আমার গল্পের তুমি...
লেখিকা:তানজিলা ইসলাম
দ্বিতীয় পর্ব
অনেক রাগ নিয়ে পিছে তাকালাম। কিন্তূ তাকে দেখে আমার রাগ একদম পানি হয়ে গেছে। ৬ ফুট লম্বা হবে ছেলেটার সারা শরীল লাল রং এ মাখামাখি কালো চুল গুলো লাল আবির দেওয়ার কারণে লাল হয়ে গেছে।গাল মুখ গলায় লাল আবির মেখে একাকার।তবুও আমি ছেলেটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। আমার মনে হলো আমার সামনে কোনো মানুষ দাঁড়িয়ে নেই।একটা লাল রঙা আস্ত এলিয়েন দাঁড়িয়ে আছে।
রক্তিমকে এভাবে দেখে আমি উচ্চস্বরে হাসতে লাগলাম।কেউ আমার হাসি দেখে মনে করবে না আমি রক্তিমের ওপর রাগ করেছি। আমার হাসি শুনে রক্তিম
বলল,
" সরি মিস আসলে আমি চোখে দেখতে পাই না।তাই ভুল করে আপনাকে আবির দিয়ে দিয়েছি"।
মনে মনে ভাবলাম ছেলেটা অন্ধ। আর তাকে নিয়ে আমি হাসাহাসি করেছি। তাই আমি উল্টো ক্ষমা চাওয়ার জন্য বললাম,
- আপনি কেনো সরি বলছেন।আমি আপনাকে নিয়ে মজা করেছি না জেনে। দয়াকরে আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি সত্যিই দুঃখিত। সরি সরি সরি সরি
- ঠিক আছে এতো বার সরি বলতে হবে না। আমি চোখে দেখতে পাই। তুমি আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছো।তাই ছোট একটা শিক্ষা দিলাম।যাতে আর কখনো কারো সাথে এমন করতে না পারো।
সেদিন রক্তিম আমায় ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে ঠিকই সরি বলিয়ে নিয়েছিলো। আমি বুদ্ধ সরি বলেছি।আজ প্রায় ৬ বছর পর সেই ইমোশনাল ব্লাকমেইল।
নিজের অজান্তেই রক্তিম কে দেখে অতীতের কথা মনে পড়ে গেল।
কি সুন্দর করে বাবা মেয়ে খেলছে? সত্যিই রক্তিম আপুকে পেয়ে অনেক খুশি। একটা কথা আছে ভাগ্যে বলে। যে ভাগ্যে থাকে না তাকে হাজার চাইলেও পাওয়া যায় না।আর যে ভাগ্যে থাকে তাকে চাইলেই পাওয়া যায়।আপুর ভাগ্যে রক্তিম ছিল। আর রক্তিম আর আপুর ভাগ্যে ছিলো নিহিরিকা।
নিচে যেতে হবে। আর কতো থাকবো অন্যের রুমে। নিচে যাওয়ার জন্য পিছন ফিরতেই দেখি আব্বু দাঁড়িয়ে আছে।আমি আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। চোখ থেকে অবাধ্য পানি পড়তে থাকলো।আমি আব্বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
- কেমন আছো আব্বু?
- ভালো আমার মা কেমন আছে?
- ভালো আছি।
- তুই বোঝি তোর এই বুড়ো বাপটার ওপর রাগ করে আছিস।
- একদম না আমি তোমার ওপর রাগ কেন করবো?
- জানিস না বোঝি আমার জন্যই তো তুই আজ আমাদের থেকে এতো দূরে থাকিস?
- কে বলে আমি তো আমার পড়াশোনার জন্য দূরে গেছি। ওইসব অতীত আর আমার কাছে আমার আপু আর পরিবার সবকিছু। তোমাদের জন্য আমি সব ছেড়ে দিতে পারি হোক তা ভালবাসা।
আব্বু আমার কথা শুনে আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
- এই বাড়িতে তোর কষ্ট হচ্ছে। চল তুই আর আমি আমাদের বাসায় চলে যাই।
- না আব্বু আমার একদম কষ্ট হয় না। এখানে সবাই আছে। তুমি আম্মু আপু নিহিরিকা বুড়ি। তোমরা থাকতে আমার কষ্ট কিসের?
- আমার মেয়েটা দেখি খুব বড় হয়ে গেছে।
- হুম তোমার মেয়ে ইট শহরে থাকতে থাকতে বড় হয়ে গেছে।
- চল নিচে চলে তোর মা খেতে ডাকছে।
- হুম চলো।
আব্বুর সাথে রুম থেকে বের হয়ে খাবার টেবিলে গেলাম। আমি আর আব্বু একসাথে বসেছি। আপু নিহিরিকা খাইয়ে দিচ্ছে। আম্মু সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। রক্তিম ছাড়া সবাই উপস্থিত।আব্বু আমাকে জিজ্ঞাস করলো,
- তুই কি আবার ঢাকা চলে যাবি।
- হুম চাকরিটা যখন নিয়েছি তখন তো যেতে হবে।
- আচ্ছা মা তুই বল আমাদের কি টাকা পয়সা কম। বাড়ি জায়গা জমি সব আছে। এইসব তো তোর আর নেহার।
- জানি আমি আব্বু। তবে কি জানো এই শহরটা আমার কাছে বড্ড অচেনা হয়ে গেছে। চেনা শহরের সাথে অচেনা আমি মানিয়ে নিতে পারবো না। আমার কাছে আমার ইট পাথরের শহরটাই চেনা।তাই ফিরে যাবো চাকরি ওতো জয়েন করতে হবে।
আমার কথা শুনে আম্মু কেঁদে কেঁদে বলল,
- কি যে তানু তুই ছোট থেকে এই শহরে বড় হয়েছিস। এখন তোর কাছে শহরটা অচেনা হয়ে গেছে।
- মাঝে মাঝে চেনা জিনিসগুলো বড্ড অচেনা হয়ে যায়।
- বোঝি না বাপু তোমাদের বাপ মেয়ের কথা থাকা লাগবে না তোর মায়ের কাছে তুই থাক তোর চাকরি নিয়ে।
- আম্মু আমার কথাটা তো শুনো।
আম্মু কাঁদতে কাঁদতে টেবিল ছেড়ে চলে গেল। আপুও নিহিরিকাকে নিয়ে চলে গেল। আব্বুর খাওয়া শেষ করে আমাকে বললো তাড়াতাড়ি খেতে আমার জন্য নাকি সারপ্রাইজ আছে।
হঠাৎ পিছন থেকে চিকন কন্ঠে কেউ বলে ওঠল।
" কেমন আছিস তানু পাখি"
কন্ঠটা চেনা চেনা হলেও চিনতে পারছি না। পিছনে ফিরে দেখি হিমু ভাইয়া এসেছে। হিমু ভাইয়া,আপু আর রক্তিম সেইম ক্লাস ছিলো। হিমু ভাইয়া আব্বুর বন্ধুর ছেলে। সেই থেকে আমাদের সাথে পরিচয়। আমাকে সবসময় তানুপাখি বলে। হিমু ভাইয়াকে বললাম ভাইয়া আপনি ১ মিনিট দাঁড়ান আমি হাতটা ধুয়ে আসি।ভেসিনে থেকে হাত ধুয়ে এসে থেকে ভাইয়া নেই। তখনি পিছন থেকে ১ জোড়া হাত আমার চোখ দুটো ধরে ফেলে। এ ছোয়া আমার বড্ড চেনা তাই বললাম,
"দেখেন ভাইয়া আমি কিন্তূ আপনার ছোঁয়া এখনো চিনি"
ভাইয়া আমার চোখ দুটো ছেড়ে দিয়ে সামনে এসে বলে,
- জানি তো আমার তানু পাখি আমার ছোঁয়া কখনো ভুলতে পারবি না।
- হুম আপনি তো সব জেনে বসে আছেন।
- হুম চল তুই আমার সাথে ছাদে। তোর সাথে অনেক কথা আছে।
- আব্বু আম্মুর সাথে দেখা করে নেন।
- পরে দেখা করা যাবে। কিন্তূ তুই ওবারের মতো যদি ওই শহরে না বলে পাড়ি জমাস।
- পাড়ি তো জমাতে হবে।
- তুই ছাদে চল।
- হুম চলেন।
হিমু ভাইয়ার সাথে ছাদে চলে এলাম। ছালে দুইটা চেয়ার রাখা। আমি একটা চেয়ারে বসে পড়লাম। আর হিমু ভাইয়া আমার সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আছে। শান্ত গলায় আমাকে জিজ্ঞেস করল,
- ফোন দিলে ফোন তুলিস না কেন তুই?
- এমনি ভালো লাগে না।
- রক্তিম কে ভুলতে যখন পারবি না তখন নেহার সাথে কেন নিজে বিয়েটা ঠিক করে দিলি।
- জানোতো হিমু ভাইয়া ছাদের এই পরিবেশে একটা গান হলে বেশ অসুবিধা হতো না কি বলো তুমি?
- কথা ঘোড়ানোর একদম চেষ্টা তুই জানিস আমি এই অভ্যাস একদম পছন্দ করি না।
- জানোতো আপু রক্তিম কে খুব ভালোবাসে।
- আর তুই?
- আমি ভালোবাসতাম না। ভালোবাসলে আকড়ে ধরে রাখতে হয়। আমিতো আঁকড়ে ধরে রাখতে পারলাম না।
- অন্যের কাছে ইচ্ছে করে ছেড়ে দিলে সেইটা আর আঁকড়ে ধরা যায় না।
- আপু সত্যিই রক্তিম কে খুব ভালোবাসতো।
- আমি বাচ্চা না তানু আমি সব বোঝি। কে কাকে কতোটা ভালোবাসে।
কথাটা বলে ছাদ ছেড়ে হিমু ভাইয়া চলে যায়। আর আমি ছাদে বসে থাকলাম। একটা গান হলে ভালো হতো। ঠিক তখনি হিমু ভাইয়া গিটারের টুংটাং শব্দে সুর তুলল
এতো রোদ্দুর তুই
এনে দিলি তাই,
তোর বৃষ্টি আমি
একটু পেতে চাই
মেঘলা হয়ে যাক
আরো পাঁচটা বারো মাস
কোনো বিকেল বেলাতে
তুই আমার হয়ে যাস
শুধু তুই শুধু তুই আর চাইছি না কিছু 😍😍
চলবে....
(
