#প্রণয়ের_রূপকথা (৪)
সকালটা বড়ো তিক্ত হলো কুহুর নিকট। ব্যথায়, শরীরের তপ্ততায় বিছানা থেকেই ওঠতে পারল না। ওকে ডাকতে এসে রাত্রি আঁতকে ওঠল।
"একি অবস্থা। এত জ্বর! কী করে হলো রে?"
"গতকাল পড়ে গিয়েছিলাম রাত্রিপু।"
"পড়ে গিয়েছিস! ঔষধ খাসনি?"
"না।"
"কেন? পাগল তুই? শরীরের হাল খারাপ করছিস কেন?"
"আমাকে একটু ঔষধ এনে দেবে রাত্রিপু। আমি ঠিক হয়ে যাব। কাউকে কিছু বোলো না।"
"বলব না কেন?"
"জানো তো মায়ের অবস্থা। টেনশন করবে।"
রাত্রি হতাশ হয়ে ওঠে পড়ল। তার মামাতো বোনটা ভীষণ আদুরে। ও যখনই এখানে আসে, তখন বেশিরভাগ সময় কুহুর সাথেই থাকে। যদিও দুজনের মাঝে কয়েক বছরের তফাৎ আছে, তবু ওদের সম্পর্কটা অনেকটাই বন্ধুত্বের। রাত্রিও ভীষণ ভালোবাসে মেয়েটিকে। কুহু শুয়েই রইল। ওঠতে পারল না। রাত্রি এল মিনিট দুয়েক বাদেই। হাতে ঔষধ।
"ওঠে পড়। ঔষধটা খেয়ে নে।"
বলে কুহুকে ধরে ওঠাল রাত্রি। প্যাকেট থেকে ঔষধ নিয়ে মেয়েটির মুখে তুলে দিল। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে পানি দিয়ে ঔষধ গিলে নিল ও। গ্লাসটা রাখতে গিয়ে রাত্রি খেয়াল করল, টেবিলে ব্যথার ঔষধ রাখা। ও ভ্রু কুঞ্চিত করল।
"একি রে। তোর এখানেই তো ঔষধ ছিল। আমাকে দিয়ে আনালি আবার!"
এ কথার জবাব দিল না কুহু। রাত্রি যেন বুঝে নিল অনেকটাই। তাই তো শুধাল,"ঔষধ কি দীপ্র ভাই দিয়েছে?"
হ্যাঁ বোঝাতে মাথা কাত করল কুহু। রাত্রি পুনরায় হতাশ হলো। একটুখানি থেমে থেকে বলল,"তুই কি সব সময় এমনই করবি?"
"জানি না রাত্রিপু।"
"তোর রাগ হয়?"
"কার ওপর?"
"দীপ্র ভাইয়ের ওপর?"
কুহু উত্তর দেয় না। মৌন থাকে। রাত্রি ওর বাহু স্পর্শ করে বলে,"রাগ থাকলেও, রাখিস না। দীপ্র ভাই খারাপ না। শুধু বিয়েটা শেষ সময়ে ভেঙে সবটা তালগোল করে ফেলল।"
"আমি বিয়েটা নিয়ে ভাবি না রাত্রিপু।"
"জানি। তবু তোর মনের অবস্থা ঠিক করার জন্য বললাম। রাগ রাখিস না বোন। স্বাভাবিক হ। দেখবি সব ভালো হবে।"
আদরের সহিত গাল স্পর্শ করে দিল রাত্রি। কুহুও অল্প একটু ঠোঁট প্রসারিত করল। সেই সাথে মনকে বোঝাল সে স্বাভাবিক হবে। দীপ্র ভাই আর তার বিয়ের ঘটনা কেবলই একটা দুঃস্বপ্ন। আর দুঃস্বপ্ন মনে রেখে কষ্ট পাওয়া বোকামি। কুহু তো তার বাবার চালাক মেয়ে হবে। বাবা সব সময় বলতেন কুহুটা একদিন অনেক চালাক হবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা। সত্যিই তাই। কুহু চালাক হবে। তাই তো মনে মনে আওড়ায়,"হ্যাঁ বাবা, তোমার কুহু চালাক হবে। তোমার কুহু ভীষণ চালাক হবে। কিন্তু সেই চালাক হওয়াটা তুমি দেখবে তো বাবা?"
এ প্রশ্নের উত্তর আসে না। আসবেই বা কেমন করে? যারা পৃথিবীর মায়া ছাড়ে, তারা যে পৃথিবীর কিছুতেই আর মায়া খুঁজে পায় না। সবথেকে আদরের সন্তান হলেও না।
জ্বরের শরীর নিয়েই ওঠতে হলো কুহুকে। নাশতা করতে হবে। ও যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক দেখাল। তবে ধরা পড়ল মায়ের কাছে। মা যখন খাবার বেড়ে দিচ্ছিলেন তখনই মেয়েটির ত্বকের তাপমাত্রা বুঝতে পারলেন। সঙ্গে সঙ্গে কপাল ছুঁয়ে দিয়ে আঁতকে ওঠলেন।
"তাপমাত্রা তো অনেক বেশি। জ্বর এল কখন?"
কুহু একটু আমতা আমতা করে ফেলল। দীপ্র মাত্রই জুসের গ্লাস হাতে নিয়েছে। নজর ফেরাল। ভ্রু রাখল কুঞ্চিত।
"এতটা জ্বর। একটাবার বললিও না?"
"ঠিক আছি মা।"
"ঔষধ এনে দিচ্ছি।"
"খেয়েছি। রাত্রিপু এনে দিয়েছে।"
রাত্রি এনে দিয়েছে? তবে দীপ্র যে গতরাতে এক পাতা ঔষধ দিয়ে গেল। ছেলেটার ভ্রু কুঞ্চিত হয়েই রইল। ও জুসের গ্লাস রেখে খাবারের টুকরো গুলো নাড়াচাড়া করতে লাগল। তবে খেলো না আর।
কুহু খাবারটা শেষ করেই রুমে চলে এসেছে। আর এসেই যে মানুষটির মুখোমুখি পড়ল, সে হলো দীপ্র। লম্বাটে ছেলেটাকে নিজের কক্ষে দেখে ওর হৃদয় আনচান করে ওঠল। দীপ্র না তাকিয়েই কুহুর উপস্থিতি টের পেল।
"আমি ঔষধ দিয়েছিলাম। সেটা খাসনি?"
টেবিলে রাখা ঔষধের পাতা। অন্য কোথাও তুলে রাখতে ভুলে গিয়েছিল ও। এখন মিথ্যে যে বলবে সে উপায় ও নেই। আবার সত্য বলতে গিয়েও হৃদয়ে কম্পন চলছে।
"কথা বলছিস না কেন?"
শীতল কণ্ঠ। তবু এই কণ্ঠে এক ধরনের আভিজাত্য আছে। আছে কঠোরতা। কুহু অনেকটাই ভয় পেল। দীপ্রর সাথে জীবনের খুব অল্প সময় পার হয়েছে তার। তাও ছোট বেলায়। সেসব ঘটনা খুব একটা মনেও পড়ে না। বড়ো হওয়ার পর এই প্রথম দীপ্র'র সাথে দেখা। তাই অনেকটাই দ্বিধা রয়েছে। জবাব না পেয়ে দীপ্র এবার ক্ষীপ্ত হলো। পেছন ফিরল। কুহুর দৃষ্টি সামনে ছিল। এবার নত হয়ে গেল।
"আমার দেওয়া ঔষধ খাসনি কেন কুহু? কী প্রমাণ করতে চাস তুই? আমি খারাপ? আমি মানুষ না? আমাকে সহ্য করা যায় না? আমি ভরসার যোগ্য না? আমি, আমি তোর জন্য বি ষে র মতন? শুধু বিয়ে করিনি বলে আমার সাথে সম্পর্ক রাখবি না? এগুলোই বোঝাচ্ছিস?"
এত গুলো কথা বলায় কুহু এবার অনেকটাই ভরকে গেল। তবে ভেতরে ভেতরে নিজেকে বোঝাল, সে ভয় পাবে না। সাহসী হবে। তাই নত মাথাটা তুলে নিল। এতে করে দীপ্র'র বুদ্ধিদীপ্ত চোখের সাথে ওর চোখের দৃষ্টি মিশে গেল।
"আনসার মি কুহু। কেন এমন করছিস?"
"আমি দয়া নিতে চাই না।"
"দয়া?"
"হ্যাঁ, দয়া। আপনি আমাকে দয়া দেখাচ্ছেন দীপ্র ভাই।"
"সিরিয়াসলি? আমি দয়া দেখাচ্ছি তোকে?"
কুহু নিজের জবাবে অনড়। এদিকে দীপ্র'র মাথা উষ্ণ। ও কিড়মিড় করে ওঠল। এগিয়ে এসে কুহুর বরাবর হলো। এত সময় কুহু যে সাহস জোগান দিয়েছে, তাতে অনেকটাই ভাটা পড়ল।
"দয়ার কথা বলে ঠিক করলি না কুহু। আমি তোকে দয়া দেখাচ্ছি না। আমি তোর দায়িত্ব নিয়েছি। স্নেহের জায়গা থেকেই নিয়েছি। কিন্তু তুই সেটাকে দয়া বলে আমাকে ছোট করলি। ওকে ফাইন, এখন থেকে দয়াই দেখাব। আর সেটা তোকে নিতেও হবে।"
বলেই গটগট শব্দ তুলে চলে গেল দীপ্র। সেই চলে যাওয়ায় কেঁপে ওঠল কুহু। সে কি কিছু ভুল করল? দীপ্র ভাই তো দয়াই দেখালেন। বিয়েটাও দয়া দেখিয়ে করতে চেয়েছিলেন। তারপর দয়া দেখিয়েই বিয়ে ভেঙে, দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলবেন। কুহুর মাথা কাজ করে না। ওর শুধু বাবাকে মনে পড়ে। বাবা হারিয়ে গেলে, মানুষের জীবন এতটা উলোটপালোট হয়ে যায়? এতটা উলোটপালোট?
দুপুরের আগ মুহূর্ত। দীপ্র বাড়ি নেই। এলাকা ঘুরতে গিয়েছে। বাড়ির দুই কর্তা দবীর আর আনোয়ার মায়ের কাছে এসে বসেছেন। বৃদ্ধার হাতে তসবি। বয়সের ভাড়ে নুয়ে পড়েছেন তিনি। এখন সময় কাটে আল্লাহর নাম নিয়ে। দবীর বললেন,"বলো মা। আমাদের কেন ডাকলে।"
বৃদ্ধা হাতের তসবি খানা পাশে রাখলেন। তারপর দুই ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। সত্যি বলতে মা কখনো সন্তানদের ঘৃণা করতে পারে না। তাই তো তিনিও পারছেন না ঘৃণা করতে। তার কাছে দবীর আর আনোয়ার সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়ার শিশুর অনুরূপ নিষ্পাপ।
"তোমাদের ডেকেছি বিশেষ কারণে।"
"কী কারণ মা?"
বললেন আনোয়ার। বৃদ্ধা আবার বললেন,"আশা করি, এবার তোমরা কথা রাখবে।"
এ কথায় দু ভাই একে অপরের মুখের দিকে তাকালেন। দুজনের মুখশ্রীতেই প্রশ্ন।
"শোনো তোমরা, আমি আজ আছি কাল নেই। ইচ্ছে ছিল তিন ভাইকে এক সাথে দেখব। সেটা তো হলো না। আমি চাই তোমরা সবাই আবার এক হও। এক সাথে থাকো। অন্তত আমি বেঁচে থাকা অবধি এই বিষয়টি ধরে রাখো। মনে করে দেখো তোমাদের বাবা জীবনের শেষ দিন গুলোতে তোমরা যেন এক থাকো সেটা চাইতেন। অথচ তার কিছুই হয় নি।"
এ কথায় দবীর আর আনোয়ার দুজনেই বেশ একটা দ্বিধা ও লজ্জায় পড়লেন। বৃদ্ধা ছেলেদের চোখ মুখ দেখেই সেটা বুঝতে পারলেন।
"সমস্যা নেই। ভেবে দেখো আমার কথা। চাইলে তোমাদের স্ত্রী'দের সাথে আলোচনা করো। চাচ্ছিলাম, বাড়িটা মেরামত করতে। উত্তরের দিকে আমার নামে যে জমিটা আছে, সেটা সরকার থেকে কিনে নেবে। তোমাদের কারো খরচা করতে হবে না।"
এ কথার পর দবীর বললেন,"আমি একটু জেবার সাথে আলোচনা করতে চাই মা। দীপ্র'র সাথেও কথা বলতে হবে।"
"ঠিক আছে। কথা বলো। তারপর জানাও। আর আনোয়ার? তোমার কী মতামত?"
আনোয়ার ও একটু দ্বিধায় আছেন। আসলে তার ছেলেটা এ বাড়ির পাগল হলেও মেয়েটা একেবারে বিপরীত। আবিদাও যে খুব একটা পছন্দ করে তা নয়। তবে বাড়িটা যেহেতু নতুন করে মেরামত করা হবে, এই দিকটা বেশ অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেল। তিনি তাই দ্বিধা থাকা সত্ত্বেও বললেন,"আমি থাকতে চাই মা। তোমার কথা আমি রাখলাম।"
| এখন থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় গল্প দেব ইনশাআল্লাহ। পরের পর্ব পরশু পাবেন। আর একটা অনুরোধ, পারলে আমার জন্য একটু দোয়া করবেন। সেই সাথে গল্প কেমন হচ্ছে মতামত দিয়েন। আমি অপেক্ষায়। |
চলবে...
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
সব পর্বের লিংক এক সাথে 👇
https://www.facebook.com/groups/cityofbanglastory.bd/permalink/1007427218026484/?app=fbl
