#অনুবদ্ধ_আয়াস 💚

#ইফা_আমহৃদ

পর্ব: ০২


" বিয়ে প্রথম সকালেই বুঝিয়ে দিলে, তুমি ঠিক কি? শাড়ি না পড়ে আমার ইমপ্রেস করার চেষ্টা করছ? কালকে তো বড় বড় জ্ঞান দিয়েছিলে, আগে নিজেকে বুঝতে!"


চরণ জোড়া থেমে গেল। মনে হলো মাটির ফাঁক দিয়ে অদৃশ্য শিকড় এসে পা দুটো আঁটকে দিলো। সাথে সাথে পেছনে ফিরলাম। রৌধিক তখন দেয়ালে হেলান দিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। দুহাত দিয়ে নিজেকে ঢাকার চেষ্টা করে অন্যদিকে ফিরলাম। তুতলিয়ে তুতলিয়ে বললাম,

" আসলে শাড়িগুলো কোথায় রাখা আছে, জানি না।"


আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই বললেন, " জানো না, না-কি না জানার ভান ধরছো?"

বলেই এগিয়ে এলেন তিনি।‌ হাতে তার টুথব্রাশ। ওয়াশরুশে ঢুকে ব্রাশ ধুয়ে রাখলেন। ট্যাপ ছেড়ে মুখে দিয়ে কুলি করে বেরিয়ে এলো। আমার সামনে দাঁড়িয়ে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলো কিয়ৎক্ষণ। অতঃপর আলমারি খুলে দিলো। হাত টেনে আলমারির সামনে দাঁড় করিয়ে বললেন,


" এখানে এতো এতো জামা কাপড় আর তুমি শাড়ি খুঁজে পাচ্ছো না। হাউ ফানি!"


" এগুলো তো শেফার জন্য কেনা জামা কাপড়..


" তো! কি হইছে? শেফার বরকে নিজের বর করতে পেরেছ, তার বিয়ের বেনারসী গায়ে জড়াতে পেরেছ। তাহলে এগুলো পড়তে কি সমস্যা?"

আমি মাথা নিচু করে রইলাম। একদিন নিজের এই অবস্থা, অন্যদিকে এই লোকটার কটু কথা! দুটোতেই হাঁপিয়ে উঠেছি। 


রৌধিক আলমারির ভেতর থেকে একটা শাড়ি বের করে ছুড়ে ফেললো আমার উপর। কেঁপে উঠলাম আমি। কর্কট কন্ঠে বললেন,


" এবার তো শাড়ি পেয়েছো? দাঁড়িয়ে না থেকে বিদেয় হও। নাকি নিজেকে দেখানোর বাকি আছে? তাহলে আমাকে না দেখিয়ে রাস্তায় গিয়ে দেখাও, অন্তত কিছু টাকা পাওয়া যাবে!"


সাথে সাথে শরীরের লোম গুলো দাড়িয়ে গেল। শেষে একটা রাস্তার মেয়ের সাথে তুলনা করলো। নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে এতোটাই নিচ হয়ে গেছে, আমি তার কি হই। সেটাই ভুলে গেছে। তবে আমি চুপ রইলাম না। দ্বিগুন তেজ নিয়ে বললাম,


" হ্যাঁ! প্রয়োজনে রাস্তায় গিয়েই দেখাবো। তাদের দেখালে টাকা পাওয়া যায়। আপনি তো আর টাকা দিতে পারবেন না। দিলেও বাবার টাকাই দিবেন। নিজে তো আর উপার্জন করেন না। টাকার মর্ম কি বুঝবেন?"


বলতে দেরী হলো চড় পড়তে দেরী হলো না। আরো একটা চ'ড় মা'রতে গিয়েও থেমে গেলেন। অন্যদিকে ফিরে রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেন। তার চোখের মণি গুলো জ্বলজ্বল করছে। শাড়িটা নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আমি শাড়িটা কোনোরকম তুলে ওয়াশরুমের ভেতরে ছুটলাম। 

________________


সোফার উপরে সং সেজে বসে আছি আমি। মাথায় একহাত কাপড় টেনে নত হয়ে আছি। যে যার মতো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। আমার পাশে বসে আছে রৌধিক ভাইয়ার ছোট বোন আদ্রিতা, ফুফুতো ভাই জাবিন, জান্নুবী। জান্নুবীর বয়স সাড়ে তিন বছর। আদ্রিক আঙ্কেল নিচে নামলেন। গিয়ে টেবিলে বসলেন। আমাকেও নিয়ে বসানো হলো। আমার সোজাসুজি চেয়ারে বসে আছে রৌধিকের দাদী এবং তার পাশে দাদা। আঙ্কেল বেশ গম্ভীর মানুষ, খাবার টেবিলে একদম কথা বলা পছন্দ করেন না। এমনকি প্লেট, চামচের টুং টাং ধ্বনিও না। বেশ কিছুক্ষণের নিরবতা ভেঙ্গে আদ্রিক আঙ্কেল বললেন,

" এই বাড়িতে তোমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?"


" না আঙ্কেল।"

আমার মৃদু স্পষ্ট জবার।  


" তোমার কিছু প্রয়োজন হলে রৌদুকে বলবে। কি বলছি আমি, সেই নিজেই তো একটা অপদার্থ। 

আমার বলবে। আমাকে বলতে সংকোচ হলে তোমার মাকে বলবে। তাছাড়া আদ্রু তো আছেই।"


আমি মাথা নাড়িয়ে সায় দিতেই খাবারে মনোনিবেশ করলেন। পুনরায় নিরিবিলি হয়ে গেল। পায়ের শব্দ শোনা গেল। আদ্রিক আঙ্কেল সিঁড়ির দিকে তাকালেন। রৌধিক শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে নেমে আসছে। ডাইনিং অতিক্রম করে যাওয়ার সময় ডেকে উঠলেন আঙ্কেল,


"রৌদু! দাঁড়াও!"


আঙ্কেলের গলা গম্ভীর। রৌধিক থেমে গেল। মাথা নত করে দাঁড়ালো। রৌধিক বেপরোয়া হলেও আঙ্কেলের কাছে একদম বাচ্চা। আদ্রিক আঙ্কেল উঠে গেলেন। রৌধিকের সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,


" রৌদু কোথায় যাচ্ছো তুমি?"


" ক্লাবে!" রৌধিকের একরোখা জবাব।


" কাল তোমার বিয়ে হয়েছে। বাড়ি ভর্তি মেহমান। প্রেস, মিডিয়া গিজগিজ করছে। আর তুমি ক্লাবে যাচ্ছো? তুমি জানো, এই খবরটা লিক হলে আমার মান সম্মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

রৌধু, তুমি বিয়ে করেছো! সংসার হয়েছে। কিছুদিন পরে বাচ্চার বাবা হবে।"


" বাবা আমি তোমার মান সম্মানের কথা ভেবে এই বিয়েতে রাজি হয়েছি। আমাকে দিয়ে সংসার কিংবা বাচ্চার চিন্তা করো না।

কালকে রাতে আমি সাফ-সাফ জানিয়ে দিয়েছি, আমার মনে কিংবা ঘরে কোথাও এই মেয়েটার জায়গা হবে না।"


রাগে পিত্তি জ্বলে উঠলো আমার। এই মেয়ে, এই মেয়ে ছাড়া কথাই বলতে পারে না সে। খাবার ছেড়ে দু'পা এগিয়ে গিয়ে বললাম,

-" এই শুনেন, আমি আপনার ঘরে কিংবা আপনার মনে থাকার জন্য মরে যাচ্ছি না। এই বাড়িতে তো আরো জায়গা আছে, আমি সেই ঘরেই থামবো।"


আমার কথা শেষ আগেই আঙ্কেল বললেন,-" না! তোমরা এক ঘরেই থাকবে। আমি চাই না, প্রেস মিডিয়া সামান্য এক বিষয় নিয়ে জল ঘোলা না করুক।

রৌধু ঘরে যাও।"


বলেই হনহনিয়ে চলে গেলেন তিনি। রৌধিক হিংস্র বাঘের ন্যায় আমার দিকে চেয়ে আছে। কিন্তু তার হিংস্রতায় আমি ভয় করি না। অন্যদিকে চেয়ে রইলাম, বেশ হয়েছে। আমাকে কথা শোনানো হচ্ছিলো না। এবার বোঝ! 

রৌধিকও প্রস্থান করলেন। রৌধিক যেতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। আঙ্কেলের উপর রাগ সব আমার উপরে ঝাড়বে। 

.

হাতে খাবারের ট্রে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি মিনিট বিশেক হয়েছে। সামনে পা ফেলতেই গিয়েও বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। বুক ভরে শ্বাস নিতে রুমের দরজা খুলে অন্তর্ভাগে প্রবেশ করলাম। রৌধিক বেডের মাঝ বরাবর বসে ফোন টিপছে। আমি না তাকিয়ে বুঝতে পারছি, রৌধিক তার রৌদ্রমাখা চোখে তাকিয়ে আছে। টেবিলের উপর রেখে গাঁ ছাড়া ভাব নিয়ে বললাম,-" আন্টি খাবার পাঠিয়েছে!"

বলেই উল্টো হাঁটা ধরলাম বেলকেনির দিকে‌। বেলকেনির দরজা পেরিয়ে আরেক পা ফেলতেই হাত ধরে ফেললো কেউ। এক টান দিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলেন আমায়। মাথার ঘোমটা টানা কাপড় খুলে পড়লো নিচে। আমার হাত পেছনে মুচড়ে ধরলেন পেছনে।‌ দৃষ্টি ঘুরিয়ে তার মুখের দিকে চাইলাম। ত্রুব্ধ চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি চাইলেই ভয়ংকর ভাবে চোখ রাঙালো। দাঁতে দাঁত ফিসিয়ে বলল,

" কি মনে করো তুমি নিজেকে? আজ তোমার জন্য! একমাত্র তোমার জন্য বাবা আমাকে খাবারের খোঁটা দিয়েছি। তোমাকে তো ইচ্ছে করছে..


বলেই ধাক্কা দিয়ে বেলিকেনির রেলিং এর উপর ছুড়ে মারলেন। সরে আসতে নিলে আরো দৃঢ়ভাবে চেপে ধরলেন। ঝুঁলে রইলাম বেলিকেনি দিয়ে খানিকটা বাইরে। পিঠে মাঝে কিছু একটা ফোঁটার মতো ব্যাথা অনুভব করলাম। তবে দৃঢ় নয়। তার হাত সরিয়ে আসতে নিলে পুরো শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো। মুখ কুঁচকে গেল। চিৎকার করে আর্তনাদ করে উঠলাম। সাথে সাথে দুই বাহু খামচে ধরলাম রৌধিকের। চোখের কার্নিশ গড়িয়ে অশ্রু পড়তে লাগলো। রৌধিক সন্দিহান চোখে চাইলো। গালে হাত রেখে বলল,


" এই মেয়ে কি হয়েছে তোমার? এমন করছো কেন?"


নিভু নিভু চোখে চাইলাম। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠছে দেহটা। ততক্ষণে সবাই এসে জড় হয়েছে রুমে। আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। নিশি আন্টি বলল,

" জোনাকি, কি হয়েছে তোমার? এমন করছো কেন?"

" আমার পিঠে!" ব্যাথিত কন্ঠে বললাম।

রক্তে পিঠের দিকটার ব্লাইউজ ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। সবাই ধীরে ধীরে আমাকে দেয়াল থেকে সরিয়ে আনল। গ্ৰিল বিহীন রেলিং এর সূচালো কোণায় অসাবধানতায় পিঠ আঁটকে গেছিলো। যেটা ব্লাউজ ভেদ করে উন্মুক্ত পিঠে আঘাত করেছে।


অতি সাবধানে বেডের উপর বসিয়ে দিল আমায়। রৌধিক মাথা নিচু করে রয়েছে। আদ্রিক আঙ্কেল চ'ড় বসালেন রৌধিকের গালে।


" বাবা আমি আসলে..

 তেজ নিয়ে বললেন,

" চুপ! একদম চুপ! এই মেয়েটাকে আমার সম্মান বাঁচাতে আমার বাড়ির বউ করে এনেছি, আঘাত করতে আনি নি। তুমি আমার উপরের রাগ এই মেয়ের উপর দেখিয়ে কি অবস্থা করেছো দেখেছো? তোমার শেফা হলে এটা করতে পারতে? যে মেয়েটা আমার এবং আমার পরিবারের সম্মান বাঁচিয়েছে, তাকে তুমি..


রৌধিক আমার দিকে বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইল। দেখে মনে হচ্ছে না, আদ্রিক আঙ্কেলের কোনো কথা তার কানে পৌঁছেছে। নিভু নিভু অধর নেড়ে কিছু একটা উচ্চারণ করলো, তা শ্রবণেন্দ্রিয় পর্যন্ত পৌঁছালো না আমার। আদ্রিক আঙ্কেল রৌধিক কে রুম থেকে বের করে দিলেন। রৌধিকের অসহায় মুখ দেখে কষ্ট হচ্ছিল আমার। আমি জানি মনে হচ্ছিল, সে ইচ্ছে করে কিছু করে নি। রাগের বশে হয়ে গেছে।


[চলবে.. ইনশাআল্লাহ]#অনুবদ্ধ_আয়াস 💚

#ইফা_আমহৃদ

পর্ব: ০৩


মাঝরাতে বুকের উপরে ভারী কিছু আবিস্কার করলাম। নাকে ভেসে এলো বিচ্ছিরি গন্ধ। ঘুমের মাঝে তিঁতঘুটে ঢেকুর উঠলো। ফট করে চোখ মেলে তাকালাম। আমার দুপাশে হাত রেখে রৌধিক নির্ভাবনায় ঝুঁকে আছে। গলা খাঁকারি দিয়ে অশান্ত কন্ঠে বললাম,


" কী? কী হচ্ছে কি মিঃ? উঠুন আমার উপর থেকে।"


নিভু নিভু চোখে অবলোকন করলো আমায়। ঘুমু ঘুমু চোখ তার। হাত বাড়িয়ে আমার মাথার অগোছালো চুলগুলো ললাটের উপর থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। হুট করেই অধর ছুয়ে দিল ললাটের মাঝবরাবর। কেঁপে উঠলাম আমি। খামচে ধরলো তার হাত। তিনিও কেঁপে উঠলো। রক্ত গড়ালো হাত বেয়ে। তিনি নিজের হাতের দিকে চেয়ে নেশালো মানুষের ন্যায় টেনে টেনে বললেন,

" আমাকে আঘাত করছিস তুই? রিভেঞ্জ নিতে শিখে গেছিস দেখছি। তুই জানিস না রৌধিক কাউকে অহেতুক আঘাত করে না। তাহলে..


ঠোঁট উল্টে বললেন তিনি। নাকের ডগায় নিজের নাক ঘসলেন। তীব্র গন্ধ আরো তীব্রতর হয়ে উঠলো। বিদেশি মানুষ। জানতাম, রৌধিক এইসব খেয়ে আসবে। তবুও কেমন বিশ্বাস যোগ্য হতো না। হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিলো আমায়‌। নিজের বলিষ্ঠ পুরুষালী হাতটা পিঠের ক্ষত স্থানে রাখলো। হাত বোলালেন কিয়ৎক্ষণ। নয়ন যুগল আপনাআপনি গ্ৰথণ হয়ে এলো। আমার মাথার সাথে নিজের মাথা ঠেকিয়ে দম বন্ধ শ্বাস নিলেন। হুট করেই আমাকে ছেড়ে ব্লাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। সেকেন্ড দুই অতিবাহিত হওয়ার পরে মাথা বের করে সহজতর ভাষায় বললেন,


" যাও! সোফায় গিয়ে ঘুমিয়ে পরো। আমার কথার অবাধ্য হলে কি হতে পারে, তা তোমার ধারণার বাইরে!"


অধর দিয়ে জিভ ভিজিয়ে নিলাম। ঘনঘন পলক ফেলে আমতা আমতা করে বললাম, " মা-মানে?


হুস বলে ভ্রু কুঁচকালেন তিনি। উঠে গিয়ে কাবার্ড হাতরাতে লাগলেন। নিজের কাঙ্খিত জিনিসটা হাতে নিয়ে বসলেন আমার সন্নিকটে। আমার হাত টেনে নক গুলো স্বযত্নে কেটে দিতে লাগলেন। হাত সরানোর চেষ্টা করতেই চোখের ভ্রু কেটে দেওয়ার দেয়ার চেষ্টা করলো। অসহায় হয়ে চেয়ে রইলাম। আমার এতো সাধের নক। ভাঙা গলায় বললাম, " প্লীজ! ছাড়ুন। কি করছেন?"


" হুস! দেখেছো আমার হাতের কি অবস্থা? তোমার এই সুন্দর রুপের মাঝে এই বড় বড় অপদার্থ নখগুলো বেমানান।"

হাতের পিঠ দেখিয়ে বললেন। সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। অনুতপ্ত হলাম আমি। আমিই বা কি করতাম, তিনি হুট করে ওমন করেছেন বলেই তো?

অস্থিরতা মেশানো কন্ঠে বললেন," আমি কখনো কোনো নারী জাতির গাঁয়ে হাত তুলি নি। তুইই প্রথম যাকে আঘাত করেছি। বিশ্বাস করো, আমি ইচ্ছে করো কিছু করিনি। ভালোবাসা আমাকে অসহায় করে দিয়েছে।"


আমি চুপ করে রইলাম। মুগ্ধ হলাম আরো একবার। মিনমিনে বললেন," জানো আজ তোমাকে কতোটা সুন্দর লাগছিল? একদম পরীর মতো। আমার ঘরেও একটা পরী রয়েছে, আমি জানতাম না। বিলিভ মি!

তুমি আমার জোনাকি পোকা। আমার আঁধার ঘরের জোনাকি। নিভু নিভু আলোয় জ্বলে উঠ তুমি। আমার অনুবদ্ধ আয়াসের সমাপ্তি।" 


কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলাম আমি। তারমানে এই ছেলেটা সকালে আমাকে বকার ফাঁকে ফাঁকে দেখছিল। ছিঃ ছিঃ কি লজ্জা। তখন এমন ভাব নিচ্ছিল, যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। অতি সাহস সঞ্চয় করে বললাম,

-" তাহলে সকালে আপনি আমাকে ঐ নজরে দেখছিলেন?"


" কোন নজরে? আমি বউ বউ নজরে দেখছিলাম! আমার বউ। আমার যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে দেখবো। তুমি বলার কে?"


" আমি কে মানে?"


"সেই তো? তুমি কে?"

আমি কিছু বলতেই চাইলেই হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন। আঙুল তুলে সোফার দিকে দেখিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন। ঘুমের ঘোরে কিসব বললেন। অথচ আমাকে দুই চোখে সহ্য করতে পারে না। সকালে বললে, একদমই বিশ্বাস করতে পারবে না। এই ছাই পাশ যদি হারাম না হতো, তাহলে আমি নিজে তাকে কিনে খাওয়াতাম।


রুমের বাতি নিভিয়ে ড্রিম বাতি জ্বলিয়ে দিলাম। কাবার্ড থেকে ব্যাগ বের করলাম। সেখানে স্বযত্নে রাখা ডাইরীটা হাতে নিলাম।


উপরে লেখা আছে অনুবদ্ধ আয়াস 💚। বেশ কিয়ৎক্ষণ হাত বুলিয়ে নিলাম লেখাটার উপর। অনুভূতিতে দেহের সর্বাঙ্গ পূর্ণ হয়ে গেল। চোখ জোড়া গ্ৰথণ করতেই কার্নিশ গড়িয়ে পড়লো অশ্রুধারা। টেবিলের উপর বসে লিখতে বসলাম মনের ভেতরের চাপা আর্তনাদ গুলো। টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। দক্ষিণা হাওয়া বইছে জানলা দিয়ে। শাড়ি আঁচল টেনে কলম চালালাম ডাইরীর ফাঁকা পৃষ্ঠায়। 


বাবা,

জানি না কেমন আছো তুমি? আমি সর্বদা তোমার কথা মেনে জীবনের প্রতিটি ধাপ এগিয়েছি। আজ তুমি আমার পাশে নেই, জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত টা আমি নিয়ে ফেলেছি। তোমার ইচ্ছে ছিল, লাল টুকটুকে বউ সাজিয়ে একটি ছেলের হাতে তোমার মেয়েকে তুলে দিবে। কিন্তু সেই ইচ্ছে টা নাহয় স্বপ্নই রয়ে গেল। ইচ্ছে টা পূরণ করতে হলে তোমাকে বাঁচাতে হবে। তোমার ইচ্ছে পূরণ হবে, তবে আমার মাধ্যমে নয়। জয়ার মাধ্যমে হবে। 

জানি না কিভাবে তোমাকে সত্যি টা বলবো। তবে একটু ধৈর্য ধর, ঠিকই বলবো..


পায়ের কাছে কিছু একটা বিকট শব্দে পড়ল। কলম পড়ে গেল হাত থেকে। ফট করে চাইলাম। রৌধিক বেডের উপর বসে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। চেঁচিয়ে বললেন,

" এইভাবে কাঁদছ কেন তুমি? সিমপ্যাথী জন্য। তাই তো! তোমার সিমপ্যাথীতে আমাকে ভুলাতে পারবে না। নিজের ইনোসেন্স দেখিয়ে সবাইকে পুতুল বানাতে পারলেও, আমাকে পারবে না। তাই এই নাটকটা একলিস্ট ঘরে বসে করো না। নেক্সট টাইম ভাববো না। সোজা বের করে দিবো। স্টপ..


শেষের শব্দ টা চেঁচিয়ে বললেন তিনি। কেঁপে উঠলাম আমি। তিনি ত্রুব্ধ চোখে আমার দিকে চেয়ে বেলকেনিতে চলে গেলেন। আমি আগের ন্যায় বেলকেনির দিকে চেয়ে আছি। এইতো ভালো ব্যবহার করেছিলেন, তাহলে হঠাৎ কি হলো তার? আমি কাঁদছি বলে তার কষ্ট হচ্ছে না-কি আলোর কারণে তার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটেছে? ডাইরীর মাঝে কলম রেখে ব্যাগে ভরে রাখলাম। অতঃপর ফাঁকা জগ নিয়ে বেরিয়ে এলাম। আন্টি বারবার বলে গেছেন, রৌধিক আসলে তাকে খাবার এনে দিতে। আত্মীয়-স্বজন চলে গেছে, তাই তাড়াতাড়িই শুয়েছে তারা।


ট্রে নিয়ে হাজির হলাম। রুম ফাঁকা। নাকে বিচ্ছিরি গন্ধ আসছে। রুম স্প্রে দিয়ে গন্ধ দূর করার চেষ্টা করলাম। বেলকেনির দিকে পা বাড়ালাম। রৌধিক বেলকেনির রেলিং এ দুই হাত রেখে দূর আকাশে চেয়ে আছেন। হয়তো নিজের অতীত মনে পড়ছে। আমার জায়গায় শেফাকে মনে পড়ছে‌। কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,

" শুনছেন? আপনার খাবার এনেছি! খেয়ে নিন।"


রৌধিক চাইলো আমার দিকে। তার চোখে অসহায়ত্ব খুঁজে পাচ্ছি। চোখে চোখ রাখার মতো সাহস নেই আমার। শান্ত গলায় বলল,

" আমি খাবো না। যাও! তুমি খেয়ে নাও।"


" রাত তো অনেক হলো। সারাদিন কিছু খান নি। বেশি না, একটু কিছু খেয়ে নিন।"


" তোমাকে আমি যেতে বলেছি। জাস্ট গো! এইধরনের মেয়েদের সাথে একটু ভালোভাবে কথা বললেই, মাথায় চড়ে বসে।"


হাতের পিঠ দেখিয়ে থামিয়ে দিলাম তাকে। সন্দিহান স্বরে বললাম," ওয়াট ডু ইট মিন বাট এই ধরনের মেয়ে। সম্মান এবং সামলে কথা বললেন। এই ধরনের মেয়ে আপনার বউ হতে আসে নি। আপনার বাবার সম্মানের কথা ভেবে বিয়েতে বসেছে। আমি এক্ষুনি এই বাড়ি থেকে চলে যেতে পারি। কিন্তু আমি স্বার্থপর নই। অন্যের উপকারের মূল্য দিতে জানি।"


আর কথা না বাড়িয়ে সোফা এসে শুয়ে পড়লাম। এই মানুষটা গিরগিটির মতো। গিরগিটির চেয়েও বেশি রং বদলায়। গিরগিটির রং বদলাবে এটা স্বাভাবিক। গিরগিটিও এতো তাড়াতাড়ি নিজের রং বদলাতে পারে না। যেটা সে পারে। শাড়ির লম্বা আঁচল টেনে শরীর ঢেকে ঘুমিয়ে পড়লাম।


[চলবে.. ইনশাআল্লাহ]
 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url