#মৌয়ের_সংসার

 (২+৩ পর্ব

#নুসরাত_জাহান মিষ্টি


কাজল মৌয়ের বিষন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে তার অনুভূতি। মৌয়ের স্থানে দাঁড়িয়ে তার সিদ্ধান্ত সঠিক। কিন্তু এত সহজ সব সম্পর্কের ইতি টানা। বিষয়টি বলতে মৌ বলে,“সব সম্পর্কের ইতি টানা সহজ নয়। আমি তো ইতি টানছি না। ভালোবাসাটা থাকবে। মনের কোনে কোথাও না কোথাও থাকবে। তবে হ্যাঁ এটার পূর্ণতা হচ্ছে না। এজন্য অবশ্য আফসোস থাকবে। তবে আমি বিশ্বাস করি পরবর্তীতে যে জীবনে আসবে সে আমার সব আফসোস দূর করে দিবে।”


একটু থেমে মৌ আবার বলে,“যদিও আমি সম্পর্কের পূর্ণতার কথা ভেবেই জড়িয়েছিলাম। এখন কোন কারণে সেটা নাহলে সবটা তো মেনে নিতেই হবে।”

এটা বলে মৌ গভীর ভাবনায় পড়ে যায়। তার স্মৃতিতে নিজের মায়ের করুণ মুখটা ভেসে উঠে। সেটা মনে করে সে আপনমনে বলে,“মা সহ্য করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে যেতো তখন সবাই বলতো, প্লীজ মানিয়ে নাও। তোমার শাশুড়ী বুড়ো মানুষ বাঁচবে কতদিন? একটু কথা শোনালে শুনে নাও। দিনশেষে আমার মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দাদীর আগেই মা রা গেল। তারপর অবশ্য আমার বাবা তার মায়ের সেবা করার জন্য, আমার দেখাশোনা করার জন্য আবার বিয়ে করেছেন। কিন্তু দাদী তার সঙ্গে খারাপটা করতে পারেনি৷ আমার বাবাও আমাকে মাকে যা দেয়নি সেইসব তাকে দিয়েছে। এখানে আমি তার দোষ দিবো না। আমার সৎ মায়ও একটা সংসারে সাবানা হতে হতে ক্লান্ত হয়ে জীবন পার করে, অবশেষে লাথি গুতা খেয়ে বিতারিত হওয়ার পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছেন। সে বুঝে গেছেন, সাবানা হয়ে টিকে থাকা যায় না। টিকে থাকা গেলেও নিজেকে সুখী করা যায় না। তাই সে বাবার থেকে তার অধিকার বুঝে নিয়েছে। এখানে তার দোষ নেই। তবে আমি এখনো যখন বাড়ি যাই বাবা আর সৎ মায়ের ঘনিষ্ঠতা কেন জানি মেনে নিতে পারি না? তাই তো বহুদিন হয়ে গেল বাসায় যাই না। বাবা ডাকে কিন্তু আমার ইচ্ছা করে না।”


“থাক না এসব কথা। যেসব কথা বললে কষ্ট বাড়বে সেসব নাই বা বললা।”

কাজলের কথা শুনে মৌ উপহাসের হাসি দেয়। সে কিছুটা হেসেই বলে,“পৃথিবীর কোন কষ্ট মায়ের মৃ ত্যুর চেয়ে বেশি হয়? হয় না। আমি আমার সেই মাকে ম রতে দেখেছি। সেই কষ্টটা যখন সহ্য করে নিয়েছি তখন এসব কিছুই নয়। তাই তো এত বছরের ভালোবাসাও আমাকে কষ্ট দিতে পারছে না।”


এটা শুনে কাজল ভীষণ অসহয় চোখে তার দিকে তাকায়। তার বেশ অপরাধবোধ হয়। দু'জনে একই স্থানে চাকরি করার সুবাদে একই সঙ্গে থাকে। কাজলের বাসা অন্য শহরে। এখানে এসেই মৌয়ের সঙ্গে পরিচয়। বন্ধুত্ব। মৌয়ের তেমন কেউ না থাকায় সে সব কথাই কাজলের সঙ্গে শেয়ার করে। তবে কাজলের অপরাধবোধ হওয়ার কারণ ভিন্ন। মৌয়ের দুঃখের কথা শুনলে তার মনে পড়ে যায়, সে মৌয়ের সামনেই তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কতটা আনন্দের সঙ্গে কথা বলে। মজা করে। এসব তো মৌয়ের নেই। তাই সে কষ্ট পায় হয়তো। সেটা ভেবেই কাজলের খারাপ লাগছে। 


কাজল এসে মৌয়ের পাশে বসে। তার কাধে হাত রাখে। মৌ কিছুটা কেঁপে উঠে। পরক্ষণে নিজেকে সামলে কাজলকে জড়িয়ে ধরে। বুকের মধ্যে কান্না চেপে রেখে বলে,“আমার সৎ মা আসার পর আমার দাদী তার ভুলটা বুঝতে পারে। তার মনে হয় আমার মা ভীষণ ভালো ছিলো। অথচ আমার মা বেঁচে থাকাকালীন তার এসব মনে পড়েনি। একটু অনুশোচনা হয়নি। যাই হোক ম রার আগে তো বুঝেছে। তবে আজও আমার চোখে মায়ের সেইসব স্মৃতি মনে পড়ে। মা তলপেটে ব্যথা নিয়ে ঘরের সমস্ত কাজ করেছে। কাজ শেষে সামান্য একটু সময় শুয়ে থাকায় তাকে কত কথা শুনতে হয়েছে। আমার দাদী তো বলতো, ননীর পুতুল, অল্পে ভেঙে পড়ে। কি এমন অসুস্থতা? বাবাও বলতো এসব কোন অসুখ। অতঃপর আমার মা তার সব ব্যথা লুকাতে শুরু করলেন। অভিমানে অসুস্থতাকে আড়াল করলেন। ধীরে ধীরে মরনব্যধী বানিয়ে ফেললেন। এসব কথা মনে পড়লে পৃথিবীর সব দুঃখই দুঃখ মনে হয় না। আমার মা মৃ ত্যুর আগে নিরবে চোখের পানি ফেলতেন। তার সেই চোখের পানিতে কত কত কষ্ট লুকিয়ে যে রয়েছে সেটা আমি জানি। আমি বুঝি।”

এটা বলে মৌ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। উচ্চশব্দে কান্না করতে থাকে। কাজল তাকে সামলানোর চেষ্টা করে। সে খুব শান্ত গলায় বলে,“তুমি কোন ভুল সিদ্ধান্ত নাওনি মৌ। তুমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছো। ভুল তো আমরা করি। আমাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ না করে আমরা ভালোবাসার জন্য পাগল হয়ে যাই। অতঃপর ভালোবাসার মানুষ অবহেলা করে দূরে ঠেলে দিলে বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারি। সেখানে দাঁড়িয়ে তোমার সিদ্ধান্ত যথার্থ। তোমার কোন ভুল নেই মৌ।”


মৌ ধীরে কান্নার শব্দ থামিয়ে দেয়। সে নিজের আবেগ আবারও নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যস্ত হয়ে যায়। তার কান্নার মাঝে যে শুধু মায়ের কষ্টটা নয়, সেই সঙ্গে ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণাও রয়েছে সেটা কাজল বুঝতে পারে। তাই তো ঐ কথাটি বললো। মৌ এটা বুঝতে পেরে খুশি হয়। মানুষ যতই কঠিন হোক না কেন? এমন কিছু মূহুর্তে তার সত্যি অন্যকারো সান্ত্বনার প্রয়োজন পড়ে। কাজল মৌয়ের মাথাটা উপরে তুলে তার চোখের পানি মুছে দেয়। অতঃপর বলে,“তোমার মা জীবনে আর যাই করুক না কেন, তোমাকে তিনি সঠিক শিক্ষায় বড় করেছেন।”


মৌ জবাব দেয় না। সে শুধু তার মায়ের মুখটা কল্পনা করে। শেষ সময়ে তার মায়ের বলা কথাটি আজও তার কানে বাজে। সে বলেছিলো,“মা ম রা মেয়েদের জীবনটা খুব কঠিন হয়। আমি চাইনি তোকে কখনো ছাড়তে মা। কিন্তু ভাগ্যের উপর কারো হাত নাই। তবে হ্যাঁ আমার মতো ভুল করিস না। আমার জীবনে যাই হয়ে যাক না কেন? দুঃখের কথা বলার জন্য অন্তত মায়ের কোলটা পেয়েছিলাম। তোর কিন্তু সেটা নেই। তোর মা তো তোর সঙ্গে থাকতে পারবে না।”


এটা শুনে মৌ তার মায়ের মুখে হাত দিতো। কান্না করে বলতো,“বারবার কেন একই কথা বলো। তুমি থাকবে না মানে? তুমি কোথায় যাবে? তুমি তো সারাজীবন আমার সঙ্গেই থাকবে।”


মৌয়ের আজও সেই কথাগুলো মনে পড়ে। তার মনে হয় তার কথাই সত্যি। তার মা তার সঙ্গে আছে। সে দূরে যায়নি৷ যদিও এটা নিছকই মৌয়ের অবচেতন মনের কল্পনা, ভ্রম। তবুও সে খুশি। থাকুক না জীবনে এমন কিছু ভ্রম। ক্ষতি নেই তো।


____


পলাশ বিয়ের জন্য পাত্রী নির্বাচন করে মৌকে ফোন দেয়। সে মৌকে উদ্দেশ্য করে বলে,“এখনও সময় আছে মৌ। আমি তোমায় ভালোবাসি। আমি চাই না আমার জীবনে অন্য কেউ আসুক। তোমাকে শুধু চাকরিটা ছাড়তে হবে। আর তো কিছু না। তোমার মাসিক যত হাত খরচ সব আমি দিবো। তোমার সব শখ পূরণ করবো। প্লীজ রাজি হয়ে যাও।”


“যদি আমাকে এতটাই চাইতে তবে বিয়ের জন্য পাত্রী ঠিক করে ফেলে নির্লজ্জের মতো ফোন দিয়ে এসব বলতে পারতে না।”

মৌয়ের কঠিন গলার কথাটি শুনে পলাশ রেগে যায়। সে চিৎকার দিয়ে বলে,”মৌ?”


“ভুল বললাম।

তুমি যেমন ভাবছো আমি খুবই সামান্য বিষয়ে তোমাকে ছাড়ছি তেমন আমারও মনে হয় তুমিও খুবই সামান্য বিষয় নিয়ে আমাকে বাদ দিয়ে অন্য মেয়ে বিয়ে করছো। তুমি চাইলে এই বিষয়টা এডজাস্ট করতে পারতে।”


“আমি তো রাজিই। আমার বাবা, মা রাজি নয়।”

এটা শুনে মৌ হাসে। সে হাসি মুখেই বলে,“প্রেম করার সময় বাবা, মায়ের অনুমতি নেওয়ার কথা মনে ছিলো না। তখন অনুমতি নিলে এই সমস্যা হতো না। যাই হোক কোন অভিযোগ নেই। নতুন জীবনে সুখী হও৷”


“ভুল করছো মৌ।

আমাকে ফিরিয়ে না দিলে অন্তত তোমার একটা সংসার হতো। ফিরিয়ে দিয়ে তুমি তোমার স্বপ্নের সংসারটা হারাচ্ছো। কারণ এই সমাজে তোমার মতো যারা চাকরি করে স্বামীকে নিজের পায়ের তলায় রাখতে চায় সেই মেয়ের সংসার হয় না। তোমারও সংসার হবে না।”

এটা শুনে মৌ কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলে,“মেয়েরা চাকরি করলেই যে স্বামীকে মূল্য দিবে না এই ভাবনাটা ভাবছো বলেই আজ আমাদের পথ আলাদা হচ্ছে। দেখো এই সমাজে সব নারী পুরুষ সমান নয়। সবাই ভালো নয়। খারাপ ছেলেও আছে মেয়েও আছে। তাই বলে খারাপটা ভেবে সবসময় সিদ্ধান্ত নিবো এমনটা করা উচিত নয়। যাই হোক তোমার কথা শুনে এবার মনে হচ্ছে আমি অনেক সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এবার তুমি আমার কথায় রাজি হলেও আমি তোমায় বিয়ে করবো না পলাশ। কারণ আমাদের পথ এক হওয়ার নয়। আমি বলছি না তুমি খারাপ। আমি শুধু এটাই বলছি তুমি আমার যোগ্যতার নও। যেমন আমি তোমার যোগ্যতার নই।”


একটু থেমে মৌ আবার বলে,“আর কখনো যোগাযোগ করো না। সেই সঙ্গে আমার সংসার হলে অবশ্যই আমি তোমাকে জানিয়ে দিবো। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। মৌয়ের সংসার হোক বা না হোক তোমারটা যেন হয়। তুমি সুখী সংসার সাজাও। এটাই চাই। ভালো থাকবে।”

এটা বলে মৌ ফোনটা কাটে। সে জানে সমাজের অধিকাংশ মানুষের কাছে হয়তো তার পলাশকে ফিরিয়ে দেওয়াটা ভুল। তবে তার কাছে এটা ভুল নয়। পলাশ বিয়ের আগেই তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, তার মা নেই। সে একা মানুষ। বাবা যে আছে সে বিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করবে। এমন মেয়ে কে বা বিয়ে করবে? বিয়ের আগে এত কথা উঠলে পরে আরও উঠবে। তাই মৌয়ের কাছে এটা ভুল নয়। সে যা করেছে তা সঠিক। তাতে নাই বা হলো তার সংসার গড়া। তবে হ্যাঁ সংসার হলে সেটা অবশ্যই তেমন ছেলের সঙ্গে হবে। যার সঙ্গে কাটালে মৌ হাসিমুখে বলতে পারবে, এটা মৌয়ের সংসার।

’#মৌয়ের_সংসার (৩)

#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি


দু’মাস কেটে যায়। ইতিমধ্যে পলাশের বিয়ে হয়ে যায়। এই খবর শোনার পর থেকে মৌ তার সঙ্গে কখনো যোগাযোগ করেনি। পলাশ যাতে যোগাযোগ না করতে পারে সেই ব্যবস্থা করেছে। যদিও কষ্ট তার হয়েছে তবে সেটা সে প্রকাশ করেনি। কাউকে বুঝতে দেয়নি। স্বাভাবিকভাবে জীবন-যাপন করছে। পলাশের বিয়ের দিন কাজল মৌকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো,“তুমি নিজেকে এত স্বাভাবিক রাখছো কিভাবে?”


“কারো জন্য কারো জীবন থেমে যায় না৷ আমাদের দু’জনার জীবনই তার নিজ গতিতে চলবে। এসবের মাঝে কষ্ট প্রকাশ করে নিজেকে দূর্বল করার মানে হয় না। যা ঘটে গেছে তা গেছে।সেটা তো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই সবটা মেনে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।”

মৌ যথেষ্ট স্বাভাবিক কন্ঠে কথাগুলো বলে। কাজল তার এতটা মনোবল দেখে সত্যি অবাক হয়। সেই সঙ্গে খুশিও হয়। সত্যি তো। যা জীবনে ঘটে গেছে সেটা তো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাহলে শুধু শুধু নিজেকে দূর্বল প্রমাণ করে লাভ কি? এক্ষেত্রে কাজলের তার অতীতের কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যায়। কিশোরী বয়সে তার জীবনে প্রেম এসেছিলো। তবে সেই প্রেম সফল হয়নি। তার প্রেমিক বিদেশ যাওয়ার পর অন্য মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। যেদিন তার প্রেমিক বলে,“স্যরি কাজল। আমি তোমাকে ঠকাতে চাইনি। কিন্তু হয়ে গেছে।”


কাজল তার কথা মানতে পারে না। সে বিশ্বাস করে না। সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার প্রেমিক তার সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ করে চলে যাচ্ছে এটাই সে মেনে নিতে পারে না। নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে তার কাছে অনুরোধ করে বলে,“তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না।”


সেদিনের পর বহুরাত জেগেছে কাজল। কান্না করে অজস্র সময় নষ্ট করেছে। বেহায়ার মতো তার প্রেমিকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে। সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখন হাসি পায় কাজলের। আবেগের বশে নিজের মূল্যবান কতই না সময় নষ্ট করেছে। তার প্রেমিক তার কাছে কখনো ফিরে আসবে না জেনেও তার পিছনে ঘুরে নিজেকে শেষ করেছে। সেই স্থান থেকে উঠতে কাজলের বেশ সময় লেগেছে। আজ হাসি পেলেও সেই দিনগুলো খুব কষ্টের ছিলো। তবে সেদিন যদি কাজল মেনে নিতে পারতো তার প্রেমিক তাকে ধোঁকা দিয়েছে। সে আর ফিরবে না। তাহলে হয়তো সামনে এগিয়ে আসা সহজ হতো। আজ অবশ্য কাজল খারাপ নেই। তার জীবনে নতুন একজন এসেছেও। তার সঙ্গে বিয়ে ঠিক। খুব শীঘ্রই তাদের বিয়ে হবে। তবে অতীতের কথা ভাবলে আজও তার বুক কাঁদে। কিভাবে নিজেকে সামলে এতটা এসেছে সেসব ভাবলে আফসোস হয়। সত্যি তো কষ্ট প্রকাশ করে লাভ নাই। কাজল তো দূর্বলতা প্রকাশ করেছিলো। বিনিময়ে ওপর পাশের মানুষ সেটার সুযোগ নিয়েছে। সেটাকে মজা হিসাবে নিয়েছে। এসব ভেবে কাজল মৌকে জড়িয়ে ধরে। মৌ ম্লান হাসে।


____


সময় কেটে যায়৷ মৌ তার স্মৃতিতে পলাশের অধ্যায়টা শেষ করে দেয়। এরই মাঝে তার বাবা ফোন দিয়ে অবশ্য বিয়ের বিষয়ে কথা বলে। মৌ তার বাবাকে পাত্র দেখতে বলে। অবশ্যই তার শর্ত মানবে এমন পাত্র। সেই সঙ্গে সে আগে কথা বলে সব পরিস্কার করে নিবে। তার বাবা রাজি হয়। তার বাবা অবশ্য মায়ের মৃ ত্যুর পর থেকে তাকে কোন বিষয়ে জোর করে না। এখানেও করবে না জানতো মৌ। পলাশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় এতদিন পাত্র দেখতে বারণ করেছিলো। ইচ্ছে ছিলো পলাশ তার পরিবারকে জানালে, সেও তার পরিবারকে জানাবে। যেহেতু সেটা হচ্ছে না। বয়সও বেড়ে যাচ্ছে। সেহেতু এখন খোঁজা উচিত। মৌয়ের কথা অনুযায়ী তার বাবা এক লোকের মাধ্যমে একজন পাত্রের সন্ধ্যান পায়।


পাত্রপক্ষ এসে মৌকে দেখে যায়। তাদের অবশ্য পছন্দ হয়। তবে পাকা কথা বলার আগে মৌ ছেলের সঙ্গে আলাদা কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করে। তেমন সুযোগই করে দেওয়া হয়। বাড়ির ছাদে মৌ এবং ছেলেটি গিয়ে বসে। সেখানে গিয়ে সজলই প্রথমে বলে,“আপনার আমাকে ভালো লেগেছে?”


মৌ ছেলেটি অর্থাৎ সজলের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলে,“একবার দেখায় ভালো লাগা হয় বুঝি?”


“হয় না?

আমার তো আপনাকে ভালো লেগেছে।”

এটা শুনে মৌ ম্লান হাসে। অতঃপর বলে,“আচ্ছা। তো বিয়ের পর আপনি আমাকে চাকরি করতে দিবেন?”


“হ্যাঁ। চাকরি করবেন না কেন?

এত ভালো চাকরি ছেড়ে দিবেন।আমার এসবে অসুবিধা নেই।”

মৌয়ের কথাটি ভালো লাগে। তবে পরক্ষণে সজল যা বলে সেটা শোনার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। সজল বলে,“বউ চাকরি করলে ভালো তো। মাথার উপর বাড়তি চাপ পড়ে না। সংসার চালানো সহজ হয়ে যায়। সংসার সামলে বউ চাকরি করতে পারলে অসুবিধা কোথায় আর? চাকরি করে তো টাকা স্বামীর হাতেই তুলে দিবে।”


“আচ্ছা।

আর যদি তুলে না দেয়?”

মৌয়ের এই কথা শুনে সজল অবাক হয়। সে বিষ্ময় নিয়ে বলে,“মানে? আপনি টাকা তুলে দিবেন না? টাকা দিয়ে আপনি কী করবেন? মেয়ে মানুষের এত টাকা লাগে নাকি?”


“কেন মেয়েদের খরচ নেই বুঝি?”

মৌয়ের এই কথায় সজল ভাবহীন ভাবে জবাব দেয়,“মেয়েদের আবার খরচ কিসের? বছরে দুটো জামা, আর তিনবেলা খাবার। এটা তো আমিই দিবো। এছাড়া তো তেমন খরচ নেই। হ্যাঁ যাতায়াত ভাড়া। যেহেতু চাকরি করেন লাগবে। কিন্তু আর তো কিছু নেই। আমাদের মতো তো বন্ধুবান্ধব নেই যে দোকানে গিয়ে বসলেই পাঁচশো এক হাজার টাকা চলে যাবে।”


“আচ্ছা আপনি আসতে পারেন।”

মৌয়ের কথা বুঝতে পারে না সজল। সে বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে বলে,“হ্যাঁ?”


”আমি বললাম, আপনি এবার আসতে পারেন।

আমি আসলে আপনার মতো মানুষকে চাচ্ছিলাম না জীবনে।”

এই কথা শুনে সজল হতবাক হয়ে বলে,“মানে? আমি ভুল বললাম কিছু? সব তো ঠিকই বললাম। তাহলে আপনি এমন করছেন কেন?”


“না আপনি ঠিক বলেননি।”

এটা বলে মৌ শান্ত চোখে সজলের দিকে তাকায়। সজল বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকে। মৌ শান্ত গলায় বলে,“স্ত্রী হিসাবে অবশ্যই আমার দায়িত্ব স্বামীর পাশে থাকা। তার সংসার স্যরি তার নয় আমার সংসার। যেহেতু সেটা আমার সংসার তাই সেটার ভালো মন্দ দেখার দায়িত্ব আমার। কিন্তু তাই বলে এমন নয় যে আমি চাকরি করি বলে কোন ছেলে সেই টাকার আশায় আমাকে বিয়ে করবে। একজন পুরুষ মানুষের তার স্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া জরুরি। সেখানে দাঁড়িয়ে স্ত্রী চাকরি করে বলে সব দায়িত্ব শেষ। তার দায়িত্ব নেই। সেই টাকায় উল্টো সংসার ভালো চলবে। এই আশা করা ছেলে দায়িত্ববান হবে বলে আমার মনে হয় না। আমি আসলে দায়িত্বহীন ছেলে চাচ্ছি না জীবনে৷ এটাই কারণ আপনাকে পছন্দ না হওয়ার। আশা করি বুঝতে পেরেছেন।”


“এটা কেমন কথা হলো?

আমি তো আপনার চাকরি করার বিপক্ষে নই। আপনার তাহলে সমস্যা কোথায়? স্ত্রী চাকরি করলে সে দায়িত্ব নিবে না?”


“হ্যাঁ অবশ্যই নিবে।

কিন্তু সেটা নিজের ইচ্ছায়। বিয়ে করার আগেই স্ত্রী সংসার টানবে বা তার টাকায় নিজের শতভাগ দাবি আছে ভেবে বসা ছেলের ইচ্ছায় নয়। আমি স্পষ্টভাবে কথা বলতে ভালোবাসি তাই স্পষ্টভাবে বলছি, আপনার কথা শুনে আমার মনে হচ্ছে আপনার আমাকে নয় আমার চাকরিটাকে বেশি পছন্দ হয়েছে। এটা লোভ। যদি এটা লোভ না হতো তাহলে অবশ্যই আমি মেনে নিতাম। আশা করি বুঝেছেন।”

মৌয়ের কথা শুনে সজল প্রচন্ড রেগে যায়। সে রাগান্বিত গলায় বলে,“আপনি দেখছি নারীবাদী। মানে নিজের বেলায় ষোলোআনা কিন্তু পরেরবেলায় নাই। এজন্যই মানুষ চাকরিজীবি মেয়েদের পছন্দ করে না। এরা একেকটা….।”


“থামুন।

আপনার মুখ থেকে আমি আর একটাও শব্দ শুনতে চাই না। আমি নারীবাদী হলে তাই। নিজের ভালোটা ভাবা যদি অন্যায় হয় তবে অন্যায় করছি। আমার এই অন্যায়টা যে মেনে নিতে পারবে আমি তাকেই বিয়ে করবো। আপনার মতো কাউকে নয় যে আমার চিন্তাকে সম্মান জানাতে পারবে না। আমাকে সম্মান জানাতে পারবে না।”

এটা শুনে সজল আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো তবে মৌ বলার সুযোগ দেয় না। সে তাকে চলে যেতে বলে। মৌয়ের কঠিন গলায় বলা কথা শুনে সজল বের হয়। তবে যাবার আগে বলে যায়,“আপনার মতো উগ্র মেয়েদের কখনো বিয়ে হবে না। ঘরে আইবুড়ো হয়ে থাকতে হবে। জেনেশুনে তো কেউ বে…. ঘরে তুলবে না।”


“আপনার এখনের কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম আসলেই আমি সঠিক। আমি আপনাকে ঠিক চিনেছি। তাই রিজেক্ট করে ভুল করছি না।”

এটা বলে মৌ নিজে ছাদ থেকে নেমে যায়। সজল রাগে ফুসতে থাকে। এক কথায় বলা যায় একটি মেয়ে সজলকে রিজেক্ট করেছে এটা সে মেনে নিতে পারছে না। তার পুরুষত্বে লাগছে। যেই বিষয়টা মৌও বুঝতে পারে।


এভাবে সজলের মতো তিন চারজনের সঙ্গে দেখা হয় মৌয়ের। সবগুলো প্রস্তাব তার পক্ষ থেকেই রিজেক্ট করা হয়। এসবে মৌয়ের বাবা বিরক্ত নাহলেও তার সৎ মা বিরক্ত হয়। মেয়েদের এত যাচাই বাছাই কি? তার এসব পছন্দ হচ্ছে না। তবে এসবে মৌ গুরুত্ব দেয় না। সে তো এখানে থাকেই না। যখন পাত্রপক্ষের সঙ্গে কথা হয় তখন নিজের ছুটির দিনে এসে দেখা করে। এসব দেখে অবশ্য সবাই বলতো, মৌয়ের কপালে স্বামী জুটবে না। এভাবে সামান্য কারণে যদি সব ছেলে রিজেক্ট করে এমন খারাপ মেয়েকে কে বিয়ে করবে? মৌ তাদের সবার কথায় স্পষ্টভাবে জবাব দিয়ে বলতো,“আমার মতো খারাপ মেয়ের এসব খারাপ চিন্তায় যে সমর্থন জানাবে তার সঙ্গেই বিয়ে করবে।”


এসবে অবশ্য সবাই ভেবে নিয়েছিলো এমন মানুষ নেই। কখনো আসবে না। মৌয়ের মনেও কোথাও গিয়ে দ্বিধা ছিলো। তবে না। সবার কথা সত্যি হয়নি। একদিন সবাইকে মিথ্যা করে দিয়ে মৌয়ের পছন্দের এক পাত্রের সঙ্গে তার দেখা হয়। পড়ন্ত বিকালে ছাদে বসে দু’জন কথা বলছিলো। শুরুতেই লোকটি অর্থাৎ পিয়াস বলে,“আমি আপনাকে আগেও দেখেছি। আমার আপনাকে আগে থেকেই পছন্দ। শুনলাম আপনার বিয়ের জন্য পাত্র খোঁজা হচ্ছে তাই প্রস্তাব নিয়ে চলে আসলাম।”

একটু থেমে আবার বলে,”আমার যেহেতু আপনাকে পছন্দ সেহেতু আমার কিছু জানার বা বলার নেই।তাই আপনি যা জানতে চান সেটা জিজ্ঞেস করুন। আমি জবাব দিচ্ছি।”


“আচ্ছা।”

এটা বলে মৌ একে একে তার কিছু প্রশ্ন করে। পিয়াস সব প্রশ্নের জবাবই খুব সুন্দর দিচ্ছিলো। সবগুলো মৌয়ের পছন্দ হয়। তবুও সে বলে,“আপনাকে আমার পছন্দ হয়নি।”

কথাটি শুনে পিয়াসের মন খারাপ হয়ে যায়। সে কিছুটা সংকোচ নিয়ে বলে,“আমি কম বেতনের চাকরি করি বলেই বুঝি আপনার এই সিদ্ধান্ত। যদিও আমি জানতাম, আমাকে আপনার পছন্দ হবে না। সামান্য ঔষধ কোম্পানির খুব ছোট পোস্টে চাকরি করি। আপনার মতো সুন্দর এবং শিক্ষিত স্বাবলম্বী মেয়ের পছন্দ না হওয়ারই কথা। এসব জেনেও আমি আসছিলাম। কারণ আপনাকে আমার ভালো লেগেছে।”


একটু থেমে আবার বলে,“স্যরি আমার এসব বলা উচিত হয়নি। আসলে মনের কথা জমিয়ে রাখতে পারলাম না তাই বললাম। যাই হোক এবার উঠি।”

এটা বলে পিয়াস উঠতে নিলে মৌ বলে,“আপনার রাগ হচ্ছে না?”


”রাগ কেন হবে?”

পিয়াস অবাক হয়ে প্রশ্ন করে। মৌ শান্ত গলায় বলে,“একটি মেয়ে আপনাকে রিজেক্ট করলো। এটায় রাগ হচ্ছে না?”


“স্যরি। এখানে রাগ হওয়ার কী আছে? আপনি মেয়ে বলে আপনার নিজস্ব পছন্দ থাকতে পারে না? আমি একজনকে পছন্দ করেছি বলে যে তাকে আমাকে পছন্দ করতে হবে এমন তো কথা নেই। উল্টো দিকের মানুষটি আমায় প্রত্যাখান করতেই পারে। হ্যাঁ একটু মন খারাপ হচ্ছে। সমস্যা নেই। ভবিষ্যত হয়তো আমার জন্য ভালো কিছু আছে। তাই এই সম্পর্ক এগিয়ে যাচ্ছে না।”

পিয়াসের মুখে এই কথা শুনে মৌ মুচকি হাসি দেয়। সে মুচকি হাসি দিয়ে পিয়াসের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। পিয়াস তার হাসির অর্থ বুঝতে পারে না।

চলবে,

বাকি পর্ব গুলা এই ওয়েবসাইটেই আছে দেখেন?

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url