গল্পঃ #হেথায়_সেথায়_সর্বত্রই_রিক্ত_ (সেরু ভাই সিরিজ)
পর্ব [ ০২ ]
লেখাঃ মোঃ শাহরিয়ার
বাসার বাইরের গেটের বাম পাশে বাবা মাটিতে পড়ে আছে। দৌড়ে গিয়ে বাবার শরীর স্পর্শ করলো অনিন্দিতা। মুহূর্তেই আঁতকে উঠলো সে। বাবার সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে আছে। নির্বাক হয়ে বসে পড়লো অনিন্দিতা। মুখের ভাষা যেন হারিয়ে যাচ্ছে তার। কিছুই বলছে না। অনিন্দিতার পরে এবার তার ভাই বাবার শরীর স্পর্শ করলো। সাথে সাথে সেও চমকে উঠলো। নিশ্বাস চলছে কি-না চেক করতেই অনিন্দিতার ভাইয়ের যেন সারা শরীর শিউরে ওঠে।
পাশ থেকে অনিন্দিতার মা উত্তেজিত হয়ে বললো,
--- তোর বাবার কী হয়ছে রে! সারা শরীর এমন ঠান্ডা হয়ে আছে কেনো? জলদিই তোর বাবাকে তোল, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এখন এতো কিছু ভাবার সময় নাই। তোরা ভাই-বোন এমন চুপ হয়ে আছিস কেনো?
কাঁপা কাঁপা স্বরে অনিন্দিতার ভাই বলে উঠলো,
---- তার কোনো প্রয়োজন নেই। বাবা আর নেই। বাবার শ্বাস চলছে না। সারা শরীর এমনি এমনি ঠান্ডা হয়ে ওঠেনি।
--- কি বাজে কথা বলছিস! চ*ড় খাবি কিন্তু।
অনিন্দিতার ভাই এবার চোখে জল এনে বললো,
--- না মা, বাজে কথা বলছি না। বাবা আর সত্যিই নেই।
সঙ্গে সঙ্গে অনিন্দিতার ভাইয়ের গালে ঠাশ করে একটা চ*ড় দিয়ে অনিন্দিতার মা বললেন,
--- তুই কী ডাক্তার হইছিস, যে বলে দিচ্ছিস তোর বাবা আর বেঁচে নেই?
অনিন্দিতার মা আর কিছু বলতে পারলো না। মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সেন্সলেস হয়ে যান। সবাই একত্রে ধরাধরি করে অনিন্দিতার মা'কে রুমে নিয়ে আসে। অনিন্দিতার ভাবীকে সেখানে রেখে তারা দু'জন আবার বাসার বাইরে বাবার লাশের পাশে এসে দাঁড়ালো। অনিন্দিতার ভাই পুলিশকে ফোন করে দ্রুত আসতে বলেছে। থানা অতটাও দূরে নয়। আসতে বেশ একটা সময় লাগবে না বোধ হয়।
অনিন্দিতার মনে এই মুহূর্তে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাবার লাশের পাশে মুখ চেপে কাঁদছে সে। এবারের হুট করে ঘটা বিষয়টাও সে আরও মানতে পারছে না। কোথা থেকে কী হলো, কি হচ্ছে, পরবর্তীতে কী হবে কোনোকিছুই বুঝতে পারছে না অনিন্দিতা। আচমকা অনিন্দিতার ভাই বলে উঠলো,
--- আমার মাথাতে কিছু ঢুকছে না। বাবা এতো রাতে বাসার বাইরে কি করছে? কেনো এলো? নিশ্চয়ই এটা খু'ন। বাবাকে কেউ খু'ন করেছে। কিন্তু কেনো খু'ন করা হলো! তারা কে? এর পিছনে কারা জড়িত বা কে আছে? যাই ভাবিনা কেনো, ফলাফল শূন্যই। তুই-ই এতো রাতে আমাদের সবার ঘুম ভাঙিয়েছিস। বাবা ঘরে নেই তোর মাধ্যমেই জানা। আচ্ছা অনিন্দিতা, তুই কি আগে থেকে কিছু জানতিস? আমার-তো এখন সব বিষয়েই তোর ওপর সন্দেহ হয়। বাবার মৃত্যুর পেছনে তোর কোনো হাত নেই তো?
শেষ পর্যন্ত নিজের ভাইয়ের মুখে এমন কথাও যে অনিন্দিতাকে শুনতে হবে তা সে কস্মিনকালেও আশা করেনি। ছলছল চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে অনিন্দিতা বললো,
--- আমি বাবার খু'ন....ছিঃ!আমি মাথায়ও আনতে পারছি না।তুমি এসব কি শুরু করছো ভাইয়া? চারদিন আগে গয়না নিয়ে একটা মিথ্যে দোষারোপ আমার উপর চাপিয়ে দিলে আর আজ বাবার মৃত্যুর দোষও! কেনো এমন করছো?
প্রত্যুত্তরের আগেই গেটের বাইরে পুলিশের গাড়ি এসে ব্রেক করলো।কিছু বলতে গিয়েও কেনো যেন বললো না অনিন্দিতার ভাই। গাড়ি থেকে দ্রুত কয়েকজন পুলিশ নেমে এলো। সাথে থানার ওসিও আছে। ইশারায় বাবার লা'শ দেখিয়ে দিলো অনিন্দিতার ভাই। বাবার লা'শ যেমন ছিল, তমনই আছে। কোনো নড়াচড়া করা হয়নি। যদি কোনো প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায় তাই। কয়েকজন আশেপাশে কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে আর ক'জন লা'শটাকে ভালো করে দেখছেন। আশেপাশে তেমন কিছু পাওয়া গেল না। তবে লা'শের নিচে একটা খাম পাওয়া গেল। কালো রঙের খাম। যেটা লা'শের নিচে চাপা পড়ে ছিল। খামটা এখনো খোলা হয়নি।ভেতরে কি আছে সেটাও কারো জানা নেই। খাম হাতে নিয়ে থানার ওসি অনিন্দিতার ভাইকে জিজ্ঞাসা করলো,
--- গলায় দাগ! শরীরের আর কোথাও কোনোরূপ চিহ্ন নেই। মনে তো হচ্ছে শ্বাসরুদ্ধ ভাবে খু'ন করা হয়েছে। তবে এতো রাতে আপনার বাবা এখানে কী করছিলেন? কিছু কী জানেন?
--- আমি ও আমার স্ত্রী ঘুমাচ্ছিলাম। এতো রাতে মা ও বোনের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আমাদের দু'জনেরই ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো। পরে জানতে পারলাম, বাবা বাসায় নেই। সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও বাবাকে কোথাও পাওয়া গেল না। এদিকে বাসার মেইন দরজাটাও খোলা ছিল। বাইরে একবারও খোঁজা হয়নি। বাইরে আসা মাত্রই গেটের পাশে বাবাকে সবাই এভাবে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখি।
--- কাউকে সন্দেহ হয়?
--- হ্যাঁ হয়। অবশ্যই সেটা আমার বোনকে। আমি আমার বোন অনিন্দিতাকে সন্দেহ করি। ওকে আপনারা নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন।
ভাইয়ের মুখে এমন কথা শুনে অনিন্দিতার চোখ দু'টো বড়বড় হয়ে গেল।কিছু বলতে যাবেই মাত্র তার আগেই কেউ একজন ভেতরে প্রবেশ করতে করতে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
--- জিজ্ঞাসাবাদ তো আপনাকে করা উচিত।
গলার স্বরটা এহসানুল সরকারের। এহসানুল সরকারকে দেখে অনিন্দিতা একটু সংকোচ মুক্ত হলো।এই মুহূর্তে বাহির থেকে অপরিচিত কারো উপস্থিতি দেখে থানার ওসি নিজেই আগে প্রশ্ন করে বসলেন।
- কে আপনি?
একটা কার্ড বের করে দেখানোর পর এহসানুল সরকার বললেন,
--- আমি এহসানুল। এহসানুল সরকার। গোয়েন্দা শাখার একজন পুলিশ অফিসার। চোখে না দেখলেও নাম বোধ হয় শুনেছেন।
অনেকটা অবাক হয়ে থানার ওসি গলার কন্ঠ স্বর নরম করে বললো,
--- আপনি! শুনবো না কেনো, অবশ্যই আপনার নাম শুনেছি আমি। কিন্তু আপনি এমুহূর্তে এখানে কী করছেন?
--- এতোকিছু বলতে চাইছি না। অনিন্দিতার বাবার প্রাণ সংশয় রয়েছে। সেটা আমিই এতো রাতে ফোন করে ওকে জানিয়েছি। তা উনি কি বেঁচে আছেন?
--- না।
--- লা'শের আশেপাশে কোনো কিছু পাওয়া গেছে?
হাতে থাকা কালো রঙের খামটা এগিয়ে দিয়ে থানার ওসি বললো,
--- এই খাম ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি।
দ্রুতই ওসির হাত থেকে এহসানুল সরকার খামটা নিলো। পূর্বপরিচিত খাম। খামটা খুলেই তিনি একটা চিঠি বের করলেন। যে চিঠিতে লেখা ছিলো,
--- পাপের পরিমাণ সর্বোচ্চ সীমানায় পৌঁছে গিয়েছিল। জীবনের শেষ পাপটা আজ করার কথা ছিল। যারপর সব ছেড়ে-ছুড়ে মহান হতে চেয়েছিলো কিন্তু তার আগেই ওপরে তার সব পাপের হিসেব দিতে চলে গেল।
#সেরু___ভাই
চিঠিটা সবার একটু শোনার মতো করেই পড়ে ছিলেন এহসানুল সরকার। যার পরপরই খামসহ চিঠিটা মুষ্টিবদ্ধ করে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তিনি বললেন,
--- এই চিঠি দিয়ে কিছু হবে না। কিছু পাওয়াও যাবে না।
আতঙ্কিত গলায় থানার ওসি বললো,
--- এটা কি সেই সেরু ভাইয়ের খাম!
এহসানুল সরকার গম্ভীর গলায় জবাব দিলো,
- হ্যাঁ। আপনি লা'শটাকে মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। এই খু'নের পেছনে শুধু একজনেরই হাত আছে, সেটা হলো সেরু ভাই।
এতোক্ষণ যাবৎ নিশ্চুপ থাকলেও এবার চুপ থাকলো না অনিন্দিতা। চোখের জল মুছে, অসহায় দৃষ্টিতে এহসানুল সরকারের দিকে তাকিয়ে বললো,
--- সেরু ভাই কে? সে আমার বাবাকে কেনো খু'ন করলো? আমার বাবার কী এমন দোষ ছিল? এসব কি! একের পর এক আমি আর কিছু নিতে পারছি না।
সাথে সাথে অনিন্দিতার ভাইও এহসানুল সরকারের উদ্দেশ্য বলে উঠলো,
--- আমিও জানতে চাইছি।
খানিকটা মুচকি হেসেই অনিন্দিতার ভাইয়ের কথার জবাবে এহসানুল সরকার বললো,
--- কেনো আপনি কী কিছুই জানেন না? এতো সাধু সাজছেন কেনো? আজ তো আপনারও, আপনার বাবাকে খুন করার কথা! কত সূক্ষ্ম প্লানিং করে রাখা।আপনার কথাতেই তো আপনার বাবা এতো রাতে বাসার বাইরে বের হয়েছিল। আপনার তো খুশি হওয়া উচিত আপনার কাজটা অন্য কেউ করে দিয়েছে। মাঝখানে আমি পড়ে গেলাম, অপ্রীতিকর অবস্থায়। আপনার বাবা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর একমাত্র ছেলে ইমন অর্থাৎ অনিন্দিতার এক্স বয়ফ্রেন্ডকে কেনো খু'ন করালো সেটা ওনার নিজের মুখ থেকে জানা হলো না।
অনিন্দিতার ভাই চমকে উঠলো। মুখে আর কোনো কথা ফুটছে না। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পা দুটো তার একটু একটু কাঁপছে। এতো কিছু হবে মোটেও আশা করেনি সে। হতভম্ব হয়ে অনিন্দিতা এহসানুল সরকারকে বললো,
--- আপনি ভুল বলছেন। আমি কিছু বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠছে। আমি জাস্ট আর কিছু নিতে পারছি না।আমার বাবাকে সেরু ভাই নামক লোকটা কেনো খু'ন করলো সেটাই তো এখন পর্যন্ত জানতে পারলাম না। এরপর আপনি বলছেন, ভাইয়ারও আজ বাবাকে খু'ন করার কথা ছিল কিন্তু কেনো? আর সবশেষে বললেন, ইমনের মৃত্যুর পিছনেও আমার বাবা জড়িত! কি এসব! কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।
এহসানুল সরকার প্রত্যুত্তরে বললো,
--- সেরু ভাই হলো একজন খুনি।জেল থেকে পালিয়ে যাওয়া একজন আসামি। যার গল্প শুরু হয় প্রায়ই দু'বছর আগে। নিখুঁত ভাবে খু*ন, কালো রঙের খাম দিয়ে কাউকে সতর্ক করা, কারো খু*ন হওয়ার কারণ লেখা, সুন্দর হ্যান্ড রাইটিং, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা সবকিছুই দুর্দান্ত। এমনকি ওর ফাঁসির রায়ও বের হয়ে গেছিলো। ফাঁসির দিন আমি ওখানে উপস্থিত ছিলাম না। সেটাই আমার জীবনে এই পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় একটা ভুল। ওই দিন ওর ফাঁসিটা হয়নি। সবকিছু যেন নাটকীয় ছিল। আগে থেকে করা সাজানো-গোছানো পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, মহাচক্রান্ত ছিল। সে অনেক কাহিনি। আমার আগের কেসটাতেও ও আচমকা এসে এভাবেই হস্তক্ষেপ করেছিল। দেখা পেয়েছিলাম প্রায় দু'বছর পর। শেষে দিনাজপুর থেকে গ্রেফতারও হয়েছিল কিন্তু সেই পূর্বের ন্যায়েই যেন জেল থেকে বের হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত ওর হাতে খু*ন হওয়া কেউই নিরপরাধ ছিল না। তাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো অন্যায়, অনাচার, অপরাধ করেছিল বা সেই সবের সাথে যুক্ত ছিল। ও কখন কোথায় কিভাবে কার সাথে জড়িয়ে পরবে সেটা কেউ জানে না। সে নিজেও বোধ হয় জানে না। আপনার বাবার কিছু অবৈধ ব্যবসা আছে। যেই ব্যবসা শুরু করেছিলেন একজনের প্রাণ কেড়ে। শেষও একজনের প্রাণ কেড়েই করতে চাইছিলেন। কিন্তু হলো না। তাছাড়া বিভিন্ন খারাপ চক্রের সাথে জড়িত তো আছেনই।
অনিন্দিতা বললো,
--- আমি কিছু মানতে পারছি না। সহ্যও করতে পারছি না। আমার বাবা কিসের অবৈধ ব্যবসা করতো? সেই ব্যবস্যা কাকে খুন করে শুরু করেছিল আর কাকেই বা খুন করে শেষ করতে চাইছিল?
--- কিছু সত্য মেনে নিতে হবে আর কিছু জিনিস না চাইলেও সহ্য করতে হবে। আপনার বাবার অবৈধ ব্যবসার কোনো অভাব নেই। তবে উনি কাকে খু*ন করে শুরু করেছিল আর কাকেই বা খু*ন করে শেষ করতে চেয়েছিল সেটা আমার অজানা। তাছাড়া আপনার বাবা কেনো আপনার এক্স বয়ফ্রেন্ড ইমনকে খু*ন করিয়েছে সেটাও আমার অজনা। তবে আরেকটা কথা জেনে নিতে পারেন, আজ থেকে অনেক বছর আগে আপনার মামার গুম হওয়ার বিষয়ে। গুম হওয়ার ৮দিন পর তার লাশ পাওয়া যায়। তাকে খু*ন করা হয়। সেটাতো জানেনই। কিন্তু সেই খু*নের পিছনে কে আছে তা আজও আপনারা কেউ জানেন না। আপনার মামার খু*ন হওয়ার একটাই কারণ ছিল, ওনার দোষ ছিল, উনি আপনার বাবাকে পরনারীর সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে দেখে ফেলে ছিলেন। আশা করছি বুঝতে পারছেন, আপনার বাবা এতোটাও ভালো মানুষ ছিলেন না।
অনিন্দিতা স্তব্ধ হয়ে গেল। কিছু বলার মতো মুখে কোনো শব্দই তৈরি হচ্ছে না এখন। তবুও আমতা-আমতা করে কোনো মতে বলে ফেললো,
--- আর ভাইয়া কেনো তাহলে বাবাকে খু'ন করতে চাইলো?
--- জানিনা।এটা সহ আরও অনেক বিষয়ই এখনো ক্লিয়ার হয়নি।তবে শীঘ্রই সবকিছু ঝাপসা থেকে পরিষ্কার হবে। আপনার ভাই আর ভাবীকে জিজ্ঞাসা করলেই সব জানা যাবে। আপনার ভাইতো এখন মুখে কুলু এঁটেছে। চুপ করে আছে। কিছুই বলছে না। অবশ্য এখন আর কিছু বলবেনও না বোধ হয়। ওসি সাহেব একে গাড়িতে তুলুন । সাথে ওনার স্ত্রী'কেও থানায় নিয়ে গিয়ে যেমনই হোক কথা বের করুন।
ঠিক সেই মুহূর্তে অনিন্দিতার ভাবী বাসার ভেতর থেকে বাইরে আসতে আসতে বললেন,
--- গাড়িতে তুলুন মানে? আমরা কেনো থানায় যাবো?
এহসানুল সরকার গম্ভীর ভাবে জবাব দিলো,
--- সেটা থানায় গেলেই বুঝবেন৷ আপনাদেরকে থানায় কেনো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেটাও আপনারা ভালোই জানেন। এতো অভিনয়ের কোনো দরকার নেই। দুপুর ১২টা পর্যন্ত আপনাদের স্বামী-স্ত্রীকে কোনো রকম টর্চার করা হবেনা। সে পর্যন্ত সময় দেওয়া হলো, সবকিছু স্বীকার করে নেওয়ার।
কথাগুলো বলার পরপরই থামলো এহসানুল সরকার। একটু নিরব ভূমিকা পালন করে কি যেন ভাবতে লাগলেন তিনি।অনিন্দিতার ভাবীকে আর কিছু বলতে দিলো না কনস্টেবল। ওসির নির্দেশে তাদের উভয়কেই গাড়িতে তোলা হলো। যার একটু পরই অনিন্দিতার বাবার লা'শ মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এহসানুল সরকার এখনো নিরব। নিরব হয়ে কি ভাবছে কে জানে। অনিন্দিতা তো কথাবলারই উৎস খুঁজে পাচ্ছে না। কোনোকিছুর হিসেবও মিলাতে পারছে না। অতঃপর এহসানুল সরকার বলে উঠলো,
--- আচ্ছা, এতো কিছু হয়ে গেল আপনার মা'কে তো দেখতে পেলাম না। আমার তো খেয়ালই ছিল না।
অনিন্দিতা সাথে সাথে জবাব দিলো,
--- মা সেন্সলেস হয়ে গেছিল। ধরাধরি করে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এহসানুল সরকার আর কিছু না বলে কাকে যেন কল করে ৫'মিনিট কথা বলে। তারপর অনিন্দিতাকে উদ্দেশ্য করে আবার বললো,
--- রাত ৪টা বেজে ৮মিনিট। সকাল হতেই বা আর কতক্ষণ। আমি দুপুর ১২টার পরে আপনাদের বাসায় আসবো। বাকি সব কথা তখন হবে। আপনি নিজেকে একটু শান্ত করে এখন বাসার ভেতর চলে যান। আপনার মায়ের কাছে যান। তাছাড়া আপনার ছেলেও তো রুমে একা!
অনিন্দিতা আর কিছু বলল না। তার কিছু বলতেও ইচ্ছে করছে না। চোখের জল মুছে বাসার ভেতরে চলে গেল। এহসানুল সরকারও, সকল সকাল থানায় আসবে ওসিকে কথাটা বলেই তাড়াহুড়ো করে নিজ গাড়ি করে চলে গেল।
দুপুর ২'টা বাজতে আর দু'মিনিট বাকি।
এহসানুল সরকার মাত্রই অনিন্দিতাদের বাড়ি এসে পৌঁছিল। অনিন্দিতার মায়ের করুণ অবস্থা। অনিন্দিতার থেকে সবকিছু শুনেছেন তিনি। কোনো কিছু মেনে নিতে পারছেন না। মানতে কষ্ট হচ্ছে। যে কষ্ট অনেক তীব্র। এহসানুল সরকার সান্ত্বনা প্রকাশ করে অনিন্দিতার মা'কে উদ্দেশ্য করে বলে,
--- আপনার ছেলে ও তার স্ত্রী সবকিছু স্বীকার করে নিয়েছে। তারা জানিয়েছে, সম্পত্তির লোভে এমন কিছু করার চিন্তাভাবনা করেছিল। অনিন্দিতাকে তার অংশ থেকে বঞ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ ছিল। তাই প্রথমে গয়না চুরি ও বিক্রি করার মিথ্যা অভিযোগ লাগিয়ে অনিন্দিতাকে সবার সামনে চোর ও ছোট করার চেষ্টা করলো। তারপর বিভিন্ন ভাবে বাবার কান ভাঙাতে লাগলো কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হচ্ছিল না দেখে শেষ-মেষ কিছুটা স্ত্রীর প্ররোচনায় নিজ বাবাকে হ'ত্যার পরিকল্পনা করে। কোনোমতে ওনাকে বাসার বাইরে নিয়ে আসে। এরপর প্লান অনুযায়ী ওনাকে বাসার সামনে থেকে তিন জনের একটা গ্রুপের কিডন্যাপ করার কথা ছিল। তারপর ভয়ভীতি দেখিয়ে সবকিছু লিখে নেওয়ার পর খু'ন।
এখন আসছি মেইন পয়েন্টে,
অনিন্দিতার বাবা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ছেলে ইমন অর্থাৎ অনিন্দিতার এক্স বয়ফ্রেন্ডকে খু*ন করার জন্য যাদেরকে কন্ট্রাক্ট দিয়েছিল, তাদেরকেই অনিন্দিতার ভাইও নিজের বাবাকে কিডন্যাপ করার পর সম্পত্তির একটা কাগজে সাইন করিয়ে খু*ন করার কন্ট্রাক্ট করেছিলো।
কুখ্যাত কন্ট্রাক্ট কিলার। মাত্র তিন জনের একটা গ্রুপ। এমন কোনো কাজ নেই যে তারা করে না। তাদের সাথে দেখা করার কোনো সুযোগ নেই। একে অপরের মুখোমুখির তো প্রশ্নই আসে না। এক কথায় তারাও আপনাকে কখনো দেখবে না, দেখতে চাইবেও না, আপনিও তাদের কখনো দেখতে পারবেন না। এমনই ভাবে তাদের কাজকর্ম চলে আসছিল। যেহেতু দু'টো কন্ট্রাক্ট একই দিনে ছিল। তাই একই দিনেই তারা দু'টো কাজ একসাথে শেষ করতে চেয়েছিল। ইমনকে খু*ন করার পরই অনিন্দিতার বাবাকে কিডন্যাপ করার কথাছিল তাদের। কিন্তু দূরভাগ্যবশত তারা আমার কবলে পরে যায়। নিজ বাড়িতেই ইমনকে খু*ন করার পর চলে যাওয়ার সময় ধরা পড়ে। অনিন্দিতার বয়ফ্রেন্ড আছে জেনে অতো রাতেই আমি ইমনদের বাড়ি গিয়েছিলাম কিছু জিজ্ঞাসা করার জন্যে। অনিন্দিতা যদি আগে থেকে আমাকে জানাতো তার আগে একজন বয়ফ্রেন্ড ছিল। তাহলে আমাকে নির্ঘুমে রাত-বিরেতে এতোটাও ছুটাছুটিও বোধ হয় করতে হতো না। অনেক আগেই অনেক কিছু জেনে যেতাম।
গতকাল রাত ২টার সময় অনিন্দিতাকে ফোন করে ইমনের ব্যাপারে বেশ কিছু কথা বলার পর সাথে সাথে কল কেটে দিয়েছিলাম। সবকিছুর পরেও কেনো যেন আমি সংকোচ মুক্ত না হতে পেরে ৫মিনিট পর আবার কল করে অনিন্দিতাকে বলেছিলাম, তার বাবার প্রাণ সংশয়ে আছে। দু'জনের মধ্যে একজন অন্তত বেঁচে থাকলে, না জানা অনেক প্রশ্নের উত্তর পেতাম। অনেক রহস্যের সমাধান পেতাম।
এতক্ষণ যাবৎ চুপচাপ এহসানুল সরকারের কথাগুলো শুনছিল অনিন্দিতা ও তার মা।
অনিন্দিতা বললো,
--- আমি ওর মতো একজন বেইমান, প্রতারকের কথা আপনাকে জানাতে চাইনি। তাই বারবার বলতে চেয়েও সেদিন বলতে পারিনি। ও একজন ঠক। ভালোবাসার নামে আমাকে ঠকিয়েছে।
--- ইমনের সারা ডায়েরি জুড়েও এমনই কিছু লেখা ছিল। লেখাটা তার নিজের হাতের লেখাই। কে কাকে ঠকিয়েছে সেটা আমি এখন জানি না। জানতেও তেমন একটা সময় লাগবে না। আমি আপনাকে সেদিন রেস্টুরেন্টে বারবার বলেছিলাম, আমাদের মধ্যকার কথাবার্তা যেন আর কেউ না জানে কিন্তু আমি শিওর আপনিই সেগুলো পাঁচকান করেছেন।
--- আমি শুধু আমার পরিবারের সবাইকে জানিয়ে ছিলাম। সবাই অনেক বাজে কথা, কটুকথা শোনাচ্ছিল তাই সহ্য করতে না পেরে রাগের বশে বলে দিয়েছিলাম।
--- ভুল করেছেন। আপনার পরিবার থেকেই সেটা আরও পাঁচকান হয়েছে। তাৎক্ষণিক তার কান অবধিও চলে যায়। যেটা আমি ঘুণাক্ষরেও চাইনি। জানিনা সেরু ভাই এরপর কোথায় কখন কী কী করবে। মাসের পর মাস তারপর বছর ওর পিছে হায়নার মতো পড়ে আছি। ওকে গ্রেফতার করার আরও একটা সুযোগ পাওয়া গেল। এখন আসছি ইমতিয়াজের ব্যাপারটায়। ইমতিয়াজের কেসটা তিন মাস পর এমনি এমনি বন্ধ হয়ে যায়নি। যথেষ্ট টাকা খাইয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যার পিছনে আছে আপনার এক্স বয়ফ্রেন্ড ইমন। তাছাড়া ইমতিয়াজ মা*রা যাওয়ার ১৩ঘন্টা আগে নিজের মায়ের হাতে বানানো ঠান্ডা শরবত খেয়েছিল। শরবতেই ওই বি'ষটা মেশানো ছিল।
এহসানুল সরকারকে আর কিছু বলতে না দিয়ে অনিন্দিতা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
--- তারমানে ইমতিয়াজের মা-ই ইমতিয়াজকে.......!
--- না।
--- তাহলে?
--- আপনার বাবার অবৈধ কিছু ব্যবসার মধ্যে একটা হলো, ফার্মেসি। যতসব অবৈধ ওষুধের কারসাজি। সেই ফার্মেসিতেই ইমতিয়াজের মৃত্যু যে বিষের জন্য হয়েছে তার একটা সিসি পাওয়া গেছে।
--- তারমানে আপনি বলতে চাইছেন ইমতিয়াজের মৃত্যুর পিছনে আমার বাবা আছে?
--- এখনো সঠিক জানিনা। তবে এটা শিওর ভাবে বলছি, আপনার আর ইমতিয়াজের ডিভোর্সই হয়নি। আপনারা আইন অনুযায়ী এখনো স্বামী-স্ত্রী।
চলবে....
আগামী পর্বেই হয়তো সমাপ্তি হবে। সবাই গঠনমূলক মন্তব্য করুন। ধন্যবাদ। পরের পর্ব এই ওয়েবসাইটেই দিছি দেখেন।
