খাঁচার ভেতর খাঁচা
পর্ব: ০৪+০৫+শেষ পর্ব
​#Choto_Dairy_01

​“২টোর পর আয়েশা এমনিতেই শেষ!”
​নয়নার মুখ থেকে কথাটা বের হওয়া মাত্রই কেবিনের ভেতরের সবাই যেন পাথর হয়ে গেল। আমার চোখের সামনে দেয়ালঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটাটা যেন এক একটা ধারালো ছুরির মতো ঘুরছিল। দুপুর একটা বেজে ছাপান্ন মিনিট! আর মাত্র চার মিনিট বাকি!
​“ফাতেমা! স্যালাইনটা খোলো! এক্ষুনি!” ডাক্তারবাবু চিৎকার করে উঠলেন।
​নার্স ফাতেমা আপা পলকের মধ্যে নিজের আতঙ্ক কাটিয়ে তীরের মতো আমার বিছানার পাশে ছুটে এলেন। ওনার কাঁপানো হাত দিয়ে চট করে আমার হাতের ক্যানুলা থেকে স্যালাইনের পাইপটা হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেললেন। কিছুটা রক্ত ছিটকে এসে লাগল বিছানার সাদা চাদরে। কিন্তু ওনার মুখ তখনো ফ্যাকাশে।
​“স্যার, স্যালাইনের অর্ধেক বোতল ইতিমধ্যেই ওনার শরীরে চলে গেছে!” ফাতেমা আপার গলায় চরম আতঙ্ক।
​আমি আমার ডান হাতের দিকে তাকালাম। শিরার ভেতর দিয়ে যেন একটা হিমশীতল ঠান্ডা স্রোত আমার বুকের দিকে এগিয়ে আসছিল। আস্তে আস্তে আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল, চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হতে শুরু করল।
​ইন্সপেক্টর বাবু ততক্ষণে বাকি পুলিশদের নিয়ে কেবিনে ঢুকে পড়েছেন। ডাক্তারবাবু দ্রুত আমার চোখের মণি পরীক্ষা করতে করতে বললেন, “আয়েশা বেগম! আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন? রাঘব সায়েন্টিফিক ল্যাব থেকে যে রাসায়নিক চুরি করেছিল, এটা তারই অংশ। এটা একটা স্লো-পয়জন, যা হার্ট অ্যাটাক তৈরি করে। আমাদের এক্ষুনি ওনার স্টমাক ওয়াশ আর অ্যান্টিডোটের ব্যবস্থা করতে হবে! ওনাকে আইসিইউতে শিফট করুন!”
​চারপাশে একটা হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল। ট্রলি এনে আমাকে যখন আইসিইউর দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, আমি আবছা আলো-ছায়ার মাঝে দেখতে পেলাম নয়না করিডোরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। ফাতেমা আপা ওকে ধরে রেখেছেন।
​আমার মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো আর বাঁচব না। বিশ বছরের এই নরককঙ্কাল জীবনটা কি এভাবেই শেষ হয়ে যাবে? রাঘব জিতেছে, ও শেষ পর্যন্ত আমাকে মেরেই ফেলল।
​কিন্তু না, আমার ভেতরের মা-টা তখনো মরেনি। আমি মরে গেলে নয়নাকে বাঁচাবে কে? রাঘব তো ওকেও ছাড়বে না! আমাকে বাঁচতেই হবে।
​.
​পরের কয়েকটা ঘণ্টা আমার কাটে এক অদ্ভুত অন্ধকার জগতে। কখনো তীব্র আলোর ঝলকানি, কখনো ডাক্তারদের চিৎকার, আর কখনো আমার বুকের ওপর একটা প্রচণ্ড চাপ। আমার মনে হচ্ছিল, আমি একটা গভীর কুয়োর নিচে তলিয়ে যাচ্ছি, আর ওপর থেকে রাঘব আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
​যখন আমার চোখ খুলল, তখন চারপাশটা একদম শান্ত। জানলা দিয়ে বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়ছে ঘরের মেঝেতে। আমার মুখে একটা অক্সিজেনের মাস্ক লাগানো।
​“আম্মু! তুমি চোখ খুলেছ?”
​পাশ থেকেই একটা চেনা গলার আওয়াজ পেয়ে আমি আস্তে আস্তে মাথা ঘোরালাম। নয়না বসে আছে। ওর চোখ দুটো ফুলে ছোট হয়ে গেছে, চুলগুলো উসকোখুসকো। কিন্তু ওর চোখে এখন আর সেই ভয়টা নেই, বরং সেখানে একটা জেদ দেখতে পেলাম।
​আমি মাস্কটা একটু সরিয়ে দুর্বল গলায় বললাম, “নয়না… আমি ঠিক আছি মা।”
​ঠিক তখনই কেবিনের দরজা খুলে ইন্সপেক্টর বাবু আর নার্স ফাতেমা আপা ভেতরে ঢুকলেন। ওনাদের মুখে গভীর চিন্তার রেখা।
​“আয়েশা বেগম, আপনি সত্যিই ভাগ্যবতী। ডাক্তারদের কয়েক ঘণ্টার লড়াই আর ফাতেমা আপার সঠিক সময়ের সিদ্ধান্তের জন্য বিষটা আপনার হার্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি,” ইন্সপেক্টর বললেন। “কিন্তু আমাদের হাতে সময় খুব কম। রাঘবকে এখনো ধরা যায়নি।”
​“মিরপুরের ওই বাড়িতে পুলিশ যায়নি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
​ইন্সপেক্টর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “গিয়েছিল। কিন্তু বাড়িটা ফাঁকা। তবে সেখানে আমরা একটা ভয়ানক জিনিস পেয়েছি। রাঘব সেখানে সুলেমানের মরদেহের বাকি অংশগুলো লোপাট করার ব্যবস্থা করছিল। কিন্তু পুলিশ যাওয়ার ঠিক দশ মিনিট আগে ও টের পেয়ে পালিয়ে যায়। আর যাওয়ার আগে ও একটা ল্যাপটপ অন রেখে গেছে, যেখানে একটা কাউন্টডাউন টাইমার চলছে।”
​“কাউন্টডাউন টাইমার?” নয়না অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
​“হ্যাঁ,” ইন্সপেক্টর গম্ভীর গলায় বললেন। “টাইমারে আর মাত্র তিন ঘণ্টা বাকি আছে। আর ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা বার্তা লেখা ছিল—‘আয়েশা যদি বেঁচে যায়, তবে ও নিজেই ওর মেয়ের চিতা জ্বালাবে। আজ রাত আটটায় মিরপুরের বাড়িতে খেলা শেষ হবে।’”
​আমার সারা শরীর আবার আতঙ্কে হিম হয়ে গেল। রাত আটটা! এখন বিকেল পাঁচটা বাজে। রাঘব আমাদের মিরপুরের বাড়িতেই ডাকছে। ও জানে পুলিশ ওখানে পাহারা দিচ্ছে, তাও ও সেখানে আমাদের ডাকছে। এটা নির্ঘাত কোনো বড় ফাঁদ!
​নয়না হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। ওর ছোট ছোট হাত দুটো মুঠো হয়ে গেল। “ইন্সপেক্টর কাকু, আমি যাব মিরপুরের বাড়িতে। আমি আর ভয় পাব না।”
​“পাগল হয়েছ নয়না?” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, কিন্তু বুকটা যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। “ও তোকে মেরে ফেলবে!”
​“না আম্মু,” নয়না আমার দিকে তাকাল, ওর চোখে এখন এক অদ্ভুত আলো। “বাবা এত বছর আমাদের ভয় দেখিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। আজ আমি বুঝেছি, বাবার আসল শক্তি আমাদের ভয়। আমরা যদি ভয় পাওয়া বন্ধ করে দিই, ও কিচ্ছু করতে পারবে না। তা ছাড়া, বাবা একা নয়। বাবার সাথে অন্য কেউ আছে।”
​ইন্সপেক্টরের কান খাড়া হয়ে উঠল। “অন্য কেউ? নয়না, তুমি কী বলছ?”
​নয়না বলল, “কাল রাতে বাবা যখন সুলেমান আঙ্কেলকে মারছিল, তখন গাড়িতে বসে আমি বাবার ফোনে একটা মেসেজ আসতে দেখেছিলাম। সেখানে লেখা ছিল—‘কাজ শেষ করে ল্যাবের ফাইলগুলো নিয়ে মিরপুরের বাড়িতে চলে এসো। পুলিশ কমিশনারের সাথে আমার কথা হয়ে গেছে, কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না।’”
​ইন্সপেক্টর বাবুর মুখটা এক মুহূর্তে কালো হয়ে গেল। উনি ওনার হাতের ওয়াকিটকিটার দিকে তাকালেন। ওনার নিজের ডিপার্টমেন্টেরই কেউ রাঘবকে সাহায্য করছে! তার মানে, পুলিশ ফোর্সের ভেতরেই রাঘবের কোনো বড় গডফাদার লুকিয়ে আছে, যে সুলেমানের ফাইলগুলো চায়!
​ইন্সপেক্টর বাবু ওনার ওয়াকিটকিটা বন্ধ করে দিলেন। ওনার চোখ দুটো শক্ত হয়ে উঠল। “আয়েশা বেগম, নয়না ঠিকই বলেছে। এই খাঁচাটা শুধু রাঘবের তৈরি নয়, এর পেছনে আরও বড় কোনো শিকারী আছে। আমরা যদি এখন সরকারিভাবে ফোর্স পাঠাই, রাঘব আগেই খবর পেয়ে যাবে। আমাদের নিজেদের রিস্কে খেলতে হবে।”
​ফাতেমা আপা এগিয়ে এলেন। “স্যার, আমি আয়েশা আপার সাথে থাকব। ওনার এই অবস্থায় একজন নার্স দরকার।”
​আমি নয়নার হাতটা ধরলাম। বিশ বছর ধরে আমি শুধু মার খেয়েছি, লুকিয়েছি, আর মিথ্যা বলেছি। কিন্তু আজ আমার মেয়ের জীবনের শেষ লড়াই। এই খাঁচাটা ভাঙতেই হবে, নয়তো এই খাঁচায় আমাদের দুজনেরই লাশ পড়বে।
​“চলুন,” আমি উঠে বসার চেষ্টা করলাম। “আমি যাব মিরপুরের বাড়িতে। রাঘবকে আমি নিজেই শেষ করব।”
​বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামছে। ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে আমাদের গাড়িটা যখন মিরপুরের সেই অন্ধকার, পরিত্যক্ত বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, আমরা কেউ জানতাম না—সেখানে আমাদের জন্য কী ভয়ানক সত্য অপেক্ষা করছে।
​চলবে...
(৫ম পর্বে চোখ রাখুন)

খাঁচার ভেতর খাঁচা
​পর্ব: ০৫
​#Choto_Dairy_01
​সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। মিরপুর ১০ নম্বরের সি-ব্লকের সেই পরিত্যক্ত বাবার বাড়িটার সামনে যখন আমাদের গাড়িটা এসে থামল, তখন চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। জীর্ণ দেওয়াল, শ্যাওলা ধরা গেট আর চারপাশের বড় বড় গাছগুলো যেন কোনো এক অশুভ সংকেত দিচ্ছিল। এই বাড়িতেই আমার শৈশব কেটেছিল, আর আজ এখানেই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়া খেলতে এসেছি।
​গাড়িতে আমরা চারজন—আমি, নয়না, ইন্সপেক্টর বাবু আর নার্স ফাতেমা আপা। ডিপার্টমেন্টের ভেতরের বিশ্বাসঘাতকের কথা জানতে পেরে ইন্সপেক্টর বাবু ওপর মহলে কোনো খবর দেননি। আমরা এসেছি সম্পূর্ণ নিজেদের ঝুঁকিতে, কোনো ব্যাকআপ ফোর্স ছাড়া।
​“আয়েশা আপা, আপনি ঠিক আছেন তো?” ফাতেমা আপা আমার কপালে হাত দিলেন। বিষের প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি, শরীরটা এখনো কাঁপছে। কিন্তু ভেতরের জেদটা আমাকে সোজা করে বসিয়ে রেখেছে।
​“আমি ঠিক আছি, ফাতেমা। আজ এর একটা এপার-ওপার করেই ছাড়ব,” আমি শক্ত গলায় বললাম।
​ইন্সপেক্টর বাবু ওনার রিভলভারটা চেক করে নিলেন। “টাইমারে আর মাত্র ত্রিশ মিনিট বাকি। রাঘব ভেতরেই আছে। নয়না, তুমি আর তোমার মা আমার ঠিক পেছনে থাকবে। ফাতেমা, আপনি গাড়িতেই থাকুন।”
​“না স্যার, আমি আয়েশা আপাকে এই অবস্থায় একা ছাড়ব না,” ফাতেমা আপার চোখেও আজ এক অদ্ভুত সাহস।
​আমরা গাড়ি থেকে নেমে আস্তে আস্তে পকেট গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। কোনো শব্দ নেই। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর আমাদের পায়ের পাতার নিচে শুকনো পাতার মড়মড়ানি। সদর দরজাটা খোলাই ছিল, যেন কেউ আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল।
​ভেতরে ঢুকতেই নাকে এলো একটা তীব্র রাসায়নিকের গন্ধ। ঠিক যেমন গন্ধ ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে পেয়েছিলাম, কিন্তু এটা তার চেয়েও তীব্র, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। লিভিং রুমের ঠিক মাঝখানে একটা জ্বলন্ত ল্যাপটপ রাখা, যার স্ক্রিনে লাল অক্ষরে কাউন্টডাউন চলছে—১৪ মিনিট ৫২ সেকেন্ড।
​“বাঃ! ঠিক সময়েই এসেছিস তাহলে!”
​হঠাৎ ওপরের বারান্দা থেকে একটা চেনা, কর্কশ কণ্ঠস্বর ভেসে এল। আমরা সবাই চমকে ওপরের দিকে তাকালাম। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে রাঘব। ওনার শার্টের হাতা গুটানো, চুলগুলো উসকোখুসকো, আর চোখে সেই চেনা পিশাচের উন্মাদনা। ওনার একহাতে একটা রিমোট কন্ট্রোল, আর অন্য হাতে একটা রিভলভার।
​ইন্সপেক্টর বাবু চট করে ওনার পিস্তল রাঘবের দিকে তাক করলেন। “রাঘব শর্মা! অস্ত্র ফেলে হাত ওপরে তোলো! চারপাশ পুলিশ ঘিরে রেখেছে!”
​রাঘব হা হা করে পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ল। “মিথ্যা বলবেন না ইন্সপেক্টর! আপনার সাথে কোনো পুলিশ নেই। থাকলে অনেক আগেই সাইরেনের আওয়াজ পেতাম। আর ওই যে ডিপার্টমেন্টের বড় কর্তার মেসেজটা নয়না দেখেছিল? ওটা তো আমিই ওকে দেখতে দিয়েছিলাম, যাতে আপনারা ভয় পেয়ে সরকারি ফোর্স না আনেন!”
​রাঘবের কথা শুনে ইন্সপেক্টর বাবুর মুখটা এক মুহূর্তে কালো হয়ে গেল। ও আমাদের ফাঁদে ফেলেনি, আমরা নিজেরাই ওর পাতা ফাঁদে পা দিয়েছি!
​“তুই কী চাস রাঘব?” আমি দেওয়াল ধরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলাম। “সুলেমান ভাইকে কেন মারলি? ওই ফাইলের ভেতর কী আছে?”
​রাঘব সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে নিচে নেমে এল। ওনার রিভলভারটা তখনো ইন্সপেক্টরের দিকে তাক করা। “সুলেমান? ও তো একটা লোভী কুত্তা ছিল! বিশ বছর আগে আমার বড় ভাই যখন ওই সায়েন্টিফিক ল্যাব থেকে একটা যুগান্তকারী ফর্মুলা চুরি করে, সুলেমান তখন ভাইয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ফাইলটা লুকিয়ে ফেলে। ভাই মারা যাওয়ার পর আমি এতগুলো বছর ধরে সুলেমানকে খুঁজেছি। কাল রাতে ও ফাইলটা বিক্রি করতে যাচ্ছিল অন্য এক বড় কোম্পানির কাছে। তাই ওকে চিরতরে ঘুমাতে হলো।”
​“আর ওই ফর্মুলাটা কীসের?” ইন্সপেক্টর বাবু জিজ্ঞেস করলেন, ওনার আঙুল তখনো পিস্তলের ট্রিগারে।
​“এমন এক রাসায়নিক, যা অল্প পরিমাণে বাতাসে মিশিয়ে দিলে চোখের পলকে একটা আস্ত এলাকার মানুষ পঙ্গু হয়ে যাবে। এটার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কোটি কোটি টাকা!” রাঘব ল্যাপটপের দিকে তাকাল। টাইমারে আর মাত্র ৯ মিনিট বাকি। “আমি আজ রাত আটটায় ওই ফাইলটা ডেলিভারি দেব। কিন্তু তার আগে, আমার এই বিশ বছরের সাজানো সংসারটার একটা গতি করা দরকার।”
​ও রিমোটটা উঁচিয়ে ধরল। “এই বাড়ির চারকোণে আমি ল্যাব থেকে আনা ওই রাসায়নিকের গ্যাস সিলিন্ডার সেট করে রেখেছি। রাত আটটা বাজার সাথে সাথে এই রিমোটের এক ক্লিকে পুরো বাড়িটা বিষাক্ত গ্যাসে ভরে যাবে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে তোদের ফুসফুস গলে জল হয়ে যাবে। পুলিশ ভাববে, আমি সপরিবারে আত্মহত্যা করেছি!”
​“বাবা! তুমি এতটা নিচে নামতে পারলে?” নয়না কেঁদে উঠল। “আমি তোমার নিজের মেয়ে!”
​“মেয়ে?” রাঘব নয়নার দিকে হিংস্র চোখে তাকাল। “যে মেয়ে বাপের বিরুদ্ধে পুলিশে ব্যাগ পাচার করে, সে আমার মেয়ে নয়! তোরা দুজনেই আয়েশার মতো আনাড়ি!”
​ঠিক তখনই, যখন রাঘবের পুরো মনোযোগ আমাদের দিকে, নার্স ফাতেমা আপা নিঃশব্দে রাঘবের পেছন দিকে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমি ওনার এই চালাকিটা বুঝতে পেরে রাঘবকে ব্যস্ত রাখার জন্য আরও জোরে কথা বলতে লাগলাম।
​“রাঘব, তুই নিজেকে খুব চালাক ভাবিস না?” আমি এক পা এগিয়ে গেলাম। “বিশ বছর ধরে তুই আমাকে মেরেছিস, কারণ তুই নিজে একটা কাপুরুষ! তুই ভাইকে মেরেছিস, সুলেমানকে মেরেছিস, কারণ তোর নিজের কোনো যোগ্যতা নেই!”
​“মুখ বন্ধ কর আয়েশা!” রাঘব রেগে চিৎকার করে উঠল। ওনার হাতের রিভলভারটা এবার আমার কপালে তাক করল। “আজ তোকে মেরেই আমি শান্ত হব!”
​“হ্যান্ডস আপ, রাঘব!”
​হঠাৎ লিভিং রুমের পেছনের অন্ধকার কোণ থেকে একটা গম্ভীর, ভারী গলার আওয়াজ ভেসে এল। রাঘব চমকে ওদিকে ঘুরতেই দেখল, দরজার মুখে আরও একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। ওনার হাতেও পিস্তল।
​ওনার নেমপ্লেটে লেখা—ডেপুটি পুলিশ কমিশনার। রাঘবের সেই তথাকথিত গডফাদার!
​রাঘব ওনাকে দেখে স্বস্তির হাসি হাসল। “আরে স্যার! আপনি এসে গেছেন? ভালোই হলো, এদের এখানেই শেষ করে দিন। ফাইলটা ওই ল্যাপটপের ব্যাগে আছে।”
​কিন্তু ডিসি সাহেব রাঘবের দিকে এগিয়ে এলেন না। ওনার পিস্তলটা সটান রাঘবের বুকের দিকে তাক করা। ওনার মুখে এক কুৎসিত ঠাণ্ডা হাসি। “রাঘব, তুমি বড্ড বেশি কথা বলো। পুলিশ ফোর্সের ভেতর কে তোমার লোক, সেটা তো তুমি অলরেডি ইন্সপেক্টরকে বলে দিয়েছ। এখন তুমি বেঁচে থাকলে আমার চাকরি আর জীবন দুই-ই যাবে। আর ওই ফর্মুলা? ওটা তো এখন শুধুই আমার!”
​রাঘবের চোখের অহংকার এক মুহূর্তে চরম আতঙ্কে রূপ নিল। ও বুঝতে পারল, ও নিজেই নিজের গডফাদারের বলির পাঁঠা হতে চলেছে!
​টাইমারে তখন মাত্র ২ মিনিট বাকি। ঘরের ভেতরের পরিবেশ এখন এক ত্রিমুখী মৃত্যুর ফাঁদ। একদিকে রাঘবের হাতের বিষাক্ত গ্যাসের রিমোট, অন্যদিকে ডিসি সাহেবের পিস্তল, আর মাঝখানে আমরা চারজন অসহায় মানুষ।
​ঠিক তখনই রাঘবের পেছনের অন্ধকার থেকে ফাতেমা আপা একটা ভারী লোহার রড নিয়ে রাঘবের মাথায় সজোরে আঘাত করলেন! রাঘব আর্তনাদ করে মেঝেতে পড়ে গেল, আর ওনার হাতের রিমোটটা ছিটকে চলে গেল নয়নার পায়ের কাছে!
​ডিসি সাহেব এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে ট্রিগার চেপে দিলেন—‘ঠাশ!’
​গুলিটা ফাতেমা আপার কাঁধ ছুঁয়ে দেওয়ালে গিয়ে লাগল। ইন্সপেক্টর বাবুও পাল্টা গুলি চালালেন। পুরো ঘরটা গুলির আওয়াজে আর ধোঁয়ায় অন্ধ হয়ে গেল।
​টাইমারে তখন শেষ ৩০ সেকেন্ড কাউন্টডাউন চলছে। নয়না মেঝে থেকে রিমোটটা তুলতে গেল, কিন্তু রাঘব রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থেকেও নয়নার পা চেপে ধরল।
​“নয়না! রিমোটটা চাপ দে! সবাই একসাথে মরব!” রাঘব পিশাচের মতো হাসতে লাগল।
​ডিসি সাহেব আবার পিস্তল তাক করলেন নয়নার দিকে। আমার বুকের ভেতরটা যেন ফেটে গেল। বিশ বছর ধরে আমি শুধু মার খেয়েছি, কিন্তু আজ আমার মেয়ের দিকে বুলেট এগিয়ে আসছে। আমি আর কোনো নিয়ম, কোনো ভয় মানব না!
​আমি আমার সমস্ত ভাঙা পাঁজরের তীব্র যন্ত্রণা ভুলে, একটা বাঘিনীর মতো লাফিয়ে গিয়ে ডিসি সাহেবের ওপর পড়লাম। ওনার হাতের পিস্তলটা কেড়ে নেওয়ার জন্য আমি ওনার হাত কামড়ে ধরলাম। ওদিকে নয়না রিমোটের লাল বাটনটা ডিঅ্যাক্টিভেট করার জন্য ছটফট করছে, আর রাঘব ওনাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে।
​টাইমারে তখন—৫, ৪, ৩...
​চলবে...
(৬ষ্ঠ ও শেষ পর্বে চোখ রাখুন)

খাঁচার ভেতর খাঁচা
​পর্ব: ০৬ (শেষ পর্ব)
​#Choto_Dairy_01
​টাইমারে তখন—৩, ২, ১...
​আমার জীবনের সবথেকে দীর্ঘ তিন সেকেন্ড। ডিসি সাহেবের হাত কামড়ে ধরে আমি যখন মাটিতে কুস্তিগিরদের মতো লড়ছি, ওদিকে নয়না তখন নিজের পুরো শক্তি দিয়ে রাঘবের রক্তাক্ত মুখের ওপর লাথি মারল। রাঘবের হাত আলগা হতেই নয়না রিমোটের সবুজ ‘ক্যান্সেল’ বাটনটা একসাথে চেপে ধরল।
​ঠিক রাত আটটা বাজার সাথে সাথে ল্যাপটপের লাল স্ক্রিনটা নীল হয়ে থমকে গেল। ‘সিস্টেম ডিঅ্যাক্টিভেটেড’। চারপাশের গ্যাস সিলিন্ডারগুলো একটা হালকা ফুসফুস শব্দ করে শান্ত হয়ে গেল। বিষাক্ত গ্যাস আর বেরুলো না।
​কিন্তু লড়াই তখনো শেষ হয়নি। ডিসি সাহেব আমাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিলেন। আমার ভাঙা পাঁজরে ওনার বুটের আঘাত লাগতেই আমি যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলাম। ওনার হাতের পিস্তলটা এবার সরাসরি আমার কপাল বরাবর স্থির হলো।
​“অনেক হয়েছে আয়েশা! এবার তোর খেলা শেষ!” ডিসি সাহেব দাঁত কিড়মিড় করে বললেন।
​‘ঠাশ! ঠাশ!’
​দুটো গুলির শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল। কিন্তু আমার শরীরে কোনো বুলেট বিঁধল না। আমি চোখ খুলে দেখলাম, ডিসি সাহেবের হাতের পিস্তলটা মেঝেতে পড়ে গেছে আর ওনার ডান হাত বেয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন ঢাকা মেডিকেলের সেই ইমার্জেন্সির ডাক্তারবাবু, আর ওনার পেছনে অন্তত বিশজন সশস্ত্র সোয়াট (SWAT) পুলিশ সদস্য!
​ইন্সপেক্টর বাবু মেঝে থেকে উঠে ডিসি সাহেবকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিলেন। ওনার মুখে তখন এক বিজয়ের হাসি।
​“কী ভেবেছিলেন ডিসি সাহেব?” ইন্সপেক্টর বাবু বললেন। “আমি এতটাও বোকা নই যে আপনার মতো রুই-কাতলাদের পাতা ফাঁদে কোনো ব্যাকআপ ছাড়া চলে আসব? হসপিটাল থেকে বের হওয়ার আগেই আমি সোয়াট টিমকে এই ঠিকানার ব্যাকআপ দিয়ে রেখেছিলাম। আর আমাদের ডাক্তারবাবু তো শুধু ডাক্তার নন, উনি পুলিশের অন-ডিউটি ফরেনসিক এক্সপার্টও বটে!”
​সোয়াট ফোর্সের সদস্যরা ডিসি সাহেব আর আধমরা রাঘবকে টেনে হিঁচড়ে গাড়ি তুলতে লাগল। রাঘব যখন আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, ওনার চোখ দুটো তখনো আমার দিকেই ছিল। কিন্তু সেই চোখে আজ আর কোনো হিংস্রতা ছিল না, ছিল এক চরম পরাজয়ের গ্লানি। ওনার বিশ বছরের তৈরি করা সাম্রাজ্য আজ এক তুড়িতে ধুলোয় মিশে গেছে।
​নার্স ফাতেমা আপার কাঁধের ক্ষতটা খুব গভীর ছিল না। ডাক্তারবাবু ওনাকে প্রাথমিক ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছিলেন। ফাতেমা আপা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। ওনার ওই একটা ছোট্ট চিরকুট পকেটে পুরে নেওয়ার সাহসের জন্যই আজ আমরা জ্যান্ত দাঁড়িয়ে আছি।
​লিভিং রুমের মেঝেতে তখন শুধু রাঘবের সেই ল্যাপটপটা পড়ে আছে, যার ভেতরে কোটি টাকার সেই বিষাক্ত ফর্মুলা লুকিয়ে ছিল। ইন্সপেক্টর বাবু ওটা সযত্নে নিজের হেফাজতে নিলেন। সুলেমান ভাই আর রাঘবের ভাইয়ের বিশ বছর আগের খুনের রহস্য আজ চিরতরে উন্মোচিত হলো।
​রাত তখন সাড়ে আটটা। মিরপুরের সেই জীর্ণ বাবার বাড়ি থেকে যখন আমরা বের হয়ে এলাম, তখন আকাশে একটা মস্ত বড় চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোটা আজ অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল লাগছিল।
​নয়না আমার পাশে এসে দাঁড়াল। ও আমার হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল। ওর চোখ দিয়ে তখনো জল পড়ছিল, কিন্তু সেই জল ভয়ের ছিল না, ওটা ছিল মুক্তির জল।
​“আম্মু…” নয়না ফিসফিস করে বলল। “আমরা কি এখন থেকে সত্যি বলব?”
​আমি নয়নাকে জড়িয়ে ধরলাম। পাঁজরের তীব্র যন্ত্রণাটা যেন এক মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। আমি ওর কপালে চুমু খেয়ে বললাম, “হ্যাঁ রে মা। আজ থেকে আমাদের আর কোনো দেওয়ালের কোণায় গুঁতো খেতে হবে না, সিঁড়ি থেকেও পড়তে হবে না। আজ থেকে আমরা মুখ খুলে সত্যি বলব। মাথা উঁচু করে বাঁচব।”
​বিশ বছর ধরে আমি যে খাঁচার ভেতরে বন্দি ছিলাম, সেই খাঁচাটা আজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। রাঘব নামের যে বাঘটা আমাদের প্রতিদিন ক্ষতবিক্ষত করত, সে এখন নিজে লোহার খাঁচায় বন্দি। আর আমি আর আমার মেয়ে? আমরা এখন মুক্ত আকাশের পাখি।
​নতুন ভোরের আলো দেখার জন্য আমাদের ডানা দুটো এখন প্রস্তুত।

​সমাপ্ত
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url