সাদা বালিশের আড়ালে

পর্ব: শেষ পর্ব 

লেখনীতে: চোটো ডায়েরি ০১

​আরশাদের মুখের শেষ কথাটা শোনার পর আমার চারপাশের বাতাস যেন এক নিমিষে ভারী হয়ে গেল। ঘরের কোণে জ্বলতে থাকা আবছা আলোয় আরশাদের মুখটাকে আমার কোনো চেনা মানুষের মুখ বলে মনে হলো না। আঠারোটা বছর ধরে যে শান্ত, ভদ্র আর নির্বিকার মানুষকে আমি স্বামী হিসেবে চিনে এসেছি, তার আড়ালে এমন এক হিংস্র রূপ লুকিয়ে ছিল?

​"তুমি... তুমি সাজিদকে বাসের নিচে টেনে নিয়েছিলে?" আমার গলা দিয়ে ঠিকমতো আওয়াজ বের হচ্ছিল না।

​আরশাদ একটা শীতল হাসি হাসল। সে খাটের ওপর ধীরপায়ে গিয়ে বসল, যেন আঠারো বছরের এক বিশাল বোঝা আজ তার বুক থেকে নেমে গেছে।

​"হ্যাঁ, নয়না," আরশাদ বলতে লাগল। "সাজিদ ভেবেছিল সে একটা চিঠি লিখে, আমার পুরুষত্ব আর অহংকারকে পদদলিত করে পার পেয়ে যাবে। কিন্তু সে জানত না, শান্ত মানুষ যখন খেপে যায়, তখন সে কতটা ভয়ানক হতে পারে। আমি এক সপ্তাহ ধরে ওকে অনুসরণ করেছিলাম। ও কোথায় যায়, কার সাথে মেশে—সব খবর রাখতাম। সেই অভিশপ্ত বিকেলে মগবাজারের মোড়ে যখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল, ও একটা ছাতা মাথায় দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল। ঠিক তখনই একটা মিনিবাস ব্রেকফেইল করে ওদিকের ফুটপাতে উঠে আসছিল। আমি ঠিক ওনার পেছনেই ছিলাম।"

​আরশাদ একটু থামল। ওনার চোখ দুটো তখন অতীতে হারিয়ে গেছে। "আমি কোনো কিছু ভাবার সময় পাইনি নয়না। আমার ভেতরের প্রতিশোধের আগুন আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। আমি পিছন থেকে ওকে ধাক্কা দিয়ে চলন্ত বাসের সামনে ফেলে দিই। কিন্তু... কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! ও যখন বাসের নিচে পড়ে চাকার নিচে পিষ্ট হচ্ছিল, ওনার ছিটকে যাওয়া শরীরটা আমার পায়ে এসে লাগে এবং আমি ছিটকে গিয়ে রাস্তার পাশের একটা লোহার পিলারের ওপর আছড়ে পড়ি। ওর মেরুদণ্ড ভেঙেছিল, আর আমার পেলভিক নার্ভ ছিঁড়ে গিয়েছিল।"

​আমি স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম। আমার করা একটা ভুলের খেসারত দিতে গিয়ে আঠারো বছর আগে দুটো মানুষ এভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল!

​"সাজিদ বাঁচেনি, তাই না?" আমি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম।

​"বেঁচেছিল, কিন্তু চিরতরে পঙ্গু হয়ে," আরশাদ বলল। "ওনার পরিবার ওনাকে ঢাকা থেকে ওনার গ্রামের বাড়ি নিয়ে যায়। আর আমি? আমি পঙ্গু হইনি ঠিকই, কিন্তু আমার ভেতরের পুরুষটা পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। যখন ডাক্তার আমাকে ওনার চেম্বারে ডেকে সেই সত্যটা বললেন, আমার মনে হয়েছিল সাজিদ বাসের নিচে গিয়েও জিতে গেছে, আর আমি বেঁচে থেকেও হেরে গেছি। বাড়ি ফিরে আমি যখন দেখলাম তুমি অনুশোচনায় কাঁদছ, আমার পায়ে ধরছ—তখন আমার মনে হলো, আমার এই অক্ষমতার কথা যদি আমি তোমাকে বলি, তুমি হয়তো আমাকে করুণা করবে। আর সমাজ ভাবত, স্ত্রীর পরকীয়ার ধাক্কা সইতে না পেরে আরশাদ পুরুষত্ব হারিয়েছে। আমি ওমন করুণার পাত্র হতে চাইনি। তাই আমি সেই সাদা বালিশটা আমাদের মাঝখানে এনে রাখলাম।"

​আমি আরশাদের দিকে তাকালাম। আমার চোখ দিয়ে এবার আর অনুশোচনার জল বের হলো না, বের হলো তীব্র ঘৃণা।

​"তুমি কতটা স্বার্থপর আরশাদ!" আমি চিৎকার করে উঠলাম। "নিজের পুরুষালি অহংকার আর সমাজের ওই মিথ্যে 'ফেরেশতা' ইমেজটা বাঁচানোর জন্য তুমি আঠারোটা বছর ধরে আমাকে তিলে তিলে মারলে? আমি প্রতিটা রাতে ওই বালিশটার দিকে তাকিয়ে ভেবেছি, আমি কত বড় পাপী! আমার স্বামী আমাকে ঘৃণা করে! অথচ তুমি নিজের অক্ষমতা আড়াল করতে আমার অপরাধবোধকে ঢাল বানিয়েছিলে!"

​"আমি বাধ্য ছিলাম নয়না!" আরশাদও চেঁচিয়ে উঠল। "একজন পুরুষের কাছে ওনার পুরুষত্ব আর ওনার আত্মসম্মানই শেষ কথা। আমি দুটোই হারিয়েছিলাম। শুধু তোমার ওই অপরাধবোধটুকুই আমাকে তোমার চোখে 'মহান স্বামী' করে রেখেছিল। আমি যদি ওটা না করতাম, তুমি কি আঠারোটা বছর আমার এই শীতল ছোঁয়া সয়ে এই ঘরে পড়ে থাকতে? থাকতে না!"

​আমরা যখন ঘরের ভেতর আঠারো বছরের জমানো ক্ষোভ আর বিষ উগরে দিচ্ছিলাম, ঠিক তখনই দরজার বাইরে একটা কাঁচের গ্লাস পড়ে ভেঙে যাওয়ার শব্দ হলো।

​আমি আর আরশাদ দুজনেই চমকে দরজার দিকে তাকালাম। দরজাটা সামান্য ফাঁকা ছিল। আমি দ্রুত গিয়ে দরজা খুলতেই দেখলাম, বাইরে আমাদের ছেলে আবির আর মেয়ে নিশি দাঁড়িয়ে আছে। নিশির হাতে জলের জগ ছিল, যা ওনার হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেছে। ওদের দুজনের চোখেই টলটল করছে জল। ওদের মুখের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।

​ওরা আমাদের সব কথা শুনে ফেলেছে। আঠারো বছর ধরে ওরা যে বাবা-মাকে আদর্শ ভেবে এসেছে, যাদের শান্ত সংসার দেখে ওরা বড় হয়েছে—আজ সেই সংসারের পেছনের কুৎসিত সত্যটা ওদের সামনে নগ্ন হয়ে গেছে।

​"মা... বাবা... এসব কী শুনলাম আমরা?" নিশি কেঁদে ফেলল।

​আবির কোনো কথা বলল না। সে ওনার বাবার দিকে তাকাল। যে বাবাকে সে এতকাল শ্রদ্ধা করত, সেই বাবা নিজের অহংকার বাঁচাতে ওনার মায়ের জীবনটাকে একটা জীবন্ত কবর বানিয়ে রেখেছে—এই সত্যটা আবির নিতে পারছিল না। সে আরশাদের দিকে এক পলক তাকিয়ে গভীর ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল। তারপর নিশির হাত ধরে ওখান থেকে চলে গেল।

​আরশাদ "আবির, নিশি..." বলে ডাকতে গিয়েও থেমে গেল। ওনার গলা দিয়ে আর কোনো আওয়াজ বের হলো না। ওনার আঠারো বছরের সাজানো 'নিখুঁত পরিবার' এক নিমিষেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।

​রাত গভীর হলো। ড্রয়িংরুমে ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো তেমনই পড়ে রইল, কেউ তা পরিষ্কার করতে গেল না। নিশি আর আবির নিজেদের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে আছে।

​আমি আমাদের শোবার ঘরে ফিরে গেলাম। মেঝেতে তখনও সেই সাদা বালিশটা পড়ে আছে। আঠারো বছরের সেই নীরব সাক্ষী। আমি বালিশটা তুলে নিলাম। আরশাদ খাটের এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। ওনার চোখে এখন আর সেই 'ভদ্র বরফের' অহংকার নেই, ওনার চোখে এখন শুধু এক নিঃসঙ্গ বুড়ো মানুষের একাকীত্বের ভয়।

​আমি বালিশটা নিয়ে ঘরের আলমারিতে তুলে রাখলাম। তারপর আরশাদের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম, "আঠারো বছর আগে আমাদের মাঝখানে যে দেয়ালটা তুমি তুলেছিলে, আজ সেটা ভেঙে গেছে আরশাদ। কিন্তু এই ভাঙা দেয়াল আর জোড়া লাগবে না। ছেলেমেয়েদের সামনে আমি তোমার মুখোশ আর খুলব না। কিন্তু এই ঘরের ভেতরে... আমরা আর কেউ কারও চেনা মানুষ নই। তুমি তোমার অহংকার নিয়ে একা থাকো, আর আমি আমার অপরাধবোধ নিয়ে।"

​আমি আর সেই ঘরে শুলাম না। চাদর আর একটা সাধারণ বালিশ নিয়ে ড্রয়িংরুমের সোফায় এসে শুয়ে পড়লাম।

​জানলা দিয়ে মগবাজারের রাতের আকাশ দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টি নেই, তবে বাতাসটা খুব ঠাণ্ডা। আঠারো বছর পর আজ আমার বুক থেকে একটা বিশাল পাথর নেমে গেছে, কিন্তু সেই পাথরের নিচে চাপা পড়ে আমার জীবনের বসন্তটাও যে কবেই মরে গেছে, তা আজ আমি টের পাচ্ছি। আঠারো বছর পর সত্যের জয় তো হলো, কিন্তু আমরা দুজনেই হেরে গেলাম।

​(সমাপ্ত)

​#সাদা_বালিশের_আড়ালে

#Choto_Dairy_01

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url