#গল্পঃকুয়াশার_মতো।
#পর্বঃ- ০৫+০৬
" শাকিলা যখন তার বাবাকে খুন করার হুমকি দেয়, তার আগে আপনাদের মধ্যে ঠিক কি কথা হয়েছে জানতে পারি? " প্রশ্ন করে উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে সাজু, তার পাশেই বসে আছে তার বন্ধু রামিশা।
" শাকিলার মা বললেন, সাজ্জাদের সঙ্গে সম্পর্ক আমরা রাখতে চাচ্ছিলাম না। শাকিলা নিজেও যেতে চায়নি তাই ওর বাবা তার উকিল বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু হঠাৎ করে যেই শাকিলা মতামত পরিবর্তন করে তখন তার বাবা রেগে যায়। "
" আপনি একজন মা, নিজের মেয়ের সংসার রক্ষা করার জন্য কখনো স্বামীকে বুঝিয়েছেন? "
" আমি আমার স্বামীর কথার উপর কোনদিন কথা বলতে পারতাম না। কারণ তিনি কখনো কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতেন না, আমার মনে হচ্ছিল তিনি শাকিলার বিষয় সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। "
" হাদিস অনুযায়ী একটা পুরুষের চরিত্র সম্পর্কে তার স্ত্রী সবচেয়ে বেশি জানেন। আপনি আপনার স্বামীকে ঠিক কতটুকু ভালো মনে করতেন, তিনি যা করতেন সবকিছুই কি ঠিক? "
" দেখুন, পৃথিবীতে সকল মানুষের ভুলত্রুটি আছে বা থাকবে, তবে ব্যক্তিগত হিসেবে আমার স্বামী খুব ভালো মানুষ ছিলেন। "
" তাহলে আপনি শাকিলার পা ধরে কেন একদিন বলেছিলেন ' তোর বাবার কথা শোন নাহলে তো আমাদের সংসারে অশান্তি আসবে। ' এই কথা বলে কেন তার সাজ্জাদের সঙ্গে তাকে খারাপ ব্যবহার করতে বাধ্য করেছেন? "
" দেখুন এটা পুরোপুরি সত্যি নয়, তাছাড়া মাঝে শাকিলা নিজেই সাজ্জাদকে সহ্য করতে পারতো না। সে বিবাহিতা অবস্থায়..."
এতটুকু বলতেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুমনা বলে উঠলো " আহ মা, কিসব বলছো? "
সাজু বললো " দেখুন আমার কাছে কিছু গোপন করতে গেলে আপনারা বিপদে পড়বেন। কারণ আমি সত্যিটা খুঁজে বের করবোই, কিন্তু আপনারা যদি কিছু গোপন করেন তারপর সেটা আমাকে খুঁজে বের করতে হয়। তাহলে তখন সম্পুর্ণ সন্দেহ আপনাদের উপর এসে পড়বে, তাই একটা কথা গোপন করতে গিয়ে অনেকটা মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকুন। "
সুমনা বললো " আমরা কিছু লুকাইনি। "
" শাকিলা তার স্বামীর সঙ্গে রাগ শেষে যতদিন এই বাড়িতে ছিল তখন কোন রুমে থাকতো। "
" সুমনা বললো, আমার রুমে। "
" আমি সেই রুমের মধ্যে একটু যেতে চাই। "
" দেখুন রুমটা আমার, একটা মেয়ের রুমের মধ্যে হুট করে বাহিরের মানুষ প্রবেশ করতে পারে না। "
" কিন্তু তবুও যেতে হবে। "
" আচ্ছা চলুন। "
|
|
সাজ্জাদকে আইসিইউ থেকে বের করে কেবিনে নেওয়া হয়েছে। যদিও মোটামুটি সুস্থ কিন্তু এখনো পরিষ্কার করে কথা বলে কিছু বলার শক্তি তার মধ্যে নেই। সাজুর পরামর্শে পুলিশ পাহারা আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে, ওসি সাহেব নিজে সকাল বেলা ও বিকাল বা সন্ধ্যায় আসেন। সাজু ও রামিশা দুজন মিলে ওসি সাহেবের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে এসেছে।
সাজ্জাদকে কিছু জিজ্ঞেস করার অনুমতি ডাক্তার দিলেন না, আরও একটা দিন অপেক্ষা করতে হবে তার সঙ্গে কথা বলতে হলে। কেবিন থেকে বেরিয়ে সাজু বললো,
" সাজ্জাদের বাসার প্রতিটি জিনিসে কার কার হাতের ছাপ আছে, বা কতজনের আছে, এগুলোর রিপোর্ট এসেছে? "
" হ্যাঁ, যে লোহার রড দিয়ে সাজ্জাদকে আঘাত করা হয়েছে তাতে স্পষ্ট সাজ্জাদের নিজের হাতের ছাপ আছে। ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র মোটামুটি অনেক কিছু টেস্ট করা হয়েছে কিন্তু সেখানে তেমন কিছু মেলেনি। "
" আপনি কি জানেন, ওদের বাসায় একটা চেকবই ছিল সেখানে ২০ লাখ টাকা সিগনেচার করা। সাজ্জাদ নিজে শাকিলার জন্য রেখেছিল কিন্তু শাকিলা সেটা রেখেই নোয়াখালী গিয়েছিল। "
" আমরা তো কোন চেকবই পাইনি, কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে? "
" শাকিলা বলেছে, তবে সেই চেকবইয়ের কথা সাজ্জাদ সজীব ও শাকিলা ছাড়া আর কেউ মনে হয় জানে না। "
" তাহলে সেটা কোথায়? "
" সেটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব আপনার, আপনি সাজ্জাদের ব্যাঙ্ক একাউন্টে খোঁজ লাগান। খোঁজ নিয়ে জানুন টাকা কি কেউ তুলে নিয়ে গেছে বা টাকা তুলতে কেউ গিয়েছে? "
" আপনি এখন কোথায় যাবেন? "
" সানোয়ার হোসেন, শাকিলার বন্ধুর কাছে। আর সেখান থেকে আপনার থানায় যেতে হবে কারণ শাকিলার কাছে কিছু প্রশ্ন করতে হবে। "
" তাহলে থানাতেই দেখা হবে। "
" আপনাকে তিনটা কাজ করতে হবে স্যার। "
" বলুন। "
" সজীব সাহেবকে চেকবই এর বিষয় ভালো করে জিজ্ঞেস করবেন। আপনার কাছে তিনটা নাম্বার দিচ্ছি সেই তিনটা নাম্বারের গত এক মাসের সকল কল লিস্ট যোগাড় করবেন। "
" আর? "
" আপাতত এগুলো। "
" আমরা মোটামুটি নিশ্চিত সাজ্জাদ খুন করেছে, কেন শুধু শুধু জটিলতা তৈরি করেন? "
" আচ্ছা আমিই সংগ্রহ করতে পারবো। "
" দরকার নেই, আমি আপনার সবকিছু বের করে জানাবো, কিন্তু আমি বোঝাতে চাই এই বিষয়টা কেমন জটিল করছেন। "
" স্কুলে আমার এক শিক্ষক ছিল, তিনি অংকের সময় সকল অংক জটিল সূত্রে সমাধান করতেন। একটা কঠিন সূত্র প্রয়োগ করে তাড়াতাড়ি করে সমাধান হয়ে যেত। তিনি বলতেন, একটু কষ্ট করে সূত্র মুখস্থ করলে পরীক্ষার হলে অনেক সময় সঞ্চয় করা যায়! "
" ঠিক বলেছেন, মানুষ যত বেশি কষ্ট করবে ততই তাড়াতাড়ি সফল হবে। "
" আমি তিনদিনের মধ্যে চেষ্টা করবো সমাধান করতে, কারণ আমার এক বন্ধু থাকে চট্টগ্রামে আর সে খুবই অসুস্থ। "
" তার নাম কি? "
" শফিক সজীব রকি ও সাজু আমরা চার বন্ধু, যে অসুস্থ তার নাম সজীব। "
|
|
পড়ন্ত বিকেল, রাস্তার পাশে খোলা স্থানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে সানোয়ার। সানোয়ার হোসেন ছেলেটাকে যতটা চঞ্চল ভেবেছিল ততটা চঞ্চল মনে হচ্ছে না।
" জ্বি বলেন কে আপনি? "
" শাকিলার বাবার খুনের রহস্য বের করার জন্য আমি চেষ্টা করছি। আপনি শাকিলার বন্ধু এবং তাকে একসময় অনেক পছন্দ করতেন তাই সেই কারণে আপনার কাছে আসা৷ "
" আচ্ছা ঠিক আছে, কিন্তু আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাকে? "
" তেমন কিছু না, শাকিলার বাবার কিছু গোপন কারবার বের করতে হবে। শাকিলা নিজেই স্বীকার করেছে তার বাবা অনেক অন্যায় কাজ করতেন, সেগুলোর দু একটা বের করতে হবে। "
" কিন্তু আমি কীভাবে জানবো? "
" যেহেতু শাকিলা তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড সেহেতু তার বাসায় নিশ্চয়ই যাতায়াত ছিল। অথবা ভুল করে হলেও একদিন না একদিন শাকিলা তার বাবার ছোটখাটো কোনো অপরাধ হলেও বলেছে। "
" কিন্তু? "
" আমি সেসব জানতে চাই না, আপনি শুধু তার সেই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি খুঁজে বের করবেন। ব্যাপার টা যতটা কঠিন মনে হচ্ছে ততটা কঠিন নয়, ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলেই দেখবেন আপনি অনেক কিছু বের করতে পারবেন। "
" আমাকে এসবের মধ্যে কেন জড়াচ্ছেন? "
" আপনি নিশ্চয়ই চান শাকিলার বাবার খুনের আসল খুনি ধরা পড়ুক। "
" হ্যাঁ অবশ্যই চাই। "
" আমি পুলিশের সঙ্গে সবকিছু বলতে পারি না, কারণ তারা ছোটখাটো কিছু পেলেই সেটাকে হাত-পা বানিয়ে মিডিয়ার কাছে বলে দেয়। তখন তদন্তের অনেক গোপনীয়তা বের হয়ে যায়, আর এজন্যই কিন্তু পুলিশের চেয়ে গোয়েন্দারা রহস্য তাড়াতাড়ি বের করতে পারে। "
" আমি চেষ্টা করবো আপনাকে সাহায্য করতে। "
" আপনি তো শাকিলার সঙ্গে জেলের মধ্যে দেখা করতে যান মনে হয়, তাই না? "
" হ্যাঁ দুবার গেছিলাম, ওর স্বামীর জন্য কান্না করে আবার নিজে বন্দী সেটাও আফসোস করে। "
" দরকার হলে তার কাছে জিজ্ঞেস করে হলেও কিছু বের করবেন। "
" জ্বি ভাই। "
" মেলা মেলা ধন্যবাদ সানোয়ার হোসেন। "
|
|
|
রিক্সায় পাশাপাশি বসে থানার দিকে যাচ্ছে সাজু ভাই ও রামিশা। ফুরফুরে বাতাস আর ব্যস্ততম শহরের মধ্যে মানুষের আনাগোনা। রামিশার ধারণা ছিল সাজু এখন গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকবে কিন্তু তা না করে সে গুনগুন করে গান গাইছে।
" সাজু বললো, রামিশা তুমি কি কালকে সকালে উঠে নোয়াখালী যেতে পারবে আমার সঙ্গে? "
" কিন্তু কেন সাজু ভাই ? "
" সাজ্জাদ যে বাড়িতে গেছিলো সেই বাড়িতে ফেরদৌস গেছে কিনা সেটা জানার জন্য। "
" মানে? "
" ফেরদৌস সেদিন হয়তো ইচ্ছে করেই সাজ্জাদের সফর সঙ্গী হয়েছে। "
" কিন্তু কেন? "
" গোলমালটা সেখানেই, কার সঙ্গে কার যোগসূত্র সেটা নাম্বারের যাবতীয় কল লিস্ট পাওয়া পর্যন্ত বুঝতে পারছি না। "
" কার কার নাম্বার ছিল সেখানে? "
" শাকিলা, ফেরদৌস ও সাজ্জাদের বন্ধু সজীব। "
" বলেন কি? এদের তিনজনের লিস্ট কেন? "
" আগে রিক্সা থেকে নামো। "
থানার মধ্যে ওসি সাহেব নেই, তিনি মাগরিবের কিছুক্ষণ আগে বের হয়েছেন। তবে সাজু আসলে যেন তার জন্য অপেক্ষা করে সেটা দারোগার কাছে বলে গেছে। দারোগা সাহেবের অনুমতি নিয়ে সাজু ভাই শাকিলার কাছে গেল।
শাকিলা বিমর্ষ মনে বসে আছে, সাজুকে দেখে মুখ তুলে তাকিয়ে রইল। চেহারা দেখে অবাক হয়ে গেল রামিশা, পিতার মৃত্যু আর স্বামীর অসুস্থতার টেনশনে কেমন হয়ে গেছে সে।
সাজু বললো " কেমন আছেন আপনি? "
" এইতো, আপনার কি অবস্থা? কোনকিছু খুঁজে বের করতে পেরেছেন? "
" হ্যাঁ পেরেছি। "
" তাহলে কি আমার বাবার খুনি তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে? আমি আর আমার স্বামী মুক্তি পাবো? "
" সবকিছু ঠিক হলে ঠিকই মুক্তি পাবেন। "
" অনেক ধন্যবাদ। "
" একটা কথা বলবো? "
" বলেন। "
" আপনি আমার সঙ্গে অনেক কিছু মিথ্যা বলেছেন আবার অনেক কিছু গোপন করেছেন। এর কারণ কি? "
" কি মিথ্যা বলেছি? আর গোপন করবো কেন? "
" সজীব সাহেবকে নিয়ে আপনার আর সাজ্জাদ এর মধ্যে কোনো ঝামেলা ছিল? সত্যি করে বলেন তো, সেদিন রাতে আপনাদের বাসায় সাজ্জাদ সজীব সাহেব আর আপনার বাবা ছিল তাই না? আপনি আমার কাছে এসব লুকিয়ে ঘটনা ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন তাই না? এজন্যই সাজ্জাদ তার চিঠির শেষে লিখেছিল, ' তুমি কেন এমনটা করলে সেটা জানতে পারি নাই। "
.
.
আপনাদের মতামত আর গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য পড়ার জন্য আমি কিন্তু কমেন্ট বক্সে অপেক্ষা করি৷ আশা করি সবাই ভুল গুলো তুলে ধরবেন এবং সামনে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিবেন।
.
চলবে...
লেখাঃ-
মোঃ সাইফুল ইসলাম সজীব।
#গল্পঃকুয়াশার_মতো।
#পর্বঃ- ০৬
" শাকিলা মেডাম আপনি রাগ করবেন না, আমি মাঝে মাঝে অদ্ভুত কিছু প্রশ্ন করে অবাক করার চেষ্টা করি। আমি ভাবছি অন্য কিছু। "
" এভাবে সম্পুর্ন দোষারোপ করে কথা বলা ঠিক না সাজু ভাই, সবসময় ফাজলামো করা ঠিক না। "
" হুম জানি, কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সিরিয়াস মুহূর্তে ফাজলামো করার ক্ষমতা সবার থাকে না। "
" বলেন আপনার ভাবনা কি? "
" সাজ্জাদ সাহেবের সেবার করার জন্য এই মুহূর্তে আপনাকে খুব বেশি দরকার। সে আপনাকে যায় কাছে পেত তাহলে মানসিকভাবে সে অনেকটা সুস্থ হয়ে যেত। "
" কিন্তু আমি কি করবো বলেন? সেদিন রাগের মাথায় মাকে কিছু কথা বলেছি, মা সেই কথার জন্য আমার নামেও মামলা করবে ভাবিনি! "
" পৃথিবীতে আমরা অনেক কিছু ভাবি না কিন্তু সেটা প্রকৃতি আমাদের সঙ্গে করে। আবার অনেক কিছু কল্পনাও করিনা, কিন্তু সেটাই জীবনে হাজির হয়ে যায়। "
" আমি চেষ্টা করবো আপনাকে জামিনে মুক্তি করা যায় কিনা, যেহেতু আপনি খুনের সময় নোয়াখালী ছিলেন। তাছাড়া সন্দেহের তালিকায় সবার উপরে সাজ্জাদ। "
" ও কথা বলবেন না, আমি জানি সাজ্জাদ আমার বাবাকে খুন করেনি। সাজ্জাদ খুন করতে পারে না সাজু ভাই, কারণ বাবা যদিও চাকরির মধ্যে কিছু দুর্নীতি করতেন। কিন্তু সাজ্জাদ কখনো বাবাকে অসম্মান করে গালি দিয়ে কথা বলে নাই। সামনে বা পিছনে কখনো বলে নাই, বরং সবসময় বলতো আল্লাহ তাকে জ্ঞান দিক। "
" দেখুন রহস্যের সমাধান নিয়ে আমি এগিয়ে যাচ্ছি, সাজ্জাদ সাহেব সুস্থ হলে তার বক্তব্য থেকে অনেককিছু পাওয়া যেত। সেদিন রাতে সে কখন বাসায় গেছে, কীভাবে গেছে, কীভাবে আহত হয়ে গেছে? "
" সাজ্জাদ কি কথা বলতে পারে? "
" না, তবে বিপদমুক্ত। "
" এ পর্যন্ত কোন আলামত পাওয়া গেছে যেগুলো দিয়ে সামনে বাড়াবেন! "
" হ্যাঁ পেয়েছি, ৬০% বের হয়ে গেছে, আজকে কিছু নাম্বারের কল লিস্ট আসবে। তারপর সেখান থেকে আরও ২০% পাওয়া যাবে, তারপর বাকিটা আমি বের করে নেবো। "
" কাকে কাকে সন্দেহ হয়? "
" সজীব সাহেব, ফেরদৌস, উকিল সাহেব, বাড়ির মালিক, ইত্যাদি! "
" ফেরদৌস তো আমার সঙ্গে ছিল, আর সজীব ভাই আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি। "
" এটা আমার সন্দেহের তালিকা, পরীক্ষার সময় অনেক ক্ষেত্রে সাজেশনে ৮০% এর প্রশ্নটাও কমন পরে যায়। "
" কিন্তু সজীব ভাই সকাল বেলা আমাকে যখন বললেন আপনারা তাকে সন্দেহ করছেন তখন আমার লজ্জা লেগেছে। "
" হাহাহা, লজ্জা কেন? আমরা কিছু তথ্যের জন্য তাকে সন্দেহ করতেই পারি। এতে করে আপনার বা তার লজ্জিত হবার কারণ কি? "
" আপনি সজীব ভাইকে সন্দেহের তালিকা থেকে বের করে রাখুন, তিনি আমার বাবাকে খুন করে নাই আমি জানি। "
" আপনার স্বামীর বন্ধুর প্রতি আপনার বিশ্বাস মুগ্ধ করেছে আমাকে, তবুও আমি আমার সন্দেহের তালিকা আমার কাছে রাখি। "
" আমার মা-বোন কেমন আছে? তারা কেউ যখন খোঁজ নেয় না তখন খুব খারাপ লাগে। "
" আশা করি খুব দ্রুত আপনার জীবন থেকে সব বিপদ কেটে যাবে, ধৈর্য ধরুন। "
★★
রাত আনুমানিক সাড়ে দশটা।
ডিনার করে বাসার ছাদে হাঁটছে সাজু, মাথার মধ্যে কয়েকটা মানুষের মুখ ভাসছে। সবকিছু কেমন যেন কুয়াশার মতো মনে হচ্ছে, দুর থেকে অন্ধকার কিন্তু সামনে এগিয়ে গেলে কিছুটা হলেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কুয়াশার মধ্যে যেমন অনেক দুরের পথ দেখা যায় না, এই রহস্যের অবস্থা ঠিক তাই। এখনই বোঝা যাচ্ছে না অনেক সামনে কি আছে, চোখের সামনে যা ঘটছে তাই দেখে পথ চলতে হচ্ছে সামনে।
সাজুর ধারণা, খুব শীঘ্রই কুয়াশা কাটতে শুরু করবে। হুট করে সূর্যের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে যাবে সবকিছু, ধরা পড়বে আসল খুনি।
সজীবের প্রতি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সন্দেহ হচ্ছে, তার সঙ্গে সাজ্জাদের খুব বেশি ভালো সম্পর্ক ছিল ঠিকই। কিন্তু সজীব মাঝে মাঝে খুব অন্যায় জনিত কাজ করতো, যেগুলো সাজ্জাদ মেনে নিতো কিন্তু খুশি হতো না।
মোবাইল বেজে উঠল, স্ক্রিনে অপরিচিত নাম্বার দেখে তাকিয়ে রইল সাজু। একদম শেষ মুহূর্তে রিসিভ করে শান্ত গলায় বলল,
" আসসালামু আলাইকুম। "
অপরদিক থেকে মেয়েলি কণ্ঠে বললো, " ওয়া আলাইকুম আসসালাম, সাজু ভাই আমি সুমনা। শাকিলা আমার বড় আপু, আপনার সঙ্গে আজ আমাদের কথা হয়েছে। "
" ওহ্ আচ্ছা তুমি? বলো তাহলে, আচ্ছা তুমি আমার নাম্বার পেলে কোথায়? "
" কি যে বলেন সাজু ভাই, আপনি অনলাইন জগৎ এর মধ্যে মোটামুটি পরিচিত। সাজু ভাই হিসেবে আপনাকে অনেকেই চেনে, আপনি ব্যক্তিগত ভাবে গোয়েন্দা হলেও আপনার লেখালেখি আপনাকে বেশি পরিচিত করেছে। "
" হাহাহা, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে তুমি নাম্বারটা অন্য উপায়ে সংগ্রহ করেছো। "
" আমি এইমাত্র আপুর সঙ্গে দেখা করে বাসায় এসেছি, আপুর কাছে আপনার নাম্বার নেই। কিন্তু আপু আপনার লেখালেখির সম্পর্কে বললেন, তাই বাসায় এসে ফেসবুকে সার্চ করলাম। "
" তারপর? "
" তারপর তো দেখলাম আপনার অনেক পরিচিতি ও সুনাম, তারপর পেইজ থেকে নাম্বার নিলাম। তবে আমি চাইলেই ফেরদৌস নামের ছেলেটার কাছ থেকে নিতে পারতাম। কারণ আপু বলেছিল আপনাকে নাকি ফেরদৌস নিয়ে এসেছে, তাই তার কাছে অবশ্যই নাম্বার আছে। "
" হুম বুঝলাম, তাহলে নিলে না কেন? "
" সাজু ভাই, সত্যি বলতে ফেরদৌস ছেলেটার প্রতি আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে। লোকটার খুব অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, আপুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পর থেকে তার যাবতীয় কর্মকাণ্ড ফেলে রেখে আপুর পিছনে পড়ে আছে। "
" হ্যাঁ বিষয়টা আমাকেও ভাবাচ্ছে। "
" সে আপুর সঙ্গে যা যা করতো সবকিছুই আমার কাছে কল দিয়ে বলতো। বাবার খুনের পরও সে বারবার কল করতো, কেমন অদ্ভুত লাগে। আবার নিজেই বেশি ভালো হবার জন্য আপনাকে ডেকে নিয়ে এসেছে। যদি সে অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে যেন কোনভাবেই তাকে সন্দেহ করা না হয়। "
" হুম তোমার ধারণা ঠিক। আমি ভাবছিলাম তার গ্রামের বাড়িতে যাবো, সেখানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে কিছু কথা জানা দরকার। ফেরদৌসের বোনের মৃত্যুর সঙ্গে কোনভাবে সাজ্জাদ কিংবা তোমার বাবার কোন হাত আছে কিনা কে জানে। "
" দুলাভাই হবে না সাজু ভাই, কিন্তু বাবার হতেও পারে কারণ তার সঙ্গে শহরের খারাপ কিছু মানুষ যোগাযোগ করতো। ফেরদৌসের কথা অনুযায়ী তার বোনের স্বামী ছিল নেশা করতো, এখন সেই কারণে কোনো যোগাযোগ নিশ্চয়ই হতে পারে। "
" মেলা মেলা ধন্যবাদ সুমনা। "
" মায়ের সামনে সাজ্জাদ ভাইকে ছাড়া আর কাউকে বাবার খুনি বলতে পারি না। মায়ের সম্পুর্ন ধারণা যে বাবাকে খুন করেছে সাজ্জাদ ভাই, কিন্তু আমার ধারণা আসল খুনি দিব্যি ভালো আছে। "
" তুমি চিন্তা করো না, আমি যেভাবেই হোক এই রহস্যের সমাধান করবো। তোমার মাকে শান্তনা দেবার দায়িত্ব তোমার, মাঝে মাঝে হাসপাতালে গিয়ে গোপনে সাজ্জাদকে দেখে এসো৷ থানায় গিয়ে বোনে সঙ্গে দেখা করবে, এই মুহূর্তে সম্পুর্ন পরিবারের সবাইকে আলাদা করে শান্তি দিতে পারবে তুমি। "
" সাজু ভাই। "
" ঠিকই বলছি সুমনা, এমন সুযোগ সবার আসে না কিন্তু, সাজ্জাদ হাসপাতালে, শাকিলা থানায়, তোমার মা অসুস্থ হয়ে বাসায়। প্রতিটি মানুষের দরকার সান্তনা এবং সঙ্গী, তোমাকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। "
" দোয়া করবেন, আে আমার বাবা যতই খারাপ থাকুক কিন্তু আমি চাই তার খুনি শাস্তি পাক। "
" অবশ্যই পাবে। "
" একটা প্রশ্ন করবো সাজু ভাই? "
" হ্যাঁ করো। "
" রুহি কে? "
" কেন? আর তুমি তার কথা কীভাবে জানো? "
" আপনার কাছে কল করার আগে আমার একটা বান্ধবী কল করেছিল। সে জিজ্ঞেস করেছিল যে আমার বাবার খুনের মামলা কে দেখছেন। যখন বললাম সাজু ভাই, সে প্রচুর অবাক হয়ে গেল। "
" কেন? "
" আপনার পরিচিত পাঠিকা, সে আপনার সঙ্গে দেখা করতো কিন্তু এখন দেশের বাইরে। "
" ওহ্ আচ্ছা। "
" আপনার কাছে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে বলে দিয়েছে। "
" কি কথা? "
" সে বললো, সাজু ভাইকে জিজ্ঞেস করে বলবে তার বন্ধু সজীবের কি খবর? আর রুহি কেমন আছে? "
" আচ্ছা আরেকদিন বলবো তোমাকে। "
" আসল কথা বলা হয়নি এখনো। "
" কি কথা? "
" বাবার উকিল বন্ধু আমাদের বাসায় এসেছিল, তিনি হঠাৎ মাকে অনেক বোঝাতে লাগলো। মা যেন আপুর বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেয়, মা প্রথমে রাজি ছিল না। কিন্তু শেষ সময়ে মা রাজি হয়েছে, কালকে সকালে থানায় গিয়ে আপুর মামলা তুলে নেবে মা। "
" তাহলে খুবই ভালো হবে, সাজ্জাদের পাশে এই মুহূর্তে শাকিলার খুব দরকার। "
" আজ তাহলে রাখি সাজু ভাই, আপনি একটু ফেরদৌসের বিষয় ভালো করে খোঁজ করুন। "
" হ্যাঁ করবো। "
★★
পরদিন বেলা এগারোটা।
রেস্টুরেন্টে বসে বসে রুটি দিয়ে গ্রিল খাচ্ছে সাজু ভাই ও রামিশা। রামিশা আজ শাড়ি পরেছে, হুট করে এমন পরিবর্তন কেন সেটা সাজু বুঝতে পারছে না। তাই নিয়ে কথা হচ্ছিল, এমন সময় ওসি সাহেবের কল এসেছে।
" হ্যালো স্যার। "
" সাজু সাহেব আপনি কোথায়? "
" আমি রেস্টুরেন্টে, কিন্তু কেন? "
" তাড়াতাড়ি হাসপাতালে আসতে পারবেন? কেউ একজন সাজ্জাদকে কিছু একটা খাইয়ে দিয়েছে, শরীর দ্রুত অবনতি হচ্ছে। "
" বলেন কি? ভিতরে কে প্রবেশ করেছে? "
" ডাক্তার নার্স ছাড়া, আজকে সাজ্জাদের স্ত্রী শাকিলা এসেছে ঘন্টা খানিক আগে। "
" শাকিলা বের হয়েছে? "
" হ্যাঁ সকাল বেলা তার মা তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে, কিন্তু সে হাসপাতালে আসতেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। "
" তারমানে কি শাকিলার মধ্যে গন্ডগোল নাকি? সে কি চায় না সাজ্জাদ বাঁচুক, সাজ্জাদ বাঁচলে সেই রাতের গোপন কিছু বের হবে নাকি? "
" আপনি একটু হাসপাতালে আসুন। "
.
.
চলবে...
আশা করি সবাই রেসপন্স করবেন।
বিঃদ্রঃ- গতকাল গল্প পোস্ট করতে পারিনি, কারণ আমি একজন কর্মজীবী মানুষ। সারাদিন কাজ করে তারপর দুই ঘন্টা + সময় বের করে আমাকে লিখতে হয়। গতকাল পরিশ্রম বেশি ছিল আর চোখে ব্যথা খুব তাই লিখতে পারিনি। আজ ছিল শুক্রবার, এদিকে আবার লকডাউন, তবুও আমার ডিউটি বন্ধ নেই। সন্ধ্যার পরে প্রচুর মাথা ব্যথা তবুও কষ্ট করে লিখলাম। কারণ আপনারা অপেক্ষা করে আছেন, তাই কষ্ট হলেও চেষ্টা করেছি।
ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন।
নিজের মতামত জানিয়ে উৎসাহিত করবেন।
লেখাঃ-
মোঃ সাইফুল ইসলাম সজীব।
