#মায়াবিনী_বিরহিণী (৩)

#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি


তুবা কাঁদতে কাঁদতে বাসার পথের দিকে আসছিলো। রাস্তার পাশের টং দোকানে মেজবাহ বসেছিলো। তুবা কাঁদছে দেখে এগিয়ে আসে। শান্ত গলায় জানতে চায়,“তুই কাঁদছিস কেন?”


তুবা কান্না না থামিয়ে মেজবাহার দিকে তাকায়। মেজবাহ আবারও একই প্রশ্ন করে। অবুঝ তুবা এবার আরও শব্দ করে কান্না করে দেয়। মেজবাহ ঘাবড়ে যায়। কিছুটা উদ্বিগ্ন গলায় বলে,“তোর কি হয়েছে তুবা? কেউ তোকে বকেছে?”


“তুমি জানো মিজু ভাইয়া কি হয়েছে?”

তুবার প্রশ্নে মেজবাহ বোকা বনে যায়। নিজেকে সামলে বলে,“তুই তো বলিসনি। না বললে জানবো কিভাবে?”


”হ্যাঁ তাই তো।”

এটা বলে তুবা কিছুটা ভাবুক হয়। একটু থেমে বলে,”জানো মিজু ভাইয়া আমাকে কেউ ভালোবাসে না। সবাই আমাকে নিয়ে মজা নেয়। সবাই আমাকে কষ্ট দেয়। শুধু কষ্টই দেয়।”

কথাটি বলে আবারও শব্দ করে কেঁদে দেয়। মেজবাহ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“শান্ত হ বোন। শান্ত হয়ে বল, কি হয়েছে? কে বকেছে? কে কষ্ট দিয়েছে?”


”সবাই। স্কুলের সবাই।

আমি মটু, আলুর বস্তা, পটকা। আরও কত কি। এসব বলে রোজ সবাই কথা শোনায়। কেউ খেলতেও নেয় না। আমি কাছে গেলে সবাই দূর দূর করে।”

এতক্ষণে তুবার কান্নার কারণ বুঝতে পারে মেজবাহ। সে খুব শান্তভাবে বলে,“ওরা বাজে তাই কষ্ট দেয়। আর যারা বাজে লোক হয় তাদের সঙ্গে দূরত্ব বঝায় রেখে চলাই ভালো। খারাপ….।”


”ওরা খারাপ?

কিন্তু এটা তো সত্যি আমি মোটা। আমি মোটা দেখেই দৌঁড়াতে পারি না। আমি অল্পে হাঁপিয়ে যাই।”

তুবা এভাবে একের পর এক কথা বলে যায়। অভিযোগ জানায় বিধাতাকে যে তাকে এভাবে বানিয়েছে। মেজবাহ বড্ড ধৈর্য নিয়ে তাকে বোঝায়। এটা তার স্বকীয়তা। মোটা হওয়া খারাপ নয়। তাছাড়া এই অবস্থায় তুবাকে বেশ ভালো লাগছে। মেজবাহ খুব মিষ্টি করে বলে,“তোকে গোলুমুলু এক পুতুল লাগছে। তবে সবাই পুতুলের মর্ম বোঝে না। তাই বাজে কথা বলে। তাদের কথায় কষ্ট পাওয়া বোকামি। অনেক বেশি বোকামি।”


“তাই?”

তুবা শান্ত গলায় জানতে চায়। মেজবাহ মাথা নাড়ায়। যার অর্থ হ্যাঁ। মেজবাহ এবার নরম গলায় বলে,“মানুষ অন্যকে কষ্ট দিয়ে মজা পায়। তারা কষ্ট দিলে কষ্টটা দেখাতে হয় না পাগলি, তার দেওয়া কষ্টের বিনিময়ে তুই যদি খুশি উপহার দিস তবে ওটাই হবে তার যোগ্য শা স্তি।”


অবুঝ তুবা এতবড় কথাটার ভাবার্থ না বুঝলেও মুগ্ধ হয়। কথাটা তো বেশ ছিলো। তাছাড়া সেদিন প্রথমই আঠারো বছরের মেজবাহকে ভালো লেগে যায় তুবার। তার চোখে মনে হয় সে খুব ভালো মানুষকে দেখছে। এই মানুষটা বড্ড ভালো। সবচেয়ে বড় কথা তার মোটা হওয়া তার জন্য খুঁত নয়। তার এই ছোট কথাটায় তুবার জন্য তার ব্যক্তিত্ব অন্যভাবে প্রকাশ করে। যেটা কয়েক বছর যেতেই ভালো লাগা থেকে অন্য অনুভূতির জন্ম দেয়।


গাড়ি থামে। গাড়িটা থামায় তুবাকে ভাবনা থেকে বের হ'তে হয়। এতক্ষণ সে অতীতের স্মৃতিচারণ করছিলো। সেবার মেজবাহ ছুটিতে তাদের বাড়িতে এসে বড্ড ভুল করেছে। তার জন্য। সেদিন সে না মেজবাহার সামনে কাঁদতো, না বা জানতো যে মানুষটা তার মোটা হওয়াকে খুঁত নয় স্বকীয়তা মানে। না সে পরবর্তীতে ভুল করতো। হ্যাঁ ভুল। ভালোবাসা তো ভুলই। এটা ভেবে তুবা ম্লান হাসে। সে মেজবাহার দিকে তাকায়। গাড়িটা থামলো কেন, জানতে চায় না। শুধু শান্ত চোখে চেয়ে থাকে। মেজবাহ গাড়ি থেকে বের হয়ে যায়, তুবা গাড়িতেই বসে থাকে। কিছুটা সময় পর মেজবাহ ফিরে আসে। হাতে খাবার। কোনরকম তুবার দিকে দু’টো খাবার এগিয়ে দেয়। কিছুটা ফেলে দেওয়ার মতোই দেয়। তুবা কিছু বলে না। সে শুধু দেখে মেজবাহার আচরণ। না সে খাবারটা খায়। চুপচাপ বসে থাকে। মেজবাহ আপন মনে একাই খেয়ে নেয়। তুবা খাচ্ছে না দেখেও তেমন হেলদোল দেখায় না। তুবাকে নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। তুবা হঠাৎ নরম গলায় বলে,“আচ্ছা মেজবাহ। বৃষ্টি তোমাকে কখনো নিজ মুখে ভালোবাসার কথা বলেছে?”


মেজবাহ তুবার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকায়। তুবা কিছুটা হকচকিয়ে যায়। নিজেকে সামলে বলে,“না মানে বৃষ্টি তোমায় ভালোবাসলে তো পালাবে না। তাহলে নিশ্চয় বিপদে রয়েছে। আমাদের তো তার খোঁজ নেওয়া উচিত। তাই আর….।”


মেজবাহ কোন জবাব দেয় না। সে আবার গাড়ি স্ট্যার্ট দেয়। তুবাও চুপ হয়ে যায়। মেজবাহ তুবাকে আড়চোখে এক পলক দেখে মনেমনে বলে,“আমার পেট থেকে কথা বের করার ধান্দা তাই না? আমি বৃষ্টিকে খুঁজছি, এটা জানলে নিশ্চয় তুই সতর্ক হয়ে যাবি। জানি তো আমি।”

মেজবাহ নিশ্চিত তুবাই কিছু করেছে। তবে তুবার এত ক্ষমতাও নাই। রাতারাতি বৃষ্টিকে ঘায়েব করে দিবে। নিশ্চয় বাড়ির আশেপাশে কোথাও রয়েছে। সম্ভাবনাময় সব স্থানে মেজবাহ খোঁজ নিচ্ছে। এসব ভাবনার মাঝে হঠাৎ মেজবাহার মন বলে,“যদি সত্যি এমন হয় যে তুবা বৃষ্টির সঙ্গে কিছুই করেনি। সত্যি যদি বৃষ্টি পালায়। তাহলে…।”

এটা ভাবনায় আসতে মেজবাহ গাড়ির ব্রেক করে ফেলে। তুবা হতভম্ব হয়ে যায়। শান্ত গলায় বলে,“কি হয়েছে?”


মেজবাহ এক পলক তুবার দিকে তাকায়৷ নিজেকে সামলে বলে,“কিছু না।”


_____


তুবা ফ্লাটে এসে বসার ঘরে বসে রয়েছে। মেজবাহ ঘরে গিয়ে বিছানা শুয়ে পড়েছে। তুবা এখানে বসে ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবছে, তার এখন কি করা উচিত? মেজবাহ কিছুই বলেনি। কিছুটা সময় ভেবে তুবা মেজবাহার ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। দরজার সামনে এসে থেমে যায়। তার পা চলছে না। অনেকটা সাহস নিয়ে সে ভেতরে প্রবেশ করে। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানায় কোনায় বসে। মেজবাহ এখনো ঘুম পড়েনি। সে আড়চোখে তুবার দিকে তাকায়। কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলে,“পাশের ঘরে কাল খাট বসিয়ে দিবো। কাল থেকে সেখানেই থাকবে। আজকের রাতটা আপাতত এখানে থাকো।”


“এটা তো শান্ত গলায় বলা যায়।

সবসময় এত রাগ নিয়ে কথা বলার কি আছে?”

তুবা এবার কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বলে। মেজবাহ এবার উঠে বসে। দ্বিগুন রাগ নিয়ে বলে,“তোর মুখটা দেখলেই আমার রাগ হয়। শান্ত থাকতে পারি না।”

একটু থেমে আবার বলে,“তুই ভাব, তোর চোখের সামনে তোর অপছন্দের মানুষ। তোর ভালোবাসা কেড়ে নেওয়া মানুষটা রয়েছে। তখন কেমন লাগবে?”


তুবা চুপ হয়ে যায়। মেজবাহ নিজ থেকে বলে,“একটা কথা মনে রাখিস তুবা। এই দুনিয়ায় দু’জন ভালোবাসার মানুষকে আলাদা করে কেউ সুখী হতে পারে না। তুইও পারবি না। সুখ তোর কপালে সইবে না।”


“আচ্ছা।”

তুবা শান্ত গলায় বলে। মেজবাহ ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকায়। প্রচন্ড বিরক্তি ধরে গিয়েছে। বিরক্তিময় কন্ঠে বলে,“হ্যাঁ। তুই জোর করে আমার সঙ্গে এসে ঠিক করিসনি। বিশ্বাস কর ঠিক করিসনি। জোর করে কারো জীবনে ঢোকা যায়, জোর করে তার সঙ্গে ফ্লাটে আসা যায় কিন্তু তার মনে ঢোকা যায় না। তুইও পারবি না। শুধু মন নয় এই ফ্লাটে তোর থাকা আমি বার করছি।”


”তোমার মনে হতেই পারে আমি তোমার বাবাকে বলে এখানে জোর করে এসেছি। এটা তোমার মনে হওয়া। কিন্তু এমন কোন কথা নেই যে তোমার মনে হওয়া সবসময় ঠিকই হবে।”

এটা বলে তুবা উঠে দাঁড়ায়। সে বিছানা থেকে একটি বালিশ নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। মেজবাহ রাগ দেখিয়ে কিছু বলতে চায়। কিন্তু পারে না। ইতিমধ্যে তুবা চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। তাই মেজবাহ চুপ হয়ে যায়। উঠে ঘরের লাইট নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। ঘরের লাইট নিভে যেতে তুবা চোখ মেলে তাকায়। আনমনে বলে,“সারাজীবন আমাকে ভুলই বুঝে গেলে মিজু। কখনো ঠিক বুঝলে না। আমার হৃদয়ের ভালোবাসা নাহয় নাই বা বুঝলা। একটু স্বচ্ছতা তো দেখতে পারতে। এতটুকু আশা আমি তোমার কাছে রাখতে পারি না।”

এটা ভেবে তুবা আনমনে হাসে। না এই হাসি খুশির নয়। এটা বিদ্রুপের হাসি। নিজের উপর নিজের বিদ্রুপ করা, উপহাস করার হাসি। এটা বড় বেদনাময় হাসি। যে বেদনা সবাই বুঝতে পারে না।

চলবে,

(ছোট হয়ে যায়? একটু ধৈর্য ধরুন বড় বড় পর্ব করার চেষ্টা করছি। লেখা কেমন হচ্ছে?) পরের পর্ব গুলা এই ওয়েবসাইটেই পাবেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url