#প্রণয়ের_প্রণতি

#পর্বঃ০২

#Arshi_Ayat


'মা!ও মা!'ফারাবী তৃষ্ণাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো।তারপর মা'কে ডাকতে লাগলো।ছোটো ছেলের গলার আওয়াজ শুনে রোমানা আক্তার রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।মা'কে দেখে প্রবল উত্তেজিত হয়ে ফারাবী জিজ্ঞেস করলো,'মা!এই মেয়েটা এখানে কেনো?'

রোমানা আক্তার ছেলের কথা শুনে কঠিন মুখে বললেন,'ও এখানেই থাকবে।কালকে তুই পালিয়ে যাওয়ার পর জুনায়েদ এর সাথে ওর বিয়ে হয়েছে।'

কথাটা যেন বিশ্বাস করতে পারছে না ফারাবী।এটা কি হলো?এই খারাপ মেয়েটার বিয়ে নিজের ভাইয়ের সাথে হলো শেষপর্যন্ত!ইশ কাল যদি কাল যদি ভাইকেও সাথে নিয়ে যেতো তাহলে আর এমন কিছু হতো না।আর ভাইও কিভাবে রাজি হলো!রাগে ফারাবীর মাথা খারাপ হয়ে গেলো।ও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বললে,'তোমাদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?আর কোনো মেয়ে পেলে না শেষপর্যন্ত এই মেয়েটাকে ভাইয়ার সাথে বিয়ে দিতে হলো?'

ফারাবীর চিৎকারে জুনায়েদ আর ফজলুল হক ও চলে এলেন।ছোটো ছেলেকে দেখেই ফজলুল হক রাগান্বিত কন্ঠে বললেন,'তুমি এখানে এসেছো কেনো?বেরিয়ে যাও?তোমার জন্য আমাদের মানসম্মান সব ধুলোয় মিশে গেছে।'

ফারাবী কাতর গলায় বলল,'বাবা এই মেয়েটা ভালো না তাই আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম।তোমরা কেনো ওর সাথে ভাইয়ের বিয়ে দিলে?'

'কি করেছে ও?'জুনায়েদ গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো।

ফারাবী কিছু বলবে তার আগেই ওর ফোনে একটা কল এলো।কিন্তু ফোন রিসিভ করার আগেই কল কেটে যায়।আর সাথে সাথেই একটা মেসেজ আসে আনানোন আইডি থেকে।মেসেজটা ওপেন করতেই ফারাবী দেখলো সেখানে লেখা,'সাবধান মিস্টার ফারাবী!

নিজের প্রেমিকাকে জীবিত দেখতে চাইলে প্রেগন্যান্সির বিষয়ে কিচ্ছু যেন মুখ থেকে বের না হয়।'

এই মেসেজের নিচেই একটা ছবি এসেছে।সেখানে ওর প্রেমিকা রিয়ানার মাথায় বন্দুক তাক করা আর রিয়ানা ওর ঘরেই ঘুমিয়ে আছে।ছবিটা দেখে ফারাবীর আর সাহস হয় নি কিছু বলার।ফোনটা পকেটে দেখে মিনমিনে গলায় বলল,'আমার ভালে লাগছে না।আমি ঘরে গেলাম।'

'না।দাড়া,উত্তর না দিয়ে যেতে পারবি না।'জুনায়েদ কঠিন স্বরে বলল।

ফারাবী বিব্রত কন্ঠে বলল,'আমার গার্লফ্রেন্ড আছে।আমি ওকেই বিয়ে করবো।তাই পালিয়েছিলাম।'

'তাহলে ওকে বিয়ে করার জন্য রাজি হয়েছিলি কেনো?আমরা যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম তোর কোনো পছন্দ আছে কি না!তখন না করলি কেনো?'রোমানা আক্তার রুষিত গলায় বললেন।

'তখন রিয়ানার সাথে ঝগড়া হয়েছিলো তাই রাগে বলেছিলাম।কাল বিয়েতে যাবার আগেই ঝগড়া মিটে গিয়েছিলো। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না।তাই নিরুপায় হয়ে পালিয়েছিলাম।'

'তোর এই খামখেয়ালি জন্য কাল কত অপদস্ত হতে হয়েছে আমাকে জানিস!'ফজলুল হক বললেন।

'সরি বাবা!'ফারাবী অনুতপ্ত গলায় বলল।

'কিন্তু তুই ওকে খারাপ বললি কেনো?'জুনায়েদ প্রশ্নবাক্য করলো।

'আরে!তোমরা সিরিয়াস হয়ে গেলে কেনো?আমি তো মজা করেছি ভাবির সাথে।আমি তো ওনার দেবর।আর ওনার সাথে তো আমার দুষ্টুমির সম্পর্ক।তাই না ভাবি!'

এই বলেই তৃষ্ণার দিকে চেয়ে চোখ মারলো ফারাবী।তৃষ্ণা সাথে সাথেই দৃষ্টি কঠিন করে ফেললো।এতক্ষণ তো রাগ উঠছিলোই তারপর কত্তোবড় সাহস চোখ মারে।তৃষ্ণা বিড়বিড় করে বলল,'বেয়াদব!দাড়া তোকে শায়েস্তা করছি।এই অপমানের শোধ আমি অবশ্যই নেবো।অপেক্ষা কর।'


কোনোমতে পরিস্থিতি সামলে ফারাবী ওর ঘরে চলে এলো।নাম্বারটায় কয়েকবার ডায়াল করেও নাম্বার বন্ধ পেলো।আর ওই আননোন আইডিটা ডিজেবল।কি হচ্ছে বুঝতে পারছে না ফারাবী।হঠাৎ রিয়ানার কথা মনে হতেই ফারাবী ওকে ফোন দিলো।প্রথম কলে ধরলো না রিয়ানা।দ্বিতীয় বার বাজতেই ফোন ধরলো।ফারাবী চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,'ফোন ধরতে এতক্ষণ লাগলো কেনো?'

'ঘুমাচ্ছিলাম।'

'আমি তো ভাবছি মরে গেছিস।'

রিয়ানা বিচলিত গলায় বলল,'তুমি এভাবে কথা বলছো কেনো?কি হয়েছে?'

'কিছু হয় নি।হবে।'

'তোর ঘরে কেউ আছে?'

'না তো!কে থাকবে?'

'ভালোমত খুঁজে দেখ।'

রিয়ানা রুমের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো কেউ নেই।ও ভ্রু কুঁচকে বলল,'কেউই তে নেই।'

'আচ্ছা তুমি কি বারান্দার দরজা খুলে ঘুমাও?'রাগ পড়ে যাওয়ায় ফারাবী 'তুই' থেকে 'তুমি' বলা শুরু করলো।

'না তো!'দরজা তো সবসময়ই বন্ধ করেই ঘুমাই।'

'ও আচ্ছা।রাখছি।পরে কথা হবে।'

রিয়ানা কে কথা না বলতে দিয়ে ফারাবী ফোন কেটে দিলো।

কিছুই বুঝতে পারছে না সে।প্ল্যানটা পুরো ঘেঁটে 'ঘ' হয়ে গেলো।এবার কি হবে?ফারাবী আর ভাবতে পারলো না।মাথা ব্যাথা করছে।ঘুমাতে হবে।কোন রকম জামা পাল্টে শুয়ে পড়লো ফারাবী।


রিসেপশন বলে জুনায়েদকে ঘরেই থাকতে হলো।বাইরে বের হতে চাইলেই রোমানা আক্তারের ধমকে আর বের হতে পারে না।একবার পালিয়ে বের হতে চাইলেও তৃষ্ণা গিয়ে শ্বাশুড়ির কানে বলে দিলো।তৎক্ষণাৎ রোমানা আক্তার জুনায়েদ এর সামনে এসে দাড়িয়ে ওর বাইরে যাওয়া ভন্ডুল করে দিলো।জুনায়েদ বাইরে যেতে না পেরে তৃষ্ণার দিকে চোখ কটমট করে তাকালো আর তৃষ্ণা এমন ভাব ধরলো যেনো তার কিছুই যায় আসে না।


বিকেলে না চাইতেও জুনায়েদ কে তৃষ্ণার সাথে ওদের বাড়িতে যেতে হলো।কাল থেকে কতকিছুই ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে হচ্ছে।ত্রিশ বছর বয়সী একটা ছেলেকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কত কিছু করানো হচ্ছে কিন্তু সে কিছুই করতে পারছে না।জুনায়েদ বিড়বিড় করে বলল,'সবই কপাল।'

শ্বশুর বাড়িতে এসে জুনায়েদ আরো বিরক্ত হলো।সব পিচ্চি পিচ্চি শালা-শালীরা এসে ঘাড়ে,পিঠে উঠে চুল টেনে,খামচি দিয়ে অবস্থা খারাপ করে ফেলছে।জুনায়েদ কিছু বলতে পারছে না সইতেও পারছে না।একটা বাচ্চা তো কোলে উঠেই হিসু করে দিয়েছে।জুনায়েদ বাচ্চাটাকে একজনের কোলে দিয়ে তৃষ্ণাকে খুঁজতে লাগলো।কিন্তু অত্র এলাকায় ও পেলো না।নিরুপায় হয়ে শ্বাশুড়িকে বলল,'আন্টি,একটু তৃষ্ণাকে ডেকে দেবেন।'

তৃষ্ণার মা রুকাইয়া বেগম তৃষ্ণাকে পাঠালেন।তৃষ্ণা এসেই ঢং করে বলল,'ইশ!আপনিও না।আমাকে না দেখে থাকতেই পারেন না।'

জুনায়েদ দাত কটমট করে বলল,'একটু চুপ থাকতে পারেন না?আর আপনাকে দেখার জন্য আমি ডাকি নি।আমার পাঞ্জাবি তে একটা বাচ্চা হিসু করে দিয়েছে।একটা পাঞ্জাবি বের করে দিন।'

'ও আচ্ছা।দিচ্ছি!'

এটা বলেই তৃষ্ণা ব্যাগ খুঁজে নীল রঙের একটা পাঞ্জাবী বের করে দিলো।তৃষ্ণার শাড়িটাও নীল।জুনায়েদ অবশ্য খেয়াল করে নি।পাঞ্জাবি পরে বাইরে বের হয়ে আসল আর ওর পেছনে তৃষ্ণাও এলো।তৃষ্ণাকে দেখে ওর খালাতো বোন ফোঁড়ন কেটে বলল,'কি রে দুলাভাই ডাকলো কেনে রে তৃষ্ণা?'

তৃষ্ণা হেসে বলল,'আরে তোদের দুলাভাইটা আমাকে না চোখে হারায়।একটু না দেখতে পেয়েই অস্থির হয়ে গেছিলো আর আমি নীল শাড়ি পরেছি বলে ওর ও নীল পাঞ্জাবি পড়তে ইচ্ছে করছিলো তাই আমাকে ডেকে নীল পাঞ্জাবী দিতে বলল।'

জুনায়েদ হতভম্ব!এতগুলো মিথ্যা একসাথে হজম করতে পারছে না সে।


চলবে...

(ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।)
 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url