#রংহীন_বসন্ত

পর্ব ৩

#ইস্পিতা_রহমান

রংহীন বসন্ত ৩

হরিণীর ন্যায় ভীত আঁখিজুগল আর কাছুমাছু মুখ দেখে শারাফের বুঝতে বাকি থাকে না প্রিয়তা ভয় পাচ্ছে।কফি শপে প্রিয়তার মুখোমুখি চেয়ারে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুজে বিচক্ষণতার সাথে প্রিয়তার দিকে চেয়ে আছে।মনেমনে বোনের পছন্দের তারিফ করছে সে।প্রিয়তা চোখ নামিয়ে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে যেনো ভীষণ অস্বস্থি হচ্ছে ওর।নিরবতা ভেঙে শারাফই বলে উঠে,


--সকালে আমি তোমায় ঠিক যে কারনে কল করেছিলাম,এখনো সেই কথায় বলার জন্য এসেছি।আশা করছি এবার উত্তর পজিটিভ হবে।অবশ্য আমার এমন লাক্সারিয়াস লাইফস্টাইল দেখে যে কোন মেয়েই ফিদা হয়ে যাবে।তুমি হয়তো সকালে তা বুঝো নি সেই জন্য আমাকে না করে দিয়েছিলে।

টেবিলের উপর হাত রেখে শারাফ একটু সামনের দিক ঝুকেগিয়ে বলে,এবার বলো তুমি রাজি?


প্রিয়তার ভীত হরিণীর ন্যায় চোখ দুটো এবার কঠোর হয়ে শারাফের দিকে তাকিয়ে বলল,


--আমি আপনাকে কিছুতেই বিয়ে করবো না।এই রকম চারপাশে সিকুরিটি নিয়ে ঘুরতে হয় এমন জীবন আমার একদম পছন্দ না।স্বাধীনভাবে যদি ঘুরতে ফিরতে না ই পারি তাহলে এতো টাকা পয়সা থেকে লাভ কি।


--আমার বোন তোমাকে পছন্দ করেছে।আমার বোনের কোন ইচ্ছা আমি অপূর্ণ রাখি নি।তার ইচ্ছা তোমাকে আমার বউ হিসেবে দেখা।সেই ইচ্ছায় বা অপূর্ণ রাখি কি করে বলো?


--কিন্তু আপনাদের ফ্যামিলির আর কেউ তো আমায় পছন্দ করে নি।


--কে পছন্দ করেছে,না করেছে তাতে আমার কিচ্ছু আসে যায় না।আমার বোন তোমায় পছন্দ করেছে আমার কাছে এইটার প্রাধান্য বেশি।


--বললাম না আমার এতো সিকুরিটি পছন্দ না।আমি স্বাধীন ও মুক্ত পাখির মত উড়তে চাই।


--সব হবে।তবে সেটাও শর্তমাফিক।


প্রিয়তা ভ্রুকুচকে বলে,মানে?


--আমি ফ্যামিলির সবাইকে লুকিয়ে তোমায় বিয়ে করবো।কেউ জানবে না তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে।আর তালুকদার বাড়িতে নিয়ে যাবো না কখনো।আমার বাংলো বাড়িতেই থাকবে তুমি।


--তার মানে আপনি বলতে চাইছেন আমাকে আপনি বিয়ে করবেন অথচ তালুকদার বাড়ির বউ হিসেবে স্বীকৃতি দিবেন না?


--হ্যা।


--হাউ ফ্যানি।আপনি আমাকে বিয়ে করবেন অথচ তালুকদার বাড়ির বউ হিসেবে স্বীকৃতি দিবে না এইটা কেমন কথা।


--আমাদের বাড়িতে দাদু আর দাদিমার মুখের উপর কেউ কোন কথা বলে না।তাদের কথায় এক কথা হিসেবে সবাই মানে।


--তাহলে আমাকে বিয়ে না করলেই তো হয়।


--কারনটা আমি তোমাকে আগেই বলেছি কেনো আমি তোমায় বিয়ে করতে চাই।


--সামান্য এই লেইম কারনের জন্য আপনি বিয়ে করবেন।


শারাফ টেবিলের উপর একটা বারি মেরে বলে,এইটা লেইম কারন না ডামেট।আমার বোন আমার প্রাণ।আমার বোনের জন্য আমি মৃত্যু পর্যন্ত বেছে নিতে পারি।


--তাহলে আপনার দাদুকে কেনো বোঝাচ্ছেন না আমাকে বিয়ে করতে চান আপনি।


--সেটা যদি হতই তাহলে এতো লুকোচুরি করতাম না।


--কেনো?


--আমার দাদু দাদিমার ইচ্ছা তাদের এক মাত্র নাতী হিসেবে আমি তাদের পছন্দমত মেয়েকে আমি বিয়ে করি।অথচ আমার বোনের পছন্দ তোমাকে।আমাকে দুজনের মন ই রাখতে হবে


--বাহ বাহ,সবার মন রাখতে আপনি আমায় বিয়ে করবেন অথচ আমার মন কি চাই তাই জানতে চান না।


--শোনো,আমি তোমার কোন ইচ্ছা অপূর্ণ রাখবো না।স্বামী হিসবে সব দায়িত্ব আমি পালন করবো।শাড়ি,গহনা,টাকা,পয়সা,গাড়ি, লাক্সারিয়াস সব জিনিস আমি তোমায় দেবো।কোন কিছু কমতি রাখবো না।ইভেন স্বামীর অধিকার আই মিন ভালোবাসাও দিবো।শুধু তুমি তালুকদার বাড়িতে ও পাবলিক কেউ জানবে না তোমার আর আমার বিয়ে হয়েছে।আর হ্যা কোন সিকুরিটিও থাকবে না তুমি তোমার মত স্বাধীনভাবে চলতে পারবে।চাইলে তুমি তোমার বাবা মায়ের বাসায় তাদের সাথে থাকতে পারো।আমি বিজনেস এর জন্য প্রায়ই দেশের বাইরে যায়।সো মাসে কয় একদিন তোমার বাড়িতে গিয়ে থাকলেও কেউ সন্দেহ করবে না।আমাদের সন্তানদের সব দায়িত্ব আমি নিবো।


--আমি অবাক হচ্ছি,চরমভাবে অবাক হচ্ছি আপনার কথা শুনে।কি সুন্দর প্লান আপনার।কতটা নিচু মনমানসিকতা হলে এইরকম চিন্তা ভাবনা মাথায় আসে তা আপনাকে না দেখলে বুঝতামই না।


--তোমার কি মনে হলো তাতে আমার কিচ্ছু আসে যায় না।


--হ্যা তাই তো।আপনি দাদু দাদিমার পছন্দে বিয়ে করবেন।তাকে তালুকদার বাড়ির বউ এর সম্মান দিবেন আর আমাকে সারাজীবন শুধু আপনার স্ত্রী হয়ে থাকতে হবে তাও কখনো কাউকে বলতে পারবো না।


--তোমার তো কোন কিছুর কমতি রাখবো না।


প্রিয়তা চিৎকার দিয়ে বলে,কোন মেয়ে স্বামী ছাড়া স্বীকৃতি বা স্বীকৃতি ছাড়া স্বামী চাই না।


--তাহলে তোমার কি চাই শুনি?


--আমার দুটোই চাই।


--তাহলে তুমি বিয়েতে রাজি?


--কখন বললাম আমি রাজি।


--এইযে বললে তোমার দুটোই চাই তার মানে তুমি বিয়ে করতে রাজি বলেই দুটো অধিকারই চাইছো।


--হ্যা আমার দুটো অধিকারই চাই যে আমাকে এই দুটো সম্মানই দিবে আমি তাকে বিয়ে করবো।আপনি দিবেন? 


--কখনো সম্ভব না।শুধু একটা,সরি একটা না,শুধু একটা মাত্র অপশনই আর সেটা হল স্বামী।


--তবে আপনাকে বিয়ে করাও আমার সম্ভব না।

প্রিয়তা উঠে দাঁড়ায়।শারাফের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,আর কখনো এমন ইউজলেস প্রস্তাব আমাকে কেনো,কোন মেয়েকেই দেবেন না।আর আপনাকে আগেও বলেছি এখনো বলছি,আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।


প্রিয়তা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে চলে যায়।শারাফও উঠে দাঁড়ায়।এগিয়ে গিয়ে এসিস্টেন্ট প্লাস বন্ধুর মত রাহুলকে বলে,


খোজ লাগাও রাহুল,কার সাথে ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে।


--হুম বস।


শারাফ গিয়ে গাড়িতে বসে।প্রিয়তা বাড়িতে এসে নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে সেখানেই ফ্লোরে 

মুখ চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বসে পরে।জীবন তাকে কোথায় নিয়ে এলো।স্বামী সংসার নিয়ে সব মেয়েদের কত স্বপ্ন থাকে।আর শারাফ তাকে কি অদ্ভুত এক শর্ত দিচ্ছে।এদিকে পাড়ার বখাটেরা ডিস্টার্ব করে বলে বাবা ওর বিয়ে ঠিক করলো।অথচ যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে তাকে দেখেই নি।

প্রিয়তা সব দোষ পাড়ার বখাটেদের দিতে থাকে,তারা যদি তাকে রাস্তাঘাটে ডিস্টার্ব না করতো তবে এত আগেই বাবা ওর বিয়ে দিতে চাইতো না।নিজের ছেলে নেই বলেই দুই মেয়েকে নিয়ে ভয়ে থাকেন উনি।তাই তো মেয়ের বিয়ে দ্রুত দিয়ে তাকে সেইফ রাকতে চাই


প্রিয়তা আবার পক্ষণেই দোষ নিজের ভাগ্যকে দেয়।আজ তার যদি একটা বড় ভাই থাকতো তবে পাড়ার বখাটেদের তার বাবা ভয়ই পেতো না।


চলবে..

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url