| সেদিন ছিল পূর্ণিমা |
| পর্ব:- ০৬+৭+ শেষ পর্ব
অবন্তীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পেটের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সে আবারও অজ্ঞান হয়ে গেছে। সাজু আর কিবরিয়া দুজন মিলে ওদের বাসার সামনে গিয়ে তামান্নার কাছেই জানতে পারে। তারপর হাসপাতালে নেবার ব্যবস্থা করেন সাজু। তামান্না নিজেও এসেছে, তার সঙ্গে তাদের ফ্ল্যাটের আরেকটা মেয়ে আছে।
একটু আগে অবন্তীর জ্ঞান ফিরেছে। সাজু তার সঙ্গে কথা বলতে যাবে। কিন্তু তার আগে তামান্না নামের এই মেয়েটাকে বাসায় পাঠানো উচিৎ। বেচারি গার্মেন্টসে চাকরি করে, রাতে ঘুমাতে না পারলে সকালে চাকরিতে যেতে পারবে না।
সাজু তামান্নাকে বললো,
" আপনি বাসায় চলে যান, কালকে সকালে তো আপনার ডিউটি আছে। আমি রাতটা নাহয় এই হাসপাতালেই কাটাবো। "
" কিন্তু আপনাকে শুধু শুধু...! "
" সমস্যা নেই, আমার তো দিনের বেলা কোনো তাড়া নেই। তাছাড়া রাত প্রায় দুইটা বেজে গেছে। কিছুক্ষণ পর সাহরির সময় হয়ে যাবে। "
" ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আপনিও বিপদে পড়ে গেলেন সাজু ভাই। "
" সেটা তো আপনিও পড়েছেন। যাইহোক, এখন তর্ক বির্তক না করে বাসায় ফিরে যান। আমার বন্ধু বাইকে করে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে। "
কিবরিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
" তুমিও বাসায় চলে যাও বন্ধু, সকালে তোমারও তো ডিউটি আছে। তাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে তুমি বাসায় ফিরে যাও। সকালে অফিসে যাবার আগে একবার এসো। "
তামান্না অবশ্য কিবরিয়ার সঙ্গে গেল না। তার সঙ্গে আরেকটা মেয়ে এসেছে, তাকে নিয়ে সে হাসপাতালের সামনে থেকে একটা সিএনজি নিয়ে চলে গেল। যাবার সময় অবন্তীর মোবাইলটা সাজুর কাছে দিয়ে গেল।
তারা সবাই চলে যাবার পরে সাজু ভাই অবন্তীর কাছে গেলেন। বড় ডাক্তার আগামীকাল সকালে আসবে। জরুরি বিভাগ থেকে আপাতত চিকিৎসা চলছে। সাজুকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল অবন্তী, সাজুর সঙ্গে এটাই তার প্রথম দেখা।
- কেমন আছেন?
- পেটে ব্যথা করছে খুব।
- রাতটা পার হলেই ব্যবস্থা করা হবে। একটু সহ্য করুন, কিছু খাবেন?
- না খাবো না।
- ডাক্তার সন্দেহ করছেন পেটের মধ্যে সম্ভবত ছোট টিউমার সৃষ্টি হয়েছে। রক্ত জমাট বেঁধে এটা নাকি হয়ে থাকে। আমার পরিচিত এক বন্ধুর স্ত্রীর এরকম হয়েছিল।
- তিনি কি বেঁচে আছেন?
- হ্যাঁ। একটা অপারেশন করতে হয়েছে। সম্ভবত আপনাকেও করতে হবে।
- বলেন কি? কতো টাকা লাগবে?
- জানি না, সবকিছুই অনুমান করা। আগামীকাল বড় ডাক্তার অসুক তারপর পরীক্ষা করে দেখা যাবে কি করতে হবে।
- অপারেশন করতে হলে আমি টাকা পাবো কোথায়? আমার গ্রামের বাড়ি থেকে বাবারও ক্ষমতা নেই টাকা দেবার।
অবন্তী কাঁদতে লাগলো। নিজের মনে বলতে লাগলো নানান কথা। সে সুযোগ চায়, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এসেছে ঢাকা শহরে। পেটে ব্যথা অনেকদিন ধরে ছিল কিন্তু কখনো এরকম কিছু সন্দেহ করেনি। শহরে এসে একটার পর একটা বিপদ তাকে ঘরে ধরেছে।
সাজু বললো,
- যদি অপারেশন করতে হয় চিন্তা করবেন না। আল্লাহ যেকোনো একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।
★★★
সাজুর ধারণা সত্যি ছিল। টগরকে তারা মারেনি। গুদামঘরের মতো একটা আবদ্ধ ঘরে টগরকে রাখা হয়েছে। সেদিন রাতে টগর যখন তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসে তখন সামান্য বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
সিরাজ নামের যে ভদ্রলোকের কথা হাসপাতালে বলেছিল সেই লোক মূলত এলাকার মোটামুটি এক নেতা। টুকটাক দলীয় জোটের সঙ্গে জড়িত আছে, নিজের হাতে কিছু ছেলেরা আছে। তাদের দিয়ে এলাকার মধ্যে মোটামুটি ক্ষমতা দেখিয়ে বেড়ায়।
টগর যখন দেখা করতে আসে তখন তিনি ছিলেন চায়ের দোকানে। টগর আসার পরে তাকে নিয়ে চলে আসেন পুরনো এই বাড়ির মধ্যে। তারপর সেখানে এসে প্রথমে সিরাজ বলে,
- দে প্যাকেট।
- প্যাকেট ওই মেয়ের কাছে নাই ভাই।
- মিথ্যা কথা, যাকে দিয়ে মাল আননইছি সে নিজের হাতে ওর ব্যাগে রাখছে।
- কিন্তু ভাই আমি ভালো করে জিজ্ঞেস করলাম সে এসব কিছু জানে না।
- মিথ্যা বলে মিথ্যা, তুই যেভাবে পারিস তার কাছ থেকে ওটা আমার কাছে এনে দিবি। নাহলে কিন্তু ওই মেয়েকে আমি শেষ করে দেবো।
- ভালো আমি যতটুকু জানি ততটুকু বলছি। গরীব মেয়ে, চাকরির জন্য শহরে এসেছে। এমন দুই নাম্বারি মালপত্র সরানোর মতো মানসিকতা তার মধ্যে নাই।
- তুই আমাকে জ্ঞান দিস? ওখানে সব মিলিয়ে কুড়ি লাখ টাকার বেশি মালামাল আছে।
- বলেন কি ভাই, এতো টাকা?
- নাহলে কি আমি শুধু শুধু মরিয়া হয়ে আছি?
- কিন্তু ভাই তার কাছে নাই।
- বুঝতে পারছি। মেয়েটাকেই তুলে আনতে হবে। তখন আমার সামনেই তাকে জিজ্ঞেস করবি।
- না তাকে এখানে আনবেন না সিরাজ ভাই। তাহলে কিন্তু আপনাকে যে সম্মান করি সেই সম্মান আর করবো না।
ব্যাস, এতটুকু যথেষ্ট। টগরকে তাই হাত-পা বেঁধে আটকে রাখা হয়েছে। এছাড়া গতি নেই। আজ প্রায় তিনদিন ধরে টগর এখানে বন্দী।
★★★
সাহরির সময় হয়ে গেছে। অবন্তী ঘুমাচ্ছে, সাজু সাহরি খাবার জন্য নিচে নামলো। হাসপাতালে ঢোকার সময় সামনে একটা রেস্টুরেন্ট দেখে এসেছে। ভালো কিছু খাবার পাওয়া গেলে তো ভালো। নাহলে রাস্তার পাশে চায়ের দোকান নিশ্চয়ই খোলা আছে, কারণ এটা ঢাকা শহর।
রেস্টুরেন্টে বসে সাজু ভাত পার্সেল করে নিল। অবন্তী একা একা আছে তাই এখানে বসে খাবার খেয়ে সময় নষ্ট করা যাবে না। খাবার নিয়ে বিল দিয়ে বের হবার সময় সোহাগের সঙ্গে দেখা।
সাজু যেহেতু তার ছবি দেখেছে তখন সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারলো। সাজু থমকে গিয়ে বললো,
- আপনার নাম কি সোহাগ?
- হ্যাঁ কিন্তু কে আপনি?
সর্বনাশ। সাজু দ্রুত হাসপাতালে চলে গেল। সোহাগ যেহেতু আছে সুতরাং সেই তার সঙ্গে আরো লোকজন আছে। সাজু অবশ্য ভালো করে দেখে এসেছে অবন্তীর কেবিনের খানিকটা সামনে সিসি ক্যামেরা আছে।
কেবিনের সামনে এসে সাজু দেখে দরজা খোলা। যাবার সময় সে দরজা বন্ধ করে গেছে। দরজা দিয়ে ভিতরে তাকিয়ে দেখে ভিতরে বেডের উপর কেউ নেই। শূন্য বিছানা পরে আছে।
চলবে....
~~~ মো: সাইফুল ইসলাম
#সেদিন_ছিল_পূর্ণিমা
|পর্ব:-০৭| সমাপ্ত।
সাজু কেবিনের ভেতর গেল। একটু পরে অবন্তী ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এলো। সাজু তার দিকে তাকিয়ে বললো,
- আপনি ঠিক আছেন তো?
- হ্যাঁ ঠিক আছি।
সাজু বাইরে বের হলো, হাসপাতালের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছে ডাক্তারি পোশাক পরা ক'জন পুলিশ ও দুজন আসামি। সাজু তাদের সামনে যেতেই পুলিশের মধ্যে থেকে একজন বললো,
- দৌড়ে একদম ছাদে চলে গিয়েছিল। সেখানেই ধরে ফেলেছি। যাইহোক, আমি দারোগা শাকিল।
- আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা করেছেন।
একটু পরে নিচ থেকে উঠে এলো কিবরিয়া এবং আরো দুজন পুলিশ। তাদের সঙ্গে সোহাগ। সোহেল চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কেবিনের দরজা ধরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে অবন্তী।
- আপনি এদের থানায় নিয়ে যান আমি একটু পরে আসছি। আর দুজন লোক দিয়ে যান, রাত শেষ হওয়া পর্যন্ত এখানে থাকবে।
দারোগা শাকিল দুজন পুলিশকে রেখে বাকিদের নিয়ে চলে গেল। সাজু ও কিবরিয়া অবন্তীর কাছে এসে বসলো। অবন্তী বললো,
- কীভাবে কি হয়ে গেল বলেন তো?
- সাজু বললো, তামান্না আর কিবরিয়ার সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম আমি তখনই সোহাগকে দেখতে পাই৷ তার সঙ্গে আরো দুজন লোক ছিল, সোহাগের ছবি দেখেছি তাই চিনতে অসুবিধা ছিল না। কিন্তু সে হয়তো ভাবেনি আমি চিনতে পারবো। তারপর নিজে থেকে বুদ্ধি করে হাসপাতাল খালি করার কাজটা করলাম। কিবরিয়া ও তামান্নাকে চলে যেতে বললাম। তখন ওরা বুঝতে পেরেছে হাসপাতালে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। সুতরাং আমাকে তারা চোখে চোখে রাখবে এটাই ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার।
কিবরিয়া হাসপাতাল থেকে বের হবার পরই আমি কেবিনে ঢুকে তাকে কল দিলাম। তারপর তাকে বললাম সরাসরি থানায় চলে যেতে হবে। ডাক্তার এর রূপ ধরে এলেই কাজটা সহজ হবে। তারা খুব দ্রুত অন্য হাসপাতাল থেকে ডাক্তারের পোশাক যোগাড় করেছে। এরপর হাসপাতালে একজন একজন করে এমনভাবে প্রবেশ করেছে কেউ সন্দেহ করেনি।
তখন আমি চলে গেলাম নিচে। আমার সঙ্গে সঙ্গে সোহাগও গেল এটা নামার সময় বুঝতে পারছি। কারণ আমাকে চোখে চোখে রেখে তারা নিয়ে যাবে আপনাকে। আমি তো জানি উপরে কি হতে পারে? তারপর রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে যখন সোহাগকে দেখতে পাই ততক্ষণে এরা সবাই ছাঁদে চলে গেছে। কারণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছাঁদের উপর লোকজন দেখা যাচ্ছিল। আর সেজন্যই আমি দ্রুত কেবিনে আসি কারণ এখানে অন্য কিছু যেন না হয়ে যায়।
অবশেষে এদের ধরা হয়েছে, কিন্তু এখনো আসল যারা তাদের ধরা বাকি। তাছাড়া টগরকেও উদ্ধার করতে হবে। সিরাজ নামের যে নেতার কথা টগর বলেছিল তাকে ধরতে হবে। সমস্যা হচ্ছে সাক্ষী।
এতকিছু হয়ে গেছে কিন্তু এদের বিরুদ্ধে মামলা করার মতো কিছু নেই।
যে ড্রাগসের জন্য এতো কাহিনি সেগুলো রয়েছে আরেকজনের হাতে। অবশ্য সেই ছেলে কিছুক্ষণ পরে চলে আসবে এখানে।
অবন্তী বললো,
- কোন ছেলে? যিনি আমার ব্যাগে থেকে প্যাকেট বের করে নিয়ে গেছে?
- হ্যাঁ। উনি ঘন্টা খানিক আগে কল দিয়েছিল। আপনার সঙ্গে বিকেলে কথা বলার সময় নাকি মোবাইল বন্ধ হয়ে গেছিল। তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তিনি এখানেই আসবেন।
সাজু আর কিবরিয়া দুজন মিলে সাহরি শেষ করে নিল। হোটেল থেকে কিনে আনা খাবার খেল। তারপর সাজু কিবরিয়াকে বললো,
- বন্ধু তুমি এখানে থাকো। আমি থানায় যাচ্ছি। ওদের কাছ থেকে আগে স্বীকারোক্তি নিতে হবে তারপর ওদের নিয়েই বাকিদের ধরতে হবে। আশা করি সকাল আটটার মধ্যে সবকিছু হয়ে যাবে। আমি কাজ শেষ হলেই চলে আসবো। যদি দেরি হয় তাহলে ডাক্তার এলে অবন্তীর কি কি পরীক্ষা করতে হবে তুমি খেয়াল রেখো। যো ছেলেটা আসবে তাকে থানায় পাঠিয়ে দিও।
সাজু উঠে দাঁড়ালো। অবন্তী বললো,
- আমাকে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।
- আরেকটা প্রশ্ন করি?
- করেন।
- সেদিন হাসপাতালে যে চারজন আপনাকে তুলে আনতে চেয়েছিল সেই চারজনের মধ্যে কেউ কি এই দুজনের মধ্যে ছিল?
- হ্যাঁ এরা দুজনেই ছিল সেদিন।
- ঠিক আছে, সাবধানে থাকবেন।
★★★
থানায় এসে দারোগা সাহেব ও সাজু ভাই একসঙ্গে বসে ওদের তিনজনকে প্রশ্ন করলেন। সচারাচর এরা স্বীকার করবে না এটাই ধারণা ছিল। কিন্তু একজন চুপ থাকলেও আরেকজন সবকিছু বলে দিলেন। দুজনকেই আলাদা করে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। সুতরাং দুজনেই ভাবছে সে হয়তো বলে দিয়েছে।
অবন্তীর স্বামী সোহাগ কাঁদছে। বেচারা কিছু টাকার লোভে এসেছিল। রাবেয়ার কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে এরা সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে। নিজের সাবেক স্ত্রীর কাছ থেকে একটা গোপন প্যাকেট বের করে দিলে পঞ্চাশ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। সোহাগের ধারণা ছিল এটা কোনো ব্যাপার হবে না কারণ অবন্তী তাকে ভালোবাসে। তাই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কাজটা করার জন্য রাজি হয়ে যায়। তারপর অবন্তীর বাড়িতে যায় এবং অবশেষে ঢাকায় আসে৷ কৌশলে মিথ্যা কথা বলে তবুও কাজ হলো না। বেচারা!
সোহাগ ও আরেকজনকে থানায় রেখেই বাকি একজনকে নিয়ে রওনা দিল দারোগা শাকিল। টগরকে যেখানে রাখা হয়েছে আপাতত সেখানে যেতে হবে আগে।
ঘন্টা খানিক পরে তারা দক্ষিণ খানের একটা পুরনো বাড়িতে প্রবেশ করে। একটা গুদামঘর থেকে টগরকে উদ্ধার করা হয় কিন্তু সেখানে কর কাউকে পাওয়া গেল না।
তবে সিরাজ নামের সেই কথিত নেতাকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সিরাজ প্রথম প্রথম চিৎকার করলেও পরে যখন জানলো তার বাকি দুজন সবকিছু স্বীকার করেছে তখন চুপচাপ হয়ে গেল। সিরাজকে নিয়ে থানায় এসে দেখে গেল যে ছেলেটার কাছে সেই প্যাকেট এতদিন ছিল সেই ছেলে থানায় বসে অপেক্ষা করছে।
টগরের শরীর বেশি ভালো ছিল না। তবে দুর্বল শরীর নিয়েও সে সচ্ছল রইল। সকাল নয়টার দিকে টগরকে নিয়ে সাজু ভাই হাসপাতালে গেল।
অবন্তীর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা হলো। তারপর কিবরিয়া বললো,
- একটা ছেলে এসেছিল। তোমার জন্য একটা গিফট রেখে গেছে।
সাজু খানিকটা অবাক হয়ে গেল। কারণ গিফট বক্সের মধ্যে একটা গোলাপী রঙের চাদর। সাজু সেই চাদরের ভাজ খুলে দেখল এক পৃষ্ঠার লম্বা একটা চিঠি। কম্পিউটার টাইপ করার মতো সুন্দর ঝকঝকে হাতের লেখা। সাজু আরো একবার মুখ ফুটে বললো, " রবিউল "!
সাজু ভাই,
আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?
অবাক হবেন না সাজু ভাই, আশ্চর্যজনক দুটো কথা বলার জন্য এই চিরকুট। যদিও এতবড় কখনো চিরকুট হয় না, যেটা হয় সেটা চিঠি। আপনি তো জানেন পুলিশের হাত থেকে আমি পালিয়েছি আট মাস আগে। পালানোর কোনো ইচ্ছে ছিল না কিন্তু দুটো কারণে আমি শেষ মুহূর্তে ইচ্ছে করেই পালিয়েছি।
(১) সাবরিনা আফরোজ।
গাজীপুরে যে হাসপাতালটা আমি করেছি সেই হাসপাতালের সবকিছু সাবরিনা দেখাশোনা করতো। মানে যাবতীয় লেনদেন সবকিছু তার কাছে ছিল। সাবরিনা বেঈমানী করেছে। শত্রুর ভয়ে কিংবা লোভে পড়ে সে আমার হাসপাতালের সব টাকা খালি করে দিয়েছে। আমার স্বপ্নের হসপিটাল এখন শূন্য। সাজু ভাই বেঈমান কখনো ছাড় দিতে নেই। বিশ্বাসঘাতকতা করা মানুষকে আমি কখনো ক্ষমা করি না। আমার হসপিটালের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সকল যন্ত্রপাতি সাবরিনা বিক্রি করে দিয়েছে। পৃথিবীর যে প্রান্তে থাকুক তাকে আমি বের করবো ই সাজু ভাই।
(২) লতা চৌধুরী।
বড্ড অদ্ভুত দুনিয়া সাজু ভাই। যে লতা চৌধুরীর জন্য আমি এতকিছু করলাম। আপনাকেও কতো পরিশ্রম করতে হলো সেই সময়। অথচ আমি কোনভাবেই বুঝতে পারিনি এসবের পিছনে লতা চৌধুরীর বিশাল মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। যদি সেটা জানতে পারতাম তাহলে ওর স্বামীর মতো ওকেও ট্রেনে শেষ করতাম। আফসোস হচ্ছে সাজু ভাই। আর সেজন্যই জেলের মধ্যে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে পারিনি। এই দুজনের শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে এসেছে। লতা চৌধুরীর অনেক বড় একটা প্ল্যান আছে। কিন্তু সেটা কি আমি নিজেও জানি না।
আপনার কাছ থেকে আমার কিছু সাহায্যের দরকার হবে। সেজন্যই আপনাকে স্মরণ করলাম। ঠিক সময় মতো আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবো। সাহায্য করবেন কি-না জানি না। তবে আমি চাইবো, বাকিটা আপনার বিবেচনা। আমার উদ্দেশ্য আপনি ঠিকই বুঝতে পারবেন। কারণ আমি জানি আপনি বুদ্ধিমান, খারাপ হবার পরে আমি আপনার মতো কাউকে সম্মান করিনি।
আল্লাহ হাফেজ।
ইতি,
রাফসান মাহমুদ/রবিউল ইসলাম।
★★★
০৮ দিন পর।
মহাখালী টার্মিনালে বাসের জন্য অপেক্ষা করছে অবন্তী। সে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে। তার সঙ্গে যাচ্ছে টগর। অবন্তী এখন সুস্থ, অপারেশন করা হয়েছে, যাবতীয় খর সাজু দিয়েছে। কদিন ধরে সাজুর মনোযোগ অন্য দিকে। সে রবিউলের বিষয় নিয়ে ভাবছে। লতা চৌধুরীর এতদিনে নিশ্চয়ই বাচ্চা হয়েছে। কিন্তু সেই মেয়ে কি এমন করেছে যার জন্য রবিউল এরকম কিছু বলতে পারে।
রবিউল যখন পালিয়েছে সেই ঘটনাও পুরোপুরি সে জানে না। হাসান ভাই সবকিছু জানে তাই তাকে জিজ্ঞেস করা দরকার। কিন্তু তিনি এখন ঢাকার বাইরে আছে।
|
|
বাস চলছে, মাগরিবের পরে বাস ছেড়েছে। জানালার পাশে বসে অবন্তী বললো,
- এর আগে আমি আমার স্বামীর সাথে রাতে বাসে ভ্রমণ করেছিলাম। আমরা নদীতে ফেরি পারাপারের সময় মাঝরাতে দুজন মিলে আকাশে জোৎস্না দেখেছি। সেদিন ছিল পূর্ণিমা, কি অপূর্ব দৃশ্য ছিল সেটা আজও চোখে ভাসে।
- টগর বললো, আপনি আপনার স্বামীকে খুব ভালোবাসেন তাই না?
অবন্তী জবাব দিল না। টগর চুপচাপ বসে রইল। আজ যদি পূর্ণিমা হতো তাহলে হয়তো তারা দুজন মিলে দেখতে পারতো। তখন হয়তো অনেকদিন পরে টগর বলতো " জানো অবন্তী, তোমার সঙ্গে কাটানো সবসময় সুন্দর মুহূর্ত ছিল একসঙ্গে বাড়িতে যাওয়া। কারণ সেদিন ছিল পূর্ণিমা। "
টগর কিছু বললো না। বাস চলছে আপন গতিতে। অবন্তীকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তাকে কালই ফিরে আসতে হবে। ইদের পরে অবন্তী যাবে চট্টগ্রামে। কারণ সিরাজ ও তার লোকদের খুব বেশি শাস্তি হবে না। অবন্তী এখানে এলে আবারও তার উপর বিপদ আসতে পারে। সাজু ভাই চট্টগ্রামে তার এক পরিচিত আঙ্কেলের ঠিকানা দিয়েছে অবন্তীকে। ইদের পরে যোগ করলে চাকরির ব্যবস্থা হবে।
★★★
রবিউলকে এই গল্পের মধ্যে পুরোপুরি রাখিনি। কারণ আমি চাই রবিউল যেখানে থাকব সেই গল্পের পুরোটা তার থাকবে। আর যেহেতু তার চাদর জড়ানো চিরকুট দিয়ে একটা অমিমাংশা ছিল তাই সেখান থেকেই সে ফিরবে। তাছাড়া তার ফাঁসির আদেশ হবার পরে কি কি ঘটেছে, কীভাবে সে পালিয়েছে এটাও লম্বা ইতিহাস। তাই আলাদা করে তাকে নিয়ে শুরু হবে।
এবার অপেক্ষা,
" চাদর জড়ানো চিরকুট "এর দ্বিতীয় খন্ড।
যেখানে অদ্ভুত লতা চৌধুরীর আবির্ভাব আবার দাদাজানের নতুন পরিচয়ে নির্বাচন করা।
সাবরিনার বিশ্বাসঘাতকতার কারণ।
--- "সেদিন ছিল পূর্ণিমা" এখানেই সমাপ্ত ----
~~~ মো:- সাইফুল ইসলাম।
