#সুখ_অমৃত

#পর্বঃ৪+৫

#লেখিকাঃদিশা_মনি


মানতাশাকে বধূবেশে সাজানোর জন্য পার্লার থেকে লোক এসেছে। গতকাল বিয়ার করবে না বলে হম্বিতম্বি করলেও আজ সে এনিয়ে কোন প্রতিবাদ করে নি। সকাল থেকে বেশ স্বাভাবিক আছে। মঞ্জুয়ারা বেগম ভেবেছিলেন মানতাশা আজ পালিয়ে যাবার চেষ্টা করবে কিংবা এই বিয়েতে অন্য কোন ভাবে হলেও বিঘ্ন সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে মানতাশা প্রতিক্রিয়াহীন। এটাতে অবশ্য তিনি বেশ স্বস্তিতে আছেন। 


পার্লারের লোকদের মানতাশার রুমে পৌঁছে দিয়ে তিনি মানতাশার উদ্দ্যেশ্যে বলেন,

“তুই যে চুপ আছিস এবং স্বাভাবিক ভাবে এই বিয়েটা মেনে নিয়েছিস এটা দেখে আমার ভালো লাগল। এখন ভালো মেয়ের মতো চুপচাপ এই বিয়েটা করে নে, তারপর দেখবি তোর সব বদনাম ঘুছে যাবে। আমার কথা মিলিয়ে নিস, এই বিয়ের পর তোকে একদম পস্তাতে হবে না।”


মানতাশা কোন জবাব দেয় না। সে মনে মনে বলে,

“আসল খেলা তো আজ বিয়ের আসরে হবে। সেটা দেখার জন্য তৈরি থাকুন মিস্টার আবু সুফিয়ান।”


মঞ্জুয়ারা বেগম মানতাশার রুম থেকে বেরোনোর পরই তার কাছে সুফিয়ানের কল আসে। তিনি ফোনটা রিসিভ করতেই সুফিয়ান বলে,

“ওদিকের কি অবস্থা? মানতাশা কি আবার কোন নতুন ঝামেলা করছে?”


মঞ্জুয়ারা বেগম হাসি মুখে বলেন,

“আরে, কি যে বলেন। মানতাশা আর কোন ঝামেলা করে নি, ও স্বাভাবিক ভাবেই সব মেনে নিয়েছে। আমার মনে হয় ওর সুবুদ্ধি হয়েছে।”


মঞ্জুয়ারা বেগমের কথায় খুব একটা ভরসা পায়না আবু সুফিয়ান। কারণ সে কাল মানতাশার চোখে যেই জেদ দেখেছে সেই মেয়ে যে এত সহজে বিয়েতে রাজি হবে না, সেটা স্পষ্টতই বোঝা যায়। সুফিয়ান স্পষ্ট বুঝতে পারে এর মধ্যে কোন ঘাপলা আছে। তাই সে মঞ্জুয়ারা বেগমের উদ্দ্যেশ্যে বলে,

“মানতাশার উপর নজর রাখবেন ভালো করে। আমার মনে হচ্ছে ও তলে তলে কোন পরিকল্পনা করছে।”


“আমার সেটা মনে হচ্ছে না।”


“আপনাকে যা বলছি তাই করুন, অনেক কষ্টে আমি এমন পরিস্থিতির তৈরি করেছি যাতে মানতাশা আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়৷ এখন আমি চাই না, কোনভাবে তীরে এসে তরী ডুবুক।”


মঞ্জুয়ারা বেগমের বেশ খটকা লাগে। তাই তিনি জিজ্ঞেস করেন,

“অনেক কষ্টে মানে? তাহলে কি কাল আপনিই মানতাশাকে ফাসিয়েছিলেন?”


আবু সুফিয়ান এবার বেশ রাগী স্বরে ধমক দিয়ে বলে,

“আপনাকে তো এত কিছু জানতে হবে না। মানতাশার সাথে আমার বিয়ে হলে আপনি প্রতিশ্রুতি মোতাবেক এক কোটি টাকা পাবেন। সেটা নিয়েই খুশি থাকুন।”


বলেই সুফিয়ান ফোন কে'টে দেয়। অতঃপর রুমের বাইরে আসে। সেখানে তার খাশ লোক আব্দুল করিম দাঁড়িয়ে। আব্দুল করিম সুফিয়ানকে দেখেই সালাম দেয়। সুফিয়ান সালামের উত্তর দিয়ে বাঁকা হেসে একটা চেক বাড়িয়ে দেয় আব্দুল করিমের দিকে। আব্দুল করিম চেকটা হাতে নিয়ে সেখানে চুমু খেয়ে বলে,

“ধন্যবাদ, জনাব।”


“তোমার উপর আমি ভীষণ খুশি আব্দুল করিম। তুমি যেভাবে মেয়েটাকে ফাসিয়েছ তা বলার বাহিরে।”


আব্দুল করিম মৃদু হাসে। সুফিয়ান একটু কড়া গলায় বলে,

“মেয়েটার সাথে কিছু করো নি তো?”


আব্দুল করিম জিভে দাঁত কেটে বলে,

“ছি, জনাব। উনি আপনার হবু স্ত্রী হবে। ওনার সাথে আমি কিভাবে কি করতে পারি? আপনার কথামতো আমি শুধু ঐ মেয়েকে অজ্ঞান করে রুমে শুইয়ে দিয়েছিলাম। আর একটা মেয়েকে সাথে করে নিয়ে গেছিলাম। সেই মেয়েই ওর জামা-কাপড় খুলে নগ্ন করে বিছানায় শুইয়ে দেয়। তারপর আমি ফোন করে এলাকার সবাইকে বলি যে আপনাদের পাশের বাড়িতে নষ্টামি চলছে। বাকিটা তো জানেনই।”


সুফিয়ান উচ্চস্বরে হেসে ওঠে।


“কাজটা তুমি দারুণ করেছ।”


আজ সময় যেন একটু জলদিই পেরিয়ে যাচ্ছে। মানতাশা বারবার ঘড়িতে সময় দেখছে। সন্ধ্যা ৭ টা বাজে। ৭ঃ৩০ নাগাদ সুফিয়ান চলে আসবে। তার পূর্বেই মানতাশাকে যা করার করতে হবে। মানতাশা আবারো নিজের ফোন বের করে। কাঙ্খিত নম্বরটি ডায়েল করে সেখানে ফোন করে। কিছুক্ষণ রিং হবার পর ফোনটা রিসিভ হয়। মানতাশা অসহায় কন্ঠে বলে ওঠে,

“রেখা, কোথায় তুই? আমি আর কতক্ষণ এভাবে অপেক্ষা করব?”


রেখা বলে,

“আমি একটা কাজে আটকা পড়ে গেছি। তাই আমার ভাইয়াকে পাঠিয়েছি তোকে আনার জন্য। তুই আমার ভাইয়ার সাথে চলে আয় প্লিজ। ভাইয়া একটু পড়েই পৌঁছে যাবে।”


“তোর ভাইয়া মানে রাসেল ভাই? কত দূরে উনি?”


“ভাইয়া তো বলল, উনি প্রায় পৌঁছেই গেছেন। তুই একটু অপেক্ষা কর।”


“আচ্ছা।”


বলেই মানতাশা ফোন রেখে দেয়। রেখা মানতাশার একজন বিশ্বস্ত বন্ধু। এই বিপদের দিনে তাই তাকেই স্মরণ করেছে মানতাশা। রেখার সাথে কথা বলার পর আবারো নিজের ব্যাগে সবকিছু ভালো ভাবে চেক করে নেয় মানতাশা। হ্যাঁ, পাসপোর্ট, ভিসা সবকিছু ঠিকই আছে। 


গত বছর মানতাশার ইচ্ছা ছিল উইন্টার হলিডেতে বিদেশে ঘুরতে যাবে। কিন্তু তার বাবা সেই সময় ব্যস্ত থাকায় আর কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠে নি। কিন্তু মানতাশার বাবা তাকে কথা দিয়েছিল সামার হলিডেতে তাকে দুবাইয়ে ঘুরতে নিয়ে যাবে। সেই জন্য পাসপোর্ট ভিসা সব করে রাখাও ছিল। দুবাইয়ে মানতাশার ফুফু সপরিবারে থাকে। মানতাশা গতকাল রাতেই ফুফুর সাথে কথা বলে রেখেছে। বাবার মৃত্যুর পর এখন ফুফুই তার একমাত্র ভরসা। তাই মানতাশা ঠিক করেছে আজকেই সে পালিয়ে নিজের ফুফুর কাছে দুবাইয়ে চলে যাবে। এজন্য নিজের বান্ধবী রেখার সাথে যোগাযোগ করেছে। রেখা তাকে সাহায্য করার আশ্বাস দিয়েছে। বিমানের টিকেটের বন্দোবস্তও সে করে দিয়েছে। এসব ভেবেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মানতাশা।


একটু পরেই তার ফোন বেজে ওঠে। রেখার কল। মানতাশা ফোন রিসিভ করতেই রেখা বলে ওঠে,

“ভাইয়া পৌঁছে গেছে। তুই জলদি নিচে নেমে যা।”


মানতাশা ফোন রেখে পরণের শাড়ি খুলে দ্রুত একটা বোরখা পড়ে নেয়। নিজেকে আড়াল করার জন্য। অতঃপর ধীর পায়ে হেটে বাইরে আসার চেষ্টা করে। মাঝপথে হঠাৎ করে কেউ তার হাত ধরে টান দেয়। মানতাশা তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলেই মঞ্জুয়ারা বেগম তাকে ধরে ফেলে এবং বলে,

“কি ভেবেছিস? এত সহজে আমার চোখকে ফাকি দিয়ে পালিয়ে যাবি?”


মানতাশা মঞ্জুয়ারা বেগমকে দেখে হতাশার শ্বাস ফেলে। তাহলে কি তীরে এসে তরী ডুবল বলে?


আবু সুফিয়ান একদম রাজকীয় বেশে বরের সাজে সেজে উঠেছে। দারুণ কারুকাজ করা সাদা পাঞ্জাবী তার উপর শেরওয়ানীতে দারুণ লাগছে তাকে। আজ যেন তার বয়স অনেকটাই কমে গেছে। কেউ দেখে বলবেই না, তার বয়স ৩৩, এক দেখায় যে কেউ ২৫ বছরের যুবক ভেবে ভুল করবে। আবু সুফিয়ান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,

“আমার জন্য অপেক্ষা করো মানতাশা। আর মাত্র কিছু সময়ের অপেক্ষা, তারপর আমি তোমাকে একদম নিজের করে নেব। তুমি না চাইলেও আমার কাছে তোমাকে ধরা দিতেই হবে।”


বলেই নিজের গায়ে সুগন্ধী মেখে নেয় আবু সুফিয়ান। 


তারপর গুনগুন করে গান গাইতে শুরু করে। তার নিকটাত্মীয় বলতে তেমন কাছের কেউ নেই। সুফিয়ানের সবথেকে কাছের বলতে তার সেক্রেটারি রাশেদ। সেই রাশেদকেই সবদিক তদারকির দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে। বিজনেস করার সুবাদে বেশ ভালোই পরিচিতি তৈরি হয়েছে, সেই পরিচয়কে কাজে লাগিয়েই অনেকের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেছে। সেইসব ব্যক্তিদের নিজের বিয়েতে নিমন্ত্রণও করেছে। এখন তাদের আপ্যায়নের ভার পুরো রাশেদের কাঁধে।


রাশেদ এসে উপস্থিত হয় সুফিয়ানের কক্ষের সামনে। সুফিয়ান তাকে দেখে বলে,

“সব কাজ কমপ্লিট?”


“জ্বি, স্যার। আপনার গাড়িও চলে এসেছে। চলুন এখন।”


“হুম, যাচ্ছি।”


বলেই আবু সুফিয়ান একটা হাসি দেয়। এবার তার গন্তব্য মানতাশাদের বাড়ি। সেখানে যাওয়ার পরেই মানতাশাকে একদম নিজের করে নেবে।


চলবে ইনশাআল্লাহ ✨#সুখ_অমৃত

#পর্বঃ৫

#লেখিকাঃদিশা_মনি


আবু সুফিয়ান রাশেদকে সাথে নিয়ে উপস্থিত হয়েছে মানতাশাদের বাড়িতে। এখানে এসে শুরুতেই সে লক্ষ্য করল চারিপাশের থমথমে পরিবেশ। বুঝতে বাকি রইল না নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে। পুরো বাড়ি জুড়ে মানুষের ভীড়। সুফিয়ান রাশেদকে আদেশ দিলো,

“তুমি এক্ষুনি সবাইকে ঠেলে সরানোর ব্যবস্থা করো। আমায় ভেতরে যেতে হবে।”


রাশেদ সুফিয়ানের আদেশ মতোই কাজ করল। কয়েকজন গার্ডকে দিয়ে ভীড় ভাট্টা কমালো। ভীড় কমতেই সুফিয়ান বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো। ড্রয়িংরুমে এসেই হতবাক হয়ে গেলো। মঞ্জুয়ারা বেগম ফ্লোরে বসে আহাজারি করে কেঁদে চলেছেন। কি মানে এই কান্নার? সুফিয়ানের সন্দেহ এবার গাঢ় হলো। মঞ্জুয়ারা বেগমের কাছে এসে সে বেশ উত্তেজিত গলায় বলল,

“কি হয়েছে টা কি? এখানে এত জটলা কেন? মানতাশা কোথায়?”


সুফিয়ানকে দেখে মঞ্জুয়ারা বেগমের আহাজারি আরো বাড়ে। তিনি নাকি সুরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন,

“পালিয়েছে ও..”


সুফিয়ানের চেহারায় শক্ত ভাবমূর্তি ফুটে ওঠে। নিজ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সে বলে,

“এত পাহাড়া ভেঙে ও পালালো কিভাবে? আপনাকে তো আমি বলেছিলাম ওকে দেখে রাখতে।”


“আমি ওকে প্রায় ধরেই ফেলেছিলাম..কিন্তু ও আমার নাকে কিছু একটা স্প্রে করে পালিয়ে গেল..”


“ড্যাম ইট..রাশেদ..এক্ষুনি গোটা শহরে লোক লাগিয়ে দাও। আমার মনে হয়না মানতাশা এখনো খুব দূরে গিয়েছে বলে। আর হ্যাঁ, সব বাস স্ট্যান্ড, রেলস্টেশন আর এয়ারপোর্টে লোক ছড়িয়ে দাও। ও যেন কোনভাবেই পালাতে না পারে।”


“জ্বি, স্যার।”


সুফিয়ান সামনে থাকা একটা ফুলদানি তুলে নিয়ে আছড়ে ফেলে বলে,

“এত সহজে তোমাকে আমি পালাতে দেব না মানতাশা। তোমাকে আমার বন্দিনী হতেই হবে।”


“আপনাকে ধন্যবাদ ভাইয়া, আমাকে এখান অব্দি পৌঁছাতে সাহায্য করার জন্য।”


মৃদু হেসে কথাটা রাসেলকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে মানতাশা। রাসেল বলে,

“ধন্যবাদ জানানোর কোন প্রয়োজন নেই। তুমি আমার বোন রেখার বন্ধু, মানে তুমি আমারও বোন। কখনো কোন বিপদে পড়লে এই ভাইকে অবশ্যই স্মরণ করবে।”


“জ্বি, অবশ্যই। আচ্ছা ভাইয়া, আমি তাহলে এখন আসি। আমার ফ্লাইটের সময় হয়ে যাচ্ছে।”


“হ্যাঁ, এসো। আর সাবধানে যেও।”


মানতাশা দ্রুর এয়ারপোর্টের দিকে পা বাড়ায়। এতক্ষণে বুঝি সুফিয়ানের কাছে তার পালানোর খবর পৌঁছে গেছে। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে এই দেশ ত্যাগ করতে পারবে তত তাড়াতাড়ি সে শান্তি পাবে। এয়ারপোর্টে ঢুকে যাবতীয় ফর্মালিটিস পূরণ করতে গিয়ে মানতাশার নাভিশ্বাস উঠে যায়। ভীষণ বিরক্তি বোধ হয়। কিন্তু তার কিছু করারও ছিল না। মানতাশা ফোশ করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,

“আল্লাহ, তুমি আমার সহায় হও। এতদূর যখন আসতে পেরেছি তখন যেন নিশ্চিন্তে এই দেশটাও ত্যাগ করতে পারি।”


অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মানতাশা বিমানে ওঠে বসে। আর মাত্র কিছু সময় তারপরই সে সুফিয়ানের বদনজর থেকে অনেক দূরে চলে যাবে। ভাবতেও মনে অভাবনীয় শান্তি অনুভূত হচ্ছে। সে আর কখনো চায় না ঐ লোকটার মুখোমুখি হতে। এখন দুবাইয়ে গিয়ে নিজের মতো একটা সুন্দর জীবন গড়ে তুলবে এটাই তার স্বপ্ন।


আবু সুফিয়ান থেকে থেকে ঝিমোচ্ছে। জীবনে প্রত্যাখ্যান শব্দের সাথে সে খুব একটা পরিচিত নয়। কিন্তু আজ একটা একরত্তি মেয়ে তাকে প্রত্যাখ্যান করে এভাবে চলে গেল। এটা তার কাছে তুমুল অপমানের। যার ফলে ক্রোধে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে। প্রচুর রাগ জমছে মানতাশা নামক মেয়েটির প্রতি। ভেবেছিল মেয়েটাকে বিয়ে করে নিজের রাণী করে রাখবে কিন্তু মেয়েটার এহেন কর্মকাণ্ডে তার ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। এখন সে চায় মেয়েটাকে খুঁজে বের করে তাকে নিজের কাছে বন্দি করে রাখতে। এবার প্রয়োজনে তাকে রক্ষিতা করে রাখবে। এভাবেই ঐ মেয়েকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে।


রাশেদ খেয়াল করছে সুফিয়ানের উদ্বেগ। তাই সে সুফিয়ানের কাছে এসে বলে,

“স্যার,আপনার কি কিছু লাগবে?”


“আমার এখন শুধু আর শুধু ঐ মেয়েটাকে লাগবে। যেখান থেকে পারো ওকে আমার সামনে এসে হাজির করো। স্বর্গ-মর্ত-পাতাল যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, আমার পায়ের কাছে এনে ফেলো ঐ মেয়েক।”


রাশেদ কর্তব্যপরায়ণ ভৃত্যের মতো বলে,

“আমি সব যায়গার ঐ মেয়ের খোঁজে লোক লাগিয়ে দিয়েছি স্যার। আপনি চিন্তা করবেন না। ঐ মেয়ে যেখানেই ঘাপটি মে'রে বসে থাক খুব শীঘ্রই ওকে আপনার সামনে এনে হাজির করবো।”


সুফিয়ান রাশেদের এই অভয় বাণীতে স্বস্তি পায় না। রাগে কাপতে থাকে তার পুরো শরীর। মানতাশার উদ্দ্যেশ্যে তীব্র ভৎসর্না করে বলে,

“তুমি যেখানেই লুকিয়ে থাকো মানতাশা...খুব শীঘ্রই তোমাকে আমার পায়ে এসে পড়তে হবে। তোমাকে আমার দাসত্ব বরণ করতেই হবে।”


দুবাই, ইমারতের শহর। যার বুকে অবস্থিত বিশ্বের সবথেকে উঁচু ইমারত বুর্জ খলিফা। পারস্য উপসাগরের পারে অবস্থিত এই শহরে পা রাখলো মানতাশা। দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নেমে সে স্বস্তির শ্বাস ফেললো। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টার উড়ানের পর সে অবশেষে আবু সুফিয়ানের থেকে হাজার মাইল দূরে এসে পৌঁছেছে। যেখানে ঐ লোকটা আর চাইলেও তার খোঁজ পাবে না। ভাবতেই অদ্ভুত প্রশান্তিতে ছেয়ে যাচ্ছে পুরো মন। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজের ফুফুকে খুঁজতে থাকে মানতাশা। তার ফুফু হুসনেয়ারা বেগম তো বলেছিলেন তিনি বিমানবন্দরে মানতাশাকে নিতে আসবেন। তাহলে এখনো এলেন না কেন?


মানতাশা অপেক্ষা করতে লাগলো। ক্রমশই অধৈর্য হয়ে উঠল। এরমধ্যেই সে দেখতে পেল একজন বোরকা পড়া মহিলা তার দিকে এগিয়ে আসছে। মানতাশার নিজের পরণেও বোরখা। তবে হিজাব ব্যবহার করায় তার মুখটা দেখা যাচ্ছে। তবে ঐ মহিলার আপাদমস্তক বোরখায় আবৃত। তাই মানতাশা সহজে চিনতে পারল না। মহিলা যখন কাছে এসে সস্নেহে ডেকে উঠল,

“মানতাশা।”


তখনই এই পরিচিত স্বর চিনে ফেলল। দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল নিজের ফুফুকে।


“আমি কি একটু বেশি দেরি করে ফেললাম? তোকে কি একটু বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে?”


হুসনেয়ারা বেগমের প্রশ্নের জবাবে মানতাশা বলল,

“হ্যাঁ, একটু।”


দুজনেই সমস্বরে হেসে উঠল। আজ অনেক দিন পর মানতাশা কারো সাথে এমন আনন্দে কথা বলতে পারছে। মায়ের থেকে কাঙ্খিত স্নেহ কখনো পায়নি, বাবার মৃত্যুর পর তো মায়ের জঘন্য রূপ দেখতে হয়েছে। তবে ফুফুর থেকে সবসময় মাতৃস্নেহ পেয়ে এসেছে। 


মানতাশার ফুফু বিয়ে করেছে এই দেশেরই এক নাগরিককে এবং সে এই দেশের নাগরিকত্বও পেয়েছে। বাংলাদেশে খুব একটা যায়না সে। সর্বশেষ মানতাশা যখন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল তার কিছু দিন আগে ফুফুর দেখা পেয়েছিল। তারপর আজ এই প্রথম। মানতাশার ফুফু তাকে বলে,

“অনেকক্ষণ বোধহয় তোকে অপেক্ষা করতে হলো। চল, এখন আমার সাথে।”


মানতাশা তার ফুফুর সাথে চলে। একটু সামনে যেতেই একটি ল্যাম্বরগিনী গাড়ি দেখতে পায়। এটা তার ফুফুর। মানতাশা অবাক হয়না। তার ফুফু দুবাইয়ের অন্যতম ধনী এক শেখ পরিবারের পুত্রবধূ। তাই তার কাছে এরকম গাড়ি থাকাটা স্বাভাবিক। হুসনেয়ারা বেগম মানতাশাকে সেই গাড়িতে উঠে বসতে বলে। মানতাশা হালকা হেসে গাড়িতে উঠে বসে।


সুফিয়ানের রাগ মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মানতাশাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ১৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো কেউ তার খোঁজ দিতে পারছে না। সুফিয়ান রাশেদের উদ্দ্যেশ্যে চিতকার করে বলে,

“টাকা দিয়ে একগাদা অকর্মন্য পুষে রেখেছি, কেউ কোন কাজের না।”


“আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি স্যার।”


সুফিয়ান রাগত স্বরে বলে,

“ঐ মেয়ের খুব শখ আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর। একবার শুধু ওর খোঁজ পাই, তারপর দেখাবো কত ধানে কত চাল।”


চলবে ইনশাআল্লাহ ✨

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url