#পর্ব-৪
#আমিনুর রহমান
আমি আমার মনের কথা গুলো নিজের মনের মধ্যেই গোপন রাখি। কেনো জানি মুখফুটে হাসানকে বলতে পারি না। আমার খুব রাগ হয় তাঁর ওপর। সে কি আমার ভিতরটাকে উপলব্ধি করতে পারবে না কখনো? বুঝতে পারবে না তাকে একজন মানুষ খুব করে ভালোবাসতে চায়। সে কেনো বারবার তাঁর প্রতি আমাকে এতো মুগ্ধ করছে। আমি তো তাঁর প্রতি আর মুগ্ধ হতে চাই না। আমি শুধু এখন আমার প্রতি তাকে মুগ্ধ করতে চাই। কিন্তু কি এমন আছে আমার যা দেখে কোনো মানুষ মুগ্ধ হবে,হাসান মুগ্ধ হবে? আমার সবকিছুই তো নষ্ট করে ফেলেছি। তাকে মুগ্ধতা উপহার দেওয়ার মতো কোনো কিছুই যে অবশিষ্ট নেই আমার। তবুও তাকে আমি এমন কিছু দিতে চাই যেটা দেখে সে মুগ্ধ হবে,সে হাসবে। হাসতে হাসতে একসময় কাঁদবে। তবে সে কান্নাটা হবে সুখের কান্না। আমি তাঁর চোখের জল মুছে দিয়ে বলবো।
"তুমি কাদঁছো কেনো? তুমি কাঁদলে একজন মানুষের ভিতরটা জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় সেটা কি তুমি জানো? তোমার চোখের পানিতে কোনো একজন মানুষের হৃদয়ে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায় সেটা কি তুমি জানো? তোমার চোখের জলে কেউ যে খুব কষ্ট পায় সেটা কি একবারও ভেবে দেখেছো তুমি? তুমি আর কখনো কাঁদবে না। সুখেও না,দুঃখেও না। আমি তোমাকে কাঁদতে দেখতে পারি না। বলো তোমার কি চাই আমার কাছে। তোমার সব সুখের কারণ হবো আমি,সব ভালো লাগার কারণ হবো আমি। কখনো তোমার কষ্টের কারণ হবো না। শুধু একবার বলো তোমার কি চাই।"
ওমনি হাসান আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করবে। আমি তাঁর কানে ফিস ফিস করে বলবো এই ছেলে কাঁদছো কেনো? একটুও কাঁদবে না। কাঁদলে তোমাকে খুব জঘন্য দেখায়। এই ফাঁকে আমি তাঁর কানের একপাশে নিজের নরম ঠোঁঠের স্পর্শ দিবো। সে আমার নিষিদ্ধ ঠোঁঠের ছোঁয়া পেয়ে কিছুটা কেপে উঠবে,তাঁর সমস্ত শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরায় ঠাণ্ডা শীতল অনুভূতি অনুভব করবে। সে আর সহ্য করতে পারবে না। আমাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে। আমার ঘাড়ে তাঁর ঠোঁটটা ছুঁইয়ে দিবে,তাঁর পবিত্র চুম্বনে আমার দেহটা আবার সেই আগের মতো বিশুদ্ধ হয়ে যাবে। আমিও অনুভব করবো এক স্বর্গীয় সুখের অনুভূতি।
এমন একটি দিনের জন্যই বোধয় আমি এখনো বেঁচে আছি। না হলে কবেই মরে যেতাম। এমন ভালোবাসার মানুষ রেখে কেউ মরতে পারে?
হয়তো সবাই পারবে কিন্তু আমি পারবো না। আমি হাসানের ভালোবাসাটা নিজের করে পাওয়ার জন্য হলেও আর কিছুটা দিন বেঁচে থাকতে চাই। তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার আগেই যদি আমি এই সুন্দর পৃৃথিবী ছেড়ে চলে যাই তাহলে হয়তো আমার থেকে দুর্ভাগা আর এই পৃথিবীতে একটিও থাকবে না।
আমি বিয়ের পর এই প্রথম নিজ থেকে হাসানের সাথে কথা বলতে যাচ্ছি। এর আগে কখনো তাঁর সাথে আমি ইচ্ছে করে কথা বলিনি কিন্তু আজ বলবো। আমার তাঁর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হয়,তাঁর পাশে বসে তাঁর হাত ধরে গল্প করতে মন চায়। আমার এই ইচ্ছে গুলো হলো জীবন্ত। আমি চাইলেও এই ইচ্ছে গুলোকে কখনো কবর দিতে পারবো না। আমি যতদিন বেঁচে থাকবো আমার মনের মধ্যে ততদিন আমার এই ইচ্ছে গুলোও জীবন্ত থাকবে। এখন আমার কেনো জানি মনে হয় সব মেয়ের জীবনেই বোধয় ঘোড়ায় চড়ে রাজুকমার আসে না,তাকে তাঁর রাজকন্যা বানিয়ে নিজের রাজমহলে নিয়ে যায় না। কিছু কিছু মেয়েকে নিজের রাজুকমারকে নিজেরই খুঁজে নিজের করে নিতে হয়। আমাকেও আমার স্বপ্নের রাজুকমারটাকে নিজের করে নিতে হবে। তবে আমার রাজুকমারটা খুঁজতে হবে না। আমিই তাকে এতোদিন চিনতে পারেনি,বুঝতে পারিনি এই সহজ সরল মানুষটাই আমার গল্পের রাজুকমার। সব গল্পে না হয় রাজপুত্র তাঁর রাজকন্যাকে এক সমুদ্র ভালোবাসা উপহার দিয়ে নিজের মনের রাজত্ব লিখে দেয়। আমার গল্পে না হয় রাজকন্যাই রাজপুত্রকে নিজের মনের রাজত্ব লিখে দিবে। তবুও তো সে আমার স্বপ্ন পুরুষ,আমার জীবন সংসারের রাজুকমার। যাকে নিয়েই আমি আমার জীবন সংসারের প্রতিটা অধ্যায় পাড়ি দিতে চাই।
আমি যখন হাসানকে বললাম,
"আপনি কিন্তু বলেছিলেন আমাকে এই পল্লী প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভরা গ্রামটা ঘুরিয়ে দেখাবেন। আপনি কিন্তু আপনার কথাটা রাখেননি। আপনি এমন কেনো? কথা দিয়ে কথা রাখেন না"।
তখন হাসান আমার কথা শুনে এমন ভাব করলো যে,মনে হলো আমি সাত আসমান থেকে নেমে এসেছি তাঁর সাথে কথা বলার জন্য। আর তাই হয়তো সে অনুনয় ভরা নিরীহ কণ্ঠে বলল,
আমার মনে ছিলো না। কিছু মনে করবেন না। আসলে অনেক কাজের মধ্যে থাকি তাই হয়তো ভুলে গেছি অথচ এটা আমার মনে রাখা উচিত ছিলো কিন্তু আমি পারিনি। সেদিন আপনি যখন বললেন স্কুলে বাচ্চাদের পড়াবেন সেই খুশিতে সব ভুলে গিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করবেন। তবে এখন আর ভুলবো না। কালকে সারাদিন আপনাকে এই গ্রামটা ঘুরিয়ে দেখাবো। যতো খুশি মন ভরে দেখবেন।
- আপনাকে যদি আমি তুমি করে বলি তাহলে কি আপনি রাগ করবেন? আপনি মনে হয় আমার থেকে ছোটই হবেন। কেনো জানি আপনাকে আপনি বলতে ভালো লাগে না। তুমি বলতে ইচ্ছে হয়।
- যতোটা ছোট ভাবছেন ততোটাও কিন্তু ছোট না আমি। হিসেব করলে দেখা যাবে খুব বেশি হলেও হয়তো ছয় সাত মাসের ছোট হবো। আর মানুষ তুমি তো সবাইকে বলে না। যারা খুব কাছের মানুষ তাদেরকেই কেবল তুমি বলা যায়। আমি তো আপনার কাছের কেউ না। কাগজে কলমে কাছের হলেও মনের দিক থেকে অনেক দূরের। তবুও যদি আপনি তুমি করে বলেন আমি কিছু মনে করবো না।
হাসান যখন কথা গুলো বলল তখন আমার ভিতরটা ভিজে গেলো। সে কি আমাকে কোনোদিন বুঝবে না। আমি তাকে কেনো তুমি করে বলতে চাই? আমি যে এখন আর পারি না। আমারও যে কাউকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে,ইচ্ছে করে আরও একবার কারো বুকে চাষাবাদ করি ভালোবাসার। আমি নিজের চোখের জলটাকে আড়াল করে হাসানকে বললাম,
"আমার আপনি বলতে ভালো লাগে না। আমি এতো হিসাব কিতাব বুঝি না,আর কখনো বুঝতেও চাই না। আমি আপনাকে তুমি করে বলবো। কাছের কিংবা দূরের নাকি সেটা আমি জানতে চাই না। শুধু জানি যে মানুষটা আমার থেকে ছোট আমি তাকে আপনি বলবো না। তুমি করেই বলবো। এমন নাতো যে তুই করে বলছি।
হাসান একটু হেসে বলল,আচ্ছা বইলেন,সমস্যা নাই। তবে আমি কিন্তু আপনাকে আপনি করেই বলবো।
আবার সেই পাগল করা হাসি। ছেলেরা কেনো এতো সুন্দর করে হাসবে? মেয়েদের হাসি সুন্দর হবে,কোনো ছেলের হাসি এতো সুন্দর হওয়া উচিত না। কিন্তু এই ছেলেটার হাসি কেনো এতো ভালো লাগে আমার? এটার উত্তর আমি জানি না।
পরক্ষণেই মনে হলো ছি,আমি কি করে এটা করলাম? আমার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। আমি কেনো তাকে তুমি বলবো? সে তো প্রথমে না বলেছিল। তারপরেও আমি নির্লজ্জের মতো তাকে আবার অনুরোধ করি। আমি কেনো এমন করলাম? নিজের আত্মসম্মানটা আমি নিজের কাছেই ছোট করলাম। আবার মনে হলো এই পৃথিবীতে শুধুমাত্র প্রিয়জনের একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মানুষ কতো কি করে,কতো জঘন্য কাজ করে। আমি তো তেমন কিছু করিনি। শুধু তাকে তুমি বলতে চেয়েছি। নিজের ভালোবাসার মানুষের কাছে তো একটু নির্লজ্জ হওয়াই যায়। আমি তো আর জোর করে তাকে চুমু খাইনি। শুধু একটু ভালোবেসে আদর করে তুমি করে বলবো। পৃৃথিবীর যতো রকম আদর আছে সবগুলোতেই তুমি সম্বোধন করতে হয়। আপনি বললে সেটা কেনো জানি আদর মনে হয় না। ন্যাকামি মনে হয়। আমি কোনো ন্যাকামি করতে চাই না। আদর করতে চাই। কি আশ্চর্য! এমন কি কখনো হয়েছে? বউ স্বামীকে তুমি করে বলবে আর স্বামী বউকে আপনি করে বলবে। কি একটা বিশ্রী ব্যপার হবে। তবুও আমার কোনো কারণে ভালো লাগছে। অদ্ভুত সব চিন্তায় বিভোর হয়ে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম বুঝতেই পারলাম না।
ঘুম ভাঙলো সকাল নটার সময়। জানালা দিয়ে সূর্যের মিষ্টি আলোটা গায়ে এসে পরছে আমার। খুব ভালো লাগছে আমার,আরও ভালো লাগতো যদি হাসান আমার পাশে বসা থাকতো। কিন্তু সে নেই। ঘুম থেকে উঠেই কোথায় যেনো চলে গেছে। হয়তো বাজার করতে চলে গেছে। আজকের সকালটা আমার কাছে খুব সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে আমার চব্বিশ বছরের জীবনে এতো সুন্দর সকাল আগে কখনো দেখিনি আমি। অথচ কতো শত সকাল আমি আমার প্রথম ভালোবাসার মানুষের সাথে কাটিয়েছি সেটা কারোর অজানা নয় কিন্তু আজকের সকালটার কাছে সেসব অগণিত সকাল গুলোকে খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছে আমার। এই স্নিগ্ধময় মনোমুগ্ধকর সকালটার সাথে আমাকেও কি খুব সুন্দর লাগছে না আজ? কিন্তু এই কথাটা বলার মতো কেউ নেই আমাকেও আজ খুব সুন্দর লাগছে। হাসান হয়তো আমার দিকে নিজের বউ এর দৃষ্টিতে কখনো তাকায় না। তাকালে নিশ্চয় সেও বলতো,
" আজ তোমাকে খুব খুব সুন্দর লাগছে। ইচ্ছে করছে আবারও তোমার প্রেমে পড়ি। তোমার চোখে চোখ রেখে আমার পৃথিবীটাতে নতুন করে দেখি"।
#জীবন_সংসার
#পর্ব-৫
#আমিনুর রহমান
একগাদা বাজার করে নিয়ে এসেছে হাসান। সেগুলো এখন রান্না করছে সে। আমি তাঁর থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে তাকে দেখছি। একটা ছেলেও যে এতো ভালো রান্না করতে পারে কখনো জানা ছিলো না। কিন্তু এই ছেলেটা পারে। হয়তো বা বাস্তবতা তাকে বাঁধ্য করেছে। আমি যদি কখনো রান্না না করি তাহলে সে আমাকে কোনো কারণে জিগ্যেসও করবে না কেনো রান্না করি নি। নিজেই চুলায় ভাত বসিয়ে দিবে। আজকে আমাকে নটার পরেও বিছানায় দেখে নিজেই রান্না করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। আমি বিছানা থেকে রান্না ঘরে উকি দিতেই হাসান দেখতে পায়। তখন থেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর মেয়েলী কাজকর্ম গুলো দেখছিলাম।
সকালে খাওয়ার সময় যখন বললাম,
তুমি এতো ভালো রান্না কার কাছ থেকে শিখেছো? তুমি তো আমার থেকেও ভালো রাঁধতে পারো।
-কারো কাছ থেকে শিখিনী,কেউ তো ছিলো না কখনো রান্না করে দেওয়ার মতো। তাই নিজেকেই করতে হয়।
-এখন থেকে আমি রান্না করবো। তোমাকে রান্না করতে হবে না।
-হাহাহাহা, আপনি রান্না করবেন? আপনি তো কখনো দশটার আগে ঘুম থেকেই উঠেন না।
-হাসছো কেনো? খুব খারাপ দেখাচ্ছে।
-আচ্ছা হাসবো না।
-আজকে কিন্তু আমাকে গ্রাম ঘুরিয়ে দেখানোর কথা। মনে আছে তো?
-হ্যাঁ মনে থাকবে না কেনো? একটু পরেই বের হবো। সারাদিন ঘুরবেন।
বিয়ের পর আজ প্রথম আমি শাড়ি পড়েছি। নীল শাড়ি। অনেকটা দিন পর আজ খুব সুন্দর করে সেজেছি। মনে হয়েছে কেউ একজন আছে যার জন্য আমাকে সবসময় পরিপাটি রাখা দরকার। হাসান আজকে আমাকে দেখে মুগ্ধ হবে কি? নাকি অন্য সব দিনের মতোই খুব সাধারণ ভাবেই আমার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিবে। কিন্তু না,হাসান আমাকে দেখে কিছুটা সারপ্রাইজ হলো। সে আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে দেখছে। চোখের পলক ফেলানোর কোনো নাম নেই। এই প্রথম সে এতোটা ভালো লাগা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে অাছে। আমার খুব ভালো লাগছে আমি তাকে নিজের প্রতি কিছুটা হলেও মুগ্ধতা উপহার দিতে পেরেছি। যখন দেখলাম সে কিছু বলছে না,আমার দিকে শুধু তাকিয়ে আছে তখন আমি তাকে বললাম,
"কি হলো? কি দেখছো ওমন করে"?
আমার কথা শুনে সে তাঁর ভাবনার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে বর্তমানে ফিরে বলল,
"কিছু না,আপনি আজ শাড়ি পড়েছেন। কেনো জানি চোখ ফেরাতে পারছি না। খুব সুন্দর লাগছে আপনাকে"।
হাসানের এই একটা কথা শুনে যে আমার ভিতরে কতোটা ভালো লাগা কাজ করেছে সেটা হয়তো আমি পাঠকদের বুঝাতে পারবো না। নিজের স্বামীর কাছ থেকে যখন কোনো মেয়ে এরকম কিছু শুনে তখন তাঁর যতটুকু ভালো লাগে তার থেকে হাজার গুন ভালো লাগছে আমার। আমি সবসময় ভেবেছি কি এমন অাছে আমার? যা হাসানকে দেওয়া যায়। যেটা দেখে সে মুগ্ধ হবে। কিন্তু আমি খুঁজে পাইনি। আজ না চাইতেও তাকে আমি আমার প্রতি মুগ্ধ করতে পেরেছি। এটাই বা কম কিসে?
গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে শাড়ি পড়া সুন্দরী একটা মেয়ে খুশি মনে হাঁটছে। তাঁর পাশে খুব সাধারণ একজন মানুষ তাকে সঙ্গ দিচ্ছে। মাঝে মাঝে সবাই কেমন করে যেনো তাকাচ্ছে। হয়তো বা অনেকে জানেই না এরা দুজন স্বামী স্ত্রী। হাসান আমাকে নতুন নতুন জিনিস দেখাচ্ছে,চিনাচ্ছে। যেগুলোর নাম আমি জানি না সেগুলোর নাম হাসান আমাকে বলছে। হঠাৎ করেই দেখলাম জলবতী বিল। সেই বিলে শত শত শাপলা সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি নিজের অজান্তেই হাসানকে বললাম,
" কি সুন্দর দৃশ্য। আমার ইচ্ছে করছে এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যটা নিজের হাতে ছুঁই। নেমে যাই বিলে।"
তখন হাসান বলল,আসুন। সামনে নৌকা আছে। আপনার ইচ্ছেটা পূরণ হবে।
- আমি তো সাঁতার জানি না। যদি ডুবে যাই তাহলে তো মরে যাবো।
-হাহাহাহা, মরবেন না। আমি সাঁতার জানি। আপনি কি করে ভাবলেন আমি থাকতে আপনি পানিতে ডুবে মারা যাবেন?
- আমি মরলেই বা তোমার কি? আমি তোমার কে হই? আমি তো আর তোমার আপন কেউ না।
- অনেক কিছুই হবে। আপনি মরে গেলো তো আমি একা হয়ে যাবো। আমি তো আর বিয়ে করতে চাই না। জীবনে বিয়ে তো একটাই।
- আমি তো তোমাকে নিজের স্বামীর অধিকার কখনো দেইনি। বউ হিসেবে যা করা দরকার সেটাও করছি না। তবুও আমার জন্য এতো চিন্তা কেনো?
- করেন নি তো কি হয়েছে? তাই বলে কি আমি করবো না। এমনটা তো না। আমি আপনাকে যেদিন কবুল বলে বিয়ে করেছি সেদিন থেকে নিজের হৃদয়ে জায়গা দিয়েছি। আপনি আমাকে যেমনই ভাবেন না কেনো আমি কখনো আপনাকে বিপদের মধ্যে ফেলে যেতো পারবো না।
হাসান নৌকার বিপরীত পাশে বসে নৌকা চালাচ্ছে। আমি পানিতে ফুটে থাকা শাপলা গুলো মুগ্ধতা নিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছি। এমন করেই যদি হাসান সবসময় আমার পাশে থাকে তাহলে আর কিছু চাওয়ার নেই আমার। এই প্রথম আমার মনে হচ্ছে আমার পাশে কেউ একজন আছে যে আমাকে এতো সহজেই মরতে দিবে না। হঠাৎ করেই আমার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি আসলো। আমার মনে হলো এটাই সুযোগ তাঁর স্পর্শ পাওয়ার,এটাই সুযোগ তাকে কাছে পাওয়ার। আমি কিছুক্ষণ পর ইচ্ছে করেই নৌকা থেকে পানিতে পড়ে গেলাম। যদিও আমার ভয় করছিলো আমি তো সাঁতার জানি না তারপর আবার এতো বড় বিল,পানির গভীরতাও অনেক। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিলো আমি পানিতে পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে হাসান আমাকে বাঁচাবে। সে আমাকে এতো সহজেই মরতে দিতে পারে না সে বলেছে। সে তাঁর কথা রাখবে।
কতো সময় আমি পানিতে ডুবে ছিলাম জানি না। তবে আমি যখন চোখ খুলাম তখন দেখলাম কেউ একজন আমার মুখে মুখ লাগিয়ে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। বুঝতে পারলাম হাসান। সে যখন বুঝতে পারলো আমার জ্ঞান ফিরেছে তখন সে আমার থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলো।
"আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি এটা করতে চাইনি। আপনি পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন। অনেকক্ষণ ডুবে ছিলেন যার কারণে আপনার পেটে অনেক পানি জমা হয়েছিলো, জ্ঞানও ছিলো না। ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তাই এমনটা করেছি। কোনো খারাপ উদ্যেশ্য নিয়ে আমি এটা করিনি,বিশ্বাস করুন।
হাসান যখন কথা গুলো বলল তথন আমার তাকে বলতে ইচ্ছে করলো,
" ভালো করেছো,খুব ভালো করেছো। নিজের বউকে চুমু খামে না তো কাকে খাবে। আমি তোমার বিয়ে করা বউ। আমার ওপর তোমার অধিকার অাছে। যা করার ইচ্ছে হয় তাই করবে। এটা নিয়ে কেনো তুমি কৈফিয়ত দিবে?"
কিন্তু আমি বলতে পারলাম না।
কোনো কথা না বলে আমি হাঁটা ধরলাম। হাসান আমার পেছনে পেছনে আসছে। আমার ভাবতে বড় ভালো লাগছে হাসানও আমাকে চায়। তাঁর মনের ভিতর সে আমাকে খুব যত্ন করে রেখেছে সেটা আমি বুঝতে পেরেছি দেরিতেও হলেও। কিন্তু কেউ কাউকে কথাটা বলতে পারছি না।
এই ঘটনার পর হাসানের সাথে আমার প্রায় দুইদিন তেমন কোনো কথা হলো না।
আজ অনেকদিন পর বুষ্টি খুব ভালো লাগছে আমার। হাসানকে যখন সাহস করে বললাম,
" এই ছেলে চলো ছাদে যাই। বৃষ্টিতে ভিজবো আমি। ভিজবে আমার সাথে"?
তখন হাসান কিছু বলল না। বুঝলাম তাঁর খুব একটা ইচ্ছে নেই। তবুও সে কিছুসময় পর বলল আচ্ছা চলেন।
বৃষ্টিতে ভেজার সময় আমার কি হয়েছিলো আমি জানি না। আমি যখন হাসানকে বললাম এতো দূরে দাঁড়িয়ে অাছো কেনো? একটু কাছে আসলে কি এমন হয়?
তখন হাসান আমাদের মাঝের দূরত্বটাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে আমার খুব কাছে আসলো। সে কাছে আসলেই আমি তাঁর হাত ধরে ফেলি। সে কিছু বলে না। হঠাৎ করেই আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়,আর আমিও ভয় পাওয়ার অভিনয়ে হাসানকে জড়িয়ে ধরি। হাসানও বোধয় নিজেকে সেদিন সংযত রাখতে পারেনি। তাই হয়তো সেও আমাকে পরম আদরে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলো। তারপর সেদিন আমরা নতুন ভাবে দুজন দুজনকে ভালোবাসতে শুরু করি। আমার সমস্ত শরীরে আমি তাঁর শীতল স্পর্শ অনুভব করি। একসময় আমরা ঘরে চলে আসি। বিছানায় শুয়ে পড়ি একজন আরেকজনকে ভালোবাসার জন্য।
চলবে.............. পরের পর্ব গুলা এখানেই দিছি।
