#মায়ের_গোপন_পাপ
পর্ব: ০৩
জানালার ওপাশে নিজের জন্মদাত্রী মায়ের মুখে এই ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের কথা শুনে আরভের পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত রাগে রি রি করে উঠল। যে বাবা দিন-রাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে এই সংসারটা আগলে রেখেছেন, তাকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ছক কষছে এই দুটো মানুষ!
আরভের ইচ্ছে করছিল এখনই চিৎকার করে বাবাকে ডেকে তোলে, কিন্তু তার চোয়ালের ব্যান্ডেজ আর শারীরিক দুর্বলতা তাকে স্তব্ধ করে রাখল। সে কোনোমতে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে দেওয়াল ধরে ধরে নিজের ঘরে ফিরে এল। খাটে শুয়ে অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়ল তার চোখ দিয়ে। আজ আর সে কাঁদছে না, আজ তার চোখ দিয়ে প্রতিশোধের আগুন ঝরছে। আরভ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, "যে মা নিজের সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলার ছক কষতে পারে, সে আর যাই হোক—আমার মা নয়। বাবাকে আমি কিচ্ছু হতে দেব না!"
পরদিন সকালে মহেশ যখন কাজের উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিলেন, তখন কবিতা অত্যন্ত যত্ন সহকারে তার হাতে জলের বোতল আর টিফিন ক্যারিয়ার তুলে দিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কত আদর্শ এক স্ত্রী! কিন্তু আরভ দূর থেকে দেখছিল কবিতার চোখের সেই কুটিল চাউনি।
মহেশ আরভের ঘরে এসে বললেন, "বাবা, আমি সাইটে যাচ্ছি। মনোজবাবু আজ নতুন একটা ঢালাইয়ের কাজের তদারকি করতে বলেছেন। তুই সাবধানে থাকিস।"
আরভ চমকে উঠল। মনোজের নাম শুনতেই কাল রাতের কথাগুলো তার মাথায় ঘুরতে লাগল। 'দুর্ঘটনা'... তার মানে কি আজই সেই দিন? আরভ বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। সে বাবাকে ইশারায় বোঝাতে চাইল যেন আজ উনি কাজে না যান। কিন্তু মহেশ ওর অস্থিরতা বুঝতে না পেরে বললেন, "চিন্তা করিস না বাবা, আমি দুপুরের মধ্যেই ফিরে আসব।"
মহেশ চলে যাওয়ার পর কবিতা রান্নাঘরে গিয়ে খুশিমনে গুনগুন করে গান গাইতে লাগল। আরভের আর বুঝতে বাকি রইল না যে, আজই বাবার ওপর কোনো বড় বিপদ আসতে চলেছে। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে নিজের ঘরে গিয়ে একটা পাঞ্জাবি গায়ে গলিয়ে নিল। শরীর প্রচণ্ড দুর্বল, চোয়ালে তীব্র ব্যথা, কিন্তু বাবার জীবনের চেয়ে বড় আর কিছুই হতে পারে না।
কবিতা যখন বাথরুমে ঢুকল, সেই সুযোগে আরভ বাড়ি থেকে পা টিপে টিপে বেরিয়ে গেল। লখনউয়ের তপ্ত রোদের মধ্যে সে একটা অটো ধরে সরাসরি চলে এল সেই কনস্ট্রাকশন সাইটে, যেখানে মহেশ কাজ করেন।
সাইটে পৌঁছে আরভ দেখল বিশাল এক চারতলা বিল্ডিংয়ের কাজ চলছে। চারদিকে শ্রমিকদের কোলাহল, সিমেন্ট মিক্সার মেশিনের আওয়াজ। আরভ ভিড়ের মাঝে তার বাবাকে খুঁজতে লাগল।
ঠিক তখনই সে ওপরের দিকে তাকাল। চারতলার ছাদের একদম কিনারায় দাঁড়িয়ে মহেশ নিচের দিকে ঝুঁকে লোহার রড গোনার কাজ করছিলেন। আর তার ঠিক কয়েক হাত পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল মনোজ চৌহান! মনোজের চোখ দুটো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল, যেন সে সঠিক সুযোগের অপেক্ষা করছে। চারপাশের শ্রমিকরা সবাই নিচে ব্যস্ত, ওপরের দিকে কারো নজর নেই।
আরভ দেখল মনোজ গুটিগুটি পায়ে মহেশের পেছনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার হাত দুটো মহেশের পিঠের দিকে তাক করা। মনোজ মহেশকে ওপর থেকে নিচে ফেলে দিয়ে 'দুর্ঘটনা' বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে!
"বা...বা...!" আরভ নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করল, কিন্তু চোয়াল তারে বাঁধা থাকায় তার মুখ থেকে শুধু একটা অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ বের হলো, যা মিক্সার মেশিনের আওয়াজে তলিয়ে গেল।
মনোজ তখন মহেশের একদম কাছে পৌঁছে গেছে। আর এক সেকেন্ড, তার পরই সে ধাক্কাটা দেবে!
আরভ আর এক মুহূর্তও না ভেবে মাটির ওপর পড়ে থাকা একটা ভারী লোহার রড কুড়িয়ে নিল। শরীরের সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে, এক অলৌকিক শক্তিতে সে সিঁড়ি বেয়ে তড়তড় করে চারতলার দিকে দৌড়াতে শুরু করল।
ওপরে তখন মনোজ হাত বাড়িয়েছে মহেশকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য... ঠিক তখনই...
মনোজ যখন তার কুৎসিত হাত দুটো বাড়িয়ে মহেশকে চারতলার ছাদ থেকে ধাক্কা দিতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে আরভ বাঘের মতো ছিটকে এসে মনোজের পিঠে লোহার রড দিয়ে এক মারাত্মক আঘাত করল!
"আহহহ!" এক তীব্র আর্তনাদ করে মনোজ মেঝেতে আছড়ে পড়ল।
হঠাৎ এই শব্দে মহেশ চমকে পেছন ফিরে তাকালেন। সামনের দৃশ্য দেখে তার চোখ চড়কগাছ! মাটিতে পড়ে ব্যথায় ছটফট করছে মনোজ চৌহান, আর তার সামনে লোহার রড হাতে দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের ছেলে আরভ। আরভের সারা শরীর কাঁপছে, চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে।
"আরভ! তুই এখানে? আর মনোজবাবুকে তুই..." মহেশ কিছুই বুঝতে না পেরে আরভের দিকে এগিয়ে এলেন।
মনোজ পিঠের ব্যথা সামলে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, "মহেশ! দেখ তোমার গুণধর ছেলের কাণ্ড! আমি সাইট পরিদর্শনে এসেছি আর ও পেছন থেকে আমাকে রড দিয়ে মারল! পাগল হয়ে গেছে নাকি ও?"
ততক্ষণে নিচের শ্রমিকরা চিৎকার শুনে ওপরে ছুটে এসেছে। মনোজ নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে শ্রমিকদের বলল, "ধরো এই ছেলেকে! পুলিশে দাও! ও আমাকে খুন করতে এসেছিল!"
আরভ আর চুপ থাকল না। সে পকেট থেকে তার মোবাইল ফোনটা বের করল। কাল রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে শুধু ওদের কথা শোনেনি, নিজের কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে মনোজ আর কবিতার পুরো কথোপকথনের একটা অডিও রেকর্ড করে রেখেছিল। আরভ কাঁপা হাতে অডিওটা প্লে করে মহেশের সামনে ধরল।
বাতাসে ভেসে এল কবিতার ফিসফিসানি গলা—"মহেশকে সরানোর ব্যবস্থা আমি করছি, কেউ বুঝতেই পারবে না ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিল..." আর তার জবাবে মনোজের চিলতে হাসি—"ও মাঝখান থেকে সরে গেলেই তো এই পুরো বাড়ি আর সাইটের সব টাকা আমাদের!"
রেকর্ডিংটা বাজার সাথে সাথে পুরো ছাদ জুড়ে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। মনোজের মুখের রঙ মুহূর্তের মধ্যে উবে গেল। সে পেছনের দিকে দু-পা পিছিয়ে গেল।
মহেশ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মনে হলো চারপাশের সবকিছু যেন ঘুরছে। যে স্ত্রীকে তিনি জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন, যার সব আবদার পূরণ করতে দিন-রাত ঘাম ঝরিয়েছেন, সে তার টাকার জন্য, অন্য একটা পুরুষের জন্য তাকে খুন করার ছক কষছিল? আর যে মনোজকে ভাই বলে বুকে টেনে নিয়েছিলেন, সে-ই তার পিঠে ছুড়ি মারল!
মহেশের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। তবে সেই জল দুর্বলতার ছিল না, ছিল এক চরম ঘৃণার। তিনি আরভের হাত থেকে রডটা নিজের হাতে নিলেন। মহেশের সেই শান্ত কিন্তু ভয়ঙ্কর রূপ দেখে মনোজ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, "মহেশ... মহেশ বিশ্বাস করো, এটা আমি..."
কথা শেষ করার সুযোগ পেল না মনোজ। মহেশ নিজের জীবনের সমস্ত ক্ষোভ আর শক্তি দিয়ে মনোজের মুখে এক জোরালো ঘুসি মারলেন। মনোজ ছিটকে গিয়ে সিমেন্টের বস্তার ওপর পড়ল। এরপর সাইটের শ্রমিকরাই সত্য জানতে পেরে মনোজের ওপর চড়াও হলো এবং তাকে গণধোলাই দিয়ে বেঁধে পুলিশের হাতে তুলে দিল।
বিকেলে মহেশ আর আরভ যখন বাড়ি ফিরল, তখন কবিতা ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে মনের সুখে টিভি দেখছিল আর ভাবছিল এতক্ষণে হয়তো তার পথের কাঁটা দূর হয়ে গেছে।
দরজা খোলার শব্দ হতেই সে হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু মহেশ আর আরভকে একসাথে অক্ষত অবস্থায় ঘরে ঢুকতে দেখে তার মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল।
"তু...তুমি? তোমরা একসাথে?" কবিতা তোতলামি করতে লাগল।
মহেশ কোনো কথা না বলে কবিতার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর পকেট থেকে ডিভোর্স পেপার আর কবিতার কাপড়ের ব্যাগটা সোফায় ছুঁড়ে ফেললেন।
কবিতা ঘাবড়ে গিয়ে বলল, "এসব কী মহেশ?"
"পুলিশ মনোজকে অ্যারেস্ট করেছে কবিতা। আর ও নিজের চামড়া বাঁচাতে তোর নামও পুলিশকে বলে দিয়েছে," মহেশের গলা আজ একদম শান্ত, কিন্তু সেই শান্ত গলার নিচে এক তীব্র দহন ছিল। "তোর মতো একটা নোংরা, খুনি মহিলার সাথে এই বাড়িতে কাটানো আমার প্রতিটা মুহূর্ত এখন আমার কাছে নরক মনে হচ্ছে। এখনই এই বাড়ি থেকে বের হয়ে যা!"
কবিতা বুঝতে পারল তার সব পাপের ঘড়া ভেঙে গেছে। সে আরভের পা চেপে ধরে কাঁদতে লাগল, "আরভ বাবা, তুই তোর মাকে বাঁচা! আমি ভুল করেছি বাবা, আমাকে মাফ করে দে!"
আরভ আলতো করে নিজের পা টান মেরে সরিয়ে নিল। সে ডায়েরিতে শেষবারের মতো একটা লাইন লিখে কবিতার সামনে ধরল:
"যে মা নিজের সন্তানের ওপর অত্যাচার চুপচাপ দেখে আর স্বামীর জীবন নিতে একটুও কাঁপে না... সে কোনোদিন মা হতে পারে না। আজ থেকে আমার কোনো মা নেই।"
পুলিশের গাড়ি ততক্ষণে বাড়ির সামনে এসে হর্ন বাজাল। মনোজের বয়ানের ভিত্তিতে পুলিশ কবিতাকেও গ্রেফতার করতে এসেছে। কবিতা কাঁদতে কাঁদতে, নিজের পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে পুলিশের গাড়িতে গিয়ে বসল। পাড়ার মানুষ থুথু দিচ্ছিল তার দিকে।
বাড়িটা একদম শান্ত হয়ে গেল। মহেশ আরভকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠলেন। আরভও তার বাবাকে শক্ত করে ধরে রাখল। আজ তাদের চোয়ালে কিংবা বুকে হয়তো অনেক ক্ষত, কিন্তু তারা একে অপরকে হারায়নি। আরভ মনে মনে ভাবল, মায়ের পাপের অন্ধকার হয়তো তাদের পরিবারকে গ্রাস করতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবার সরলতা আর ছেলের ভালোবাসার কাছে সেই অন্ধকার আজ চিরতরে হেরে গেল।
(সমাপ্ত)
গল্পটি আপনার কেমন লেগেছে? আরভের এই সাহসিকতা এবং গল্পের শেষ পরিণতি নিয়ে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্ট বক্সে জানাতে ভুলবেন না কিন্তু!
গল্পের শেষ ও চূড়ান্ত পর্ব (৫ম পর্ব) দেখতে চাইলে এখনই কমেন্ট বক্সে আপনার মন্তব্য জানান!
