#মায়ের_গোপন_পাপ
পর্ব: ০২
মহেশ যখন হন্তদন্ত হয়ে ওয়ার্ডের ভেতরে ঢুকলেন, তখন তার চোখ-মুখ জুড়ে চরম আতঙ্ক। বিছানায় ছেলের রক্তাক্ত, ফুলে যাওয়া মুখ দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি আরভের বিছানার পাশে এসে বসে পড়লেন, তার হাত দুটো কাঁপছিল।
"আরভ! বাবা আমার, এ কী হাল হয়েছে তোর? কীভাবে হলো এসব?" মহেশের গলা বুজে এল। দিন-রাত এক করে যে ছেলের ভবিষ্যতের জন্য তিনি খাটছেন, তাকে এই অবস্থায় দেখে তিনি যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
কবিতা চোখের জল মুছে চটজলদি মহেশের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার গলা কাঁপছিল, কিন্তু সেটা ভয়ের চেয়ে বেশি ছিল নিজের অপরাধ ঢাকার মরিয়া চেষ্টা। সে মহেশের হাত ধরে বলল, "তুমি একটু শান্ত হও। ডাক্তারবাবু বলেছেন চোয়ালে চোট লেগেছে, এখন বেশি কথা বলা বারণ। আসলে... কলেজ থেকে ফেরার পথে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে একদম নিচে পড়ে গেছে আমাদের ছেলে। ওপর থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ায় এই অবস্থা..."
মহেশ স্তম্ভিত হয়ে আরভের দিকে তাকালেন। "সিঁড়ি থেকে পড়ে এত বড় চোট? কিন্তু ওর পাঁজরেও তো দেখছি ব্যান্ডেজ! আর মুখটা এমন ফুলে গেছে যেন..." মহেশের মনে কোথাও একটা খটকা লাগল। একজন সাইট সুপারভাইজার হিসেবে তিনি বহু দুর্ঘটনা দেখেছেন, এই ক্ষতগুলো কোনো পতন থেকে হওয়া ক্ষতের মতো লাগছিল না।
তিনি আরভের একদম কাছে গিয়ে বসলেন। আরভের চোখে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। সেই জল শারীরিক কষ্টের নয়, সেই জল নিজের মায়ের চরম বিশ্বাসঘাতকতা আর বাবার সরলতার জন্য। আরভ কথা বলতে পারছিল না, তার চোয়াল তারে বাঁধা। কিন্তু তার চোখ দুটো চিৎকার করে সত্যটা বলতে চাইছিল।
কবিতা আরভের চোখের সেই ভাষা বুঝতে পেরে ভেতরে ভেতরে কেপে উঠল। সে মহেশের মনোযোগ ঘোরাতে তাড়াতাড়ি বলল, "আহা, তুমি এখন ওকে জেরা করা বন্ধ করবে? ছেলেটা এমনিতেই ব্যথায় মরছে। তুমি বরং নিচে গিয়ে ওষুধের বিলটা মিটিয়ে এসো, ডাক্তারবাবু ওষুধগুলো আনতে বলেছেন।"
মহেশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে তার জমানো টাকার পার্সটা বের করলেন। আরভের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বললেন, "তুই চিন্তা করিস না বাবা, আমি আছি তো। আমি এখনই আসছি।"
মহেশ ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে যেতেই কবিতার মুখের অবয়ব পুরোপুরি বদলে গেল। সে আরভের দিকে ঝুঁকে এসে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বলল, "যেটুকু বলেছি, সেটুকুই যেন তোর বাবা জানে! যদি একটা কথাও এদিক-ওদিক হয়, তবে তোর এই খেটে খাওয়া সরল বাবা স্ট্রোক করে ওখানেই মারা যাবে। তুই চাস তোর বাবাকে খুন করতে? আর মনোজ কত বড় প্রভাবশালী লোক তুই জানিস? ও চাইলে আমাদের পুরো পরিবারকে রাস্তায় বসিয়ে দিতে পারে!"
আরভ চোখ বন্ধ করে নিল। তার নিজের মায়ের এই রূপ সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। যে মা তাকে ছোট থেকে নীতিশিক্ষা দিয়েছে, সে আজ নিজের পাপ ঢাকতে বাবার জীবন আর পরিবারের সম্মানের দোহাই দিচ্ছে!
পরদিন বিকেলে আরভকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করা হলো। বাড়িতে ফেরার পর পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে রইল। মহেশ আরভের ঘরে এসে বসলেন। কবিতা তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকার ভান করছিল।
মহেশ ঘরের দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দিলেন। আরভের খাটের পাশে বসে অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন, "আরভ, তুই এখন বড় হয়েছিস। তোর বাবার বয়স হতে পারে, কিন্তু চোখ দুটো এখনো অন্ধ হয়ে যায়নি। সিঁড়ি থেকে পড়ে গেলে মানুষের পাঁজরে কালশিটে পড়ে না, আর চোয়াল ওভাবে ভেঙে যায় না। তোকে কেউ মেরেছে, তাই না বাবা?"
বাবার এই প্রশ্নে আরভ চমকে উঠল। তার চোখের কোণ দিয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়ল।
মহেশ আরভের হাতটা নিজের শক্ত, খসখসে হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন, "তুই ইশারায় আমাকে বল আরভ, কে করেছে এটা? মনোজ চৌহান? ওই ঠিকাদার নাকি অন্য কেউ? আমি কাল সাইটে মনোজের গাড়ির চাকার দাগ দেখেছি আমাদের বাড়ির সামনে। তুই সত্যিটা বল, আমি তোকে ছাড়া আর কাউকেই বিশ্বাস করি না।"
ঠিক তখনই দরজার বাইরে একটা কাচের গ্লাস হাত থেকে পড়ে ভেঙে যাওয়ার শব্দ হলো। আরভ ও মহেশ দুজনেই দরজার দিকে তাকালেন। বাইরে কবিতা দাঁড়িয়ে ছিল, তার মুখটা ভয়ে একেবারে নীল হয়ে গেছে।
কাচের গ্লাসটা ভেঙে পড়ার শব্দে ঘরের ভেতরের থমথমে ভাবটা এক পলকে চূর্ণ হয়ে গেল। মহেশ দ্রুত উঠে গিয়ে দরজা খুললেন। বাইরে কবিতা কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে আছে, তার পায়ের কাছে কাচের টুকরো আর জল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
মহেশ ভ্রু কুঁচকে কবিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, "কী হলো কবিতা? এভাবে কাঁপছ কেন? আর তোমার মুখটা এমন শুকিয়ে গেছে কেন?"
কবিতা কোনোমতে নিজের গলার ভেতর দলা পাকানো ভয়টা গিলে নিয়ে বলল, "না... মানে, হাত থেকে পিছলে পড়ে গেল। আসলে তোমরা ঘরের দরজা বন্ধ করে কী এত কথা বলছ? আরভ তো কথাই বলতে পারছে না, ওকে এখন একটু শান্তিতে ঘুমাতে দাও না!" সে জোর করে একটা মিথ্যে হাসির মুখোশ মুখে টেনে আনার চেষ্টা করল, কিন্তু মহেশের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে সেই মুখোশ টিকছিল না।
মহেশ কবিতার দিকে গভীর চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। তারপর চিবুক শক্ত করে বললেন, "আমি আমার ছেলের সাথে কথা বলছি কবিতা। আর বাবা-ছেলের মাঝে কোনো লুকোছাপা থাকে না। তুমি ভাঙা কাচগুলো পরিষ্কার করো।"
মহেশ আবার ঘরের দরজাটা টেনে দিলেন। তিনি আরভের দিকে ফিরে এসে বসলেন। আরভের বুকটা তখন দুরুদুরু কাঁপছে। সে একদিকে বাবার সরলতা আর ভালোবাসা দেখছে, অন্যদিকে মায়ের সেই ভয়ঙ্কর হুমকি—"তোর বাবা স্ট্রোক করে মারা যাবে!" আরভ বুঝতে পারছিল না সে কী করবে। এক চরম ধর্মসংকটে পড়ে গেছে ২৩ বছরের ছেলেটা।
মহেশ আরভের মাথায় হাত রেখে বললেন, "বল আরভ। তুই ইশারায় শুধু মাথা নেড়ে আমাকে 'হ্যাঁ' বা 'না' বল। তোকে কি মনোজ মেরেছে?"
আরভ তার বাবার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আরভের প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসা। আরভ যদি এখন সত্যিটা বলে দেয়, তবে তার বাবার পায়ের তলার মাটি সরে যাবে। যে মানুষটাকে বাবা এত বিশ্বাস করে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন, সেই মানুষটাই তার স্ত্রীর ঘরে...। এই আঘাত মহেশ সহ্য করতে পারবেন না।
আরভ অনেক কষ্ট করে নিজের মাথাটা দুদিকে নাড়ল। অর্থাৎ, 'না'।
মহেশ অবাক হয়ে বললেন, "মনোজ নয়? তাহলে কার গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল বাইরে? তোকে কে এই হাল করল বাবা?"
আরভ টেবিলের ওপর রাখা একটা ডায়েরি আর কলম ইশারায় চাইল। মহেশ তাড়াতাড়ি সেগুলো তার হাতে দিলেন। ভাঙা চোয়াল আর ব্যথায় কাঁপতে কাঁপতে আরভ ডায়েরির পাতায় লিখল:
"বাবা, মনোজবাবু এসেছিলেন তোমার খোঁজে। তুমি সাইটে ছিলে তাই মা ওনাকে চলে যেতে বলেন। আর আমার এই অবস্থা কলেজের কিছু সিনিয়র ছেলেদের সাথে ঝামেলার জন্য হয়েছে। ওরা রড দিয়ে মেরেছে। পরিবারের সম্মানের ভয়ে মাকে মিথ্যা বলতে বলেছিলাম। মাকে দোষ দিও না।"
মিথ্যেটা লিখতে গিয়ে আরভের কলম কাঁপছিল, বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। কিন্তু নিজের সৎ, পরিশ্রমী বাবাকে বাঁচানোর জন্য তাকে আজ নিজের মায়ের পাপ আড়াল করতে হলো।
মহেশ ডায়েরির লেখাটা পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখের সন্দেহ কিছুটা কমল, কিন্তু রাগ কমল না। "কলেজের ছেলেগুলো এত বড় সাহস! তোকে এভাবে মারল? আমি কালই থানায় যাব আরভ!"
আরভ আবার খাতায় লিখল: "প্লিজ বাবা, পুলিশ করো না। ওরা পলিটিক্স করে, ঝামেলা আরও বাড়বে। আমি সুস্থ হয়ে নিজেই সব দেখে নেব। তুমি শুধু শান্ত থাকো।"
মহেশ ছেলের হাত চেপে ধরে বললেন, "ঠিক আছে বাবা। তুই যা বলবি তাই হবে। তুই সুস্থ হয়ে ওঠ আগে।"
মহেশ ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কবিতা গুটিগুটি পায়ে ঘরের ভেতরু ঢুকল। দরজা বন্ধ করে সে আরভের খাটের পাশে এসে দাঁড়াল। আরভের হাত থেকে ডায়েরিটা কেড়ে নিয়ে লেখাগুলো দেখল সে। নিজের পাপ ঢাকা পড়েছে দেখে কবিতার চোখে এক অদ্ভুত স্বস্তির ছোঁয়া দেখা দিল।
সে আরভের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, "তোর এই উপকারের কথা আমি ভুলব না আরভ। তুই আজ আমাদের সবাইকে বাঁচিয়ে দিলি।"
আরভ চোখ দিয়ে তীব্র ঘৃণা উগরে দিল নিজের মায়ের প্রতি। সে ডায়েরিতে আবার লিখল: "আমি তোমাকে বাঁচাইনি। আমি আমার বাবাকে বাঁচিয়েছি। তবে মনে রেখো, পাপ কখনো চাপা থাকে না। যেদিন বাবা নিজে সব জানতে পারবেন, সেদিন আমি আর তোমাকে বাঁচাবো না।"
কবিতা আরভের চোখের সেই তীব্র ঘৃণা সহ্য করতে না পেরে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কয়েকদিন কেটে গেল। আরভ আস্তে আস্তে সুস্থ হচ্ছিল, তরল খাবার খেয়ে দিন কাটছিল তার। কিন্তু এর মধ্যেই এক রাতে আরভের ঘুম ভেঙে গেল বাড়ির পেছনের দিকের জানালার পাশে কারো ফিসফিসানি আওয়াজে।
রাত তখন প্রায় একটা। মহেশ পাশের ঘরে ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছেন। আরভ দেয়াল ধরে ধরে পা টিপে টিপে পেছনের জানালার দিকে এগিয়ে গেল। চাঁদের আলোয় বাইরের দৃশ্য দেখে আরভের গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল।
বাড়ির পেছনের বাগানের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে মনোজ চৌহান! আর তার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে কবিতা!
মনোজ নিচু গলায় হাসতে হাসতে কবিতার কোমরে হাত দিয়ে বলল, "তোমার ছেলে তো বেশ ভালোই শিক্ষা পেয়েছে। মুখ একদম বন্ধ! এখন বলো, মহেশকে কবে রাস্তা থেকে সরাচ্ছ? ও মাঝখান থেকে সরে গেলেই তো এই পুরো বাড়ি আর সাইটের সব টাকা আমাদের!"
কবিতা মনোজের বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, "তুমিও যেমন না মনোজ! একটু ধৈর্য ধরো। মহেশকে সরানোর ব্যবস্থা আমি করছি, কেউ বুঝতেই পারবে না ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিল..."
জানালার আড়ালে দাঁড়িয়ে আরভের পুরো শরীর রাগে কাঁপতে শুরু করল। চোয়ালের ক্ষত ভুলে সে নিজের দাঁত কামড়ে ধরল। যে মা নিজের স্বামীর জীবন নেওয়ার ছক কষছে, সে আর যাই হোক, মা হতে পারে না!
চলবে,,,,,,,,,
