয়ারম্যান সাহেব বললো,


"এই বিষয় আদিব'কে জানানো উচিত। এতবড় ঘটনা'র পড়ে এই মেয়ে'কে ভরসা করা যায় না। এদের দু'জনকে'ই শাস্তি পেতেই হবে। আদিবে'র মতামত জানতে হবে এ বিষয়ে তার কি সিদ্ধান্ত। যেহেতু তার স্ত্রী'র তার অধিকার সব থেকে বেশী। তার মতামত নিয়ে আমরা একটা,সিদ্ধান্ত নিবো। কি বলেন আপনারা?


 কয়েকজন মুরব্বিদের উদ্দেশ্য করে বললো। তারাও হ্যাঁ সূচক জবাব দিলো। 


এমতো অবস্থায় ঋতু সবার সামনে শ্বাশুড়ি'র পা জড়িয়ে ধরে কান্না করে বললো,


"আম্মা আমাকে ক্ষমা করে দিন! তাদের আদিবকে জানাতে না করেন। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে আম্মা! এবারে'র মতো ক্ষমা করে দিন, আমার বাচ্চা মেয়ে'টা মুখের দিকে তাকিয়ে। আমি কথা দিচ্ছি আর কখনো এমন হবে না।"


মায়ের এমন অবস্থা দেখা আদিবা আরো জোরে জোরে কাঁদছে। সুমনা বেগম থামাতে পারছে না, তাই বাধ্য হয়ে ঋতুর কোলে দিলো। মেয়ে'কে কোলে নিয়ে লোক দেখাতে, কপালে, চোখে, মুখে অজস্র চুমু খেলো ঋতু। মায়ের আদর পেয়ে ছোট্ট আদিবা'র কান্না থেমে গেলো।


 সুমনা বেগম ছোট্ট বাচ্চা নাতনী'টার মুখের দিকে চেয়ে সমাজের মানুষ, লোকলজ্জা, মান-সম্মানে'র কথা ভুলে সবার হাতে পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে নিলো। ঋতু'কে সাথে করে বাড়ি নিয়ে আসলো। জসিমকে বারবার সতর্ক করে তাকেও ছাড়িয়ে নিলো জসিমে'র বউ ও বাচ্চারা। বাড়িতে এসে জসিম মনে'র রাগ ক্ষো'প মিটাতে বউ'টাকে ইচ্ছে মতো মা'র'লো আর অ'ক'থ্য ভাষায় গা'লা'গা'লি করলো। বাচ্চা দুইটার মুখের দিকে তাকিয়ে এই মানুষ রুপি জা'নো'য়া'রে'র সাথে সংসার করছে জসিমে'র বউ "শীলা"।

.

দিন পনের চলে গেলো। জসিমে'র সাথে কয়েকদিন যোগাযোগ বন্ধ রাখলেও পুনরায় বেশ সতর্ক ভাবে যোগাযোগ কন্টিনিউ করছে দু'জন। সুমনা বেগম চোখে চোখে রাখে ঋতু'কে। এসব বিষয় উনি কিছু টের পায়নি আর। কথায় আছে না, " কয়লার ময়লা যায় না ধু'ই'লে, মানুষের স্বাভাব যায় না ম'র'লে!"

চোর চু"রী করলে কতক্ষণ পাহাড়া দিয়ে রাখা যায়!


 এদিকে জসিমে'র জেদ চেপেছে ঋতু'কে তার চাই'ই চাই! যে করেই হোক। আদিবের ইমু নাম্বার জানতো জসিম। কিছু একটা ভেবে বাঁকা হসলো। ঋতু ও তার একান্ত সময়ের কিছু ভিডিও করেছিলো ঋতুর অজান্তেই। সেগুলো সব আদিবকে পাঠিয়ে দিলো।

.

আজ শুক্রবার, আদিবে'র ছুটির দিন। যার ফলে সারাদিন অনলাইনে সময় কাটাচ্ছিল আদিব। হুট করে ইমু'তে অচেনা নাম্বার থেকে কিছু ভিডিও ফুটেজ আসলো। যা দেখে আদিবের গোটা দুনিয়া'টা অন্ধকারে ছেঁয়ে গেলো। মাথার উপরে বিশাল আকাশটা ভেঙে পড়লো মনে হচ্ছে। নিজের চোখ দু'টো'কে বিশ্বাস করতে পারছে না এটা তার ঋতু! না! না! হতে পারে না বলে, পা'গ'লে'র মতো চিৎ/কার দিয়ে উঠলো আদিব। 


#চলবে.....


[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ! ]#অন্ধ_বিশ্বাস 


#writer_sumaiya_afrin_oishi 


#পর্বঃ৩


কোনো এক পুরুষের সাথে অ'ন্ত'র'ঙ্গ অবস্থায় ভিডিও তে স্পষ্ট ঋতুকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু পুরুষটি'র মুখ দেখা যায়নি। মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা লাগছে আদিবের। মাথায় বারংবার ঘুরপাক খাচ্ছে দৃশ্যগুলো। ঘৃণায় গা গুলিয়ে আসছে তার। হাতের মোবাইল'টা গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছুঁড়ে মারলো ফ্লোরে। মুহুর্তে'ই ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো মুঠোফোন'টা। নিজে'র চুল খামচে ধরে জোরে জোরে শ্বাস ছাড়তে লাগলো আদিব।

 কি করে এমন জ'ঘ'ন্য পাপ কাজ করতে পারলো ঋতু? ভাবাচ্ছে তাকে। এই মেয়ের জন্য নিজের শখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে বিদেশে পড়ে আছে। আর সেই মানুষটা তাকে এমন ভাবে ঠকালো? কি করেনি সে ঋতু'র জন্য! তার বিনিময়ে কি এগুলো তার প্রাপ্য? ঋতু'কে এখন এক কা'ল'না'গি'নী সাপ মনে হচ্ছে। যে নিখুঁত ভাবে অভিনয় করে আদিবের জীবন ধ্বং'স করে দিলো। হৃদয়ে'র অনুভূতিরা আর জীবিত নেই, ম'রে গেছে তারা! ম'রে গেছে! শুধু দেহটা বেঁচে আছে। অন্ধ বিশ্বাসে'র কাছে বাজে ভাবে ঠকে গিয়েছে মানুষ'টা। কষ্টে বুকটা ভারী হয়ে গেলো ছেলেটার। এতোটা অধঃপতন হয়ে গিয়েছিল তার, ঠিক-বেঠিক বিবেচনা না করে অন্ধে'র মতো বিশ্বাস করেছে অর্ধাঙ্গিনী'কে। এটাই কি তাহলে তার অন্ধ বিশ্বাসে'র প্রাপ্য? মস্তিষ্ক যেন বারংবার উত্তর দিচ্ছে -হ্যাঁ! 

মুহূর্তে'ই মায়ের সাথে করা আচরণ, অন্যায় গুলো মাথা চাপা দিলো আদিবের। এইতো সেদিন ও মায়ের সাথে ঋতু'কে নিয়ে ভরাই করেছিলো।মায়ের বলা প্রত্যেক'টা কথা যেন এখন হারে হারে টের পাচ্ছে আদিব। হৃদয়'টা জুড়ে অনুতপ্তে'র আ'গু'নে জ্ব'ল'ছে তার! মা কি ক্ষমা করবে তাকে? এত কষ্ট দিবা'র পরে কোন মুখে ক্ষমা চাইবে সে। একাধিক প্রশ্ন এসে মস্তিষ্কে হানা দিয়েছে। না ভাবতে পারছে না আর কিছু। মাথাটায় অসহ্য যন্ত্রণা করছে, চোখ দু'টো নিস্তেজ হয়ে বন্ধ হয়ে আসলো। 

.

দু'টো দিন কেটে গেলো এমন অসহ্য যন্ত্রণা নিজের মধ্যে পুঁষে। অতি শোকে পাথর হয়ে গেলো ছেলেটা। কাজ-কর্ম করার শক্তি একেবারে'ই নেই, নিজেকে ঘরবন্দী করে নিলো। সবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে, একমাত্র নিকোটিনে'র ধোঁয়া হলো সঙ্গী। রুম মেটরা কিছু জিজ্ঞেস করলে, কৌশলে এড়িয়ে যায়। এসব কি কাউকে বলার মতো ঘটনা! এসব বললে যে, লোকে তার পু'রু'ষ'ত্ব নিয়ে কথা শুনাবে। ছিঃ! ছিঃ! করবে। পুরুষে'র কাছে এটি মা'রা'ত্ম'ক লজ্জাজনক ঘটনা। 

.

আধার রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো আদিব।কোনো কিছু ভালো লাগেনা না তার। 

 মায়ের কন্ঠ'টা শোনার জন্য মনটা ভীষণ ছটফট করছে আদিবে'র। আজ কতোটা দিন মায়ের কণ্ঠ'টা শুনে না সে। সিগা'রেট'টা ফেলে দ্রুত রুমে আসলো। পুরনো একটি ফোন ছিলো, তাতে নিজের সিম ভরে নিলো। ভুলবশত হাতের টাচস্ক্রীনে লেগে ডাটা অন হয়ে গেলো। পরক্ষণে'ই ঋতু'র একাধিক কল, মেসেজ এসেছে। এমন একটা ভাব যেন আদিব ছাড়া বড্ড অসহায় সে।

 আগে এসব দেখলে অধর কোণে মিষ্টি হাসি ফুটতো, আজ ঘৃণা হচ্ছে আদিবে'র। 

এতো অভিনয় কেনো করছে? না-কি মেয়েরা এমনই নিখুঁত অভিনেত্রী!ভাবতেই আদিবের রাগ উঠলো আবারো। কয়েক মিনিটের মধ্যে'ই ঋতু'র কল আসলো। আদিব রিসিভ করলো না, কিন্তু বারংবার কল দিচ্ছে ঋতু। আদিব ও তাচ্ছিল্য করে হেসে, অভিনয়ে'র শেষ অংশ দেখা'র জন্য বাধ্য হয়ে রিসিভ করলো। 


ভিডিও কলে ঋতু'র মুখটা ভেসে আসলো, ভুলেও একটিবার সেদিকে তাকায়নি আদিব। ঋতু ব্যস্ত হয়ে বললো,


"তোমার কি হয়েছে আদিব? তুমি ঠিক আছো? কিছু হয়নি তো? দু'দুটো দিন অনলাইনে আসলে না কেনো? জানো আমার কত টেনশন হচ্ছিলো? আমার দিকে তাকাও আদিব! কথা বলো জান! তুমি এমন করলে আমার ভাল্লাগে না বুঝতে পারছো তুমি।"


এসব আদিখ্যেতা দেখে মুহূর্তে'ই ভীষণ রাগ উঠলো আদিবের। নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে না পেরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, 


"বন্ধ কর তোর নাটক। বাড়ি আসছি। যা কথা সামনাসামনি হবে।"


"এভাবে রেগে আছো কেনো জান? আর কি বলো বাড়িতে আসবে মানে? আরো দু'টি বছর থাকো।"


"কেনো আমি বাড়িতে আসলে তোর না'গ'রে'র সাথে ন'ষ্ট'মি করতে পারবি না? এজন্য নিষেধ করিস। ভয় নেই তুই মুক্ত ঋতু। আমার জীবন থেকে তোকে মুক্ত করে দিলাম। যত পারিস উড়ে বেড়া, কেউ বাঁধা দিবে না তোকে।"


আতঙ্কিত হয়ে উঠলো ঋতুু। আদিব জানলো কি করে? মিনমিন করে কোমল কণ্ঠে বললো, 


"এসব কি বলছো আদিব?তুমি ছাড়া.. 


বলতে পারলো না ঋতু, আদিব রাগের চো'টে চিৎকার দিয়ে বললো, 


" চুপ। চুপ। একদম চুপ! খবরদার আর একটাও মিথ্যে কথা বলবি না।"


এই আদিব'কে চিনে না ঋতু। হিংস্র কোনো সিংহের মতো লাগছে আদিবকে। যে হাতের কাছে যাকে পাবে মুহূর্তে'ই শেষ করে দিবে। ঋতু ভয়ে ভয়ে বলল,


"আমার ভুল হয়েছে আদিব। প্লিজ ক্ষমা করে দেও আমাকে। আমি নিজেকে শুধরে নিবো, মাথা ঠান্ডা করো আদিব প্লিজ!"


"এটা ভুল করিসনি তুই, পাপ করেছিস! মহা পাপ করেছিস, অন্যায় করেছিস, আমাকে ঠকিয়েছিস। পর''কী'য়া নামক অ'বৈ'ধ সম্পর্কে জড়িয়েছিস। এর পরে ও ক্ষমা করবো তোকে? হাহা! 

আরে তোর যদি এতোই কামনা-বাসনা জেগেছে আমাকে বলতি আমি বাড়ি আসতাম। আমি পুরুষ হয়েও শুধু তোর জন্য নিজের কামনা, শখ, আহ্লাদ সব বিসর্জন দিয়ে বছরের পর বছর বাহিরে পড়ে আছি। আমার কথা ভাববি কেনো তুই, আমি তো তোর টাকা ইনকামে'র মেশিন মাত্র। তোর কথা শুনে নিজের অভাগা "মা"টার সাথে অন্যায় করেছি। কেনো এমন করলি আমার সাথে ঋতু? কেনো?কেনো?"


অশ্রু গুলো গড়িয়ে পড়লো ছেলে'টার গাল বেয়ে। অসহায়ত্বতায় ঘিরে ধরেছে তাকে। নিজেকে সামলে নিয়ে পুনরায় আবার বললো, 


"দোষটা আসলে আমারই তোর দোষ না! বড় ভালোবেসে, শখ করে, আদর করে, যত্ন করে তোকে পাখি বলে ডাকতাম! 

ভুলেই গেছিলাম যে, পাখি এক ডালে বেশী দিন বাসা বাঁধে না! তুই মুক্ত ঋতু! ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিবো। তোর মুখ দেখতে চাই না আর! আমার বাড়ি থেকে চলে যা। আল্লাহ যেন আর কোনো দিন তোর মুখ'টা না দেখায় আমাকে!"


ঋতু রেগে গেলো। ক্রোধিত কণ্ঠে বললো, 


"বুঝে বলছিস তো ফ'কি'ন্নি'র বাচ্চা! ভুলে যাসনা তোর সবকিছু আমার নামে।"


আদিব কোনো প্রত্যুওর করলো না, লাইনটা কেটে দিলো। যেখানে সঙ্গী মানসিক শান্তি না হয়ে, মানসিক যন্ত্রণা'র কারণ হয়! সেখানে টাকা-পয়সা নিতান্ত তুচ্ছ। আদিব রুম থেকে বেরিয়ে, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালো। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভারী কয়েকটা নিঃশ্বাস ছেড়ে আনমনে বললো,


"আমি ভালোবাসার কা'ঙা'ল ছিলাম...

তাই তো বুঝিনি তোমার ছলনা। 

ভুলে গিয়েছিলাম-

সমুদ্রের বালুচরে যতই শক্ত খুঁটির বাসা হোক না কেন-

ঢেউয়ের বুকে মিলিয়ে যায় একদিন ঠিক'ই। 

আমিও বালুচরে ঘর বাঁধার মতো তোমার প্রেমে অ'ন্ধ হয়েছিলাম!

তুমি সময়ের সাথে ঠিকই মিলিয়ে গেলে! 

সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তুমি এসে তছ'নছ করে দিলে আমার জীবনকে ।

সমুদ্রের ঢেউ হয় খুবই নিষ্ঠুর ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব-

তেমনই "অ'ন্ধ'বি'শ্বাস" অন্ধ করে ভালোবাসার ঘর করে তাসের ঘর। 

ইশশশস ভালোবাসা বলছি!

এটা তো ভালোবাসা নয়...

তবে ভালোবাসা কারে কয়?

যে সম্পর্কে নেই কোনো অ'বি'শ্বাস, দুটি মনের মাঝে গড়ে উঠে স্বপ্ন। পূর্ণতা পায় একদিন বাস্তবরূপে, তাই হয়তো ভালোবাসা ।

যেই সম্পর্ক সবসময় ছ'ল'না দিয়ে হয়, তবে তাকে কী বলে জানো তো?

বলতে পারো কেউ, সেই সম্পর্কের নাম?

যেই সম্পর্ক দিয়ে যায় অশ্রু ঝরা বেদনা!

আচ্ছা, ভালোবাসার মানুষগুলো কেন একসময় এত নি'ষ্ঠু'রতার প্রমাণ দেয়!

কেনই বা মিষ্টি মধুর কথায় মন ভুলিয়ে ধীরে ধীরে পা'ষা'ণ হৃদয় প্রমাণ করতে উ'ম্মা'দ হয়? 

বলতে পারো?

পারবে না-

কারণ,

এমন কম-বেশী সবার জীবনেই ঘটে থাকে উত্তর মেলে না কারো। 

হুম উত্তর জানা নেই। 

তবে বলতে পারি #অন্ধ_বিশ্বাস কাউকে করতে নেই।"

.

এদিকে ঋতু ফুঁসছে ক্রোধে। আজই এর একটা বিহিত করতে হবে। জসিম'কে জানিয়ে নিজেই ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো। জসিম তাকে বিয়ে করবে বলে জানালো। জসিমতো এইটাই চেয়েছিলো। এই রাতে'ই বেড়িয়ে পড়লো ঢাকা জসিমে'র কাছে। ছোট্ট মেয়ে'টা ফেলে গেলো একটিবার ভাবলো না মেয়ে'টার কথা। সুমনা বেগম হাতে-পায়ে ধরেও রাখতে পারলো না ঋতু'কে। ছোট্ট নাতনী'টাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদছে সে, এই মেয়ে'টার ভবিষ্যত কি হবে? নির্ঘুম রাত পাড় করছে সুমনা বেগম।


 হঠাৎ মুঠো ফোন'টা ভেজে উঠলো। রিসিভ করতেই আদিবে'র কণ্ঠ থেকে অসহায় ভাবে "মা" ডাক শুনে সুমনা বেগমে'র অন্তর আ'ত্মা কেঁপে উঠলো। দীর্ঘ কতটা দিন পড়ে এই ডাকটা কর্ণকুহরে পৌঁছালো তার। যেখানে তার খুশী হবার কথা, কিন্তু মোটেও খুশী হয়নি। বরং আজ আতঙ্কিত হয়ে উঠলো সে। কি করে আজকের সত্যি'টা বলবে সে। কোনো বাক্য ব্যয় না করে চুপ করে আছে সে। আদিব বাচ্চাদের মতো কেঁদে ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বললো,


"আমাকে কি একটি বার ক্ষমা করবে মা! প্লিজ মা! ক্ষমা করো আমাকে। তোমার সাথে যে মহা অন্যয় করেছি আমি। অন্ধ বিশ্বাস করে ঠকে গিয়েছি আজ আমি। সব হারিয়ে আমি একদম নিঃস্ব হয়ে গিয়েছি মা! তোমার সাথে করা অন্যায়ের, এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করা'র একটি সুযোগ দেও মা! আমি আমি ভালো নেই মা! তুমি একটি বার ক্ষমা করো, কথা দিচ্ছি আর কখনো তোমার বিরুদ্ধে যাবো না। একটা সুযোগ দেও আমাকে। এই পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আপন বলতে কেউ নেই মা! কেউ নেই!"


ছেলে'র অসহায়ত্ব অবস্থা "মা'' হয়ে কি করে সহ্য করবে তিনি। ছেলে'র উপরে যে তার কোনো রাগ অভিমান নেই। নিজেও আঁচলে মুখ লুকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে তিনি। নিজেকে সামলে নিয়ে ছেলে'কে বললো,


" বাবা ঋতু...."


থামিয়ে দিয়ে আদিব বললো, আমি সব জানি মা! তুমি বলো আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো?


"এভাবে বলিস না বাবা! তোর উপরে আমার কোনো রাগ কিংবা অভিমান নেই। শত অন্যয় করার পরেও 'মা" বলে ডাক দিলে, সন্তানের উপরে যে মায়েরা রাগ করে থাকতে পারে না।"


আরো অনেক সময় কান্নাকাটি করে মায়ের নিকট ক্ষমা চাইলো আদিব। নিজে'র কষ্ট গুলো মায়ের আদুরে কন্ঠ শুনে অশ্রু দিয়ে বিসর্জন দিয়ে দিলো। 

 মায়ের নিকট মিনতি করে নিজের মেয়ে'টাকে দেখে রাখতে বললো।

.

.

ছয়টা মাস হয়ে গেলো। আদিব'কে ডিভোর্স দিয়ে জসিম'কে বিয়ে করে দিব্যি সংসার করছে ঋতু। ঋতু'র টাকায়, জসিমে'রও বেশ ভালো দিন যাচ্ছে। নতুন নারী'তে আসক্ত হয়ে স্ত্রী, সন্তানে'র একটি খোঁজ অবধি রাখে না জসিম। শীলা মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে কোনো রকম দু'মুঠা ভাত খেয়ে দিন পাড় করে।


ঋতু ভালো থাকলেও, শুধু ভালো নেই আদিব। গভীর রাতে ঋতু যখন জসিমে'র ভালোবাসায় ডুবে যায়। এদিকে আদিব ডুব দেয় নিকোটিনে'র ধোঁয়া'য়। কতশত স্মৃতিকে নিয়ে নির্ঘুম রাত পাড় করছে সে। তা শুধু আদিবের মতো ঠকে যাওয়া ছেলে গুলো জানে!


মা-মেয়েটার জন্য নিজেকে বাঁচিয়ে প্রয়োজনে'র তাগিদে কাজ করছে। না-হয় সেই কবে নিজেকে শেষ করে দিতো। জীবিত লা'শ হয়ে ম'রে ম'রে বেঁচে আছে ছেলে'টা। 

 তবুও নিত্য নিয়ম করে মিথ্যে হাসি দিয়ে বলছে " আমি ভালো আছি মা!" 

আদৌও সে ভালো নেই! সারাদিন কর্ম ব্যস্ততায় সময় চলে গেলোও রাত'টা কাটে বিষন্নতায়।


তবে কি এমন ভাবেই জীবন চলবে! নাকি জীবনের মোড় ঘুরে যাবে? প্রশ্ন রইলো.........


#চলবে...


[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ! ]


 কি অবস্থা তোমাদের হুহ? সবাই আগের মতো রেসপন্স করো না কেনো? পেইজের রিচ একদম নেই! সবাই বেশী বেশী রেসপন্স করে রিচ'টা ঠিক করে দেও। এ বিষয়ে তোমাদের সহযোগিতা কামনা করছি! তোমাদের অনুপ্রেরণা পারে একজন ক্ষুদ্র লেখিকা'কেও অনেক'টা পথ চলাতে।#অন্ধ_বিশ্বাস 


#writer_sumaiya_afrin_oishi 


#পর্বঃ৪


দুপুরে'র ভ্যাপসা গরমে জনজীবন ওষ্ঠাগত। কিন্তু জসিমে'র মন পুলকিত! কিছু পেতে হলে, একটু-আধটু কষ্ট সহ্য করতে হয়। উত্তপ্ত রোদে'র মধ্যে মার্কেটে এসে ঘুরে ঘুরে ঋতু'র পছন্দ মতো শাড়ী, চুড়ী, ইত্যাদি কিনে নিলো। ঋতু'কে একটা দারুণ সারপ্রাইজ দিবে বলে। কেননা আগামী কাল পহেলা বৈশাখ। অবশ্য টাকা'টা ঋতু'র কাছ থেকে'ই নেওয়া। যার টাকা দিয়ে তাকে সারপ্রাইজ দিতে পারা, বিষয় খানা মন্দ না..! 

.

ঋতু বাসায় রয়েছে, দুপুরে'র জন্য রান্না করতে লাগলো। এখন থেকে সবসময়ই জসিমে'র জন্য নিজ হাতে রান্না করে। আজও নিজে বাজার করে জসিমে'র পছন্দ অনুযায়ী সব রান্না করছে। আর ভাবছে তার প্রাণ-প্রিয় স্বামীর কথা।

রোদের মধ্যে মানুষ'টা কোথায় গেলো? অতী ভালোবাসায় মনটা যেন আনচান আনচান করছে জসিমে'র জন্য। একরাশ উদাসীনতা, চিন্তা ভাবনা নিয়ে রান্না কমপ্লিট করলো। এরিমধ্যে ডোরবেল ভেজে উঠলো, ঋতু হাসি মুখে দরজা খুলে দিলো। জসিম'কে দেখা মাত্র'ই ব্যস্ত হয়ে গেলো, নিজে'র ওড়না দিয়ে যত্ন করে গায়ের ঘাম টুকু মুছে দিয়ে এটা সেটা জিজ্ঞেস করতে লাগলো। জসিম ও হাসি মুখে উওর দিলো। জসিম চেয়ারে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে ক্লান্ত স্বরে বললো, 


 "যে গরম পড়ছে আজ শরীর'টা প্রচুর ক্লান্ত লাগছে ঋতু সোনা।"


"এই গরমের মধ্যে বাহিরে কেনো গিয়েছো?"


শাসিয়ে বললো ঋতু। অতঃপর দ্রুত ফ্রিজ থেকেে ঠান্ডা লেবুর শরবত নিয়ে আসলো। জসিম কয়েক চুমুক খেয়ে ঋতু'কে একটু দিলো। ঋতু হাসি মুখে খেয়ে নিলো। 

 খালি গ্লাস'টা হাতে নিয়ে রান্না ঘরে যাবার জন্য পা বাড়ালো ঋতু। অমনি জসিম পিছন থেকে হাত ধরে নিজের কাছে নিয়ে নিলো। শপিং ব্যাগ থেকে কিনে আনা জিনিসগুলো বের করে নেশালো কন্ঠে বললো,


"ফাগুনী ভালোবাসায় বৈশাখী!!

খুব যত্নে পড়া টিপ,আর কাজল কালো চোখ, অগোছালো শাড়ী, সব তোমার নামেই হোক!"


এতো কিছু দেখে ঋতু ভীষণ আনন্দি'তো। টুপ করে জসিমে'র গালে শীতল অধর ছুঁয়ে দিলো। এমন করে কোনো দিন আদিব তাকে সারপ্রাইজ দেয়নি। অথচ জসিম তাকে কতোটা ভালোবাসে! মনে মনে তৃপ্তির ঢেঁকুর গি'ল'লো ঋতু।

.

পরদিন খুব সকালে'ই ঋতু গোসল করে, জসিমে'র আনা শাড়ী, চুড়ি পড়ে রেডি হয়ে নিলো। জসিম ও রেডি হয়ে, কিছুক্ষণ পরে দু'জন মিলে ঘুরতে বেড় হলো। 

.

সারাদিন প্রেমিক-প্রেমিকা'র মতো এটাসেটা কিনে, ঘুরে ঘুরে'ই কাটালো সময়টা। এ যেন এক অচেনা সুখ! জীবন এতো রঙিন কেনো? জসিম জীবনে না আসলে হয়তো কস্মিনকালেও জানা হতো না।

 রাতে বাহির থেকে খেয়ে আসলো দু'জন। ক্লান্ত থাকায় গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে, দু'জনই ঘুমিয়ে পড়লো। তাদে'র যে ছেলে-মেয়ে আছে তা যেন বেমালুম দু'জনে'ই ভুলেই গিয়েছে। ভুলবশতও মনে পড়ে না পুরোনো স্মৃতি।

.

রাতে'র আঁধার তীব্র থেকে আরো তীব্রতর হচ্ছে। হঠাৎ ছোট্ট আদিবা ঘুমের মধ্যে দাদী'কে হাতড়িয়ে ধরে, আম্মু! আম্মু! বলে কান্না করে উঠলো।

সুমনা বেগমে'র ঘুম ভেঙে যায় আদিবার কান্নায়। নাতনী'টাকে বুকের মধ্যে আগলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এটা নতুন না , মা'য়ের জন্য রোজ কান্না করে মেয়ে'টা। সারাদিন ভুলিয়ে রাখতে পারলেও রাতে প্রতিদিন মায়ে'র সাথে ঘুমাবে বলে বায়না ধরে। সুমনা বেগম ছোট মেয়েটার অসহায়ত্ব সহ্য করতে না পেরে কেঁদে উঠলো নিঃশব্দে। কয়েকটি মাস ধরে তার শরীর'টা ভালো যাচ্ছে না। বিভিন্ন চিন্তায় হা'র্টে'র সমস্যাটা বেড়েছে। নাতনী'টার খেয়াল নিতে পারছে না আগের মতো। একটুতে'ই যেন হাঁপিয়ে যায় আজকাল।

.

আযানের মধুর ধ্বনি কানে আসতেই ঘুম ভেঙে গেলো গেলো আদিবে'র। শেষ রাতে একটু ঘুমিয়ে ছিলো তাও ঘুমটা ভেঙে গেলো। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো আদিব। সবকিছু অসহ্য লাগে তার। সবকিছু এতো তিক্ত কেনো? জীবনের হিসাব মিলছে না কবুও!

তবুও দেরী করলো না আর, উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলো। নামাজ আদায় করে নিলো। মোনাজাতে নিজের না বলা কথাগুলো কেঁদে কেঁদে সৃষ্টিকর্তার নিকট জমা দিলো। অতঃপর সকাল ও দুপুরের জন্য রান্না করে নিলো।

 সকাল সাতটা বেজে গেছে সবকিছু গুছাতে গুছাতে।তাড়াহুড়ো করে দু'টো ভাত খেয়ে নিজের কাজে'র জন্য বেড়িয়ে পড়লো। একটু দেরি হলে, মালিকের অ'ক'থ্য ভাষায় গালাগালি শুনতে হয়। তবুও প্রয়োজনে'র তাগিদে মানিয়ে নিতে হয়। প্রাবাসী জীবনটা কি এতো সোজা? উঁহু! কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, তবেই পারিশ্রমিক মিলে। 

এত কষ্ট করে রোজগারে'র টাকা'টা নিজে ভোগ করতে পারলো কই? মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেয়া নারী'কে বিশ্বাস করে ঠকে গিয়েছে ছেলে'টা। প্রিয়জন,টাকা, সব হারিয়ে নিঃস্ব আজ সে। অথচ তার পারিশ্রমিক বিনা কষ্টে, অন্য কেউ অনায়াসে ভোগ করছে।

.

.

বাংলাদেশে সকাল দশ-টা বাজে। ঋতুূু দুই কাপ কফি নিয়ে, জসিমে'র পাশে এসে খাটের উপরে বসলো। জসিম কোনো এক অজানা কারণে, চিন্তিতো ভঙ্গিতে, মন খারাপ করে বসে আছে। কিন্তু কারণ'টা ঋতু জানে না। ঋতু কফির মগ দু'টো পাশে রেখে, জসিমে'র গালে হাত দিয়ে বললো, 


"কি ব্যাপার? তুমি এভাবে চুপচাপ করে বসে আছো যে? তুমি কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তি'তো? কি হয়েছে আমার সাথে শেয়ার করো প্লিজ!"


জসিম হতাশ কন্ঠে বললো,


"এভাবে বসে বসে তো খাওয়া যায় না ঋতু। আমার একটা কাজ করতে হবে।"


"তো করো, সমস্যা কি? এতে চিন্তা'র কি আছে?"


"আসলে চেয়েছিলাম একটা ব্যাবসা শুরু করবো। তুমি কি বলো?"


"এটা তো ভালো আইডিয়া। শুরু করো।"


এবার জসিম ঋতু'কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললো, 


"আসলে ব্যাবসা করতে তো ক্যাশ লাগে। আমার কাছে তো টাকা-পয়সা নেই। যদি তুমি দিতে, ব্যাবসায় লাভ হলে আস্তে আস্তে তোমার টাকা পরিশোধ করে দিতাম।"


ঋতু জসিমে'র উষ্ণতা'র ছোঁয়া পেয়ে পরম আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেললো। কিছু একটা ভেবে অভিমানী কন্ঠে বললো, 


"এভাবে বলছো কেনো জসিম। আমার টাকা মানেই তো তোমার টাকা।"


"তবুও..."


জসিমে'কে থামিয়ে দিয়ে, গাল টেনে ঋতু আদুরে সুরে বললো, 


"এজন্য বুঝি আমার বাবুটা'র মন খারাপ।তোমার এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তুমি ব্যাবসা শুরু করো। টাকা'র ব্যবস্থা হয়ে যাবে।"


জসিম আবেগাপ্লুত হয়ে, ঋতু'কে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো। ঋতু নিজে'কে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললো,


"এ্যাই কি করছো এখন? ছাড়ো আমাকে, সারাদিন শুধু দুষ্টমি না! কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে'তো।"


জসিম বাঁকা হেসে ছেড়ে দিলো ঋতু'কে। ঋতু জসিমে'র হাতে একটা মগ দিয়ে, নিজেও একটা নিলো। জসিম ফুউউ দিয়ে লম্বা চুমুক দিলো কফিতে। 

.

.

দুপুরের খাবার জন্য এক ঘন্টা'র জন্য, ক্লান্ত দেহ, বিষন্ন মন নিয়ে বাসায় ফিরলো আদিব। বাসায় এসে মা'কে ভিডিও কল দিলো। কয়েক মাস আগে মা'কে একটা এনড্রোয়ে'ট ফোন পাঠিয়েছে।

সারাটাদিন সময় হয়ে উঠেনি, এখন একটু সময় করে মা-মেয়েটার অবয়া'টা দেখারা জন্য মনটা ছ'ট'ফ'ট করছে। 

দু'বার কল দিতেই হাঁপাতে হাঁপাতে রিসিভ করলো সুমনা বেগম। নাতনী'র পিছনে ছুটতে ছুটতে হাঁপিয়ে গিয়েছে তিনি। মা'কে এমন হাঁপাতে দেখে মন ক্ষুণ্ন হলো আদিবের। সারাজীবন গেলো বয়স্ক মহিলা'রা দুঃখে দুঃখে! শেষ বয়সটায় ও একটু শান্তি পেলো না। এখন শরীর'টাও তো ভালো যাচ্ছে না। মুহুর্তে'ই মা'কে হারানো'র ভয়ে কলিজা'টা মোচড় দিয়ে উঠলো আদিবের। পৃথিবীতে আপন বলতে আছে শুধু "মা"টা। তাকে হারালে সে বাঁচবে কি নিয়ে?

 আর কিছু হারানো'র ক্ষমতা কিংবা শক্তি দু'টোই একেবারেই নেই তার। এসব যখন ভাবছে আদিব। সুমনা বেগম কোমলমাখা স্নেহময়ী কণ্ঠে বললো, 


"আদিব....?"


ভাবনার সুতো ছিঁড়েলো আদিবে'র। মায়ের মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো, 


"কেমন আছো মা? শরীর ভালো যাচ্ছে তোমার? ভালো ডাক্তার দেখাতে বললাম তাও দেখাচ্ছো না কেনো?"


"আমি একদম ভালো আছি বাবা। তুই চিন্তা করিস না তো। খেয়েছিস দুপুরে? এত শুকিয়ে যাচ্ছিস দিন দিন, খাওয়া-ধাওয়া কি ছেড়ে দিয়েছিস? একদম চিন্তা করিসনা। উপরওয়ালা নিশ্চয়ই উওম পরিকল্পনা'কারী!" তিনি বান্দা'র ভালো'র জন্য'ই সবকিছু সিদ্ধান্ত নেয়। তার উপরে কারো হাত নেই বাবা।"


"আমি ঠিক আছি মা। শুকিয়ে যাইনি তো,আগের মতো'ই আছি। মায়েদের চোখে সব সন্তান'রা শুকনো আজীবন! বলে হাসলো আদিব।


মা-মেয়ের সাথে অনেক'টা সময় কথা বললো। তারপর সব ভেবে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিলো, আগামী মাসে বাড়ি'তে চলে যাবে একেবারে। কতদিন মা'কে সামনাসামনি দেখা হয়না। খুব শীগ্রই বাড়ি যেতে হবে তার।

 মা-কে গিয়ে ভালো ডক্টর দেখাতে হবে। মা'কে অনেক দিন বাঁচতে হবে! শেষ বয়সটা'য় মা'কে একটু শান্তি দেওয়া দরকার।


#চলবে


[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ! ]


রিচেক করিনি ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেমন হয়েছে জানাবেন.....#অন্ধ_বিশ্বাস 


#writer_sumaiya_afrin_oishi 


#পর্বঃ৫


আজ'কে দুই দিন চলছে আদিব বাড়িতে এসেছে। বাসায় যেন মন টিকছে না তার, কোথাও যেন কারো শূন্যতা অনুভব হচ্ছে। সময়টা বিকেলে। আদিব নিজের রুমে চোখ বন্ধ করে সুয়ে আছে। কিন্তু বারবার চিরচেনা ঋতু'র মুখটা চোখের সামনে ভাসছে। দ্রুত চোখ খুলে ফেললো সে। নিজের অনুভূতি নিয়ে নিজে'রই রাগ হচ্ছে। ঘৃণা করে সে ঋতু নামক বিষাক্ত নারী'টা কে। তবে কেনো বারবার তার কথা মনে পড়ছে? উওর'টা অজানা তার কাছে।বিষাক্ত নারী'র বিষক্রিয়া যেন ভিতরটা জ্ব'লে-পু'ড়ে খা'ক হয়ে গিয়েছে তার। লম্বা কয়েকটা শ্বাস নিয়ে রুমে'র আশপাশে দৃষ্টি বুলালো আদিব। নিজে'র রুমটা'য় মনে হচ্ছে তীব্র হাহাকার বিরাজমান! মস্তিষ্কে পুরনো স্মৃতি গুলো জাগ্রত হচ্ছে বারংবার। বিছনার অপর পাশ'টা খালি খালি লাগছে। এই রুমে কতশত স্মৃতি রয়েছে তাদের, অথচ মানুষটা আর তার নেই। আবার ও চোখ বন্ধ করে নিলো আদিব। আনমনে বললো, 


"সত্যি কি মনে পড়া বারণ !!

তোমার স্পর্শ, তোমার হাসি আর খোঁপা বাঁধানো চুল গুলো। হঠাৎ করে আমাকে তোমার কথা মনে পড়ায়।

সময়টা বড্ড অভিমানে কাটছে, তোমাকে ভুলার কথা ভেবে নয়। বরং তোমার সাথে কাটানো ঐ মুহুর্তক্ষণ আমাকে আরো বেশি ভাবাচ্ছে আজও। 

একটা প্রশ্ন আমার মনকে বারবার জিজ্ঞেস করি, আসলে অচেনা মানুষগুলো কেনো জীবনে আসে আবার মন ভেঙ্গে অদেখা দেশে পাড়ি জমাই। আমার আজোও বোধগম্য হলো না প্রশ্নটার উত্তর।   

মিথ্যাে ছিলো না কোনো কিছুই রুপ, দেখানো স্বপ্ন আর ভালো লাগাটা। সময়ের অজুহাতেই চেনা মানুষটা এক পলকেই অচেনার আসনে বন্ধি করে নেওয়া।  

বড্ড অভিমান হচ্ছে অচেনা মানুষটার জন্য। এখনো মিস করি ঐ হারানো অভিমানিটাকে। কারণ, সুন্দর করে ভালোবেসে মন ভাঙ্গানোটাতো শিখিয়েছো তুমি আমাকে।" 


 হঠাৎ পিঠে কারো ছোট ছোট হাতের স্পর্শ অনুভব করে, চোখ খুললো আদিব। ছোট্ট আদিবা'কে দেখে মৃদু হেসে বুকের মধ্যে নিয়ে নিলো। কিয়াৎক্ষণ পরে আদিবা বাবা'র নিকট বায়না ধরে বললো, 


"আব্বু আমি আম্মুর কাছে যাবো।আম্মু কোথায় গিয়েছে, এখন আসে না কেন?আমাকে আম্মুর কাছে নিয়ে চলো আব্বু!"


চমকে উঠলো আদিব, মুহূর্তেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। বুক চিরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসলো। কি বলবে সে? এসবের কি উত্তর দিবে সে!

 আজ মা থাকতেও যে, মা হারা মেয়ে'টা।

আদিবা বাবা'র মুখে দিয়ে তাকিয়ে রইলো উওর শুনবার আশায়। আদিব কিছু বলতে পারলো না,

 কথা ভুলানো জন্য নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে কার্টুন বের করে বললো,


"আম্মু আসো আমরা কার্টুন দেখি। এই দেখো কত ছোট ছোট বাবু!আমার কিউট আম্মুটা'র মতো।"


আদিবা উৎফুল্লি'তো হয়ে উঠলো, মোবাইলটা হাতে নিয়ে মনযোগ দিয়ে কার্টুন দেখছে আর হাসছে। আদিব মেয়ে'কে রেখে উঠে, ফ্রেশ হয়ে নিলো। আজকেই মা'কে নিয়ে ডক্টরে'র কাছে যাবে সে।

.

.

ঋতু উদাসীন হয়ে, ক্লান্ত শরীরে রান্না করছে রাতের জন্য। ইদানীং প্রায় সময়ই তার মাথা, হাড় ও সন্ধিস্হলে ব্যাথা করছে। শরীরে যেন একেবারে শক্তি পাচ্ছে না। খাওয়ার প্রতি অনিহা, বমি বমি ভাব। এক মাসের মধ্যে ওজন অনেকটা কমে গিয়েছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তার উপরে জসিমে'র আচরণের পরিবর্তন। ঋতু'র টাকা নিয়ে ট্রেডার্সে'র ব্যাবসা শুরু করেছে জসিম। তারপর থেকেই জসিমে'র আচার ব্যবহার অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। অ'ক'থ্য ভাষায় গালাগালি করে তাকে। 

আজকাল তার ডাক নাম হয়েছে, খান.. মা..!

 সব মিলিয়ে প্রচুর ডি'প্রে'শ'নে আছে ঋতু। 

তবে কি জসিমে'র কাছে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছে? সবকিছু ছিলো কী তবে লোক দেখানো? নাকি বরাবরই তার টাকা'র প্রতি লো'ভ ছিলো...!

হয়তো টাকার জন্যই এমন'টা করেছে। টাকা নেওয়া শেষ, ভালোবাসা ও শেষ!

 আজ ভাবছে এসব ঋতু। তার যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। এখন মুখ বুঝে সহ্য করা ছাড়া যে কোনো উপায় নেই। সবরকমে'র পথ নিজে'র হাতে বন্ধ করে দিয়েছে। 

 ইদানীং আদিব'কে বারবার মনে পড়ছে। এত অসুস্থ্য শরীর দেখেও জসিমে'র মধ্যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া নেই। অথচ আবিদ তার একটু ঠান্ডা লাগলেই পা'গ'ল হয়ে যেতো। সেই মানুষটা'র সাথেই বে'ঈ'মা'নী করেছে সে! আজ, এখন, প্রতিনিয়ত আফসোস হচ্ছে তার। আদিবের কথা মনে পড়তেই চোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে তার।

তরকারি'র পোড়া গন্ধ নাকে আসতেই হকচকিয়ে উঠলো ঋতু। তরকারির সাথে সাথে তার মনটাও পু'ড়'ছে প্রতিনিয়ত।

.

দু'টো মাস কেটে গেলো। ডক্টর দেখানোর পরে আরো বেশি অসুস্থ্য হয়ে পড়ছে সুমনা বেগম। নিজের কাজ ও করতে পারছে না আজকাল। আদিবা'র খেয়াল ও মা কে দেখাশোনার জন্য একজন মানুষ রেখেছে আদিব। তাকে প্রচুর ব্যস্ত৷ থাকতে হয়, কেননা বাজারের মধ্যে ছোট্ট একটা কাপড়ের দোকান দিয়েছে একমাসের মতো হয়েছে। মধ্যবিও পুরুষ'রা কি আর দু'বেলা বসে খেতে পারে। যেমন করেই হোক তাদের সংসারে বোঝা বহন করতে'ই হবে। 

সারাদিন একহাতে দোকান সামলিয়ে রাত আটটা'য় ক্লান্ত শরীরে বাসায় আসলো আদিব।

বাসায় আসতেই মনে হয় তার একান্তই একজন মানুষ দরকার।

এইযে ক্লান্ত শরীরে'র নিয়ে বাসায় ফিরলো, এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এগিয়ে দিবার জন্যও হলেও একজন মানুষ দরকার হয়। নিজের কাজ গুলো গুছিয়ে দিবার জন্য একটা "তুমি"র দরকার পড়ে। একাকিত্বে'র সঙ্গ হিসেবে হলেও একজন নিজে'র মানুষ দরকার। কিন্তু একবার ভ'য়ং'ক'র ভাবে ঠকে যাওয়া মানুষ গুলো যে, আর দ্বিতৃয় বার কাউকে বিশ্বাস কিংবা ভরসা করতে পারে না। তাদের যে ভয় হয়, মারাত্মক ভাবে ভয় হয়। যতবার সুমনা বেগম আদিবকে বিয়ের কথা বলেছে ততবারই আ'ত'ঙ্কে উঠেছে আদিব। বিয়ের কথা শুনলে'ই মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে যায় তার, কপালে পড়ে চিন্তার রেখা। সুমনা বেগম ছেলে''কে জোর করে না। ছেলেকে সময় দিচ্ছে নিজে'কে সামলানোর। 


আদিব কিছুক্ষণ পরে ফ্রেশ হয়ে মায়ের রুমে আসলো। সুমনা বেগম বিচলিত ভঙ্গিতে সুয়ে আছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি দ'ম ফুরিয়ে যাবে তার। আদিবা দাদির পাশে বসে গেমস খেলছে মোবাইলে। বাবা'কে দেখা মাএ'ই "আব্বু" বলে ঝাপিয়ে পড়লো বাবা'র কোলে। আদিব মেয়ে'কে কোলে নিয়ে আদর করে দিলো। মেয়েও বাবা'র কপালে চুমু খেলো। সারাদিন ক্লান্ত শরীর'কে সতেজ করতে এটা'ই যেন যথেষ্ট। মেয়ে তার কথার ফুল ঝুড়ি নিয়ে বসলো বাবার কাছে, সারাদিন পরে এইটুকু যেন মানসিক শান্তি'র কারণ আদিবে'র।অতঃপর মা'কে ক্ষীণ কন্ঠে ডাকলো।


ছেলে'র কণ্ঠে "মা", কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই নড়েচড়ে উঠলো তিনি। ক্লান্ত কন্ঠে বললো,


"বাবা আসছো তুই। কখন আসলি? 


মায়ের পাশে বসে, কপালে হাত দিয়ে বললো, 


"এইতো মা, মাএ'ই আসলাম। ঔষধ খেয়েছো তুমি?"


"হ্যাঁ বাবা খেয়েছি।"


" কালকে একবার ডক্টরে'র কাছে নিয়ে যাবো তোমাকে। এখন শরীর কেমন লাগছে মা?"


ছেলের একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মৃদু স্বরে সুমনা বেগম বললো,


"আর শরীর..! সময় ফুরিয়ে আসছে আমার। বেশি দিন আর বাঁচব নারে বাবা। তার আগে তোর জীবন'টা গুছিয়ে দিতে চাই। বিয়েটা করে নে বাবা। জীবনটা'কে আর একটা সুযোগ দে। সব মেয়ে এক না'রে।

তোর একটা পথ হলে ম'রে গেলেও শান্তি পাবো। আর না করিস না। আমি ম'রে গেলে এই ছোট্ট আদিবা'র কী

হবে? কে দেখে রাখবে মেয়ে'টাকে। তোর বা কি হবে?"


ছোট আদিবা একবার বাবার মুখের দিকে তাকায় আবার দাদির মুখের দিকে তাকালো। তার ছোট্ট মস্তিষ্কে এসব যেন কিছু বোধগম্য হচ্ছে না। সে নিশ্চুপ হয়ে, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। 

আদিব নড়েচড়ে বসে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো, 


"ছিঁ! মা এসব কি বলছো? তোমার কিছু হবে না আমি থাকতে।"


সুমনা বেগম নিজের হাত ছাড়িয়ে বাচ্চাদের মতো মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, নিশ্চুপ হয়ে রইলো। কারণ উত্তর পায়নি সে, বরাবরের মতো আদিব বিয়ে'র বিষয়টা এড়িয়ে যায়। মনেমনে অভিমান হলো সুমনা বেগমে'র।


আদিব দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে কিছু একটা ভাবলো। মা'কে আর কোনো প্রকার কষ্ট দিতে চায় না আদিব। মায়ের শেষ বয়সটায় সেবা, যত্ন করার জন্য, মেয়ে'টা দেখার জন্য হলেও ব্যক্তিগত একজন নারী'র প্রয়োজন। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়ে, থমথম মুডে হ্যাঁ বলে দিলো। সে বিয়ে করবে। মায়ের পছন্দ অনুযায়ী করবে। সুমনা বেগমে'র মুখে হাসি ফুটলো। মনেমনে অনেক আগে পাশে'র গ্রামে'র একটা মেয়ে ঠিক করে রেখেছে ছেলে'র জন্য, তার সাথেই বিয়ে দিবে সিদ্ধান্ত নিলো। 

 আদিব গম্ভীর মুডেই মেয়ে'কে বসিয়ে রেখে উঠে রান্না ঘরে চলে গেলো, রাতের জন্য রান্না করবে বলে। মা'কে কিচ্ছুটি কাজ করতে দেয় না আদিব, বাড়িতে আসার পর থেকে। রান্না ঘরে এসে'ই চোখ দু'টো জ্বলছে তার। কে জানতো তাকে দ্বিতীয়'বারের মতো আবার ও বিয়ে করতে হবে।সে তো খুব করে এক নারী'তে আসক্ত হতে চেয়ে ছিলো...! সৃষ্টিকর্তা কি তবে স্বয়ং, এটা লিখে রেখেছে তার ভাগ্যে? হতাশার শ্বাস ফেলে রান্নায় মনোযোগ দিলো আদিব।

.

.

রাত এগারোটায় জসিম বাসায় আসলো। ঋতু অচেতন দেহটা টানতে টানতে দরজা খুললো। জসিম ঋতু'কে পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢুকলো, একটা বাক্য ব্যয় করলো না দু'জনার কেউ। ঋতু ভারী কয়েকটা শ্বাস ছেড়ে দরজা লাগিয়ে খাবার বাড়তে গেলো। তার শরীর দিনদিন খারাপ থেকে খারাপে'র দিকে। আগের সৌন্দর্য আর নেই। শরীর শুকিয়ে গিয়ে, চামড়া খসখসে হয়ে গিয়েছে। অনেক বলার পরে জসিম তিন হাজার টাকা দিয়েছিলো, তা দিয়ে

গতমাসে একবার ডক্টর দেখিয়েছিলো। কিন্তু ফলাফল শূন্য, কোনো উপকার পেলো না।

.

ঋতু জসিমে'কে খাবার দিয়ে ভয়ে, ভয়ে পাশে দাঁড়িয়ে রইলো।  

 আজকাল জসিম'কে প্রচন্ড ভয় পায় ঋতু। না জানি আবার কখন গালাগালি শুনতে হয়। জসিম এসে খেতে বসলো একাই। একবার জিজ্ঞেস করলো না পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে, "সে খেয়েছে কিনা"।

জসিম একটু ভাত মুখে নিয়েই নাক-মুখ কুঁচকে। তা দেখে আতঙ্কিত হয়ে উঠলো ঋতু, ফাঁকা ঢোক গিললো। তার আগেই বিকট শব্দ হলো। জসীম ভাতে'র প্লেট ছুঁড়ে মারলো ফ্লোরে। ভাত, তরকারি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঋতু'র গায়ে পড়লো। জসিম দ্রুত পায়ে এসে ঋতু'র চুলের মুঠি ধরে বললো, 


" খান.. মা...! রান্না করার সময়, তোর মন থাকে কোথায় আজকাল? নাকি আবার কোনো নতুন ভা'তা'র ধরছো মা..। আমার কষ্ট করা আনা টাকা দিয়ে বাজার করি, আর তুই অখাদ্য-কুখাদ্য রান্না করিস। সারাদিন রোগের বাহানা করো....! আজ তোর সব রোগ ছাড়িয়ে দিবো। বলেই আরো জোরে চুল টান দিলো জসিম। পিঠে পড়লো শক্ত-পোক্ত পুরুষালী'র হাতের অগণিত থা'প্প'ড়। 


ঋতু আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো তার শরীর। এই জসিম কে? এই জসিম'কে তো চিনে না ঋতু.! চোখ দিয়ে অশ্রু গুলো গড়িয়ে পড়ছে তার। জসিম'কে অনুনয় করে বললো, 


"প্লিজ আমাকে ছেড়ে দেও! আমি ব্যথা পাচ্ছি জসিম। তরকারি তো ঠিক'ই ছিলো তবুও এমন করছো কেনো? না-কি তোমার তোমার জীবন থেকে আমার সময় ফুরিয়ে গিয়েছে? আমার টাকা গুলো নিবার পর থেকে, কেমন করে পাল্টে গেলে তুমি।"


জসিম ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো ঋতু'কে। ছিঁটকে দেয়ালের সাথে পড়লো, যার ফলে মাথায় আঘাত পেলো। জসিম অদ্ভুত মানবে'র মতো হেসে বললো, 


" তোর মতো বারো ভা'তা'রি'কে আমার জীবনে প্রয়োজন নেই। বাঁচতে চাইলে আমার জীবন থেকে মুক্তি নিয়ে চলে যা। ভুলে যাস না, আমার বউ, বাচ্চা আছে। আর টাকা হাহা..!

তোর কাছে কোনো প্রমাণ আছে?এগুলো আমার টাকা। পুনরায় এই কথা বললে জা'নে মেরে ফেলবো...!


রক্তিম চোখে তাকিয়ে রুমে চলে গেলো জসিম। এদিকে ঋতু স্তব্ধ হয়ে পড়ে রইলো। তার মাথা যেন ঘুরছে। মস্তিষ্ক অচল হয়ে গেলো , আস্তে আস্তে চোখ দু'টো বন্ধ হয়ে সেন্সলেস হয়ে গেলো। 

গভীর রাতে হুস ফিরতেই নিজেকে আগে'র জায়গায় আবিষ্কার করলো ঋতু। মুহুর্তেই মনে পড়লো জসিমে'র আচরণ।

নিজে'র দেহটা কোনো রকম উঠিয়ে চোখে'র জল ফেলতে ফেলতে মেঝেতে'র ছড়িয়ে থাকা ভাত গুলো তুলে ফেললো। মাথায় পানি দিয়ে রুমে এসে দেখতে পেলো, জসিম কারো সাথে হেসে হেসে ফোনালাপ করছে। তবে কি সৃষ্টিকর্তা তার কর্মে'র ফল ব্যাক দিচ্ছে। আদিবে'র সাথে করা অন্যায়ে'র শাস্তি কি তাহলে এগুলো? নাকি আরো বাকি আছে? ভাবতেই কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে ঋতু'র। মরীচিকা'র পিছনে ছুটে আসল হীরা যে হারিয়ে ফেলছে সে, তা এখন হারে হারে টের পাচ্ছে। 

হায় আফসোস...! 

হায় আফসোস...! করতে করতে আবারো মাথাটা যন্ত্রণা করছে।

চোখের সামনে ছোট্ট আবিদার মুখটা ভেসে আসলো বারংবার। মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নিবার জন্য বুকটা হাহাকার করছে আজ...! নিজের করা কর্মে'র জন্য ভীষণ রকমের আফসোস হচ্ছে। কিন্তু সময় থাকতে নিজেকে না শুধরা'লে সারাজীবন হা-হুতাশ করেও লাভ হবে না....! হারানো জিনিস আর ফিরে পাওয়া যায় না। 


চলবে......


[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ! ]


ব্যস্ততার জন্য কালকে দিতে পারিনি। আজও তাড়াতাড়ি দিতে পারলাম না, তার জন্য বিশাল স্যরি!! কেমন হয়েছে বলবেন। রিচেক করিনি ভুল ত্রুটি সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন!....

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url