#এই_অবেলায়(০২)

®সুমনা সাথী 


রাতের অনেকটা প্রহর নবনী একা একাই প্রতীক্ষা করলো কিন্তু দিব্য আর ফেরেনি। শূন্য ঘরটায় বসে পুরো বিষয়টাই তার কাছে কোনো দুঃস্বপ্নের মতো মনে হতে লাগল। বুকের গহীনে জমে থাকা পুরোনো ক্ষতগুলো যেন নতুন করে চাড়া দিয়ে উঠল। অসীমের সেই বেইমানি আর বর্তমানের এই অনিশ্চয়তা। নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না সে; বালিশে মুখ গুঁজে প্রাণভরে কাঁদল। চোখের নোনা জলে হৃদয়ের ভার কিছুটা লাঘব হলেও মনের ভেতরে জমে থাকা মেঘ কাটল না। কাঁদতে কাঁদতেই কখন যে ক্লান্ত চোখদুটো ঘুমে জড়িয়ে এসেছিল, তা সে টেরই পায়নি। যখন ঘুম ভাঙল, ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল নবনী। জানালার পর্দা সরিয়ে দেখল বাইরে রোদের তেজ বেশ কড়া। ফোনটা হাতে নিয়ে সময় দেখামাত্রই যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল ওর। সকাল আটটায় পয়তাল্লিশ! লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় নবনী কুঁকড়ে গেল। নতুন বাড়িতে প্রথম সকালেই এতটা দেরি করে ফেলাটা যেন এক মস্ত অপরাধ। অথচ অবাক করার বিষয় হলো বাড়ির কেউ তাকে একবারের জন্য ডাকল না। একরাশ অস্বস্তি নিয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বের হলো সে। বাড়িটা তো নয় যেন প্রাসাদ। প্রশস্ত ড্রয়িং রুমে দামি আসবাব আর আভিজাত্যের ছোঁয়া। নবনীকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই অলেখা হাস্যোজ্জ্বল মুখে এগিয়ে এলেন। 


'উঠে গেছো মা? এসো, নাস্তা করবে।'


রান্নাঘরে অলেখার সাথে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা কাজে হাত লাগিয়েছেন। ডাইনিং টেবিলে বসে দিব্যর ছোট ভাই কলরব আর বোন কথা নাস্তা করছে। তাদের তদারকি করছেন দিব্যর ছোট চাচি মাজহা আর তার ছেলের বউ মৌনিতা। সবাইকে একসাথে দেখে নবনীর সংকোচ আরও বেড়ে গেল। বাড়ির বড় বউ হয়ে এত দেরি করে সবার সামনে আসাটা তার কাছে ভীষণ লজ্জার মনে হতে লাগল। নবনীর মুখের এই অস্বস্তি মৌনিতার নজর এড়ালো না। সে দ্রুত পা ফেলে নবনীর কাছে এগিয়ে এল এবং ঠোঁটের কোণে মিষ্টি এক টুকরো হাসি ঝুলিয়ে বলল,


'এসো নবনী, অত সংকোচ করছো কেন? সম্পর্কে তুমি আমার বড় হলেও বয়সে তো নিশ্চয়ই ছোট হবে। তোমাকে নাম ধরে ডাকলে কি মাইন্ড করবে?'


নবনী বিষণ্ণতার মাঝেও একটু মৃদু হাসার চেষ্টা করল। মাথা নেড়ে জানাল যে সে কিছু মনে করবে না। তারপর বেশ কুণ্ঠিত স্বরে বলল, 


'আসলে সরি, আমার উঠতে একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল।'


অলেখা কিচেন থেকে বেরিয়ে এসে নবনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। অভয় দিয়ে বললেন, 


'আমি ইচ্ছা করেই তোমাকে ডাকিনি মা। কাল অতটা পথ জার্নি করে এসেছো, ক্লান্তি থাকাটাই স্বাভাবিক। এটা নিয়ে একদম ভেবো না। এখন চটজলদি নাস্তা করে নাও, তারপর কিছু নিয়ম-কানুন আছে সেগুলো সারতে হবে।'


মৌনিতা নবনীকে হাত ধরে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসালো। বাড়ির সবার সাথে পুনরায় পরিচয় করিয়ে দিলেও নবনী খেয়াল করল, মানুষগুলোর ভিড়ে দুটি মুখ অনুপস্থিত। দিব্য আর ছোট্ট দিয়াকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ নিরব থেকে নবনী জড়তা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করল, 


'আন্টি, দিয়া কোথায়?'


মাজহা উত্তর দিলেন, 'দিয়াকে তো দিব্য স্কুলে নিয়ে গেছে। ও প্রতিদিন অফিস যাওয়ার পথে দিয়াকে নামিয়ে দিয়ে যায়। আর বাড়ির বাকি পুরুষরা মানে তোমার চাচা শ্বশুর আর আমার ছেলে কাব্যও অনেক আগে বেরিয়ে গেছে। এই বাড়িতে মোটামুটি আটটার মধ্যেই সবাই কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।'


দিব্যর কথা শুনে নবনীর মনের কোণে একটা প্রশ্ন উঁকি দিল। কাল রাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর কোথায় ছিলো দিব্য৷ আর কেনো বা গিয়েছিলো? নবনী আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ নাস্তা শেষ করল। এরপরই শুরু হলো পরবর্তী নিয়ম। মাজহা আর অলেখা তাকে রান্নাঘরে দিকে নিয়ে গেলেন। মাজহা বুঝিয়ে বললেন, 


'আমাদের বাড়ির একটা পুরনো নিয়ম আছে। নতুন বউ প্রথম সকালে সবার জন্য কিছু না কিছু রান্না করে। তবে নিয়ম হচ্ছে এই কাজে বাড়ির কেউ তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারবে না। নিজের হাতেই সবটা সামলাতে হবে। পারবে তো?'


নবনী ধীরস্থিরভাবে মাথা নাড়ল। মনে মনে কিছুটা নার্ভাস লাগলেও সে জানে যে রান্না সম্পর্কে তার ভালোই জ্ঞান আছে। তবে এত বড় পরিবার আর নতুন স্বাদের সাথে মানিয়ে নেওয়াটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। মাজহা বেগম এই ফাঁকে মিলুর সাথে নবনীর পরিচয় করিয়ে দিলেন। মিলু এ বাড়ির বহু পুরনো বিশ্বাসী কাজের লোক। তার স্বামীও এ বাড়ির পুরনো ড্রাইভার। রান্নাঘরে নবনীকে একা রেখে বাকি সবাই বেরিয়ে গেল। সুবিশাল আধুনিক রান্নাঘরটায় নবনী যখন একা দাঁড়াল তখন তার মাথার ভেতর শত চিন্তার আনাগোনা। সে কী রান্না করবে? ঠিক তখনই মিলু বিনীত স্বরে জিজ্ঞেস করল,


'কোনো কিছু কি কাটাকুটি করা লাগবে ভাবি? লাগলে বলেন, আমি সব গুছিয়ে দিচ্ছি। আপনি কি রান্না করবেন কিছু ভেবেছেন?'


নবনী জানালা দিয়ে বাইরের উজ্জ্বল রোদের দিকে তাকাল। তার মনের ভেতর তখন চিন্তার ঝড়। কী রান্না করলে সবার মন রক্ষা হবে। আবার নিজের সম্মানও বজায় থাকবে তা নিয়ে সে বেশ দোটানায় পড়ে গেল। অবশেষে সে ভাবল, ভুনা খিচুড়িটাই হবে সবথেকে নিরাপদ আর জুতসই সিদ্ধান্ত। সবজি আর মশলাপাতি দিয়ে একবার চড়িয়ে দিতে পারলে স্বাদের দিক থেকে খুব একটা বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না। সে মিলুকে বেশ কিছু সবজি কুটে দিতে বলল। মিলু সবজি কাটতে বসেই একগাল হেসে বেশ রসিয়ে রসিয়ে পুরনো গল্প জুড়ে দিল। দাঁত বের করে সে বলল, 


'জানেন ভাবি, সেবার যখন মৌনিতা ভাবির বিয়ে হলো; তখনো আমি এই রান্নাঘরেই ছিলাম। ভাবি তো মস্ত বড়লোক বাপের আদুরে আর একমাত্র মেয়ে। হাঁড়ি-পাতিল কোনোদিন ধরেনি। শেষমেষ কী না পেরে নুডলস রান্না করে বসলো! বাড়ির সবার মুখ দেখার মতো হয়েছিল সেদিন।'


বলেই মিলু খিলখিল করে হাসতে লাগল। কিন্তু নবনীর মনে এই হাসি কোনো দোলা দিল না বরং সে কিছুটা বিরক্তই হলো। একে তো নিজের এলোমেলো জীবন নিয়ে সে অস্থির তার ওপর নতুন পরিবেশের চাপ এসবের মাঝে মিলুর এই ফালতু রং-তামাশা তার একদমই ভালো লাগছিল না। সে একটু গম্ভীর হয়েই নিজের কাজে মন দিল। সবজি ধোয়া, চাল-ডাল মাপার এই ব্যস্ততার ফাঁকে নবনী যেন মুহূর্তের জন্য ভুলেই গেল গত রাতের ঘটনা। সব মশলা কষানোর পর যখন খিচুড়ির সুঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল তখন নবনী এক মুহূর্তের জন্য আনমনা হয়ে গেল। সে ভাবল, যে মানুষটার জন্য সে তার সবটুকু উজার করে দিতে চেয়েছিল সেই আজ অনেক দূরে। আর যাকে সে কোনো না কোনোভাবে এক প্রকার ঘৃণা করতো আজ তার ঘরের মানুষের জন্য রাঁধতেই সে ব্যস্ত। নিয়তি বোধহয় একেই বলে।


সিঁড়ি বেয়ে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নামলেন অলেখা বেগম। তাঁর এক হাতে ধরা মুঠোফোন। কারো সাথে কথা বলতে বলতে তিনি এতটাই বিচলিত যে আশেপাশের কোনোদিকে তাঁর খেয়াল নেই। রান্নাঘর থেকে নবনী উৎসুক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল। ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছিল মৌনিতা; সে শাশুড়ির এমন অবস্থা দেখে তড়িঘড়ি উঠে এসে জিজ্ঞেস করল,


'কী হয়েছে চাচিআম্মা? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কার ফোন এসেছিল?'


নবনীও হাতের কাজ ফেলে ধীর পায়ে ড্রয়িং রুমের কোণে এসে দাঁড়াল। অলেখা বেগম একবার নবনীর দিকে তাকিয়ে নিয়ে ধরা গলায় বললেন, 


'দিয়ার স্কুলের টিচার ফোন করেছিলেন। স্কুলে দিয়া নাকি কার সাথে মারামারি করেছে। ম্যাডাম বললেন, ছুটি হওয়ার আগে উনি দিয়ার মায়ের সাথে দেখা করতে চান। আমি দিব্যকে অনেকবার কল করার চেষ্টা করলাম কিন্তু ও মিটিংয়ে আছে বলে ফোন ধরছে না।'


মৌনিতা অবাক হয়ে বলল, 'কিন্তু দিয়ার যে মা নেই সেটা তো স্কুলের সবাই জানে। এখন ওর মা কোত্থেকে আসবে?'


অলেখা বেগম অস্থির হয়ে বললেন, 'আমি অতশত জানি না বাপু। তবে শুনলাম দিয়া হাতে চোট পেয়েছে। ও খুব কাঁদছে। দাঁড়াও, আমি আরেকবার দিব্যকে ট্রাই করি।'


নবনী বলে উঠল, 'এক মিনিট আন্টি। উনাকে আর কল করার দরকার নেই। আপনি আমাকে দিয়ার স্কুলের ঠিকানা বলুন, আমি এখনই চলে যাচ্ছি।'


অলেখা বেগম কিছুটা দ্বিধায় পড়লেন। নবনী এই বাড়ির নতুন বউ, একা একা পাঠানোটা কি ঠিক হবে? তবে পরক্ষণেই ভাবলেন দিয়ার জন্য নবনীর এই টানটা তো ভালো লক্ষণ। তিনি সায় দিয়ে বললেন, 


'ঠিকানা নিতে হবে না। তুমি আমাদের গাড়িতে করেই যাও। আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি তোমাকে পৌঁছে দিতে।'


নবনী সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। অলেখা যাওয়ার আগে আবার মনে করিয়ে দিলেন, 


'যাওয়ার পথে একবার দিব্যকে কল দিও। টিচার ওর সাথেও কথা বলতে চেয়েছেন। আমিও দেখছি ওকে পাওয়া যায় কি না।'


নবনী দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। এক অদ্ভুত বাস্তবতায় সে থমকে গেছে। যার ঘর করতে সে এই বাড়িতে এসেছে, যার সন্তানের দায়িত্ব নিতে আজ সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে; সেই মানুষটির ফোন নাম্বারটাই তার কাছে নেই! নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বেশ কুণ্ঠার সাথে বলে ফেলল,


'উনার নাম্বারটা... মানে নাম্বারটা তো আমার কাছে নেই।'


অলেখা অবশ্য বিনাবাক্য নাম্বার দিয়ে দিয়েছিলেন। গাড়িতে বসে বার বার কল করেও ওপাশ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। দিব্য সম্ভবত তার বিজনেস মিটিংয়ে এতটাই মগ্ন যে ফোনের অস্তিত্বই ভুলে গেছে। নবনী হতাশ হলো বেশ। স্কুলে পৌঁছে নবনী জানতে পারল সবটা। দিয়া তার সহপাঠীদের সাথে গল্প করছিল যে এখন তার কাছে ও মা আছে। কিন্তু তারা সেই কথাকে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল। তাদের বিদ্রুপ আর অবিশ্বাস সহ্য করতে না পেরেই দিয়া রুখে দাঁড়িয়েছিল। আর সেই হাতাহাতির এক পর্যায়ে মেঝেতে পড়ে গিয়ে তার ছোট্ট হাতটা ছিলে গেছে। অফিস রুমের একপাশে থম মেরে বসে আছে দিয়া। লাল হয়ে আসা চোখ আর ফোলা মুখটা বড্ড বিধস্ত লাগছে। নবনী ধীর পায়ে তার কাছে এগিয়ে গেল। পাশে বসে আদুরে স্বরে বলল,


'দিয়া মাম্মা, আমার সোনামণিটা বুঝি খুব ব্যথা পেয়েছে? উফ্‌, তোমার তো খুব কষ্ট হচ্ছে সোনা, তাহলে ওষুধ লাগাচ্ছ না কেন? কই দেখি তো হাতটা?'


দিয়া মুখ তুলল না। বুকের ওপর হাত দুটো আড়াআড়ি করে বেঁধেছে সে। মাথাটা নিচু করে রেখেছে। গম্ভীর স্বরে নবনীর দিকে না তাকিয়েই বলল, 


'আমি তোমার সাথে একদম কথা বলব না। তুমি পচা! তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসো না। সকালে আমি কত অপেক্ষা করলাম কিন্তু তুমি আমায় স্কুলে দিতে এলে না। তোমার সাথে আমার বিষেদ। তুমি যাও এখান থেকে। পাপ্পাকে আসতে বলো।'


দিয়া বিচ্ছেদ বলতে চেয়েছিলো। এটা সে প্রায় কথায় ব্যবহার করে। নবনী এর মানে সহসাই না বুঝলেও ধারনা করতে পারলো। শব্দটা যেন নবনীর বুকে তীরের ফলার মতো বিঁধল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এইটুকু একটা শিশু কতটা অভিমান জমিয়ে রেখেছে তা ভেবে নবনীর চোখ ভিজে এল। সে দিয়ার মাথায় হাত রেখে বলল,


'খুব সরি সোনা মাম্মা আমার। কাল থেকে রোজ মাম্মা তোমাকে স্কুলে নিয়ে আসবে। প্রমিস করছি। এখন লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে একটু ওষুধটা লাগিয়ে দিতে দাও তো।'


'নেভার!'


'আমি বললেও না?'


গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে দিয়া একবার মুখ তুলে তাকাল কিন্তু পরক্ষণেই আবার অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিল। দিব্য এসে দাঁড়িয়েছে। নবনী স্বস্তির শ্বাস নিলো। দিব্য মেয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার মান ভাঙানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু নবনীর কাছে সেই মুহূর্তটা যেন স্থবির হয়ে গেল। তার পায়ের নিচের মাটি কাঁপছে। দিব্যর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে নবনীর সমস্ত শরীর হিম হয়ে এল। অসীম! সে এখানে কীভাবে? অসীমও স্তম্ভিত। সে তার বসের সাথে কোনো জরুরি কাজে বেরিয়েছিল কিন্তু নিজের বসের মেয়ের স্কুলে এসে তার প্রাক্তন প্রেমিকা নবনীকে দেখবে তা ছিল তার কল্পনাতীত। দিব্য দিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার রক্তিম চোখ দুটো স্থির হলো অসীমের ওপর। শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় সে বলল,


'অসীম, ইনি তোমার ম্যাডাম, মিসেস দিব্য তালুকদার। কালই উনার বিয়ে হয়েছে আর আজকে সব ফেলে উনি এখানে। তুমি খুব ভালো করেই জানো, আমি দিয়ার ব্যাপারে কতটা সচেতন। আমার পুরো পৃথিবী একদিকে আর আমার মেয়ে একদিকে। স্কুল থেকে যখন বারবার কল আসছিল তখন তোমার উচিত ছিল ফোনটা আমাকে দেওয়া কিংবা অন্তত নিজে রিসিভ করা।'


অসীম দিশেহারা বোধ করল। প্রবল এক অস্বস্তিতে বারকয়েক শুকনো ঢোক গিলল সে। কাঁপাকাঁপা গলায় শুধু বলল, 


'আই অ্যাম সরি, স্যার।'


দিব্য একবার নবনীর দিকে চাইল। তার দৃষ্টিতে এক দুর্ভেদ্য গাম্ভীর্য। নিজেকে সংযত করে সে আবারও অসীমকে উদ্দেশ্য করে বলল, 


'মনে রেখো, দিয়া আমার মেয়ে। ওর সমস্ত দায়ভার আমার। আগেও আমিই দেখতাম, পরেও আমিই দেখব। আমার মেয়ের দায়িত্ব আমি অন্য কারো ওপর চাপাতে পারি না। তাই ভবিষ্যতে ওর কোনো বিষয়ে দায়িত্বহীনতা আমি বরদাস্ত করব না।'


অসীমের ভেতরটা জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিল। দিব্যর কথাগুলো আজ তীরের মতো তার গায়ে বিঁধছে। এই রাগ কি অপমানের নাকি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নবনীকে দেখে সেটা সে নিজেও জানে না। যে মেয়েটিকে কাল সে আভিজাত্যের দোহাই দিয়ে ছুঁড়ে ফেলেছিল, আজ সে তার পরম শ্রদ্ধেয় বসের স্ত্রী! এই চরম সত্যটা হজম করা তার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। নবনীর কানে যেন কোনো শব্দই পৌঁছাচ্ছে না। এই মানুষটার মুখোমুখি হওয়া মানে তার কাঁচা ঘায়ে লবণের ছিটে দেওয়া। দিব্য ম্যাডামের সাথে আরও কিছুক্ষণ কথা বলল। দিয়ার হাতে ঔষধ লাগালো। অতঃপর পর বেরিয়ে যেতে নিয়ে ও গম্ভীর কণ্ঠে নির্দেশ দিলো,


'অসীম, ম্যাডামকে নিয়ে এসো।'


নবনী যেন রোবটের মতো নিজের ভারী শরীরটা টেনে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। অসীম ড্রাইভিং সিটে, আর দিব্য তার পাশের সিটে। দিয়াকে পেছনের সিটে নবনীর পাশে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছোট দিয়া এখন একদম স্বাভাবিক। নবনী কেবল জানালার বাইরে চেয়ে রইলো। গাড়ির ভেতরের থমথমে নীরবতা ভাঙল দিয়ার চঞ্চলতায়। আচমকাই সে নবনীর হাতটা ধরে সজোরে একটা ঝাঁকুনি দিল। ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকা নবনী চমকে উঠল। নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল। দিয়া বড় বড় চোখ করে নবনীর দিকে তাকিয়ে বলল,


'তুমি কি স্যাড হয়ে গেছো? আমি তোমাকে বকেছি বলে কি তোমার রাগ হয়েছে? দেখো, পাপ্পা বলে বড়রা তো ভালোর জন্যই বকে তাই স্যাড হতে নেই। ওসব তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে হয়। আমি নিজেও তো তোমার ওপর খুব এংরি ছিলাম কিন্তু দেখো আমি কেমন সব ভুলে গেছি!'


নবনী দিয়াকে টেনে নিজের কোলে তুলে নিলো। তার দুই গালে চুমু খেল। তারপর দিয়ার সেই চোট পাওয়া হাতের তালুতে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,


'আমি একটুও রেগে নেই সোনা। আমি শুধু খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভাবছিলাম আমার ছোট মা-টা বুঝি আমার সাথে সারাজীবনের মতো আড়ি করে দিল! এখন আমি একা একা কী করব? কিন্তু তুমি বড় হলে কি রে?'


দিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, 


'ইশ, তুমি কত ভীতু! দিয়া একদম ব্রেভ গার্ল, বুঝলে? আর দাদু বলে আমি বুড়ি। এবার বলো বড়ো আগে নাকি বুড়ি? আচ্ছা, তোমার চোখে কী হয়েছে?'


নবনী তড়িঘড়ি করে হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে ফেলল। ধরা গলায় সামলে নিয়ে বলল, 


'আসলে চোখে কিছু একটা পড়েছে সোনা, তাই ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিলাম না।'


দিয়া মাথা নেড়ে বলল, 'কিন্তু আমি তো সব দেখতে পাই। আমার চোখ খুব পাওয়ারফুল। আমি কিন্তু আমার চোখ কাউকে দেব না!'


[গল্প সবার আগে পেতে পেজে ফলো দিয়ে রাখবেন। আর অবশ্যই মতামত জানাবেন।]

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url