#ভালোবাসারা_ভালো_নেই

#অজান্তা_অহি

#পর্ব-০৪


আমি অস্পষ্ট সুরে বিড়বিড় করলাম,


'আমার ভালবাসার মানুষগুলো তীব্র অভিমান নিয়ে দুনিয়া ছাড়লো। তোমরা কেউ দেখলে না। কেউ নাহ!'

___________


চোখ মেলতে দেখি ভোরের আলো ফুটে গেছে। চারপাশে চেঁচামেচি আর শোরগোলের আওয়াজ। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, আশপাশের দুই তিন গ্রামের মানুষ চলে এসেছে। বাড়িতে তিল ধারণের জায়গা নেই। আব্বা নতুন বউ আনার পরো এত মানুষ হয়েছিল না। আজ পরিচিত অপরিচিত মানুষ দিয়ে বাড়ি ভর্তি। আমার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। এতো মানুষ কেনো বাড়িতে? ঐতো মায়ের দূর সম্পর্কের বোন টা দাড়িয়ে আছে। সবার চোখ মুখ এমন শুকনো কেন! বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলাম আমি।


বারান্দার ছোট্ট খুপড়িতে আছি। আমাকে ঘিরে জনা-দশেক মানুষ। মাথার উপরে স্যালাইন ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। আমাকে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে? কখন? আর কেন? আচমকা মস্তিষ্ক খোলাসা হলো আমার। এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। দৌঁড়ে বড় ঘরের দরজায় হুমড়ি খেয়ে পড়তে চোখের সামনে দেখতে পেলাম চার-চারটে লাশ। মাটিতে শায়িত। হিতাহিত বোধশূণ্য হয়ে গেলাম যেন! দৌঁড়ে মায়ের কাছে যেতে যেতে বললাম,


'মাকে মাটিতে শুইয়ে রেখেছ কেন? ঠান্ডা লেগে যাবে তো। মায়ের শ্বাসকষ্ট আছে! সর্দি হলে মা শ্বাস নিতে পারে না।'


মায়ের শরীর স্পর্শ করে শিউরে উঠলাম আমি। ঠান্ডা বরফের মতো হয়ে গেছে। কেমন যেন থমকে গেলাম। একে একে বড় আপা, সেজো আপাকে স্পর্শ করলাম। সবার শরীর এতো শীতল কেন? এক লাফে পুতুলের কাছে গেলাম। পুতুলের শুকনো ঠোঁট জোড়া হালকা প্রসারিত। দেখে মনে হচ্ছে ঘুমের মধ্যে মিষ্টি কোনো স্বপ্ন দেখে হাসছে। ঘুমানোর আগে এক বাটি দুধ পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছিল নিশ্চয়ই! আহারে পুতুল। আমার পুতুল!


বুকের ভেতর হাহাকার করে উঠলো আমার। দুনিয়া এতো নিষ্ঠুর কেন! তবে কি সেজো আপার কথা সঠিক? বেঁচে থাকা সত্যিই কঠিন? তা না হলে মা সবাইকে নিয়ে আত্ম'হ'ননের পথ বেছে নিলো কেন! হুট করে বুকের ভেতর বিপুল শূন্যতা অনুভব করলাম। বুঝতে পারলাম আমার এই দুনিয়ায় আর কেউ নেই। এই যে চারপাশের এত লোকজন! এদের কেউ আমার আপন নয়। কেউ আমার ভালবাসা নয়। আমার প্রিয়জন নয়! সন্ধ্যা মেলাবার আগে আগে সবাই চলে যাবে। পালিয়ে যাবে। আমার কি হবে এখন?


কয়েক জন ধরে রেখেছিল আমায়। তাদের থেকে ছুটে দৌঁড়ে পুকুর পাড়ে গেলাম। বাঁকানো হিজল গাছটার গোড়ায় সাদা বিড়ালটা মরে পড়ে আছে। কাল রাতে এখানেই খেতে দিয়েছিলাম ওকে। বেচারা আর নড়বার সুযোগ পায়নি। আহারে জীবন! হাঁটু ভাঁজ করে ওর পাশে বসে পড়লাম। গায়ে হাত বুলাতে মন বলে উঠলো,


'আমার মৃত্যুটা এভাবে নিজের করে কেন নিলি? এখন আমি এই পৃথিবীতে একা বাঁচবো কি করে? কি করে!'


কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো শুধু। আর কাঁদলাম না। কান্না পেলো না আমার। লোকজন ধরে উঠোনে নিয়ে এলো। আমি রান্নাঘরের এক কোনায় বসে সবকিছু দেখতে লাগলাম। নিজেকে কেমন অনুভূতি শূণ্য মনে হচ্ছে। চারপাশের এতো কান্না, আহাজারি, লোকজনের আহা উঁহু কিছুই স্পর্শ করছিল না আমায়। তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখলাম। 


বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পুলিশের জিপ আসলো। তাগড়া তাগড়া কয়েকজন পুলিশ এসে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করলো। আমাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো। আমি উত্তর দিলাম না। ঘৃণায় দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। এতদিন এরা কোথায় ছিল? যখন আমরা দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছি। পুতুল তার স্বরে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে। বড় আপাকে এত অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। এতদিন তারা কোথায় ছিল যখন আমাদের সাথে একের পর এক অন্যায় হচ্ছিল! কোনো উত্তর দিলাম না পুলিশকে। তাদের ডেকে নিয়ে গেলো রাফি ভাইয়ের বাবা জাকির কাকা। জাকির কাকার সাথে কি কথা হলো জানি না। অনেক তর্ক বিতর্কের পর পুলিশ চলে গেলো। সন্ধ্যার পর পর গ্রামবাসী কবর খুঁড়ে ফেললো।


গোসলের পর আমি শুধু সেজো আপাকে দেখলাম। সেজো আপার ভালো নাম জ্যোতি। আব্বা ময়না বলে ডাকতো। বোনদের মধ্যে আপাকে আমি বেশি ভয় পেতাম। আপার ভয়ংকর রাগ। এই রাগসহ আপা আমার কত আপন ছিল। ভালবাসার ছিল! আমার ভালোবাসার ময়না সাদা কাপড় জড়িয়ে শুয়ে আছে। আমার আপার চেহারায় কত অভিমান জমানো। বেচেঁ থাকতে এই অভিমান সে সযত্নে লুকিয়ে রাখত। আজ আপার কোনো লুকোচুরি নেই। সে যেনো পৃথিবী বাসীকে বলছে, দেখো আমি কত অভিমান নিজের মাঝে লুকিয়ে রেখেছিলাম। তোমরা কেউ খোঁজ নেওনি! 


আমার সমস্ত অভিমান গিয়ে মায়ের উপর জমলো। কিন্তু পরক্ষণে বুঝতে পারলাম মা কম কষ্ট নিয়ে দুনিয়া ছাড়েনি! আমি রাফি ভাইকে নিয়ে রঙিন স্বপ্নে বিভোর ছিলাম বলে মায়ের কষ্ট উপলদ্ধি করিনি। জন্মের পর থেকে মা যুদ্ধ করছে। বেঁচে থাকার জন্যে লড়াই করছে। পর পর কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ায় কত লাঞ্ছিত, অপমানিত হয়েছে। আব্বার হাতে জখম হয়েছে। আব্বার লাঠির আ'ঘাতে পাঁজরের হাড় ভাঙ্গার পরও মা হাল ছাড়েনি। জীবনযুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করেনি। আজ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আমার মা নিরুপায় হয়ে নিয়েছিল। মা যে ইতোধ্যে হাজার বার ম'রে গেছে!

রাত হতে না হতে আমার ভালবাসা গুলো চোখের আড়ালে চলে গেলো। তাদের দূরে কবর দিয়ে এলো। প্রিয়জনদের আমার অলক্ষ্যে রেখে আসলো। আমি চেয়ে চেয়ে দেখলাম শুধু। কিচ্ছু করতে পারলাম না। কয়েক ফোঁটা চোখের জলও ফেললাম না। এতো নিষ্ঠুর কেন আমি? 


সেদিনের রাতটা কি বিভীষিকাময় কাটলো। আমার নতুন মা এলো পরদিন। বাড়ি তখন সুনসান। কয়েক জন স্বজন ছাড়া কেউ নেই। নতুন মা এসে আমায় সান্ত্বনা দিলেন। আমি চুপচাপ শুনে গেলাম। এক ফাঁকে বললাম,


'আমি ঠিক আছি। আপনার কিছু বলতে হবে না!'


সে তবুও থামলো না। আমার কাছ ঘেঁষে এসে বলল,


'তুমি কি ভয় পাচ্ছো জুঁই?'


'ভয় কেন পাবো? আশ্চর্য! আর কাকে ভয় পাবো?'


'নতুন মা কিছুক্ষণ উসখুশ করল। পরে বললো,


'এ বাড়িতে তোমার একা থাকা নিরাপদ না জুঁই। বুঝছো? তোমারে আমার সাথে নিয়ে যাবো ভাবতেছি। কি বলো?'


'আমি কোথাও যাব না। এখানেই থাকবো।'


বলে সরে এলাম আমি। তখনও বুঝতে পারিনি, এই জীবনে ঠিক কি কি হারিয়ে ফেলেছি আমি! 


___________


এতগুলো প্রাণ চলে গেলো দুনিয়া ছেড়ে। এক রাতের বিনিময়ে। অথচ তাতে পৃথিবীর কিচ্ছু হলো না। রোজকার মত সকাল হতে লাগলো, পাখিরা কিচির মিচির শুরু করলো। দখিনা হাওয়া বইতে লাগলো। দু-চারদিন কানাঘুষা করে গ্রামবাসী থেমে গেলো। তাদের কাছে সব স্বাভাবিক হয়ে গেলো। শুধু আমার ক্ষেত্রে ভিন্ন। সবকিছু আগের মতো থেকেও আমার চারপাশে কি যেন নেই! বাতাসে মায়ের গায়ের গন্ধ নেই। হুটহাট পুতুলের কান্নার আওয়াজ শোনা যায় না এখন। বড়ো আপা ঘোমটা খুলে আর ডেকে উঠে না। সেজো আপার গা ছাড়া স্বভাব আর চাইলেও দেখতে পাই না। এই এতো এতো শুন্যতা আমার ছোট্ট হৃদয় আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে লাগলো।


আব্বা এলো বেশ কিছুদিন পর। এতদিন অনেকটা পলাতক ছিল। পুলিশ নাকি আব্বাকে খুঁজেছে। তার জন্য পালিয়ে পালিয়ে ছিল। সেদিন সন্ধ্যায় আব্বা লুকিয়ে এলো। আমার সাথে দেখা করার জন্য। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আব্বার প্রতি আমার ঘৃণার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এতটা বেড়ে গেছে যে আমি তার মুখ পর্যন্ত দর্শন করলাম না। 


রাতের বেলা বারান্দার খুপড়িতে বসে ছিলাম। হঠাৎ জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি রাফি ভাই আসছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য দৃষ্টি বিভ্রম মনে হলো আমার। পরে দেখি নাহ! সত্যি রাফি ভাই এসেছে। তার উপস্থিতি টের পেয়ে আব্বা বেরিয়ে এলেন। তাড়াহুড়ো করে এসে তাকে ঘরে নিয়ে গেলেন। আমি কিছুক্ষণ বিমূর্ত রইলাম। আব্বা রাফি ভাইকে কেন ডেকেছে কারণ উদঘাটন করতে পারলাম না। 


সময় বয়ে যাচ্ছে। ওপাশের ঘরে কি কথা হচ্ছে জানা নেই আমার। কিছুক্ষণ এ ঘরে ছটফট করে বের হলাম। উচিত-অনুচিতের তোয়াক্কা না করে ভেড়ানো দরজার এপাশে কান রাখলাম। আব্বা কয়েক মিনিট এ কথা, সে কথা বললেন। হুট করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,


'বাবাজী তুমি কি জুঁই মাকে পছন্দ করো? ওরে বিয়া করতে পারবা?'


দরজার এপাশে বুক দুরুদুরু বেড়ে গেলো আমার। সেই সাথে আব্বার উপর রাগ হলো। আব্বা কি বলছে এসব? ভেতরে ভেতরে রেগে গেলেও মনের কোনো একটা অংশ রাফি ভাইয়ের উত্তর শুনার জন্য অপেক্ষায় রইলো। রাফি ভাই দীর্ঘ সময় নিল না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,


'চাচা আমি আপনার সেজো কন্যা জ্যোতিকে পছন্দ করতাম। ওকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু বিধি বাম। কি এক অঘটন ঘটে গেলো।'


রাফি ভাইয়ের কণ্ঠে দুঃখ ফুটে উঠেছে। কাছের কেউ, আপন কেউ হারানোর দুঃখ। কিন্তু আব্বা হাল ছাড়লেন না। বললেন,


'যা হইবার তা তো হইয়া গেছে। জ্যোতি মা তো আর ফিরা আইবো না। তুমি বাজান আমার মেয়েটার দায়িত্ব নিতে পারবা? বাচ্চা মেয়ে আমার! জীবনটা উলোট-পালোট হইয়া গেছে। বহুত কষ্ট পাইতেছে। তুমি রাজি থাকলে আমি আইজ রাইতেই তোমার আব্বার লগে কথা কমু। তোমার আব্বা আমার বন্ধু মানুষ। ওরে তোমার হাতে তুইলা দিলে আমি এট্টু নিশ্চিন্ত হই।'


'চাচা মাফ করবেন। আমি পারবো না। জুঁইকে আমি অন্য নজরে কখনো দেখি নাই।'


আমি আর দাঁড়ালাম না। ছুটে ঘরে চলে আসলাম। যা শোনার, যা বোঝার তা হয়ে গেছে আমার।


_________


লোকমুখে শুনতে পেলাম আব্বা বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছে। বাড়ি ছাড়া গ্রামে আমাদের আর কোনো সম্পদ ছিল না। বাড়ি বিক্রির সব কথা কানে এসেছে আমার। কিন্তু প্রতিবাদ করিনি। কেন করবো? কার জন্য করবো? এই বাড়িতে যে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল! আমি এই বাড়ি ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে, পরিচিত মানুষ ছেড়ে পালিয়ে যেতে চাই। এই জীবন থেকে পালিয়ে যেতে চাই। দূরে, বহুদূরে!


আব্বা বেশ কিছুদিন হলো আমার সাথে এ বাড়িতে থাকে। একদিন নতুন মা এলো। পরদিন ভোরবেলা মা-বোনদের কবর জিয়ারত করা হলো। বিকেলবেলা নতুন মা আমায় কাপড় চোপড় গুছিয়ে নিতে বললো। বুঝতে পারলাম, পুরোনো স্মৃতি ছেড়ে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। সেদিন রাতের আঁধারে কিছু নির্দিষ্ট জিনিস নিয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখলাম। প্রিয় জায়গা ছেড়ে, প্রিয় মানুষগুলো ছেড়ে! শেষ বারের মতো পুকুর পাড় থেকে রাফি ভাইয়ের বাড়ির দিকে তাকালাম। রাফি ভাই বারান্দা দিয়ে একবার হেঁটে গেলো। পূর্বের মত এবারো টের পেলো না কেউ একজন তাকে দেখে চোখের শান্তি মেলালো। শেষবারের মতো!


আমি সম্মুখে পা রাখলাম। আমার পনেরো বছরের সমস্ত আবেগ, হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা আর প্রিয় মানুষগুলোর সমস্ত স্মৃতি ফেলে রেখে এগিয়ে চললাম। এতটুকু দুঃখ পেলাম না, কষ্ট পেলাম না। কাঁদলাম না! পাথর হয়ে গেছি যেন। আমার শুকনো চোখের নদীতে জোয়ার আসলো খানিক পরে। অবশেষে মায়ের কবরের পাশে দিয়ে যাওয়ার সময় চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। বুঝতে পারলাম, আমার ভালবাসারা ভালো নেই!


সম্পুর্ণ গল্পের লিংক 👇

https://www.facebook.com/share/p/182nLi4Vqh/

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url