#মায়ের_লড়াই
#অন্তিম_পর্ব
#ইলোরা_ফারদিন
আমার ভাবনার মাঝেই মা আমার ঘরে এলেন। তার সারা মুখে মারের দাগ, শরীরেও অসংখ্য দাগ উকি মারছে। অন্যদিন হলে মা এই দাগগুলি ঢেকে রাখতেন। কিন্তু আজ তা করলেন না। সে যেন ইচ্ছে করেই আমার সামনে সেগুলো দেখালেন।
এরপর মা হাতে ভাতের প্লেট নিয়ে আমাকে বলতে লাগলেন,
"আমি তখন চিটাগং ভার্সিটির প্রথম বর্ষে। আর তোমার বাবা শেষ বর্ষে। উত্তর বঙ্গের মেয়ে আমি। আর তোমার বাবা এই চিটাগং এর ছেলে। সে তখন এখানে ন্যাশনাল ভার্সিটিতে মাস্টার্স করছে।
সে যাই হোক, অত্যন্ত রূপবতী হওয়ায় তোমার বাবার নজরে পরে যাই আমি। তারপর যা হওয়ার তাই। সে প্রেমের প্রস্তাব দিল, পাগলামি করলো, আমিও তাতে তাল মিলিয়ে পাগল হলাম। পরিবারকে জানাতেই তারা না করে দিল। কারণ আমাদের বাসায় প্রেম বিয়ে নিষিদ্ধ ছিল। শেষে বাবা আমাকে বললেন হয় পরিবার নাহয় তোর বাবা।
বোকা আমি, পরিবারের ২১ বছরের ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলে, তোর বাপের দুই বছরের ভালোবাসাকে বেছে নিলাম। কিন্তু বিয়ের একমাস না যেতেই তোর বাবার ভিন্ন রূপ দেখলাম। আমার পড়াশুনা বন্ধ করে দিল। এক প্রকার এই বাসায় বন্দি করে লাখলো। মায়ের মিথ্যা অভিযোগে গায়ে হাত তুলতে শুরু করলো।
প্রথমে ভেবেছিলাম সংসার করব না। অনেক সাহস করে বাবাকে ফোন দিয়ে জানালাম সব।
কিন্তু বাবা আমার শেষ ভরসা ভেঙে দিয়ে বললেন, যেদিন ঘর ছেড়েছিস, সেদিন থেকেই তুই মৃত আমার জন্য।
তারপর ভাবলাম এ জীবন রাখব না। কিন্তু সেদিনই জানতে পারলাম তুই আমার গর্ভে। তারপর থেকেই আমি বোবা হয়ে গেলাম। শুধু তোর কথা ভেবে। পরে রইলাম এই জেলখানায়।
কিন্তু আজ! আজ তুই এখানেও নিরাপদ না। তাই আমি চাই তুই এই জেলখানা থেকে পালিয়ে যা। তারপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে এখানে এসে আমাকে এই নরক থেকে মুক্তি দে মা।
মা আমি একা কেন? তুমিও চলো!
না রে মা। এটা কিভাবে সম্ভব!
সব সম্ভব মা। উলটো তুমি আমার পাশে থাকলে আমি সাহস পাব, একটা শক্ত অবলম্বন পাব।
তারপর?
তারপর আর কি? কেটে গেল সাতটা বছর। এই সাত বছরে অনেক কিছু বদলেছে। সেদিন বাসা থেকে ভোর রাতে পালিয়ে যায় মা মেয়ে। রাতের খাবারে ঘুমের ওষুধ মিলিয়ে দেয়ায় সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন ছিল। যাওয়ার সময় লকার থেকে নগদ আট লক্ষ টাকা নিয়ে নেয় তারা। তারপর পাড়ি দেয় ঢাকা।
ভাগ্যক্রমে ঢাবিতে চান্স পায় নবনীতা। এরপর নিজের যোগ্যতায় বড় চাকরি নিয়ে ফিরে নিজ এলাকায়।
আজ প্রায় আট বছর পর মা মেয়ে পা রাখলো তাদের বাসার সামনে। পাশে নবনীতার বডি গার্ড।
গাড়ি থেকে নেমেই সে তাদের বাসাটাকে সর্ব প্রথম দেখলো সে। আগের সেই জৌলুশ নেই। কেমন যেন হয়ে আছে। তাদের দেখে এলাকার মানুষ জড়ো হয়েছে।
বাসার ভিতর ঢুকতেই তাদের কানে এলো কোকানোর শব্দ। সামনে বারান্দায় তাকাতেই দেখতে পেল তার দাদী শুয়ে আছে, মুখ তার বাকানো, লালা পরছে। পাশ থেকে এক মহিলা বলে উঠলো,
"এরা পাপের শাস্তি পেয়েছে রে নবু। তোর দাদি প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পরা, বিছানায়ই হাগে মুতে, গন্ধ রে বাপ।
আর তোর ফুফুরে তো ওর স্বামী ছাইড়া দিছে। শালি ফজলে ডাক্তারের লগে পরকীয়া করতো। ফজলের বউ ওরে পুরা এলাকার সামনে কাপড় ছাড়া করছে। এখন ওয় পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। আর তোর ফুফাতো ভাই তো মাদক মামলায় জেলে।
আর তোর বাপ..
বলার আগে জসিম হাজির হলো সেখানে। জসিমকে দেখে নবনীতা আর ওর মা যেন আজ নির্বাক। ওর দুটো হাত নেই।
জসিম ধীর পায়ে এগিয়ে এলো নবনীতা আর নিলুফার সামনে। তারপর নিজের স্ত্রী আর কন্যার সামনে মাথা নত কর আচমকা নিলুফার সামনে বসে কেদে উঠলো। বললো,
" আমাকে ক্ষমা কর নিলু, তুমি আমার জন্য কত কি করলে আর আমি নিজের মা বোনের কথায় তোমাকে এতো কষ্ট দিয়েছি। আসলেই আমি কাপুরুষ। নিজের মেয়েটাকেও নরকে ঠেলে দিচ্ছিলাম। সে পাপের শাস্তিই এখন পাচ্ছি! "
এবার নবনীতা বলে উঠলো, " আমরা আপনাদের পাপ পূণ্যের গান শুনতে আসি নি মিস্টার জসিম। এই নেন ডিভোর্স পেপার, এটাতে সই করে দিবেন। সই না করলেও তিন মাস পর এমনিতেও ডিভোর্স হয়ে যাবে।"
বলে এক মুহুর্ত দেরি না করে নবনীতা মায়ের হাত ধরে সে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।
অবশেষে মুক্তি পেল নিলুফার। নবনীতাও আজ খুশি। অবশেষে তার মা নিজের লড়াইয়ে জয় লাভ করলো।
সমাপ্ত
