#অস্তরাগের_রঙ
#তেজরিন_উম্মীদ
(২)+৩
🚫❌কোন প্রকার ডায়ালগ বা সিন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫❌
ফারাজ যখন খান বাড়িতে পা রাখল, তখন তার চোখেমুখে আগুন ঝরছে। ড্রয়িং রুমে ঢুকেই সে একপ্রকার যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিল। তার চিৎকারে পুরো খান বাড়ি যেন ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল। রাইমা খান ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ফারাজের কানে তখন কোনো কথাই ঢুকছে না। তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সুযোগ পেলে সে মাইকিং করে পুরো এলাকাকে নিজের অপমানের কথা জানিয়ে দেবে।
দাঁতে দাঁত চেপে ফারাজ গর্জে উঠল,
"আম্মি! তোমাদের পছন্দের মেয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছ না ? আস্ত একটা বাচাল মেয়ে! কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই নুন্যতম শিক্ষা নেই তার। ভাবতে পারো আম্মি, ওই মেয়ে সরাসরি আমাকে রিজেক্ট করে দিয়েছে? হেহ! আমাকে রিজেক্ট করার সাহস পায় কোত্থেকে ও? কী লেভেলের বেয়াদব হলে একটা মেয়ে মুখের ওপর বলতে পারে— আমি আপনাকে রিজেক্ট করছি!"
ছেলের এমন রূপ দেখে রাইমা খানের ভ্রু কুঁচকে গেল। রুশদী যদি সত্যিই সরাসরি এমন কথা বলে থাকে, তবে কাজটা সে মোটেও ঠিক করেনি। তিনি ধীরকণ্ঠে শুধালেন,
"রুশদী কি সত্যিই তোমাকে সরাসরি এই কথা বলেছে?"
"হ্যাঁ আম্মি! তোমার আদরের হবু পুত্রবধূ আমার মুখের ওপর বলে দিয়েছে সব। তার নাকি আমাকে পছন্দ হয়নি। কারণ কী জানো? আমি নাকি বুড়ো! তার থেকে দশ বছরের বড় বলে আমি বুড়ো লোক! লাইক সিরিয়াসলি আম্মি? আমি বুড়ো? আমার টিনেজ লাইফটাই তো ঠিকঠাক শেষ হলো না, আর এই মেয়ে বলে আমি বুড়ো!" ফারাজের কণ্ঠ দিয়ে যেন তখনো আগুন ঝরছিল।
ছেলের জেদ সম্পর্কে রাইমা খান ভালোভাবেই জানা। একবার যদি সে বেঁকে বসে, তবে তাকে ফেরানো অসম্ভব। তিনি নরম গলায় বললেন, "আচ্ছা, আমি রুশদীর সাথে কথা বলছি। তুমি আপাতত শান্ত হও তো।"
"কিসের শান্ত হব আম্মি? ওই মেয়ে আমাকে অপমান করেছে। আমি ওকে কোনোভাবেই বিয়ে করব না, ব্যস!"
রাইমা খান পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও বললেন, "বললাম তো আমি দেখছি বিষয়টা..."
কিন্তু কার কথা কে শোনে! মায়ের আশ্বাস ফারাজের কানেই পৌঁছাল না। সে নিজের উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
"কিসের কথা আম্মি? ওই মেয়েকে আমি বিয়ে করছি না মানে করছি না। এখন ওই মেয়ে যদি আমার পা ধরেও মাফ চায়, তবুও আমি তাকে মাফ করব না। আস্ত একটা মেন্টাল মেয়ে! ন্যূনতম কমন সেন্স নেই ওর মধ্যে..."
ফারাজের রাগ মেশানো কথা গুলো ড্রয়িং রুমের দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়তে লাগল।আর রাইমা খান চুপ করে গেলেন ভাবলেন এই ছেলে সে বুঝাবে কি করে।
চিৎকার করতে করতেই ফারাজের চোখ আটকে গেল সোফায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকা শের-এর ওপর। ছেলেটি মাথা নিচু করে মন খারাপ করে বসে আছে। বাবার নেওয়া এই সিদ্ধান্তে পুচকি শের-এর মনটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তার ছোট্ট মনে তখন একটাই হাহাকার—বাবা কেন ওই মম এর সাথে এমন রুড ব্যবহার করে এলো? এখন যদি রুশদী মম বাবাকে বিয়ে না করে, তবে এই পুচকি শেরটা আর কোনোদিন মা পাবে না।
ফারাজ দুই কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালো। শের-এর বিষন্ন মুখটার দিকে তাকিয়ে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নিজের যত রাগই থাকুক না কেন, এই কলিজার টুকরা শের-এর মলিন মুখ দেখলে ফারাজের পৃথিবীটা এলোমেলো হয়ে যায়। ফারাজের সমস্ত জেদ আর অহংকার যেন ছেলের ওই এক ফোঁটা মন খারাপের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়।এই ছেলের জন্য ফারাজ সব করতে পারে... সব!
রাইমা খান ফারাজের দৃষ্টি লক্ষ্য করে শান্ত স্বরে বললেন, "আর কিছু বলবে?"
ফারাজ এবার কিছুটা উদাসীন ভঙ্গিতে মায়ের দিকে তাকাল। তার গলার স্বর আগের চেয়ে অনেক বেশি নরম হয়ে এসেছে। সে বলল, "ওর মন খারাপ দেখলে আমি সব কথা গুলিয়ে ফেলি আম্মি।"
রাইমা খান সুযোগটা হাতছাড়া করলেন না। তিনি ধীর পায়ে ছেলের কাছে এসে বললেন, "তুমি তো জানো রুশদীকে ও-ই পছন্দ করেছে। আমরা কেউ তো রুশদীকে চিনতামই না। ও নিজে এসে রুশদীর কথা বলল বলেই আমরা খোঁজখবর নিয়েছি। জীবনে প্রথমবার ও কাউকে নিজের মা বলে মেনে নিয়েছে ফারাজ। এখন তোমার জেদের কারণে রুশদীর সাথে বিয়েটা না হলে শের বচেয়ে বেশি কষ্ট পাবে। এখন বাকিটা তুমিই ভেবে দেখো।"
এটুকু বলেই রাইমা খান ফারাজকে নিজের চিন্তার সাগরে ডুবিয়ে রেখে ঘর থেকে চলে গেলেন। ফারাজ বড় করে একটা শ্বাস টেনে নিজেকে কিছুটা সামলে নিল। তারপর ধীর পায়ে সোফায় বসে থাকা শের-এর কাছে গিয়ে তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। শের তখনও মুখ নিচু করে অভিমানী হয়ে বসে আছে। ফারাজ তার ছেলের ছোট্ট হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু খেল। এরপর ভ্রু উঁচিয়ে আদুরে গলায় শুধাল, "তুমি কেন মন খারাপ করে আছো, পাপা?"
শের কোনো উত্তর দিল না, মাথাও তুলল না। ফারাজ আবার আদর মাখা স্বরে ডাকল, "কেন মন খারাপ পাপা?"
এবার শের খুব ভাঙা গলায় প্রশ্ন করল, "হোয়াই ওয়্যার ইউ রুড টু রুশদী মম, পাপা?"
ফারাজ অপরাধীর মতো মাথা নুইয়ে বলল, "আই এম সরিপাপা।"
শের-এর দুশ্চিন্তা তখনো কাটেনি। সে আবারও প্রশ্ন করল, "হোয়াট ইফ রুশদী মম ডাজ ন্ট ম্যারি ইউ নাউ?"
ছেলের আকুতি দেখে ফারাজ নিজেকে আর সামলাতে পারল না। সে আশ্বাস দিয়ে বলল, "আমি সব ঠিক করে দেবো। এখন তুমি খুশি?"
বাবার মুখে আশার বাণী শুনে শের এবার মুখ তুলে তাকাল। তার মলিন মুখটা মুহূর্তেই খুশির ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, "সত্যি বাবা? সত্যি তুমি ওকে নিয়ে আসবে?"
ছেলের এই স্বর্গীয় হাসিটুকু দেখেই যেন ফারাজ এর দেহে প্রাণ ফিরে পেল। এই একটুখানি হাসির জন্য ফারাজ দুনিয়ার সব অসম্ভবের সাথে লড়াই করতে রাজি। ফারাজ হাসিমুখে হ্যা সূচক মাথা নাড়ে। অমনি খুশিতে আত্মহারা হয়ে শের ঝাঁপিয়ে পড়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরল। ফারাজও পরম মমতায় ছেলেকে বুকে টেনে নিল।
শের তার বাবার কানে কানে ফিসফিস করে বলল, "থ্যাংকস পাপা। দেয়ার ইজ নো ওয়ান লাইক ইউ; ইউ আর দ্য বেস্ট ফাদার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।লাভ ইউ পাপা। "
--
রেস্টুরেন্ট থেকে ফিরে রুশদী কাউকেই কিছু জানায়নি। নাহিদা বেগম তাকে হাজারটা প্রশ্ন করে ত্যক্তবিরক্ত করলেও সে মুখে কুলুপ এঁটে ছিল। বাড়ি ফিরেই সে যন্ত্রের মতো নিজের কাজে মগ্ন হয়ে পড়ল। বাইরে পোশাক বদলে একটা সাধারণ সুতি থ্রিপিস পরে নিয়েছে সে। ওড়নাটা কোমরে শক্ত করে পেঁচিয়ে,বাসন মাজতে থালা-বাসন পাহাড়সম স্তূপের সামনে গিয়ে দাড়ালো। কল ছাড়তেই সাবান-পানির ফেনা ছিটকে এসে তার পেটের কাছে জামাটা ভিজিয়ে দিল। কাজের মাঝেই কপাল থেকে চুইয়ে পড়া ঘাম মুছতে গেলে হাতের ফেনা মেখে গেল কপালে, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।
হঠাৎ ড্রয়িং রুম থেকে নাহিদা বেগমের চড়া গলা রুশদীর কানে এলো
"আচ্ছা, আপনি কোনো টেনশন করবেন না বিয়ান, আমি সবটা দেখছি।"
রুশদী বুঝতে পারল, খান বাড়ি থেকে ফোন এসেছে। নিশ্চয়ই এতক্ষণে ফারাজ তার কীর্তির কথা সব জানিয়ে দিয়েছে। মনে মনে রুশদী একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।যাক, বিয়েটা তবে ভেঙেই যাচ্ছে। এটাই তো সে চেয়েছিল।
এরই মধ্যে রান্নাঘরে নাহিদা বেগমের পদধূলি পড়ল। স্বাস্থ্যবতী এই মহিলার ফর্সা মুখটা রাগে এখন টকটকে লাল। তিনি এক হাত কোমরে দিয়ে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রুশদীর দিকে। রুশদী আড়চোখে তা দেখেও না দেখার ভান করে কাজে মন দিল। মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল, 'ডাইনিটা কেমন তাকিয়ে আছে! ইচ্ছে করছে হাতের কড়াইটা দিয়ে এক বাড়ি মেরে মাথাটা দু’ভাগ করে দিই।'
"রেস্টুরেন্টে কী হয়েছে?" নাহিদা বেগমের কণ্ঠস্বর সাপের ফোঁসফানির মতো শোনাল রুশদীর কাছে।
রুশদী নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলল, "কী আর হবে? কিছুই হয়নি।"
"তবে ফারাজকে তুই কী বলেছিস?"
"যা বলার তাই বলেছি। বলেছি—আমি তাকে বিয়ে করতে পারব না।"
কথাটা শেষ হতে না হতেই নাহিদা বেগম চিতার মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন রুশদীর ওপর। এক হ্যাঁচকায় রুশদীর চুলের মুঠি ধরে তাকে ঘুরিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
"তুই বিয়ে করবি না? তোর ঘাড় করবে! তুই যদি এই ছেলেকে বিয়ে না করিস, তবে তোকে আমি জ্যান্ত আগুনে পুড়িয়ে মারব। এটা কি মামার বাড়ির মোয়া পেয়েছিস যে চাইলেই বিয়ে ভেঙে দিবি? তুই এই বিয়ে না করলে আমার ছেলের বিদেশে পড়তে যাওয়া হবে না, আমাদের ব্যবসাও ডুববে। এত সহজে আমি এই সোনার ডিম পাড়া হাঁস হাতছাড়া করব না সোনামণি! তোকে এই বিয়ে করতেই হবে।"
রুশদী নিজেকে ছাড়ানোর কোনো চেষ্টা করল না। সে দাঁতে দাঁত চেপে অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে নিল। কিন্তু তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা। সে ধীর স্বরে বলল,
"আমি মরে গেলেও এই বিয়ে করব না।"
"তুই মরলে দরকার হলে তোর লাশের সাথেই ওই ছেলের বিয়ে দেব আমি! মন্ত্রীর ছেলে বলে কথা, এই সুযোগ আমি কিছুতেই হাতছাড়া করব না।"
এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে রুশদী। তার দুচোখেও তখন ব আগুন। ঝাঝালো কণ্ঠে সে সাফ জানিয়ে দিল,
"বললাম তো, আমি বিয়ে করব না মানে করব না! আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না।"
নাহিদা বেগম দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, "তেজ দেখাস? তোর তেজ আমি এক নিমেষেই বের করে দিচ্ছি। এই বিয়ে না করে তোর নিস্তার নেই।"
"এই ছেলেকে যদি আপনার এতই পছন্দ, তবে নিজেই বিয়ে করে নিন না! আমাকে কেন বারবার বলছেন?"
"কী বললি তুই, হারামজাদি!" নাহিদা বেগমের রাগের বাঁধ ভেঙে গেল।তিনি পশুর মতো হিংস্র হয়ে রুশদীর চুলের মুঠি আঁকড়ে ধরলেন এবং সর্বশক্তি দিয়ে তার মাথাটা পাশের দেয়ালের সাথে সজোরে আঘাত করলেন। একবার নয়, দুই-তিনবার বিরামহীনভাবে রুশদীর মাথাটা দেয়ালে ঠুকে দিলেন তিনি। ফলস্বরূপ, মুহূর্তেই রুশদীর কপাল ফেটে গলগল করে রক্ত ঝরতে শুরু করল। তীব্র যন্ত্রণায় রুশদী আর্তনাদ করে উঠল, "ও মা গো!"
সেই বুকফাটা চিৎকার শুনে ড্রয়িং রুম থেকে ছুটে এলেন আনাস হক এবং রুশদীর সৎ ভাই নাহিদ। নাহিদ দ্রুত গিয়ে মায়ের হাত থেকে বোনকে ছাড়িয়ে নিল। রক্ত বন্ধ করার জন্য সে নিজের হাত দিয়ে রুশদীর ক্ষতস্থানটা চেপে ধরল, কিন্তু ততক্ষণে রুশদীর শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। চোখ দুটো আপনা আপনি বন্ধ হয়ে আসছে, সে জ্ঞান হারানোর উপক্রম।
নিজের মেয়ের এমন রক্তাক্ত অবস্থা দেখেও পাষাণ বাবা আনাস হক টু শব্দটিও করলেন না। তিনি কেবল নির্বাক দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। নাহিদা বেগম তখনও রাগে ফুঁসছেন, "এখন বল, বিয়ে করবি কি না? বিয়ে তোকে করতেই হবে!"
অর্ধচেতন অবস্থায়, মরণাপন্ন যন্ত্রণার মাঝেও রুশদী অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল, "ম... মরে গেলেও বিয়ে করব না।"
তার মুখে জেদের কথা শুনে নাহিদা বেগম আবারও তাকে আঘাত করতে উদ্যত হলেন, কিন্তু এবার নাহিদ ঢাল হয়ে দাঁড়াল। সে তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে অস্থির হয়ে বলল, "আব্বু, দাঁড়িয়ে কী দেখছেন? ওকে ধরুন! প্রচুর রক্ত পড়ছে, এখনই হাসপাতালে নিতে হবে। দেরি হলে সিরিয়াস কিছু হয়ে যাবে!"
নাহিদ আর আনাস হক ধরাধরি করে রুশদীকে হাসপাতালের দিকে নিয়ে গেলেন।
সত্যিই, আনাস হকের মতো বাবা মেলা ভার। পৃথিবীর বুকে জন্মদাতা পিতার এমন নির্লিপ্ততা যেন এক বিস্ময়।নিজের গর্ভধারিণী মা-ও যদি কোনো সন্তানের সাথে এমন আচরণ করত, তবে যেকোনো বাবার পৌরুষ আর মমতা হয়তো রুখে দাঁড়াত, নয়তো প্রতিবাদে গর্জে উঠত। কিন্তু সেখানে একজন সৎ মা মেয়েটাকে এমন ভয়ংকর আঘাত করলো , অথচ আনাস হক একটি টু শব্দ পর্যন্ত করলেন না। নিজের রক্তকে এভাবে অন্যের হাতে কষ্ট পেতে দেখেও যার রক্ত হিম হয় না, তাকে বাবা বলে ডাকাও যেন পিতৃ শব্দের অবমাননা।
----
মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ নিয়েই আজ কলেজে এসেছে রুশদী। সামনে তার এইচএসসি পরীক্ষা, তাই এই মুহূর্তে কোনোভাবেই ক্লাস মিস দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে নাহিদা বেগম বলেছিলেন রুটি বানিয়ে রেখে যাওয়ার জন্য, কিন্তু রুশদী সেসবের তোয়াক্কা না করেই নাস্তা না বানিয়েই কলেজে চলে এসেছে। সে জানে, বাড়ি ফেরার পর কপালে নির্ঘাত জুটবে অমানুষিক নির্যাতন কিংবা বিষাক্ত সব কটু কথা। কিন্তু রুশদী এখন আর সেসব নিয়ে ভাবতে চায় না।
দুপুর একটা। আকাশ থেকে যেন আগুনের ঝরছে, সূর্যের তেজ আজ বড্ড বেশি প্রখর। কপাল ফাটা থাকার কারণে আগে থেকেই মাথার ভেতরটা টিসটিস করে ব্যথা করছিল, তার ওপর রুশদীর আছে পুরনো মাইগ্রেনের সমস্যা। তীব্র রোদ সেই যন্ত্রণাকে যেন তিনগুণ বাড়িয়ে দিল। প্রতিদিন সে হেঁটেই বাড়ি ফিরে,কিন্তু আজ এই অবস্থায় হাঁটা তার পক্ষে অসম্ভব। এই রোদে রাস্তায় যেকোনো সময় জ্ঞান হারানোর সম্ভাবনা আছে। তাই কলেজ ছুটি হতেই সে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো রিকশার জন্য। ছুটির সময় হওয়ায় গেটে ছাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, এর মধ্যে অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থেকেও সে একটা খালি রিকশা পেল না। তীব্র মাথাব্যথায় তার চোখের সামনে পৃথিবীটা যেন ঝাপসা হয়ে আসছে।
হঠাৎ রুশদী অনুভব করল, একটা নরম আর ছোট্ট হাত তার বাম হাতটা জাপ্টে ধরেছে। যন্ত্রণায় কুঁচকানো চোখে সে নিচের দিকে তাকাল। দেখল, বছর চার-পাঁচেকের একটি বাচ্চা ছেলে তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি মাথা উঁচু করে রুশদীর দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসল।তার সেই নিষ্পাপ হাসিতে সব কটি ছোট ছোট দাঁত ঝিলিক দিয়ে উঠল।
রুশদী ছেলেটিকে চেনে না, কিন্তু তার মনে পড়লো এ তো সেই মায়াবী ছেলেটি! গতকাল রেস্টুরেন্টে ফারাজের সাথেই সে এই বাচ্চাটিকে দেখেছিল। কিন্তু এই ভরদুপুরে ফারাজের ছেলে এখানে কী করছে? বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে রুশদী যন্ত্রণাকাতর চোখে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তীব্র মাথাব্যথা উপেক্ষা করেই রুশদী বাচ্চাটির সাথে কথা বলার জন্য একটু নিচু হলো। কোমল স্বরে শুধাল, "তোমার নাম কী, বাবু?"
ছেলেটি উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে উত্তর দিল, "শেহরান খান শের।"
রুশদী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "তুমি এখানে কী করছো একা একা?"
শের একগাল হেসে উত্তর দিল, "তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি মম!"
'মম!'শব্দটা রুশদীর কানে পৌঁছাতেই সে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল। এই পুচকি ছেলেটা তাকে 'মা' বলে ডাকছে! সে অবাক হয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল, "তুমি কাকে মম বলছো?"
"তোমাকে! আচ্ছা, এখন কথা না বলে চলো তো আমার সাথে,"
বলেই শের তার ছোট্ট হাতে রুশদীর হাত ধরে টানতে শুরু করল। রুশদী বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে ছেলেটির কাণ্ড দেখছিল।সে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়েই বলল, "কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমাকে?"
"আহা, চলোই না!"
অগত্যা রুশদীও ছেলেটির পিছু পিছু হাঁটতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড হাঁটার পর তারা কলেজ রোডের মোড়ে এসে থামল। সেখানে একটি দামি গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফারাজ। পরনে তার খয়েরি রঙের শার্ট আর ঢিলেঢালা কালো প্যান্ট। দুপুরের কড়া রোদ থেকে বাঁচতে চোখে কালো সানগ্লাস পরেছে সে। তবে তার চোখেমুখে একরাশ বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
শের রুশদীকে নিয়ে সোজা ফারাজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, কিন্তু তখনও সে রুশদীর হাতটা ছাড়েনি। ফারাজকে দেখামাত্রই রুশদীর বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে ফেলল। ফারাজও পাল্টা বিরক্তি প্রকাশ করে কোনো কথা না বলে গটগট করে গাড়িতে গিয়ে বসল।
শের তৎক্ষণাৎ পেছনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। কিন্তু রুশদী তখনও বাইরের কড়া রোদে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। তাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ডাকল, "মম, ভেতরে এসো!"
'মম' ডাকটা রুশদীর কানে কেমন এক অদ্ভুত সুরের মতো শোনাল। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাচ্চাটার ওপর সে রাগ করতে পারল না। এই ছেলেটার চেহারায় কী এক মায়া আছে, যা মুহূর্তে যে কারো মন গলিয়ে দিতে সক্ষম। রুশদী ভেতরে যাওয়ার কোনো আগ্রহ না দেখিয়েই জিজ্ঞেস করল,
"কোথায় যাব আমি?"
গাড়ির ভেতর থেকে ফারাজের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো, "তোমাকে নিয়ে পাচার করে দেব না, এটুকু নিশ্চিত থাকো।"
ফারাজের কথা শুনে রুশদীর রাগ সপ্তমে চড়লেও সে নিজেকে সামলে নিল। মাইগ্রেনের যন্ত্রণায় তার মগজ তখন ছিঁড়ে যাচ্ছে, এই অবস্থায় ঝগড়া করার মতো শক্তি বা ইচ্ছে কোনোটি-ই তার নেই। এরই মধ্যে শের আবার তার হাত টেনে আবদার করল,
"এসো না মম!"
রুশদী শের-এর চোখের দিকে তাকাল। সেই আকুতিভরা দৃষ্টির এক অদ্ভুত টানে সে আর না বলতে পারল না। যন্ত্রচালিত মানুষের মতো সে গাড়িতে উঠে বসল। রুশদী বসা মাত্রই কোনো কথা না বাড়িয়ে ফারাজ গাড়ি স্টার্ট দিল।
ফারাজ গাড়ির লুকিং গ্লাসে পেছনে বসে থাকা রুশদীর দিকে এক পলক তাকাল। সাদা কলেজ ড্রেস, পরিপাটি করে করা বেণি।সবই ঠিক আছে, কিন্তু তার কপালে ধবধবে সাদা ব্যান্ডেজ দেখে ফারাজের ভ্রু কুঁচকে গেল। গতকালও তো মেয়েটা দিব্যি ছিল, তবে হঠাৎ কী হলো? ব্যান্ডেজের ওপর দিয়ে লাল রক্তের ছোপ দেখা যাচ্ছে, যা দেখে বোঝা যায় আঘাতটা বেশ গুরুতর। ফারাজ মনে মনে ভাবল, ‘যাক, ভালোই হয়েছে। এই বেয়াদব মেয়েটার এমন একটা শিক্ষা হওয়া দরকার ছিল।’
ঠিক সেই মুহূর্তে রুশদীও লুকিং গ্লাসে তাকাল এবং দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। ফারাজ দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলেও রুশদী তাকে বিড়বিড় করে কী যেন গালি দিল।
এদিকে শের রুশদীর কপালে হাত রেখে বিষণ্ণ গলায় শুধাল, "তোমার মাথায় কী হয়েছে মম? খুব লেগেছে?"
রুশদী আলতো করে শের-এর মাথায় হাত বুলিয়ে ম্লান হেসে বলল, "কিছু হয়নি , এমনি একটু লেগেছে।"
ফারাজ গাড়ি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে বারবার আয়নায় রুশদীর ওই ব্যান্ডেজ করা মাথার দিকে তাকাচ্ছিল। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছে। নিজেকে আর সামলাতে না পেরে অবশেষে সে গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করেই ফেলল, "তোমার মাথায় ব্যান্ডেজ কেন? কী হয়েছে?"
রুশদী মনে মনে বিরক্ত হলো। সব তো এই লোকের জন্যই! কাল রেস্টুরেন্টে একে অপমান করার দায়েই তো সৎ মায়ের হাতে মার খেয়ে এই দশা হতে হয়েছে তার। এখন আবার দরদ দেখিয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে! রুশদী তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, "আপনাকে রিজেক্ট করার সৎ মা পুরস্কার হিসেবে আদর দিয়েছে।"
ফারাজ অবাক হয়ে বলল, "তোমার মা মেরেছে?"
রুশদী বলল, "জি?"
ফারাজ আয়নায় তাকিয়ে হাসির ছলে বলল, "তোমার মা তো দেখছি বেশ ডিয়ারিং মহিলা!"
রুশদী এবার রাগে জ্বলে উঠল। ,
" আপনারও কি আমাকে মারার ইচ্ছে আছে?"
"হোয়াট?" ফারাজ হকচকিয়ে গেল।
রুশদী ঝাঝালো কণ্ঠে যোগ করল, "সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালান। বারবার পেছনে তাকাতে গিয়ে নিজে তো মরবেনই, আমাকেও সাথে নিয়ে মরবেন!"
আসলে ফারাজের ওই চাহনি রুশদীকে খুব অস্বস্তিতে ফেলছিল। সেই অস্বস্তি ঢাকতেই সে কথাটা বলে ফারাজের ওপর দোষ চাপিয়ে দিল। ফারাজ আর কথা বাড়াল না, তবে তার দৃষ্টি তখনো মাঝে মাঝে আয়নায় স্থির হয়ে যাচ্ছিল।
-
রুফটপ রেস্টুরেন্টের খোলা বাতাসেও গরম ভাব টা কাটছে না। শের খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে অন্য টেবিলে বসেছে, যাতে ফারাজ আর রুশদী নিজেদের মধ্যে কথা বলার সুযোগ পায়। কিন্তু রুশদীর চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি। সে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে, যেন এখান থেকে পালাতে পারলেই বাঁচে।
অবশেষে নীরবতা ভেঙে রুশদী রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন করল, "আমাকে এখানে কেন এনেছেন?"
ফারাজ শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলল, "তোমার সাথে একটা শান্তি চুক্তি করতে।"
"কিসের শান্তি চুক্তি?" রুশদীর কণ্ঠে উপহাস।
"তুমি আমাকে বিয়ে—"
ফারাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই রুশদী তড়িৎ
বেগে বলে উঠল, "কালকেই তো বলে দিয়েছি, আমি আপনাকে বিয়ে করব না। ব্যাস, কথা এখানেই শেষ।"
ফারাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত রেখে,
"দেখো, আমি এখানে তোমার সাথে ঝগড়া করতে আসিনি।"
"আপনার কি মনে হয়, আমি আপনার সাথে ঝগড়া করার জন্য মরিয়া হয়ে আছি " রুশদীর পাল্টা জবাব।
"প্লিজ, একটু শান্ত হয়ে কথা বলো।"
"পারব না।"
ফারাজ এবার একটু কড়া গলায় বলল, "দেখো মেয়ে, তেরামিতে তুমি আমার সাথে অন্তত পারবে না। তাই এই ত্যাড়া কথাগুলো বাদ দাও। আর শোনো, কালকের ব্যবহারের জন্য আমি দুঃখিত। সরি।"
রুশদী যেন আকাশ থেকে পড়ল। ভ্রু কুঁচকে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, "আপনি আমাকে 'সরি' বললেন? ঠিক শুনলাম তো?"
ফারাজ দাঁতে দাঁত চেপে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে আবারও বলল, "হ্যাঁ, সরি! এখন শুনতে পেয়েছ?"
রুশদী এবার একটু হেলান দিয়ে বসল, মুখে জয়ের হাসি।
"হ্যাঁ, এবার স্পষ্ট শুনেছি। মেজাজটা একটু শান্ত হলো। এবার বলুন, কী বলবেন?"
"তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?" ফারাজ সরাসরি
প্রশ্নটা ছুড়ে দিল।
"না।"
বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে রুশদী মানা করে দিল।
ফারাজের ভেতরটা অপমানে রি রি করে উঠল। সে আজ নিজের স্বভাবের বাইরে গিয়ে প্রথম কারো সাথে এত নমনীয় সুরে কথা বলছে, আর এই মেয়ে তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে যাচ্ছে! শেরের মুখ চেয়ে সে তবুও দমে গেল না।
ধৈর্য ধরে ফারাজ বলল, "একটু ভেবে দেখো।"
"সব জায়গায় আমি আমার দামি ব্রেনটা খরচ করি না," রুশদীর সপাট জবাব।
'ব্রেন থাকলে তো ইউজ করবে বেয়াদব মেয়ে।
ফারাজ মনে মনে গালমন্দ করলেও মুখে শুধু বলল,
"দেখো!"
"আপনাকে দেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই।"
ফারাজ এবার মরিয়া হয়ে উঠল, "আমার কথাটা তো শোনো!"
"আমি কানে একটু কম শুনি।"
"রুশদী, বোঝার চেষ্টা করো ।"
"দেখুন, আমার ম্যাট্রিক্সের স্যার সবসময় বলতেন
আমি নাকি একটু কম বুঝি। সুতরাং আপনার কথা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই।"
ফারাজ নিজেকে শান্ত রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল, "দেখো, তুমি আমাকে যেমনটা ভাবছ, আমি কিন্তু আসলে তেমন নই।"
রুশদী চোখ বড় বড় করে বলল, "কেন? আপনি কি থার্ড জেন্ডার?"
ফারাজের ধৈর্যের বাঁধ এবার চিড় ধরল, "তুমি কিন্তু লিমিট ছাড়াচ্ছো!"
রুশদী নির্লিপ্ত স্বরে বলল, "আমি লিমিট ছাড়ানোর পর আপনার সাথে কথা বলা শুরু করেছি। তাই বলে লাভ নেই।"
ফারাজ কিছু বলতে গেলেই রুশদী আবারও শুরু করল, "আসলে আপনাদের মতো অহংকারী ছেলেদের আয়নার সামনে দাঁড়ানো উচিত। দেখবেন নিজের চেহারার বদলে সেখানে একটা বিশালাকার ইগো ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। আপনি তো ভাবছেন আপনি হিরো, কিন্তু আমার কাছে আপনার ভ্যালু জিরো!"
ফারাজ এবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, "তোর বিয়ের খেতা পুড়ি! তোর সাথে যতই ভালো ব্যবহার করতে চাচ্ছি, তুই ততই আমাকে জ্বালিয়ে মারছিস। শোন ডাইনি, আমি দরকার হলে কলাগাছকে বিয়ে করব, তবুও তোকে কোনোদিন বিয়ে করব না! সর সামনে থেকে!"
রুশদীও সমান তালে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, "আমিও রাস্তার কোনো পচা মূলাকে বিয়ে করব, তবুও আপনার মতো অসভ্যকে বিয়ে করব না!"
"তোর সাথে ওই রাস্তার মূলা-গাজরই মানায়! এই ফারাজ খান নয়!" ফারাজ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল।
"ইউ...!" রুশদী আঙুল উঁচিয়ে কিছু বলতে চাইল।
ফারাজ তর্জনী উঁচিয়ে গর্জে উঠল, "তোর গুষ্টি ইউ!
তোর মতো ত্যাড়া মেয়েকে আমি দুই টাকায় গুনি না !"
পুরো রেস্টুরেন্টের মানুষ তখন অবাক হয়ে তাদের এই দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড দেখছে।
চলবে....#অস্তরাগের_রঙ
#তেজরিন_উম্মীদ
(৩)
🚫❌কোন প্রকার ডায়ালগ বা সিন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫❌
ঢাকার ব্যস্ত শহরের এক অভিজাত রেস্টুরেন্ট। বাইরের রাজপথে গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো আর হর্নের কানফাটানো আওয়াজ রেস্টুরেন্টের ভিতরেও শোনা যাচ্ছে।মৃদু হলুদাভ আলোয় চারপাশটা বেশ সুন্দর লাগছে।এর মাঝে, মুখোমুখি রাইমা খান এবং রুশদী। রাইমা খানের চোখেমুখে আভিজাত্যের ছাপ আর।রুশদী রাইমা খানের সমানে নিজেকে ভদ্র মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।
দুপুরের ঘটনায় ফারাজ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়ি ফিরে রাইমা খানকে সব বলেছে। ছেলের সেই রুদ্রমূর্তি দেখে রাইমা খান স্থির থাকতে পারেননি। তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন এই মেয়েটির সাথে সরাসরি কথা বলবেন। কেন সে ফারাজের মতো সুপাত্রকে বারবার প্রত্যাখ্যান করছে, তা জানা দরকার। কিন্তু সন্ধ্যায় রুশদীর মুখোমুখি বসে রাইমা খান কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। মেয়েটির শান্ত চাহনি আর মার্জিত আচরণ তাকে মুগ্ধ করছে। তবে কেন সে ফারাজের সাথে এমন করছে? বিয়ে ভাঙার জন্য কি এত অভিনয়?
রাইমা খান কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
"রুশদী, আমার ছেলেকে নিয়ে তোমার কোনো অভিযোগ থাকলে বলতে পারো।"
রুশদী দীর্ঘক্ষণ টেবিলের এককোণে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ছিল। রাইমা খানের কথায় সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার কণ্ঠস্বর বিকেলের ঝরা পাতার শব্দের মতোই মৃদু এবং করুণ শোনাল। সে নিচু সুরে বলল,
"না আন্টি, ওনার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র কোনো অভিযোগ নেই। তিনি যথেষ্ট ভালো মানুষ।"
"তাহলে? তুমি কি অন্য কাউকে পছন্দ করো?"
রুশদী এবারও মাথা নিচু করে নিল। তার দীর্ঘ চোখের পাতাগুলো যেন অশ্রুর ভার সইতে না পেরে নুয়ে পড়ছে। সে ধীরস্থিরভাবে বলল,
"না আন্টি, আপনি ভুল ভাবছেন। তেমন কোনো কারণ নেই। আসলে... আমি এই মুহূর্তে বিয়েটাই করতে চাচ্ছি না।"
রাইমা খান কিছুটা অধৈর্য হয়ে জানতে চাইলেন, "কারণটা কী? ফারাজের মতো ছেলে তো বারবার তোমার দ্বারে আসবে না।"
রুশদী দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার ভেতরের পাথরচাপা কষ্টটাকে বের করে আনল। কম্পিত ঠোঁটে বলল,"আমার বিয়ে হয়ে গেলে... আমার বাবা আর বাঁচবেন না।"
কথাটা শুনে রাইমা খান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে তিনি বললেন,
"আমি যতটুকু জানি, তোমার বাবার সাথে তোমার সম্পর্ক খুব একটা মধুর নয়। এই যে তোমার মা তোমার কপালটা ফাটিয়ে দিল, তোমার বাবা তো নিশ্চয়ই প্রতিবাদ করেননি? তোমার চেয়ে তোমার সৎ মায়ের প্রতিই তার টান বেশি। তোমার বিয়ে হলে তো তিনি বরং খুশিই হবেন। মরার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?"
রুশদী এবার রাইমা খানের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকাল। তার চোখে যেন অতীতের ধুলো জমা স্মৃতির মিছিল ভেসে উঠল। তার চোখের কোণে জমে থাকা জল চিকচিক করছে। একটু সময় নিয়ে সপবলতে শুরু করল সে,
"আন্টি, আমার সৎ মা মানুষ নন, তিনি এক জঘন্য লোভী মহিলা। আমি বাড়িতে আছি বলেই বাবা আজও অন্তত দুবেলা দুমুঠো ঠিকমতো খেতে পারছেন। আমি না থাকলে অযত্নে আর অবহেলায় তিনি না খেয়েই মারা যাবেন। আমি নিশ্চিত জানি, নাহিদা বেগম তাকে কোনোদিন নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবেন না। তিনি প্রচন্ড লোভী এক মহিলা, শুধু টাকার জন্য আমার বাবাকে বিয়ে করেছেন।ব্যবসায় লস করায় এখন বাবার প্রতি তার ব্যবহার রুঢ়। আজ আমাকেও টাকার জন্যই আপনার ছেলের হাতে তুলে দিতে চাইছেন। কাল যদি আমার বাবার চেয়ে আরও বিত্তবান কাউকে পান, তবে বাবাকে ছেড়ে যেতেও তিনি দ্বিধাবোধ করবেন না।"
রুশদীর গলার স্বর কিছুটা বুজে এল, তবুও সে থামল না।"আর আমার বাবা? তিনি তো ওই মহিলার মোহে অন্ধ, এক প্রকার পাগলই বলা চলে। বউ যদি আজ তাকে বলে নিজের কিডনি বিক্রি করে টাকা এনে দিতে, তিনি বোধহয় সেটাই করবেন। এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া বাবার আর কোনো আপনজন নেই। তিনি আমাকে ভালোবাসুক বা না বাসুক, আমার আমার শরীরে তো তার রক্ত বইছে। এই অসহায় লোকটাকে এমন এক নরপিশাচির হাতে একা ফেলে দিয়ে আমি নিজের সুখের কথা চিন্তা করতে পারি না আন্টি। আমি তাকে একা ফেলে যেতে পারব না।বাবা না বাসলেও আমি তাকে বড্ড ভালোবাসি।"
রাইমা খান নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়েটির দিকে। তার মনে হলো, যে মেয়েটি নিজের জীবন তুচ্ছ করে এক স্বার্থপর বাবার কথা ভাবছে, সে তো সাধারণ কোনো মেয়ে নয়।সে এক অন্যরকম ত্যাগের প্রতিচ্ছবি।
রাইমা খান রুশদীর কথা শুনে এটুকু বুঝতে পারলেন, বাবার প্রতি তার ভালোবাসা কতটা গভীর। বাবা যেমনই হোক না কেন, তার প্রতি রুশদীর ভালোবাসা সীমাহীন। রাইমা খান রুশদীর এই ভালোবাসা দেখে কিছুটা সংশয়ে বললেন,
"কিন্তু রুশদী, তোমার বাবা কি তোমাকে ঠিক ততটা ভালোবাসেন যতটা তুমি তাকে বাসো?"
রুশদীর মুখে হালকা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। সে বলল,
"বাবাকে ভালো না বেসে থাকতে পারি না। মাঝে মাঝে খুব রাগ হলেও বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারি না। তিনি যখন মা বলে ডাকেন, তখন মনে হয় বাবা চাইলে নিজের কলিজাও বের করে দিতে পারি। আমার বাবা ছাড়া আমার আপন আর কেউ নেই। তিনি যতই খারাপ হোক না কেন, আমি তাকে ঘৃণা করতে পারি না। জানেন কেন?আগের কথাগুলো খুব মনে পড়ে। এখন বাবা যেমনই হোক না কেন, আগে তো এমন ছিলেন না। আমার কিছু হলে পাগল হয়ে যেতেন। ঘুম না এলে সারারাত মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। কিছু চাওয়ার আগেই হাজির করে দিতেন। সেই বাবা বদলে গেলেও তার ভালোবাসাগুলো আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। আমি আমার বাবাকে অনেক ভালোবাসি।"
রাইমা খান রুশদীর দিকে তাকিয়ে সরাসরি বললেন, "তোমার বাবাকে আমি যতটুকু চিনেছি, তুমি যা বলছ তা সত্যি। তোমার সৎ মা যদি টাকার আবদার করে, তবে তোমার বাবা কিডনি বিক্রি করেও টাকার ব্যবস্থা করে দেবেন। তেমনি তোমার সৎ মায়ের কথা রাখতে তোমাকে বিক্রি করতেও তিনি হয়তো পিছু পা হবেন না। আমি তোমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড জানি, তাই সরাসরি বলছি। এই বিয়েটা হলে তুমি এবং তোমার তথাকথিত স্বার্থপর বাবা দুজনেই সুখে থাকবে।"
রাইমা খানের কথায় রুশদীর খারাপ লাগলেও এটাই বাস্তব। সে চুপ করে রইল। রাইমা খান বুঝতে পারলেন রুশদীর মনের অবস্থা। এত অল্প বয়সে এমন পরিস্থিতিতে থেকেও মেয়েটি নিজেকে অনেক সামলে রেখেছে। বয়সের তুলনায় অনেক ম্যাচিউরড হয়েছে। যে বাবা তাকে নিয়ে ভাবে না, তার বিয়ে হয়ে গেলে সে খেতে পারবে কিনা তা নিয়েও মেয়েটা চিন্তিত। রাইমা খান রুশদীর টেবিলের উপর রাখা ডান হাতটা ধরলেন। সেটা ছিল ভরসার হাত। তিনি বললেন,
"আমার ছেলেটা অনেক ভালো রুশদী। একটু জেদি, কিন্তু ওর জেদের জন্য তুমিই পারফেক্ট। ওর একগুঁয়েমির সাথে কেউ পারে না, সেখানে তুমি এখনই ওর অবস্থা নাজেহাল করে দিয়েছো। ওর অগোছালো জীবনটা তুমি চাইলে গুছিয়ে দিতে পারবে। সাধারণ মেয়ে হলে ওর উপর কথা বলতে পারবে না, কিন্তু তুমি পারবে।তোমাদের কেমিস্ট্রি টা হবে ইট পাটকেলের মত ।"
রাইমা খানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। রুশদীও কিছুটা অনিচ্ছার সঙ্গেই মৃদু হাসল। তারপর অভিযোগের সুরে বলল,
"আপনার ছেলে কিন্তু বড্ড ঝগড়াটে!"
রাইমা খান তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন,
"তুমিও তো কম যাও না বাপু। শের আমাকে সব বলেছে।"
ভদ্রমহিলার অকপট স্বীকারোক্তিতে রুশদী খানিকটা লজ্জা পেল। সেই বিব্রত ভাব কাটাতে সে মৃদু হেসে কফির কাপে চুমুক দিল।
"শোনো রুশদী," রাইমা খান শান্ত গলায় বলতে শুরু করলেন,
"আমাদের লাইফটা অনেক ছোটো। আমরা হর হামেশা আমাদের লাইফের জন্য ভুল সিদ্ধান্ত নি।আমরা প্রায়ই বর্তমানের মোহে আগামিকে হারিয়ে ফেলি। কখনো কখনো আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন পথে পা বাড়াই, যা আমাদের জন্য কাল হয়ে দাড়ায় ফিউচারে। কিন্তু রুশদী, মনে রেখো মানুষ হিসেবে ভুল করা আমাদের স্বভাব। সবচেয়ে বড় ভুল সেটা নয় যা আমরা করে ফেলি, বরং সবচেয়ে বড় ভুল হলো সেই ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়া। আমরা হয়তো সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব না, কিন্তু প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্ত আমাদের নতুন করে চিনতে শেখায়,কাকে বিশ্বাস করতে হয়, আর কোন পথে হাঁটলে নিজের শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। দিনশেষে, আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্তের যোগফলই আমাদের জীবন। "
রুশদী খুব মনোযোগ দিয়ে রাইমা বেগমের কথাগুলো শুনছিল। পঁয়তাল্লিশ ছুঁইছুঁই এই নারী অসম্ভব গুছিয়ে কথা বলেন। তার ব্যক্তিত্বে এক ধরনের আভিজাত্য আছে। পরনের মিষ্টি রঙের শাড়িটা নিখুঁতভাবে কুচি দিয়ে পরা। মাঝখানে সিঁথি করা চুলে ছিমছাম খোঁপা। চোখে টানা কাজল। রুশদী মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। মানুষটা আর তার কথাবার্তা দুটোই ভীষণ পরিপাটি।
এর মাঝেই রাইমা খান কৌতুক মেশানো কণ্ঠে বললেন, "ভয় পেয়ো না, আমি কিন্তু একদম শাশুড়ি মেটেরিয়াল আছি বস!"
রাইমা খানের কথা শুনে এবার রুশদী আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। খিলখিল করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল সে। মেয়েটার হাসি মারাত্মক সুন্দর। ঝরনার স্বচ্ছ জলের মতো সেই হাসি।মুক্তোর দানার মতো শুভ্র দাঁতের ঝিলিক আর চোখের কোণে জমে থাকা হাসির রেখা তাকে এক মায়াবী রূপ দান করল।
হাসি থামলে রাইমা খান প্রশ্ন করলেন, "কী ভাবলে তবে? তোমার মত কী?"
রুশদী সরাসরি রাইমা খানের চোখের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরকণ্ঠে বলল, "আমি বাবাকে একা ফেলে যেতে পারব না।"
রাইমা খান পরম মমতায় রুশদীর মাথায় হাত রাখলেন। স্নিগ্ধ হেসে বললেন, "ঠিক আছে, এখন বাসায় যাও। সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে ভাবো। আমার নম্বরটা নিয়ে যাও, যদি মত বদলাও তবে ফোন কোরো।"
রুশদী অপলক তাকিয়ে রইল রাইমা খানের দিকে। মহিলাটির সান্নিধ্যে কেমন যেন একটা 'মা মা' ভাব মিশে আছে। সন্তান অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেললে মা যেমন প্রদীপ হাতে এসে পথ দেখান, রাইমা খানকেও ঠিক তেমন মনে হচ্ছে। আজ রুশদীর মা বেঁচে থাকলে হয়তো তিনিও তাকে এভাবেই আগলে ধরতেন, দেখিয়ে দিতেন সঠিক কোনো পথ।
--
অলস এক বিকেল। জানলার পর্দা ঠেলে আসা রোদে ফারাজ নিজের ঘরে কার রেসিং গেমে বুঁদ হয়ে আছে। পাশে বসে ছোট শের মনোযোগ দিয়ে ট্যাবে কার্টুন দেখছে। দুজন মহাব্যস্ত নিজ নিজ কাজে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় দেখা দিল এক ছায়া। পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকল ফারাজের ছোট ভাই শাহনান খান, যাকে সবাই ভালোবেসে 'শান' বলে ডাকে। শানের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে বাবা শেহজাদ খান ওকে পড়াশোনার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কাউকে কিছু না জানিয়ে আজ সে হঠাৎ দেশে হাজির। এসেই কানে এসেছে বড় ভাইয়ের বিয়ে ভাঙার খবর। সেই খবর নিয়েই সে সোজা হাজির হয়েছে ফারাজের ঘরে।
ফারাজ কানে হেডফোন গুঁজে টিভির স্ক্রিনে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ব্যস্ত। শান নিঃশব্দে পেছনে দাঁড়িয়ে হুট করে ফারাজের কান থেকে হেডফোনটা টেনে সরিয়ে নিল। চমকে উঠে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল ফারাজ। ছোট ভাইকে সামনে দেখে বিস্ময়ে তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
বিস্ময় সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় ফারাজ শুধাল,
"তুই বাড়ি আসলি কখন? ড্যাড জানে?"
শান সেসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ধার ধারল না। বরং গালভরা হাসি নিয়ে খিকখিক করে হেসে বলল,
"তোমাকে নাকি হবু ভাবি রিজেক্ট করে দিয়েছে? সত্যি নাকি ভাইয়া?"
মুহূর্তেই ফারাজের মুখের ভঙ্গি পাল্টে গেল। আত্মসম্মানে ঘা লাগায় চটা গলায় জবাব দিল, "কে বলেছে তোকে এসব আজেবাজে কথা? এই ফারাজ কি এতই সস্তা যে একটা সাধারণ মেয়ে তাকে রিজেক্ট করবে? আমিই ওই মেয়েকে রিজেক্ট করেছি, বুঝেছিস?"
শান পাক্কা খবর নিয়েই এসেছে। এসব ভুজং ভাজং বুঝ সে আর নিবে না। শান টিপ্পনী কেটে বলল,
"ভাইয়া পাট নিও না তো। আমি সব খবর জেনেই এসেছি।"
"কচু জানিস তুই! আমার রুম থেকে যা এখন,"
ফারাজ প্রায় ধমক দিয়ে উঠল।
শান ভাইয়ের ধমক গায়ে না মেখে বিছানায় বসে থাকা শেরের দিকে এগিয়ে গেল। শের এতক্ষণ কার্টুনে মগ্ন ছিল, হঠাৎ কাউকে সামনে দেখে মাথা উঁচু করে তাকাল। শান চাচুকে দেখতে পেয়েই তার কচি মুখটা এক চমৎকার হাসিতে ভরে উঠল। মুহূর্তেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল শানের ওপর। শানও হেসে তাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ চাচা-ভাতিজার এই নীরব ভালোবাসার পালা চলল।
তারপর শানের গলা ছেড়ে বিছানায় উঠে দাঁড়াল শের। আধো আধো গলায় জিজ্ঞেস করল, "তুমি কখন আসলে চাচু?"
শান হাতের পাঁচ আঙুল মেলে ধরে বলল, "এই তো মাত্র পাঁচ মিনিট আগে।"
শের এবার শানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, "দাদু জানে?"
শানও নাটকীয় ভঙ্গিতে ফিসফিস করে উত্তর দিল, "উঁহু, জানে না।"
শের চোখ বড় বড় করে বলল, "তবে তো তোমার খবর আছে! দাদু এবার তোমাকে পিটনি দিয়ে একদম চাটনি বানিয়ে ফেলবে।"
শান হাসতে হাসতে বলল, "নো প্রবলেম! চাটনি তো তোর খুব পছন্দ। তুই না ইয়াম ইয়াম করে খেয়ে নিস।"
শের হাসি দিয়ে চাটনি খাওয়ার অভিনয় করে বলল, "ইয়াম! ইয়াম! ইয়াম!"
ছোট্ট শেরের কথা শুনে শান হেসে কুটিপাটি হলো। শেরের কপাল আর গালে গোটা পাঁচেক চুমু খেয়ে তাকে আবার বুকে টেনে নিল সে। ঘরটা ভেসে গেল এই দুই দুষ্টু-মিষ্টির খুনসুটিতে।
ফারাজ আড়চোখে চাচা-ভাতিজার এই ভালোবাসার দৃশ্যটি দেখছিল। শেরের ছোট পৃথিবীতে বাবার পরেই যদি কাউকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তবে সে শান। শানও এই ছোট্ট মানুষটিকে ভীষণ ভালোবাসে। কোথাও বের হলে শেরের জন্য উপহার আনাটা শানের কাছে অনেকটা অভ্যাসের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত ছয়টা মাস শান দেশের বাইরে ছিল।প্রতিদিন নিয়ম করে কয়েকশ বার ফোন করে শেরের খোঁজ নিয়েছে।ওদের এই আত্মার টান দেখে ফারাজ মাঝে মাঝে অবাক হয়।
---
ম্যাথমেটিক্স ক্লাস চলছে। লুৎফর স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে খড়খড় শব্দে জটিল সব সমীকরণ কষে যাচ্ছেন, কিন্তু রুশদীর মন সেখানে নেই। সে জানালার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে আছে।একদম শেষ বেঞ্চে বসার স্যার তাকে দেখতে পাচ্ছে না। লাস্ট বেঞ্চে বসার এই এক মজা।
রুশদীর মাথায় সারাক্ষণ রাইমা খানের কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। সে জানে, বাবার মায়াজালে আটকে থাকলে তার নিজের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাবার প্রতি অন্ধ টানে নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দেওয়া মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। তবুও টান সে কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারছে না। এক অদ্ভুত দোটানায় তার ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে।
"রুশদী!"
লুৎফর স্যারের কর্কশ কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল সে। ভাবনার সুতো ছিঁড়ে যেতেই সে হচকচিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। স্যারের চোখের দিকে তাকিয়েই তার বুকটা ধক করে উঠল,নিশ্চয়ই তার অমনোযোগ ধরা পড়ে গেছে। লুৎফর স্যার এই কলেজের সবচেয়ে রাগী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।তাঁর ক্লাসে কেউ অন্যমনস্ক থাকলে তাকে চরম শাস্তি পেতে হয়। স্যারের রক্তিম চেহারার দিকে তাকিয়ে রুশদীর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে কোনোমতে ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
"জি... জি স্যার!"
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে লুৎফর স্যার হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠলেন। বিদ্রুপের হাসি নাকি আনন্দের, তা বোঝার আগেই স্যার প্রশ্ন করলেন,
"তুমি বিবাহিত রুশদী? আর তোমার বাচ্চাও আছে? কই, আগে তো কখনও বলোনি!"
স্যারের কথা শেষ হতে না হতেই পুরো ক্লাস যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সবার কৌতূহলী ও বিস্ময় ভরা চাউনি এখন রুশদীর ওপর। সে নিজেও যেন আড়াইশ ভোল্টের বৈদ্যুতিক শক খেল। অবিবাহিত একটা মেয়ে ক্লাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুনছে সে নাকি বিবাহিত এবং তার এক সন্তানও আছে! মাশাআল্লাহ, বিয়ের আগেই সে মা হয়ে গেল! বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে রুশদী নিজেকে সামলে নিয়ে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ক্লাসের দরজার কাছ থেকে একটা ছোট্ট কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
"হেই মম, হোয়াটসঅ্যাপ!"
মুহূর্তেই ক্লাসের সবার চোখ দরজার দিকে ঘুরে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে পুঁচকে শের, যার মুখে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি।
শেরের কণ্ঠস্বর শুনে রুশদী দরজার দিকে তাকাতেই দ্বিতীয় দফায় বড়সড় এক ঝটকা খেল। এই পিচ্চি এখানে এল কী করে? আর এসেই যেভাবে সবার সামনে ওকে মম বলে ডাকল, তাতে রুশদীর মান-সম্মানের বারোটা বেজে গেছে। লজ্জায় আর অস্বস্তিতে কান-মাথা গরম হয়ে উঠল ওর। ক্লাস থেকে দ্রুত বের হওয়ার জন্য পা বাড়াতেই এক সহপাঠী টিপ্পনী কেটে বলে উঠল,
"তুমি যে বিবাহিত রুশদী, আগে তো কখনও বলোনি?"
রুশদী না থমকেই দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল,
"বিশ্বাস করো, আমিও এই মাত্র জানলাম!"
রুশদী দ্রুত পায়ে শেরের কাছে পৌঁছাল। এই ছেলেটা আজ সবার সামনে ওর সম্মানের চাটনি বানিয়ে ছাড়ল! সে নিচু হয়ে প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় শেরকে জিজ্ঞেস করল, "তুমি এখানে কী করছ, শের?"
ফের সোজা হয়ে লুৎফর স্যারের দিকে তাকিয়ে বিনীতভাবে বলল, "স্যার, আমি কি একটু আসছি?"
স্যারও সম্মতি জানালে রুশদী ক্লাস থেকে বের হয়ে আসলো।
করিডরে বের হয়েই রুশদী শেরকে নিজের সামনে দাঁড় করাল। হাত নেড়ে কড়া গলায় বলল, "এবার বলো, তুমি এখানে কেন এসেছ?"
শের দাঁত বের করে হাসল। তারপর পাশের একজনকে ইশারা করে বলল, "ঝিংকু তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে।"
রুশদী ভ্রু কুঁচকে শুধাল, "ঝিংকু? কে এই ঝিংকু?"
"ভাবি, এই যে আমিই ঝিংকু!"
করিডরের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক নিজের দিকে ইশারা করে বলে উঠল।
রুশদী সরু চোখে তার দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল,এই আবার কোন ক্ষেতের মুলা? একে তো আগে কখনও দেখেনি। শান তখন রুশদীর সামনে এসে দাঁড়াল এবং একটা বড় করে সালাম দিয়ে বলল,
"ভাবি, আমি শান।"
"কে আপনি? আর আমাকে ভাবি ডাকছেন কেন?"
রুশদী বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল।
শান জবাব দিল, "আমি আপনার একমাত্র দেবর, শাহনান খান।"
'খান' পদবিটা শুনে রুশদী বুঝতে পারল, এই ছেলেই নিশ্চয়ই ফারাজের ছোট ভাই। রুশদী শুকনো গলায় বলল, "তাতে আমি কী করব?"
শান একটু হেসে বলল, "শুনলাম আপনি নাকি বড় ভাইয়াকে রিজেক্ট করে দিয়েছেন? কোন সেই মহীয়সী নারী যে ফারাজ খানকে না বলার সাহস রাখে, তাকে এক নজর দেখতেই চলে এলাম।"
রুশদী এবার চরম বিরক্ত হয়ে বলল, "দেখা তো হলো? এখন দয়া করে যান এখান থেকে। এটা আমার কলেজ, এখানে আমার একটা আলাদা মান-সম্মান আছে, সেটা আর ডুবাবেন না প্লিজ।"
"ওকে, শের চলো,"
শান মাথা নেড়ে সায় দিল।
তবে শের যাওয়ার আগে রুশদীর দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করল, "তুমি একটু নিচু হও তো।"
রুশদী একটা বিরক্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু হলো। মুহূর্তেই শের ওর গলা জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, "লাভ ইউ মম! উম্মাহ!"
বলেই রুশদীর নরম গালে একটা কড়া করে চুমু বসিয়ে দিল সে। রুশদী কিছু বুঝে ওঠার আগেই শের খিলখিল করে হাসতে হাসতে শানের হাত ধরে লাফাতে লাফাতে করিডর দিয়ে চলে গেল। রুশদী স্তব্ধ হয়ে গালে হাত দিয়ে ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
ছেলেটা অদ্ভুত! ওর ওই নিস্পাপ ভালোবাসাটা যেন এক নিমিষেই রুশদীর সব বিরক্তি ধুয়ে মুছে দিল। মাতৃহীন এই শিশুটা অবলীলায় এক অপরিচিতাকে মা ডেকে তার আঁচলে আশ্রয় খুঁজছে। এই দৃশ্যটা রুশদীর হৃদয়ের কোনো এক কোণে চিনচিনে এক বেদনার জন্ম দিল। ছেলেটার জন্য অদ্ভুত এক মায়া আর হাহাকার তার বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে এল। ওর ওই ছোট্ট বুকটা হয়তো সারাক্ষণ এভাবেই একটু মায়ের স্পর্শের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকে।
--
রাত বাড়ার সাথে সাথে রুশদীর ব্যস্ততাও পাল্লা দিয়ে বাড়ে। নাহিদা বেগমের ফরমায়েশের অত্যাচারটা ইদানীং যেন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। রুশদী একটু পড়ার বই নিয়ে বসলেই ওনার হাজারটা নাটক শুরু হয়।কখনও মাথা ব্যথা, কখনও পা ব্যথা। পা টিপে দেওয়া থেকে শুরু করে অবেলায় রান্না বসানো, সবটা যেন রুশদীকে তটস্থ রাখার জন্য। রুশদীর মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ওই মহিলার গলাটাই টিপে দিতে, কিন্তু পরক্ষণেই বাবার মুখটা মনে পড়তেই সব রাগ জল হয়ে যায়।
রুশদী মুরগির মাংস রান্না করে রেখেছে, এখন ঘাম ঝরিয়ে রুটিগুলো সেঁকছে।
সবাই যখন ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবার নিয়ে খোশগল্পে মত্ত, রুশদী তখন একা হাতে রান্নাঘরের হাড়ি-পাতিল মাজছে। খিদের জ্বালায় পেটটা কামড়াচ্ছে ওর, শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙে আসতে চাইছে। রান্নাঘরের দরজা দিয়ে ও একবার ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকাল। সবাই খুব আয়েশ করে গরম গরম রুটি আর মাংস দিয়ে তৃপ্তিভরে খাচ্ছে।
বাবার দিকে তাকিয়ে রুশদীর বুকটা হু হু করে উঠল। বাবাও সবার সাথে দিব্যি গল্প করতে করতে খাচ্ছেন। অথচ একবারও কি মনে পড়ল না তার মেয়েটার কথা? বাড়ির কাজের মেয়ের মতো যে মেয়েটা সারাদিন খাটল, সে কিছু মুখে দিয়েছে কি না, এই সামান্য প্রশ্নটাও কি বাবার মস্তিষ্কে একবারের জন্য খেলল না? নিজের শৎ ছেলে, নতুন স্ত্রী আর শাশুড়িকে নিয়ে বাবা আজ বড় সুখী, অথচ সেই সুখের ভিড়ে রুশদী যেন এক অবহেলিত অস্তিত্ব। অপমানের বিষে ওর মনটা তেতো হয়ে গেল। তবে খারাপ লাগতে লাগতে এখন অভ্যাস হয়ে গেছে, খারাপ লাগাটাও আজকাল বেশি খারাপ লাগে না।
কাজ শেষ করে রুশদী ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। ততক্ষণে সবাই খাওয়া শেষ করে উঠে গেছে। নাহিদা, আনাস আর ওনার মা মিলে ড্রয়িংরুমে বসে আয়েশ করে টিভি দেখছেন। রুশদী খাবারের পাত্রের ঢাকনা তুলে দেখল একদম শূন্য! অবশিষ্ট কিছুই নেই, কেবল তলায় সামান্য ঝোল আর কিছু এঁটো থালাবাসন পড়ে আছে। ওর হাত-পা রাগে কাঁপতে শুরু করল।
ও বুঝতে পারল, নাহিদা বেগম ইচ্ছে করেই রুশদীকে অভুক্ত রাখার পরিকল্পনা করেছেন। বাবার চোখের সামনে এমন অন্যায় অত্যাচার সহ্য করাটা অসহ্য হয়ে উঠছে ওর কাছে। শুধু বাবার কথা ভেবে ও চুপ করে আছে, কিন্তু আজ যেন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে রুশদী নিজের খিদের চেয়েও বেশি অনুভব করল এক গভীর একাকিত্ব। এই বাড়িতে সে যেন থেকেও নেই।
রুশদী শূন্য পাতিলটার দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পেটের ক্ষুধাটা তখন যেন হৃদয়ের হাহাকারের কাছে হার মেনেছে। ঝাপসা চোখে সে একবার ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল, যেখানে হাসাহাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। অথচ এই হাসির রাজ্যে সে যেন এক পরিত্যক্তা। রুশদীর খুব ইচ্ছে করল চিৎকার করে বাবাকে বলতে,'বাবা, আমি কি এই বাড়ির কেউ না? কাজ শেষে আমার জন্য কি এক টুকরো রুটিও জুটবে না?' কিন্তু কথাগুলো গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল। চোখের কোণে এক ফোঁটা লোনা জল জমা হলো, যা গড়িয়ে পড়ার আগেই সে মুছে ফেলল।
ক্ষুধার চেয়েও রুশদীর ভেতরে এখন রাগটা তীব্র হল। সে অনেক কষ্টে নিজের রাগ দমিয়ে রাখল।পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রইল। ঠিক সেই মুহূর্তে ডাইনিং টেবিলে পানি খেতে এলেন নাহিদা। রুশদী শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল, "আমার খাবার কোথায়?"
নাহিদা গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে নির্লিপ্ত মুখে বললেন, "খাবার কোথায় মানে? শেষ হয়ে গেছে।"
"মানে কী? আমি কী খাব তবে?"
রুশদীর কণ্ঠস্বরে এবার ক্ষোভ ফুটে উঠল।
নাহিদা এক চুমুক পানি খেয়ে অবহেলার স্বরে বললেন,
"সবাই খেয়ে ফেলেছে, তুই এখন মুড়ি-টুরি কিছু একটা খেয়ে নে। না হলে নতুন করে ভাত রাঁধ।"
এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না রুশদী। সে চিৎকার করে উঠল, "মজা করছেন আমার সাথে? রাত একটা বাজে এখন, আমার কি ক্ষুধা লাগে না? আমার কি পেট নেই? সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যখন খেতে বসলাম, তখন বলছেন খাবার নেই! আমার ভাগের খাবারটা কি আলাদা করে রাখা যেত না? আমি কি এখন এই মাঝরাতে মুড়ি খেয়ে থাকব?"
রুশদীর চিৎকারে নাহিদা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, "তুই আমার ওপর চড়া গলায় কথা বলিস! তোর সাহস তো কম না। খেতে মন চাইলে নিজে রেঁধে খা, না হলে পানি খেয়ে ঘুমিয়ে যা। আমাকে বিরক্ত করবি না।"
রুশদী এবার করুণ চোখে ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল। বাবা সেখানে আয়েশ করে বসে টিভি দেখছেন। রুশদীর কানফাঁটা চিৎকার নিশ্চয়ই তার কানে পৌঁছেছে, অথচ তিনি পাথরের মতো নির্বিকার। রুশদী চিৎকার করে বলল, "আব্বু! তুমি কি কিচ্ছু বলবে না?"
আানাস হক অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। কোনো মমতার ছিটেফোঁটাও নেই সেই দৃষ্টিতে। তিনি রুক্ষ গলায় বললেন, "তোর মা তো বললই ভাত নেই। ক্ষুধা লাগলে রান্না করে খা, চিল্লাচিল্লি করছিস কেন?"
"আব্বু!" এক বুক হাহাকার নিয়ে আর্তনাদ করে উঠল রুশদী। বাবার এমন নির্দয় আচরণ তার কলিজায় তীরের মতো বিঁধল।
নাহিদা এবার রাগে ফুসে উঠলেন,
"তোর আব্বু আমাকে কী বলবে শুনি? তুই দিন দিন বড্ড বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস। তোর একটা উচিত শিক্ষা হওয়া দরকার!"
বলেই তিনি আশেপাশে রুশদীকে মারার জন্য কিছু খুঁজতে লাগলেন। শেষমেশ রান্নাঘর থেকে রুটু বেলার বেলুনটা হাতে নিয়ে রুশদীকে আঘাত করতে শুরু করলেন।
রুশদী প্রথমে হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তার দৃষ্টি হঠাৎ আটকে গেল বাবার দিকে। আানাস হক নির্বিকারভাবে টিভির পর্দায় তাকিয়ে আছেন। নিজের মেয়েকে চোখের সামনে সৎ মা এভাবে মারছে, অথচ তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রুশদী হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল।সে বাধা দেওয়া বন্ধ করে দিল। নাহিদার প্রতিটি আঘাত তার পিঠে নয়, যেন তার বাবার প্রতি জমে থাকা শেষ মায়াটার ওপর পড়ছে।
নাহিদ এসে অবশেষে মাকে থামাল, কিন্তু আানাস হক তখনও শান্ত। ঠিক সেই মুহূর্তে বাবার প্রতি রুশদীর হৃদয়ে এক চরম ঘৃণার জন্ম নিল। এই লোকটার মায়ার জন্য সে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিতে চেয়েছিল? ছিঃ! নিজের ওপর ধিক্কার জন্মালো ওর। রুশদী বুঝতে পারল, সে এক ভুল মানুষের পেছনে আবেগের অপচয় করছিল। যে বাবা তার সন্তানকে রক্ষা করতে পারে না, সেই বাবার প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকার মানে হয় না।
রুশদী দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল সে ফারাজকে বিয়ে করবে। এই বন্দিশালা থেকে সে মুক্তি চায়। তারও তো একটা জীবন আছে, তারও তো একটু হাসিখুশি থাকার অধিকার আছে। এই পাথুরে মায়ার চেয়ে ফারাজ খানের ওই জেদি সংসারটাই বোধহয় তার জন্য অধিক নিরাপদ। রুশদী স্থির চোখে বাবার দিকে শেষবারের মতো তাকাল এই দৃষ্টিতে আর মায়া নেই, আছে কেবল এক বিদঘুটে ঘৃণা। সে এবার নিজের জীবন নিজের মতো করে সাজিয়ে নেবেই।
আচ্ছা আমার লেখাটা কি বেশি অগোছালো লাগছে? তোমাদের কি বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে? জানাবে।
চলবে....
এই ওয়েবসাইটেই পরের পর্ব গুলা দেওয়া হবে? তাই সাথেই থাকুন ধন্যবাদ।
