#পর্ব-৬( সমাপ্ত পর্ব)
#আমিনুর রহমান
সেদিনের পর থেকে আমার নতুন এক জীবন শুরু হয়। আমি যে মানুষটাকে মন থেকে চাইতাম কিন্তু বলতে পারতাম না কখনো,এখন সে মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে প্রতিরাতে ঘুমাই। আমার প্রতিটা সকাল শুরু হয় আমার প্রিয় মানুষের নিষ্পাপ মুখটা দেখে। সবসময় দেখে এসেছি বউ তাঁর জামাই এর ঘুম ভাঙায় কিন্তু আমার ক্ষেত্রে উল্টা। আমার ঘুম ভাঙায় আমার জামাই,আমি যতোবার অভিমান করি ততবারই সে কোনো না কোনো ভাবে আমার পাহাড় সমান অভিমানটা ভাঙিয়েই ছাড়বে। আমিও মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে অভিমান করি। কারণ আমি জানি ,আমি হাজার বার অভিমান করলেও কেউ একজন আমার অভিমান ভাঙাবে। এমন একজন মানুষ থাকলে অভিমান না করে পারা যায়? যায় না।
কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে যখন আমি সূর্যের মিষ্টি রোদের হলুদ আলোয় বসে মগ্ন হয়ে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম জীবন কতো সুন্দর। আমরাই জীবনটাকে জটিল করে ফেলি। আবিরের সাথে যখন বিচ্ছেদ হয় তখন বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছে হতো না। কিন্তু এখন যখন হাসানের সাথে আছি তখন মরতে ভয় হয়। আমার মনে হয় এতো ভালোবাসা রেখে আমি মরেও শান্তি পাবো না। হঠাৎ করেই তখন আমি মাথা ঘুরে পড়ে যাই। জ্ঞান ফেরার পরে হাসপাতালের বেডে নিজেকে আবিষ্কার করি। চোখ খুলতেই দেখি হাসান আমার হাত ধরে খুশি মনে বসে আছে। আমি যখন হাসানকে জিগ্যেস করলাম কি হয়েছিলো আমার?
তখন সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
"তুমি মা হতে চলেছো। আমি বাবা হবো।"
হাসানের কথা শুনে আমার চোখে জল এসে গেলো। আমার অতীত আমাকে নাড়া দিলো। এই সন্তানের জন্যই তো আমার পাঁচ বছরের সংসার ভেঙে গিয়েছিলো। তবে ভালোই হয়েছে। সেদিন বুঝেছিলাম খারাপ সময়ে মানুষ চেনা যায়। আমিও চিনেছিলাম।
বাবা মা যখন জানতে পারলো আমি মা হতে চলেছি তখন তারা আর দেরি করেনি। হাসপাতালেই আমাকে দেখতে এসেছিলো। আমি হাসানকে রেখে বাপের বাড়ি চলে যাই। হাসানকে এতো করে বলার পরেও সে আমার সাথে আসলো না। তাঁর নাকি কি কাজ আছে। কয়েকদিন পরে আসবে। আমিও তাকে জোর করলাম না। কারণ আমি জানি সে কাজ শেষ করেই আমার কাছে চলে আসবে।
কয়েক মাস পর আমি ছেলে সন্তানের মা হলাম। সবাই খুব খুশি। বাবা মা,ভাই,ভাবি সবাই আমার ছেলে হওয়াতে অনেক খুশি হয়েছে। হাসান বোধয় সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে। আমি ছেলেটাকে সবসময় এভাবেই হাসিখুশি দেখতে চাই। যে মানুষটা আমার দুঃখের জীবনটাকে এতো সুখ দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে সে মানুষটার জন্য আমি যাই করি না সেটাই কম হবে।
তিন বছর পর শহরে এসেছি। আজ আমার জীবনে সবকিছুই আছে। আমি একজন আদর্শ স্বামী পেয়েছি। সে আমাকে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার দিয়েছে। আমাকে একটা সন্তান দিয়েছে। একটা বাচ্চা একজন মায়ের কাছে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা শুধু আমিই জানি। আর সেটা যদি হয় সংসার ভাঙার কারণ তাহলে তো কোনো কথায় নেই।
হঠাৎ করেই বহুদিনের চেনা পরিচিত সেই মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে যাই। হ্যাঁ,আবির আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে আমি খুব বেশি অবাক হলাম। আগের সেই সুন্দর চেহারাটা এখন আর নেই। কালের বিবর্তনে চেহারাটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মুখে বড় বড় দাঁড়ি,চুল গুলো এলোমেলো। দেখতে খুব খারাপ লাগছে। আবিরকে দেখা মাত্রই আমি হাসানকে বললাম তুমি ভিতরে গিয়ে বসো আমি আসছি।
কেমন আছো?
- ভালো আছি,তুমি কেমন আছো? তোমার প্রজন্ম রক্ষা করেছো নিশ্চয়।
- না,তুমি চলে যাওয়ার পর আমার জীবনটা নরকে পরিণত হয়েছে। আমি তোমাকে যে কারণে আমার কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম। সেই একই কারণে আমার স্ত্রীও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।
- মানে? বুঝলাম না।
- আমি তাকে সন্তান দিতে পারিনি বলে সে অন্য কারো সাথে চলে গেছে।
- তুমি তো বলেছিলে আমার সমস্যা আছে। তোমার কোনো সমস্যা নেই। তুমি সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা রাখো।
- আমি ভুল করেছিলাম,সমস্যাটা আমারই আমি বুঝতে পারিনি। তাঁর জন্য আমি দীর্ঘ দুইটা বছর ধরে সাজা পাচ্ছি। হয়তো ভবিষ্যতেও পাবো। ওটা কে? তোমার স্বামী।
- হ্যা,আমার স্বামী সন্তান। তাঁর মানে তুমি তোমার দ্বিতীয় বউকে নিয়ে অনেক সুখেই ছিলে।
- হতে চেয়েছিলাম কিন্তু সুযোগ পাইনি। জীবনের প্রথম জিনিসগুলোই বেস্ট হয়। আমি বেস্টকে পেয়েও ধরে রাখতে পারিনি।
- এটা আমি বিশ্বাস করি না।
- কেনো?
- কারণ আমি আমার জীবনে তো প্রথম বার বেস্ট কাউকে পাইনি। দ্বিতীয় বার বেস্ট কাউকে পেয়েছি।
- সেটাও ঠিক। তোমার ছেলেটা অনেক সুন্দর।
- জানি।
- আমার জন্য তোমার খারাপ লাগছে? খারাপ লাগাটায় স্বাভাবিক। আমাকে দেখে সবারই খারাপ লাগে।
- তেমন কিছু না। তোমাকে দেখে খারাপ লাগবে কেনো? আমি তোমাকে অনেক আগেই ভুলে গিয়েছি। আমার স্বামী আমাকে এতো বেশি ভালোবাসা দিয়েছে যে তোমাকে মনে রাখার কোনো চান্সই নাই।
- তুমিও বুঝি তোমার স্বামীকে অনেক ভালোবাসো?
- বাসবো না কেনো? নিজের থেকেও বেশি বাসি। ততোটাই ভালোবাসি যার বেশি আর ভালোবাসা যায় না। আজকে একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করছে।
- কি কথা?
- তুমি তো একসময় বলেছিলে তোমার প্রজন্ম রক্ষা করতে হবে,তাঁর জন্য তোমার একটা নিজের বাচ্চা দরকার। তোমার বাবা মাও তোমার সাথে তাল মিলিয়েছিলো। এখন কিভাবে তুমি তোমার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষা করবে?
- তুমি কি আমাকে এখনো ঘৃণা করো?
- তোমাকে ভালোবাসার মতো কোনো কারণ আছে? তোমার মতো মানুষকে ঘৃণা না করে উপায় আছে। তোমাকে একটা সাজেশন দিচ্ছি।
- কি?
- তুমি আবার বিয়ে করো। তারপর তোমার বউকে একরাতের জন্য অন্য কারো কাছে রেখে আসো। তাহলেই তো তোমার প্রজন্ম রক্ষা হবে। দুনিয়ার সবাই জানবে বাচ্চাটা তোমার শুধু তুমি জানবে বাচ্চাটা অন্য কারো। খুব রাগ হচ্ছে আমার কথা শুনে না? আমারও হয়েছিলো যেদিন তুমি আমাকে বলেছিলে অন্য পুরুষকে দিয়ে সন্তান জন্ম দিতে। একটা কথা মনে রেখো কিছু কিছু জিনিস সৃষ্টিকর্তা মানুষদের হাতে দেন না। সন্তান জন্ম দেওয়াটাও তেমন। এটা আমাদের হাতে থাকে না। যে জিনিসগুলো মানুষের হাতে থাকে না সেই জিনিসগুলোর জন্য কাউকে এতো বড় কষ্ট দেওয়া উচিত না। কিন্তু তুমি দিয়েছিলে। কি সুখ পেয়েছো তুমি? কোনো সুখই পাওনি। কাউকে অকারণে দুঃখ দিয়ে এই পৃথিবীতে খুব মানুষই সুখী হতে পেরেছে।
আমি চলে আসি। আমি জানি আমার কথা গুলো আবিরের ভিতরটাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। কিন্তু আমাকেও খেয়েছে। আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছিলাম শুধুমাত্র এই দিনটার জন্য। আমার মনের ভিতর যে ক্ষত গুলো জমা হয়েছিলো আজ সব বের করে দিয়েছি। হয়তো আবির ভাবছে আমি তাঁর কাটা ঘায়ে লবণ ছিটিয়ে দিলাম। তাতেও আমার দুঃখ নেই। আমি যে তাকে আমার ভিতরের কথা গুলো শোনাতে পেরেছে। তাকে বোঝাতে পেরেছি,দেখাতে পেরেছি। সে আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাঁর জীবন থেকে বের করে দিলেও আমি মরে যাইনি। আমি তাকে ছাড়াও সুখী হয়েছি, বাচ্চার মা হয়েছি। সে এটা দেখে সারাজীবন অনুতপ্ত হবে। এটাই বা কম কিসে?
হাসান আমাদের ছেলে অয়নকে নিয়ে বসে আছে। অয়ন তাঁর বাবার কোলে বসে হাসছে। ছেলেটাও তাঁর বাবার মতো হয়েছে। ছেলেটার হাসিও তাঁর বাবার মতো। আমি যেমন হাসানের হাসি দেখে মুগ্ধ হই,আমি নিশ্চিত আমার ছেলের হাসি দেখেও হাজার হাজার মেয়ে মুগ্ধ হবে। হাসানকে বলেছিলাম এখনি আসবো কিন্তু অনেক দেরি করে ফেলেছি। সে তো আমার ওপর অভিমান করে না কখনো। কিন্তু কেনো জানি মনে হচ্ছে আজ করবে। আমিও চাই সে খুব অভিমান করুক। সে যেমন আমার অভিমান ভাঙায় আমিও আজ তাঁর অভিমান ভাঙাবে।
স্বামী আর বাচ্চাকে এতো সময় কেউ বসিয়ে রাখে?
- বসিয়ে রেখেছি তো কি হয়েছে?
- কিছু হয়নি।
- ধুর তুমি এমন কেনো? এতো ভালোবাসো কেনো আমায়?
- আমি আবার কি করলাম?
- আমি তোমাকে দুই মিনিটের কথা বলে দশ মিনিট বসিয়ে রাখলাম। তুমি আমার ওপর রাগ করবে না? অভিমান করবে না? এটা কোনো কিছু হলো?
- পারি না তো। আমি চাইলেও তোমার ওপর রাগ করতে পারি না।
- আমার বুঝি অন্য সব মেয়ের মতো নিজের স্বামীর রাগ ভাঙাতে ইচ্ছে করে না?
- আমি তোমার এই ইচ্ছেটা হয়তো বা কোনোদিন পূরণ করতে পারবো না।
- কেনো পারবে না?
- কারণ আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসতে পারি,তোমার ওপর রাগ কিংবা অভিমান করার ক্ষমতা বিধাতা আমাকে দেয়নাই।
- এতো ভালোবাসা কোথায় রাখবো?
- আমাকে দিও।
কথাটা বলেই হাসান আমার হাত ধরে বলল, এখন চলো যে কাজের জন্য এসেছি সেটা করি।
-অয়নের জন্মদিনে তো অয়নকে উপহার দিবে,সামনে যে আমার জন্মদিন আসছে সে খেয়াল আছে?
-হ্যাঁ আছে।
-আমাকে কি দিবে?
-তুমি কি চাও?
-আমার কিছু চাই না। অয়নের জন্য একটা বোন চাই। দিবে তো?
কথাটা বলেই নিজের অজান্তেই আমি হেসে দেই। আমার হাসি দেখে অয়নও হেসে দেয়। অয়নের হাসি দেখে হাসানও হেসে দেয়। আবার সেই পাগল করা মনমাতানো হাসি। যেই হাসিতে লক্ষ কোটিবার আমি মুগ্ধ হয়েছি,এখনো হচ্ছি,ভবিষ্যতেও হবো।
সমাপ্ত।
