ভুল ভাঙার রাত

​পর্ব: ০৩+শেষ পর্ব

​#Choto_Dairy_01

​ডাক্তারের বাড়িয়ে দেওয়া কলমটা আমার হাতের আঙুলের ডগায় কাঁপছিল। মা আর বাচ্চা—দুজনের একজনকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে? এই একটা বাক্য আমার মগজের ভেতর তপ্ত সীসার মতো খিল খিল করে বিঁধতে লাগল।

​আমি মাটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যর্থ, সবচেয়ে অপদার্থ পুরুষ মনে হচ্ছিল। যে সুমিকে একটুখানি সুখ দিতে পারলাম না, আজ উথাল-পাথাল করা এক ঝড়ের মুখে তাকে একা দাঁড় করিয়ে আমি মৃত্যুর পরোয়ানায় সই করছি?

​“শান্ত, সইটা কর বাবা। সময় নষ্ট করিস না,” মায়ের ভাঙা গলাটা আমার কানে এলো।

​আমি মায়ের দিকে তাকালাম। মায়ের চোখের কোণ দিয়ে জল গড়াচ্ছে, কিন্তু উনার মুখ অবয়বে সেই চিরচেনা শক্ত ভাবটা স্পষ্ট। মা আমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন।

​“ডাক্তারবাবু,” মা ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে খুব অনড় গলায় বললেন, “আমার ঘরের লক্ষ্মী যেন আমার ঘরেই ফিরে আসে। আপনি আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।”

​আমি চোখ বন্ধ করে কাগজে সই করে দিলাম। আমার জীবনের সবচেয়ে ভারী সই।

​ঠিক তখনই ওটি-র (অপারেশন থিয়েটার) ভারী দরজাটা খুলে গেল। দুজন নার্স সুমির স্ট্রেচারটা ঠেলে ওটি-র দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সুমির মুখে অক্সিজেনের মাস্ক লাগানো। ওর আধো-বোজা চোখ দুটো কেমন যেন শূন্য, কেমন যেন নিষ্প্রাণ।

​আমি এক দৌড়ে স্ট্রেচারের পাশে গেলাম। ওর একটা বরফের মতো ঠাণ্ডা হাত আমার দুই হাতের মাঝে চেপে ধরলাম।

​“সুমি… সুমি আমার দিকে তাকাও,” আমার গলা দিয়ে তখন আর আওয়াজ বেরোচ্ছিল না, শুধু কান্না দলা পাকিয়ে আসছিল। “তোমাকে ফিরে আসতেই হবে সুমি। এই শান্তকে শাস্তি দেওয়ার জন্য হলেও তোমাকে ফিরতে হবে। তুমি ছাড়া এই অপরাধীটার আর কেউ নেই।”

​সুমি মাস্কের ভেতর থেকেই খুব ক্ষীণভাবে ওর চোখের পাতা দুটো নাড়াল। যেন ও আমাকে বলতে চাইল—‘আমি চেষ্টা করব’। তারপরই ওটি-র লাল বাতিটা জ্বলে উঠল, আর ভারী দরজাটা আমাদের মাঝখানে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দিল।

​করিডোরের স্টিলের চেয়ারে আমরা সবাই বসে আছি। কেউ কোনো কথা বলছি না। বড় আপা, মেজ আপা জায়নামাজ বিছিয়ে হাসপাতালের এক কোণায় আল্লাহর কাছে হাত তুলেছেন। তাদের চোখ দিয়ে অবিরাম পানি পড়ছে। অহংকার আর হিংসার দেয়ালটা আজ সুমির এই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে পুরোপুরি ধসে গেছে।

​ঘড়ির কাঁটা যেন আর নড়ছিল না। একেকটা সেকেন্ড যেন একেকটা বছর।

​প্রায় দুই ঘণ্টা পর ওটি-র লাল বাতিটা নিভে গেল। দরজার লক খোলার শব্দ হতেই আমি ছিটকে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভেতর থেকে ডাক্তার বের হয়ে এলেন। উনার সবুজ অ্যাপ্রনটা রক্তে ভেজা। ডাক্তার মুখ থেকে মাস্কটা সরালেন। উনার ক্লান্ত মুখে কোনো হাসি ছিল না।

​আমার বুকটা ধক করে উঠল। আমি দেয়ালটা খপ করে ধরে ফেললাম।

​“ডাক্তারবাবু…?” আমার গলা দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হলো না।

​ডাক্তার একটা গভীর শ্বাস নিয়ে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। “মি. শান্ত, মিরাকেল বলে একটা শব্দ পৃথিবীতে আছে। আমরা সত্যিই আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আপনার স্ত্রীর জরায়ু থেকে প্রচণ্ড ব্লিডিং হচ্ছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমরা মা এবং বাচ্চা—দুজনকেই বাঁচাতে পেরেছি।”

​কথাটা শোনার সাথে সাথে আমার পা দুটো আর আমার শরীরের ভার রাখতে পারল না। আমি হাসপাতালের ওই নোংরা মেঝেতেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। দুই হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে উঠলাম। মা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, ওপাশে তিন বোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। এ কান্না কোনো কষ্টের ছিল না, এ কান্না ছিল এক চরম স্বস্তির।

​“তবে…” ডাক্তার আবার বললেন।

​আমি ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ালাম। “তবে কী ডাক্তারবাবু? কোনো সমস্যা?”

​“বাচ্চাটা আট মাসে জন্ম নিয়েছে, অর্থাৎ প্রিপ্যাচিউর বেবি। ওর ওজন বেশ কম আর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তাই ওকে এখনই এনআইসিইউ (NICU) বা নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ইনকিউবেটরে রাখতে হবে। আর আপনার স্ত্রীর জ্ঞান ফিরতে আরও কয়েক ঘণ্টা সময় লাগবে। ওনাকে কেবিনে শিফট করা হচ্ছে।”

​ডাক্তার চলে যাওয়ার পর আমি কাঁচের দেয়ালের ওপাশ থেকে এনআইসিইউ-তে আমার ছোট্ট সন্তানটাকে দেখলাম। কতটুকু একটা প্রাণ! গায়ে কতগুলো পাইপ আর তার জড়ানো। বুকটা ধকধক করে ওঠানামা করছে। ও যেন লড়ছে, এই পৃথিবীর আলোয় বেঁচে থাকার জন্য লড়ছে। আমি কাঁচের ওপর হাত রেখে মনে মনে বললাম—‘বাপধন আমার, তুই লড়ে যা। তোর বাবা তোকে আর তোর মাকে আগলে রাখার জন্য এবার প্রস্তুত।’

​ভোর চারটার দিকে সুমিকে কেবিনে দেওয়া হলো।

​জ্ঞান ফেরার পর সুমি যখন চোখ মেলল, কেবিনের ভেতর তখন হালকা আলোর আভা। ও আস্তে আস্তে চোখ পিটপিট করে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করল। ও দেখল উনার মাথার পাশে বসে আছেন মা, আর পায়ের কাছে বসে আছেন বড় আপা আর মেজ আপা। বড় আপা সুমির পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

​সুমি প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেল। ও হয়তো ভাবছিল ও এখনও কোনো স্বপ্ন দেখছে। ও খুব দুর্বল গলায় বলল, “মা… আমার বাবু?”

​মা সুমির কপালে হাত রেখে পরম মমতায় বললেন, “তোর ছেলে ভালো আছে রে মা। একদম তোর মতো শান্ত হয়েছে। একটু দুর্বল, তাই ডাক্তাররা ওকে মেশিনে রেখেছে। তুই একদম চিন্তা করিস না। তুই আগে সুস্থ হ।”

​সুমি মায়ের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে আজ কোনো শাশুড়ির কঠিন চাউনি ছিল না, ছিল এক জন্মদাত্রী মায়ের ব্যাকুলতা। সুমির চোখ দিয়ে আবার দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

​বড় আপা রুমানা সুমির হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন, “সুমি, আমাদের মাফ করে দিস রে বোন। আমরা তোকে শুধু খাটিয়েই গেছি, কোনোদিন একটু ভালোবাসতে পারিনি। আজ যদি তোর কোনো ক্ষতি হয়ে যেত, তবে আমরা নিজেদের কোনোদিন ক্ষমা করতে পারতাম না।”

​সুমি কিছু বলতে চাইল, কিন্তু বড় আপা ওর ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বললেন, “এখন একদম কথা বলবি না। ডাক্তার তোকে কথা বলতে নিষেধ করেছে। তুই শুধু বিশ্রাম নে।”

​আমি কেবিনের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিলাম। আমার বুকটা এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেল। যে পরিবার সুমিকে একাকীত্বের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল, আজ তারাই ওকে ভালোবাসার আলোয় মুড়ে দিচ্ছে।

​কিন্তু আমার আর সুমির মাঝখানের যে দূরত্ব, যে অপরাধবোধ আমার ভেতরে বাসা বেঁধেছে, সেটা কি এত সহজে মিটে যাবে? আমি সুমিকে এতদিন যে নীরব কষ্ট দিয়েছি, স্বামী হিসেবে তার প্রায়শ্চিত্ত আমি কীভাবে করব?

​আমি ধীর পায়ে কেবিনের ভেতরে ঢুকলাম। সুমি আমার দিকে তাকাল। ওর চোখে এবার আর সেই অভিমানী চাউনি ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত আকুলতা।

​আমি ওর বিছানার পাশে গিয়ে বসলাম। কিন্তু ঠিক তখনই সুমির মনিটরের বিটের শব্দটা আবার অদ্ভুতভাবে বেড়ে যেতে লাগল, আর ও নার্ভাস হয়ে আমার দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিল।

​সুমি কি কিছু বলতে চাইছে যা ও সবার সামনে বলতে পারছে না?


​সুমির হার্টবিট মনিটরের শব্দটা হঠাৎ দ্রুত হতে শুরু করায় কেবিনের ভেতরের শান্ত পরিবেশটা আবার থমথমে হয়ে গেল। ও যন্ত্রণায় কিংবা এক তীব্র ছটফটানিতে আমার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল। ওর ঠোঁট দুটো কাঁপছিল, যেন ভীষণ জরুরি কিছু একটা ও আমাকে বলতে চাইছে, যা এত মানুষের সামনে ও মুখে ফুটিয়ে তুলতে পারছে না।

​মা আর আপারাও ঘাবড়ে গেলেন। বড় আপা বললেন, “শান্ত, ডাক্তারকে ডাক জলদি! সুমির এমন হচ্ছে কেন?”

​আমি সুমির বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা শক্ত করে ধরে ওর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লাম। ওর কপালে জমে ওঠা ঘামের ফোঁটাগুলো নিজের হাত দিয়ে মুছে দিয়ে বললাম, “সুমি, শান্ত হও। আমি এখানে আছি। তোমার কিচ্ছু হবে না। কী বলতে চাও বলো?”

​সুমি আমার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে কান বেয়ে বালিশে মিশে যাচ্ছিল। ও অন্য হাতটা দিয়ে আলতো করে নিজের পেটের ওপর ছোঁয়ানোর চেষ্টা করল, যেখানে কয়েক ঘণ্টা আগেও আমাদের সন্তান ছিল। ও খুব ক্ষীণ, প্রায় ফিসফিসানি গলায় বলল, “শান্ত… বাবুকে একবার… একবার এনে দাও না? আমি শুধু… একটু ছুঁয়ে দেখব। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে…”

​একটি মায়ের এই আকুলতা কেবিনের প্রতিটি মানুষের বুকে গিয়ে তীরের মতো বিঁধল। আটটা মাস যে সন্তানকে ও নিজের শরীরের রক্ত-পানি করে বড় করেছে, আজ জ্ঞান ফেরার পর তাকে নিজের কোলে না পেয়ে ওর ভেতরটা হাহাকার করে উঠছে। প্রিপ্যাচিউর হওয়ার কারণে বাবু এনআইসিইউ-র কাঁচের বাক্সে বন্দি, আর সুমি এখানে একাকী। এই মানসিক কষ্টটাই ওর হার্টবিট বাড়িয়ে দিচ্ছিল।

​মা সুমির মাথায় হাত রেখে কেঁদে ফেললেন। “পাগলী মেয়ে আমার! এই জন্য তোর বুকের ভেতর এত তোলপাড় হচ্ছে? শান্ত, তুই এখনই ডাক্তারের সাথে কথা বল। ও তো হাঁটতে পারবে না, অন্তত হুইলচেয়ারে করে হলেও ওকে একটু বাচ্চার কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যায় কি না দেখ।”

​আমি আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ডিউটি ডাক্তারের রুমে গেলাম। ডাক্তারকে সুমির মানসিক অবস্থার কথা বুঝিয়ে বলতেই উনি প্রথমে একটু ইতস্তত করলেন, তারপর বললেন, “দেখুন, পেশেন্টের এই মেন্টাল ট্রমা দূর করাটা ওনার রিকভারির জন্য খুব দরকার। তবে ওটি-র পর ওনাকে বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখা যাবে না। খুব সাবধানে, মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য ওনাকে এনআইসিইউ-র বাইরে থেকে বাচ্চাটিকে দেখানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।”

​আমি নার্সদের সহায়তায় একটা হুইলচেয়ার নিয়ে কেবিনে ফিরলাম।

​আমি অত্যন্ত সাবধানে সুমিকে কোলপাঁজা করে বিছানা থেকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে দিলাম। ওর শরীরে এখনও স্যালাইনের নল লাগানো। বড় আপা স্যালাইনের স্ট্যান্ডটা ধরে আগে আগে হাঁটলেন, আর মেজ আপা সুমির গায়ে একটা চাদর ভালো করে জড়িয়ে দিলেন। আজ আমার বোনেরা যেভাবে সুমির চারপাশ আগলে দাঁড়িয়েছে, তা দেখে আমার চোখ দুটো আবার ভিজে এলো। ভুল ভাঙার পর মানুষের ভেতরের চেনা রূপটা যে এতটা সুন্দর হতে পারে, তা আমার কল্পনার বাইরে ছিল।

​এনআইসিইউ-র কাঁচের দেয়ালের সামনে যখন হুইলচেয়ারটা গিয়ে থামল, সুমি দুই হাতে কাঁচের ওপর ভর দিয়ে জানালার ওপাশে তাকাল।

​ভেতরে নীল আলোর নিচে, ইনকিউবেটরের ভেতরে শুয়ে আছে আমাদের ছোট্ট বাবুটা। ওর ছোট্ট দুটো হাত-পা নড়ছে। সুমি কাঁচের গায়ে নিজের মুখটা ঠেকিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ওর চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছিল, কিন্তু উনার ঠোঁটের কোণে এবার ফুটে উঠল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে পবিত্র এক চিলতে হাসি।

​“আমার সোনা বাবা…” সুমি কাঁচের ওপাশ থেকেই ফিসফিস করে বলল। “তোর বাবাকে মাফ করে দিস বাবা। তোর মা-কেও মাফ করে দিস। তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে আমার কোলে ফিরে আয়।”

​আমি সুমির পেছনে দাঁড়িয়ে ওর দুটো কাঁধের ওপর হাত রাখলাম। সুমি মাথাটা সামান্য হেলিয়ে আমার হাতের ওপর রাখল। ও একবারও আমার দিকে তাকাল না, কিন্তু ওর এই স্পর্শটাই আমাকে বুঝিয়ে দিল—ও আমাকে ক্ষমা করতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা আর নীরব কষ্টের পর স্বামী হিসেবে আমার এই ছোট্ট প্রচেষ্টাটুকু ওর মনের ক্ষততে একটুখানি মলম লাগাতে পেরেছে।

​পাঁচ মিনিট শেষ হতেই নার্স এসে বললেন, “এবার ওনাকে কেবিনে নিয়ে যান। ওনার বিশ্রামের প্রয়োজন।”

​কেবিনে ফিরিয়ে আনার পর সুমিকে আবার বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হলো। এবার ওর মনিটরের রিডিং একদম স্বাভাবিক। ও এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি নিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ও গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

​মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “শান্ত, সুমি এখন ঘুমাচ্ছে। তুইও সারারাত এক ফোঁটা ঘুমানি। একটু ফ্রেশ হয়ে আয়।”

​আমি কেবিনের বাইরে এসে হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়ালাম। তখন বাইরে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। রাতের সেই কালবৈশাখী ঝড়টা কেটে গিয়ে চারপাশটা কেমন যেন শান্ত, স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। ঠিক আমাদের জীবনের মতো।

​বড় আপা রুমানা আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। উনার হাতে এক কাপ চা। চায়ের কাপটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “নে, একটু চা খা। মাথাটা হালকা হবে।”

​আমি চা-টা নিয়ে একটা চুমুক দিলাম। বড় আপা আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “শান্ত, আজ তোকে একটা সত্যি কথা বলি। আমরা যখনই এ বাড়িতে আসতাম, সুমিকে খাটাতাম, আর তুই চুপ করে থাকতিস—তখন আমাদের মনে হতো আমরাই বুঝি এই বাড়ির আসল মালিক। তোর এই চুপ থাকাটাই আমাদের অহংকারকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। তুই যদি প্রথম দিনই আমাদের ডেকে সুমির কষ্টের কথা বলতিস, তবে আমাদের এই ভুলটা ভাঙতে এতগুলো দিন লাগত না, আর সুমিকেও আজ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসতে হতো না।”

​বড় আপার কথাটা আমার মনে নতুন করে আঘাত করল। সত্যি তো, বোনেদের দোষ দিয়ে কী লাভ? ক্ষমতার চাবিকাঠি তো আমার হাতেই ছিল। আমিই তো সুমিকে সবার সামনে ছোট করে রেখেছিলাম আমার নীরবতা দিয়ে।

​আমি বড় আপার দিকে তাকিয়ে বললাম, “আপা, যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমি শুধু আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই যে সুমি আর আমার সন্তান বেঁচে আছে। তবে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

​বড় আপা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, “কী সিদ্ধান্ত শান্ত?”

​আমি চায়ের কাপটা একপাশে রেখে খুব দৃঢ় গলায় বললাম, “সুমি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর, আমি আর ওকে ওই চার দেয়ালের সংসারে একা ফেলে রাখব না। আমি অফিসের কাজের পাশাপাশি ঘরের কাজেও ওর হাত বাটাব। আর…”

​আমি একটু থামলাম। বড় আপা কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রইলেন।

​আমি বললাম, “আর এই পরিবারে কার কী অধিকার, কার কতটুকু সীমানা—সেটা আজ থেকে আমি নিজেই ঠিক করে দেব। সুমি এই বাড়ির বউ, ও কারো দয়ার পাত্রী নয়। ও এই বাড়ির রানী।”

​আমার কথা শুনে বড় আপার মুখে একটা গর্বের হাসি ফুটে উঠল। তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “তুই আজ সত্যিই একজন প্রকৃত পুরুষ হয়েছিস রে শান্ত। তোর এই সিদ্ধান্তকে আমি মনে-প্রাণে সম্মান করি। সুমির এই অধিকারটা পাওয়া খুব দরকার ছিল।”

​পরের তিন দিন হাসপাতালেই কেটে গেল। সুমি আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠছে। বাবুর অবস্থাও আগের চেয়ে অনেক ভালো, ডাক্তার বলেছেন আর দু-একদিন পরেই ওকে কেবিনে দেওয়া যাবে। পুরোটা সময় মা আর আপারা হাসপাতালেই পালা করে সুমির সেবা করেছেন। সুমিকে ওনারা নিজেদের হাত দিয়ে খাইয়ে দিয়েছেন, চুল বেঁধে দিয়েছেন।

​চতুর্থ দিনের মাথায় সুমি যখন কেবিনে বসে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, তখন আমি ওর চোখের ভেতর আর কোনো অতীত অভিমান বা লুকানো কষ্ট দেখতে পেলাম না। সেখানে ছিল কেবলই এক বুক ভালোবাসা আর নিরাপত্তা পাওয়ার এক পরম তৃপ্তি।

​কিন্তু আমি তখনও জানতাম না, আমাদের বাড়ি ফেরার পর এক নতুন পরীক্ষা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কারণ, বাড়ি যাওয়ার পর যখন মেজ দুলাভাই আর বড় দুলাভাই আমাদের এই পারিবারিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হবেন, তখন তাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে? বিশেষ করে মেজ দুলাভাই, যিনি চিরকালই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার এবং সুমিকে ছোট করে কথা বলায় ওস্তাদ।


​হাসপাতালের দিনগুলো আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে গেল। বিশেষ করে আমার বোনেদের ভেতরের সেই চিরচেনা রূপটা এক নিমেষে বদলে যেতে দেখলাম। ষষ্ঠ দিনের মাথায় ডাক্তার যখন ঘোষণা করলেন যে আমাদের ছোট্ট বাবু এবার পুরোপুরি সুস্থ এবং আজই আমাদের ছুটি দেওয়া হবে, তখন কেবিনের ভেতর আনন্দের এক বন্যা বয়ে গেল।

​ছোট আপা সুলতানা বাবুকে কোলে নিয়ে বলছিল, “দেখো ভাবী, ওর নাকটা একদম ভাইয়ার মতো হয়েছে, আর চোখ দুটো হয়েছে ঠিক তোমার মতো শান্ত।”

​সুমি বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছিল। ওর ফ্যাকাশে মুখে এখন এক অদ্ভুত সতেজতা। ও সুলতানার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। এই কদিনে সুমি যেন এক নতুন পরিবার খুঁজে পেয়েছে। যে মানুষগুলোর বাঁকা কথা একসময় ওর বুকে তীরের মতো বিঁধত, আজ তারাই ওকে এক মুহূর্তের জন্য একা ছাড়ছে না।

​ছুটি হওয়ার পর আমরা যখন গাড়িতে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, আমার বুকের ভেতর এক অজানা আশঙ্কা উঁকি দিচ্ছিল। মা আর তিন বোন আমাদের সাথেই আছে। কিন্তু বাড়িতে অপেক্ষা করছেন বড় দুলাভাই আর মেজ দুলাভাই। বড় দুলাভাই মানুষ হিসেবে কিছুটা নরম হলেও, মেজ দুলাভাই জামিল সাহেব অত্যন্ত কড়া আর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার মানুষ। উনার ধারণা—সংসারে মেয়েরা খাটবে, আর পুরুষরা রাজত্ব করবে। সেদিন রাতে ড্রইংরুমে যে ঝড় বয়ে গিয়েছিল, বোনেদের মুখে নিশ্চয়ই ওনারা সব শুনেছেন। এখন ওনাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেটাই আমার চিন্তার কারণ।

​গাড়ি এসে যখন আমাদের বাড়ির সামনে থামল, আমি সুমিকে খুব সাবধানে ধরে গাড়ি থেকে নামালাম। মা বাবুকে কোলে নিয়ে আগে আগে হাঁটলেন।

​ড্রইংরুমে ঢুকতেই দেখলাম বড় দুলাভাই আর মেজ দুলাভাই সোফায় বসে আছেন। মেজ দুলাভাইয়ের মুখটা গম্ভীর, উনার হাতে খবরের কাগজ। আমাদের ঢুকতে দেখে ওনারা তাকালেন।

​বড় দুলাভাই উঠে এসে বললেন, “আরে শান্ত! এসো এসো। যাক, আলহামদুলিল্লাহ্‌, মা আর বাচ্চা দুজনেই সুস্থভাবে বাড়ি ফিরেছে। আমরা তো ভীষণ চিন্তায় ছিলাম।”

​আমি হাসার চেষ্টা করে বললাম, “জি দুলাভাই, আল্লাহর রহমত।”

​কিন্তু মেজ দুলাভাই জামিল সাহেব সোফা থেকে উঠলেন না। তিনি খবরের কাগজটা টেবিলে ছুঁড়ে ফেলে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আমার দিকে তাকালেন। উনার গলার স্বরে এক চিলতে উপহাস, “তা শান্ত বাবাজী, হাসপাতাল থেকে তো এক্কেবারে ‘মহাপুরুষ’ হয়ে ফিরলে শুনলাম? সেদিন নাকি নিজের মা আর বোনেদের ডেকে আচ্ছা করে জ্ঞান দিয়েছ? বলি, একটা সামান্য ঘরের কাজের বিষয় নিয়ে নিজের আপন বোনেদের এভাবে অপমান করতে তোমার বাধল না?”

​জামিল সাহেবের এই আচমকা আক্রমণে সুমি ভয় পেয়ে আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ওর মুখটা আবার আমতা আমতা করে উঠল।

​আমি কিছু বলার আগেই মেজ আপা পারভীন মেজ দুলাভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। খুব কড়া গলায় বললেন, “তুমি একদম চুপ করো তো! সেদিন রাতে শান্ত কোনো ভুল বলেনি। ভুল আমরা করেছিলাম। আর তুমি তো এ বাড়ির জামাই, এ বাড়ির ভেতরের বিষয়ে কথা বলার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?”

​মেজ দুলাভাই আকাশ থেকে পড়লেন। নিজের স্ত্রীর মুখে এমন প্রতিবাদ উনি জীবনেও শোনেননি। উনি সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “কী বললে পারভীন? তোমার সাহস তো কম নয়! আমার মুখে মুখে তর্ক করছ? ওই শান্তর বউয়ের বাতাস কি তোমার গায়েও লেগেছে নাকি? আজকালকার মেয়েরা একটু প্রশ্রয় পেলেই মাথায় চড়ে বসে।”

​“খবরদার জামিল!” এবার গর্জে উঠলেন স্বয়ং মা।

​মা বাবুকে সুলতানার কোলে দিয়ে মেজ দুলাভাইয়ের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। মায়ের সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে পুরো ড্রইংরুম এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। মা বললেন, “আমার ঘরের সিদ্ধান্ত আমার ছেলে নেবে। শান্ত সেদিন যা বলেছে, আমার ইচ্ছাতেই বলেছে। সুমি এই বাড়ির বউ, কোনো কাজের মেয়ে নয়। আর পারভীন ঠিকই বলেছে, আমার ছেলে ওর বউকে সম্মান দিতে শিখেছে, সেটা যদি তোমার সহ্য না হয়, তবে তুমি নিজের বাড়ি চলে যেতে পারো। কিন্তু আমার বাড়িতে এসে আমার বউমার দিকে আঙুল তোলার সাহস দেখাবে না।”

​মায়ের এই রুদ্রমূর্তি দেখে মেজ দুলাভাইয়ের মুখের সব অহংকার এক সেকেন্ডে ধুলোয় মিশে গেল। তিনি আর একটা কথাও বলতে পারলেন না। বড় দুলাভাই পরিস্থিতি সামাল দিতে মেজ দুলাভাইয়ের হাত ধরে বললেন, “জামিল, চল তো ভেতর রুমে চল। শুধু শুধু কেন সিন ক্রিয়েট করছ?” ওনারা দুজনে ভেতরের রুমে চলে গেলেন।

​আমি সুমিকে নিয়ে আমাদের নিজেদের ঘরে এলাম।

​কয়েকদিন পর এই ঘরে ফেরা। ঘরটা একদম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ছোট আপা সুলতানা আগেই এসে বিছানা চাদর সব পাল্টে রেখেছিল। আমি সুমিকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে ওর পায়ের কাছে মেঝেতে বসলাম।

​সুমি চমকে উঠে বলল, “একী শান্ত, তুমি নিচে বসছ কেন? উপরে এসো।”

​আমি সুমির দুটো হাত আমার হাতের মুঠোয় নিলাম। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “সুমি, আজ তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। এতদিন আমি ভেবেছিলাম চুপ থাকাটাই বোধহয় শান্তি। কিন্তু আজ বুঝতে পেরেছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ না খোলাটাও এক ধরনের অপরাধ। আমি স্বামী হিসেবে তোমাকে যে কষ্ট দিয়েছি, তার কোনো ক্ষমা হয় না। কিন্তু আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আজকের পর থেকে এই সংসারে তোমাকে আর কোনোদিন একাকী লড়তে হবে না।”

​সুমি আমার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর চোখ দুটো আবার জলে ভরে উঠল, কিন্তু এবার সেই জলে কোনো দুঃখ ছিল না, ছিল এক পরম প্রাপ্তির আনন্দ। ও আলতো করে আমার মাথাটা ওর বুকের কাছে টেনে নিল।

​বলল, “আমার আর কোনো আফসোস নেই শান্ত। তুমি যে আমার কষ্টটা বুঝতে পেরেছ, আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছ—একজন স্ত্রীর জন্য এর চেয়ে বড় উপহার আর কিছু হতে পারে না।”

​ঠিক তখনই ঘরের দরজায় একটা মৃদু টোকা পড়ল।

​তাকিয়ে দেখলাম মা দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। উনার কোলে আমাদের ছোট্ট সোনা বাবা। মা হাসিমুখে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন এবং বাবুকে সুমির কোলে সঁপে দিলেন।

​“নাও বউমা, তোমার ধন তোমার কোলে নাও। আর আজ থেকে রান্নাঘরের চিন্তা একদম করবে না। রুমানা আর পারভীন আজ রান্না চাপিয়েছে। আজ ওরা রেঁধে আমাদের খাওয়াবে,” মা হেসে বললেন।

​সুমি বাবুকে বুকে জড়িয়ে ধরে মায়ের দিকে তাকাল। পুরো ঘরটা তখন এক স্বর্গীয় শান্তিতে ভরে উঠেছে। রাতের সেই অন্ধকার, সেই ভুল ভাঙার রাতটা আমাদের জীবন থেকে সব কলুষতা ধুয়ে মুছে এক নতুন ভোরের সূচনা করে দিয়ে গেছে।

​(সমাপ্ত)

​গল্পটি কেমন লাগল জানাতে ভুলবেন না! আপনার মূল্যবান মন্তব্য #Choto_Dairy_01 পেজের জন্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url