#অন্ধ_বিশ্বাস
#writer_sumaiya_afrin_oishi
#পর্বঃ৯+১০+শেষ পর্ব
নতুন দাম্পত্যে'দের জীবন থেকে সপ্তাহখানিক সময় অতিবাহিত হয়েছে। সমাজের নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের দু'দিন পড়ে নতুন বউকে নিয়ে আবিদকে শ্বশুর বাড়ি থাকতে হয়েছে দু'দিন। তাদের সাথে ছিলো আবিদাও। এ নিয়ে আবিদের অগোচরে ফারিহাকে অনেকেই খোঁচা দিয়ে কথা বলেছে। "বাচ্চা হবার আগেই বাচ্চার মা" এসব নিয়ে হাসাহাসি করেছে। যদিও ফারিহা এসব গায়ে মাখেনি, মুখ বুঝে হজম করে নিয়েছে। তার ভাগ্যে যা ছিলো তাই হয়েছে, ভাগ্য'কে মেনে নিয়েছে সে।
বিয়ের ঝামেলা সব চুকে গিয়েছে। দু'দিন হয়েছে পুনরায় শ্বশুর বাড়ি এসেছে ফারিহা। বাসায় কেউ নেই, একজন অসুস্থ শ্বাশুড়ি যার নিজেরই হাঁটাচলা করতে কষ্ট হচ্ছে। তাই অল্প কয়েকদিনেই সংসারের সমস্ত দায়িত্ব সে নিয়ে নিয়েছে। সাংসারিক কাজকর্ম এসব করতে সে ছোটবেলাই থেকে অভ্যস্ত তাই সংসারের কাজ করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তার।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলো ফারিহা। এরিমধ্যে আবিদাও উঠে গিয়েছে, তাকেও ফ্রেশ করিয়ে কোলে তুলে নিলো। মা-মেয়ে দুজন মিলে তারপর রান্না ঘরে গেলো নাস্তা বানানোর জন্য। ফারিহার পিছনে পিছনে ঘুরছে আর একটু পরপর "আম্মু" "আম্মু" বলে ডাকছে আবিদা। আবার বিভিন্ন আজগুবি কথা বলছে, আবার খিলখিল করে হাসছে মায়ের সাথে ছোট্ট আবিদা।
ফারিহার ও বেশ লাগছে এসব। সে-ও উপভোগ করছে আবিদার কথাবার্তা। দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে আপন মা-মেয়ে। এইকয়দিনেই দুজন দু'জনকে আপন করে নিয়েছে। অবুজ ছোট বাচ্চারা কি আর আপন-পরের ব্যবধান বুঝে। তাদের যারা এজটু বেশী আদর করবে তাদের পিছনে পিছনে সারাদিন ছুটবে। বাধ্যগত ভাবে তার সব কথা মেনে নিবে। ফারিহা রুটি ছেঁকতে ছেঁকতে আবিদাকে বললো,
" আবিদা আম্মু? দেখে তো তোমার বাবাই ঘুম থেকে উঠছে কিনা?"
আবিদাও বাধ্য মেয়ের মতো ছুটে বাবা-র রুমে গেলো। চেয়ার বসে উচ্ছাস নিয়ে এসব দেখছে সুমনা বেগম। কতদিন পড়ে তার নাতনী'টা আবার প্রা'ণ ফিরে পেয়েছে। মনে হচ্ছে এই বাসাটাই হারিয়ে যাওয়া আনন্দে পুনরায় মেতে উঠেছে।
আজ থেকে কর্ম জীবনে'র পিছনে ছুটতে হবে আবিদকে। দোকানে অনেক কাজ জমা হয়েছে এতদিনে। তাই আজ সকালেই উঠে রেডি হচ্ছিলো আবিদ। মেয়ে'কে দেখে কোলে তুলে আদর করতে লাগলো আবিদ। আবিদা টেনেহিঁচড়ে কোল থেকে নামতে চাইছে। তা দেখে আবিদ প্রশ্ন করলো,
"কি হয়েছে মা? নড়াচড়া করছো কেনো এতো?"
"আমালে চালো চালো। আমি আম্মু'র কাতে দাবো।"
আবিদ মুচকি হেসে ছেড়ে দিলো। এরিমধ্যে ফারিহা আবিদার জন্য খাবার নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো। আবিদ'কে রেডি দেখে বললো,
"এ্যা মা আপনি তো একদম রেডি। আসুন এবার খেতে চলুন।"
"না এখন খাবার সময় নেই আমার। তোমরা খেয়ে নিও আমি বাহির থেকে খেয়ে নিবো। তাড়া দেখিয়ে যেতে যেতে বললো আবিদ।"
হুট করে ফারিহা আবিদের একটি হাত ধরে আঁটকে দিয়ে বললো,
"বাসা থেকে খেয়ে যান। বাহিরের খাবার শরীরের জন্য ক্ষ'তি'ক'র।"
"একদিন খেলে কিছু হবে না। সময় নেই একদম আজ।"
ফারিহা শুনলো না। সে দ্রুত হাতের খাবার প্লেট থেকে একটুকরো রুটি সাথে ডিম ভাজি নিয়ে আবিদের মুখের সামনে ধরে লাজুক হেসে বললো,
"আমি খাইয়ে দেই। নিন এবার খানতো জলদি।"
আবিদ চমকালো..! দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ফারিহার মুখশ্রী'র পানে। এভাবে প্রথম প্রথম ঋতুও তাকে খাইয়ে দিতো।
হুট করে বুকের মাঝে চিনচিন ব্যথা অনুভব হচ্ছে। মানুষটা আর তার নেই। তার জায়গায় আজ অন্য কেউ। আচ্ছা এতো আদর, যত্ন তার ভাগ্যে সইবেতো না-কি ফারিহাও হারিয়ে যাবে সবার মতো..? ভাবতেই বুকটা ভারী হয়ে গেলো।
"এইযে কি ভাবছেন? নিন হা করুন।"
নম্র মেয়েলী কণ্ঠ শুনে ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসলো আবিদ। তারপরে খেয়ে নিলো মুখের সামনের খাবার টুকু। রুটি চিবাতে চিবাতে আবিদ জিজ্ঞেস করলো,
"মা খেয়েছে? "
"হ্যাঁ আম্মা খাচ্ছে। প্রথমেই আমি খাবার দিয়ে আসছি তাকে।"
"আচ্ছা। তুমিও খেয়ে নিও ঠিক ভাবে। কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে ফোন দিয়ে বলিও।"
"আচ্ছা।"
ফারিহা টুকটাক কথা বলছে আর বাবা- ও তার মেয়ে'কে যত্ন করে খাইয়ে দিচ্ছে। আবিদা হঠাৎ তার ছোট ছোট হাত দিয়ে মায়ের মুখের সামনে একটু রুটি ধরে বললো,
"আম্মু তুমিও কাও।"
ফারিহা মুচকি হেসে খেয়ে নিলো।চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ রইলো একটি সুখী পরিবারের চমৎকার দৃশ্য।
আবিদ খেয়ে মা'কে বলে চলে গেলো দোকানে। ফারিহা আবিদাকে কোলে নিয়ে শ্বাশুড়ির রুুমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"আম্মা ঔষুধ খেয়েছেন?"
"হ্যাঁ মা খাইছি। তুমি নাস্তা করছো?"
"জ্বি আম্মা। আপনার আর কিছু লাগবে?"
"না মা।"
"আচ্ছা আমি রান্না ঘরে আছি। কিছু দরকার হলে সাথে সাথে আমাকে বলিয়েন। খবরদার একা একা করতে যাবেন না।"
ফারিহার কথায় হাসলো সুমনা বেগম। এই হাসি একদম ভিতর থেকে তৃপ্তিময় হাসি। আহা কি স্নিগ্ধ মায়েদের হাসি..! মায়েদের হাসি এওো সুন্দর কেনো? এই হাসি স্বচ্ছ, টলটলে। নেই কোনো কৃএিমতা'র ছাপ। মেয়েটা এই কয়েকদিনে তার যত্নের কোনো ত্রুটি রাখেনি।
.
.
.
বস্তিতে এক গাছের ছায়ার নিচে ক্লান্ত দেহ নিয়ে বসে আছে ঋতু। রাজকীয় বিলাসবহুল ঘর ছেড়ে আজ তার জায়গা মিলেছে কোনো এক জীর্ণ-শীর্ণ বস্তিতে। শেষ অবধি এখানেও থাকতে পারবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। চারদিকে একবার উদাসীন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্হির নয়নে খোলা আকাশে দিকে তাকিয়ে রইলো ঋতু।
শরীর আগে থেকেই খারাপ যাচ্ছিলো তার। সেই সমস্যাগুলো আরো গুরুতর হচ্ছে দিনদিন।
মানসিক, শারীরিক কন্ডিশন মোটেও ভালো যাচ্ছে না ঋতু'র। তাদের দ্বিতীয় বি'চ্ছে'দের আজ আটদিন অতিবাহিত হতে চলছে। এই আটদিনে চেহারায় বয়সের ছাপ পড়ে গিয়েছে স্পষ্ট। তার দেহটা শুধু বেঁচে আছে পৃথিবীতে, আ'ত্মা'টাতো ম'রে গিয়েছে সেই কবেই। যেদিন জসিম চোখে বুড়ো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তার জীবনে আসল মানুষ কে ছিলো। সেদিনই ভিতর থেকে ম'রে গিয়েছে ঋতু নামক মেয়েটা।
প্রতি মুহুর্তে অ'নু'শো'চ'না'র আগুনে ঝ'ল'সে যাচ্ছে ভিতরটা। যা কেউ অনুভব করছে না। বুক থেকে প্রতিনিয়ত ভারি কতগুলো দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়া আর কিছু করা'র নেই তার। হাতে অবশিষ্ট বলতে কিছু রইলো না। ঠুনকো কিছু আবেগকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজ হাতে বাকি জীবনটা ত'ছ'ন'ছ করে দিয়েছে সে। জীবনে কিছু ভুলে'র বোঝা আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। এই শহরের প্রতিটি আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে এমন হাজারো ব্যর্থ জীবনের গল্প। প্রতিমুহূর্ত মরণ যন্ত্রণায় ছ'ট'ফ'ট করছে ব্যর্থ মানুষগুলো। আবিদের সাথে করা অন্যায়গুলো ভিতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে হৃদয়টা র'ক্তা'ক্ত করে দিচ্ছে মেয়ে'টার। বারবার মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে সে একজন চরমভাবে ব্যর্থ রমনী। বেঁচে থাকার মতো সকল অবলম্বন, নিজস্ব সঙ্গী, সন্তান, সংসার প্রয়োজনীয় সবকিছু হারিয়ে আজ একেবারে নিঃস্ব ঋতু। নিজেকে দুনিয়ায় সবথেকে অ'ভা'গী মনে হচ্ছে। যার প্রাপ্তির ঝুলিটা একেবারে শূন্যের কোঠায়।
হঠাৎ চোখ পড়লো আকাশে দু'টো পাখি এক সাথে উড়ে বেড়াচ্ছে। একটা পাখি আগে উড়ছে আর একটা পাখি পিছনে। ঋতুর মনে হচ্ছে পিছনে থাকা পাখিটা আবিদ আর অন্যটা সে। একটা সময় আবিদও তো তার পিছনে পিছনে এভাবে ছুটতো। সেদিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঋতু মনেমনে বিড়বিড় করে বললো,
"জানো আবিদ?তুমি হেরে গিয়েও জিতে গেছো..! তুমি হেরে গিয়েছো আমার ছ'ল'না আর ঠুনকো অন্ধ বিশ্বাসে'র কাছে। আর আমি ভ'য়ংক'র ভাবে হেরে গিয়েছি ভাগ্যের কাছে।
অন্ধ বিশ্বাসের জন্য সাময়িক কষ্ট পেলেও গোটা আস্ত একটা লাইফ তোমার জন্য রয়ে গিয়েছে। আর আমি সবকূল হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব আজ...!
দীর্ঘ একটা আফসোস প্রতিনিয়ত আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে ..! আমি তোমায় হৃদয় উজাড় করে ভালোবাসতে পারলাম না। তোমায় ইচ্ছে মতো ভালোবাসতে পারাটা আমার আর হলো না। তুমি অন্য কারো জন্যই সঠিক, তাইতো তোমাকে আর নিজের করে পেলাম না।
তোমাকে ভালোবেসে আমার কোনো কষ্ট নেই। তোমার প্রতি আমার হাজারটা অভিযোগও নেই..! শুধু আফসোসের একটা "দীর্ঘশ্বাস" সারাজীবন থাকবে বক্ষ পিঞ্জরে! তোমায় মন ভরে ভালোবাসাটা ইহজন্মে আর হলো না বলে..!"
থামলো ঋতু।নিজের একান্ত কথা গুলো ঐ খোলা আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছে। ইশশ কত সুখময়, স্নিগ্ধ ছিলো সেই দিন গুলো। সব আজও চোখের সামনে ভাসছে। শুধু মানুষটাকে সে ছেড়ে দিয়েছে। এখন আর চাইলেও পাওয়া যাবে না।
আচ্ছা..! সৃষ্টিকর্তা তাদের পথ চলাটা আরো একটু দীর্ঘ করতে পারতো না? ভাবতেই চোখ দু'টো ঝাপসা হয়ে গেলো।
"কি গো মাইয়া? এহানে এমনে বইসাছোছ ক্যান? তুমি না ডাক্তার দেখাইবার জন্য যাও? এইডাই কইলা না সক্কালে আমারে।"
কারো কথা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসলো ঋতু। দেখতে পেলো এক মাঝ বয়সী এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে। যে ভ্রু কুঁচকে উত্তর পাওয়ার জন্য তার দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে। পথ থেকে এই মহিলার নিকট আশ্রয় পেয়েছে সে। যদিও টাকা'র বিনিময়ে থাকছে তার টিনের ছোট্ট ঘরটায়। তবুও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে এই বয়স্ক মহিলার নিকট। অন্ততো একজন মানুষ তার খোঁজ নিচ্ছে নিজ থেকে। কৃতজ্ঞ নয়নে মহিলার দিকে তাকিয়ে রইলো ঋতু।
মহিলা অধৈর্য হয়ে পুনরায় বললো,
"কি গো কথা কইবার আছো না ক্যান?"
চোখের জলটুকু মুছে মলিন কন্ঠে ঋতু বললো,
" এইতো খালা যাবো এখন। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিলো তাই একটু জিরিয়ে নিলাম এখানে।"
"যাও এহন মেলা ব্যালা হইছে। দেরী হইলে ডাক্তার পাইবা না।"
" আর ডাক্তার..! না পেলেও সমস্যা নেই। ডাক্তারা তো বড়জোড় শরীরে'র ক্ষ'ত সারতে পারে খালা। মনে যে বিষাক্ত হাজারো ক্ষ'ত আছে তা কি দেখবে ডক্টর'রা খালা?"
"এত শক্ত কথা বুঝবার পারি না বাপু। একটু খোলসা করে কওতো দেখিনি?"
"কি শুনবে খালা? নিজের পুরো একটা জীবন আমি নিজের হাতেই নষ্ট করে দিয়েছি। না বাঁচার মতো বেঁচে থাকছি, না মৃ'ত্যুর পর ভালো থাকবো সেইরকম কিছু করছি। শুধুমাত্র দুশ্চিন্তা ভর্তি মাথা নিয়ে কোনরকম দিনগুলোকে পারি দিয়ে যাচ্ছি। না ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি, না বর্তমান সময়ে ভালো আছি। অতীত নিয়ে তো আর আলাদাভাবে বলার কোনো অবকাশই নেই আমার কাছে। আমি নিজেই জানি না, কি করছি বা কি করা উচিত আমার! আমি এটাও জানি না, কি হচ্ছে আমার সাথে কিংবা আরো কত কি হওয়ার বাকি আছে সামনের দিকে।
যাইহোক এভার যাচ্ছি খালা।"
ঋতু আর একমুহূর্ত দেরি করলো না, হাঁটা দিলো সামনের দিকে। পিছনে থাকা মহিলার বোধগম্য হলো না ঋতু'র কথা। সে নি'র্বোধের মতো তাকিয়ে ঋতু'র যাওয়া দেখছে। তবে এটুকু বুঝলো মেয়েটার এক আকাশ সমান কষ্ট বুকে।
ব্যস্ত শহরের সাথে মানুষ গুলো ও ব্যস্ত। কাউকে নিয়ে ভাবনার এতো সময় নেই কারো। মহিলা আর ভাবলো না, নিজের কাজের উদ্দেশ্য চলে গেলো। কেননা একবেলা কাজ না করলে পেটে আর খাবার জুটবে না। এই শহরে শূন্য পকট থাকলে কেউ কারো নয়। টাকা থাকলে দুনিয়ায়র সমস্ত বিলাসিতা হাতের নাগালে।
.
বস্তি ছেড়ে হেঁটে হেঁটে শহরে এসেছে ঋতু। জসিমে'র দেওয়া কাবিনের শেষ অবলম্বনটুকু ঋতু'র কাছে রয়েছে।প্রথমে ব্যাংক থেকে কিছু টাকা তুলে নিলো তা দিয়ে ডক্টর দেখাবে। তাকে দেখাবার মতো আর কেউ রইলো না, নিজেকে বাঁচাতে হলেও কিছু একটা কাজ করতে হবে। তার আগে সুস্থ হয়ে নেওয়াটা অধিক জরুরী। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হসপিটালে এসেছে ঋতু। ডক্টর তাকে কতগুলো টেস্ট দিয়েছে। সেগুলো করে রিপোর্টের জন্য করিডোরে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো। সবার মতো তার এতো তাড়া নেই, নিজের কোনো সঠিক গন্তব্য নেই। গা-ছাড়া ভাবে বসে পড়লো হসপিটালে রাখা একটি চেয়ারে। হঠাৎ দেখতে পেলো ছোট্ট অসুস্থ একটি বাচ্চা মেয়ে'কে কোলে নিয়ে এক মা কান্না করতে করতে দ্রুত ডক্টরের কেবিনের দিকে ছুঁটছে। যা দেখে আবিদা'র কথা খুব মনে পড়ছে তার, বুকটা হাহাকার করছে আজ।
কেমন আছে ছোট্ট মেয়েটা? তার করা কর্মের ভুক্তভুগী আবিদাও। তারা জন্যই তো ছোট্ট মেয়েটা বঞ্চিত হয়েছে মায়ের আদর থেকে। কেমন মা ছিলো সে? আসার কিছু সময় আগেও তো মেয়েটাকে খুব মে'রে'ছি'লো। কখনো ঐভাবে যত্ন নেওয়া হয়নি মেয়ে'টার। আজ বড্ড বুকটা পু''ড়'ছে ঋতু'র। একটু মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নিবার জন্য বুকটা তীব্র হা"হা'কা'র করছে। অথচ আজ মেয়েটা তার থেকে কতদূরে।
মেয়ে'টা কেমন আছে? খোঁজ অবধি জানা নেই তার।
নিজেকে নিজের ঘৃণা হচ্ছে।
ছিঃ! কেমন মা আমি! মা হবার কোনো যোগ্যতা নেই আমার.। আমি মা হিসেবেও চরম ভাবে ব্যর্থ!
পরক্ষণে জসিমে'র প্রতি তীব্র ক্রো'ধ মাথা চাপা দিলো। নিজ হাতে খু'ন করতে ইচ্ছে করে মানুষ রুপি জা'নো'য়া'র'টা'কে। কিন্তু মানুষ চাইলেও সব ইচ্ছে পূরণ করতে পারে না। যদি তার ডাকে সাড়া না দিতো তবে জীবন অন্য রকম হতো তার।
তার ধোঁ'কায় পড়েই তো জীবন থেকে সব কিছু হারিয়েছে সে। আজ শুধু নিজের বলতে আফসোস আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছে মেয়ে'টা। সৃষ্টি-কর্তার নিকট বারংবার বলছে, তার থেকে সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া পুরুষটির নি'র্ম'ম মৃ'ত্যু হোক। ওদের মতো মানুষ পৃথিবীতে বাঁচার কোনো অধিকার রাখে না..! কে জানে সৃষ্টিকর্তা শুনলো কি-না সন্তান হারা এক অ'ভা'গী মায়ের করুণ আ'র্ত'না'দ !
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আভা ছড়িয়ে পড়ছে প্রকৃতিতে। এরি মধ্যে একজন নার্স দ্রুত পায়ে তার নিকট এসে প্রশ্ন করলো,
"আপনি মিস ঋতু?"
"জ্বি।"
"আপনার সব রিপোর্ট রেডি ম্যাম। সেগুলো নিয়ে দ্রুত ডক্টরের কেবিনে চলে যান।"
কথা শেষ করেই আবার দ্রুত ঝ'ড়ে'র গতিতে চলে গেলো নার্স'টি। ঋতু'কে কিছু জিজ্ঞেস করার সময়টুকু অবধি দিলো না। এরা সবাই বিজি। অহেতুক কারো একটু দু'দন্ড সময় নেই কারো খোঁজ নিবার। ঋতু'র মনটা ভীষণ ছ'ট'ফ'ট করছে। রিপোর্টে কি আছে জানার জন্য। ভিতর থেকে অস্হিরতা কাজ করছে তার।
.
রিপোর্ট নিয়ে ডক্টরের সামনে বসে আছে ঋতু। ডক্টর কপালে ভাজ ফেলে অনেকক্ষণ যাবৎ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সবগুলো রিপোর্ট। যা দেখে ঋতু ভীষণ নার্ভাস ফিল করছে। তার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গিয়েছে। চিন্তিতো হয়ে ডক্টরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ঋতু।
ডক্টর চারপাশে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হতাশ কণ্ঠে বললো,
"মিস ঋতু? আপনার সাথে কেউ আসেনি?"
"না ডক্টর। পৃথিবীতে আমার আপন বলতে কেউ নেই। যা বলার আমাকে বলুন।"
ডক্টর কোনো ভনিতা ছাড়াই বললো,
"আপনার অবস্থা খুবই শো'চ'নীয় ঋতু। আপনার রিপোর্ট খুবই খারাপ। আরো আগে আসা উচিত ছিলো আপনার। আপনার ব্লা'ড ক্যা'ন্সা'র হয়েছে। যা সমস্ত ব্লা'ডে ছড়িয়ে পড়ছে।"
ডক্টরে কথা শুনে উওেজিত হয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো ঋতু। ঋতু'র চারপাশে যেন প্রতিধ্বনি হচ্ছে, "আপনার ব্লা'ড ক্যা"ন্সা"র হয়েছে"। মুহূর্তেই মস্তিস্ক যেন অচল হয়ে গেলো। বিশাল এই আকাশটা যেন তার মাথার উপরে ভে'ঙে পড়লো। শরীরে হিমশীতল কিছু প্রবেশ করলো, সাথে সাথে শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো তার। ঋতুর মনে হচ্ছে পায়ের তলা থেকে মাটিটুকু যেন সরে গিয়েছে। আবার মনে হচ্ছে শূন্যে ভাসছে সে। মস্তিস্ক যেন জানান দিচ্ছে বারংবার,
"তোর সময় ফুরিয়ে গিয়েছে ঋতু। তোকে আর পৃথিবীর মাটি চায় না!"
ডক্টর বুঝতে পারলো ঋতু'র মনের অবস্থা। উনি ঋতু'কে ঠান্ডা হতে বললো। ঋতু ধাম করে চেয়ারে বসে পড়লো। ডক্টর পুনরায় আবার বললো,
"শুনুন এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না। মনে সাহস রাখুন।
মন শক্ত করতে পারলে অল্পতে শরীর খারাপ হবে না। যে ক'দিন বেঁচে আছেন নিজের সাথে যু'দ্ধ করে বাঁচতে হবে আপনার।
আর আপনি মানসিক ভাবে ভেঙে পড়লে তো চলবে না মিস।"
ডক্টরের কথা শুনে ঋতু'র মাঝে কোনো ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হলো না। সে ফাঁকা মস্তিষ্কে জিজ্ঞেস করলো,
"এর কোনো চিকিৎসা নেই ডক্টর?"
"বাংলাদেশে ভালো চিকিৎসা নেই। আপনার যে অবস্থা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া প্রয়োজন। তবে ভালো হবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই । এতে অনেক টাকার প্রয়োজন। আনুমানিক ৮-১০ লক্ষ টাকা তো লাগবেই।"
"আমার কাছে এতো টাকা নেই ডক্টর। তবে কি আর বেশি দিন বাঁচবো না আমি?"
"আমার হাতে কিছু করার নেই ঋতু। বেশি বেশি সৃষ্টিকর্তা'কে ডাকুন। উপরওয়ালা চাইলে সুস্থ হতেও পারেন। আপাতত আমি কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি এগুলো নিয়মিত খাবেন।"
______________
এদিকে জসিম নতুন বাইক কিনে মনের আনন্দে শ্বশুর বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আজই ছেলে-মেয়ে ও শীলা'কে নিয়ে আসবে ঢাকায়। ব্যাবসার ঝামেলার জন্য যেতে পারেনি এতদিন। ঝামেলা না হলে সেই কবেই যেতো সে। মনটা যেন সারাক্ষণ তার "শালা" "শীলা" করছে।
পুরুষের কাছে টাকাই সব। আগে টাকা ছিলো না কেউ তাকে দুই-পয়সার দাম দিতো না মানুষ। আজ টাকা আছে সবাই তাকে আলাদা ভাবে সম্মান দিচ্ছে। অথচ আসল টাকাটা কার কেউ জানবার প্রয়োজনবোধ করলো না। বর্তমান সমাজে যার হাতে টাকা ক্ষমতা তার।
পৃথিবীতে এতো সুখময় কেনো? ইশশ জসিম'র নিকট সবকিছু রঙিন মনে হচ্ছে। দ্রুত ব্যাগ ভর্তি ফলমূল, বিভিন্ন দামী দামী জিনিসপএ কিনে নতুন জামাইয়ের মতো ভাব নিয়ে বাইক স্টার্ট দিলো জসিম।
#চলবে........
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ! ]#অন্ধ_বিশ্বাস
#writer_sumaiya_afrin_oishi
#পর্বঃ১০
সবার জীবন থেকে সাত সাত'টি মাস কেটে গেলো । এরিমধ্য পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। আবিদের ছোট্ট দোকানটা এখন অনেক বড় হয়েছে। তার ব্যাবসা দিন দিন উন্নতির দিকে যাচ্ছে। ছোট্ট দোকানটা চেঞ্জ করে অনেক বড় দোকান নিয়েছে আবিদ। নিজের কাজের পাশাপাশি এখন দু'জন কর্মচারী ও রেখেছে দোকানে। কেননা বড় দোকান একা সামলানো যায় না।
নিজে সৎ থেকে, হালাল টাকা দিয়ে কিছু শুরু করলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাতে বরকত ঢেলে দেয়। পরিশ্রমে'র ফল কখনো বিফলে যায় না। প্রতিদিনের মতো আজও আবিদ নাস্তা খেয়ে দোকানে যাবার জন্য রেডি হচ্ছিলো। আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য হঠাৎ শরীর ভালো যাচ্ছে না তার। গতকাল রাত থেকে জ্বর,গলা ব্যথা। শরীর চলছে না যেন, তবুও একবার দোকানে গিয়ে কর্মচারীদের কাজ বুঝিয়ে আসা দরকার।
এরিমধ্যে ফারিহা আবিদে'র জন্য এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে রুমে আসলো। আবিদকে রেডি হতে দেখে মৃদু রাগ দেখিয়ে বললো,
"কি ব্যাপার রেডি হয়ে কই যাচ্ছো?"
"কই আর যাবো? দোকানে।"
আবিদের ভাব শীতল উওর শুনে রেগে গেলো ফারিহা। পুনরায় কণ্ঠে রাগ মিশ্রিত করে বললো,
"তোমার শরীরে প্রচুর জ্বর। এই নিয়ে দোকানে যাবে মানে?"
"মধ্যবিওদের এতটুকু শরীর খারাপে কিছু হয় না। এরা সব সিচুয়েশনে নিজেকে সামলে নিতে জানে। আমার দোকানে কাজ আছে ফারিহা। তবে তাড়াতাড়ি চলে আসবো রাগ করো না কেমন।"
ফারিহা দুধের গ্লাসটা টেবিলের উপরে রেখে হঠাৎ আবিদকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে কোমল কণ্ঠে বললো,
"আমার এতো টাকা চাই না। এই অসুস্থ শরীর নিয়ে তোমার কাজে যেতে হবে না। আগে সুস্থ হও পরে সব হবে।"
"কি কি করছো ফারিহা। যেতে দেও প্লিজ!"
শুনলো না ফারিহা। সে পুনরায় আরো একটু হাতের বাঁধন শক্ত করে ধরে আবেগি কন্ঠে বললো,
"না দিবো না। যাবে না! মানে যাবে না তুমি।"
আবিদ হাসলো। বউয়ের এমন আবেগময় আবদার কি উপেক্ষা করা যায়? হয়তো যায়! তবে আবিদ পারলো না। মেয়েটা তাকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটা বেশীই ভালোবাসে। মাঝে মাঝে আবিদ চিন্তিত হয় আনমনে ভাবে তখন, আসলেই কি এতোটা ভালোবাসা পাবার যোগ্য সে?
এই মানুষটাকে কষ্ট দিতে মন সায় দিলো না তার। আবিদ এক হাতে ফারিহাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বললো,
"আচ্ছা যাবো না। এবার খুশী'তো?"
"হিম খুউব বেশী খুশি হয়েছি।"
আবিদকে চট করে ছেড়ে দুধের গ্লাসটা আবিদের হাতে তুলে দিয়ে ফারিহা বললো,
"নেও ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি খেয়ে নেও।"
আবিদ বাধ্য ছেলের মতো খেয়ে নিলো। ফারিহা ব্যস্ত হয়ে বিছনা ঠিক করছে সেদিকে আবিদ মুগ্ধ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। এই মেয়েটাকে যত দেখে তত মায়া হচ্ছে আবিদের।
ফারিহার ছোট ছোট শাসন, কেয়ার, রাগ,অভিমান, আবদার গুলো আবিদ বেশ উপভোগ করে সে। এই মেয়েটা তাদের গোটা জী'র্ণ'শী'র্ণ ভেঙে যাওয়া পরিবারকে পুনরায় নতুন প্রাণ দিয়েছে। নিস্তেজ হয়ে যাওয় প্রাণগুলো'কে মন খুলে হাসতে শিখিয়েছে।
হঠাৎ আবিদের চোখে চোখ পড়তেই দু'জনার দৃষ্টি এক হয়ে গেলো। আবিদকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জা পেলো ফারিহা। আবিদ বুঝতে পেরে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। তারপর গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে আড় চোখে বারবার দেখছে ফারিহা'কে।
হয়তো সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত নারীদের নিকট রয়েছে অসীম ক্ষমতা।
একজন নারী যেমন একটি পুরুষ'কে নিমিষেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। ঠিক তেমনি কোনো এক মহীয়সী নারী ভেঙে যাওয়া পুরুষটি'কে যত্ন করে, নিজের সর্বোচ্চ ভালোবাসা দিয়ে তাকে পুনরায় উজ্জীবিত করতে পারে। কেননা বেশিরভাগ পুরুষ মানুষ হলো ভালোবাসা'র কা'ঙা'ল! ঘরে-বাইরে হয়রান হয়ে এরা একটু শান্তি খুঁজে, একটু মানসিক শান্তি খোঁজে, আর কিচ্ছুটি না! তবে একবার সেই মানসিক শান্তিটা পেয়ে গেলে সেই জায়গাটা আর হারাতে চায় না। নিজের সবটা জুড়ে দেয় সেই জায়গাটায়। তখন পুরুষটি হয়ে উঠে ওপর মানুষটির উপরে সম্পুর্ন নির্ভরশীল।
পুরুষ মানুষ অনেক'টা চাপা স্বভাবে'র ও বটে। এরা চায় কেউ একজন আসুক, নিজ থেকে তার না বলা অনুভূতি গুলো বুঝুক। তাকে সবার থেকে আলাদা ভাবে মূল্যয়ণ করুক। এদের একটু নিজ থেকে যত্ন করে ভালোবাসলে নিজেকে বিলীন করে দিতে পারে। জীবনে সঠিক জীবনসঙ্গী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সঠিক মানুষের কাছে সবাই অতী মূল্যবাণ। অনেক সময় দেখা যায় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ফেলে যাওয়া মানুষটাকে ও কেউ অতী মূল্যবাণ ভেবে বুকে টেনে নেয়। মানুষটা তার কাছে হয় পৃথিবীর'র সব থেকে দামী উপহার। ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়ায় যেন একটু অযত্ন করলেই মহা ক্ষতি হয়ে যাবে। তেমনি ফারিহা নিজ থেকে যত্ন ও ভালোবাসা দিয়ে আবিদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। নিজের অধিকার নিজেই আদায় করে নিচ্ছে। এখন আবিদ ও ফারিহার মাঝে সুন্দর একটা সম্পর্ক তৈরী হয়েছে। প্রথমে আবিদ ফারিহার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতো। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমতী ফারিহা বুঝলেও না বুঝে ব্যাপার গুলো এরিয়ে যেতো। একবার ভয়ংকর ভাবে ভে'ঙে যাওয়া মানুষ গুলো কি এতো সহজে কাউকে পুনরায় আবার নতুনভাবে ভালোবাসতে পারে? না! পারে না খুব সহজে! একবার আঘাত প্রাপ্ত মানুষগুলোর যে ভয় হয় পুনরায় অন্য কাউকে বিশ্বাস করতে। তবে এদের সঠিক যত্ন নিলে তারাও পুনরায় উজ্জীবিত হয়ে প্রাণসঞ্চার হতে পারে!
ফারিহা বুঝতো নিজ থেকে এসব।এসব নিয়ে ঝামেলা না করে আবিদকে সময় দিয়েছে সে, একটু একটু করে আবিদের সাথে মিশেছে সে।
যদিও আবিদ কখনো প্রকাশ করছে না তার মনের অনুভূতি। তবে ভেঙে যাওয়া মানুষটা পুনরায় আবার কাউকে ফিল করছে।"ভালোবাসি" সবসময় মুখে মুখে বলতে হয় না। তার কাজকর্মের মাধ্যমে ফুটে উঠে অপর মানুষটা তার কতখানি জুড়ে রয়েছে।
ফারিহা রুম গুছিয়ে রুম থেকে চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই আবিদ উঠে তার হাত ধরে ফেললো। হকচকিয়ে গেলো ফারিহা, নিজেকে ছাড়াতে, ছাড়াতে বললো,
"কি হচ্ছেটা কি ছাড়ুন? আমার কাজ আছে এখনো।"
"না ছাড়বো না তো। এত দূর দূর করছো কেনো? একটু বসো আমার পাশে।"
"দূরে থাকবো না তো কি করবো? আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন না! এখন অবধি একটা বার বললেন না "ভালোবাসি"!"
একরাশ অভিমান নিয়ে বললো ফারিহা। আবিদ ফারিহাকে নিজের পাশে বসিয়ে দিয়ে মৃদু কণ্ঠে বললো,
"আমি তোমাকে ভালোবাসি না তার মানে এই নয় আমি তোমাকে ঘৃণা করি। তুমি আমার কাছে কাছে থাকলে আমার ভালো লাগে। তোমার স্পর্শ গুলো বারবার পেতে ইচ্ছে করে। তোমার হাজারটা কথা মুগ্ধ হয়ে শুনতে ইচ্ছে করে..!"
"তার মানে আপনিও আমাকে ভালোবাসেন! মুখে একবার বললে কি এমন ক্ষ'তি হয়? বলুন না একবার "ভালোবাসি"...! উচ্ছাস নিয়ে বললো ফারিহা।
" "ভালোবাসি" শব্দটা আমি খুব ভয় পাই ফারিহা। এটা বললে যদি তুমিও হারিয়ে যাও সবার মতো করে। নতুন করে কাউকে হারিয়ে পুনরায় বাঁচার মতো শক্তিটুকু অবশিষ্ট নেই আমার। এটা না বললে কি হয় না?"
আবিদের সহজ স্মৃকার উক্তি শুনে মনে মনে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো ফারিহা। সব মেয়ে চায় তার প্রিয় পুরুষে'র মুখ থেকে কারণে অকারণে "ভালোবাসি" কথাটা শুনতে। অথচ মানুষটা মচকাবে তাও ভা'ঙ'বে না। ভালোবাসে অথচ মুখে বলবে না। ফারিহা নিরুওর দেখে আবিদ ফারিহার গাল ছুঁয়ে বললো,
"কি হলো কথা বলছো না কেনো?"
"না তেমন কিছু না। বলো তুমি আমি শুনছি।"
আবিদ বিছানায় সুয়ে পড়লো তারপরে হাই তুলতে তুলতে বললো,
"থাক বলতে হবে না। আমার মাথাটা ব্যথা করছে ভীষণ। একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে?"
ফারিহা মুচকি হেসে বিনাবাক্যে পরম যত্ন করে আবিদের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আবিদ চোখ বন্ধ করে অনুভব করছে ফারিহার স্পর্শ। মিনিট দশেক পড়েই আবিদের সাড়া শব্দ না পেয়ে ঘুমিয়ে গেছে ভেবে ফারিহা আবিদের কপালে হুট করে একটা ভালোবাসার পরশ কপালে ছুঁয়ে দিয়ে বললো,
"ভালোবাসি!অনেক বেশী ভালোবাসি আমার প্রিয়তম!"
আবিদ সজাগ ছিলো। ফারিহা লজ্জা পাবে ভেবে চোখ খুললো না।তার ভিতরটা জুড়ে এক অজানা ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো নিমিষেই। কালো মেয়েগুলো বোধহয় হাসবেন্ড'কে একটু বেশিই ভালোবাসে বলে মনে হচ্ছে আবিদের নিকট। সে সৃষ্টিকর্তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানালো, তার জীবনের সাথে এমন একটা মানুষকে জুৃঁড়ে দিবার জন্য। ফারিহা আরো কিছুক্ষণ আবিদের দিকে তাকিয়ে থেকে সাবধানি পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসলো শ্বাশুড়ি'র রুমে। আবিদা এখনো ঘুমাচ্ছে।
সুমনা বেগম এতক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করছিলো। ফারিহাকে দেখে বন্ধ করলো পড়া, তারপর মৃদু হেসে বললো,
"আয় মা আমার কাছে এসে বোস। আমার তিলাওয়াত শেষ হয়েছে।"
ফারিহা মৃদু হেসে শ্বাশুড়ির নিকট গিয়ে বসলো। তার পরে দু'জন মিলে এটা সেটা বলছে আর খিলখিল করে হাসছে। যে হাসির শব্দ আবিদের কান অবধি পৌঁছালো। মায়ের হাসিখুশি মুখশ্রী দেখে মনে মনে তৃপ্তির ঢেঁকুর গিললো আবিদ। সুমনা বেগমে'র শরীর আগের তুলনায় অনেকটা বেশিই সুস্থ। শুধু ঔষধ আর ডক্টর দেখালেই হয়না, সঠিক যত্ন নিতে হয় অসুস্থ মানুষকে। ফারিহা মায়ের মতো করে শ্বাশুড়ির যত্ন নিয়ে সুস্থ করে তুলেছে।
_________________
জসিম শীলার সাথে দিব্যি সংসার করছে। সেদিনই শীলা'কে নিয়ে এসেছে নিজের কাছে। তার জীবনে কোনো কিছু অভাব নেই আর। এত সুখের ভিতরে হঠাৎ আট বছরের বাচ্চা মেয়ে'টা অসুস্থ হয়ে গেলো। আজ দুইমাস ধরে বিছানায় পড়ে আছে মেয়েটা। কত ডক্টর দেখাচ্ছে কেউ রোগ নির্ণয় করতে পারছে না। জসিম নিজের দোকানে যাবার আগে মেয়ের রুমে আসলো। মেয়ে'টার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।স্নেহতুর হাত দিয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মেয়ে'টার করুন "মুখ" তার ভিতরটা নড়বড়ে করে দেয়। "বাবা" যতই খারাপ হোক মেয়েদের একটু বেশিই ভালোবাসে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে তার করা পাপের শাস্তি এই ছোট্ট নিষ্পাপ বাচ্চা মেয়ে'টা পাচ্ছে। আল্লাহর নিকট ক্ষমা চায় বারংবার। মনপ্রাণে চায় তার মেয়েটা সুস্থ হোক। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো জসিম অতঃপর কোমল কণ্ঠে মেয়ে'কে ডাকলো,
"আম্মা?"
চোখ দু'টো খুললো ছোট্ট জিনিয়া। বাবা'র মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো মলিন মুখে। জসিম পুনরায় আবার বললো,
"আমি দোকানে যাচ্ছি আম্মা। তোমার জন্য কি আনবো বলো?"
"বাবা আজ গরুর মাংস আনবে। আমার খুব খেতে ইচ্ছে করে।"
জসিম মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে হেসে বললো,
"আচ্ছা আম্মা। আমার মা যখন বলছে অবশ্যই আনবো। আমি এবার যাই।"
জিনিয়া মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো। জসিম রুম থেকে বেরিয়ে পড়লো আবার একবার পিছনে তাকিয়ে দেখলো মেয়ে'কে। অতঃপর দোকানে গেলো।
না এখানেও ভালো লাগছে না তার। শীলার সাথে একটু কথা বলে নিলো। দোকানের কর্মচারীদের সবকিছু দেখিয়ে বাজারে গেলো জসিম। আজ কেমন যেন মনটা ছটফট করছে তার। তাই তাড়াতাড়ি বাজার করে বাসায় যাবে। মেয়েকে নিয়ে গরুর মাংস দিয়ে এক সাথে দুপুরে ভাত খাবে। দেরী না করে খুশী মনে ছেলে-মেয়েদের পছন্দ মতো ব্যাগ ভর্তি বাজার করে বাইক স্টার্ট দিলো জসিম। কিছু দূর যেতেই ফোনটা বেজে উঠলো তার। বাইক একপাশে থামিয়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখলো এক কর্মচারী "রহমান আলী'র" ফোন। যা দেখে বিরক্ত হলো জসিম। মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসলো অকথ্য গালাগালি।একটু আগে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে আসতে না আসতেই ফোন দেওয়া শুরু তাদের। ক্রোধিত হয়ে ফোন রিসিভ করে কিছু কটুকথা শোনার আগেই ওপাশ থেকে মানুষের হৈচৈ কানে আসলো জসিমে'র। সে ব্যস্ত হয়ে বললো,
"হ্যালো! হ্যালো..! রহমান কি হয়েছে? কোথায় তুই?"
"স্যার সর্ব'নাশ হয়ে গিয়েছে। আমাদের মার্কেটে আগুন লেগেছে। সব পুড়ে যাচ্ছে স্যার..! সব পুড়ে যাচ্ছে!"
মুহুর্তেই মুখটা বিষন্নতায় ছেয়ে গেলো। আতঙ্কিত হয়ে মাথায় হাত রাখলো জসিম। তার কতো সাধনার পড়ে গড়ে তোলা এই ব্যাবসা। এভাবে সব পুড়ে ছাই হয়ে যাবে? না..! না..! এ হতে পারে না। তাকে কিছু একটা করতেই হবে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে জসিম দ্রুত ফুল স্পিডে বাইক স্টার্ট দিলো। হুট করে কোথাথেকে একটা ট্রাকের মুখোমুখি হয়ে ধাক্কা খেয়ে পুনরায় চলন্ত ট্রাকে'র নিচে চা'পা পড়লো জসিম। আকাশপাতাল একটা চিৎকার হলো, "আল্লাহ গো...! মুহূর্তেই জসিমে'র দেহ থেকে প্রাণ পাখি উড়ে গেলো ঐ দূর আকাশে।
ঘটনা এতো দ্রুত হলো কেউ কিছু বুঝার আগেই রাস্তার সাথে পি'ষে গেলো জসিম। ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইলো জসিমে'র নি'স্তে'জ হওয়া দে'হ'খা'না। মেয়ের সাথে গরুর মাংস দিয়ে ভাত আর খাওয়া হলো না। চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলো জসিম।
রাস্তা টকটকে লাল রঙে মাখামাখি। এমন নি'র্ম'ম মৃ'ত্যু দেখে আতঙ্কিত মানুষ। চেহারা থেঁতলে গিয়েছে। মাথার ম'গ'জ ছিঁটকে গিয়েছে দূরে। পেট ফে'টে না'ড়ি'ভু'ড়ি আলাদা হয়ে গিয়েছে। মানুষটা শনাক্ত অবধি করতে পারছে না কেউ। মুহুর্তেই পুলিশ, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষজন জড়ো হলো রাস্তায়।
.
.
বরিশাল রুপা তলী বাস স্টার্নের কিনারায় বসে আছে ঋতু। নাক দিকে রক্ত পড়ছে আর এক হাত দিয়ে মুছছে। অপর হাতে রয়েছে একটা থালা।
পড়নে ময়লা, র'ক্তে ভরপুর বিভিন্ন জায়গা থেকে ছেঁড়া একখানা কাপড়। যা দেখে অনেক বড় ঘরের ভদ্রলোকে'রা নাক ছিটকিয়ে চলে যায়। কেউ কেউ দয়াকরে দুইপয়সা দিয়েও যায়।
সবকিছু হারিয়ে আজ তার স্হান হয়েছে রাস্তায়। উন্নত চিকিৎসার অভাবে শরীরে শুধু হাড্ডি গুলো আর নিঃশ্বাস'টা রয়ে গিয়েছে। নিজের কাছে যতটুকু সম্বল ছিলো নিজের চিকিৎসার জন্য খরচ করেছে ঋতু। তাতে কিছুই হলো না, টাকা নেই, কাজ করার শক্তি নেই, একেবারে নিঃস্ব হয়ে পথে পথে ঘুরছে মেয়েটা। চারমাস হয়েছে ঢাকা শহর ছেড়ে বরিশাল এসেছে। এই বাস স্টার্নই থাকছে সে।
মানুষ দয়া করে কিছু দিলে তবেই পেটে পড়ে, না হয় না খেয়ে থাকতে হয় সারাদিন। ঋতু'র মনে হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা যেন পৃথিবীর সমস্ত কষ্ট দিয়ে দিয়ে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করাচ্ছে। একটা বাস এসে থেমেছে মাএ। মানুষজন আসছে যাচ্ছে।
ঋতু চারপাশে তাকিয়ে মানুষ জনের নিকট কিছু টাকা চাইছে। কেউ খুচরো টাকা দিচ্ছে কেউ বা পাশকাটিয়ে চলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে নিজের ভাগ্যের উপর খুব মায়া হয়। কি জীবন কি হয়ে গেলো তার..! চারপাশে এত এত মানুষ অথচ তার আপন বলতে কেউ নেই। কতবার নিজেকে শেষ করতে গিয়েও মস্তিস্ক তাকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে। ঋতু জানে আ'ত্ম'হ'ত্যা মহা পাপ। তাইতো বাঁচিয়ে রেখেছে নিজেকে। পৃথিবীতে তো তার এতটুকু শান্তি মিললো না। ম'রার পরে কি একটু শান্তির আশা করবে না সে...! এজন্যই তো আজও দেহটা পরে রয়েছে তিক্ত পৃথিবীতে। না-হয় সেই কবেই শেষ করে দিতো নিজেকে।
দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে এই অবধি পেটে কিছু পড়েনি। এখন খুউব ক্ষুদা লাগছে সাথে জল তৃষ্ণা। আজকে যা পেয়েছে থালা থেকে উঠিয়ে হাতের মুঠোয় গুঁজে নিলো কয়েকটি কাগজের নোট।এই কাগজের টাকা গুলোরই যত মূল্য পৃথিবীতে। অতঃপর অচঁল দেহটা টেনেটুনে লা'ঠি'তে ভর করে সামনের দিকে একটা টঙ দোকানে যাচ্ছে।
দূর থেকে মানুষের ভিড়। কেউ চা, সিগারেট, পান খাচ্ছে, কেউ বা খুব মনযোগ দিয়ে টিভি দেখছে।ঋতু এগিয়ে যেতেই চোখ পড়লো টিভি'র দিকে। মুহূর্তেই কানে আসছে একজন সাংবাদিক মহিলা ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে।
"আজকের ব্রেকিং নিউজঃ গতকাল টেকনিক্যাল রোডে ট্রাকের সাথে মোটরসাইকেলে'র মুখোমুখি সংঘর্ষনের ফলে এক যুবকের নি'র্ম'ম ভাবে প্রাণ গেলো।
পুলিশ ২৪ ঘন্টা তদন্ত করে লোকটির পরিচয় নিশ্চিত হলেন। লোকটির নাম জসিম। পেশায় একজন ব্যাবসায়ী ছিলেন। দেশের বাড়ি বরিশাল। কিছুক্ষণ আগে পুলিশ তার মৃ'ত্যু দেহ তার স্ত্রী, সন্তানের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছে।"
পরমুহূর্তেই ভিডিও ফুটেজ আসলো, যাতে নির্মম কিছু দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। তবে লোকটির অবয়া অনুমান করা যাচ্ছে না।
তার পাশে'ই জসিমে'র ছোট্ট একটি পুরনো ছবি ভেসে আসলো। দোকানের লোকজন হা-হুতাশ করে একজন আরেকজনকে বলছে,
"ইশশ কি মৃ'ত্যু দেখছো ভাই!লোকটার কি ক*ষ্টটাই না হয়েছে। শান্তিতে ম'র'বার ও পারলো না! আল্লাহ ক্ষমা করুক!"
হঠাৎ ঋতু গলা ফাটিয়ে উচ্চ স্বরে বললো,
"আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ'র বিচার! আল্লাহর বিচার! পৃথিবী থেকে একটা কী'ট'প'ত'ঙ্গ দূর হলো।"
কথা শেষ করে হাসলো ঋতু। মুখে কি স্নিগ্ধ! প্রশান্তি'র হাসি! পরমুহূর্তেই নিজের হাতে থাকা টাকাগুলো নিয়ে ছুটে গেলো মসজিদে দিকে। আজ এগুলো খুশী হয়ে মসজিদে দান করে দিবে বলে। নিজের ক্ষুধা যেন উবে গেছে, গায়ে অদ্ভুত একটি শক্তি অনুভব করছে ঋতু। সে লা'ঠি ছাড়াই হাসি মুখে দৌ'ড়া'চ্ছে।
দোকানে থাকা মানুষগুলো অবাক হয়ে দেখছে ঋতু'কে। কারো মৃ'ত্যু খবর শুনে কেউ এভাবে হাসে? নিশ্চয়ই মেয়ে'টা পা'গ'ল! লোকগুলো আর বুঝলো না ঠিক কতটা কষ্ট দিলে, তার থেকে কতটা ব্যথা পেলে একটা মানুষের নি'র্ম'ম মৃ'ত্যু সংবাদ শুনে কেউ এতোটা খুশী হয়!
#চলবে.....
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ! ]
কেমন হচ্ছে জানাবেন। কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন। এই পর্বে সবাই রেসপন্স করবেন দয়াকরে! আগামী পর্বেই শেষ হতে চলছে গল্প'টা।
আল্লাহুম্মা সাল্লিমনি লিরমাদান, ওয়া সাল্লিম রামাদানা লি, ওয়া তাসলিমাহু মিন্নি মুতাক্বাব্বিলা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে শান্তিময় রমজান দান করুন। রমজানকে আমার জন্য শান্তিময় করুন। রমজানের শান্তিও আমার জন্য কবুল করুন। আমিন।
সবাইকে রমজান মোবারক 🤍#অন্ধ_বিশ্বাস
#writer_sumaiya_afrin_oishi
#পর্বঃ১১(অন্তিম পর্ব)
এ'ম্বু'লে'ন্স করে জসিমে'র লা'শ গ্রামের বাড়ি নিয়ে আসা হয়েছে দা'ফ'ন করা'র জন্য। বাড়িতে লোকজনে'র বেশ আনাগোনা। মানুষ আসছে যাচ্ছে।
কেউ বা হা-হুতাশ করছে কেউ বা নি'ন্দা করছে। লা'শে'র পাশে বসে গুনগুন করে কাঁদছে শীলা। তার কান্না দেখে ছেলে-মেয়ে দু'টোও কাঁদছে।
সুখ নামক জিনিস তার ভাগ্যে হয়তো সৃষ্টি-কর্তা দেয়নি।সংসার জীবনে জসিম ছিলো বড্ড উদাসীন,অন্য নারীতে আসক্ত। তারপরও সবকিছু মেনে নিয়েছে শীলা। ছেলে-মেয়ে দু'টোর মুখের পানে তাকিয়ে আস্ত জীবনটা পড়ে রইলো বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এক অ'মানুষের সাথে। সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে যেইনা মানুষটা তাকে একটু ভালোবাসলো অমনি দুনিয়া থেকে গত হলো মানুষটা। একটু ভালো থাকার জন্যই তো সে স্বার্থপর হয়ে জসিমে'র সমস্ত অন্যয় মেনে নিয়েছে। ভালো আর থাকলো কই? একটু সুখের মুখ দেখার আগেইতো স্বামী নামক মানুষটি তাকে একা করে চিরবিদায় নিলো! তবে কি কাউকে ঠকিয়ে মানুষ বেশি দিন সুখী হতে পারে না? না পারে না! সাময়িক সময়ের জন্য সুখ মিললেও এই সুখ চিরস্থায়ী হয় না! কারো সুখ-শান্তি ছিঁ'নিয়ে নিয়ে কাউকে ঠকিয়ে কস্মিনকালেও কেউ সুখী হতে পারে না!
হঠাৎ মানুষের ভিড় ঠেলে লা'ঠি'তে ভর দিয়ে এলাকার এক বৃদ্ধা মুরব্বি আসলো। জসিমে'র নিথর হয়ে পড়ে থাকা শরীরটা দেখে আফসোসের স্বরে বললো,
"বেশি চ্যা'ত'লে আল্লাহ দুনিয়ায় হেগো বেশি দিন রাহে না। আল্লাহর বিচার আছে! বিচার আছে! খুব বেশি উড়াল দিছিলা। তয় আল্লাহ ঠা'স কইরা পাখনা ছিঁ'ই'ড়া দেছে। এইবার ক'ব'রে গিয়ে যতখুশি উইড়া বেড়াও বাঁচা!"
বৃদ্ধা পুরুষ'টির কথা শুনে বুকটা ভারী হয়ে গেলো শীলার। মানুষটা যেমনই ছিলো না কেনো তার তো অর্ধাঙ্গিন। এই মৃ'ত্যু মানুষটাকে নিয়ে এসব শুনতে বড্ড খারাপ লাগছে তার।
মুহূর্তে কেউ কেউ বৃদ্ধার সাথে তাল মিলিয়ে মানুষ এটা সেটা বলছে। কেউ বা নিরব দর্শক হয়ে শুনছে। মৃ'ত্যু ব্যাক্তির লা'শের সামনে বসে মানুষের এমন আলোচনা -সমালোচনা দেখে তাজ্জব বনে গেলো একজন আলেম। উনি সবার উদ্দেশ্য করে বললো,
"আপনারা দয়া করে চুপ থাকুন! আল্লাহ কার মৃ'ত্যু কি ভাবে রেখেছে আমরা কেউ জানি না! যার মৃ'ত্যু যেভাবে ভাগ্যে লেখা আছে সেভাবে হবেই।
কে নিষ্পাপ কে গুনাহগার একমাত্র উপরওয়ালা বলতে পারেন। তাই এসব বলে নিজের কাঁধে গুনাহর পাল্লা ভারি করবেন না। এসব আলোচনা বন্ধ করুণ। সম্ভব হলে দোয়া করুন তার জন্য!"
হুজুরের কথা শুনে সাময়িক সময়ে'র জন্য চুপ করলো উপস্থিত সবাই। অতঃপর বিকেলে চারটায় জসিমে'র জানাজা নামাজ পড়ে ক'র'ব স্হানে লা'শ দা'ফ'ন করা হলো। লা'শ রেখে যে যার ঘরে ফিরলো শুধু অন্ধকার কবরে পড়ে রইলো জসিম।
.
.
শুভ্রময় সকাল! রৌদ্রময় প্রকৃতি। ফারিহা এখনো ঘুমাচ্ছে। গতকাল রাতে রাত জেগে পড়ার ফলে দু-চোখ ভর্তি ঘুম টইটম্বুর। পড়ালেখা নিয়ে কারো কোনো আপওি নেই। আবিদ চায় ফারিহার যত ইচ্ছে পড়ুক। সে পড়াবে ফারিহাকে বিনিময়ে তার সন্তান'রা শিক্ষিত আদর্শ একজন মা পাবে।
রোদের তেজ তীব্র থেকে তীব্র হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ধরণীর বুকে। যা জানালার পর্দা বেঁধ করে এক ফালি রোদ এসে চোখে মুখে আঁচড়ে পড়লো ফারিহার। সাথে সাথে চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো মেয়ে'টা। আস্তে ধিরে চোখ খুলতেই লাফ দিয়ে বসে পড়লো। চারপাশে রোদে ভরপুর। তারমানে বেলা অনেক হয়েছে..! এতক্ষণ কি ভাবে ঘুমালো সে? আজ তার অনার্স ফাইনাল পরিক্ষা শুরু। অথচ সে মাএ উঠলো, কেউ ডাকলো না অবধি। কতকাজ বাকি তার। কখন কি করবে সে? মোবাইল হাতে নিয়ে সময় দেখলো। সময় ৮ঃ০৩। আর কিছু না ভেবে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে রান্না ঘরে ছুটে গেলো ফারিহা। রান্না ঘরে এসে দেখতে পেলো সুমনা বেগম নাস্তা তৈরী করছে আর আবিদ তাকে এটা সেটা করে সাহায্য করছে। তা দেখে বিস্মিত চোখে ব্যস্ত কণ্ঠে ফারিহা বললো,
" এগুলো কি করছেন আম্মা? আপনি অসুস্থ শরীর নিয়ে রান্না ঘরে আসলেন কেনো? আমাকে ডাকলেই তো হতো। "
"আমি বেশ সুস্থ আছি মা। এতো ব্যস্ত হতে হবে না তোকে। প্রতিদিন তো তুই এক হাতে সবকিছু করিস। আমি না হয় তোর পরিক্ষা'র ক'দিন একটু কষ্ট করলাম। মেয়ের জন্য এতটুকুতো করতেই পারি মা।"
"তবুও আপনি একা এতো কষ্ট করতে গেলেন কেনো আম্মা? আসলে কাল অনেক রাত অবধি পড়েছিতো তাই উঠতে পারিনি।"
অপরাধী'র মতো মাথা নত করে বললো ফারিহা। যা দেখে সুমনা বেগম হেসে ফেললো। তারপর আহ্লাদী কণ্ঠে বললো,
"পা'গ'লী মেয়ে.! এতো কৈফিয়ত দিতে হবে না তোকে। যা তোর মেয়ে'কে নিয়ে খেতে বোস। আমার রান্না শেষ।"
ফারিহা আর দেরী করলো না আবিদাকে ঘুম থেকে ডাকতে গেলো। শ্বাশুড়ি'র আচরণে মনে মনে ভীষণ খুশী হয়েছে ফারিহা। ভাগ্যক্রমে এমন একটি ফ্যামিলি পেয়েছে সে। আগে নিজের ভাগ্য'কে নিয়ে কত আফসোস করতো সে। এখন আর কোনো আক্ষেপ নেই তার। নিজে কে ভীষণ ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে তার।
.
ফারিহার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো আবিদ। সে নীরব দর্শক হয়ে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবটা শুনলো। এরা বউ- শ্বাশুড়ী এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে, এখানে যে তৃতীয় একজনার উপস্থিতি রয়েছে তা যেন তাদের চোখেই পড়ছে না। কেউ তাকে পাওা দিচ্ছে না! এরি মধ্যে সুমনা বেগম ধমকের সুরে বললো,
"কিরে তুই এখানে এমন দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? রুটি গুলো নিয়ে টেবিলের উপরে রাখ যা।"
মায়ের ধমক শুনে আবিদের নিজেকে মনে হচ্ছে এদের বেতনভুক্ত কাজের লোক সে। আবার কিছু একটা মনে করে হাসলো আবিদ।
তারপর সবাই একসাথে খেতে বসলো। ফারিহা নিজে খাচ্ছে সাথে আবিদাকে খাইয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে একজন মা তার সন্তান'কে অতী আদর করে ধরে-বেঁধে খাইয়ে দিচ্ছে। সে দিকে তাকিয়ে চোখ দু'টো জুড়িয়ে যাচ্ছে আবিদের। তার ছোট্ট পরিবারে সীমাহীন অর্থের অভাব থাকলেও সুখের কোনো কমতি নেই। মনে মনে সৃষ্টিকর্তার নিকট শুকরিয়া আদায় করলো আবিদ।
.
আবিদ ও ফারিহা দু'জন রেডি হয়ে একসাথে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লো। ফারিহা'র সাথে রিক্সা করে পরিক্ষার "হল" অবধি এসেছে আবিদ। এক্সাম কেমন না কেমন হয় এ নিয়ে ফারিহা ভীষণ নার্ভাস ফিল করছে। চোখে মুখে চিন্তা'র ছাপ। তা দেখে আবিদ ফারিহার কাঁধে হাত রেখে মৃদু কণ্ঠে বললো,
" এতো ভয় পাচ্ছো কেন ফারিহা? ভয়ের কি আছে বো'কা! একদম চিন্তা করো নাতো। হাবিজাবি চিন্তা না করে সম্পুর্ন মনোযোগ দিয়ে লিখবে।
ইনশাআল্লাহ পরিক্ষা ভালো হবে তোমার!"
ফারিহা এতটুকুতেই যেন ভরসা পেলো। খারাপ সময় কিংবা ভালো সময় এমন একটা ভরসার হাত সবারই প্রয়োজন হয়। দিনশেষে প্রিয় একজন মানুষ খুবই প্রয়োজন হয়, যার কাছে কিছু মুখে বলতে হয় না অনায়াসেই মানুষটা সবকিছু বুঝে যায়। ফারিহা'র ভিতরটা শিহরিত হচ্ছে বারংবার! তার মতো এতিম একটা মেয়ে'র জীবনে এমন একজন মানুষ আল্লাহ মিলিয়ে দিয়েছে। হুট করে আবিদের হাতটা শক্ত করে ধরলো ফারিহা। হঠাৎ ফারিহার এমন আচরণে আবিদ চমকালো। আশেপাশের মানুষজন অবাক হয়ে দেখছে তাদের। আবিদ হাত ছাড়ালো না বরং লোকচক্ষুর পরোয়া না করে মৃদু হেসে হাতে বন্ধনটি আরো একটু শক্ত করে সামনে দিকে অগ্রসর হলো।এরিমধ্য পরিক্ষার সময় হয়ে আসছে প্রায়।
ফারিহা'কে ভিতর অবধি পৌঁছে দিয়ে আবিদ নিজের দোকানে চলে গেলো।
.
.
কয়েক সপ্তাহ গত হতেই শীলা ঢাকা থেকে সাংসারিক যাবতীয় জিনিসপত্র নিয়ে বাবা'র বাড়ি থাকছে। যত চেষ্টা করে বাবা'র বাড়ি থেকে দূরে থাকতে নিয়তি যেন আরো ধরে বেঁধে বেশি করে এখানে রাখছে।
মাঝ পথে জীবনটা যেন থমকে গেলো তার, কোনো কূলকিনারা মিলছে না যেন। অসুস্থ মেয়েটা এখন আরো বেশি অসুস্থ হয়ে গেছে। হাত-পা নাড়াচাড়া করতে পারছে না এখন। উন্নত চিকিৎসা করা'র মতো সমর্থ আর তার কাছে অবশিষ্ট নেই। স্বামীর সাথে সাথে হারিয়ে গেছে আর্থিক অবস্থা। বিছানায় বসে ধুঁকে ধুঁকে মরছে মেয়ে'টা। অথচ মা হয়ে নিরবে চোখের অশ্রু বিসর্জন ছাড়া কিছু করতে পারছে না সে। বাহিরে কাজ করতে গেলে স্বামীর কর্মের জন্য তি'ক্ত কথা বলে মনটা বি'ষি'য়ে দেয় লোকজন। পরিবারে'র একজনের করা অ'প'ক'র্মে'র জন্য গোটা পরিবারের লোকজনে'র জীবন ন'র'কে পরিণত হয়।অনেক সময় বাবা-মায়ের করা পা'পে'র দায়-ভার সন্তানদের বহন করতে হয়। সৃষ্টিকর্তার বিচার বড্ডই আজব!
সেই সাথে ভাইয়ে'র বউয়ের অযথা কটুকথা, খাবার নিয়ে খোঁটা শুরু হয়ে গিয়েছে। মা'টা বেঁচে আছে এজন্যই ঠাঁই মিলছে এখানে।মায়ের জন্য পারছে না ঘর থেকে ঘাড়ধা'ক্কা দিয়ে বের করে দিতে।
শীলা উদাসীন হয়ে মেয়ের পাশে বসে জীবনের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। কি পেলো এই জীবনে সে? প্রাপ্তি বলতে কিছুই চোখে ঠেঁকছে না। হঠাৎ ঝংকার একটি কণ্ঠস্বর আচমকাই কানে আসতে সজ্ঞানে ফিরলো শীলা। অপর প্রান্তে থাকা ভাবি হুংকার ছেড়ে বললো,
" এইযে জমিদারের কন্যা..! আরকত দিন মেয়ে'র পাশে সারাদিন বসে বসে ভাইয়ের অ'ন্ন'ধ্বং'স করবেন? এদিকে কাজ করতে করতে আমি ম'রে যাচ্ছি। আর নবাব ঘরে সবগুলো। রান্নাঘরে থালাবাসন গুলো ধুয়ে রান্না করেন। আমি এত কাজ করে ১৪ গোষ্ঠী সবাইকে খাওয়াতে পারবো না।"
ভাবি'র কটুকথা শুনে চুপ করে বিনাবাক্যে চলে গেলো শীলা। এই কথার আঘাতে থেকে ও যে তার মনের বি'ষ'ন্ন'তা মেঘের পরিমাণ বেশি। যা কাউকে বলা যায় না আর না সহ্য করা যায়। নিয়তি বোধহয় কিছু মানুষকে আজন্মকাল দুঃখ কষ্ট সহ্য করতেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। এরা সারাদিন হয়রান হয়ে একটু শান্তি, একটু সুখ খুঁজে। দিনশেষে এই শান্তিটুকু পায় না। পেলেও নিয়তি তা বেশিদিন ভাগ্য রাখে না। আজন্ম কাল এই মানুষগুলো হতাশাগ্রস্ত হয়ে বেঁচে থাকে একটু সুখের আশায়..! শীলার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকালো ভাবি। তা দেখে অসুস্থ মেয়েটা নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে।
.
.
দীর্ঘ কয়েকদিন সময় নিয়ে আজ সম্পুর্ন শেষ হলো ফারিহার পরিক্ষা। সময়টা রাত। আবিদ এখনো দোকানে। আবিদা মায়ের কাছে হঠাৎ বিরিয়ানি খাবার জন্য বায়না ধরেছে। আজ অনেক দিন পরে রান্না ঘরে মেয়ের জন্য বিরিয়ানি রান্না করছে ফারিহা।
এ কয়দিন ফারিহাকে কিচ্ছু একটি কাজ করতে দেয়নি সুমনা বেগম। আজও রান্নাঘরে সুমনা বেগম ফারিহা'কে সাহায্য করতে এসেছিলো কিন্তু ফারিহা তাকে কিছু করতে না দিয়ে রুমে গিয়ে বিশ্রাম করতে বললো। শ্বাশুড়ি'দের কি সব সময় কাজ করতে হয়? ছেলের বউয়েরা যখন অসুস্থ কিংবা ব্যস্ততার মধ্যে থাকে তখন বিবেক খাঁটিয়ে একটুআধটু কাজকর্ম, সুন্দর আচরণ করলেই বউদে'র মনে অনেকটা জায়গা করে নেওয়া যায়। সুমনা বেগমের কাজকর্মের কারণে ফারিহা'র শ্বাশুড়ি'র প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। দিনদিন তার প্রতি যত্নশীল আন্তরিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে শুধু মাএ সুমনা বেগমে'র ব্যবহারের জন্য।
সুমনা বেগম সুয়ে সুয়ে আবিদার সাথে কথা বলছে। এরি মধ্যে ফারিহা রান্না শেষ করে একহাতে বিরিয়ানি অন্য হাতে এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে শ্বাশুড়ি'র রুমে প্রবেশ করলো।
হাতে থাকা গ্লাসটা সুমনা বেগমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
"আম্মা নিন। গরম গরম দুধটা খেয়ে নিন।"
সুমনা বেগম সোয়া থেকে উঠে বসতে বসতে বললো,
"আর কত আমাকে খাওয়াবি মা? তুই নিজেও একটু খা ঠিকঠাক। আমি বুড়ো মানুষ আর কত খাবো? কয়দিন পরে এমনিই ম'রে যাবো।"
"একদম বাজে কথা বলবেন না আম্মা। ছোট বেলা মা'কে হারিয়ে বহুকষ্টে মানুষ হয়েছি আমি। বড়হয়ে বিয়ের পরে মায়ের মতো একজন "মা" পেয়েছি। তাকে এত তাড়াতাড়ি হারাতে চাই না। আপনাকে অনেক বছর বাঁচতে হবে আম্মা! পুনরায় আমি মায়ের আদর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হতে চাই না।আপনার শরীর দুর্বল। ডক্টর পুষ্টিকর খাবার খেতে বলছে বেশি বেশি ভুলে গেছেন? খেয়ে পুরোপুরি সুস্থ হন আপনি। আর আমাকে মেয়ের মতো বেশি বেশি শাসন করুন , আদর করুন!"
কি যেন ছিলো ফারিহার কথায়। অতী আনন্দে সুমনা বেগমের চোখ দু'টো ভিজে গেলো। ফারিহার একটা হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে ভেজা কণ্ঠে বললো,
"তুই অনেক ভালো মনের মানুষ মা! এভাবেই থাকিস সারাজীবন। আল্লাহ তোকে হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখুক। তুই অনেক অনেক বেশি সুখী হ। তোর এই মায়ের দোয়া তোর সাথে আছে সবসময়।"
সুমনা বেগম কথা শেষ করে দ্রুত চোখের জলটুকু মুছে হাসি মুখে অর্ধেক পরিমাণ দুধ খেয়ে নিলো। বাকি অর্ধেক ফারিহার মুখের সামনে ধরে বললো,
"নে তুই এইটুকু খেয়ে নে।"
ফারিহা মৃদু হেসে বিনাবাক্যে খাওয়া শুরু করলো। এতে যেন রয়েছে মা'য়ের ভালোবাসা'র ছোঁয়া! মায়ের উষ্ণ ছোঁয়া কবুও মিস করতে চায় না ফারিহা।
সুমনা বেগম অপলক নয়নে এক মায়াবী কন্যাকে দেখছে। চোখে মুখে যেন হাজারো মায়া লেপ্টে আছে মেয়েটার। মেয়ে'টার গায়ের রং শুধু কালো। কিন্তু মনটা ভীষণ কোমল, একদম স্বচ্ছ! সবসময় মন থেকে মেয়ে'টার সুখ কামনা করে সুমনা বেগম।
.
.
ঘড়ির কাঁটায় সময় এগারোটা জানান দিচ্ছে। ফারিহা এতক্ষণ আবিদার সাথে সময় কাটাচ্ছিল। এই মেয়ে'টা তার আ'ত্মার সাথে মিশে গিয়েছে। আবিদা যখন "আম্মু" বলে ডাক দেয় ফারিহার শুনতে বেশ লাগে। এই 'আম্মু' ডাকটাই যেন বারংবার মনে করিয়ে দেয় সে একজন মা! বাচ্চা মেয়ে'টা তার সাথে অল্প কদিনের মধ্যে পুরোপুরি মিশে গিয়েছে। গ'র্ভে' সন্তান জ'ন্ম হলেই শুধু মা হওয়া যায় না। আবিদা তাকে মায়ের অনুভূতি'র সাথে পরিচয় করে দিয়েছে। এই অনুভূতি'র স্বাদ ভীষণ মিষ্টি! অতী স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে এই অনুভূতিতে!
কিছু কিছু সম্পর্ক তৈরী হয় আ'ত্মা থেকে। তেমনি আবিদা তার গ'র্ভের সন্তান না হলেও আ'ত্মা'র সন্তান হয়েছে!
রাত অনেক হয়েছে তা দেখে আবিদাকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে ফারিহা। সুমনা বেগম ও ঘুমিয়েছে। শুধু সজাগ রয়েছে ফারিহা। কেননা আবিদ এখনো বাসায় আসেনি তারজন্যই অপেক্ষা করছে সে। যদিও আবিদ ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে আজ ফিরতে দেরী হবে তার। তবুও ফারিহা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে প্রিয় পুরুষটির জন্য। মাঝে মাঝে প্রিয় মানুষটার জন্য রাত জেগে অপেক্ষা করতেও ভীষণ ভালো লাগে। ফারিহা মুচকি হেসে সময় কাটানোর জন্য একটা কাঁথা সেলাই করতে বসছে।
ঘন্টাখানিক হয়েছে কাঁথা সেলাই করে রেখে দিয়েছে কাঁথা। অথচ এখনো মানুষটা আসছে না..! এবার ভীষণ চিন্তিত হলো ফারিহা।ফোন হাতে নিয়ে আবিদের নাম্বার ডায়াল করতেই কানে ভেসে আসলো দরজায় কড়া নাড়ানো'র শব্দ। ফারিহার অধর কোণে মিষ্টি হাসি ফুটলো। তার আর বুঝতে বাকি রইলো না কে এসেছে। ফোন রেখে দ্রুত দরজা খুললো। কড়া নাড়ানো'র সাথে সাথে দরজা খুলে গেলো..! মানে মেয়ে'টা তার জন্য এতো রাত অবধি অপেক্ষা করছে? ভাবতেই সারাদিনে'র পরিশ্রম যেন উবে গেলো আবিদের। তার মুখে মিষ্টি হাসি দেখা গেলো।
প্রিয় মানুষটি'র ঘামে ভেজা, ক্লান্ত মুখ, অথচ মুখে হাসি। যা দেখে ঠোঁটের হাসিটা গাড়ো হলো ফারিহা'র। আবিদ ভিতরে প্রবেশ করে মৃদু কণ্ঠে বললো,
"জেগে ছিলে কেনো ঘুম বাদ দিয়ে? আমিতো বলেই দিয়েছিলাম ফিরতে দেরী হবে।"
"বা-রে.! তুমি বাসায় না আসা অবধি ঘুমিয়েছি কখনো?তুমি বাহিরে থাকলে আমার বড্ড চিন্তা হয়। সেখানে ঘুম কি করে আসে বলো তো?
তোমার জন্য অপেক্ষা করতেও আমার ভীষণ ভালো লাগে।"
আবিদের পা জোড়া থেমে গেলো। দৃষ্টি স্হির করলো ফারিহার মুখপানে। ফারিহার সহজ স্বীকারোক্তি শুনে ততক্ষণাৎ বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না আবিদ। সত্যিই তো! সেই শুরু থেকেই আবিদ দোকান থেকে না আসা অবধি ফারিহা রাত জেগে অপেক্ষা করে। ফিরলে তবেই একসঙ্গে ডিনার করে ঘুমাবে। আবিদকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফারিহা তাড়া দিয়ে বললো,
"কি হলো? এভাবে তাকিয়ে না থেকে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি খাবার বাড়তেছি।"
আবিদ মুচকি হেসে চলে গেলো। তারপর দু'জন মিলে এক সাথে ডিনার করে রুমে আসলো। ফারিহা চুল আঁচড়াচ্ছে হঠাৎ আবিদ এসে পকট থেকে একটা গোলাপ ফারিহার চুলে গুঁজে দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
"শুভ জন্মদিন আবিদার আম্মু! জন্ম দিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা তোমার জন্য।"
ফারিহা চমকে গেলো বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইলো তার প্রিয়তম পুরুষটি দিকে। আজ তার জন্মদিন ছিলো তারইতো মনে ছিলো না। অথচ মানুষটা কত ব্যস্ততার মধ্যেও ঠিকই মনে রেখেছে। এই প্রথম কেউ তাকে এই ভাবে উইশ করেছে। তাও আবার তার সবথেকে প্রিয় মানুষটি। ফারিহা অতী আনন্দে বাকরুদ্ধ। মেয়েদের খুশী করতে আসলেই খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না। প্রিয় মানুষের থেকে একটু সময়, ছোট ছোট উপহার পেলেই এরা বেজায় খুশি।
ফারিহাকে এভাবে নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে আবিদ ভ্রু কুঁচকে ক্ষীণ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
"কি হয়েছে আবিদার আম্মু? তুমি খুশী হওনি?"
ফারিহা আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। অতী আনন্দে চোখ থেকে অশ্রু গুলো গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ ফারিহাকে কাঁদতে দেখে ভড়কে গেলো আবিদ। ব্যস্ত হয়ে ফারিহার গাল ছুঁয়ে বললো,
"আরে কাঁদছো কেনো তুমি? কি হয়েছে বলো আমায়? কোথাও কষ্ট হচ্ছে?
প্রিয় মানুষের আদুরে স্পর্শে কান্না"র গতি বেড়ে গেলো ফারিহা'র। হুড়মুড় করে আবিদের বুকে মাথা রেখে কান্নারত কণ্ঠে বললো,
" সব কান্না কষ্টে'র হয় না।জানো আমি ভীষণ খুশী হয়েছি আদিবা'র আব্বু। ভীষণ ভীষণ খুশী! "মা" ম'রার পর থেকেই জীবন থেকে সব হারিয়ে গিয়েছিলো। তোমাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে আল্লাহ আমাকে পুনরায় চাওয়ার থেকেও বেশি কিছু দিয়েছে। তোমাদের সবাইকে নিয়ে আমি হাজার বছর বাঁচতে চাই। প্লিজ আমার হাতটা কখনো ছেড়ে দিওনা! তাহলে যে আমি বাঁচতে পারবো না। তোমাকে আমি ভীষণ রকমের ভালোবাসি আবিদার আব্বু ! সত্যিই ভীষণ ভালোবাসি....! তোমাকে ছাড়া নিজেকে খুবই অসহায় মনে হয়! জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আমার তোমাকেই লাগবে..!"
"এসব কি বলছো ফারিহা? প্লিজ কান্না করো না! আমি তোমাকে ছেড়ে দিবো কেনো?আমার মতো অতী নগন্য ভে'ঙে যাওয়া মানুষটিকে তুমি নতুন করে হাসতে শিখিয়েছো। নতুন করে তোমাকে আমি কবুও হারাতে চাই না ফারিহা! আমার জীবনের শেষ দিন অবধি আমি তোমাকে চাই ফারিহা!"
বলেই আবিদ ফারিহার কপালে ভালোবাসার পরশ ছুঁয়ে দিলো। শক্ত করে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিলো।আকস্মিক ভাবে ফারিহার কান্না থেমে গিয়েছে। সে চুপটি করে পরে রইলো আবিদের প্রশন্ত বুকে। এই বুকেই লুকিয়ে রয়েছে পরম শান্তি!
দু'জনার মধ্যে নিরবতা বিরাজমান। শুধু অতী কাছ থেকে দুজন দু'জনকে গভীর ভাবে অনুভব করছে।
.
.
কাক ডাকা ভোর! ঋতু সুয়ে আছে রাস্তার পাশে। তার কাছে দিনরাত সবই সমান। তার অবস্থা দিনদিন শোচনীয়! শরীরে বিভিন্ন জায়গায় ফোসকা ফোসকা পড়ে চামড়া উঠে গিয়েছে। তা থেকে মাছি ভনভন করে উড়ে উড়ে তাদের খাবার সন্ধান করছে। এতো দুর্দশা অথচ সে এখনো বেঁচে রয়ে গিয়েছে পৃথিবীতে ।
এখন নিজে চলার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই দেহখানায়। অচল দেহখানায় শুধু নিশ্বাসটুকু ছাড়া আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই। পেটের ক্ষুধায় বাকিটুকু কাতর হয়ে গিয়েছে। মানুষজন তাকে দেখলে আজকাল নাক ছিটকিয়ে চলে যায়। একটু খাবারের জন্য তী"ব্র হাহাকার করে মেয়েটা! অথচ মানুষ শুনেও না শুনার বান করে পাশকাটিয়ে চলে যায়। যাদের মনে অধিক মায়া তারা মাঝে মাঝে কিছু খাবার দেয়। এইটুকু খেয়েই যায় দিন! যায় রাত একাকী!
কি আজব..! দিনরাত আল্লাহর কাছে নিজের মৃ'ত্যু কামনা করছে অথচ মুক্তি যেন মিলছেই না এই করুন পরিস্থিতি থেকে। নিজের ভাগ্যের উপরে নিজেরই মায়া হয় ঋতু'র। ইশশ! কি জীবন তার কি হয়ে গেলো! ঋতু সচারাচর মাথার উপরে থাকা বিশাল আকাশটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মনের সমস্ত কথা তার কাছে মেলে ধরে।
তারতো আর প্রিয় কেউ নেই যে মনযোগ দিয়ে তার কথা শুনবে। এখন এই আকাশটাই তার একমাত্র আপনজন..! ঋতুর চারপাশে মানুষজন কোলাহল। একটু খাবারের জন্য একেকজনের নিকট হাত পেতে চিৎকার দিয়ে দিয়ে বলছে,
"আমায় একটু খাবার দেও! খুব ক্ষুধা পেটে! দয়া করে কেউ একটু খাবার ভি'ক্ষা দেও..! "
কেউ কিছু দিলো না। মানুষ এতো নি'ষ্ঠু'র কেনো? তার হৃদয় ভা'ঙা করুণ পরিস্থিতি কারো চোখে পড়ছে না...! দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে প্রশ্ন করলো ঋতু,
"আচ্ছা আকাশ..! বলতো জীবন এতো জটিল কেনো?"
ঋতু যেন গায়বী ভাবে শুনতে পাচ্ছে আকাশটা মৃদু হেসে তাকে বলছে,
"জীবন সহজ থাকে মেয়ে! শুধু তোমরা নিজেরাই কিছু ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা কিছু ভুল মানুষকে অন্ধ বিশ্বাস করে সহজ জীবনটাকে জটিল করে তোলো।"
গায়বী উওর শুনে ঋতু'র ক্ষ'ত গুলো পুনরায় জাগ্রত হলো। চিৎকার দিয়ে কান্না করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কান্নারা ও যেন সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে গিয়েছি। কতদিন আর কান্না করা যায়?য'ন্ত্র'ণাগু'লো এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে! এখন আর চাইলে কাঁদতে পারে না।
বুক চিড়ে বেরিয়ে আসলো ভারী দীর্ঘ নিঃশ্বাস! সাথে সাথে আফসোস হচ্ছে, "ইশশ যদি সে জসিম'কে অন্ধ বিশ্বাস না করতো তাহলে তার জীবন টাও সুখময় ভরে থাকতো।"
শেষ পরিণতিতে দীর্ঘশ্বাস আর আফসোস ছাড়া কিচ্ছু করার নেই তার। হঠাৎ রাস্তায় একজোড়া কাপল দেখে চোখ আটকে গেলো ঋতু'র। অপলক নয়নে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। ছেলেটার কোলে ছোট্ট একটা বাচ্চা। আবার তার একহাত শক্ত করে ধরে রয়েছে একটা মেয়ে। আহা..! তাকেও যদি কেউ এমন ভালোবেসে আগলে রাখতো..! পরক্ষনেই মনে হচ্ছে তারতো এমন ভরসার একটা হাত ছিলো, একটা বিশ্বস্ত আবিদ ছিলো..! মানুষটাকে ঠকিয়ে ভাগ্যের কাছে নিজে ঠকে গিয়েছে। এরিমধ্যে কেউ যেন ঋতু'র কানে কানে তাচ্ছিল্যের সাথে বলছে,
"এখন আর আফসোস করে কোনো লাভ নেই! সময় ঠিক তার বদলা নেয় ঋতু!
যারা অতিরিক্ত ভালোবাসা পায় তারা ভালোবাসা ধরে রাখতে পারে না কবুও। তারা সবসময় সঠিক ভালোবাসা'কে অবহেলা করে। এ-ই মানুষ গুলোই আবার জীবনে একটা সময় গিয়ে সামান্য একটু ভালোবাসা পাবার জন্য চিৎকার করে কাঁদে..! কিন্তু ভালোবাসা তখন আর ধরা দেয় না। কারণ সময় ঠিক তার প্রতিশোধ নেয়...!"
.
.
আরো কয়েক সপ্তাহ সময় চলে গেলো। ফারিহার শরীরটা ইদানিং ভালো যাচ্ছে না। তাই আজ ফারিহাকে ডক্টরের কাছে নিয়ে আসছে আবিদ। ডক্টর পরিক্ষা -নিরীক্ষা করে জানিয়েছে, অন্য কোনো সমস্যা নেই, ফারিহা মা হতে চলছে। খবরটা শুনে সবাই ভীষণ খুশী হয়েছে। আবিদ ও খুশী হয়েছে পরক্ষণে কিছু একটা ভেবে চিন্তিত সে। তবুও ফারিহাকে তা বুঝতে দিলো না। দু'জন মিলে ঘন্টাখানিক হয়েছে বাসায় এসেছে। বাসায় এসে আবিদ মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে আছে। তার ভয় হচ্ছে। চিন্তা হচ্ছে ভীষণ! গভীর ভাবে ভাবছে সে, আচ্ছা ফারিহার যখন নিজের বাচ্চা হবে তখন কি আবিদাকে মায়ের মতো এতো স্নেহ করবে? নিজের বাচ্চা পেয়ে যদি ফারিহার আচরণ পাল্টে যায়? তখন কি হবে তার ছোট্ট আবিদার। ছোট্ট মেয়ে'টার কি আজন্মকাল যাবে কষ্ট পেয়ে?
আবিদের সমস্যা ধরতে বেশি সময় লাগলো না ফারিহার। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঠিকই ধরে ফেললো আবিদের পরিবর্তন। ফারিহা রুমে এসে আবিদের পাশে বসে কাঁধে হাত রেখে মৃদু কণ্ঠে বললো,
"চিন্তা করো না আবিদার আব্বু। আমার দশ-টা সন্তান হলেও আবিদার জায়গাটা ঠিক আগের মতোই রয়ে যাবে। ফারিহা আমাদের বড় মেয়ে। ওর মুখ থেকেই আমি প্রথম "আম্মু" ডাক শুনেছি। মেয়ে'টা আমার গ'র্ভে'র সন্তান না হোক ও আমার আ'ত্মা'র সন্তান! ওর জন্য আমার ভীষণ মায়া! বিশ্বাস করো আবিদার আব্বু? ওর জায়গাটা কখনো নড়বড়ে হবে না।"
নিজের মনের কথা ফারিহার মুখে শুনে চমকালো আবিদ।মনে মনে ভরসা পেলো ফারিহার কথায়। আবেগেআপ্লুত হয়ে এক হাতে ফারিহাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
"তুমি এতো ভালো কেনে ফারিহা?"
ফারিহা হেসে বললো, "তুমি যে অনেক ভালো তাই আমিও ভালো।"
কথা শেষ করে ফারিহা দু'হাতে বাবা-মেয়ে দু'জনকে জড়িয়ে ধরলো। আবিদার কপালে গভীর চুমু খেলো।
.
.
পরদিন সকালে আবিদ নাস্তা করে রুমে সুয়ে আছে। আজ আর দোকানে যাবে না সে। একটু পরে মা'কে বরিশাল সদরে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবে। প্রতি চারমাস পরপর সুমনা বেগম'কে একবার টেস্ট করানোর জন্য ডক্টরের কাছে নিয়ে যেতে হয়। আজই সেই তারিখ। এরিমধ্য ফারিহা রুমে এসে তার পাশে সুয়ে পড়লো। তারপরে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো আবিদের মুখশ্রী'র পানে। ফারিহার মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর পুরুষটি তার স্বামী! মানুষটা এতো সুন্দর কেনো? না-কি শুধু তার চোখেই আবিদ সব থেকে সুদর্শন পুরুষ?
উত্তর মিলাতে পারলো না ফারিহা। ফারিহাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আবিদের অস্তিত্ব হচ্ছে। তবুও স্মিত হেসে প্রশ্ন করলো,
"এভাবে তাকিয়ে কি দেখছো?"
"তোমাকে দেখছি। যত দেখছি তত বার প্রেমে পড়েছি। আচ্ছা একটা কথা বলি?"
"হুম বলো।"
"জানো তোমাকে দেখলেই আমার শুধু প্রেম প্রেম পায়! তখন শুধু ভালোবাসতে ইচ্ছে করে তোমায়।"
"আচ্ছা এই ব্যাপার। কতদিন থাকবে তোমার এই প্রেম? না-কি সময়ের সাথে সাথে সব ভালোবাসা - প্রেম হারিয়ে যাবে?"
আবিদের কথায় ক্ষীণ হাসলো ফারিহা। কয়েক মিনিট সময় নিয়ে হুট করে আবিদকে জড়িয়ে ধরে মায়াবী কণ্ঠে বললো,
"আমি বার বার তোমার প্রেমে পড়বো...
আমি অসংখ্য বার তোমার প্রেমে পড়বো_
যতোটা কাছে কিংবা দূরেই থাকি না কেনো...
শত মাইল দূরত্বে থেকেও তোমার প্রেমে নিজেকে হারাবো'!
যদি বলি তোমার সাথে আমার প্রেম জন্ম জন্মান্তরের ;
যদি বলি তোমার সাথে আমার প্রেম ইহকাল পরকালের !
আমি বৃদ্ধ বয়সেও নতুন করে তোমার প্রেমে পড়বো-
তোমার সাদা চুলের প্রেমে , তোমার মুখভর্তি দাড়ির প্রেমে, তোমার ভাজ পড়া গালের প্রেমে, তোমার চশমাপরা আড় চোখে তাকানোর প্রেমে আমি তখন নতুন করে আবারও প্রেমে পড়বো'!
তুমি বারান্দায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিবে , সাথে একখানা পত্রিকা হাতে মাঝে মাঝে আমার পানে তাকাবে -
আমি তোমার তাকানো দেখে আবারও তোমার প্রেমে পড়বো।
আমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগেও আরেকবার তোমার প্রেমে পড়তে চাই_ তোমার পানে চেয়ে, তোমার প্রেমে পড়ে পৃথিবী থেকে শেষ বিদায় নিতে চাই'!
আমি বার বার তোমার প্রেমে পড়বো।আজন্মকাল তোমাকেই ভালোবাসবো আবিদার আব্বু !"
"এত যে কাছে আসতে চাও
কতটুকু সংযম আছে তোমার?
এত যে ভালোবাসতে চাও,
তার কতটুকু উত্তাপ সইতে পারবে তুমি?"
" নিজেকে সংযম রেখে তোমার কাছে মোটেও আসতে চাইছি না আমি। আমি বেসামাল হয়ে হুটহাট তোমার সাথে নিজেকে জড়াতে চাই প্রিয়। তোমার ভালোবাসা উওাপে নিজে বারংবার পো'ড়া'তে চাই।"
আবিদ শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো ফারিহাকে। তারপর দুষ্ট হেসে ফারিহাকে ফিসফিস করে বললো,
"এবার না হয় একটু বেসামাল হয়ে যাই কি বলো?"
এরিমধ্যে সুমনা বেগম হাঁক ছেড়ে বললো,
"কই রে আবিদ? তোর হলো? আরকত ক্ষণ লাগবে? আমার কিন্তু রেডি হওয়া শেষ। কতক্ষণ বসে থাকবো আমি তাড়াতাড়ি কর।"
মায়ের কথায় হুস ফিরলো দু'জনার। ফারিহার কপালে চুমু খেয়ে আবিদ পুনরায় ফিসফিস করে বললো,
"বাসায় আসি তারপর দেখবো আমার ভালোবাসার উওাপ কতটা সহ্য করতে পারো।"
ফারিহা মুচকি হাসলো।আবিদে আবার বললো,
"সাবধানে থেকো! আবিদা ও নিজের খেয়াল রেখো।"
"আচ্ছা তুমি ও সাবধানে থেকো। "
.
আবিদ কিছুক্ষণের মধ্যে মা'কে নিয়ে রওনা দিলো। ফারিহা ও আবিদা তাদের সাথে গেইট অবধি আসলো। আবিদ মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করে দিয়ে বললো,
"দুষ্টমি করবে না একদম মা। আম্মুর কথা শুনিও ঠিক আছে মা?"
"আত্তা বাবাই। তুমি আমার জন্য আর আম্মুর জন্য এওো গুলো তকলেট (চকলেট) নিয়ে এসো।"
আবিদ মৃদু হেসে সম্মতি জানালো। সুমনা বেগম ফারিহার মাথায় স্নেহতু হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
"সাবধানে থাকিস মা!"
.
.
পরন্ত বিকেল। ডক্টর দেখিয়ে সবকিছু গুছিয়ে বাসায় আসার জন্য বাসে উঠলো মা -ছেলে। আহাম'রি জটিল কোনে সমস্যা এখন আর নেই সুমনা বেগমের। সবকিছু নরমাল জানিয়ে দিয়েছে ডক্টর। তা শুনে স্বঃস্তির শ্বাস ছাড়লো আবিদ। যথাসাধ্য চেষ্টা করে শেষ বয়সটায় মা'কে একটু শান্তি দিতে। মায়ের মুখের দিকে কতক্ষণ চেয়ে রইলো আবিদ। ইশশ!মায়েদের মুখে এত মায়া কেনো? মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতেও যেন আবিদের চোখ দু'টো অন্যরক শান্তি খুঁজে পায়।
সুমনা বেগমে'র বড্ড তৃষ্ণা লাগছে। এরিমধ্য আবিদ জিজ্ঞেস করলো,
"আম্মু খাবে কিছু? কিছু লাগবে তোমার?"
"না বাবা কিছু খাবো না। তবে ভীষণ পিপাসা লাগছে।"
"আচ্ছা তুমি বসো আমি পানি নিয়ে আসছি।"
আবিদ দ্রুত পায়ে বাস থেকে নেমে গেলো। ছেলের যাওয়ার পথে একপলক তাকিয়ে সুমন বেগম জানালা থেকে বাহিরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। মিনিট খানিক পরে হঠাৎ তার চোখে পড়লো রাস্তার পাশে সুয়ে থাকা জী'র্ণ শী'র্ণ মলিন একটি মুখ। দীর্ঘদিন এক ছাদের নিচে বসবাস করার ফলে এই মুখটা চিনতে তেমন অসুবিধা হয়নি সুমনা বেগমে'র। উনি সেদিকে তাকিয়ে একদলা থুতু ফেলে দ্রুত জানালার কাচ বন্ধে করে মনে মনে বিরবির করে বললো,
"কর্মের বীজ যেভাবে বপন করবে ,
সেভাবেই ফল পাবে !
কর্মের ফল কক্ষণো বিফলে যায় না...। কক্ষণো না!"
_____________________সমাপ্ত____________________
আসসালামু আলাইকুম! প্রিয় পাঠক কেমন আছেন সবাই? আশা রাখছি ভালো আছেন সবাই। দীর্ঘদিন অনিয়মিত ভাবে গল্পটা দেওয়ার জন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। আজ বড় পর্ব দিয়ে ইতি টানলাম এখানেই। কেমন হয়েছে জানাবেন? ভুল ত্রুটি গুলো ক্ষমা করবেন। এই অতী নগন্য মানুষটিকে সম্ভব হলে আপনাদের দোয়ায় রাখবেন। আবারো দেখা হবে নতুন কোনো গল্প। সবাই ভালো থাকবেন! আল্লাহ হাফেজ!
