#তুমি_আমার_মনের_মানুষ
#লেখা_Bobita_Ray
পর্ব- ০২
সন্ধ্যে সাতটার লগ্নে রাতুল-প্রিয়ন্তির বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের সমস্ত নিয়ম কারণ পালন করে রাতুলদের বাড়ি যেতে যেতে মধ্যরাত হয়ে গেল। প্রিয়ন্তি আজ সারাদিন কিছুই খায়নি। বিয়ের শেষে বড়োমা জোর করে কয়েক গাল ভাত মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছিল। সারা রাস্তা বমি করতে করতে বিধস্ত অবস্থায় রাতুলদের বাড়িতে পৌঁছালো। বাসায় পৌঁছেই রাতুল টোপরটা সোফায় ফেলে নিজের ঘরে চলে গেল। প্রিয়ন্তি ড্রয়িংরুমে বসে আছে। এই বাসাটা প্রিয়ন্তির চেনা। তিনবছরে অনেকবার আসা হয়েছে। তবে আজকের মতো এমন অদ্ভুত অনুভূতি কখনো হয়নি। রাতুলের ছোটোবোন রিতু এসে প্রিয়ন্তির পাশে বসল। রিতু এবার ইন্টার ১ম বর্ষের ছাত্রী। আজ পরীক্ষা ছিল৷ তারজন্য বিয়েতে যেতে পারেনি। মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে দেখল ওরা এসে গেছে। বলল,
“বউদি চলো ফ্রেশ হয়ে নেবে।”
রিতুর মুখে এই প্রথম ‘বউদি’ ডাকটা শুনে প্রিয়ন্তির যেন কেমন লাগল। রিতুর সাথে আগে থেকেই প্রিয়ন্তির বেশ সখ্যতা ছিল। তবে রিতু সবসময় প্রিয়ন্তিকে প্রিয়ন্তিদি বলে ডাকতো। অবশ্য এখন সম্পর্কটাই তো বদলে গেছে। আগে ছিল বউদির ছোটো বোন। আর এখন সে নিজেই রিতুর বউদি হয়ে গেছে। আজ একবারও রাতুলের সাথে প্রিয়ন্তির কথা হয়নি। শুধু শুভদৃষ্টির সময় সবার অনুরোধে খুব অল্প সময়ের জন্য দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হয়েছিল। তারপর বাকি নিয়মগুলো দুজনই জড়বস্তুর মতো শুধু একটার পর আরেকটা পালন করে গেছে। প্রিয়ন্তি রিতুর সাথে ওঠে চলে গেল। রিতু প্রিয়ন্তিকে রাতুলের ঘরে নিয়ে গেল। রাতুল শুয়ে ছিল। ওদের দেখে উঠে ব্যালকনিতে চলে গেল। রিতু লাগেজ খুলে একটা সুতি শাড়ি বের করে দিল প্রিয়ন্তিকে। বলল,
“কাপড়টা পাল্টে নাও। ফ্রেশ লাগবে। আমি হেল্প করব?”
প্রিয়ন্তি ইতস্তত করে বলল,
“আমি স্নান করব।”
“বেশ, বাথরুমে যাও। ওয়েট তোমার চুলের খোঁপাটা খুলে দেই।”
পার্লারের মেয়েটা প্রিয়ন্তির মাথায় একগাদা ক্লিপ দিয়ে খোঁপা করে দিয়েছে। রিতু তেলের বোতল নিয়ে এলো। প্রিয়ন্তির চুলের খোঁপা সময় নিয়ে খুব সাবধানে খুলে দিল। প্রিয়ন্তি সুতি শাড়ি আর ব্লাউজ নিয়ে বাথরুমে ঢুকলো।
প্রায় বিশ মিনিট পর স্নান সেরে বের হলো প্রিয়ন্তি। রাতুল তখনো ঘরে আসেনি। ঘরে বসে আছে রাতুলের মা রিক্তাদেবী আর রাতুলের বোন রিতু। মা পইপই করে বলে দিয়েছে শ্বশুর-শাশুড়ীর সামনে মাথায় ঘোমটা দিবি। প্রিয়ন্তি রিক্তাদেবীকে দেখে মাথায় আলতো হাতে কাপড় তুলে দিল। আজ কেন যেন ওনাদের সামনে খুব লজ্জা লাগছে৷ প্রিয়ন্তি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নিচু কণ্ঠে বলল,
“মৃণালিনী কোথায়?”
রাতুলের দেড় বছরের মেয়েটার নাম মৃণালিনী। রিক্তাদেবী বলল,
“মৃণালিনী ঘুমে।”
প্রিয়ন্তি ইতস্তত করে বলল,
“ওকে বরং এখানে নিয়ে আসতেন।”
রিক্তাদেবী বলল,
“আজ থাক। এখন আনতে গেলে কাঁচাঘুম ভেঙে যাবে। তুমি দাঁড়িয়ে রইলে কেন? সিঁথিতে সিঁদুর পরে খেয়ে নাও।”
প্রিয়ন্তি চুলগুলো মুছে, মাথা আছড়ে সিঁথি ভর্তি রাতুলের নামে সিঁদুর পরলো। অথচ দুদিন আগেও মানুষটা সম্পর্কে প্রিয়ন্তির জামাইবাবু ছিল। দুদিনের ব্যবধানে এখন শুধুই ‘জামাই’ হয়ে গেছে। কথাগুলো ভাবতেই প্রিয়ন্তির গা শিরশির করে উঠলো। রিক্তাদেবী প্রিয়ন্তিকে সিঁদুর পরতে দেখে বলল,
“তোমার বোন সায়ন্তি এরকম একটা কুৎসিত কাণ্ড ঘটাবে আমরা কেউ কল্পনাও করিনি। আমার ছেলে ছুটিতে বাড়ি এলে ওর সাথে প্রায়ই অশান্তি করতো। আমরা ভাবতাম স্বামী-স্ত্রীর মাঝে তো ঝগড়া লাগেই। এ আর নতুন কী! আমার ছেলেটাও চাপা স্বভাবের জানো! বউ যে বিয়ের পরও পরকীয়া করে জেনেও কখনো আমাদের জানায়নি। অবশ্য আমার ছেলেই বা কতটুকু জানতো। এতো নিখুঁত অভিনয় করতো তোমার বোন। কতটা বেয়াদব আর ছিনাল হলে, দেড়বছরের বাচ্চা ফেলে রসিক নাগরের হাত ধরে পালিয়ে যায়! মা’গী’র কলিজা আছে।”
সায়ন্তি যতই খারাপ হোক। হাজার হলেও সম্পর্কে প্রিয়ন্তির দিদি। দিদির প্রাক্তন আর প্রিয়ন্তির বর্তমান শাশুড়ী নামক মানুষটার মুখে দিদির নামে এতো কুৎসিত কথা শুনতে প্রিয়ন্তির একটুও ভালো লাগলো না। রিতু বলল,
“আহ্..মা চুপ করো তো!”
“তুই চুপ কর। বলতে দে আমাকে। শোনো প্রিয়ন্তি এতকিছুর পরও তোমাকে আমরা বউ করে কেন এনেছি জানো? দুটো কারণে,
এক. তোমার ভাগ্নিকে মাতৃস্নেহে বড়ো করবে তুমি। আর দুই. ওই মাগি যদি কোনোদিন ফিরে আসে, তাহলে দেখবে কী হারাইছে সে। এবং সেই অনুতাপে সারাজীবন আফসোস করে জ্বলেপুড়ে মরবে।
তোমার কোনোকিছুর আমরা অভাব রাখব না। আমরাও দেখব, ওর নাগর ওকে কতোদিন সুখে রাখে। কতো শখ করে বউ এনেছিলাম। অথচ আমাদের মুখে চুনকালি মেখে কীভাবে ঘর ছাড়লো। এখনো ভাবলে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। যাইহোক এখন এই টপিক বাদ দেই। তুমি খেয়ে নাও। এই রাতুল খেয়ে যা বাবা?”
পুরোটা সময় প্রিয়ন্তি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে রইলো। কেবল তো শুরু এই কথাগুলো সারাজীবন শুনতে হবে প্রিয়ন্তিকে। বেশ বুঝতে পারছে প্রিয়ন্তি। রিতু ফিসফিস করে বলল,
“মায়ের কথায় কিছু মনে করো না বউদি। আসলে মা সেকেলে চিন্তাচেতনার মানুষ। তোমার বোনের তিনবছরের সংসার ফেলে চলে যাওয়াটা মা এখনো মেনে নিতে পারেনি।”
রিক্তাদেবী বলল,
“ও হ্যাঁ বউমা আর একটা কথা বলি! তোমার বোন তো তোমার বাবা-মা আমাদের সবার মুখে চুনকালি দিয়েছে। তুমিও এমন কিছু করো না। যাতে তোমার বাবা-মায়ের শিক্ষার প্রশ্ন উঠে। এমনিতেও তোমার বোন যা করেছে। তোমার ভালো ঘরে বিয়ে হতো না। তোমার রাজ-কপাল বুঝলে!”
কেমন রাজ-কপাল বেশ বোঝা হয়ে গেছে প্রিয়ন্তির৷ বিয়ের একদিনও যায়নি। অথচ এখুনি যা শুরু করেছে এই মহিলা। বাকি জীবন কীভাবে কাটাবে কে জানে! মা-বাবাও এই চিন্তাভাবনা থেকেই রাতুলের সাথে বিয়ে দিয়েছে। মা প্রায়ই আফসোস করে বলতো সায়ন্তির ঘটনার জের ধরে প্রিয়ন্তির ভালো ঘরে বিয়ে হবে না। এতে অবশ্য প্রিয়ন্তির কোনো মাথা ব্যথা ছিল না।
মায়ের ডাক শুনে রাতুল ঘরে এলো। রিক্তাদেবী বলল,
“খেয়ে নে বাবা!”
রাতুল একবার আঁড়চোখে প্রিয়ন্তির দিকে তাকালো। মাকে বলল,
“খেতে ইচ্ছে করছে না মা।”
“প্রিয়ন্তি তুমি কী খাবে?”
পেটে খিদে চু চু করছে। তবে ‘খাব’ বলতে খুব লজ্জা লাগছে প্রিয়ন্তির। রাতুল বলল,
“খাবার রেখে যাও মা। খিদে লাগলে খেয়ে নেব আমরা।”
“আচ্ছা বাবা। এবার একটু রেস্ট নে তোরা। রিতু চল ঘুমাবি।”
মা আর বোন উঠে চলে যেতেই রাতুল আস্তে করে দরজাটা চাপিয়ে দিল। ধীর কণ্ঠে বলল,
“খেয়ে নাও প্রিয়ন্তি।”
প্রিয়ন্তি খিদেয় অস্থির বোধ করছে। তবুও ভদ্রতা করে বলল,
“আপনি খাবেন না?”
“না।”
প্রিয়ন্তি আর কথা বাড়ালো না। হাত ধুয়ে খেতে বসল। মাছ আর ডাল দিয়ে অর্ধেক ভাত মেখে খেয়ে এক গ্লাস জল ঢকঢক করে গিলে ফেলল। পেট ভরে গেল। রাতুল খাটে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে একমনে ফোন স্ক্রল করছিল।
প্রিয়ন্তির খাওয়া শেষ হতেই রাতুল বলল,
“এদিকে আসো প্রিয়ন্তি।”
এখন প্রিয়ন্তির ভয় ভয় করছে। এই মানুষটাকে একটানা তিনটা বছর জামাইবাবু ডেকে এসেছে প্রিয়ন্তি। ভাগ্যক্রমে মানুষটা এখন প্রিয়ন্তির বর। দিদি কেন যে এতোবড় একটা ভুল করলো! তার খেসারত এখন প্রিয়ন্তিকে দিতে হবে।
প্রিয়ন্তি গুটিগুটি পায়ে এসে রাতুলের সামনে দাঁড়াল। রাতুল ফোনটা বিছানায় রেখে চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে নিল। প্রিয়ন্তির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি এখন কেমন অনুভব করছো প্রিয়ন্তি?”
প্রিয়ন্তি রাতুলের কথার মানে ঠিক বুঝতে পারলো না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রাতুলের মুখের দিকে তাকালো।
রাতুল চোখ থেকে চশমাটা খুলে শার্টের কোণা দিয়ে মুছে নিয়ে চোখে পরলো। তারপর আস্তে করে উঠে বাবু হয়ে বসল রাতুল। বলল,
“তোমার দিদির সাথে আমার তিনবছরের সংসার ছিল। না চাইতেও তোমার দিদিকে সব দিয়েছি আমি। কতো রিকুয়েষ্ট করেছি আমার সাথে যেয়ে থাকতে! একবার আমার খুব নির্জন একটা এলাকায় পোস্টিং হলো। শীতের রাতে একা একা মন টিকতো না। তোমার দিদিকে কতবার বলেছি, চলো আমরা একসাথে থাকি। তোমার দিদি আমার বাবা-মাকে দেখে রাখার অজুহাতে আমার সাথে গেল না। বিয়ের আটমাস পর জানতে পারলাম তোমার দিদির গোপন প্রেমের কথা। যেদিন হাতে-নাতে তোমার দিদিকে প্রমাণ সহ ধরলাম, তোমার দিদি আমার পাদু’টো জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদলো। আমার কাছে ক্ষমা চাইলো। আর জীবনেও তার সাথে সম্পর্ক রাখবে না। এই বলে, আমার গা ছুঁয়ে কথা দিল। প্রথম প্রথম মেনে নিতে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। তবুও সম্মান নষ্ট হবার ভয়ে মেনে নিয়েছি। তাছাড়া ততদিনে তোমার দিদির মায়ায় ভীষণ ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম। তারপর তো মৃণালিনী তোমার দিদির পেটে এলো। ভেবেছিলাম এবার ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে আমার দেড় বছরের মেয়েকে ফেলে তোমার দিদি পালিয়ে গেল। আচ্ছা আমার কী দোষ ছিল বলোতো? আমার কথা বাদই দিলাম! আমার ছোট্ট মেয়েটার কী দোষ ছিল? যাওয়ার হলে বিয়ের আগেই পালিয়ে যেতো। তা-ও না গেলে আমার বাচ্চা ওর গর্ভে আসার আগে যেতো। কিন্তু ও তা করলো না। আমার মেয়েটাকে এতিম করে দিয়ে ওর সো কল্ড প্রেমিকের ভালোবাসার টানে পালিয়ে গেল। আমি তো প্রথমে মানতেই পারিনি। কতো রাত নির্ঘুম কেটেছে। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাইনি। অন্তত বিয়ের আগে একবার তোমার সাথে সামনাসামনি কথা বলে নিতে চেয়েছিলাম। মা এমন ভাবে আমাকে বুঝালো। অন্যকেউ না। একমাত্র তুমিই নাকি আমার মেয়ের বেস্ট মা হবে। তাছাড়া তোমার দিদির ওইরকম একটা কুৎসিত ঘটনার পর তোমার ভালো ঘরে বিয়ে হওয়ার সম্ভবনা কম। সবকিছু বিবেচনা করে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তোমাকে বিয়ে করেছি। আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুরু করার আগে আমাকে স্পষ্ট করে একটা কথা বলো তো প্রিয়ন্তি!”
প্রিয়ন্তি জড়তা নিয়ে বলল, “কী কথা?”
“তোমারও কী তোমার দিদির মতো অন্য কোথাও রিলেশন আছে?”
প্রিয়ন্তি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। পায়ের নিচে কী যেন শিরশির করছে। মিথ্যে বলবে না সত্যি বলবে সঠিক বুঝতে পারছে না প্রিয়ন্তি। ওর বড্ড অস্থির লাগছে।
“কী হলো প্রিয়ন্তি?”
প্রিয়ন্তি শুকনো ঢোক গিলল। গলা শুকিয়ে চৌচির। রাতুলের সন্দেহ গাঢ় হলো। বিড়বিড় করে বলল,
“বেছে বেছে এই ধরনের মেয়েগুলোই কেন যে আমার ভাগ্যে জুটে!”
প্রিয়ন্তি মাথা নিচু করে বলল,
“ছিল।”
রাতুলের মনটা তিতা বিষে ভরে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“মানে এখন নেই বলতে চাচ্ছো?”
“হ্যাঁ মানে…না মানে…”
রাতুল প্রিয়ন্তির একহাত মুঠো করে ধরলো। ভয়ে প্রিয়ন্তির বুক ধুকপুক করছে। পেটের ভেতরে কী যেন কামড়ে ধরেছে। গা গুলিয়ে উঠছে। রাতুল চাপা কণ্ঠে বলল,
“প্রেমই যখন করতে আমাকে বিয়ে করলে কেন? এনিওয়ে তোমার দিদির মতো তোমারও কী আমাকে ঠকানোর ইচ্ছে আছে? লিসেন প্রিয়ন্তি ওই ধরনের ইচ্ছে যদি থেকে থাকে। এখুনি আমার বাসা থেকে চলে যাবে তুমি। তোমাদের জন্য বার বার আমি অপমানিত হতে পারব না। তোমাদের মানসম্মান না থাকলে কী হবে, এই সমাজে আমাদের মানসম্মান আছে। কী হলো কথা বলছো না কেন? একা যেতে ভয় পাচ্ছো? চলো আমি তোমাকে দিয়ে আসছি।”
(চলবে)
(পরের পর্ব এখানেই দিছি দেখেন এই ওয়বসাইটেই।
