#বৃদ্ধ_বয়সে_মায়ের_ডিভোর্স
পর্ব-০২
লেখক~ 𝐒𝐭𝐨𝐫𝐲 𝐨𝐟 𝐘𝐞𝐚𝐬𝐢𝐧 𝐍𝐞𝐞𝐥
মা ফোনটা নামানোর পর কয়েক সেকেন্ড কিছু বললেন না। তার চোখে আমি এমন এক দৃষ্টি দেখলাম, যেটা ভয়, অবিশ্বাস আর এক অদ্ভুত শান্তির মিশ্রণ। যেন তিনি অনেক কিছু আন্দাজ করছেন, কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না।
আমি কাছে গিয়ে বললাম, “কি হয়েছে মা?”
মা ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকালেন। তার ঠোঁট শুকিয়ে গিয়েছিল। তিনি খুব আস্তে বললেন, “তোমার খালা বলছে… তোমার বাবার কিছু হয়েছে।”
আমার বুক ধক করে উঠল। “কি হয়েছে?”
মা মাথা নাড়লেন। “ঠিক বলেনি। শুধু বলেছে, আমাকে এখনই যেতে হবে।”
কিছুক্ষণ আমরা দুজনেই চুপ করে রইলাম। তারপর মা গভীর একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, “চলো।”
আমি বুঝতে পারলাম, এটা শুধু একটা সাধারণ খবর না। এর ভেতরে কিছু আছে।
আমরা দ্রুত বের হলাম। গাড়িতে উঠার পর পুরো রাস্তা মা চুপ ছিলেন। জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু মনে হচ্ছিল তিনি কিছুই দেখছেন না। তার চোখের ভেতর দিয়ে যেন পুরোনো সব স্মৃতি ভেসে যাচ্ছে।
হয়তো সেই প্রথম দিনগুলো… যখন তারা প্রেম করতেন।
হয়তো সেই সময়… যখন বাবা বলতেন, “আমি বড় পরিবার চাই, অনেক বাচ্চা, একটা ভরা সংসার।”
হয়তো সেই দিনগুলো… যখন মা রাত জেগে আমাদের দেখাশোনা করতেন, আর বাবা ঘুমাতেন নিশ্চিন্তে।
আমি চুপ করে ছিলাম। জানতাম, এই মুহূর্তে কিছু বলা ঠিক হবে না।
আমরা যখন খালার বাসার সামনে পৌঁছালাম, তখন বিকেল প্রায় শেষ। আকাশটা অদ্ভুত রঙ ধারণ করেছে, যেন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।
দরজা খুললেন খালা। তার চোখ লাল, মুখটা ক্লান্ত।
মাকে দেখে তিনি এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন।
“কায়লা… তুমি এসেছো,” তিনি ফিসফিস করে বললেন।
মা ধীরে বললেন, “কি হয়েছে? ও কোথায়?”
খালা একটু দূরে সরে গিয়ে আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। তার মুখে এমন এক অভিব্যক্তি, যেটা আমি আগে কখনো দেখিনি।
আমরা ড্রয়িংরুমে ঢুকলাম।
আর তারপর…
আমি স্থির হয়ে গেলাম।
সোফার কোণায় বসে ছিল একজন মানুষ।
চেনা, অথচ অচেনা।
সে আমার বাবা।
কিন্তু… এই মানুষটা সেই মানুষ না, যাকে আমি এক বছর আগে দেখেছিলাম।
তার চুল এলোমেলো, বেশিরভাগই পেকে গেছে। মুখে গভীর বলিরেখা। চোখের নিচে কালি। গায়ের রঙ মলিন। শরীরটা শুকিয়ে গেছে।
যে মানুষটা একসময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের “যুবক” চেহারা নিয়ে গর্ব করত… সে এখন নিজেই নিজের ছায়া হয়ে গেছে।
মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তার চোখ বড় হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না।
বাবা ধীরে মাথা তুললেন।
তার চোখে এমন এক দৃষ্টি… যেখানে অহংকার নেই, আত্মবিশ্বাস নেই… শুধু ক্লান্তি আর ভাঙন।
তিনি মায়ের দিকে তাকালেন।
তার ঠোঁট কাঁপল।
“কায়লা…”
মায়ের মুখ শক্ত হয়ে গেল। তিনি ভেতরে ঢুকে ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
“কি হয়েছে তোমার?” তার গলায় কোনো আবেগ নেই।
খালা পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “ওর সেই মেয়েটা… যে সাথে ছিল… সে ওকে ছেড়ে চলে গেছে।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
খালা বললেন, “ওর সব টাকা, সঞ্চয়… সব নিয়ে গেছে। আর কিছু রেখে যায়নি।”
বাবা মাথা নিচু করলেন।
“আমি বুঝিনি… আমি ভাবতাম… সে আমাকে ভালোবাসে…”
মা কিছু বললেন না।
খালা আবার বললেন, “শুধু তাই না… ওর ব্যবসাটাও ডুবে গেছে। অনেক ঋণ হয়েছে।”
ঘরটা ভারী হয়ে গেল।
আমি বাবার দিকে তাকালাম।
এই সেই মানুষ, যিনি এক বছর আগে বলেছিলেন, “তোমার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।”
আজ… যেন সময় তাকে ধরে এনে সেই একই কথাটা ফিরিয়ে দিয়েছে।
মা ধীরে ধীরে একটা চেয়ারে বসলেন।
তার চোখ বাবার ওপর স্থির।
“তুমি আমাকে এখানে কেন ডেকেছ?” তিনি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
খালা বললেন, “ও তোমার সাথে কথা বলতে চায়।”
বাবা মাথা তুলে তাকালেন।
“আমি ভুল করেছি, কায়লা,” তিনি বললেন। তার গলা ভেঙে যাচ্ছিল। “আমি খুব বড় ভুল করেছি।”
মা চুপ।
“আমি ভাবতাম… তুমি আর আগের মতো নেই। আমি ভাবতাম, আমি আরো ভালো কিছু পাবো…”
তিনি থেমে গেলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন, “কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।”
মা একটু ঝুঁকে সামনে এলেন।
“আর এখন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
বাবা চোখ নামিয়ে বললেন, “এখন আমি বুঝি… তুমি কি ছিলে।”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
আমি মায়ের দিকে তাকালাম।
তার মুখে কোনো দয়া নেই, কোনো রাগও নেই। শুধু একটা অদ্ভুত শান্তি।
“তুমি কি চাও?” মা সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন।
বাবা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “আমি… ফিরে আসতে চাই।”
আমার বুকের ভেতর কিছু একটা মোচড় দিল।
খালা চোখ বন্ধ করলেন, যেন এই উত্তরটা তিনি আগেই জানতেন।
মা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
তার চোখে চোখ রেখে বললেন, “ফিরে আসতে?”
বাবা মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ… আমি সব ঠিক করতে চাই।”
মা হালকা একটা হাসি দিলেন।
কিন্তু সেটা সুখের হাসি না।
সেটা এমন এক হাসি… যেখানে হাজারটা রাতের কান্না, অপমান, ত্যাগ সব জমে আছে।
“তুমি জানো,” মা বললেন, “এক বছর আগে তুমি কি বলেছিলে?”
বাবা চুপ।
মা নিজেই বললেন, “তুমি বলেছিলে, আমার মেয়াদ শেষ।”
তিনি একটু থামলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “আজ আমি তোমাকে দেখে একটা জিনিস বুঝলাম…”
ঘরের সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছে।
মা বললেন, “মেয়াদ আসলে কার শেষ হয়েছিল।”
বাবা মাথা নিচু করলেন।
তার চোখ থেকে পানি পড়তে লাগল।
মা ঘুরে দাঁড়ালেন।
“আমি অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছি তোমার কাছে,” তিনি বললেন। “কিন্তু আমি নিজেকে আবার নতুন করে শুরু করেছি।”
তিনি দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
আমি তার পেছনে গেলাম।
বাবা কাঁপা গলায় বললেন, “কায়লা… প্লিজ…”
মা থামলেন না।
দরজার কাছে গিয়ে শুধু একবার পেছনে তাকালেন।
তার চোখে কোনো ঘৃণা নেই।
শুধু মুক্তি।
“আমি আর সেই মানুষ না, যাকে তুমি ছেড়ে গিয়েছিলে,” তিনি বললেন।
তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন।
আমি তার পেছনে বের হলাম।
বাইরে বাতাসটা ঠান্ডা।
মনে হচ্ছিল… একটা অধ্যায় শেষ হয়েছে।
কিন্তু আমি জানতাম না…
এটাই শেষ না।
কারণ সামনে আরও কিছু আছে।
যেটা আমাদের জীবন পুরোপুরি বদলে দেবে।
#বৃদ্ধ_বয়সে_মায়ের_ডিভোর্স
