#ভালোবাসারা_ভালো_নেই

#অজান্তা_অহি

#পর্ব-০২


আমার আকুল মনের আবেদন শুনতে পেলো না রাফি ভাই। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে দেখলাম রুদ্র মূর্তি নিয়ে সে এগিয়ে আসছে। আব্বার কাছে এসে থেমে গেল। বাহিরে আবছা অন্ধকার। আব্বা তাকে চিনতে পারলেন না। তিনি উচুঁ স্বরে বললেন,


'কেডা রে?'


'আমি রাফি। জাকির হোসেনের ছেলে।'


আমি ছোট খাটো বিস্ফোরণের অপেক্ষায় রইলাম। আব্বা কি রেগে যাবে? রাফি ভাইকে বিশ্রী কিছু বলবে? কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে আব্বা হেসে উঠলেন। আন্তরিকতার হাসি। রাফি ভাই কে নিয়ে হঠাৎ ভীষন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। চেঁচিয়ে সেজো আপাকে ডাকতে লাগলেন।


'এই ময়না, চেয়ার আনতো। বাবাজীকে বইতে দে।'


সেজো আপা বের হলো না। আব্বা এবার আমাকে ধমকে বলে উঠলেন,


'হুনস না? কথা কানে যায় না! বাবাজী রে বইতে দে।'


গালে হাত রেখেই নড়লাম আমি। রুমে ঢুকে হন্যে হয়ে চেয়ার খুঁজলাম। চেয়ার নেই। ভালো চেয়ার মাত্র একটা আছে। সেটা নতুন মায়ের ঘরে। বাধ্য হয়ে পায়া ভাঙ্গা চেয়ারটা নিয়ে বের হলাম। রাফি ভাই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে চেয়ার এগিয়ে দিতে ছোট্ট করে সে বললো,


'বসবো না আমি।'


আব্বা জোর করলো বসার জন্য। তবুও সে বসলো না। তার দৃষ্টি ঘুরেফিরে আমার গালের উপর ন্যস্ত হলো। আব্বা একসময় জিজ্ঞেস করলেন,


'বাবাজী কি মনে কইরা?'


'চাচী তেলের কথা বললো। তেল নাই নাকি। এইজন্যে মোড়ের দোকান থেকে এনে দিলাম।'


'ও। আমারে কইবো না? আমি তো বাজারে গেছিলাম।'


'আমি আসছি!'


কেরোসিনের বোতলটা চেয়ারের উপর রেখে রাফি ভাই ঘুরে দাঁড়ালো। আব্বা বাঁধা দিয়ে ঝটপট বললেন,


'বাবাজী দাঁড়াও এট্টু। একখান জিনিস দেবো।'


আব্বা হেঁটে উত্তরের ঘরের দিকে গেলেন। চিন্তা হলো আমার। আব্বা কি দিবে রাফি ভাই কে! চিন্তারত অবস্থায় আচমকা মুখে আলো জ্বলে উঠলো। চোখের পাতায় পড়তে বন্ধ করে নিলাম। রাফি ভাই ফোনের লাইট দিয়ে গাল দেখল। নরম সুরে বললো,


'ব্যথা পেয়েছিস খুব? রাতে কিছু লাগিয়ে নিস!'


রাফি ভাইয়ের বাম হাতটা গাল স্পর্শ করলো আমার। কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেলাম। পরক্ষণে ভয় পেয়ে দূরে সরে গেলাম। রাফি ভাইয়ের ভয়ডর নেই? বাড়ি ভর্তি মানুষ! আব্বা ফিরছে। তার হাতে বক্সের মতো কিছু একটা। সেটা তিনি রাফি ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,


'এইডা তোমার আব্বা রে দিও।'


রাফি ভাই মাথা নেড়ে হাঁটা ধরলো। আর পেছন ফিরে তাকালো না। আমি আগের জায়গাতে জমে রইলাম। একটা মানুষ আমাকে পাথর বানিয়ে কি নির্বিকার ভঙ্গিতে হেঁটে গেলো!


ঘোর কাটলো আমার। আব্বা আবার চেঁচাচ্ছে। সেজো আপা এখনো বের হয়নি। আপার প্রচন্ড জিদ। রান্নার জন্য তখন হয়তো আপাকে ডেকেছে। আপাকে না পেয়ে আমাকে। আমি ছিলাম না বলে মারলো। এটা নতুন নয়। আব্বা আগে থেকেই আমাদের গায়ে হাত তুলে। একবার তো পুতুলকে তুলে আছাড় দিয়েছিল। ছোট্ট পুতুল! আমাদের বাবা নামক মানুষটা ভারী নিষ্ঠুর। 


আব্বা আবার সেজো আপাকে ডাকছে। সেজো আপার কাজ গুছানো। চমৎকার। রান্নার হাতে যেনো জাদু আছে। আব্বা হয়তো চাচ্ছে আজ তার নতুন অতিথির জন্য আপার হাতে ঝোল করতে। কিন্তু আপা বের হলো না। তার বদলে বের হয়ে এলো বড়ো আপা। আব্বা মাছ এনেছে। মুখের টনটনে ব্যাথা নিয়ে আমি রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। বড়ো আপাকে সাহায্য করতে হবে। 


__________


এরপর দুদিন কেটে গেছে। বাড়ির অবস্থা ভয়াবহ। মা এখন পর্যন্ত মুখে কিছু তুলেনি। বড়ো আপা আর সেজো আপা কোনো রকমে দুটো দানা খেয়ে বেঁচে আছে। মাকে কিছুতেই খাওয়ানো যাচ্ছে না। পুতুলকেও কাছে নিচ্ছে না। মায়ের শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে। শরীর আরো দূর্বল হয়ে গেছে। তবুও মুখে খাবার তুলছে না।


বড়ো আপা শ্বশুর বাড়ি থেকে চলে এসেছে মাসখানেক হলো। বর ভালো না। সারাক্ষণ মারধর করে। ঠিকমতো খেতে দেয় না। পেটে বাচ্চা আসার পর আরো ক্ষেপেছে। সর্বদা চড়, লাথি! আপা সহ্য করতে না পেরে চলে এসেছে। আর খোঁজ নিচ্ছে না তারা। এত দুঃখ সহ্য করা যায়? 

পৃথিবীর সব দুঃখ উপরওয়ালা আমাদের দিয়েছে যেনো!


বিকেলের দিকে আব্বা গোছগাছ শুরু করলো। কথা বলতে ইচ্ছে করে না তার সাথে। তবুও কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম,


'আব্বা কোথায় যাবে তুমি?'


আব্বা সদুত্তর দিলো না। নতুন মা এই দুদিন কোনো কথা বলেনি। চুপচাপ থেকেছে। আব্বার ঘর থেকে বের হয়নি। খাবারও আব্বা ঘরে দিয়ে এসেছে। কানাঘুষায় শোনা যাচ্ছে, নতুন মা নাকি যাত্রাপালা করতো। সেখানে আব্বার সাথে পরিচয়। পরে নাকি আব্বাকে বিয়ে করে পালিয়ে এসেছে। 


আব্বার বয়স বাড়েনি। দেখলে অল্প বয়সের মনে হয়। প্রথম দেখায় কেউ বিশ্বাস করবে না এত বড় বড় মেয়ে আছে। আমার নতুন মায়েরও বোধ হয় বিভ্রম হয়েছে। বুঝতে পারেনি। 


সন্ধার পর পর আব্বা বের হলো। নতুন মাকে সাথে নিয়ে। একদম পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে। আব্বাকে দেখে কেন জানি আমার কষ্ট হলো। ভীষণ কষ্ট হলো। মনে হলো, আব্বাকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলছি। আব্বা কি আর কোনোদিন আসবে না? নিজের অজান্তে আমার চোখের কোণ ভিজে উঠলো। 


আব্বা যাওয়ার পর পরই মা রুম থেকে বের হলো। টানা ৪ দিন পর বাহির হলো মা। আব্বা যাওয়ার আগে মায়ের রুমে ঢুকেছিল। তাদের মধ্যে কি কথা হয়েছে জানি না। কিন্তু আমি তাকিয়ে দেখলাম মা একদম স্বাভাবিক। আমার কাছে এসে লাজুক স্বরে বললেন,


'জুঁই ভাত আছে? ভাত দে তো। খিদা পাইছে খুব।'


আমার চোখের জল গাল স্পর্শ করলো। দৌঁড়ে রান্নাঘরে গিয়ে ভাত বেড়ে আনলাম। মা বারান্দায় বসে খেলো। পেটপুরে। খাওয়া শেষ করে পুতুলকে কোলে নিল। ওর সাথে দু চারটে ছেলেমানুষী কথার আদান প্রদান করলো। আমার কি যে ভালো লাগলো!


________


সেজো আপা আজ আমার পাশে শুয়েছে।মা পুতুলকে নিয়ে বড়ো আপার সাথে ঘুমিয়েছে। সমস্ত বাড়ি সুনসান। নিরব! সেজো আপা চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। আপা কি ঘুমিয়ে পড়েছে? আমার কিছুতেই ঘুম আসছে না। কদিন হলো স্কুলে যাওয়া হয়নি। লোকের কথার ভয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখা হয়নি। ঘরবন্দী সময় কাটছে অনেকটা! সেজন্যে রাফি ভাইয়ের সাক্ষাৎ মেলেনি। সেই যে সেদিন রাতের অন্ধকারে দেখেছিলাম। আর চোখে পড়েনি। ভেতরে ভেতরে ছটফট করছিলাম আমি। মানুষটা ঐ তো একটু দূরে রয়েছে। হাত বাড়ালেই স্পর্শ করা যাবে যেন! তবুও কত দূরে! একবার চোখের দেখা মেলে না। 


'জুঁই, নড়চড় করবি না। লাথি দিয়ে ফালায় দিবো কিন্তু!'


মুহূর্তে আমি স্ট্যাচুর মতো হয়ে গেলাম। আপাকে দিয়ে ভরসা নেই। সত্যি সত্যি লাথি দিতে পারে। একবার শীতের রাতে কি নিয়ে ঝগড়া হয়েছে দুজনার। লাথি দিয়ে বিছানা থেকে ফেলে দিয়েছিল। আপার প্রচন্ড রাগ। আপাকে দুলাভাই সামলাবে কি করে? 


'আপা! ঘুমিয়ে পড়েছ?'


ক্ষীণ গলায় ডাক দিলাম আপাকে। আপা শুনলো না। এবার হালকা করে বাহু তে ধাক্কা দিলাম। আপা বিরক্তি নিয়ে বললো,


'বল!'


'এই বিয়েতে তোমার মত নেই?'


'বিয়েটা হবে না রে জুঁই। তোর মনে হয় আব্বার এতবড় ঘটনার পর ওরা আমায় বাড়ির বউ করবে? করবে না। ওরা নামী-দামী পরিবার। এলাকায় নাম প্রচুর। আমদের মত এমন পরিবার থেকে মেয়ে কেন নিবে?'


আপার বিয়ে ঠিক হয়েছে পাশের গ্রামে। ছেলে একটু বখাটে টাইপের। তবুও বাপের প্রচুর অর্থ। বাপ মেম্বার। সেজো আপা আগুন সুন্দরী। ছেলেটা রাস্তায় আপাকে দেখেছিল। কিছুদিন উত্যক্ত করেছে। তারপর বিয়ের প্রস্তাব এনেছে। আব্বা এক কথায় রাজি হয়ে গেছে। আর কিছুদিন পর বিয়ে। কিন্তু কয়েক দিন হলো তারা খোঁজ নিচ্ছে না। কোনো প্রকার যোগাযোগ করছে না। আপার বিয়েটা কি ভেঙ্গে যাবে? বিয়ে ভেঙ্গে গেলে মা প্রচুর কষ্ট পাবে। 


অন্ধকারে আপার দিকে তাকালাম। মুখ দেখা না গেলেও বুঝলাম আপা কাদঁছে। কেনো কাদঁছে? আপা তো এই বিয়েতে খুশি ছিল না। আব্বা এক প্রকার জোর করে বিয়ে দিচ্ছিল। বিয়ে না হলেই তো ভালো। আপা তাহলে কষ্ট কেন পাচ্ছে? আপা কি কাউকে ভালোবাসে? 


আচমকা প্রশ্ন টা মাথায় এলো আমার। জিজ্ঞেস করতে গিয়ে থেমে গেলাম। আপার মন ভালো না। অন্য সময় জিজ্ঞেস করবো। কাত ঘুরে চোখ বন্ধ করলাম আমি। বন্ধ দু চোখের পাতা পাশের বাড়ির ছেলেকে নিয়ে স্বপ্নে বিভোর হয়ে গেলো। 


__________


জানালার বাইরে কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে। আবছা ভাবে কানে আসছে। কিন্তু চোখ মেলতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু পুরুষ কন্ঠটা চির পরিচিত মনে হচ্ছে। হঠাৎ ধপ করে চোখ খুললাম। জানালার ওপাশে রাফি ভাই। রাফি ভাই এতরাতে কার সাথে কথা বলছে? আমার বাঁ পাশের বিছানা খালি। সেজো আপা নেই। অন্ধকারে দেখলাম আপা পায়ের দিকের জানালা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। জড়োসড়ো হয়ে। ফিসফিস করে রাফি ভাইয়ের সাথে কি যেনো বলছে! বুকের ভেতর তীব্র জ্বলুনি শুরু হলো আমার। এই অন্ধকার রাতে ভয়ংকর এক সত্য আবিষ্কার করলাম।


(চলবে)

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url