#জীবন_সংসার

#পর্ব-২+৩

#আমিনুর রহমান


আমার চোখের জলে ডিভোর্স পেপারটা ভিজে গেলেও আবিরের চোখটা বিন্দুমাত্র ভিজলো না। আমি শুধু আবিরের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম একটা মানুষ কয়েকটা দিনের ব্যবধানে এতোটা পরিবর্তন কি করে হতে পারে? কখনো ভাবিনি সে এতোটা চেঞ্চ হবে কিন্তু হয়েছে। আবিরের সাথে আমার পাঁচ বছরের সংসারটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। শুধুমাত্র একটা বাচ্চার জন্য। অথচ সে চাইলেই আমাদের সংসারটা টিকিয়ে রাখতে পারতো। বাচ্চা দত্তক নিতে পারতো কিংবা অন্য কোনো উপায়ে নিতে পারতো যদি সে চাইতো। কিন্তু সে তাঁর নিজের রক্তের কাউকে চায়। তাই হয়তো আমাদের ডিভোর্সের সময় তাঁর চোখে কোনো জল আসেনি। খুশি মনেই সে ডিভোর্স পেপারটাতে সাইন করেছে। আমার ভালোবাসাটা যে কোনোদিন এতো সস্তা হয়ে যাবে কখনো ভাবিনি আমি। কোনো এক সময়ের দামি ভালোবাসাটায় আমার কাছে আজ খুব সস্তা মনে হচ্ছে।


বাবা মাকে যখন বলেছিলাম আমি একটা ছেলেকে পছন্দ করি, তাঁর সাথেই আমি আমার সংসার জীবন শুরু করতে চাই। তখন আমার বাবা মা আমাকে জোর করেনি। শুধুমাত্র বলেছিলে,

"আর যাই করিস না কেনো,নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা একটু ভেবে চিন্তে নিবি। হুট করেই কোনো সিদ্ধান্ত নিবি না। মনে রাখবি যেসব ছেলেরা বিয়ের আগে খুব ভালোবাসা দেখায়,প্রেম দেখায় সেসব ছেলেরা বিয়ের পরে ততোটা প্রেম দেখাবে না। ভালো প্রেমিক হওয়া যতোটা সহজ একজন ভালো স্বামী হওয়া ঠিক ততোটাই কঠিন। আজকাল ভালো প্রেমিকের অভাব নেই,রাস্তার মোড়ে,দোকানপাটে যেখানে সেখানে খুঁজলে সস্তা মানের ভালো প্রেমিক পাওয়া যাবে কিন্তু সেইসব সস্তা প্রেমিকেরা ভালো স্বামী হতে পারে না।"


আমি সেদিন বাবার কথা গুলো গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু আজ ঠিকই বুঝতে পারছি। ভালো স্বামী সব মেয়ের কপালে জুটে না। যদি বাবা মায়ের মতে বিয়ে করার পরেও স্বামীর সংসারে কোনো মেয়ে সুখী না হতে পারে তাহলে সে মেয়ে বড় মুখ করেই বাবার বাড়ি থাকতে পারবে। কিন্তু যে মেয়ে নিজের ইচ্ছেতে নিজের প্রেমিককে বিয়ে করে সুখী হতে পারেনি,সংসার টিকেনি সেই মেয়ে কিভাবে তাঁর বাবা মায়ের কাছে বড় মুখ করে থাকবে?


কিন্তু আমার এছাড়া কোনো উপায় নেই। আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আমি জানি আমার পৃৃথিবীর আর কোথাও থাকার জায়গা না হলেও একটা জায়গায় ঠিকই হবে। সেটা হচ্ছে আমার নিজের বাবার বাড়ি। প্রতিটি বাবা মাকেই তাদের মেয়ের বিয়ের পরেও মেয়ের চোখের জল মুছে দেওয়ার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়। কারণ বিয়ের পরে বিচ্ছেদ হয়ে বাপের বাড়ি ফিরে আসতে হতে পারে হয়তো এই ভেবে বাবা মা তাদের মেয়ের চোখের জল মুছে দেওয়ার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকে।


আমি যখন সুটকেস হাতে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিংবেল চাপলাম তখন আমার মা দরজা খুলে আমাকে প্রথম যে কথাটা জিগ্যেস করলো সেটা হলো,

"তুই একা কেনো? তোর হাসবেন্ড কোথায়?"


আমি তখন কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু বললাম,

" মা আবির আবার বিয়ে করছে আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে।"


বলেই আমি মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেই।


বাসায় আসার কয়েকদিন হতে না হতেই বাবা আমার বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। বুঝতে পারলাম আমাকে কেউ এভাবে দেখতে চায় না। আমার ভাইয়েরাও চায় আমি বিয়ে করে সুখে শান্তিতে বেঁচে থাকি। তাই যেদিন বাবা আমাকে বলল,

" আমি তোকে আবার বিয়ে দিবো। তোর জীবনের এখনো কিছুই হয়নি। যতো টাকাই লাগুক আমি তোকে বিয়ে দিবো"


আমি সেদিন নীরবে দাঁড়িয়ে বাবার কথাটা শুনেছিলাম,হ্যাঁ না কিছুই বলিনি।


তার প্রায় একমাস পর হঠাৎ করেই বাবা আমাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। আমিও জোর করলাম না। পাঁচ বছরের একটা ডিভোর্সি মেয়ের পছন্দ অপছন্দ থাকাটা মানায় না। তাই আমিও কিছু বলিনি বাবাকে আমার পছন্দ নিয়ে। যে ছেলেটার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে সেই ছেলেটা আমার থেকে এক বছরের ছোটই হবে। আমি কখনো ভাবিনি এমন একজন মানুষকে আমি বিয়ে করবো। অশিক্ষিত, ক্ষ্যাত,গাইয়া একটা ছেলে বলা চলে। সারাজীবন স্বপ্ন বুনেছি সুন্দর সুদর্শন পুরুষ নিয়ে। কিন্তু আজ এমন একজন মানুষের সাথে আমার বিয়ে হলো যাকে আমি কখনোই মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। শুধুমাত্র বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রাজী হয়েছি। কারণ আমি পাঁচ বছর একটা মানুষের সাথে সংসার করেছি। বাবা অনেক খুঁজে এই ছেলেটাকে আমার জন্য ঠিক করেছে। বাবার ধারণা এই ছেলেটার কাছেই আমি সুখী হবো। ছেলেটার কেউ নেই,বাবা মা অনেক আগেই মারা গিয়েছেন। সেজন্যই লেখাপড়া খুব বেশি দূর পর্যন্ত করতে পারেনি।


আমি বাসর ঘরে বউ সেজে বসে আছি। এ নিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো আমি বউ সেজেছি তাই খুব একটা অস্বস্তি হচ্ছে না আমার। এটা আমার দ্বিতীয় বাসর রাত। প্রথমবার যেমন খুব উত্তেজিত ছিলাম রাতটা নিয়ে এবার ততোটা উত্তেজিত নয়। কারণ যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে তাকে আমার পছন্দ না। তাঁর সাথে একসাথে এক বিছানায় ঘুমাতে হবে এটা মনে হলেই গা ঘিন ঘিন করে। প্রতিরাতে ওই মানুষটার গায়ের ঘামের গন্ধে ঘুমাতে হবে আমাকে এটা ভাবতেই কেমন জানি লাগছে। তবে কিছু করার নেই আমার। বিলাসিতার জীবনে তো ছিলাম কিন্তু সেখানেও সবশেষে সুখ পাইনি। তাই বাবা এবার আর টাকা পয়সাওয়ালা কারো কাছে বিয়ে দেননি। বিয়ে দিয়েছেন গরীব একজন যুবকের কাছে। যে সভ্য সমাজের মানুষ থেকে অনেক আলাদা।


ওইতো ছেলেটা দরজা লাগিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমাকে হয়তো আমার অনুমতি ছাড়াই স্পর্শ করবে। কারণ এসব মানুষরা শুধু শারীরিক সম্পর্কটাকেই বড় করে দেখে। এটাই শিক্ষিত আর অশিক্ষিত মানুষের মাঝে পার্থক্য। আমি জানি না আজ রাতে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে। হয়তো বা নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে শারীরিক সম্পর্ক করতে হবে। আমি হয়তো কয়েকটা দিন সুযোগ পাবো না নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার।


"বুঝতে পারছি আপনি হয়তো আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছেন। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমাকে নিয়ে যেমনটা ভাবছেন আমি কিন্তু তেমন না। হয়তো আপনার মতো ওতো পড়ালেখা করতে পারিনি আমি,তবে যতোটুকু পেরেছি করেছি। আপনার বাবাকে আমি খুব সম্মান করি। ওনি যখন আপনার কথা আমাকে বলল,কেনো জানি তখন আমি না করতে পারিনি। আমি জানি আমার আপনাকে ভালো লাগেনি তবে আমারও কিছু করার ছিলো না। আমি যদি না করতাম তাহলে আপনার বাবা অনেক কষ্ট পেতো। আমি তাকে কষ্ট দিতে চাইনি। ওনি আমার জন্য অনেক করেছেন। বাবা মা মারা যাওয়ার পর যখন খাওয়ার অভাবে মরতে বসেছিলাম তখন আপনার বাবাই আমাকে কাজ দিয়েছিলেন। তারপর আর বেঁচে থাকার জন্য আমাকে চিন্তা করতে হয়নি। তাই আমি তাঁর অনুরোধটা ফেলতে পারিনি। আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনার জীবনটা হয়তো নষ্ট করে দিয়েছি আমি। তবে আপনার এখানে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে থাকবেন। আপনাকে কেউ কিছু বলবে না,আমিও আপনার ওপর কখনে আমার অধিকার খাটাতে আসবো না। আপনি ওপরে ঘুমান আমি নিচে ঘুমাচ্ছি।"


কথা গুলো বলেই ছেলেটা নিচে বিছানা পেতে শুয়ে পড়লো।


আমি মানুষটাকে খারাপ ভেবেছিলাম অথচ মানুষটা মোটেও খারাপ না সেটা তাঁর কথাবার্তা শুনেই বোঝা যায়। সে ততোটা শিক্ষিত না হলেও,স্মার্ট না হলেও তাঁর এমন ব্যবহারটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাঁর মধ্যে একটা ভালো মানুষ বাস করে। যে মানুষটা পৃৃথিবীর সবাইকে মুগ্ধ করার ক্ষমতা রাখে। মনে হলো পৃৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ মানুষটা আমার সামনে কথা বলল। যার কথায় কোনো রাগ নেই,কোনো অভিমান নেই,আছে শুধু মুগ্ধতা। 


প্রথম প্রথম এই মানুষটার গায়ের ঘামের গন্ধ আমার কাছে অসহ্য লাগতো। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি বুঝতে পারলাম এই লোকটার ঘামের গন্ধেই আমার ভবিষ্যৎ সুখ নিহিত। পাঁচ বছরের ডিভোর্সি একটা মেয়ে এতো ভালো মনের একটা মানুষকে নিজের স্বামী হিসেবে পাবে এটা কেউ কল্পনা করতে পারে? পারে না। কিন্তু আমি পেয়েছি। আমি তাঁর সাথে খুব তাড়াতাড়িই নিজেকে মানিয়ে নিলাম। অথচ আমি ভেবেছিলাম কোনোদিন এই মানুষটার সাথে আমি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবো না। কিন্তু আমি নিয়েছি। মানুষটা অন্য সব মানুষের মতো ওতো স্মার্ট না,সুন্দর না,শিক্ষিত না। তবে তাঁর ভিতরটা যেকোনো মানুষের থেকে সুন্দর। আর একজন মানুষের বাহিরের সৌন্দর্য কিছু না। জীবনে সুখী হওয়ার জন্য ভিতরের সৌন্দর্য দরকার। বাহিরের সৌন্দর্য দিয়ে কখনো পরিপূর্ণ সুখী হওয়া যায় না। আর এই মানুষের ভিতরটা বিশুদ্ধ। তাই আমি মানুষটাকে উপেক্ষা করতে পারি না।


চলবে................#জীবন_সংসার

#পর্ব-৩

#আমিনুর রহমান


কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদেরকে কখনো ভালো না বেসে থাকা যায় না। নিজের অজান্তেই সেসব মানুষদের প্রতি মুগ্ধতা কাজ করে। আমার ক্ষেত্রেও কি তেমন হয়নি? বিয়ের আগে কতো কি ভেবেছি আমি এই মানুষটাকে নিয়ে। ময়লা শরীরের অশিক্ষিত খুব সাধারণ একজন যুবকও যে কোনো শহরে শিক্ষিত সুন্দরী মেয়ের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে সেটা আমি কখনো বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু আজ বিশ্বাস না করে উপায় নেই। কারণ আমি তাঁর উপস্থিত প্রমাণ। আমার থেকে এক বছরের ছোট এই ছেলেটাকে খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করে আমার কিন্তু পারি না। ওই যে বাসর রাতে তাঁর সাথে আমি খুব খারাপ ব্যবহার করেছি। তাঁর সাথে একটা কথাও বলিনি আমি। অথচ সে হয়তো সেই রাতটাতে আমার কাছ থেকে ভালো লাগার কিছু কথা শুনতে চেয়েছিলো কিন্তু আমি বলিনি। সেই লজ্জায় আমি তাঁকে নিজের ভিতরের অনুভূতির কথা বলতে পারি না। সেও কখনো জানার চেষ্টা করে না এই কয়েকটা দিনের ব্যবধানে আমি তাঁর প্রতি কতোটা মুগ্ধ হয়েছি।


ছেলেটার নাম হাসান। দেখতে শ্যাম বর্ণের একজন সাদাসিধে যুবক। আমি তাঁর কোনো স্পর্শ পাইনি,সে কখনো আমার হাতটা পর্যন্ত ধরেনি তবুও কেনো জানি মনে হয় এই মানুষটা আমার ভিতরে বাস করে,আমার সবকিছুতে সে তাঁর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে। আমি চাইলেও তাকে নিজের কাছ থেকে সরাতে পারি না। আমার কল্পনার সপ্তম মহাকাশে আমি তাকে নিয়ে মনের সুখে ঘুরে বেড়াই। তবুও আমি তাকে ছুঁতে পারি না। মনে হয় তাকে ধরলেই সে অদৃশ্য হয়ে যাবে কিন্তু আমি তো তাকে হারাতে চাই না,নিজের ভালোবাসার খাঁচায় খুব যত্ন করে বন্দী করে রাখতে চাই আজীবন। সে যে আমার ভালোবাসার পাখি। আমার ভয় হয় আমার পাখিটা যদি খাঁচা ছেড়ে উড়ে যায়? আমি যে তাকে জনম জনম ধরে আমার মনোমন্দিরে বন্দী করে রাখতে চাই সেটা কি জানে?


"আপনি তো অনেক দূর পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। আমাদের একটা স্কুল আছে। সেখানে গরীব মানুষের পোলাপান পড়াশোনা করে। তবে তারা আমার মতো এতোটা ক্ষ্যাত না। আপনি যদি ওই স্কুলটাতে পড়াতেন তাহলে অনেক গুলো বাচ্চার উপকার হতো। আমি আপনাকে জোর করছি না। বাসায় একা একা সবসময় উদাস মনে বসে থাকেন যেটা দেখে আমার খুব খারাপ লাগে। যদিও আমার খারাপ লাগাতে আপনার কিছু যায় আসে না। তবুও একটু ভেবে দেখবেন। যদি সম্ভব হয় পড়াবেন"।


হাসান যখন কথা গুলো বলল তখন আমার ভিতরটাতে মনে হলো কেউ একজন অনবরত ছুড়ি দিয়ে আঘাত করছে। আমার সহ্য হচ্ছিলো না। সে আমাকে এতোটা নিচু মনের মানুষ ভাবে? সে কি জানে না মানুষ বদলায়,তাঁর ব্যবহার বদলায়,সাথে ঘৃণাটাও ভালোবাসায় পরিণত হয়। সে জানবে কি করে? তাকে তো আমি কখনো বলিনি। তাঁর খুব সাধারণ জাঁকজমকহীন জীবন যাপনটা আমার বড় ভালো লাগে। আমিও তাঁর মতো করে তাঁর সাথে এভাবেই খুব সাধারণ ভাবে চিরকাল বেঁচে থাকতে চাই।


আমি যখন তাকে অবাক করে দিয়ে বললাম,

"আচ্ছা আমি ভেবে দেখবো। আগে স্কুলের পরিবেশটা দেখবো। যদি ভালো লাগে তাহলে পড়াবো।"


আমার কথাটা শুনে হাসান কিছুটা হকচকিয়ে গেলো। সে হয়তো ভাবেনি আমি বিষয়টা এতো সহজ ভাবে নিবো। তাই সে যখন খুশি মনে বলল,


"আপনি কবে যেতে পারবেন বলেন। আমি আপনাকে সেদিনই নিয়ে যেতে পারবো সাথেও আমাদের গ্রামটা ঘুরিয়ে দেখাবো।"


ছেলেটাকে আজ প্রথম আমি হাসতে দেখলাম। ওরকম বিশ্রী হাসি না,শব্দ করে হাসে তেমন হাসি না। খুব শান্তশিষ্ট ভদ্র হাসি। একটা ছেলের হাসিতেও যে মুক্তো ঝড়তে পারে,কোনো মেয়ে মুগ্ধ হতে পারে সেটা আমার জানা ছিলো না। কিন্তু সত্যিই হাসানের হাসিটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। একজন মানুষকে যখন ভালো লাগতে শুরু করে তখন বোধয় মানুষটার সবকিছুই ভালো লাগে। চলাফেরা, কথাবার্তা, হাসি কান্না সবকিছুই। আমি নিশ্চিত আমার কাছে যে হাসিটা খুব ভালো লেগেছে সেটা হয়তো পৃৃথিবীর অন্য কোনো মেয়ের কাছে খুব বিশ্রী মনে হবে। তবে আমার বারবার একটা কথা মনে হচ্ছে,যে ছেলের হাসিটা এতো সুন্দর তাঁর কান্নাটা কতো মধুর হবে। ছেলেরা নাকি খুব সুন্দর করে কাঁদতে পারে,যেটা মেয়েরা পারে না। কিন্তু আমি তো এই ছেলেটাকে কাঁদতে দিতে চাই না। সে হাসবে,সবসময় হাসবে। যতদিন বেঁচে থাকবে ততোদিন হাসবে। সে কখনো কাঁদতে পারবে না। আমি তাকে কাঁদতে দিবো না।


আজ প্রথম আমি তাঁর সাথে বাহিরে বের হয়েছি। তাঁর সাথে মানে হাসানের সাথে। দুজন মানুষ পাশাপাশি বসলেও কেউ কারো সংস্পর্শে নেই। সে আমার থেকে যতোটা সম্ভব দূরে সরে বসেছে। মনে হচ্ছে আমার সাথে একটু ছোঁয়া লাগলে তাকে আমাজন জঙ্গলে বনবাস দেওয়া হবে। নিজের বিয়ে করা বউ এর সাথে এক রিকশায় যাচ্ছে অথচ ভীতুর মতো মাঝখানে পানামা খালের সমান দূরত্ব বজায় রেখেছে। আমার খুব বিরক্ত লাগছে। কি এমন হয় সাহস করে আমার হাতে হাতটা একটু রাখলে। খুব ভালো মানুষেরা মনে হয় ভীতু টাইপের হয়। হাসানও তেমন হয়েছে। আমি সাহস করে যখন তাঁর হাতে হাত রাখবো ঠিক তখনই সে তাঁর হাতটা সরিয়ে নিলো। অথচ সে দেখেইনি আমি তাঁর হাতে হাত রাখার জন্য সকল লজ্জা,অপমান,সংকোচ পেছনে ফেলে বাড়িয়ে দিয়েছিলাম নিজের অপবিত্র হাতটা। তাঁর বিশুদ্ধ হাতের ছোঁয়া পাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি ব্যর্থ হয়েছি। এটাকেই বোধয় ভাগ্য বলে। কথায় আছে,অভাগা যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়। আমার ক্ষেত্রেও তেমনি হলো।


আমি আরও একবার তাকে দেখে বিস্মিত হলাম। রিকশাওয়ালা ছেলেটার বয়স বড় জোর আঠারো হবে। এতো ছোটো একজন মানুষকেও সে আপনি করে অন্য সব মানুষের মতো সম্মান দিয়ে কথা বলছে অথচ এই মানুষটাকে আমি অশিক্ষিত ভেবেছিলাম। আবিরের সাথেও তো অনেক সময় অনেক জায়গায় রিকশা করে গিয়েছি আমি। কিন্তু আবিরকে কখনো কোনো রিকশাওয়ালাকে এতোটা সম্মান দিয়ে কথা বলতে দেখিনি। সে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তুই করে বলতো,বয়সে খুব বেশি বড় হলে তুমি করে বলতো। শিক্ষিত হলেই কারো কাছ থেকে ভালো ব্যবহার আশা করা যায় না। আবার অনেক অশিক্ষিত মানুষের কাছ থেকেও খুব সুন্দর ব্যবহার পাওয়া যায়। এটা আমি হাসানকে দেখেই বুঝতে পারলাম। তাঁর প্রতি ভালোবাসার সাথে সাথে সম্মানটাও অনেক বেড়ে গেলো। আমি ভেবেছিলাম সে আমার যোগ্য না কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমিই তাঁর যোগ্য না।


স্কুলটাকে যতোটা নোংরা ভেবেছিলাম ততোটা নোংরা না। পরিবেশটা ভালো না হলেও একেবারে খারাপ না। যখন জানতে পারলাম স্কুলটাতে হাসানের অনেক অবদান আছে তখন কেনো জানি আরও একবার তাঁর প্রতি আমি মুগ্ধ হলাম। একটা মানুষের মাঝে কি এমন থাকে যে তাঁর প্রতি বার বার এতো মুগ্ধ হওয়া যায় আমার জানা নেই। তবে আমি নিশ্চিত, আমি যতো বার শ্যাম বর্ণের ছোটোখাটো এই ছেলেটার প্রতি মুগ্ধ হয়েছি পৃৃথিবীর আর কেউ কারো প্রতি কখনো এতবার মুগ্ধ হয়নি,ভবিষ্যতেও হবে না। এই গ্রামে বাচ্চাদের পড়ার জন্য কোনো স্কুল ছিলো না। প্রায় তিন কিলো পথ পায়ে হেটে স্কুলে যেতে হতো। কেউ যখন স্কুলের জন্য জমি দিচ্ছিলো না তখন হাসান জমি দিয়েছে। অথচ তাঁর জমিজমা বলতে বাড়ির জায়গাটুকু আর স্কুলের জায়গায় টুকুই ছিলো। একটা মানুষের মন কতো বড় হলে এমন কাজ করে আমার জানা নেই। তবে আজ আমার বোঝার বাকি নেই বাবা আমাকে ঠিক মানুষের কাছেই বিয়ে দিয়েছেন। যে মানুষটার মন এতো বড় তাঁর ভালোবাসার সীমানা কতো বড় হবে এটা ভাবতেই ভিতরটাতে এক অজানা ভালো লাগা বয়ে যায়।


আকাশে মেঘ জমেছে,তবে বৃষ্টি হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যদি আজ বুষ্টি নামে,হাসান আমাকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে তাহলে কেমন হবে? আমি জানি বৃষ্টিতে ভিজলে আমার অসুখ হবে,জ্বর আসবে,সর্দি লাগবে। কিন্তু তবুও আমি তাঁর সাথে ভিজতে চাই। আমি তাঁর সাথে ভেজার জন্য হাজার বার বিছানায় পড়তে রাজি আছি,জ্বরে আক্রান্ত হতে রাজী আছি। তবুও আমি তাঁর হাত ধরে তাঁর সাথে একটু ভিজতে চাই। সেই যে আমার সবচেয়ে বড় অসুখ। 


ওই তো হাসান বসে বসে কি যেনো করছে। সেও কি আমার মতো ভাবে? নাকি ভাবে না খুব জানতে ইচ্ছে করে আমার। আমি আজ সব ভয়কে জয় করে তাকে সব বলবো। বলবো আমার তাকে ভালো লাগে,আমি তাকে খুব খুব কাছে পেতে চাই।


"এই শোনো ছোট ছেলে। তুমি এমন কেনো? আমাকে বুঝো না কেনো? এতো ভীতু হলে চলে? আজ থেকে তুমি সারাদিন যেখানেই থাকো না কেনো সন্ধ্যা হলে আমার কাছে ফিরে আসবে। আমি দিনের আলোয় তোমাকে ভালোবাসতে পারবো না,আমি লজ্জায় মরে যাবো। অন্ধকার রাতে যখন পৃৃথিবীর সব মানুষ ঘুমিয়ে যাবে,কারো কোনো সাড়াশব্দ থাকবে না,একটা কাকপক্ষীও জেগে থাকবে না। তখন আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরিয়ে ঘুমাবো। তুমি কিন্তু না করবে না। আমি তোমাকে শুধু জড়িয়ে ধরেই ঘুমাবো না। পুরুষদের যতরকম চাহিদা থাকে আমি তোমার সেসব চাহিদা পূরণ করবো। তোমাকে আমার হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিবো। বিনিময়ে তোমার ভিতরের বিশুদ্ধ ভালোবাসাটা আমার চাই। তুমি আমাকে দিবে না? বলো"

 পরের পর্বগুলা এখানেই দিছি? এই ওয়েবসাইটেই।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url