গল্প: আমার_মনেরি_অঙ্গনে পর্ব: ০৬
আমার_মনেরি_অঙ্গনে
পর্ব:(৬)
নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
রানীর ধমক শুনে মহুয়া দ্রুত পায়ে হেঁটে ঘরে আসে। তৌসিফ বিছানায় শুয়ে ফোন টিপছিলো। মহুয়া ঘরের মধ্যে ধীর পায়ে পায়চারি করে। দৃষ্টি তৌসিফের দিকেই দেওয়া। তৌসিফও আড়চোখে মহুয়াকে দেখে। বেশ খানিকটা সময় এভাবে কেটে যায়। এবার তৌসিফ উঠে দাঁড়ায়। সে বিছানা ছেড়ে আলমারির কাছে যায়। মহুয়া তার পিছনে গিয়ে আস্তে করে দাঁড়ায়। তৌসিফ একটা জামা বের করে ঘুরতে মহুয়ার সাথে ধাক্কা খায়। মহুয়ার মাথাটা তৌসিফের বুকের সাথে লাগে। তৌসিফ বিরক্ত হয়ে বলে,“চোখের মাথা খেয়েছো? এখানে সংয়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলে কেন? বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখছি, আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করছো। সমস্যা কি?”
“না মানে ভাবী বললো তো আপনার পিছু পিছু থাকতে।”
মহুয়া ভীত গলায় বলে। তৌসিফ এটা শুনে আরও রেগে গিয়ে বলে,“তোমার মনে হয় কি, এভাবে চোখের সামনে ঘুরলে আমি তোমাকে মেনে নিবো? তোমার সাথে সব মিটমাট করে নিবো?”
মহুয়া জবাব দেয় না। তৌসিফ এতে আরও রেগে যায়। রাগ নিয়ে বলে,“বেয়াদব মেয়ে৷ জবাব দিচ্ছো না কেন?”
“কি দিবো?”
মহুয়ার প্রশ্নে তৌসিফ হতাশ হয়। সে কন্ঠে কিছুটা গম্ভীরতা ফুটিয়ে তুলে বলে,“এটা বিয়ে। কোন খেলা নয়। যে এ শিখিয়ে দিলো এটা করো, সেটা করলে স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাবে। এটা বিয়ে। এটাকে মন থেকে অনুভব করতে হয়। যা করতে হয় সেটা নিজ থেকে করতে হয়। বুঝলে বোকা মেয়ে?”
মহুয়া তৌসিফের দিকে আড়চোখে তাকায়। সে কোন কথা বলে না। তবে মাথা নাড়ায়। যার অর্থ সে বুঝেছে। তৌসিফের এবার হাসি পেলো। মেয়েটার সরল সহজ মুখটা দেখে হাসতে মন চাইলো। তবে হাসলো না। বরং রাগী রাগী ভাব নিয়ে বলে,“চবলার মতো দাঁড়িয়ে আছে দেখো? মন চায় কয়েকটা দেই লাগিয়ে। দিবো লাগিয়ে?”
মহুয়া লাফিয়ে পিছিয়ে যেতে নিলে পড়ে যায়, তবে মেঝেতে পড়ে না। তৌসিফ আগেই ধরে নেয় তাকে। মহুয়া কেঁপে উঠে। তার কোমড়ে তৌসিফের হাত, শরীরের সঙ্গে শরীর লাগছে। অন্যরকম লাগছে মহুয়ার। সে সেই অনুভূতি নিয়েই তৌসিফের দিকে তাকায়। তৌসিফও তাকিয়ে ছিলো। দুজনার চোখাচোখি হয়।মহুয়ার হঠাৎ মনে পড়ে, এভাবে বিয়ে হবে ভেবে সে অনেক ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলো। চেয়েও স্বামী নামক মানুষটার সঙ্গে কল্পনায় মধুর স্মৃতি সাজাতে পারেনি। মনের মধ্যে তার জন্য মায়া জাগাতে পারেনি। কারণ তার মনে দ্বিধা কাজ করতো। এভাবে বিয়েটা আদৌ হবে? যদি হয় তবে তার স্বামী তাকে কখনো মেনে নিতে পারবে? এসব ভাবনায় মহুয়ার তার স্বামীর প্রতি মায়া জাগানো হয় না। তার মনে হয়, এই স্বামীকে ভালোবাসলে সে শুধু কষ্টই পাবে। ভালোবাসা যাবে না। কিন্তু আজ হঠাৎ করেই, কোন কারণ ছাড়াই সে তার স্বামীর মায়ায় জড়িয়ে গেছে। কোন কারণহীন তাকে ভালো লাগছে মহুয়ার।
ইতিমধ্যে তৌসিফ মহুয়াকে সোজা দাঁড় করিয়ে দূরে সরে যায়। মহুয়াকে গভীর ভাবনায় দেখে একটু জোরেই বলে,“ঠিকভাবে হাঁটতে চলতে পারে না, এই নাকি গুনের বাহার। দেখলাম তো গুন। সেই বিয়ে থেকে দেখছি। ফ্যাঁচফ্যাঁচ কান্না আর লোক ঠকানো। এছাড়া কি বা গুন আছে।”
তৌসিফের এসব কথায় মহুয়ার ভাবনায় বাঁধা পড়ে। তার এবার নিজের উপর রাগ হয়। এই মানুষটা সারাজীবন তাকে এই খোঁটা দিয়ে যাবে। আর সে কি-না সেই মানুষকে নিয়ে ভালো কিছু ভাবছে। এই ভাবনার জন্য এবার রাগ হচ্ছে। সেই রাগ থেকে বলে বসে,“তো বিয়ে করছিলেন কেন? করতেন না বিয়ে। যে বিয়ে করে এত আফসোস হয় সেটা করলেন কেন? মাঝ সমুদ্র ভেসে যেতাম নাহয় আমি। বিয়ে করে কেন শুধু কথা শোনাচ্ছেন?”
মহুয়ার রাগ নিয়ে বলা কথাগুলো শুনে তৌসিফ সন্দিহান চোখে তাকায়। অতঃপর বলে,“তুমি নিজ থেকে কিছু বলতেও পারো? আমি তো ভাবছিলাম সবার কথা শোনা আর কাঁদাই তোমার ধর্ম। এখন দেখছি কথাও জানো। যাই হোক শোনো মেয়ে, আমি এমনই। সারাজীবন এমনই কথা শোনাবো। থাকতে হয় থাকো নাহয় ভাগো। কিন্তু হ্যাঁ মুখে মুখে তর্ক করবে না। এটা একদম সহ্য করবো না। বউ বউয়ের মতো থাকবা। নয়তো কয়েকটা লাগিয়ে দিবো।”
“বউয়ের মতো কিভাবে থাকে?”
মহুয়া সাহস করে প্রশ্নটা করেই ফেলে। সে করবে না ভাবছিলো। তবুও করে ফেললো। তৌসিফ তার প্রশ্ন শুনে কঠিন গলায় বলে,“বউ হবে নম্র, ভদ্র, শান্ত, স্বামীর সব কথা শুনবে।”
এটা শুনে মহুয়া অবাক হয়। এই লোকের তো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বোঝায় সে চুপচাপ সব মেনে নেয়, শান্ত থাকে এটা তার পছন্দ নয়। এখন আবার অন্য কথা বলছে। এই লোকের মাথায় সমস্যা? এক মুখে কত কথা? তৌসিফ বোধহয় তার মনের ভাব বুঝতে পারে। সেজন্য তার পাশে গিয়ে খুব আস্তে করে বলে,“এটাই বউয়ের ধর্ম। তবে হ্যাঁ যে স্বামী তাকে সম্মানে রাখবে তার জন্য সে এমন বউ হবে। অসম্মানের স্থানে কথা শোনাটাকে গোলামি বলে। সেটার মাঝে বউয়ের নম্রতা কিংবা শান্ত মনোভাব ফুটে উঠে না। শুধু ভয় আর গোলামিই ফুটে উঠে।”
এটা বলে তৌসিফ ঘর থেকে বের হয়। মহুয়া কান চেপে ধরে। তার কানের মধ্যে কেমন করছে? লোকটা কি বললো? তার যে কথায় তার প্রতি অসম্মান ফুটে উঠবে সেটা না শোনা? সম্মানের সাথে যেটা বলবে সেটা শুনবে? এসবই বললো। মহুয়া ভাবতে পারছে না। সে বিছানায় ধপাশ করে বসে পড়ে।
____
আসমার কথা বলে চলে যায়। রানী প্রচন্ড রেগে রয়েছে। তার আচরণে সেটা প্রকাশ পাচ্ছে। ফিরোজা বেশ অনেকটা সময় ধরে আসমাকে লক্ষ্য করছে। অতঃপর না পেরে বলে,“বড় ভাবী, কার উপর রেগে আছো? হয়েছে কি?”
“কিছু না।”
এটা বলে রানী নিজের কাজে মন দেয়। ফিরোজা আরও কয়েকবার একই কথা জানতে চায়। শেষে না পেরে রানী বলে,“নিজের ভাগ্যের উপর রেগে রয়েছি।”
“মানে?”
ফিরোজা কিছু বুঝতে পারে না। রানী প্রসঙ্গ বদলে ফেলে। যতই প্রসঙ্গ বদলাক তার কানে এখনো আসমার বলা কথাটা বাজে। সে খুব ব্যঙ্গ করে বলেছে,“দেবর বিয়ে দিলে। যতই বিয়ের আসরে পাত্রী বদলে যাক। বিয়েটা তো হয়েছে। খুব শীঘ্রই সুখবর শুনবো তাই না? বউটা কালো তবে তোমার চেয়ে এই দিক দিয়ে এগিয়ে। তোমার সৌন্দর্য দিয়ে কি বা হবে, তুমি তো আর বাচ্চা দিতে পারবে না। ঐ মেয়েটা পারবে। যাই হোক মিলেমিশে থেকো। আবার ঝামেলা করো না যেন।”
রানীর মাথা থেকে এই কথাটা এখনো বের হচ্ছে না। সবাই কি পেয়েছে? ফিরোজার বাচ্চা হয় নাই? কই তাদের নিয়ে কি হিংসে করেছে রানী? বরং নিজ হাতে কত যত্ন নিয়ে তাদের পেলেছে। এখনও তারা তার বড় মামীকে কত ভালোবাসে? এই তো একটু আগে ফারাজ আবদার করে গেল মামীর হাতে দুধপুলি খাবে। সেটা না খেয়ে যাবে না। তার মা আজই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সে পিঠা না খেয়ে যাবে না। মাইশাও জেদ ধরলো তার হাতের মালপোয়া খাবে। তাহলে এখন সবাই এত কথা বলছে কেন? দেবরের বাচ্চা হলে সে পালবে না? সে তো ওদের চেয়েও বেশি ভালোবাসবে। কারণ এই বাচ্চা সারাদিন ঘরে থাকবে। বিয়ে হতে না হতেই সবাই এই এক জিনিস নিয়ে পড়লো। এসবে যা রাগ হয়েছে তার চেয়ে বেশি রাগ হয়েছে রানীর আসমার ইঙ্গিতে। আসমা যে তাকে কি ইঙ্গিত দিয়ে গেছে সেটা একমাত্র সে জানে। সে যতই না বোঝার ভান ধরুক, মন তো ঠিক বুঝেছে। সেই দুঃখ সে কিভাবে গোচাবে? এটা ভেবে রানীর কান্না পাচ্ছে। তবে কাঁদে না। এত বছরে সবকিছুর অভ্যাস হয়ে গেছে। কান্নাটাকেও আটকে রাখার অভ্যাস তৈরি করে নিয়েছে সে। তাই খুব সহজেই ফিরোজার চোখ ফাঁকি দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। তাকে বুঝতে দেয় না তার মনের তোলপাড়।
★
সন্ধ্যাবেলা আফজাল বাড়ি চলে আসে। আজ একটু তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। এসে থেকে রানীর মনটা খুব খারাপ দেখে। যদিও রানী কিছুই বলেনি। তবে তার মন খারাপ আফজাল ঠিকই বুঝতে পারে। তবুও রানী ঘরের সব কাজ করে যাচ্ছে। এখনো চাল ভিজিয়ে রাখছে। পিঠা বানানোর জন্য পড়ে গুড়া করবে। এসবের মাঝে আফজাল তাকে ঘরে ডাকে। রানী ঘরে এসে স্বাভাবিক গলায় বলে,“কিছু লাগবে?”
আফজাল জবাব না দিয়ে রানীর কোমড়ে হাত দিয়ে তাকে কাছে টেনে নেয়। অতঃপর আদুরে গলায় বলে,“আমার বউকে দরকার ছাড়া আমার কাছে ডাকতে পারি না? খুব বেশি বুড়ো হয়ে গিয়েছে আমি?”
“ছাড়ো তো। এই ভর সন্ধ্যা কি শুরু করলে?”
রানী খানিকটা লজ্জা পায়। সেই সঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাসও ফেলে। আফজাল খুব যত্ন নিয়ে তার কপালে চুমু খেয়ে বলে,“মন খারাপ কেন আমার বউয়ের?”
“কই না তো।”
রানী অস্বীকার করে। আফজাল রানীর দুই কাধে হাত রেখে তার চোখে চোখ রেখে বলে,“আমি চিনি আমার বউকে। তাই মিথ্যে বুঝ দিয়ে লাভ নাই। বলো মন খারাপ কেন?”
“এমনি।”
রানী বলতে চায় না। আফজাল জোরাজোরি করে। এক পর্যায়ে রানী বাধ্য হয়ে বলে,“সবাই ভাবছে তৌসিফের বাচ্চা হলে আমি খারাপ হয়ে যাবো। এই জগতের সবচেয়ে খারাপ মানুষটা হবো। আমি হিংসায় জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে যাবো। তৌসিফের বউকে খুব কষ্ট দিবো। তার নমুনা তো কাল দেখিয়েছি। তার বাসর রাতটা নরক বানিয়ে দিয়েছি। এরচেয়ে বেশি নরক বানাবো তার বাচ্চা হলে। কারণ আমি খুব খারাপ। আমি তো বন্ধ্যা। আমার সামনে সে মা হবে। আমাকে তো খারাপ হতেই হবে। তাই না?”
বলতে বলতে রানী কান্না করে দেয়। আফজাল অবাক হয়ে যায়। সেই সাথে রেগেও যায়। এত বছরেও মানুষের কথা শোনানো শেষ হলো না। সে এমন প্রতিবেশীদের দুটো গালি দিয়ে বউকে সামলানোর চেষ্টা করে। পরম যত্নে তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,“তুমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ। আমার দেখা সবচেয়ে সেরা মানুষ।”
“আমি বাচ্চা যে আমাকে বাচ্চাদের মতো বুঝ দিচ্ছো?”
রানী আহত গলায় বলে। আফজাল ম্লান হেসে বলে,“চোখের দিকে তাকাও। তাহলে বুঝতে পারবে এটা মিথ্যে নয়।”
“আমি যদি এতই ভালো হই তবে সব খারাপ আমার সাথেই কেন হয়?”
রানী চিৎকার করে বলে। আফজাল তাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করে বলে,“কারণ ভালো মানুষদের সাথেই খারাপ হয়। সবসময় খারাপ হয়। তুমি যদি একটু খারাপ হতে তাহলে হয়তো যা তুমি পাওনি তা সবই পেতে। কিন্তু সমস্যা হলো তুমি খুব ভালো যে। আর যদি বলো মহুয়ার সঙ্গে করা ঘটনা। তবে বলবো ঐ এক বিন্দু কষ্টের বিনিময়ে তুমি তাকে আকাশ সমান ভালোবাসা দিবে। আমি জানি তুমি এটাই করবো। তখন ঐ মেয়েই বলবে সেদিনের সেই কষ্ট তার কাছে মূল্যহীন। তুমি নিজের উপর বিশ্বাস না রাখলেও আমি তোমার উপর বিশ্বাস করি। আর হিংসে কেন করবে তুমি? তুমি তো ওদের বাচ্চাকে অনেক ভালোবাসবে। হয়তো ওদের চেয়েও বেশি।”
আফজাল রানীকে বোঝানোর চেষ্টা করে। রানী বুঝ মানে না। সে কান্না করতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে একটা সময় বলে,“একটা বাচ্চা। একটা বাচ্চার জন্য আমার সুন্দর জীবনটা তছনছ হয়ে গেলো তাই না? আমার সাজানো গোছানো সব কিছু নষ্ট হয়ে গেছে।”
“কিছু নষ্ট হয়নি। সব ঠিক আছে।”
“সব ঠিক থাকলেও মনের ক্ষতটা যে সারেনি। সেটা কখনো মুছবে না। কিছু ক্ষত মোছার নয়।”
রানীর এই কথাটা শুনে আফজাল তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। সে আর কিছু বলতে পারে না। তার কন্ঠ দিয়ে কোন শব্দ বের হয় না। সে চুপচাপ রানীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকে।
’
’
চলবে,
পরের পর্বগুলা এই ওয়েবসাইটেই ধারাবাহিক ভাবে প্রতিদিন দেওয়া হবে তাই পরের পর্ব মিছ না করতে চাইলে চোখ রাখুন আমাদের ওয়েবসাইটে,ধন্যবাদ
(ভুলক্রটি ক্ষমা করবেন। আশা করি খুব একটা খারাপ হয় নাই।)
