#উপলব্ধি

#পর্ব_২

#যুমার_মাহরীন_আহমেদ


দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ কেটে গেলো। এই এক সপ্তাহে বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে আমার তেমন কোন কথা হয় নি। বলাবাহুল্য তিনি অনেকবার বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবার আমি বিরক্তির সাথে সেখান থেকে চলে এসেছি। এই মহিলাকে আমার ভীষণ বিরক্ত লাগে , একেবারে বিষের মতো। বলা হয় নি ,ভদ্রমহিলার নাম মল্লিকা। খুবই বিশ্রি নাম! আমার জীবনে শোনা সবচেয়ে বিশ্রি নাম এই মল্লিকা! 


বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পর পুরো এক সপ্তাহ ধরে আত্মীয়-স্বজন ,মেহমানদের আনাগোনা লেগে থাকলো। বাবা তার দ্বিতীয় বিয়ে খুব সাধারণভাবে কাজি অফিসে গিয়ে করেছেন। এতে আত্মীয়-স্বজনদের কত অভিযোগ! তাদের আগে কেন জানায় নি? বিয়েটা আরো একটু ধুমধাম করে করলে কি এমন হতো? তারাই তো দুবছর ধরে তাকে বিয়ে করার জন্য প্রেশার দিচ্ছিলো, এখন যখন জুনায়েদ বিয়ে করলো, তখন তাদের দাওয়াত পর্যন্ত করলো না ?


বাবা বিরক্তির সাথে ফুপুকে বললেন, আহ, আপা! আমি তো প্রথমবার বিয়ে করছি না। একটা বিয়ে করার দরকার ছিল ,তাই করেছি। এতে এতো হইহুল্লোড় করার কিছু দেখি না।


আড়াল থেকে আমি তাদের সব কথা শুনলাম। আমার কেন জানি ভীষণ খারাপ লাগলো। অথচ এই আত্মীয়-স্বজন আমার মায়ের বিয়েতে কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে বাড়িতে এসে বদনাম করেছিলো মাংস ঠিকমতো সিদ্ধ হয় নি। মেয়ের বাপের আয়োজন তেমন জাকজমক হয় নি। আরো কত কথা আমার মাকে শুনতে হয়েছে। মা যখন খুব কষ্ট পেতো তখন আমার সাথে সেসব কথা শেয়ার করতো। আসলে আমাদের মায়েরা এমনি এমনি আমাদের অজাতের বংশ বলে না। আমাদের বেশিরভাগ বংশই আসলে অজাতের বংশ।


নিজের রুমে যাওয়ার সময় বাবার রুম থেকে ঐ ডাইনি মহিলার খিলখিল হাসির শব্দ কানে এলো। আমার মায়ের সবকিছু দখল করে নিয়ে কি সুন্দর মনের আনন্দে হাসছে! 


রুমের সামনের দৃশ্য দেখে আমার পা থেমে গেলো। ঐ ডাইনি মল্লিকা সিদরার চুল বেধে দিচ্ছে।আর কি নিয়ে সিদরার সাথে হাসাহাসি করছে। সিদরাও তার কথা শুনে খিলখিল করে হাসছে।


" তুমি আমায় পছন্দ করো?" সিদরার চুল বেধে দিতে দিতে বলল মল্লিকা।


সিদরা কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বলল, আসলে তোমাকে দেখলে না কিরকম মা, মা লাগে। 

এই বলে মল্লিকার আঁচল নাকের কাছে নিয়ে বলল, তোমার গা থেকে না মায়ের ঘ্রাণ বের হয়। 


সিদরার কথা শুনে মল্লিকার চোখ পানিতে ভরে গেলো। সে মল্লিকাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে তার দুগালে হাত রেখে বলল, তাহলে আমার কাছে আসো না কেন? আমার থেকে দূরে থাকো কেন?


মল্লিকার কথা শুনে সিদরা তার চোখ নামিয়ে ফেলে মিনমিন স্বরে বলল, আপু বলেছে, তুমি নাকি একটা ডাইনি।যে আমাদের মায়ের জায়গা নিতে এসেছে। যে আমাদের কাছ থেকে আমাদের বাবাকে কেড়ে নিতে এসেছে। বাবার মন থেকে মাকে ভুলাতে এসেছে। তুমি নাকি আমাদের সৎমা। আর সৎমারা কখনো ভালো হয় না। তারা বাচ্চাদের অনেক মারে। তুমিও আমাদের অনেক মারবে।। তুমি আমাদের নামে বাবার কাছে অনেক উল্টা-পাল্টা কথা বলবে, এতে বাবাও আর আমাদের পছন্দ করবে না। যেমনটা সাজি আপুর সৎমা সাজি আপুর সাথে করেছিলো।


সিদরার কথা শুনে মল্লিকা কিছুক্ষণের জন্য থেমে তারপর বলল, সবসময় মনে রাখবে সিদরা, কেউ কারো জায়গা নিতে পারে না।প্রত্যেকের জন্য তার নিজস্ব জায়গা থাকে। এই বাড়িতে আমি তোমার মায়ের জায়গা দখল করতে আসিনি। বরং নিজের জায়গা করে নিতে এসেছি। আমি চাইলেও তোমার মায়ের জায়গা কখনো নিতে পারবো না, তোমার মা চাইলেও আমার জায়গা কখনো নিতে পারবেন না। কারণ সবার জন্য তার নিজস্ব জায়গা নির্ধারিত। আমি তোমায় কখনো আমাকে মা ডাকতে জোর করবো না, কিন্তু তুমি আমায় মা ডাকলে আমি ভীষণ খুশি হবো। তুমি চাইলে নাও ডাকতে পারো। কিন্তু আমার কাছে এসো। প্লিজ এসো।


অনেক হয়েছে! এই মহিলা তো ভীষণ সংঘাতিক! কি প্রো লেভেলের ম্যানিপুলেট করতে জানে রে বাবা। আরেকটু হলে আমার আলাভোলা বোনটাকে বশ করে নিবে। না, এটা হতে দেওয়া যায় না। আমি রেগে গিয়ে কিছুটা উচ্চস্বরে সিদরাকে ডাকলাম, সিদরা!


আমার ডাক শুনে চমকে গেলো সিদরা। দরজার সামনে আমায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেলো। 


" রুমে ,চল।" কিছুটা হুংকার দিয়ে বললাম।


সিদরা ভয়ে ভয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলো। মল্লিকা আমার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, প্লিজ, তুমি ওকে কিছু বলো না। ওর কোন দোষ নেই। আমিই ওকে ডেকেছিলাম।


আমি কাঠ কাঠ গলায় জবাব দিলাম, আমার বোন! আমাকে বুঝে নিতে দিন।


বলে টানতে টানতে সিদরাকে নিয়ে রুমে চলে গেলাম। দরজা লাগিয়ে রাগী কন্ঠে বললাম, এই তোর মায়ের প্রতি ভালোবাসা? সপ্তাহ পেরুলো না এর মধ্যে মায়ের সতীনের সাথে ভাব জমিয়ে ফেলেছিস? তোরা সব কটা বিশ্বাসঘাতক। ছি, ছি সিদরা। তুই এত খারাপ? তুই ওই মহিলার কাছ থেকে মায়ের ঘ্রাণ পাস? তাহলে যা তোর ঐ মায়ের কাছে।আমার কাছে একদম আসবি না। আমি তোর কেউ না। কয়েকদিন পর যখন মল্লিকা তার আসল রূপ দেখাবে , তখন বুঝতে পারবি মায়ের ঘ্রাণ বেরুলেই মা হয় না।


সিদরা কান্না করতে করতে আমায় জড়িয়ে ধরে বলল, আমি সরি আপু। আর হবে না। তুমি আমায় দূরে সরিয়ে দিও না।আমি আর কখনো তোমার অবাধ্য হবো না। আর কখনো ঐ আন্টির সাথে কথা বলবো না।আপু, ও আপু! আমার সাথে কথা বলো। আপু আর রাগ করে থেকো না। আপু ,আমি মাকে অনেক ভালোবাসি।


আমি তখন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, মনে থাকে যেন। ঐ মহিলার আশে-পাশে যেন তোকে আমি আর না দেখি।


------


 দিন এভাবে যেতে লাগলো। বাবার সাথে আমার সম্পর্কের কোন উন্নতি হলো না। বরং বাবাকে আমি যথাসম্ভব আমি এড়িয়ে চলতে লাগলাম। বাবা সবটা বুঝতেন। অসহায়ের ন্যায় আমার দিকে তাকাতেন কিন্তু কিছু বলতেন না। আমার এই অবহেলা বাবা মেনে নিয়েছেন। তবে আমাদের দেখভালের কোন ত্রুটি তিনি রাখেন নি। আমার নিজের কোন ইনকাম ছিলো না। তাই আমার ওনার উপর নির্ভর হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।তবুও আমি আমি যথাসম্ভব কমিয়ে খরচ করার চেষ্টা করতাম। নিজের ছোটখাটো ইচ্ছেগুলো চাপা দিতে লাগলাম।আমার কেন জানি বাবার টাকার উপর ভীষণ বিরক্তি কাজ করতো। আমি চেষ্টা করতাম যত কম খরচ করা যায়। এতে আমার যতই কষ্ট হোক।আমি আমার সব খায়েশ,শখ জমিয়ে রাখলাম নিজের ইনকামের টাকায় কেনার জন্য। আপনারা কি ভেবেছেন জামাইয়ের জন্য জমিয়ে রেখেছি? উহুম, ভুল ভেবেছেন। 


সিদরাকেও সেদিনের পর থেকে মল্লিকার ধারে-কাছে যেতে দেখে নি। আমার কথা সে বেশ সিরিয়াসলি নিয়েছে।


মল্লিকা এখনো অব্দি তার কূটনামি শুরু করে নি। তবে কিছুদিনের মধ্যে শুরু করে দেবে আশা করা যায়। আর কতদিন ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকবে? 

বেশ কয়েকবার চেয়েছিলো আমার মন জয় করার। কিন্তু হুররাম তো হুররাম। সে সিদরা নয়।


সেদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখি বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী মল্লিকা মাহফুজ খাবার টেবিলে খাবার নিয়ে কার জন্য অপেক্ষা করছেন। 


আমি সেসবে মাথা না ঘামিয়ে রুমে যেতে যাবো এমন সময় তিনি বেশ উৎসাহ নিয়ে বললেন, হুররাম, এসে গেছো? তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। 


আমি কপালে বিরক্তির ভাজ ফেলে ওনার দিকে বললাম , কেন? কেন আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন?


" আমরা একসাথে গল্প করতে করতে খাবার খাবো।তোমার বাবার কাছ থেকে শুনেছি, তোমার নাকি হালিম ভীষণ প্রিয়। তাই আমি আজ তোমার জন্য হালিম রান্না করেছি। চলো একসাথে খাই।" হাসিমুখে বললেন মল্লিকা।


আমি আগের মতো করে বললাম, আপনার হালিম আপনি খান। আমার আমার মায়ের হাতের রান্না করা হালিম প্রিয় ছিলো। আমার মায়ের হাতের রান্না করা সব খাবার আমার প্রিয় ছিলো। আমার মা নেই, তাই এখন আমার কোন প্রিয় খাবার নেই।


আমার কথা শুনে মল্লিকার হাসিমুখ মলিন হয়ে গেলো। শান্ত গলায় বললেন, আমরা কি বন্ধুও হতে পারি না হুররাম। মা না মানো এটলিস্ট ফ্যামিলির একজন সদস্য মানতে পারো। আমি তোমায় কখনো হার্ট করেছি হুররাম? তাহলে তুমি কেন আমায় হার্ট করছো?


" আমি আগে থেকে ক্ষত-বিক্ষত মিসেস.মল্লিকা মাহফুজ। আর একজন আহত মানুষকে বারবার আহত করা যায় না। আপনার আমাকে হার্ট করার কোন প্রয়োজন নেই , আমাকে হার্ট করার জন্য আপনার উপস্থিতি যথেষ্ট। " এতটুকু বলে হনহন করে রুমে চলে গেলাম। 


মায়ের মৃত্যুর পর থেকে আমি অতিরিক্ত মাত্রায় ডিপ্রেশনে ভুগছিলাম। সারাক্ষণ নিজেকে ঘরবন্দি করে রাখতাম। কিছুই ভালো লাগতো না। ইচ্ছে করতো মায়ের কোলে গিয়ে শুয়ে থাকি , কিন্তু সেটা সম্ভব ছিল না। ডিপ্রেশনের অতল গহবরে আমি আস্তে আস্তে তলিয়ে যাচ্ছিলাম।মনে হচ্ছিলো আমার কেউ নেই। আমাকে কেউ ভালোবাসে না। আমার এই অবস্থা দেখে বাবা আমায় সাইক্রিয়াটিস্ট দেখান। আস্তে আস্তে থেরাপির মাধ্যমে আমি সুস্থ হচ্ছিলাম। ঠিক সেই সময়টাতে বাবার দ্বিতীয় বিয়ে করা আমায় আবার ডিপ্রেশনের অতল গহবরে ফেলে দিলো। পুনরায় আমার ভেতরে থাকা সমস্যাগুলো জেগে উঠতে লাগলো। তবে এবার আমি আর কোন থেরাপি নিলাম না। কারণ আমি আর ভালো হতে চাই না। প্রতিদিন যখন মল্লিকা মাহফুজকে আমার মায়ের রুম থেকে বেরুতে দেখি, আমার মায়ের রান্নাঘরে রান্না করতে দেখি , মায়ের পুরো সংসারের চাবি তার আচঁলে দেখি ,আমি প্রতিদিন একবার করে মারা যাই। আমি তাকে আমার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম, কিন্তু এই সংসারে আমার মায়ের জায়গায় মেনে নিতে পারছিলাম না।এই সংসার আমার মায়ের। সে তিল তিল করে এই সংসার গড়ে তুলেছে। 

নিজের মধ্যকার হতাশা চূড়ান্ত মাত্রায় বাড়ছিলো। ঠিক তখনই আমার জীবনে আলো  হয়ে এলেন মেহরিন মোস্তফা। আমাদের মেহরিন ম্যাম! 


চলবে........


পরের পর্ব গুলা এখানেই পাবেন। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url